সময় অসময় নিঃসময়/কালবেলা: মোহিনী আড়াল: ভ্রমকথা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
স ম য় ও স মা জ

কালবেলা: মোহিনী আড়াল: ভ্রমকথা

 শিরোনাম নিয়ে নিবন্ধ-প্রয়াসীর কিছু লেখার রেওয়াজ নেই। অনেকদিন আগে যেমন বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন, আমাদিগের (অর্থাৎ লেখকদের) আত্মপরিচয় আপনি দিবার রীতি নাই। কিন্তু ইদানীং সমস্ত কিছুই ‘চলে যায়। অতএব শিরোনাম প্রসঙ্গে লিখছি, না, গুরুতর কোনো কথা নয়। এইমাত্র যে, মনের মধ্যে লেখার বিষয়টি যখন দানা বেঁধে উঠেছে, ভাবছিলাম, নাম হোক; সময়ের সাহিত্য, সাহিত্যের সময়। একটু পরে নিজেরই খটকা লাগল ‘সাহিত্য কথাটা নিয়ে। সাহিত্য লিখব না কি সন্দর্ভ, সাহিত্য শব্দটা বড্ড বেশি ফর্মাল, আনুষ্ঠানিক, প্রাতিষ্ঠানিক, গুরুগম্ভীর। এখন তো ‘এক্রিচার’-এর যুগ, টেক্সট বা বয়ান লেখা ভালো। সময়ের বয়ান হতেই পারত, সঙ্গে বয়ানের সময়। তারপর ভাবতে শুরু করলাম, চোখের সামনে সময়’ এর মতো উদাসীন, নিরপেক্ষ, দার্শনিক শব্দটিও কেমন যেন পানসে, জলো হয়ে গেছে। সময় থেকে নির্যাস শুষে নিয়েছে তথ্যের, পণ্যের সম্মোহন ছড়ানো গণমাধ্যম। একেবারে সন্ত্রাসবাদীর কায়দায় ব্যক্তির দখল থেকে সময় ছিনিয়ে নিয়েছে কে বা কারা। ই-মেল ইন্টারনেট সাইবার কাফে ই-কমার্স ইত্যাদি শব্দাবলী সামুদ্রিক তুফানের মতো আছড়ে পড়ছে আমাদের ওপর। ডট কমের তুমুল সন্ত্রাসে ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে গেছে ব্যক্তি-সমাজ-ঐতিহ্য-সম্পর্ক ইত্যাদির বোধ। প্রবল পরিহাসের মতো এল বলে সাহিত্য। কিছুদিন পরেই হয়তো এরকম নিবন্ধ-প্রয়াসের কোনো প্রয়োজন থাকবে না।

 ভাবতে ভাবতে মনে এল জীবনানন্দের বেলা-অবেলা-কালবেলার কিছু কিছু বাচন। হ্যা, সময়ের ভব্যসব্য আশালতা শুকিয়ে যাচ্ছে যখন, কালবেলা ছাড়া কী বা বলা যায় একে। গত কয়েক বছরে দেখলাম, কী অসামান্য দ্রুততায় ও দক্ষতায় শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত-অশিক্ষিতদের তফাত মুছে দেওয়া হল। চ্যানেলে চ্যানেলে নির্বোধ সিরিয়্যালের দাপটে সামাজিক বিনিময়ের সমস্ত সেতু একে একে ভেঙে পড়ল। বই। পড়া নামক অভ্যাস হয়ে দাঁড়াল আদিখ্যেতা। একেকবার একেকটা জোর এল মেগা-সিরিয়ালের; তখন সেই কানু ছাড়া গীত নেই আর। স্টার টি.ভিতে যেমন কৌন বনেগা ক্রোরপতি। উপগ্রহ-প্রযুক্তির উপর একাধিপত্যের সুযোগে বিশ্বপুঁজিবাদের মোড়লেরা ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতিগর্বী বাঙালিদের পর্যন্ত দোঁ-আশলা, তে-আঁশলা জীবে পরিণত করছে। নিকৃষ্ট সামন্তবাদী অপচেতনা ও নির্বিচার ভোগবাদী প্রতীকের ককটেল ইতিমধ্যে বাঙালির ভুবনকে অনেকখানি কলুষিত করে দিয়েছে। হাঁসজারু ও বকচ্ছপদের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের স্বাতন্ত্রের অভিজ্ঞানগুলি। সবচেয়ে মারাত্মক কথা, আমাদের শিশু ও কিশোরেরা হয়ে উঠছে দম-দেওয়া পুতুল, পরগাছা ও উৎকেন্দ্রিক। সাহিত্যের সমস্ত পরিচিত আড্ডায় এবং গত কয়েক বছরে বইমেলাগুলিতে ছোট পত্রিকার সমাবেশগুলির দিকে তাকালেই খালি চোখে ধরা পড়বে, আনুপাতিক হারে মধ্যবয়স্কদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এর পরে রয়েছে যারা এখন আর তত তরুণ নয়। সদ্য কৈশোর-উত্তীর্ণ টগবগে ছেলেমেয়েদের সংখ্যা সবচেয়ে কম। অথচ ঠিক উল্টো ছবিটা দেখার কথা ছিল। সব মিলিয়ে ভয়াবহ এক বাস্তব বিস্তীর্ণ চোরাবালির মতো অপেক্ষমান।

