সময় অসময় নিঃসময়/উপভাষা, লঘুসংস্কৃতি, অপর পরিসর

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

উপভাষা, লঘুসংস্কৃতি, অপর পরিসর

 যে-ভাষা যত বেশি সমৃদ্ধ, উপভাষার ঐশ্বর্যে সে তত ধনী। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে কোনও ভাষা যখন যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত হয়, এলাকা ভেদে তাতে দেখা যায় বৈচিত্র্য। ধ্বনিগত ও রূপগত কিংবা পদান্বয় ও শব্দভাণ্ডারের ভিন্নতা যখন কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় আপাত-গ্রাহ্য হয়ে ওঠে, আমরা উপভাষার আদল ফুটে উঠতে দেখি। মূল ভাষার সঙ্গে তার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য যুগপৎ সত্য। সামাজিক ইতিহাসের চাপে একই ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে কোনও বিশেষ অঞ্চলের আর্থরাজনৈতিক সমৃদ্ধি যখন অন্যান্য এলাকার বাসিন্দাদের পেছনে ফেলে দেয়—অনিবার্যভাবে গড়ে ওঠে কেন্দ্র ও পরিধির সম্পর্ক। গঠনগত সামগ্রিকতা সত্ত্বেও সংস্কৃতির কেন্দ্রাভিগ প্রবণতা অনস্বীকার্য। আবার দ্বিবাচনিকতার নিয়মে বিকেন্দ্রায়ন প্রক্রিয়া দেখা দেয় প্রান্তিক অঞ্চলে—এ কথা অস্বীকার করা যায় না। বাংলা ভাষার একই অঙ্গে এত রূপ এইজন্যে। রাঢ়, বঙ্গ, পু, বরেন্দ্র প্রভৃতি অঞ্চলের নৈসর্গিক বৈচিত্র্যই সাংস্কৃতিক ও ভাষিক ভিন্নতার উৎস। ওই সব ঐতিহ্যগত এলাকাতেই নয় কেবল, জেলায় জেলায় মহকুমায় মহকুমায় বাংলা ভাষার প্রায়োগিক ঐশ্বর্য প্রকাশ পায় তার প্রায়-অনন্ত বৈচিত্র্যে। এদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাষারূপ যে শিষ্ট বাংলা হিসেবে সর্বজনমান্য হয়ে উঠল, এর পেছনে সক্রিয় রয়েছে সামাজিক প্রতাপের আনুকূল্য। রাজধানীর আশেপাশে কেন্দ্রাভিগ সংস্কৃতি ও সেই সংস্কৃতির পরিপোষক ভাষা যতখানি পরিশীলিত হয়, দূরবর্তী প্রান্তিক অঞ্চলে কখনও তা হওয়া সম্ভব নয়। স্থিতিস্থাপকতার বদলে ওই সব এলাকায় প্রকট হয়ে ওঠে অস্থিরতা ও পরিধি-সংলগ্ন বিচ্ছুরণ। আকরণ-আভিমুখ্যের পরিবর্তে আকরণোত্তর প্রবণতা কেন্দ্রীয় ভাষার শিষ্ট রূপটিকে বজায় রাখতে পারে না। উপভাষার বিশিষ্ট ধরন তাই প্রান্তিক অঞ্চলগুলিতে আপেক্ষিক স্বাতন্ত্র অর্জন করে নেয় এবং সেই স্বাতন্ত্রকে সামাজিক মান্যতা ও প্রতিষ্ঠা দেয়।

 বাংলা ভাষায় পুরুলিয়া-বীরভূম-কোচবিহার অঞ্চলের উপভাষায় কেন্দ্রীয় ভাষা-সংস্কৃতির প্রভাব দুর্লক্ষ্য নয়, কিন্তু প্রান্তিক অঞ্চলগুলির মৌখিক বাব্যবহারে আপেক্ষিক স্বাতন্ত্র্যও স্পষ্ট। অবশ্য মনে রাখতে হয় একথা যে, স্বাতন্ত্র্য অচল অনড় অপরিবর্তনীয় নয়। বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যন্ত্রসভ্যতার বিকাশ ছিল স্তিমিত গতি; আর্থসামাজিক পরিসরে আজকের মতো তীব্র জটিল অভিঘাতও দেখা যায়নি। ফলে উপভাষা অঞ্চলের ধীর স্থির আকরণেও কোনও বড় মাপের সমস্যা অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু গত তিন দশকে অভূতপূর্ব তথ্য-প্রযুক্তির বিস্ফোরণ বিশ্বায়নের মাদককে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে দিয়েছে। উপভাষা ব্যবহারকারীর চেতনাবিশ্ব ফলে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে, স্বভাবত ভাষাবিশ্বও অটুট থাকেনি। আপেক্ষিক স্বাতন্ত্রের পূর্বাগত প্রেক্ষিত কার্যত তাৎপর্যহীন হয়ে পড়েছে। শিষ্টায়নের প্রবণতা আগেও ছিল উপভাষা অঞ্চলে; ইদানীং তা অতিমাত্রায় প্রকট। আরও একটি কথা এইসঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন। শিষ্ট চলিত ভাষার কেন্দ্র অন্তত পশ্চিমবঙ্গের নিরিখে পুরুলিয়াবীরভূম-কোচবিহার থেকে খুব একটা লক্ষণীয় দূরত্বে নেই। কার্যকরী অপরতার বোধকে বিকৃতভাবে, রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে, উসকে দিয়ে ইদানীং যদিও উত্তরবঙ্গে ‘কামতাপুরি’ নাম নিয়ে বাংলা ভাষার সঙ্গে আঞ্চলিক উপভাষার সম্পর্ক অস্বীকার করা হচ্ছে—ক্ষীণ বা অস্তিত্বহীন সংযোগের সংকট ওই অপর পরিসরে ছিল না কখনও। কিন্তু নোয়াখালি-চট্টগ্রাম-সিলেট এবং অবিভক্ত কাছাড় (সাম্প্রতিক অভিধা অনুযায়ী বরাক উপত্যকায়) বসবাসকারী প্রান্তিকায়িত বাঙালিদের জন্যে সংযোগের অভাব জনিত সংকট জ্বলন্ত বাস্তব। অপর পরিসরের উপলব্ধি এইসব অঞ্চলে তাই অর্জিত নয়, স্বতঃস্ফূর্ত। উপগ্রহ-প্রযুক্তির সমুদ্রোচ্ছাস এবং শিষ্টায়ন প্রবণতা দিন দিন বেড়ে যাওয়া সত্ত্বেও আপেক্ষিক স্বাতন্ত্র এখনও বাস্তব ও অপরিহার্য সত্য।

 ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনায় না গিয়েও কয়েকটি প্রাসঙ্গিক কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। বরাক উপত্যকা ঔপনিবেশিক শক্তি ও আঞ্চলিক প্রভুত্ববাদী বর্গের যৌথ কুটিল চক্রান্তে আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত। স্বাধীন হয়েছি আমরা, ভারতবর্ষের বাকি অংশের সঙ্গে; কিন্তু অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সঙ্গে লড়াই আজও থামল। আজও ছেদ ঘটল না আত্মঘাতী মূঢ়তার, আত্মবিস্মৃতির, নির্লজ্জ সমঝোতা ও তোমোদ প্রবণতার। বরাকের সমাজে রন্ধ্রে-রন্ধ্রে ঢুকে গেছে বিবেকহীন পশ্চাত্তাপশূন্য দালাল-মানসিকতার বিষ। এই নিবন্ধ যখন লিখছি, স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় পড়লাম, আগামী লোকগণনায় আসামের বঙ্গভাষীরা যাতে নিজেদের অসমিয়া বলে পরিচয় দেন—সেই অনুরোধ জানিয়েছে বাঙালি মা-বাবার কয়েকটি কুলাঙ্গার সন্তান। পুরননা দিনে বলা যেত, এইসব উচ্ছিষ্টজীবী মানুষ নামধারী ইতর প্রাণীদের মুখে আঁতুড়ঘরে নুন দেওয়া হয়নি কেন? এরা এবং এদের মুষ্টিমেয় সাঙ্গপাঙ্গরা অসমিয়া কেন, জুলু-হটেনটট বলে নিজেদের প্রচারিত করুক। কিছু আসে যায় না। এইসব দুকান-কাটা লোকগুলো খবরের কাগজে ঠিক এখনই বিবৃতি দিচ্ছে কেন? সামনেই আসামে নির্বাচনের ঢাকে কাঠি পড়বে বলে? নাকি, কারণ আরও গভীরে! হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তানের স্তবপ্রচারকেরা দিনে রাত্রে বেনো জল ঢুকিয়ে দিচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক মদতে। চ্যানেলে চ্যানেলে উগ্র কুৎসিত নীল বিষ প্রতীচ্যায়িত হিন্দিয়ানির সূত্রে না-পৃথিবীর হাতছানি আর উন্মত্ত ভোগবাদ দিয়ে বাঙালি ও মনুষ্যত্বের সব চিহ্ন মুছে ফেলতে চাইছে। সৎ অসমিয়াদের জন্যেও একই বিপদ আজ। কিন্তু অসম সাহিত্য সভার পাণ্ডারা দেয়ালের লিখন পড়তে না পেরে একচক্ষু হরিণের মতো পুরনো হরতন-ইস্কাবন দিয়ে খেলতে চাইছেন। বঙালখেদা আন্দোলন থেকে বহিরাগত বিতাড়ন উৎসব দিয়ে এঁরা আসামকে ক্রমাগত টুকরো করেছেন, গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতে আগুন জ্বালিয়েছেন। তবু এরা পণ করেছেন, অসমিয়াকরণ আর খিড়কি-দুয়ার দিয়ে নয়, সদর দরজা দিয়ে করবেন। এদের শিক্ষা হবে কি? এদের জন্যে সময়ের কোনও ভাষা নেই, নতুন পাঠ নেই কোনও।

 আসলে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সাড়ম্বরে উদ্যাপিত হওয়ায় এবং উনিশে মে নতুন মর্যাদায় পালিত হওয়ার সম্ভাবনায় অন্ধকারের হায়েনা শেয়ালেরা গর্ত ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে। তার ওপর, চিরঘুমন্ত বাঙালি নবজাগরণ-এর উদাত্ত আহ্বানে পশ্চিমবঙ্গে নিদালির ঘোর কাটিয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। বাংলা ভাষা কেবল হিন্দুর নয়, কেবল মুসলমানের নয়। হিন্দু বাঙালি ও মুসলমান বাঙালির মিথ্যা পরিচয়ের গোলকধাঁধার বিরুদ্ধে একুশ শতকের উদয়-মুহূর্তে নতুন চেতনার বিচ্ছুরণ শুরু হয়েছে—এই সত্য অনুভব করে টনক নড়েছে বিবরবাসীদের। ভাড়াটে কলমচিরা তক্কেতক্কে ছিল, নবজাগরণের তাৎপর্য নিয়ে উপভাষা অঞ্চলের প্রান্তিক বাঙালিরা ঠিক কীভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারে, এ নিয়ে তাদের একটি শব্দও খরচ করতে দেখিনি। কিন্তু ঘেঁকশেয়ালেরা রাজকীয় জোব্বা পরে নেওয়ার জন্যে হুক্কা-হুয়া শুরু করা মাত্র ওই কলমচিরা একটুও দেরি না করে বারো হাত কাকুরের তেরো হাত বীচি নিয়ে বিজ্ঞজনোচিত ভাষ্য লিখতে শুরু করেছে। যে-বিষয় ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে বুঝিয়ে দেওয়া উচিত, তা মনোযোগের অযোগ্য, তড়িঘড়ি তার টীকা-ভাষ্য করার অর্থ কি ঘোলাজলে মাছ শিকারের জন্যে কাউকে কাউকে উসকে দেওয়া? এতে নিজেদের অবস্থান হাস্যকর হয়ে গেলেও কিংবা নিজেদের মুখ পুড়ে গেলেও কিছু যায় আসে —এই কি মনোগত অভিপ্রায়?

 তাহলে পঁচিশে বৈশাখের সকালেই ভাষিক সম্প্রসারণবাদী ও আঞ্চলিক আধিপত্যবাদীরা শিলচরে গান্ধীবাগের চত্বর দখল করতে থাকুক। আমাদের বুকে বসে আমাদেরই দাড়ি উপড়াতে থাকুক উদ্ধত প্রতাপে, আগ্রাসনবাদীরা আমাদের শিলনোড়া দিয়ে আমদেরই দাঁতের গোড়া ভাঙতে থাকুক। শিলচর সহ বরাক উপত্যকার সমস্ত জনপদে দিনরাত বাজতে থাকুক চটুল বিহুগীতি ও জৈব প্রবৃত্তিতে সুড়সুড়ি-দেওয়া হিন্দি ভাষার কোলাহল। পিঠ পুড়ে পুড়ে অস্থিমজ্জায় আগুন ধরে গেলেও ফিরে শোয়ার কথকতা চালিয়ে যাই আমরা। উনিশে মে ফিরে যাক ব্যর্থ নমস্কারে। আমরা তো সিলেটিতে কথা বলি, শিষ্ট বাংলায় বলি না। বাংলার আর কোনও উপভাষা অঞ্চলে অন্তত এটা দেখব না, বৃহত্তর সামাজিক পরিমণ্ডলে শিষ্ট চলিত ব্যবহার করলে আড়াল থেকে কেউ বিদ্রুপ করছে।‘দেশি কুকুর বিলিতি কুকুরের বুলি আওড়াচ্ছে বলে মূখতম উপহাসে একে অপরের শরিক হচ্ছে। পুরুলিয়া বীরভূম-কোচবিহারবাঁকুড়া-বগুড়া- চট্টগ্রামে কখনও এই অভিজ্ঞতা হবে না যে, আনুষ্ঠানিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমাবেশে কেউ প্রকাশ্যে নিজের উপভাষায় ভাষণ দিচ্ছে। উপভাষার নিজস্ব কিছু বাগবিধি, স্বরন্যাস কিংবা উচ্চারণভঙ্গি থাকতে পারে—এইমাত্র। অন্যত্র এটা কল্পনারও অগোচর যে, নিজেরই ভাষার শিষ্টরূপে সড়গড় হওয়ার জন্যে কেউ সচেতন চেষ্টা করবে না। কিন্তু বরাক উপত্যকার পাঠশালাগুলিতে বাংলা বর্ণমালাও উপভাষার স্পর্শদোষ এড়াতে পারছে না।

