সন্ধ্যা সঙ্গীত/গান আরম্ভ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

ডাকি তোরে, অায়রে হেথায়,
সাধের কবিতা তুই আয়!
চারি দিকে খেলিতেছে মেঘ,
বায়ু আসি করিছে চুম্বন,
সীমা-হারা নভস্থল, দুই বাহু পসারিয়া
ভাই বোলে, সখা বোলে,
বুকেতে করিছে আলিঙ্গন ।
অনন্ত এ আকাশের কোলে
টলমল মেঘের মাঝার,
এই খানে বাঁধিয়াছি ঘর
তোর তরে, কবিতা আমার।
আহা এ কি নিভৃত নিলয়,
অাহা এ কি শান্তি নিকেতন!



অতি দূরে ছায়া-রেখা সম
পৃথিবীর শ্যামল কানন।
হেথা আমি আসিব যখনি
তোরে আমি ডাকিব রমণী।
মেঘেতে মেঘেতে মিলে মিলে
হেলে দুলে বাতাসে বাতাসে,
হাসি হাসি মুখখানি করি
নামিয়া আসিবি মোর পাশে।
বাতাসে উড়িবে তোর বাস,
ছড়ায়ে পড়িবে কেশপাশ,
ঈষৎ মেলিয়া আঁখি পাতা
মৃদু হাসি পড়িবে ফুটিয়া,
হৃদয়ের মৃতুল কিরণ
অধরেতে পড়িবে লুটিয়া৷
একখানি জোছনার মত
বাতাসের পথ ছুঁয়ে ছুঁয়ে,
হিল্লোল-আকুল কমলিনী
বাতাসে পড়িবি নুয়ে নুয়ে।
পৃথিবী হইতে অতি দূরে
এই হেথা মেঘময় পুরে,



গলাটি জড়ায়ে ধরি মোর
ব’সে র’বি কোলের উপর।
এলোথেলো কেশপাশ লোয়ে
বসে বসে খেলিব হেথায়,
উষার অলক দুলাইয়া
সমীরণ যেমন খেলায়!
চুমিয়া চুমিয়া ফুটাইব
আধফুটে হাসির কুসুম,
মুখ লোয়ে বুকের মাঝারে
গান গেয়ে পাড়াইব ঘুম!
কৌতুকে করিয়া কোলাকুলি
আসিবে মেঘের শিশুগুলি,
ঘিরিয়া দাঁড়াবে তারা সবে
অবাক হইয়া চেয়ে রবে!
তাই তোরে ডাকিতেছি আমি
কবিতা রে, আয় এক বার,
নিরিবিলি দুটিতে মিলিয়া
র’ব’হেথা, বধুটি আমার!

মেঘ হোতে নেমে ধীরে ধীরে

আয়লো কবিতা মোর বামে।
চম্পক অঙ্গুলি দুটি দিয়ে
মেঘরাশি ধীরে সরাইয়ে,
উষাটা যেমন ক’রে নামে।
বায়ু হোতে আয়লো কবিতা,
আসিয়া বসিবি মোর পাশে,
কে জানে বনের কোথা হোতে
ভেসে ভেসে সমীরণ স্রোতে
সৌরভ যেমন কোরে আসে!
হৃদয়ের অন্তঃপুর হোতে
বধু মোর, ধীরে ধীরে অায়।
ভীরু প্রেম যেমন করিয়া
ধীরে উঠে হৃদয় ধরিয়া,
বঁধুর পায়ের কাছে গিয়ে
অমনি মুরছি পড়ে যায়!
পরের হৃদয় হোতে উঠে
আয় তুই কবিতা অামার,
গিরির আঁধার গুহা হোতে
মৃদু মৃদু অতি ক্ষীণ স্রোতে
যেমন করিয়া উথলায়



ছোট এক নির্ঝরের ধার।
তেমনি করিয়া তুই আয়,
আয় তুই কবিতা আমার!

চকিতে করিয়া ছিন্ন ঘন ঘোর মেঘরাশি,
বিদ্যুৎ যেমন নেমে আসে,
হে কবিতা, তেমন করিয়া
এসো না এসে না মোর পাশে!
দূর দূরান্তর হোতে প্রচণ্ড নিশ্বাস ফেলি
ঝটিকা যেমন ছুটে আসে,
দশ দিশি থরহরি ত্রাসে!
আত্মঘাতী পাগলের মত
এলোথেলো মেঘ শত শত
শত শত বিদ্যুতের ছুরি
বার বার হানিতেছে বুকে,
যন্ত্রণায় আৰ্ত্তনাদ করি,
ছুটিতেছে ঝটিকার মুখে!
এমন ঝটিকা রূপ ধরি,
এলোমেলো উন্মাদিনী বেশে,
এসো না, কবিতা, কভু তুমি

এ আমার বিজন প্রদেশে!
ছিরে ফেলি লোহার শৃঙ্খল,
ভেঙ্গে ফেলি হৃদি কারাগার,
আঁখি ফেটে অনল নিকলে,
ধ’রে অতি ভীষণ আকার,
পলক না ফেলিতে ফেলিতে
যেমন ছুটিয়া ক্রোধ আসে,
হৃদয়ের অন্তঃপুর হোতে
তেমন এসো না মোর পাশে!
যা' কিছু সম্মুখে পায়, গলাইয়া জ্বলাইয়া
আগ্নেয়-গিরির প্রাণ হোতে
উঠে যথা অগ্নির নির্ঝর,
কবিতা, আগ্নেয় মুর্তি ধরি
পরের হৃদয় ভেদ করি,
এসো না এ হৃদয়ের পর!
এসে তুমি উষার মতন
এসে তুমি সৌরভের প্রায়,
প্রেম উঠে যেমন করিয়া
নিঝর যেমন উথলায়!

অথবা শিথিল কলেবরে
এস তুমি, বস’ মোর পাশে;
শোয়াইয়া তুষার শয়নে,
চুমি চুমি মুদিত নয়নে,
মরণ যেমন করে আসে,
শিশির যেমন করে ঝরে;
পশ্চিমের আঁধার সাগরে
তারাটি যেমন কোরে যায়;
অতি ধীরে মৃদু হেসে, সীঁদুর সীমন্ত দেশে
দিবা সে যেমন করে আসে
মরিবারে স্বামীর চিতায়,
পশ্চিমের জ্বলন্ত শিখায়।
পরবাসী ক্ষীণ আয়ু, একটি মুমুষু বায়ু,
স্বদেশ কানন পানে ধায়
শ্রান্ত পদ উঠিতে না চায়;
যেমনি কাননে পশে, ফুল-বধূটির পাশে,
শেষ কথা বলিতে বলিতে
তখনি অমনি মরে যায়.
তেমনি, তেমনি করে এস,
কবিতা রে, বধুটি আমার,

ম্লান মুখে করুণা বসিয়া,
চোখে ধীরে ঝরে অশ্রু ধার।
দুটি শুধু পড়িবে নিশ্বাস,
দুটি শুধু বাহিরিবে বাণী,
বাহু দুটি হৃদয়ে জড়ায়ে
মরমে রাখিবি মুখখানি!