 কেন এমন হল? তথ্য ও বিনোদনের মাদক আমাদের দৈনন্দিনকে আচ্ছন্ন করছে। যখন, সাফল্য-শিকারীরা ভোগবাদী সমাজের মাপে নিজেদের খোলনলচে পাল্টে ফেলছে। প্রতিটি ঘরে ঘরে চলছে আত্মপ্রতারণা ও আত্মসম্মোহনের নির্বিবেক প্রক্রিয়া। সর্বব্যাপ্ত সম্মোহনকে বাস্তব বলে ধরে নিচ্ছে প্রায় প্রত্যেকেই। কালবেলার উপযোগী এই মোহিনী আড়াল। পণ্যায়নের প্রভাব ষাটের দশক থেকেই সাহিত্যে ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। প্রাতিষ্ঠানিক পণ্য সাহিত্যের পুরোহিতেরা মার্কিনী কায়দায় যৌনতা ও হিংসার অনান্দনিক মিশ্রণ ঘটিয়ে ‘বেস্ট সেলার’ উৎপাদনে সচেষ্ট ছিলেন। পরে ক্রমশ তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপবিশ্বাস, মৌলবাদী প্রবণতা, অলৌকিকতা ইত্যাদি। একদিকে উন্নত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উপযোগী মানসিকতা আমদানি করে অন্যদিকে চরম রক্ষণশীল প্রবণতাকে প্রশ্রয় দিয়ে বিচিত্র পাঁচন তৈরি হচ্ছিল। নব্বই-এর দশক থেকে উন্নত প্রযুক্তির উপযোগী আধুনিকোত্তরবাদের ছায়া এসে যুক্ত হল। ফলে আমাদের সাহিত্যের বিজ্ঞাপনধন্য জনপ্রিয় ধারাটি স্তরে স্তরে সাহিত্যের নামে ভ্রমকথারই তাণ্ডব চালিয়ে গেছে। পাশাপাশি অবশ্য ছোট পত্রিকায় সাহিত্যের বিকল্প ধরন ও বিকল্প চেতনা সন্ধানের প্রক্রিয়াও অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু অতি সাম্প্রতিক পর্যায়ে যে অভূতপূর্ব সর্বাত্মক আক্রমণ সাংস্কৃতিক নয়া উপনিবেশবাদীরা শুরু করেছে, অভিঘাতের ব্যাপকতায় তার সঙ্গে কিছুই তুলনীয় নয়।

 এর আগেও মানুষের ইতিহাসে বহু দুর্যোগ এসেছে, মননে ও সাহিত্যে নানা ধরনের অনন্বয় তৈরি হয়েছে। অন্তর্বস্তু ও প্রকরণের মধ্যে উপযুক্ত রদবদল ঘটিয়ে মানুষকে দুর্যোগ বরং ঋদ্ধ করেছে আরো। কিন্তু অতি সম্প্রতি মানুষ যেভাবে নিজেরই তৈরি যন্ত্র-প্রযুক্তির কাছে দাসখৎ লিখে দিয়ে নিজেকে নিজেই অবান্তর করে তুলছে—এরকম আগে কখনো দেখা যায়নি। মানুষ এখন আত্মহননের মাদকে মশগুল। দুরন্ত গতি ও উদ্বৃত্ত সম্পদ সঞ্চয়ের নেশায়, সম্পদ থেকে আরো সম্পদ তৈরির অন্ধ প্রতিযোগিতায় স্বয়ং সময় অলীক হয়ে পড়ছে। এখন কোথাও কোনো পৌবাপর্য নেই, প্রেক্ষিত নেই, প্রাসঙ্গিকতাও নেই। অর্জনীয় কোনো সত্য নেই, আছে কেবল নিত্য নতুন সত্য-ভ্রম উৎপাদনের প্রতিযোগিতা। সাম্প্রতিক এই পর্যায়কে বলা হচ্ছে self ignition, self seduction এর পর্যায়।

 তৃতীয় সহস্রাব্দের সূচনাপর্বে এতদিনকার অর্জন-ব্যর্থতা-সম্ভাবনাকে নিশ্চয় যুক্তিনিষ্ঠভাবে বুঝে নেওয়া দরকার। কিন্তু সমস্যা এখানেই যে আমাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনের ভেতরে এবং চিন্তা-অনুভূতি-উপলব্ধির মধ্যেও রয়েছে অজস্র কূটাভাস, শূন্যায়তন ও গোলকধাঁধা। এইজন্যে সন্দর্ভ তৈরি করতে-না-করতে আমরা মাঝপথে সেসব ভেঙে দিচ্ছি। আসলে ভেঙে যাচ্ছি নিজেরাই। প্রত্যয় নিয়ে কোনো কিছুকেই চূড়ান্ত বলে তর্কের খাতিরেও মেনে নিতে পারছি না। সব ধরনের ভাবাদর্শ, স্বপ্ন, বিশ্বাস, কিংবা নির্মাণ-আকাঙ্ক্ষাকে মহাসন্দর্ভ বলে প্রত্যাখ্যান করাই রেওয়াজ এখন। ‘সকলেই আড় চোখে সকলকে দেখে। তাহলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব আজ? ইতিহাসের দিকে তাকাতে পারছি না কেননা ইতিহাস মানে পিঞ্জর, ইতিহাস মানে আধিপত্যবাদের চতুর নির্মিতি। চরম বিমানবায়নের এই পর্যায়ে জৈবপ্রযুক্তি ও জৈবরসায়ন বিদ্যা মানুষের বহু সহস্রাব্দব্যাপী ধারাবাহিকতাকে ভেঙে চৌচির করে দিচ্ছে। বিশ্বায়নের নামে সমস্ত বৈশিষ্ট্য নিঃশেষে মুছে দিচ্ছে অপ্রতিরোধ্য তথ্যবিননাদনের নয়া উপনিবেশবাদ। এসময় দার্শনিকেরা ভাবছেন অস্তিত্বের প্রত্নতত্ত্ব বা জ্ঞানের প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে। পরিণামে লেলিহ জিহ্বা দিয়ে আত্মসম্মোহন আমাদের ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমানকে চেটে পুটে খাচ্ছে। সব কিছুই যখন ‘ভবিষ্যৎ অতীত’, আমাদের সাহিত্যবোধ বা নন্দনচিন্তা দাড়াবে কোন্ ভিত্তির ওপরে?

