সময় অসময় নিঃসময়/লিটল ম্যাগাজিন নামক শমীবৃক্ষ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

লিটল ম্যাগাজিন নামক শমীবৃক্ষ

 আমরা লক্ষ করছি, ছোট পত্রিকা সফল হলেই ছোট থাকছে না আর। এই তথ্য নিছক তথ্য নয়, হয়ে দাঁড়াচ্ছে বড়ো মাপের সমস্যা। লিটল ম্যাগাজিন গোত্রপরিচয় হারিয়ে পরিণত হচ্ছে মেগা-ম্যাগাজিনে। তখন তার চরিত্রেও আমূল রদবদল ঘটে যাচ্ছে। কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলেন, মেদবৃদ্ধি তো কায়ায় হয় না কেবল, মগজেও হয়ে থাকে। ঈষৎ রাবীন্দ্রিক ঢঙে বলা যেতে পারে, চিরপুরোনো চাদ, চিরদিবস এমনি থাকো, এই তো আমার সাধ।

 না, কথাটি মোটেই ঠাট্টা-তামাসার নয়। কলকাতায় প্রমা, অনুষ্টুপ, এক্ষণ, অমৃতলোক, বিভাব, হাওয়া ৪৯, এবং এই সময়, এবং মুশায়েরা ইত্যাদি কাগজের গোত্রপরিচয় মূলত অভিন্ন ছিল। কিন্তু বিবর্তনের পথে এরা আজ পরস্পর থেকে (এবং আসলে নিজের উৎস-স্বভাব থেকেও) কার্যত আলোকবর্ষ দূরত্বে চলে গেছে। কোনো-কোনো সম্পাদক প্রকাশ্যে লিটল ম্যাগাজিনের পারিভাষিক ও ইতিহাস-নির্ধারিত পরিচয় নস্যাৎ করে এর প্রেরণা ও সাংস্কৃতিক ভাবাদর্শকে অস্বীকার করছেন। কেননা সরকারি-বেসরকারি বিজ্ঞাপনের ঢালাও বদান্যতায় তাদের প্রাক্তন-লড়াই এখন তাদের নিজেদের পক্ষেই অস্বস্তিকর এবং বিস্মৃতিযোগ্য স্মৃতি। বরং পণ্যায়নের যাবতীয় যুক্তিশৃঙ্খলা মেনে নিয়ে পাদপ্রদীপের আলো ভাগ করে নেওয়ার জন্যে অশোভন ব্যগ্রতাই স্বাভাবিক। শ্লোগান এখন একটাই: যে-খেলার যে-নিয়ম!

 কী বলব একে! ছোট পত্রিকার গভীর গভীরতর সংকট, নাকি, মিডিয়া-শাসিত টাকা-মানুষদের মৌল ব্যাধি! কেন আজ ‘কার আগে প্রাণ কে করিবে দান তারি লাগি কাড়াকাড়ি’ এত প্রকট হয়ে পড়েছে? ছোট পত্রিকাকে সিড়ি আর মেগা-ম্যাগাজিনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আনন্দলোলাকে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্যে গোপন ও প্রকাশ্য মেধাবিক্রয়ের আয়োজন কিসের ইঙ্গিত? এ বিষয়ে আরও কথা বলার আগে সমস্যার অন্য এক দিকের প্রতি তর্জনি সংকেত করা যেতে পারে। প্রশ্নহীন আন্তরিকতা নিয়ে যথেষ্ট ক্লেশ সয়ে চেয়ে-চিন্তে নবীনতম কিছু লেখা একসঙ্গে ছাপিয়ে দেওয়াই কি শেষ কথা? তারুণ্যের স্পর্ধা, জগৎ-সংসারের প্রতি সরব তাচ্ছিল্য, দুজন বা তিনজন মিলে গোষ্ঠী তৈরি, বইমেলা এবং এজাতীয় সামূহিক উপস্থিতিতে উদ্ভট আচরণ করে নজর কাড়ার চেষ্টা: এসবের নীটফল কি লিটল ম্যাগাজিন এবং সাহিত্য আন্দোলন! কয়েকটি এলোমেলো কৃশকায় সংখ্যা প্রকাশ করতে করতে কোদল তুঙ্গে উঠে যায় অবধারিতভাবে এবং অকালমৃত্যু ঘটে সেই পত্রিকার। প্রতিবাদ বা বিদ্রোহ কিছুই তাতে ভালোভাবে দানা বেঁধে ওঠে না।