 ছাত্র-ছাত্রীরা যখন ধাপে-ধাপে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে, তাদের মগজে ও অভ্যাসে বদ্ধমূল হয়ে যাচ্ছে এই সংস্কার যে বাংলা যেমন খুশি ব্যবহারযোগ্য। কেননা প্রতিটি স্তরে প্রতিটি বিষয়ে টেক্সট বইগুলিতে বাংলা ভাষাকে দুমড়ে মুচড়ে পরিকল্পনা মাফিক বিকৃত করা হচ্ছে। অথচ পাঠ দান একটা আনুষ্ঠানিক ব্যাপার মাত্র নয়; এতে প্রচুর সূক্ষ্ম ও গভীর অনুভূতির স্তরও রয়েছে। সেসব বিঘ্নিত হয় যদি শিক্ষক-শিক্ষিকারা নির্বিচারে সর্বত্র কেবল ধ্বস্ত মর্দিত বাংলাকে বা উপভাষাকেই প্রকাশ-মাধ্যম করে তোলেন। শিষ্ট চলিত ফলে হয়ে উঠেছে আবশ্যিক অথচ কম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিকল্প মাত্র।

 এই ছাত্রছাত্রীরা, এমন কি শিক্ষক-শিক্ষিকারাও, যখন জীবনের প্রয়োজনে বৃহত্তর বাঙালি পরিমণ্ডলে যান—দু-একটি বিরল ব্যতিক্রম বাদ দিলে অন্য কেউ হীনমন্যতা। কাটিয়ে উঠতে পারেন না। এ কি আমরা ভাবতে পারি যে, উত্তরবঙ্গ (শিলিগুড়ি) কিংবা বর্ধমান বা বিশ্বভারতী বা বিদ্যাসাগর (মেদিনীপুর) বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে শিক্ষক-শিক্ষিকারা পাঠকক্ষে ঢোকার আগে এটা বলে দিচ্ছেন ছাত্র-ছাত্রীদের, ‘তোমরা বাপু আমাদের সঙ্গে বা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে অন্তত উপভাষা ব্যবহার করো না। দ্যাখো, তোমরা বাংলা পড়তে এসেছ এবং আমরাও বাংলা পড়াতে এসেছি। অতএব বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে কিংবা তার বাইরেও, মত বিনিময়ের জন্যে শিষ্ট চলিত শুদ্ধভাবে ব্যবহার করতে শেখো’! এ এক উদ্ভট পরিস্থিতি শিলচরের আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যা কিনা ন ভূতো ন ভবিষ্যতি। বাংলা ভাষাকে চেতনার প্রতিটি কোষে-কোষে যদি প্রতিষ্ঠিত করতে চাই এবং সর্বত্রব্যাপ্ত আক্রমণের চক্রান্তকে প্রতিহত করতে চাই, তাহলে পাঠশালা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বুঝতেই হবে। সিলেটি উপভাষা থাকুক আমাদের একান্ত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্তরে। উনিশে মে-একুশে জুলাই-সতেরো আগস্টের রক্ত-রাঙা পথ তো সিলেটি উপভাষার জন্যে তৈরি হয়নি, বাংলা ভাষার মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্যে হয়েছিল। আমরা যেন মর্যাদার তাৎপর্য ও প্রায়োগিক দিকটা তলিয়ে ভাবি। নইলে আমরাই দায়ি হব দুঃখিনী বর্ণমালার অষ্টাবক্র দশার জন্যে।

 বরাক উপত্যকায় খবরের কাগজগুলিতে বাংলা ব্যবহারের নামে যথেচ্ছাচার চলছে। সংবাদপত্রে কাজ শুরু করার আগে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ বা শিক্ষানবিশির ব্যবস্থা না থাকায় দু-তিনটে বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলা ভাষার শুদ্ধতা নিয়ে সাংবাদিকদের কারও কোনও মাথাব্যথা থাকে না। বাক্য তৈরিতে কোনও মাথা-মুণ্ডু নেই; অসমিয়া কিংবা হিন্দি কিংবা সিলেটি শব্দ বা বাগবিধি ইচ্ছেমতো ব্যবহৃত হচ্ছে। বানানের কথা তো না বলাই ভালো। কয়েক দিন যেতে না যেতেই এরা নিজেদের এত কেউকেটা বলে ভাবতে শুরু করে যে ঔদ্ধত্য হয়ে যায় মাত্রাছাড়া। পেশাগত উৎকর্যের জন্যেও যে ভাষাপ্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত পুনঃশিক্ষিত হতে হয়—প্রতাপের ছায়ায় লালিত হয়ে এঁরা এই সত্য ভুলে যান। শেষ পর্যন্ত মনস্তাত্ত্বিক কারণে এঁরা বাংলা ভাষাকেও নিজেদের সেবাদাসী বলে ভাবতে শুরু করেন। মুশকিল হচ্ছে, রোজ এদের কলম-নিঃসৃত বাক্যরাশি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। জনসাধারণের ভাষারুচিকে এরা দলিত, মথিত ও বিকৃত করে দিচ্ছে। কেউ দেখার নেই, কেউ বলার নেই। আর বললেই বা শুনবে কে? এই যে বিচিত্র পরিস্থিতি, তা-ও প্রান্তিক অঞ্চলের উপভাষায় আনখশির প্রোথিত থাকার ফলেই উদ্ভূত হচ্ছে। আলোর চেয়ে ছায়ার রমরমা যেখানে, স্বভাব সেখানে আচ্ছন্ন হয় সহজে: জাতীয় স্বভাব, ভাষার স্বভাব, অনুভূতির স্বভাব—সর্বত্র সুস্থতার চেয়ে বিকার বড় হয়ে ওঠে। চিন্তা ও উপলব্ধিতে কেন্দ্র নেই কোনও, আছে কেবল লাগামছাড়া বয়ে যাওয়া। আছে ‘ঠেকার কাজ’ কুলিয়ে দেওয়া। উপভাষার শৌর্য ও সৌন্দর্য, প্রাকৃতায়নের স্পন্দন যেখানে বাচনে অভূতপূর্ব গভীরতা যোগ করতে পারত, সেখানে তার বদলে দেখা যায় উপসংস্কৃতির লঘুতা ও হীনমন্যতা। দুঃখিনী বর্ণমালার অষ্টাবক্র দশা তাই অবধারিত।