 সর্বত্রব্যাপ্ত বিভ্রমের এই কালবেলায় পুরনো ধাঁচের বয়ান কোথাও তো প্রাসঙ্গিক থাকছে না। সমস্তই আপেক্ষিক এবং সাময়িক যখন, ভিত্তি কিংবা অন্বিষ্ট অবান্তর হতে বাধ্য। গত চার-পাঁচ বছরে চোখের সামনে জীবনবোধ হয়ে উঠল রঙিন মরীচিকা। ফলে আখ্যান থেকে ঝরে গেল ঋজুতা ও সত্যের নিষ্কর্ষ; কবিতার বাচন থেকে চিহ্নায়কের দ্যুতি। এটা ঠিক, উপন্যাসে ছোটগল্পে নানাধরনের অভিনবত্ব দেখা যাচ্ছে ইদানীং। কিন্তু মানুষের দুরূহ সংকটের ছবি কি স্পষ্ট হচ্ছে? যে-মানুষটি পাঠাভ্যাস হারিয়ে ফেলছে দ্রুত এবং যার দৈনন্দিনকে শাসন করছে মেকি চিহ্নের সন্ত্রাস—তার কাছে নেতি ও নৈরাজ্যের উদ্ভট প্রতিসন্দর্ভ যোগান দেওয়াই কি সাহিত্যের কাজ? কবিতার হাল-হকিকৎ এই বিভ্রমের পরিসরে সবচেয়ে বেশি কূটাভাসময়। বিকারের ঔদ্ধত্য ও অবিশ্বাসের অহংকার শব্দাবলী থেকে শুষে নিচ্ছে অনুভূতির বর্ণমালা; অভ্যাসের খোলস দিয়ে চালাকির প্রদর্শনী অব্যাহত রাখতে পারলেই হল। অনুভূতি কি সত্য নয় আর? দর্পণে প্রতিবিম্ব নিয়ে খেলছে আজকের খেলনা-মানুষেরা। বিয়োগপর্বের চিন্তাগুরু জী বদ্রিলারকে তাই ভাবতে হয় বিভ্রমের প্রতিজগৎ নয়, ভ্রমকথার চতুর আবর্ত তৈরি করা নিয়ে। সত্য নয় শুধু, মিথ্যাও নির্বাসিত আজ বয়ান থেকে; তাই পাঠকৃতি মানে গোলকধাঁধার সিঁড়ি। বদ্রিলার লেখেন, ‘Today it is events which are neither true nor false and which play with their screens. You can no more isolate an event from its screen than in the past, you could isolate a passion from its mirror.’ (Cool memories: 1994: 65).

 হয়তো এতটুকু নয়; কিন্তু এর কাছাকাছি উচ্চারণ রয়েছে রণজিৎ দাসের কবিতায় (ডায়েরি থেকে ২)) ‘সত্য কী, আমরা জানি না। অথচ মিথ্যাকে জানি, নির্ভুল, নিজের ছায়ার মততা। এই সত্যসন্দিগ্ধ চির জীবনে, মিথ্যাই শেষ পর্যন্ত আমাদের একমাত্র নিঃসংশয় উপলব্ধি, সেই অর্থে আমাদের একমাত্র বিশ্বস্ত সত্য। আমাদের আশ্রয়।...খুব সম্ভবত, আমরা মাতৃগর্ভ থেকেই মিথ্যাকে জানি। জিন-এর গৃঢ়তম সন্ধ্যাভাষায় হয়তো ইঙ্গিতবদ্ধ আছে মিথ্যার সংজ্ঞা এবং ব্যবহারবিধি। এই বয়ানে কবি সময়ক্লিষ্ট প্রতিবিম্বের মুখোমুখি যেন। শূন্যতার আনাচে কানাচে কাকতাড়ুয়ার মতো দৃশ্যমান যত বিলীয়মান মুহূর্তগুলি, সেইসব যতখানি ভ্রম ততখানি বাস্তব। ভাষার সপ্রতিভতা সত্ত্বেও চোখে পড়ে প্রচ্ছন্ন হাহাকার। কালবেলায় এই তো অর্জন মান্ধ সভ্যতার। কবিতায় তাই বিষয় খুঁজতে হয় না এখন, ভাবতে হয় না প্রকরণ নিয়েও। আত্মতা ও নৈর্ব্যক্তিকতার পুরনো জলবিভাজনরেখাও অচল হয়ে গেছে। এসময় আলাদা করে কবিতা লিখতে হয় না, প্রতি মুহূর্তের অভিজ্ঞতাপুঞ্জ নিজেরাই কবিতায় বয়ান হয়ে ওঠে। ফলে সংসোজক সূত্রও খুঁজে নিতে হয় না। বিয়োগপর্বের সার্বিক অসংবদ্ধতা ও কেন্দ্রহীনতা নেতির বিন্যাসকেই বয়ান হিসেবে তৈরি করে নেয়। অর্থাৎ প্রতিবাচন লুকিয়ে থাকে বাচনেরই ভেতরে। যেমন রণজিতের ‘টেলি খুশি’ কবিতার প্রথম স্তবক: এক নতুন খুশি এসেছে আমাদের ঘরে। টেলিখুশি। টিভি-র পর্দা থেকে রকমারি পণ্যের চমকদার বিজ্ঞাপনগুলি ঘরময় ছড়িয়ে দিচ্ছে এই অদ্ভুত, রাংতা মোড়া খুশি। যাতে মেশানো আছে স্বপ্ন, মুখোশ, কোকেন, মোহর, ডাইনি এবং আলাদিন। তাই দেখে ঘরের মেয়ে পুরুষদের তো বটেই ঘরের বেড়ালটার পর্যন্ত হাসি হাসি মুখ। কারণ, মূলত নিরানন্দ মানুষের সংসারে, যে-কোনো খুশিই, খুশি।