 কেন কাগজ করছি, এবিষয়ে স্পষ্ট ধারণা শুরুতে হয়তো অনেকের থাকে না। কিন্তু হাঁটুজলে দাপাদাপি করতে করতে একসময় ডুবজলে তো যেতেই হয়। এবং তখন, সাঁতার না জানলে একেবারে চলে না। বলা বাহুল্য, সাঁতারুকে সবচেয়ে আগে জল সম্পর্কে অবহিত হতে হয়। জলে চোরাস্রোত থাকে; তবু এসব মোকাবিলা না করে ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় না। লিটল ম্যাগাজিন যাদের কাছে কেবল ক্ষণিক খেয়ালের উন্মাদনা, তারা এত কথা ভাবেন না কখনো। তাই অন্তহীন মিছিলের মধ্যে ঢুকে যাওয়া ছাড়া এদের অন্য কোনো ভূমিকাও গড়ে ওঠে না। কিছুদিনের মধ্যে যদি স্পষ্ট না হয় ছোট পত্রিকার তাৎপর্য কী, তার অস্তিত্ব কোন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার ফসল এবং এতে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলি কেন চিহ্নায়কের বিন্যাস হিসেবে গ্রাহ্য, তাহলে ধীরে ধীরে অনিবার্যভাবে পণ্ডশ্রমের চোরাবালিতে তলিয়ে যেতে হবে। এইজন্যে লিটল ম্যাগাজিন নিছক ইতিহাসের উপকরণ মাত্র নয়, আসলে তা হল ইতিহাসের নির্মাতা। বারবার আমাদের প্রচলিত অভ্যাসে হস্তক্ষেপ করে এবং অনেক ক্ষেত্রে বেপরোয়া অন্তর্ঘাত করে, সাহিত্যের খাত থেকে পলি সরিয়ে দিয়ে তা তীব্র ও দ্যুতিময় নবীন জলধারাকে গতিময় করে তোলে। একই কারণে ছোট পত্রিকাকে বিশেষভাবে আত্মবিনির্মাণপন্থী না হলে চলে না। কেননা কখনো কখনো নিজেরই সত্নরচিত পদ্ধতি, প্রকরণ ও অস্তবস্তু প্রাতিষ্ঠানিক স্বভাব অর্জন করে নেয়; তখন নির্মোহভাবে নিজেকে আঘাত করে জটাজাল থেকে প্রাণের গঙ্গাকে মুক্ত করতে হয়। নইলে আত্ম-অনুকরণের অভ্যাসে সমস্ত পদ্ধতি, প্রকরণ ও অন্তর্বস্তু থেকে হারিয়ে যেতে পারে ঈঙ্গিত নির্যাস। যেতে পারে না, হারিয়ে যায়। চিরতরে।

 অতএব লিটল ম্যাগাজিনের প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য হল অপ্রাতিষ্ঠানিকতা। প্রচলিত সাহিত্যের তেল-চিকচিকেনধরকান্তি দেখে যাঁরা প্রলুব্ধ হয়ে স্রোতের অনুকূলে হাত-পা ছুঁড়তে শুরু করেন, ওই স্রোতের ফেনা হয়ে ভেসে যাওয়া ছাড়া তাদের আর কিছুই করণীয় থাকে না। সাহিত্যের রূপ-রীতি-স্থাপত্য-অলংকরণ-ভাষা-বাচন-ভিত্তি-আকরণ: সমস্তই যেন রূপকথার মায়াপুরী হয়ে আমাদের যাবতীয় জিজ্ঞাসা-বিশ্লেষণকে নিদালির ঘুমে আচ্ছন্ন করে দেয়। তাই সাধারণ চোখে ধরা পড়েনা,এই মায়া আধিপত্যবাদী বর্গের তৈরি। প্রতাপের বিচ্ছুরণে সমস্ত মূল্যবোধ পরিকল্পিত ও নির্মিত বলে আমরা সেই