 অবক্ষয়ী আধুনিকতাবাদের বিষক্রিয়ার অভিব্যক্তিগুলি প্রত্যন্ত অঞ্চলে ‘বৈশিষ্ট্য বলে বন্দিত ও অনুকরণীয় হয়ে ওঠে। সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতের সঙ্গে এইসব অভিব্যক্তির দ্বিবাচনিক সম্পর্ক বিচার না করে যখন তাদের মান্যতা দেওয়া হয়, বুঝতে হবে এ কেবল জাতে ওঠার মেড ইজি বা সহজ পাঠ মাত্র। যা আমরা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অর্জন করিনি, তা প্রসাধনের বিড়ম্বনা ছাড়া কিছুই দিতে পারে না। আমাদের এই অনাগরিক উপভাষা-অঞ্চলে প্রাকৃতায়ন, ঐতিহ্যমনস্কতা, আদিকল্প থেকে আহৃত চেতনা, ধীরস্থির নিসর্গসাপেক্ষ চিহ্নায়ন প্রকরণের গ্রন্থনা কেবলমাত্র সাহিত্য ও শিল্পসৃষ্টির লক্ষণমাত্র নয়; এ আমাদের জীবনদৃষ্টির বিশিষ্ট ধরন। যেসব অপরিহার্য কারণে এবং কেন্দ্রীকৃত প্রতিবেদনের আধিপত্যবাদী তাড়নায় শিষ্ট চলিতভাষী এলাকায় ঔপনিবেশিক আধুনিকতাবাদের আদল ক্রমশ আদর্শায়িত হয়েছিল, উপভাষাভাষী বরাক উপত্যকার বাঙালিদের জন্যে সেসব কিছুমাত্র প্রাসঙ্গিক ছিল না। তবু বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরে নিজেদের ব্রাত্য লঘুসংস্কৃতি কিংবা উপসংস্কৃতির অনুসারী বলে ভেবেছি বলে আমরা জন্মসূত্রে অর্জিত এবং অভিজ্ঞতায় ও উপলব্ধিতে পুনঃস্বীকৃত অভিজ্ঞানকে পশ্চাৎপরতার দৃষ্টান্ত মনে করে মরমে মরে রইলাম। নিজেদের বিকল্প জীবনবীক্ষার নিবিড়তা, লাবণ্য ও গৌরবের তাৎপর্য আবিষ্কার করার বদলে বহু হাত-ফেরতা আধুনিকতাবাদের উদ্ভট রঙ মেখে নিলাম। গাজনের হরগৌরীর মতো নয়, সাকার্সের ক্লাউনের মতো। অথচ উত্তর আধুনিকতার ফসল গোলায় ভোলার মতো ক্ষেত্র ছিল প্রস্তুত, শ্রাবণের মেঘ নিয়ে আকাশ ছিল উন্মুখ, উপভাষার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য লোকায়ত ঐতিহ্যের বীজতলি ছিল আগ্রহী কৃষকের অপেক্ষায়। আমাদের কবিতায় ও ছোটগল্পে মাঝে মাঝে তার ঝিলিক দেখা গেল শুধু। কিন্তু অবক্ষয়ী আধুনিকতাবাদ আমাদের শেখাল আত্ম-অবমাননা, স্বভূমির প্রতি উপেক্ষা, মিথ্যা কেন্দ্রীকরণের প্রতি মোহ। আর, হাল আমলে আধুনিকোত্তর প্রতিজগৎ ও প্রতিচেতনার আলেয়া-উচ্ছ্বাসে নিজেদের বিশ্বায়িত করার জন্যে হঠাৎ উৎকট আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছি আমরা।

 উত্তর-আধুনিকতার বীজতলিকে খুঁজতে হয় না, উপভাষার সহগামী লঘুসংস্কৃতির মধ্যে তা স্বাভাবিকভাবে উপস্থিত। কেন্দ্রীয় এলাকার তুলনায় আমাদের অপর পরিসর বিকেন্দ্রায়নের শতজল ঝরনায় উচ্ছ্বসিত হতে পারে। অথচ আজ কোনো ভগীরথ সেই ঝর্নার ধ্বনিকে জটাজাল ভেদ করে আমাদের উৎসুক ইন্দ্রিয়ের কাছে নিয়ে এল না। আমাদের আপাত-বিচ্ছিন্নতা মূল সংস্কৃতির সমস্ত বেগবান ধারাকে সমান মাপে প্রাসঙ্গিক করে তোলেনি। দ্বীপবাসী যেভাবে ঊর্মিমালার দিকে তাকায়, আমরাও সেভাবে সময়ের ক্রুর উদাসীন উচ্ছ্বাসের পানে তাকিয়েছি। আমাদের ওই তাকানোয় অভ্যাস ছিল, দেখার আশ্চর্য ছিল না। চিরকাল যারা স্রোতের উপান্তে থাকে কিংবা নিবদ্ধ থাকে বেলাভূমিতে, সমগ্র বহমানতা সম্পর্কে তাদের কোনও ধারণা তৈরি হয় । অথবা সমগ্রের পরিধিতে আদৌ কোনও অবস্থান উপ-সংস্কৃতির দ্যোতনাসম্পন্ন প্রত্যাখ্যাত ও দূরীকৃত অপর পরিসরের পক্ষে সম্ভব কিনা—এই প্রশ্নের মীমাংসা নিয়েও মাথা ঘামায় না কেউ।

 বীরভূম বা মালদহের আঞ্চলিক উপভাষায় যেসব বাঙালিরা কথা বলেন, তাদের কিন্তু বাঙালিত্ব প্রমাণ করতে হয় না। চট্টগ্রাম-নোয়াখালির উপভাষার প্রকট স্বাতন্ত্র সত্ত্বেও জাতিসত্তা নিয়ে অনাবশ্যক জটিলতা দেখা যায় না। কিন্তু ঔপনিবেশিক প্রভুশক্তির সাংস্কৃতিক রাজনীতির শিকার হওয়ার ফলে বারবার সিলেটি উপভাষী মানুষের উপর নেমে এসেছে বানিয়ে-তোলা অস্তিত্বের সংকট। বাংলার রাষ্ট্রসীমা হতে নির্বাসন দিয়ে আসামের সঙ্গে সিলেটকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আসামের আধিপত্যবাদীরা প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি লুব্ধতা ছাড়তে পারেনি, কিন্তু মেধার উৎকর্ষ ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রকেও মেনে নিতে চায়নি। সিলেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত অবিভক্ত কাছাড়ও একই কারণে আঞ্চলিক প্রভুত্ববাদীদের কাছে চক্ষুশূল। বাংলার সংস্কৃতিবিশ্বের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য এই অঞ্চলের মানুষজন যাতে শক্ত মেরুদণ্ড নিয়ে মর্যাদা দাবি করতে না পারে, এজন্যে ধূর্ত চক্রান্তের জাল বিছানো হয়েছে সর্বত্র। এর সর্বশেষ উৎকট নিদর্শন হল, কিছু বেতনভুক উচ্ছিষ্টজীবী দালালদের দিয়ে বাঙালিদের উদ্দেশ্য আহ্বান জানানো—তারা যেন আগামী লোকগণনায় অসমিয়াকে নিজেদের মাতৃভাষা বলে ঘোষণা করে।