 আধুনিকতাবাদের আরোহী পর্বে জীবনানন্দ লক্ষ করেছিলেন চিহ্নায়কের শৌর্য ও আমোদ; আর, অবরোহী পর্বের সূচনায় তাঁর কবিতায় ব্যক্ত হয়েছিল কার্নিভালের হাসি ও তিক্ত শ্লেষ। আধুনিকতাবাদের প্রচ্ছায়া যখন বাংলা কবিতায় পড়তে শুরু করেছে, অন্তর্দাহ ও স্বগতোক্তি সাবলীল মিশে যাচ্ছে পরিহাস ও কোলাহলে। ভাড়, জ্যোতিষী এবং জহ্লাদ দাঁড়িয়ে যাচ্ছে একই পঙক্তিতে। ভ্রমকথারই এ এক বিশিষ্ট ধরন। সময়ের বাচন যতক্ষণ কবিদের কাছে ধরা দেয়, প্রতিবাচনের অন্তর্বয়নও মানিয়ে যায়। যেমন জয় গোস্বামী লেখেন “হাসিগুলি, হাহাকারগুলির’ (হাসি, হাসিগুলি, হাসিদের) সমান্তরাল অস্তিত্বের কথা। ক্রমশ বদলে যায় সময়ের অনুভব আর সেই সঙ্গে ‘বারোভাতারী মৃত্তিকার পরিসরকে প্রতিস্পর্ধা জানিয়ে কল্পনাপ্রতিভা হয়ে ওঠে যুগপৎ সুড়ঙ্গসন্ধানী ও মহাকাশচারী। বাস্তব অনায়াসে মিশে যায় প্রকল্পনায়; প্রাগুক্ত আত্মজ্বলন (Self-ignition) ও আত্মসম্মোহন (Self-Seduction) এর উপযোগী পরাবিবরণ প্রতিবেদনে দখলদারি বিস্তার করে, ভাষার চলনও আমূল বদলে যায়:

‘আমরা পান করি, আমরা প্রাণ করি মৃত্যুকে মৃত্যুকে? মৃত্যুকে?
আমরা নিঃশ্বাস ধরেছি, নিঃশ্বাস সৌরবল
আমরা নিঃশ্বাস, আমরা নিঃশ্বাস সীমিত হোম
আমরা আইবুড়ো চাকুরে দিদি তার যুবতী বোন
আমরা ঘরে ঘরে পঙ্গু বাপ আর অন্ধ ভাই
আমরা যা-ই বলি ব্রহ্ম তা-ই কাল ব্রহ্ম তাই বাল ব্রহ্ম তা-ই,
আমরা নিজেদের জায়গা চাই।’

 উৎকেন্দ্রিক ও নিরবয়ব সময়ের মধ্যে আজকের কবি-সত্তা দেখতে পায় শুধু খোলা মরণ ফাঁদ’ এবং লক্ষ করে কীভাবে মানুষ স্বয়ং মোড়ে-মোড়ে মরণফাঁদ হয়ে উঠেছে। এসময় শবোথানের; প্রতিসংস্কৃতি ও প্রতিজীবনের জারজ সন্তানেরা সব চর্যচোষ্য সত্য মিথ্যা নির্বিচারে গিলে খাচ্ছে। কিন্তু সর্বব্যাপ্ত মোহিনী আড়াল অনতিক্রম্য বলে সময়ের কৃষ্ণবিবর কারো চোখেই পড়ছে না ‘বিশ্বতানে মোহিছে চুম্বক’। প্রত্যেকের পায়ের তলায় মাটি সরে যাচ্ছে, মাটির তলায় লোহা ফুটছে। অর্থাৎ বাস্তবই প্রকল্পনা হয়ে উঠছে এখন। সমস্ত আবেগ-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা-স্বপ্ন প্রবল ভস্মের মুখে লুটিয়ে পড়ে যখন, প্রতিবাদহীন দিক-ভ্রান্ত মানুষ ওই ভস্মের নিচে লুকোতে যায় আর আমরা সবাই দুই হাতে ভয় ভস্ম খাই।’ (ভুতুম ভগবান)