ভাষা শুনি, সেই গ্রন্থনা দেখি যা কিনা ওই বর্গের অনুমোদিত। প্রতাপ যাদের গিলে খায়, সেইসব অস্তেবাসী জনের কণ্ঠস্বর সাহিত্য নামক ঐকতানে চির অনুপস্থিত। সাহিত্যের মূল্যবোধ আসলে সমাজের উঁচুতলার স্বার্থ-উপযোগী ও স্বার্থ-অনুমোদিত মূল্যবোধ। তাই ওই মূল্যবোধকে তীক্ষ্ণ জিজ্ঞাসার তীরে বিদ্ধ না করে, ওই মূল্যবোধের আশ্রয় হিসেবে গড়ে-ওঠা ভাষা-আকরণ-সন্দর্ভকে আক্রমণ না করে কোনো নতুন সম্ভাবনার জন্ম হতে পারে না। যদি তার মানে হয় সাহিত্যকর্ম বলে প্রসিদ্ধ বৌদ্ধিক বটবৃক্ষটির মূল উৎপাটন, তাহলে সম্ভাবনার নতুন জমিতে ফসল ফলানোর তাগিদে তা-ই করতে হবে। বস্তুত করাও হচ্ছে। বাঙালির ভুবন জুড়ে প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের প্রতিসন্দর্ভকে মশালের মতো জ্বালিয়ে রাখছেন যাঁরা, তাদের মধ্যে আমরা দেখছি অপ্রাতিষ্ঠানিক নবীন চেতনার উৎসব। এই উৎসবে প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে আধিপত্যবাদী বর্গের প্রতাপ-পঞ্জীয়নের চতুর কৃৎকৌশল, লোকায়ত প্রাকৃত অনুভবের স্পন্দনে জেগে উঠছে এতদিনকার প্রান্তিকায়িত চেতনা-ভাষা-অভিজ্ঞতা। লিটল ম্যাগাজিন ধারণ করছে। এইসব প্রতিস্রোতের আকল্পকে।

 এইজন্যে যদি সাহিত্যসৌধের নোনা পলেস্তারা খসে পড়ে যায় তো যাক। তার বদলে জেগে উঠছে কিনা আটপৌরে কিন্তু সজীব প্রাণের স্ফুলিঙ্গরূপী ‘লেখা’ এবং চিহ্নায়ন সম্পৃক্ত নবীন লিখনপ্রণালী—লিটল ম্যাগাজিনের পাঠক হিসেবে একমাত্র তা-ই আমাদের বিবেচ্য। এই লেখার মধ্যে লেখক-সত্তার বদলে সূত্রধার-সত্তা যদি প্রবলতর হয়ে ওঠে, তাতে সাহিত্য-সংশ্লিষ্ট যাবতীয় ক্লান্তি-অবসাদ-নিরক্ত ধূসরতা থেকে সরে আসার পথ খুঁজে পাই। অন্তত যেসব পড়ুয়ার মানস-জীবনে কোনো বিবর্তন নেই অর্থাৎ যাদের শৈশব কাটে না কখননা, তাদের মনোরঞ্জনের দায় বইছে লেখা। এদের মুখে চুষিকাঠি ধরিয়ে দেওয়ার মহান ব্রত পালন করেন যেসব সাহিত্যিকেরা, তাদের দলে না ভিড়ে ওই লেখাপত্রের পতাকা শক্ত মুঠোয় ধরে রাখছেন লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকেরা। তারা মধ্যবিত্তের ফাপা, তরল, দায়িত্ববোধহীন দুঃখসুখের পাঁচালি ছেপে এত কষ্টে বের-করা পত্রিকার অমূল্য পাতাকে নষ্ট করবেন।