 গোটা আসাম জুড়ে বাঙালিরা প্রধানত কোনও না কোনও উপভাষায় কথা বলেন। এতে মূখদের পোয়াবারো, কারণ, অসমিয়ার অপভ্রংশ বলে সমস্ত অপর পরিসর এবং তাদের স্থানিক সংস্কৃতিকে গ্রাস করার অজুহাত বানানো যায়। সমস্ত বাংলা মাধ্যমের স্কুলকে কবেই মুছে ফেলা হয়েছে; নয়া অসমিয়া নামক কাঠালের আমসত্ত্বও তৈরি করা হয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি থেকে বহুদূরে থাকার ফলে এবং সাম্প্রতিক গৈরিকীকরণের পর্যায়ে হিন্দুত্ব ও মুসলমানত্ব মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার পরিণতিতে দূরবর্তী অপরেরা নিজেদের গোত্রপরিচয় ভুলে যেতে বসেছে। বিনিময়ে পাচ্ছে ভিটেমাটি থেকে উৎখাত না হওয়ার আশ্বাস এবং ভুক্তাবশিষ্ট এঁটোকাটা কুড়িয়ে নেওয়ার চমৎকার স্বাধীনতা।

 এইজন্যে বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি সংস্কৃতির বিপুল বৈচিত্র্যপূর্ণ ভূবনেও আসামের পলায়নবাদী ভীরু বঙ্গভাষীরা নিজেদের জন্যে কোনও পরিসর তৈরি করতে পারেনি। আসল কথা, তৈরি করতেও চায় নি। এখানেই বরাক উপত্যকার উপভাষাভাষী বাঙালিদের অভিজ্ঞান ও দুর্বলতা যুগপৎ স্পষ্ট। মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে মনে, আমরা কি একই সঙ্গে মাতৃভাষার বাইরে ও ভেতরে? কিন্তু কেন এই বিচিত্র সসেমিরা অবস্থান? তবে কি সর্ষের মধ্যেই কোথাও ভূত রয়ে গেছে? বিশেষত গত দুই দশকের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে মনে হয়, ঘরে ঘরে প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে তোলার বদলে আমরা ঘরে ঘরে জতুগৃহ গড়ে তুলেছি। এই দুই দশকে মায়েরা বাবারা নিজেদের ছেলেমেয়েদের কিম্ভুতকিমাকার ‘শুদ্ধ’ বাংলা শেখাচ্ছেন। এতে ভঙ্গিটা শুধু শিষ্ট বাংলার কিন্তু উচ্চারণপ্রণালী ও স্বরন্যাসে স্পষ্টতই উপভাষার ধরন। এমন কি বাক্যগঠনেও উপভাষার ছাপ। এতে তৈরি হচ্ছে কেবল হাঁসজারু ও বকচ্ছপ বাংলা ভাষা।

 গত চার দশকের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সেইসব ছেলে-মেয়েরাই বিকট বাংলা বলে থাকে যারা তাদের বাড়িতে ‘শুদ্ধ’ ভাষা বলার প্রাথমিক পাঠ নিয়েছে। এরা মনে মনে উপভাষাকে তাচ্ছিল্য করতে শেখে অথচ বিশিষ্ট বাংলার মূলস্রোতে স্বচ্ছন্দভাবে যোগও দিতে পারে না। কিন্তু একই সঙ্গে উপভাষায় ও শিষ্ট বাংলায় দক্ষ হতে চাই শুধু সতর্কতা ও সংবেদনশীলতা। এরাই যখন গল্প লেখে, কবিতা লেখে, প্রবন্ধ লেখে, নাটক লেখে কিংবা বাচন-নির্ভর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়—তাদের অশিক্ষিত-পটুত্ব পদে পদে শিল্পরস ও সৃষ্টির লাবণ্যকে লাঞ্ছিত করতে থাকে। কারণ ভাষা যখন নানা ধরনের প্রকাশমাধ্যমের আকর, সূক্ষ্মতা ও গভীরতা সেইসব অশিক্ষিত-পটু জনদের জন্যে পুরোপুরি দুপ্রবেশ্য হয়ে যায়। এরই অনিবার্য পরিণতিতে নিজেদের স্থানিক উপসংস্কৃতির সূক্ষ্মতা ও বৈচিত্র্য এবং অপর পরিসরের শৌর্য ও লাবণ্যময় সম্ভাবনা পুরোপুরি অনধিগম্য হয়ে যায়। এরই সূত্র ধরে মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতিপূরণের তাড়নায় কূপমণ্ডুকতাই হয়ে ওঠে সর্বজনীন প্রতিরক্ষা ব্যুহ। একদিকে ছিড়ে যায় আমাদের শেকড়, অন্য দিকে মুছে যায় আকাশ। না পারি উপভাষার সহজ লাবণ্য ও খর চলিষ্ণুতার সূত্রে উপসংস্কৃতি ও অপর পরিসরের তাৎপর্য অনুধাবন করতে, না পারি নিজেদের বৃহত্তর চারণভূমিতে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্যে উপযুক্ত করে তুলতে। বঙ্গীয় পরিমণ্ডলের সবচেয়ে প্রান্তিক অঞ্চলের উপভাষাভাষী হিসেবে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করে আছে দীর্ঘ ও কঠোর নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জনীয় তাৎপর্য। পদে পদে তাতে স্খলিত হওয়ার আশঙ্কা; কিন্তু সব ধরনের ভ্রষ্টতার হাতছানি এড়িয়ে গিয়ে পৌছাতে পারি সম্ভাবনার স্বর্ণ-শিখর প্রাঙ্গণে। এভাবেই তো পৌঁছেছেন নির্মলেন্দু চৌধুরী ও হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সৈয়দ মুজতবা আলি ও ভূদেব চৌধুরী, বিপিনচন্দ্র পাল ও সুন্দরীমোহন দাস, অপূর্ব চন্দ ও অমিতাভ চৌধুরী, অশোকবিজয় রাহা ও জগদীশ ভট্টাচার্য এবং এরকম আরও কেউ কেউ। তা হলে কোন অকারণ হীনমন্যতা ও আত্মপ্রতারণার মোহে নিজেদের আকাশকে সঙ্কুচিত করে আমরা বরাক উপত্যকার বাঙালিদের সাহিত্যকর্ম ও সংস্কৃতিপ্রক্রিয়ার জন্যে ছোট মাপের মানদণ্ড তৈরি করি?