 কেন সময়ের এই কথকতা তৈরি হচ্ছে আজ? কারণ, বিলুপ্তির আশঙ্কায় ভেতরে ভেতরে ত্রস্ত স্বয়ং কবিতা। সামাজিক মনস্তত্ত্ব জন্ম নেয় বিশেষ আর্থ-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে। এই সূত্রে বদলে যায় সাহিত্যের অন্তর্বস্তু ও আঙ্গিক, মূল্যবোধ ও অন্বিষ্ট। বাংলা সাহিত্যের পূর্ববর্তী সমস্ত যুগে যা ঘটেছে, এখনো একই প্রক্রিয়ার অভিব্যক্তি দেখছি। তবে কথাটা এইখানে যে এখন মানুষের মৌল পরিসরই আক্রান্ত। তাই ভাষা-চেতনা, সাহিত্য-বোধ সব কিছুই বিপন্ন। আমাদের চোখের সামনেই তো নিঃশব্দে ঝরে যাচ্ছে শৈশব ও কৈশোরের সারল্য, লাবণ্য ও নিবিড়তা। সহজ পাঠের সহজ আনন্দ এখন নির্মমভাবে নির্বাসিত। বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমের অন্ধ প্রতিযোগিতায়, উৎপাদিত চিহ্নের সন্ত্রাসে আর ভোগ্যপণ্যের মাদকতায় কালো হয়ে গেছে আমাদের আকাশ। শিক্ষা-ব্যবস্থায় কেবল প্রকরণ রূপান্তরিত হয়নি, নির্যাসও অন্তর্হিত। আমাদের সংস্কৃতির শেকড় উপড়ে ফেলছে বিশ্বপুঁজিবাদ। আর, সেই শূন্যস্থান পূর্ণ করার জন্যে দ্রুত ধেয়ে আসছে প্রযুক্তি-সেবিত সামন্তবাদের অন্ধকার। রাষ্ট্রীয় প্রতাপের আনুকূল্যে আসমুদ্র হিমাচল এক ছাঁচে ঢালাই হয়ে যাচ্ছে। বাঙালি কবি-লিখিয়েরা জারজ-সংস্কৃতির প্রশ্রয়দাতা রাজনীতির কৃষ্ণবিবরকে শনাক্ত করতে পারছেন না। এই পরিস্থিতিতেই তীব্র আত্মবিদারক শ্লেষে জয় লেখেন, আমরা সব বুদু সব ভূতুম ভগবান। এই সময়ের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে সত্য, মিথ্যা, সন্দর্ভ, প্রতিসন্দর্ভ, প্রতিবেদন, ভ্রমকথা, বিশ্বাস, অবিশ্বাস—সব কিছু একাকার হয়ে যাওয়া আর সব কিছু সহনীয় হয়ে যাওয়া। কিছুদিন আগেও কবি-লিখিয়েরা প্রতিবাদ করতেন, প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেন কেননা কোনো-না-কোনো ভাবে দায়বোধ পীড়িত করত তাদের। কিন্তু এখন নির্লিপ্ততা ও উদ্বেগহীনতা নৈরাজ্যকেই দার্শনিক সমর্থন দিয়ে যায়। এমন কী কিছু কিছু ক্ষেত্রে অন্ধতা এত সর্বগ্রাসী যে পৌরসমাজ আর রাজনৈতিক সমাজের পশ্চাৎগতিও তাদের কোথাও সংলগ্ন করে তোলে না। বরং আধিপত্যবাদীদের চতুর কৃৎকৌশল সম্পর্কে উদাসীন থেকে তারা অনায়াসে প্রতিগতির শিবিরে যোগ দিতে পারেন। এখনকার বয়ানে তাই আত্মপ্রতারক মোহিনী আড়াল অতি সহজেই বিমানবায়ন প্রক্রিয়ার পালে হাওয়া দিচ্ছে।

 আমরা কি লক্ষ করেছি প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যের বিজ্ঞাপনে কত সাবলীল ভাবে মান্যতার নতুন সংজ্ঞা তৈরি হচ্ছে? বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমে রুচিবিকৃতির উন্মত্ত প্রদর্শনী থেকে সাহস সঞ্চয় করে প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যপত্রগুলিও নিজেদের বিজ্ঞাপনের ভাষা পাল্টে দিচ্ছে। স্বভাবত বিজ্ঞাপনী মনস্তত্ত্ব অবধারিত ভাবে এসে পড়ছে সাহিত্যের বয়ানেও। কোনো কিছুতেই কারো এসে যায় না যেন। আসলে রুচিবিকার আধুনিকোত্তর এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার অভিজ্ঞান। তাই কিছুদিন আগে হাবেরমাস যে বৈধতাজনিত সংকটের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দিক নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন, ইদানীং সেসব কেমন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। মান্যতা পেয়ে যাচ্ছে সব কিছু কেননা আমাদের মন এখন জগদ্দল পাথর। সেই পাথরে শ্যাওলা জমতে পারে মাত্র, কোনো রেখার আঁচড় পড়ে। এই আরোপিত মান্যতার ভেতরে বিপুল নিরবয়ব ধূসর শূন্যতা তবু চোখে পড়ে যায় কোনো কোনো কবির। জয় গোস্বামী তাই লেখেন:

 ‘আগুন নিবতে ছাই নেই আর পাথুরে দেওয়াল নেই শুধু দুই দিকে ছড়ানো শূন্য, শুধু দশদিকে ছড়ানো বিরাট একটা কালো দশ দিক, মাঝে মাঝে বিন্দুরা টুপটুপ করে জ্বলছে’ (নর্তক)।

 এ হল নিরালম্ব সময়ের বার্তা যখনকার দস্তুর হল: ‘To lose the original, but find its double, to lose face, but recover one's image, to lose innocence, but recover one's shadow.’ (জাঁ বদ্রিলার: প্রাগুক্ত: ৬৪)