, এটাই আজকের দিনের বড়ো ভরসা। নিসর্গের সরকার আশরাফ, লিরিকের এজাজ ইউসুফী, দ্রোণাচার্যের শিমূল আজাদ, অমৃতলোকের সমীরণ মজুমদার, উত্তরাধিকারের অমিত দাস, হাওয়া ৪৯-এর সমীর রায়চৌধুরী, কালিমাটির কাজল সেন, মধ্যবর্তীর বিশ্বরূপ দে সরকার, দ্যোতনার গৌতম গুহরায়, শরিকের বিশ্বজিৎ চৌধুরী, একবিংশের খোন্দকার আশরাফ হোসেন, কবিতীর্থের উৎপল ভট্টাচার্য আজ আর বিচ্ছিন্ন কটি নাম নন; এঁদের মতো আরও কয়েকজনের সমবায়ী উদ্যোগে গড়ে উঠেছে প্রতিভাবাদর্শের শানিত আয়ুধ। এর চেয়ে বেশি ইতিবাচক সংকেত আর কী হতে পারে। এসময় অনেকার্থদ্যোতনার, এসময় বহুস্বরসঙ্গতির। এই দায়িত্ব পালন করছে যুদ্ধরত লিটল ম্যাগাজিনেরা, বিজ্ঞাপনধন্য পণ্যসাহিত্যের সেবাদাসদের আধা-ঔপনিবেশিক আড়তগুলিতে অর্ডারি মালের বেচাকেনা দিনদিন মিইয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ব্যবসাদারেরা কি সহজে হার মানতে পারে? তাই এরা নানা পদ্ধতি অবলম্বন করে সর্ষের মধ্যে ভূত ঢুকিয়ে দেয়। অর্থাৎ ছোট পত্রিকার শিবির ভাঙার চতুর আয়োজন করে।

 বস্তুত এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। পৌর সমাজের ভিত্তিতে গড়ে-ওঠা রাজনৈতিক সমাজে যেভাবে লজ্জাহীন ভ্রুক্ষেপহীন শিবিরবদল রেওয়াজে পরিণত হয়েছে, তাতে তাৎক্ষণিক সুবিধা পাওয়ার লোভ-ই হয়ে উঠছে জীবনযাপনের মুখ্য আধেয়। যেসব লিখিয়েরা মূলত চলতি হাওয়ার পন্থী, স্রোতে গা ভাসানোর চেয়ে বেশি কোনো দায় স্বীকার করতে তারা নারাজ। এরা কেবল তথ্যের খোলস দেখে তৃপ্ত; যদি ওই খোলস রঙিন ও চকচকে হয়ে থাকে, তাহলে একেই সাম্প্রতিকতার পরাকাষ্ঠা ভেবে এরা উল্লসিত। জীবনে কোনো সংকেত খোঁজা বা তাৎপর্য আবিষ্কার করার বৃথা হয়রানি এরা পছন্দ করেন না। যৌবনে অন্যায় ব্যয়ে বয়সে কাঙালি হতে কোনো আপত্তি নেই এদের, কেননা নিজেদের পর্বতপ্রমাণ মূঢ়তা এরা ঢেকে রাখেন অতিপরিশীলিত সপ্রতিভতার মোড়কে। ভঙ্গিসর্বস্বতা যেখানে শেষ কথা, তাতে লিটল ম্যাগাজিনের পতাকা বহন গভীরতর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দায়ের সঙ্গে নিঃসম্পর্কিত হতে বাধ্য। এইজন্যে আরও একটু নাম, আরও একটু দাম পাওয়ার তাড়নায় প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির কৃপাধন্য হওয়ার উপযোগী প্যাচ-পয়জার করতে এদের দ্বিধা হয় না। স্বভাবত এরা কাকের ঘরে কোকিল; বাসা ভেঙে উড়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত হয়তো কোনো প্রাসাদের সুরম্য বারান্দায় খাচার নিরাপদ ঘেরাটোপে এদের অধিষ্ঠান হয়। বাঁধা সময়ে বরাদ্দ ছোলা খেয়ে কখনো সুখে শিস দেয় আর কখনো শেখানো বুলি আওড়ায়। গন্তব্যের, ভাবাদর্শের, প্রাসঙ্গিকতার বালাই নেই এদের। লিটল ম্যাগাজিনের অপ্রাতিষ্ঠানিক চেতনা এদের পক্ষে দুর্বোধ্য গ্রিক।