 বহু বছর আগে ‘সুরমাপত্যকা সাহিত্য সম্মিলিনী’র সভাপতির অভিভাষণ (১৩২৩ বঙ্গাব্দ) দিতে গিয়ে ভুবনমোহন দেবশর্মা যেসব কথা বলেছিলেন, সেই প্রতিবেদন পুনঃপাঠ করতে হবে আজ। সেই অভিভাষণের কিছু নির্বাচিত অংশ এখানে উদ্ধৃত করছি: ‘আমরা বাঙালি। বঙ্গভাষা আমাদের ভাষা। বঙ্গীয় সমাজ আমাদের সমাজ। আমাদের দেহে-দেহে বাঙালির রক্ত প্রবাহিত। আমাদের মস্তিষ্কে-মস্তিষ্কে বাঙালির চিন্তাস্রোত। বঙ্গ-ভারতি! তোমার বিজয়শঙ্খ পতিত সমাজের পাপ-তাপ দূর করুক।...মগধ, মিথিলা, শ্রীহট্ট ও উড়িষ্যায় একদা বাগবীণার একটি মাত্র তার বাজিত। কিরূপে তাহার ব্যত্যয় ঘটিয়াছে, আমাদের সুরমা উপত্যকার কথ্যভাষার দিকে লক্ষ্য করিলে, তাহার কথঞ্চিৎ পরিচয় পাওয়া যায়।...সাহিত্যের সমগ্র শক্তি একমাত্র উহার কেন্দ্রস্থলে আবদ্ধ থাকিলে দেশের সর্বত্র সত্বর উহার অভ্যুত্থান ঘটিবে না; আমাদের বিরাট জাতীয় ভাষা ও জাতীয় সাহিত্যের সৃষ্টি হইবে না। আগে ভাষা, পশ্চাৎ সাহিত্য। দুঃখের বিষয়, আমাদের ভাষা ও সাহিত্য লইয়া কিছু দিন পূর্বে একটা সন্দেহবাত্যা বহিয়া গিয়াছে। কোনো কোনো পাশ্চাত্য লেখকের লেখনীমুখে প্রকাশিত হইয়াছিল—শ্রীহট্টের বাগব্যবহার বঙ্গভাষা হইতে স্বতন্ত্র এবং শ্রীহট্টের নিজের কোনো ‘সাহিত্য’ নাই!...বাঙ্গালার প্রত্যেক জেলার শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত সমাজের কথোপকথনের ভাষা সর্বাংশে একরূপ নহে।..প্রত্যেক জেলার উচ্চশ্রেণী বা শিক্ষিত সমাজের কথ্যভাষা বঙ্গের আদর্শ ভাষার অনুরূপ; কিন্তু নিম্নশ্রেণীর কথ্যভাষা জেলায় জেলায় কিয়ৎ পরিমাণ বিভিন্ন ছাঁচে গঠিত; শব্দ-প্রয়োগ অপেক্ষা উচ্চারণগত বৈচিত্র্যই অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের ব্যবধান সৃষ্টি করিয়াছে। অশিক্ষিত লোকের কথ্যভাষা হইতে আদর্শ গ্রহণ করিয়া পূর্বকথিত পাশ্চাত্য মনীষীগণের অবলম্বিত প্রণালীতে সিদ্ধান্ত সংস্থাপন করিলে বলিতে পারা যায়, বঙ্গের প্রত্যেক জেলায় এমন কি, জেলার বিভিন্ন অংশে ভাষার বিভিন্ন আদর্শ প্রচলিত।...বিভিন্ন জেলার নিম্নশ্রেণীর কথ্যভাষার বৈচিত্র্য বিদ্যমান থাকিলেও উহারা মূলত অভিন্ন এবং অখণ্ড বঙ্গভূমির সাহিত্যিক ভাষার একই গতিপথ চিরকাল নিয়মিত রহিয়াছে।.ভাষা ও সাহিত্যের সহিত জাতীয়তার একটা দুচ্ছেদ্য সম্বন্ধ রহিয়াছে।..এই সম্বন্ধটুকু ছিন্নভিন্ন হইতে কেহই সম্মতি দিতে পারেন । অখণ্ড বঙ্গভাষা শতখণ্ডে বিভক্তা হইলে বঙ্গ সাহিত্যের সম্প্রসার খব্বীকৃত হইবে এবং সাহিত্য সাধনার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হইয়া যাইবে। আমদের সাহিত্যের ভাষা বাঙ্গালা। উহার ঢাকাই-রঙ্গপুরী শ্রীহট্ট-যশোহরী সংস্করণ নাই। সাহিত্য হইতে সর্বপ্রকার প্রাদেশিকতা সরাইয়া ফেলিয়া অখণ্ড বঙ্গভাষার উপাসনা করাই বঙ্গসাহিত্য সেবকের ধ্রুব লক্ষ্য। বঙ্গভাষার উপাসনায় আমাদিগকে নিম্নলিখিত পাশ্চাত্য মন্ত্রটি স্মরণ রাখিতে হইবে There is neither Greek nor jew but Christ is all অর্থাৎ খ্রিস্টভক্তের গ্রীক বা যীহুদী নাই সব খ্রিস্টান। বঙ্গভাষারও শ্রীহট্টনদীয়া নাই, অখণ্ড বঙ্গভূমি জুড়িয়া সব বাঙ্গালা’।

 ভাবতে অবাক লাগে, ৯৩ বছর আগে এই কথাগুলি উচ্চারিত হয়েছিল। ভুবনমোহনের অভিভাষণ আজকের আত্মবিস্মৃত বরাকবাসী বাঙালি বারবার পুনঃপাঠ করুন। বিশেষত নিম্নরেখাঙ্কিত বাক্যগুলি মন্ত্রের মতো পুনরুচ্চারণ করুন। তাহলে এই সত্য স্পষ্ট হবে যে, ভুবনমোহনের সময়ে যেমন আমাদের ভাষা ও সাহিত্য লইয়া’..সন্দেহবাত্যা বয়ে গিয়েছিল, সেই ‘সন্দেহবাত্যা’ সাংস্কৃতিক রাজনীতির আয়ুধ হিসেবে কয়েক বছর পরপর ব্যবহৃত হচ্ছে। অবিভক্ত কাছাড়কে অসমিয়াভূত গোয়ালপাড়া বানানোর চক্রান্ত, ৬০ সালের বঙ্গালখেদা, ৭২ এবং ৮৬ সালে আঞ্চলিক উপনিবেশবাদীদের চোয়া ভেঁকুর, ৭৮-৭৯ থেকে ৮৫-৮৬ পর্যন্ত বহিরাগত তাড়ানোর উগ্রতা এবং সম্প্রতি আসামবাসী বাঙালিকে অসমিয়া করে নেওয়ার উদ্ভট পরিকল্পনা—সমস্ত ক্ষেত্রে ভুবনমোহনের ‘সন্দেহবাত্যা’ কখনও ঘুর্ণিবায়ু, কখনও দাবানল, কখনও অগ্ন্যুৎপাত হয়ে দেখা দিয়েছে। ভুবনমোহনকে সাংস্কৃতিক রাজনীতির মোকাবিলা করতে হয়েছিল ৯৩ বছর আগে, আমাদেরও করতে হচ্ছে।