 আজ উপন্যাসকে গিলে খাচ্ছে পপসাহিত্যের আন্তর্জাতিক দানব এবং মেগা-সিরিয়ালের ঝকঝকে ভিস্যুয়াল। ছোটগল্পকে শুষে নিচ্ছে বিনোদনের রগরগে কেচ্ছা আর বিজ্ঞাপনের মায়াবী নাট্য-মুহূর্তের বিন্যাস। শিশুসাহিত্যের সজীব ও সংবেদনশীল বয়ান কার্টুন নেটওয়ার্ক-এর যান্ত্রিকতায় মুছে যেতে বসেছে আজ। ছেলেবেলায় যে-সমস্ত গল্প গাথা, লোকায়ত ঐতিহ্যের মণিমুক্তো, কল্পনার সহজ সৌন্দর্য সাংস্কৃতিক সত্তাকে কুসুমিত করত; আজকের প্রজন্মে তাদের অনুপস্থিতি খুব বেশি প্রকট। শৈশব ও কৈশোরে যাদের মন ফুলের মতো তাজা ও নিষ্কলুষ থাকে, অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের মধ্যে বিকারের সংক্রমণ ঘটিয়ে দেওয়া হচ্ছে যৌনতা ও সন্ত্রাসের অন্তর্ঘাত দিয়ে। সাহিত্যের উৎসুক গ্রহীতা হওয়ার যে-প্রক্রিয়া এতদিন শিশুকালেই শুরু হয়েছে, ইদানীং তা ধ্বস্ত হয়ে যাচ্ছে আরম্ভ হওয়ার আগেই। সর্বগ্রাসী ভোগ্যপণ্যের মাদকে এবং অন্ধ প্রতিযোগিতার মোহে যে-সব আধ্যাত্মিক মানুষের কাঠামো তৈরি হচ্ছে, তাদের ভয়াবহ বৃত্তবন্দি অবস্থানে সাহিত্য ও শিল্পের কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। কিছুদিন আগেও বিজ্ঞানভিত্তিক উপন্যাসের প্রজাতি কল্পবিজ্ঞানের ক্রমোৎকর্ষকে প্রতিষ্ঠিত করছিল। কিন্তু অতি সাম্প্রতিক কালে AXN নামক টিভি চ্যানেল যেভাবে কল্পবিজ্ঞানকে বিকৃত করছে এবং উৎকট করছে বিমানবায়ন প্রক্রিয়াকে কম্পুটার প্রযুক্তির সাহায্যে জান্তবতা-হিংস্রতা-অলৌকিকতার ককটেলে রূপান্তরিত করেছে, তা সরাসরি আমাদের সূক্ষ্ম সংবেদনা, মানবিক ইতিহাস ও কল্পনার পরিসরকে চূড়ান্তভাবে মুছে ফেলছে। সূক্ষ্মতা, কল্পনা ও মানবিকতার উপর এমন বীভৎস আক্রমণ আগে কখনো দেখা যায়নি।

 সব মিলিয়ে, এ কোন্ পৃথিবীর ছবি যেখানে প্রতিবাস্তব ও প্রতিসন্দর্ভের মায়া আমাদের এতদিনকার সমস্ত নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক উপার্জনকে নিরালম্ব করে দিচ্ছে? আধুনিকতাবাদ মানুষকে যদিও নিঃসঙ্গ করেছিল, তবুও সেই নিঃসঙ্গ মানুষের নিজস্ব নির্জনতা লুপ্ত হয়ে যায় নি। কিন্তু যন্ত্র-প্রযুক্তি দ্বারা উৎপাদিত মাদকগ্রস্ত প্রতিজগতে আধুনিকোত্তরবাদ সেই নিঃসঙ্গতা আর নির্জনতার অবকাশও রাখেনি কোথাও। কর্কশ কোলাহলের স্থূল সন্ত্রাসে অবয়বহীন ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে সব সূক্ষ্মতা, সব স্বপ্ন, সব কল্পনা। একুশ শতক বা তৃতীয় সহস্রাব্দের নামে তৃতীয় বিশ্বের যেসব আত্মবিস্মৃত মানুষজনেরা গন্তব্যহীন স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা টেরও পাচ্ছেন না কীভাবে তাদের শিথিল মুঠো থেকে বালির মতো ঝুরঝুর করে পড়ে যাচ্ছে যাবতীয় সংকল্প ও উদ্যম, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা, সৃষ্টি ও নন্দন। প্রথম দুনিয়ার বহু হাত-ফেরতা সিকি আধুলি নিয়ে কেউ কেউ মশগুল হয়ে পড়ছেন। নিজেদের যথাপ্রাপ্ত পরিসর ও পরম্পরার সঙ্গে নিঃসম্পর্কিত বিষয় ও প্রকরণ নিয়ে উপন্যাস-ছছাটগল্প-কবিতার প্রতিবেদন তৈরি করতে চাইছেন। ফলে তাদের রচনা-প্রয়াস হয়ে উঠছে কৃষ্ণবিবরের দৃষ্টান্ত, যা বারবার, এমনকী তারা নিজেরাও পুনরাবৃত্ত করতে পারছেন না।

