সন্ধ্যা সঙ্গীত/আবার

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

আবার?

তুমি কেন আইলে হেথায়
এ আমার সাধের আবাসে?
এ আলয়ে যে নিবাসী থাকে,
এ আলয়ে যে অতিথি আসে,


সবাই আমার সখা,  সবাই আমার বঁধু,
সবারেই আমি ভালবাসি,
তারাও আমারে ভালবাসে,
তুমি তবে কেন এলে হেথা
এ আমার সাধের আবাসে?
এ আমার প্রেমের আলয়,
এ মাের স্নেহের নিকেতন,
বেছে বেছে কুসুম তুলিয়া
রচিয়াছি কোমল আসন।
কেহ হেথা নাইক নিষ্ঠুর,
কিছু হেথা নাইক কঠিন,
কবিতা আমার প্রণয়িনী
এইখানে আসে প্রতি দিন!
সমীর কোমল মন,  আসে হেথা অনুক্ষণ,
যখনি সে পায় অবকাশ,
যখনি প্রভাত ফুটে,  যখনি সে জেগে উঠে,
ছুটিয়া আইসে মাের পাশ;
দুই বাহু প্রসারিয়া,  আমারে বুকেতে নিয়া,
কত শত বারতা শুধায়,
সখা মাের প্রভাতের বায়!


আকাশেতে তুলে আঁখি  বাতায়নে বসে থাকি
নিশি যবে পােহায় পােহায়;
উষার আলােকে হারা  সখী 'মাের শুকতারা
আমার এ মুখ পানে চায়,
নীরবে চাহিয়া রহে,  নীরব নয়নে কহে
“সখা, আজ বিদায়—বিদায়!”
ধীরে ধীরে সন্ধ্যার বাতাস
প্রতিদিন আসে মাের পাশ!
দেখে, আমি বাতায়নে,  অশ্রু ঝরে দুনয়নে,
ফেলিতেছি দুখের নিশ্বাস;
অতি ধীরে আলিঙ্গন করে,
কথা কহে সকরুণ স্বরে,
কানে কানে বলে “হায় হায়!”
কোমল কপােল দিয়া কপােল চুম্বন করি
অশ্রু বিন্দু সুধীরে শুখায়।
সবাই আমার মন বুঝে,
সবাই আমার দুঃখ জানে,
সবাই করুণ আঁখি মেলি
চেয়ে থাকে এই মুখ পানে!
যে কেহ আমার ঘরে আসে


সবাই আমারে ভালবাসে,
তবে কেন তুমি এলে হেথা,
এ আমার সাধের আবাসে!

চাহিতে জান না তুমি  অশ্রুময় আঁখি তুলি
অশ্রুময় নয়নের পানে;
চিন্তাহীন, ভাবহীন  শূন্য হাসিময় মুখে
ওকি দৃষ্টি হান’ এ বয়ানে,
চেয়ে চেয়ে কৌতুক নয়ানে!
র’ ফের”-ও নয়ন  ভাবহীন ও বয়ন
আনিও না এ মাের, আলয়ে,
আমরা সখারা মিলি  আছি হেথা নিরিবিলি
আপনার মনােদুঃখ লয়ে।
এমনি হয়েছে শান্ত মন,
ঘুচেছে দুঃখের কঠোরতা,
ভাল লাগে বিহঙ্গের গান,
ভাল লাগে তটিনীর কথা।
ভাল লাগে কাননে দেখিতে
বসন্তের কুসুমের মেলা,
ভাল লাগে, সারাদিন ব'সে


দেখিতে মেঘের ছেলেখেলা।
এইরূপে সায়াহ্নের কোলে
রচেছি গােধূলী-নিকেতন,
দিবসের অবসান কালে
পশে হেথা রবির কিরণ।
আসে হেথা অতি দূর হতে
পাখীদের বিরামের তান,
ম্রিয়মাণ সন্ধ্যা বাতাসের
থেকে থেকে মরণের গান।
পরিশান্ত অবশ পরাণে
বসিয়া রয়েছি এই খানে।

কহিয়া নিষ্ঠুর বাণী,  কঠোর কটাক্ষ হানি,
আবার ভেঙ্গো না এ আলয়,
হৃদয়েতে কোর না প্রলয়।
প্রতি দিন সাধিয়া সাধিয়া,
পদতলে কাঁদিয়া কাঁদিয়া,
প্রকৃতির সাথে আজি করেছি প্রণয়;
গাছ পালা সরােবর,  গিরি নদী নিরঝর,
সকলের সাথে আজি করেছি প্রণয়;


মনে সদা জাগে এই ভয়
আবার হারাতে পাছে হয়!

যাও, মােরে যাও ছেড়ে,  নিও না-নিও না কেড়ে,
নিও না, নিও না মন মাের;
সখাদের কাছ হতে  ছিনিয়া নিও না মােরে,
ছিঁড়ো না এ সখ্যতার ডোর!

আবার হারাই যদি,  এই গিরি, এই নদী,
মেঘ বায়ু কানন নির্ঝর,
আবার স্বপন ছুটে,  একেবারে যায় টুটে
এ আমার গােধূলীর ঘর,
আবার আশ্রয় হারা,  ঘুরে ঘুরে হই সারা,
ঝটিকার মেঘ খণ্ড সম,
দুঃখের বিদ্যুৎ-ফণা  ভীষণ ভুজঙ্গ এক
পোষণ করিয়া বক্ষে মম!
তাহা হলে এ জনমে,  নিরাশ্রয় এ জনমে
ভাঙ্গা ঘর আর গড়িবে না,
ভাঙ্গা হৃদি আর জুড়িরে না!
একটি কথা না বোলে,  যাও চোলে, যাও চোলে,
কাল সবে গড়েছি আলয়,

কাল সবে জুড়েছি হৃদয়,
আজি তা’ দিও না যেন ভেঙ্গে
রাখ’ তুমি রাখ’ এ বিনয়!