সন্ধ্যা সঙ্গীত/সন্ধ্যা (সন্ধ্যাসংগীতের সংযোজন)

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

ব্যথা বড়ো বাজিয়াছে প্রাণে ,
সন্ধ্যা তুই ধীরে ধীরে আয়!
কাছে আয় — আরো কাছে আয় —
সঙ্গীহারা হৃদয় আমার
তোর বুকে লুকাইতে চায় ।
আমার ব্যথার তুই ব্যথী ,
তুই মোর একমাত্র সাথী ,
সন্ধ্যা তুই আমার আলয় ,
তোরে আমি বড়ো ভালবাসি —
সারাদিন ঘুরে ঘুরে ঘুরে
তোর কোলে ঘুমাইতে আসি ,
তোর কাছে ফেলি রে নিশ্বাস ,
তোর কাছে কহি মনোকথা ,
তোর কাছে করি প্রসারিত
প্রাণের নিভৃত নীরবতা ।
তোর গান শুনিতে শুনিতে
তোর তারা গুনিতে গুনিতে ,
নয়ন মুদিয়া আসে মোর ,
হৃদয় হইয়া আসে ভোর —
স্বপন-গোধূলিময় প্রাণ
হারায় প্রাণের মাঝে তোর!
একটি কথাও নাই মুখে ,
চেয়ে শুধু রোস মুখপানে
অনিমেষ আনত নয়ানে ।
ধীরে শুধু ফেলিস নিশ্বাস ,
ধীরে শুধু কানে কানে গাস
ঘুম-পাড়াবার মৃদু গান ,
কোমল কমল কর দিয়ে
ঢেকে শুধু দিস দুনয়ান ,
ভুলে যাই সকল যাতনা
জুড়াইয়া আসে মোর প্রাণ!
তাই তোরে ডাকি একবার
সঙ্গীহারা হৃদয় আমার ,
তোর বুকে লুকাইয়া মাথা
তোর কোলে ঘুমাইতে চায় ,
সন্ধ্যা তুই ধীরে ধীরে আয় ।
আঁধার আঁচল দিয়ে তোর
আমার দুখেরে ঢেকে রাখ ,
বল তারে ঘুমাইতে বল
কপালেতে হাতখানি রাখ ,
জগতেরে ক ' রে দে আড়াল ,
কোলাহল করিয়া দে দূর —
দুখেরে কোলেতে করে নিয়ে
র ' চে দে নিভৃত অন্তঃপুর ।
তা হলে সে কাঁদিবে বসিয়া ,
কল্পনার খেলেনা গড়িবে ,
                             খেলিয়া আপন মনে কাঁদিয়া কাঁদিয়া , শেষে
আপনি সে ঘুমায়ে পড়িবে ।
  
আয় সন্ধ্যা ধীরে ধীরে আয় ,
হাতে লয়ে স্বপনের ডালা
গুন্‌ গুন্‌ মন্ত্র পড়ি পড়ি
গাঁথিয়া দে স্বপনের মালা ,
জড়ায়ে দে আমার মাথায় ,
স্নেহ-হস্ত বুলায়ে দে গায়!
                             স্রোতস্বিনী ঘুমঘোরে , গাবে কুলু কুলু করে
ঘুমেতে জড়িত আধো গান ,
ঝিল্লিরা ধরিবে একতান ,
                             দিনশ্রমে শ্রান্ত বায়ু গৃহমুখে যেতে যেতে
গান গাবে অতি মৃদু স্বরে ,
                             পদশব্দ শুনি তার তন্দ্রা ভাঙি লতা পাতা
ভর্ৎ সনা করিবে মরমরে ।
                             ভাঙা ভাঙা গানগুলি মিলিয়া হৃদয়-মাঝে
মিশে যাবে স্বপনের সাথে ,
                             নানাবিধ রূপ ধরি ভ্রমিয়া বেড়াবে তারা ,
হৃদয়ের গুহাতে গুহাতে!
  
আয় সন্ধ্যা ধীরে ধীরে আয় ,
আন তোর স্বর্ণ মেঘজাল ,
পশ্চিমের সুবর্ণ প্রাঙ্গণে
খেলিবি মেঘের ইন্দ্রজাল!
ওই তোর ভাঙা মেঘগুলি ,
হৃদয়ের খেলেনা আমার ,
ওইগুলি কোলে করে নিয়ে
সাধ যায় খেলি অনিবার ।
ওই তোর জলদের ' পর
বাঁধি আমি কত শত ঘর!
সাধ যায় হোথায় লুটাই ,
অস্তগামী রবির মতন ,
লুটায়ে লুটায়ে পড়ি শেষে
সাগরের ওই প্রান্তদেশে
তরল কনক নিকেতন!
ছোটো ছোটো ওই তারাগুলি ,
ডাকে মোরে আঁখি-পাতা খুলি ।
স্নেহময় আঁখিগুলি যেন
আছে শুধু মোর পথ চেয়ে ,
সন্ধ্যার আঁধারে বসি বসি
কহে যেন গান গেয়ে গেয়ে ,
‘ কবে তুমি আসিবে হেথায়
অন্ধকার নিভৃত-নিলয়ে ,
জগতের অতি প্রান্তদেশে
প্রদীপটি রেখেছি জ্বালায়ে!
বিজনেতে রয়েছি বসিয়া
কবে তুমি আসিবে হেথায়! '
সন্ধ্যা হলে মোর মুখ চেয়ে
তারাগুলি এই গান গায়!
আয় সন্ধ্যা ধীরে ধীরে আয় ,
জগতের নয়ন ঢেকে দে —
আঁধার আঁচল পেতে দিয়ে
কোলেতে মাথাটি রেখে দে!