 কয়েক বছর আগে পাঠ্যপুস্তক এবং খবরের কাগজের ভাষায় বিদূষণ ঘটানোর দুরভিষন্ধিমূলক পরিকল্পনার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন ‘সাহিত্য’-এর সম্পাদক কবি বিজিৎকুমার ভট্টাচার্য। এই বিদূষণ এখন আরও কালান্তক মূর্তি নিয়ে হাজির হয়েছে। এর মোকাবিলা করতে হবে সুদৃঢ় ভাবাদর্শগত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে। ভুবনমোহনের প্রবন্ধ আমাদের আয়ুধ হোক। বিশেষত নিম্নরেখাঙ্কিত অংশ হোক আমাদের জপমন্ত্র। বরাক উপত্যকার উপভাষাভাষী কবি-লিখিয়েরা জেলায় জেলায় স্বতন্ত্র সাহিত্যভাণ্ডার’ এর মূখ ধারণাকে ভুবনমোহনের মতোই প্রত্যাখ্যান করুন। বিহারের সিংভূম অঞ্চলে কিংবা পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর অঞ্চলের জীবনযাপন ও বাগবৈভব ব্যবহার করেন বলে কি গল্পকার অনিল ঘড়াই, স্বপ্নময় চক্রবর্তীকে অথবা বাঁকুড়া-বীরভূমের ছাপ আছে বলে কথাসাহিত্যিক ভগীরথ মিশ্র-সৈকত রক্ষিত এবং কবি নির্মল হালদারকে অথবা উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক জীবনের রূপকার অভিজিৎ সেনকে আমরা নিছক স্থানীয়’ লেখক বলি? বাস্তব অলঙ্, উপভাষার আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য সেই বাস্তবের সূক্ষ্ম অভিজ্ঞতা ও ইশারা খচিত হয়ে থকে। সমস্ত কিছুকে আত্তীকৃত করেই গড়ে উঠেছে বাংলা ভাষার সাহিত্য-ভুবন।

 আজ কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারী-শঙ্করজ্যোতি দেব-বিজয়কুমার ভট্টাচার্য-স্বর্ণালী বিশ্বাস কিংবা গল্পকার শেখর দাশ-মিথিলেশ ভট্টাচার্য-বদরুজ্জামান চৌধুরী-সুব্রতকুমার রায়-রণবীর পুরকায়স্থ কিংবা প্রাবন্ধিক সুজিৎ চৌধুরী কি নিছক বরাকের লেখক হিসেবে পরিচিত? দেবীপ্রসাদ সিংহ গৌহাটিতে, দুলাল ঘোষ আগরতলায়, সাধন চট্টোপাধ্যায় কলকাতার মফঃস্বলে, দেবেশ রায় কলকাতায়, সেলিনা হোসেন ঢাকায়, হাসান আজিজুল হক রাজশাহীতে, উদয়ন ঘোষ আসানসোলে, কমল চক্রবর্তী জামশেদপুরে, পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় নৈহাটিতে লিখছেন—এসব তথ্য উৎসুক জনেরা জানতে চাইবেন হয়তো। কিন্তু প্রশ্নাতীত সত্য হল, এঁরা প্রত্যেকেই বাংলা ভাষার লেখক। নিশ্চয় ‘ভাষা ও সাহিত্যের সহিত জাতীয়তার...দুচ্ছেদ্য সম্বন্ধ...ছিন্নভিন্ন হইতে কেহই সম্মতি দিতে পারে না।’ এবং প্রত্যেকে ‘অখণ্ড বঙ্গভাষার উপাসনা’ করে চলেছেন যেহেতু ‘উহার ঢাকাই-রঙ্গপুরী, শ্রীহট্ট-যশোহরী সংস্করণ নাই’। তাই রণজিৎ দাশ-জয় গোস্বামী-রাহুল পুরকায়স্থদের কবিতা কামরুজ্জামান কামু-মাসুদ খান-খোন্দকার আশরাফ হোসেনদের কবিতার পাশাপাশি যখন পড়ি, এঁদের উপভাষাগত অভিজ্ঞান বা জেলাগত অবস্থান নিয়ে কিছুমাত্র চিন্তা করি না। কারণ, ‘অখণ্ড বঙ্গভূমি জুড়িয়া সব বাঙ্গালা'।

 তবু কেন বরাকের বাঙালিদের আজও সীমাহীন মূখতা ও নষ্টামির বিরুদ্ধে লড়তে হয় অবিভাজ্য বাঙালি সত্তার শরিক হিসেবে নিজেদের তর্কাতীত অবস্থান প্রমাণের জন্যে? ইতিহাসের এ এক নিষ্ঠুর কৌতুক। আমাদের জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ। একদিকে হিন্দি-হিন্দুত্ব-হিন্দুস্থানের তত্ত্ব, অন্যদিকে ঐশ্লামিক মৌলবাদের ক্রমবর্ধমান নিরেট চাপ। আবার একদিকে অসমিয়াকরণের প্রকাশ্য ও প্রচ্ছন্ন হুঙ্কার ও ধূর্ততা এবং অন্যদিকে উপনিবেশবাদী চক্রের ইঙ্গিতে সিলেটি জাতীয়তাবাদের সুড়সুড়ি। সম্প্রতি লন্ডনে ছাপা একটি বই নজরে পড়ল, যেখানে বাংলাদেশে শোষিত ও প্রান্তিকায়িত সিলেটিদের বাঙালি পরিচয় থেকে সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে প্রাথমিক পদক্ষেপ দেওয়া হয়েছে। প্রবাসী সিলেটিরা এই বার্তা ক্রমশ ছড়িয়ে দিচ্ছেন বৃহত্তর শিলচরের নানা এলাকায়। এখনও অবশ্য এই বক্তব্যে খুব একটা ডালপালা গজায়নি। কিন্তু ঘরপোড়া মানুষেরা সিঁদুরে মেঘের লক্ষণ দেখলে শঙ্কিত তো হবেই। মোদ্দা কথা হল, ভুবনমোহনের সময়ের মতো এখন ‘জাতীয়তার বন্ধন শ্লথ করিয়া অবশেষে গৃহে-গৃহে ঘৃণা ও অবিশ্বাসের বীজ ছড়াইয়া’ দেওয়ার আয়োজন অব্যাহত। কবি-লেখকবুদ্ধিজীবী-সংস্কৃতিকর্মীরা উপভাষা, লঘুসংস্কৃতি ও অপর পরিসরের ইতিবাচক সম্ভাবনার দিক কর্ষণ করুন। কিন্তু সেইসঙ্গে অনুমোদনযোগ্য লক্ষ্মণরেখার শাসনও অনুধাবন করুন। নইলে নেতি ও উৎকেন্দ্রিকতা তাদের সমস্ত সৃষ্টিমূলক উদ্যমে বরফজল ঢেলে দিতে পারে।