 প্রতিষ্ঠান এইসব কোকিলের দস্তুর জানে। এদের খাঁচাবন্দী করতে যে দুটো চারটে দানাই যথেষ্ট, একথা প্রাতিষ্ঠানিক মোড়লদের বুঝতে দেরি হয় না। সুতরাং বড়শির চারা হিসেবে খানিকটা গুরুত্ব দিয়ে অচিরে ভুলে যায় এদের। কিন্তু সংশয়ের আঁধি তৈরি করা যেহেতু প্রতিষ্ঠানের রণকৌশল, লিটল ম্যাগাজিনের অনেক সৎ সৈনিক সহজ বুদ্ধির জন্যে এই শিবির বদলের আসল তাৎপর্য অর্থাৎ সংশয়ের তাৎপর্যহীনতা বুঝতে পারেন না। তাদের মধ্যে দ্বিধা ও দুর্বলতা দেখা দেয়, হতাশা প্রস্তুতিপর্বকে আচ্ছন্ন করে, পথ চলার শক্তি সংহত করার বদলে কেউ কেউ নেতির চক্রব্যুহে ঢুকে পড়েন। প্রতিষ্ঠান তো তা-ই চায়। আর, যাঁরা নাছোড়বান্দা হয়ে তবু এগিয়ে যেতে চান, তাদের জন্যে প্রতিষ্ঠান ওইসব বড়শির চারাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে। অন্তর্ঘাত কীভাবে কখন নিঃশব্দে ঘটে যাচ্ছে, সততা ও মৌলিক চিন্তা নিয়েও ছোট পত্রিকার মশালচিরা তা বুঝতে পারেন না। চোরাবালিতে যখন কোমর অব্দি ডুবে যায়, সেসময় কেউ কেউ হয়তো ছটফট করে ওঠেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের সম্মোহন, বহুশ্রুত, প্রায় ক্লিশে হয়ে-যাওয়া, বাক্যবন্ধ ব্যবহার করে লেখা যেতে পারে, এর মোহিনী মায়ায় কত ডাকসাইটে বিপ্লবীর পথ বেঁকে গেছে গাস্থ্যের দিকে। এইসব প্রাক্তন বিপ্লবীদের সাম্প্রতিক অবস্থান জীবনানন্দ কথিত শতশত শূকরীর প্রসববেদনার আড়ম্বরকে যতই মনে করিয়ে দিক না কেন, অস্বীকার করার উপায় নেই যে লিটল ম্যাগাজিনের কোনো কোনো অর্জুনের হাত থেকে গাণ্ডীব খসে পড়ছে পিতামহ ও পিতৃব্যদের বিপক্ষ শিবিরে দেখে। যেহেতু এইসব প্রাক্তন প্রিয়জনদের ডিগবাজি-কুশলতা ভাবাদর্শের প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে আজকের সেনানীদের সন্দিহান করে তুলছে, ইতিহাসের আবর্জনাকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করার দায় স্বীকার করাটা ছোট পত্রিকার পতাকাবাহীদের অবশ্যকৃত্যের মধ্যে পড়ে। মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়ার চতুর খেলাকে যে ঘৃণা করতে শেখেনি, লিটল ম্যাগাজিন কিছুতেই তার জন্যে নয়।

 আধিপত্যবাদ চিরকালই সুস্থ চিন্তার সবচেয়ে বড় শত্রু। চিন্তায় পক্ষাঘাত ঘটিয়ে দেওয়ার জন্যে অনবরত কলকাঠি নেড়ে যায় আধিপত্যবাদের নায়েব-গোমস্তা-দালালের বাহিনী। এদের খপ্পর থেকে সে-ই বাঁচাতে পারে যে জানে এরা কেন কী করছে। স্বাধীনতাকে যারা বিনিময়যোগ্য মনে করে, যে-কোনো অজুহাতে এরা সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। লিটল ম্যাগাজিনের লড়াই মূলত এই সংক্রামক প্রবণতার বিরুদ্ধে। চারদিকে ভাগাড় আর জঙ্গলের স্তুপ দেখে নিপাট ভালোমানুষ ভদ্রলোকের মতো নাকে রুমাল চাপা দিয়ে