 তাছাড়া আরো একটি মৌলিক প্রশ্নও উঠে আসছে এখন। আধুনিকতাবাদ লোকসংস্কৃতি ও লোকায়ত জীবনচর্যাকে উপেক্ষা করতে শিখিয়েছিল, ছড়িয়েছিল পরিশীলিত নাগরিকতার মোহ। আধুনিকোত্তরবাদ সেই মোহকে প্রযুক্তি-সন্ত্রাসের সাহায্যে সময়-নিরপেক্ষ, পরিসর-নিরপেক্ষ অধিবাস্তবের গোলকধাঁধায় পাকাপোক্ত ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। স্পন্দমান জীবনের কথকতা নয় আর, ঈপ্সিত এখন সেই সর্বাত্মক ভোগবাদ যার প্রভাবে দিন-রাত্রি চেতনা-অবচেতনা-ভূত-ভবিষ্যৎ একাকার হয়ে যায়। আরো একটি ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়াও বিষাক্ত ছত্রাকের মতো ছড়িয়ে গেছে। সর্বত্র। গণমাধ্যমের বলয় বিশ্বায়িত হওয়ার ফলে লোকসংস্কৃতির উৎসভূমি খরার দাবদাহে পোড়া জমিতে রূপান্তরিত হচ্ছে দ্রুত।

 আজ যাঁরা সাহসী মুঠোয় ছোট পত্রিকার পতাকা ধরে রাখতে চাইবেন, তাদের লড়াই অনেক বেশি কঠিন। কেননা তারা বাস করছেন জা বদ্রিলার কথিত ‘Hyperreal' জগতে। যেখানে ‘The model comes first and its constitutive role is invisible because all one sees are instuntiations of models’ (1991: 83)। বিশ্বপুঁজিবাদের কুটিল ছায়ায় আবিল ভারতবর্ষীয় সমাজ ওই অধিবাস্তবের দ্বারা আক্রান্ত। তাই আমাদের চিন্তার ধরন পর্যন্ত বদলে যাচ্ছে। আমরা টের পাচ্ছি না, কখন কীভাবে নিঃশব্দ পদচারণায় বিদূষণ আমাদের বোধ-বুদ্ধিকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দিচ্ছে। মোহিনী আড়াল ভেদ করার দ্রষ্টাচক্ষু আমরা হারিয়ে ফেলেছি, ভ্রমকথাকেও বরণ করে নিচ্ছি প্রাগুক্ত ‘মডেল’ বা নিয়ন্তা আকল্প হিসেবে। এই আকল্পের সাংস্কৃতিক রাজনীতি অর্থাৎ আধিপত্যবাদের কূটকৌশল সুস্মিতা সেন, ঐশ্বর্য রাই, লারা দত্তদের একাদিক্রমে বিশ্বসুন্দরী হিসেবে ঘোষণা করার মধ্যে ব্যক্ত হয়। কারণ সর্বাত্মক মুক্তিকামী নারীচেতনাকে পথভ্রষ্ট করার জন্যে এবং পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে দৃঢ় প্রোথিত করার জন্যে তৃতীয় বিশ্বের অধিবাসীদের উপর নতুন বিউটি মিথ চাপিয়ে দেওয়া আবশ্যিক। একটু আগে যাকে বিষাক্ত ছত্রাক বলেছি, তার বিপুল সংক্রমণ বুঝতে পারি যখন আসামের বরাক উপত্যকার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও অনুষ্ঠিত হয় সুন্দরী প্রতিযোগিতা। সমানুপাতিক হারে হুহু করে বেড়ে যায় বিলিতি মদের কেনাবেচা ও যৌন সন্ত্রাস।

 ওই একই আকল্পের সূত্রে তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে চরম আদিখ্যেতা করা হয়। সবই পণ্যায়নের স্বার্থে। সাহিত্যের নতুন বিধি-বিন্যাস তৈরি হতে থাকে তারই অদৃশ্য প্রেরণায়। নইলে অরুন্ধতী রায় থেকে ঝুম্পা লাহিড়ী রাতারাতি বেস্ট সেলার হয়ে যেতেন না। এ এক বিচিত্র পরিস্থিতি। একদিকে কম্পিউটার প্রযুক্তির মায়ায় ভিস্যুয়ালের সন্ত্রাস ব্রহ্মাণ্ডগ্রাসী এবং পাঠাভ্যাস ভ্রান্ত পথে মরীচিকা-প্রত্যাশী, অন্যদিকে সাহিত্যসংবিদ ঢাকী সুদ্ধ বিসর্জনে যাওয়ার পক্ষে। মাঝখানে ত্রিশঙ্কুর মতো দোদুল্যমান আমাদের বিদ্যা-বুদ্ধি-যুক্তি-সংস্কার-বিবেক। অধিবাস্তব জগতে আরম্ভ নেই, বিকশিত হওয়া বা করাও নেই। এই অধিবাস্তবতায় ‘more and more areas of social life are reproductions of models organized into a system of models and codes' (তদেব)। আসলে তো চিহ্নায়কও নেই, সামাজিকতাও নেই এখন। আছে কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন মুহূর্তের অবভাস। বদ্রিলার স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ‘Today it is quotidian reality in its entirety-political, social, historical and economic that from now on incorporates the simulatory dimension of hyperrealism' (Simulations: 147).