 বিশেষত নাট্যকর্মীরা যেন ওই লক্ষ্মণরেখার মর্ম বুঝতে পারেন। প্রাকৃতায়ন ও ঐতিহ্যমনস্কতা নিশ্চয় অবক্ষয়ী আধুনিকতাবাদের পঙ্কশয্যা থেকে তাদের উত্তরণ ঘটাবে। আর, উত্তর আধুনিক চেতনার মর্মকোষ থেকে তারা দ্রাক্ষামোচনও করবেন। কিন্তু উপভাষা ও তার সহগামী লঘু সংস্কৃতির অবশ্যমান্য সীমান্ত তাদের উপলব্ধিতে ধরা পড়ুক আগে। শিষ্ট ভাষা যেসব ধূসর ও ধুপছায়া অঞ্চলের দ্যোতনা পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না, উপভাষা তার সঙ্গে সেতু বন্ধন করুক। অপর পরিসরের অকর্ষিত ও অনাবিষ্কৃত ভূমিতে বীজাধান করুক উপভাষা-বাহিত লঘু সংস্কৃতির অনুষঙ্গগুলি। কিন্তু সেসব থাকুক অন্তর্বয়ন হিসেবে, কদাচিৎ অন্তর্বয়ন মূল প্রতিবেদন হতেও পারে বটে, কিন্তু তা সর্বজনীন ও সর্বত্রগ্রাহ্য হতে পারে না। উপভাষা অঞ্চলে যাঁরা সৃষ্টির উদ্যান রচনা করেন, সামঞ্জস্যবোধ তাদের সবচেয়ে সেরা অবলম্বন। সবুজ ঘাস ও গুল্মলতা অলঙ্করণ হিসেবে সুন্দর নিশ্চয়, কিন্তু তার বৃদ্ধিও মাত্রাতিরিক্ত নয়। মাত্রার বাইরে গেলে তা উদ্যানের পুষ্পসারকে আচ্ছন্ন করে, তখন তাকে বলি আগাছা। তেমনি উপভাষা-বাহিত লঘু সংস্কৃতির চেতনা আমাদের অপর পরিসরকে সৃষ্টির তাৎপর্যে মণ্ডিত করুক। একদেশদর্শী ভাবে আমরা যেন মূল ভাষাবিশ্বের প্রতিবন্ধক না হই।

 এমন যদি হয়, বীরভূমের সাহিত্য কিংবা চট্টগ্রামের সাহিত্য হয়তো বগুড়ার সাহিত্য কিংবা কাছাড়-সিলেটের সাহিত্যের সঙ্গে অসুস্থ ও অস্বাভাবিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হবে। প্রকাশ্যে অথবা প্রচ্ছন্নভাবে। বিশ্বায়নের দাপটে আমাদের আকাশ ঝাপসা, মাটি টলোমলো। এ সময় সামূহিক বাচন পুনরুদ্ধারের, পুনরাবিষ্কারের। সাংস্কৃতিক রাজনীতির মোড়লেরা নানা অজুহাতে ছদ্মসন্দর্ভের বিভ্রম তৈরি করে চলেছে। বিভ্রম থেকে উৎপাদিত হচ্ছে অলীক ব্যবধানের অবভাস। বাংলা ভাষার পতাকাতলে সমবেত হওয়ার এই তো মাহেন্দ্রক্ষণ। এ সময়ের বার্তা অন্তহীন দ্বিরালাপেরও। অতএব উপভাষার সঙ্গে ভাষার, একক বাচনের সঙ্গে সামূহিক বাচনের নতুন নতুন দ্বিরালাপের ক্ষেত্র আমরা যেন আবিষ্কার করতে থাকি। যে যেখানে আছি সেখানকার আলো-হাওয়া-রোদের চাহিদা অনুযায়ী। মূখ শয়তানের দল আমাদের সমবেত নবজাগরণে পরাভূত হবেই হবে। আমাদের আছে উনিশে মে, আমাদের আছে একুশে ফেব্রুয়ারি, আছে একুশে জুলাই, আছে সতেরোই আগস্ট।

 আমাদের গন্তব্যও এক। খণ্ডিত অস্তিত্ব থেকে পূর্ণ অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার দিকে আমাদের যাত্রা। উপভাষা আমাদের শৌর্য ও লাবণ্য, আমাদের লজ্জা ও দুর্বলতা নয়। শুধু চাই সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মাত্রাবোধ। ভুবনমোহনের কথা মনে রেখে বলব, ‘বঙ্গবাণীর অঙ্গচ্ছেদের শঙ্কা’ আমাদের আজও রয়ে গেছে। আমরা জানি, ‘শ্রীহট্টের কথ্যভাষা পুরাতন গৌড়ীয় বঙ্গভাষারই প্রতিকৃতি। আমরা তার শক্তি ও সৌন্দর্যের উৎস সাহিত্য ও সংস্কৃতির বহুস্বরিক বাচনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করব। অনধিকারীর পক্ষে তা সম্ভব নয়। ‘আমরা যে ভাষায় মাতৃস্তন্য পান করিয়াছি, তাহা অবিশুদ্ধ ভাবিতে পারি না। কিন্তু এই শুদ্ধতার। অর্জনের জন্যেও চাই যোগ্যতা।‘সাহিত্যদেহের রুধিরের অভাব দূর করার কথা ৯৩ বছর আগে ভুবনমোহন বলেছিলেন, এই সঙ্কট তো আজও রয়েছে। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? তখনও সত্য ছিল এই উচ্চারণ—‘ধনপুষ্ট পশ্চিমবঙ্গের উন্নত সাহিত্যের দিকে লক্ষ্য করিলে আমাদের গৃহদেবতা রক্ষা পাইবেন না।’ এখনও তা সত্য। আমাদের সীমায়িত অবস্থান কি শতাব্দী ধরে দৃষ্টিশক্তিকেও ক্ষীণ করে রেখেছে? ‘সাহিত্য শুধু ভাষার প্রাণ নহে, সমাজেরও প্রাণের অভিব্যক্তি’ ঠিক। তাহলে মাত্রাতিরিক্ত উপভাষা-চেতনাইকি আজও আমাদের গণ্ডিবদ্ধ করে রেখেছে? বড় আকাশ আমাদের হাতছানি দিয়েছে কিন্তু দাঁড় ছেড়ে বেশি দূর উড়তে পারিনি। ডানার ব্যবহার শিখিনি নাকি যথাপ্রাপ্ত পরিসরের অপরতা অদৃশ্য শেকল পরিয়ে দিয়েছে আমাদের?