 এই কালবেলায় প্রতিদিনকার জীবন যখন ক্রমশ বেশি করে অধিবাস্তব হয়ে উঠেছে, সাহিত্যের সমস্ত প্রতিবেদনকেই তৈরি হতে হচ্ছে যুদ্ধের জন্যে। আক্ষরিক এবং রূপক দুই অর্থেই জীবন মূলত যুদ্ধক্ষেত্র। পাঠকৃতিও তাই। কোনো-এক মুহূর্তের চিহ্নায়কের আগ্রাসনে পূর্ববর্তী মুহূর্তের চিহ্নায়ক লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে যেমন, তেমনি সেও তো আগামী সমস্ত অস্থির চিহ্নায়কের পক্ষে ভবিষ্যৎ অতীত মাত্র। চূড়ান্ত অস্থির ও অনিশ্চিত এই পরিসরে সত্যভ্রম ও প্রতিবাচনের কাছে কি হার মানবেন ছোট পত্রিকার যোদ্ধারা? সমস্ত পুরনো আকল্প নস্যাৎ করে কালবেলা যদি ভ্রমকথার বুদ্বুদমালা উপস্থাপিত করে, তাও তো এক আকল্পই। সমস্ত ধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও সাহিত্যকে দাঁড়াতে দেখি জটিল জিজ্ঞাসায়, আত্মমন্থনে। সবাই নিশ্চয় চলতি হাওয়ার পন্থী হয়ে স্রোতে গা ভাসিয়ে দেন না। হয়তো বা কেউ কেউ আবার আবর্তই তৈরি করেন কেবল আর নিজেদের অগোচরে নব্য স্থিতাবস্থার সমর্থক হয়ে ওঠেন। তবু লিখন-প্রক্রিয়ার বিনির্মাণ অব্যাহত থাকে। সাফল্য বা ব্যর্থতার প্রশ্ন বড়ো নয়। রবিশঙ্কর বল, মধুময় পাল, স্বপন সেন যখন তাদের বয়ানে প্রতিসন্দর্ভকেও গ্রথিত করেন এবং অন্তর্বস্তু ও প্রকরণে সময় ও পরিসরের ভেতরকার শূন্যায়তনগুলি খনন করেন—তাতে কেবল আধুনিকতাবাদী অনন্বয়ের বিন্যাস থাকে না। তেমনি মলয় রায়চৌধুরী, কমল চক্রবর্তী, উদয়ন ঘোষদের সন্দর্ভেও দেখি কৃষ্ণবিবরের নানা আয়তন। সব মিলিয়েই তৈরি হয় কালবেলার ভ্রমকথা।

 মোহিনী আড়াল মানুষের স্বাচিত নিয়তি: একথা লিখব না। বিভ্রমের সামাজিক ও ঐতিহাসিক উৎস শনাক্ত করাই কবি-লিখিয়েদের দায় এখন। আজকের বিজ্ঞাপন-সর্বস্ব দুনিয়ায় প্রতিটি বস্তুই আগ্রাসী পুঁজির Fetish হয়ে দাঁড়িয়েছে (তদেব: ১৫২)। ছলনাজালে সৃষ্টির পথ আরো আকীর্ণ এখন; তাই বলে কি ভ্রমকথার বৈধতা খুঁজবে সাহিত্য?

 চুল-দাঁত-নখ-চোখ-ঠোট-ত্বক এবং অবশ্যই শরীরী (নারী শরীরের) অনুষঙ্গ অধিবাস্তবের নানা বিভঙ্গ। আমাদের নিভৃত প্রেম, দাম্পত্য কিংবা মাতৃত্ব ও বন্ধুতা সমস্তই এসে দাঁড়িয়েছে বিশ্বজোড়া হাটের হট্টরোলের মাঝখানে। এইসবই এখন বাস্তবের চেয়েও বেশি বাস্তব। এই প্রেক্ষিতে তবু কবি-লিখিয়েদের ভাবতে হচ্ছে লেখার নতুন প্রকরণের কথা, জীবনের নতুন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও তাৎপর্যের কথা, সত্তার অস্তিত্বতাত্ত্বিক ও জ্ঞান-তাত্ত্বিক সন্ধানের কথা। কিন্তু কিছু দূর গিয়েই যেন চোরাবালিতে হারিয়ে যাচ্ছে সব। এখন যেন আকারহীন, চরিত্রহীন, বর্ণহীন, লক্ষ্যহীন স্রোতের তোড়ে মুছে যাচ্ছে সব। আলো এবং অন্ধকারের দ্বৈততা সম্পর্কেও যখন দ্বিধা দেখা দেয়, কী করবেন ছোট পত্রিকার আপসহীন যোদ্ধারা?

 যেভাবে যন্ত্রবদ্ধ জীবনে সংকেত, চিহ্ন ও প্রতিবিম্বের তোড়ে ভেসে যাচ্ছে সব কিছু, বাস্তবতা ও সম্ভাব্যতার সমস্ত আকল্পই অনিকেত হয়ে পড়ছে। ঘরে-ঘরে ঢুকে পড়ছে আজ লোভ-লালসা বিকৃত আকাঙ্ক্ষার মারীবীজ। অনতিসাম্প্রতিক কৌন বনেগা ক্রোড়পতির নির্লজ্জ জুয়াখেলা প্রচারমাধ্যমের দৌলতে অধিবাস্তবের নগ্ন আগ্রাসনকে অবারিত করে তুলেছে। এ তো আমাদের কালবেলারই অভিব্যক্তি যখন এদেশের যাবতীয় অসংহতি যাদুবলে মুছে দেয় রাঘববোয়াল রুপার্ট মাড়ুকের সাইবার মাদক। ছায়াছবির মায়জগতের সম্মোহক ব্যক্তিত্ব হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার চেয়েও ঢের বেশি দ্রুততায় ও দক্ষতায় নিয়ন্ত্রণ করে ভারতবাসীর মগজ ও সময়। বিনোদনের রাজনীতি বিভ্রান্ত দেশবাসীদের বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব কি এই ক্রান্তিকালের সাহিত্য-যোদ্ধারা এড়িয়ে যেতে পারেন? কে অস্বীকার করতে পারে যে ‘The cool universe of digitality has absorbed the world of metaphor and metonymy'!