ফুলবাগানের সন্ধান করেন। যিনি, ছোট পত্রিকার যুদ্ধ অন্তত তার জন্যে নয়। নগদ-বিদায়ের অবিরাম হাতছানি উপেক্ষা করা ওই যুদ্ধের প্রথম ধাপ। যোদ্ধাকে জানতে ও ভাবতে হয়, কেন ভাগাড়ের চারদিকে ঘিরে এত শকুন আর ফেউদের আনাগোনা ও হল্লাবোল। আধিপত্যবাদীরা কীভাবে এই পৃথিবীকে মানুষের পক্ষে অব্যবহার্য করে তুলছে ক্রমশ, এটা দেখানো এবং বোঝানো তার যুদ্ধ। যতক্ষণ এই উপলব্ধিতে না পৌছাচ্ছেন, অন্তত ততক্ষণ লিটল ম্যাগাজিনের মাইন-বিছানো রণভূমিতে তিনি ফুরফুরে ফুলবাবুমাত্র হয়ে থাকবেন। বলা বাহুল্য, যুদ্ধক্ষেত্র আর যা-ই হোক, সৌখিন হাওয়া বদলের জায়গা নয়। তাতে বিস্ফোরণের কালো ধোঁয়ায় দম আটকানোর সম্ভাবনা অন্তত উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এর চেয়ে বরং প্রাক্তন বিপ্লবীদের মতো কিংবা সাহিত্য করে’ নামী দামী হওয়া আধিপত্যবাদের খয়ের খাঁ-দের মতো সহজ ও স্বাভাবিক পথে বিচরণ করা অনেক বেশি নিরাপদ। এতে ‘স্বাধীন’ও থাকা যায়, চিন্তা তাতে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হোক বা খাঁচাবন্দী হোক। আধিপত্যবাদ অপরিসীম দক্ষতায় দৃশ্য ও অদৃশ্য পিঞ্জর তৈরি করে চলেছে প্রতিনিয়ত। এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে সামগ্রিক প্রতিরোধ ও বিকল্প প্রতিবেদনের সন্ধান। এই কাজ লিটল ম্যাগাজিন করে যাচ্ছে বলে পীড়ন প্রায় সর্বগ্রাসী হয়েও বাংলা সাহিত্যের একমাত্র সত্য হতে পারেনি।

 সমাজে ও সাহিত্যে ছোট-বড়ো অজস্র প্রতিষ্ঠান দিন-দিন কেন তিমিলি হয়ে উঠছে, এর উত্তর খুঁজতে হবে আমাদের জীবনের নানা অনুপুখে। এই বাড়বাড়ন্ত কি শেষ সত্য? জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী-কমলকুমার মজুমদার-অমিয়ভূষণ মজুমদারের মতো লিখিয়েরা যে আপসহীন প্রতিবাদ ও বিকল্প সাহিত্যের প্রতিস্রোত গড়ে তুলেছেন, তা বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃত ভুবন জুড়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক চেতনার অক্ষয় প্রেরণা হিসেবে আজও সক্রিয়। পাশাপাশি যদিও পণ্যসাহিত্যের রমরমা অব্যাহত রয়েছে, তবু লিটল ম্যাগাজিন থেমে থাকেনি। কেননা থেমে থাকাও তো এক ধরনের পরাজয়েরই স্বীকারোক্তি। তাই যাবতীয় স্থিরতা, পরিবর্তন-অনীহা ও মানিয়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এইসব লেখকেরা সুযোগসন্ধানী মধ্যবিত্ত বর্গের সাহিত্যিক মুখোশকেই খুলে দিয়েছেন। ভাষা ও চেতনার কাঠামোয় অন্তর্ঘাত করে তারা আসলে প্লিসর্বস্ব ঘুনধরা বাণিজ্যিক সমাজের বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়িয়েছেন। ছোট পত্রিকার শমীবৃক্ষ থেকে আগুনের মতোই ধারাবাহিকভাবে জ্বলে উঠেছেন শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, অসীম রায়, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবিমল মিশ্র, সুবিমল বসাক, শৈলেশ্বর ঘোষ, উদয়ন ঘোষ এবং এরকম আরো কয়েকজন লিখিয়ে। তারা সাহিত্যের নামে প্রচলিত আত্মপ্রতারণাকে আক্রমণ করেছেন বিনা দ্বিধায় এবং কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করেননি। এমন কি, প্রচলিত অর্থে জনপ্রিয়তার মোহকে অস্বীকার করে জনতার উপর চাপিয়ে দেওয়া রুচি, বাস্তবতা ও ন্যায়বোধকে আক্রমণ করেছেন। তাদের কল্পনা, আবেগ ও চিন্তা, যুক্তি ও প্রকল্পনা অপ্রাতিষ্ঠানিক চেতনা থেকে উৎসারিত হয়ে ভাষাসংস্কার ও সাহিত্যসংস্কারকে যেন ভেতর থেকে ছুরিকাঘাত করেছে। সভ্যতার নামে মানুষের তুমুল মৃত্যুপরম্পরাকে এরা অস্বীকার করতে চেয়েছেন লিটল ম্যাগাজিনের আশ্রয়ে। সমস্ত কোলাহলের উল্টোমুখে দাঁড়িয়ে এমন-এক নতুন বহুত্বময় কণ্ঠস্বরের জন্ম দিতে চায় এই পত্রিকাগুলি যা মৃত্যুপীড়িত সভ্যতার পক্ষে দর্পণ হবে না কেবল, গড়ে তুলবে প্রতিবাস্তবতা ও প্রতিসন্দর্ভের আদল।

 ছোট পত্রিকার মূল লড়াই এইখানে যে, সাহিত্যকে নিছক মুনাফাখোরদের পণ্যে রূপান্তরিত করাকে প্রতিহত করাই তার লক্ষ্য এবং সেইসঙ্গে আধিপত্যবাদীদের আসল চেহারাটা ধরিয়ে দেওয়াই তার দায়। ছোট পত্রিকায় যারা লেখেন, তারা রুগ্ন সমাজের যথাপ্রাপ্ত মূল্যবোধকে বারবার প্রশ্নে বিদ্ধ করেন, ব্যবচ্ছেদ করেন, আক্রমণ করেন। সততা ছাড়া সর্বব্যাপ্ত প্রচারসর্বস্বতার বিরুদ্ধে যেহেতু লড়াই করা যায় না, ছোট পত্রিকার প্রতিটি যোদ্ধাই সেহেতু লেখাকে যুদ্ধ বলে মনে করবেন—এই হল ন্যূনতম চাহিদা। গ্রিক প্রত্নকথার সিসিফাসের মতো নিঃসঙ্গ ও একক অভিযাত্রী হওয়ার জন্যে তাদের তৈরি থাকতে হয় এবং বারবারই হয়তো নতুন করে সূচনাবিন্দুতে ফিরে গিয়ে কঠিন চড়াই ভেঙে দুর্বহ পাথরকে ঠেলে তুলতে হয় উপরে। কোনো ছক অনুযায়ী তা হতে পারে না। ফলে ছোট পত্রিকাকে বারবার ছক ভেঙে ফেলতে হয়, গড়তেও হয় আরও একবার তা ভাঙার জন্যে। এ বিষয়ে সর্বতোভাবে লিটল ম্যাগাজিনেরই লেখক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক চেতনার প্রতিনিধি সুবিমল মিশ্র লিখেছেন:‘প্রতিষ্ঠান একটি ব্যাপক শক্তি, বিভিন্ন কেন্দ্রে তার ডালপালা ছড়ানো। প্রতিষ্ঠান সবসময়ই মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশের বিরোধী। তার উদ্দেশ্য মুনাফা লোটা এবং যেন তেন প্রকারে ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠীকে করায়ত্ত করা। পাঠককে শিল্প-সচেতন করা নয়, তার মনোরঞ্জন করা। শুধু আমাদের দেশেই নয়, সব দেশেই প্রতিষ্ঠান চায় সমস্ত রকম স্বাধীন অভিব্যক্তি, প্রকৃত সত্যের প্রকাশ বন্ধ করতে। তাদের হাতে বিজ্ঞাপন যন্ত্র, সমস্ত রকমের প্রকাশমাধ্যমগুলি, আর মূলত এই বিজ্ঞাপনের সাহায্যে সে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে।

 প্রতিষ্ঠানের এই মারাত্মক সর্বগ্রাসী চরিত্র এইজন্যেই ঘৃণ্য যে তা তথাকথিত সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে একটা তাসের প্রাসাদ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এর আসল লক্ষ্য মানুষের মানবিক নির্যাসটুকু শুষে নেওয়া। একদিকে প্রবল দৈত্যের মতো তার পরাক্রম আর অন্যদিকে মনোলোভন মুখোশের ও প্রসাধনের শিল্প। লিটল ম্যাগাজিনের যোদ্ধারা এতে ভয় পান না। কারণ রাজা যে আসলে উলঙ্গ, সে-খবর তাদের জানা। কিন্তু এও ঠিক যে, বিজ্ঞাপনের চাতুর্যে অনবরত সব পেয়েছির রঙিন দেশের হাতছানিতে কেউ কেউ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। প্রতিভাবাদর্শের ঔদ্ধত্যকে যে রোখা সম্ভব কেবলমাত্র ভাবাদর্শের শক্তিতে, একথা ভুলে গিয়ে চটজলদি নামী-দামী হওয়ার জন্যে সেইসব বিভ্রান্ত লিখিয়েরা আত্মসমর্পণ করে বসেন। এবং, সেই মুহূর্ত থেকে স্বাধীন লিখিয়ে থেকে তারা পরিণত হয়ে যান ভাড়াটে কলমচিতে। ভুলে যান, কয়েক বছর স্রোতে গা ভাসিয়ে চলতে পারলেও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি তাদের মরা ইদুরের মতো ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলতে পারে। ষাটের দশকের শাস্ত্রবিরোধী গল্পকার বা প্রথাবিরোধী কবিদের বেশ কয়েকজন স্বধর্মচ্যুতির মাশুল কীভাবে দিচ্ছেন, এর নজির চোখের সামনে রয়েছে। এরা এবং এঁদের আগে ও পরে আরও কবি-লিখিয়েরা সোনার হরিণের পেছনে ছুটেছেন এবং অবধারিতভাবে কয়েক বছর যেতে-না-যেতে হারিয়ে ফেলেছেন তাদের সৃষ্টির উত্তাপ ও ব্যক্তিত্বের অভিজ্ঞান। এ থেকে ছোট পত্রিকার অনেক কিছু শেখার আছে। কিন্তু, অত্যন্ত পরিতাপের কথা, ইদানীং জোয়ারের বদলে ভাটার টান যেন অনুভূত হচ্ছে। চোরাগোপ্তা পথে আপস করতে করতে কেউ কেউ অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছেন দু-নৌকায় পা রেখে চলতে। গাছের খাওয়া এবং তলারও কুড়োনো চলেছে এক সঙ্গে, বিনা দ্বিধায়। যে-কারণে জন্ম হয়েছিল লিটল মাগাজিন নামক প্রতিজ্ঞার, তাই যেন নিষ্প্রভ হয়ে পড়ছে। বিশ্বপুঁজিবাদের সাংস্কৃতিক আয়ুধ আধুনিকোত্তরবাদকে প্রসঙ্গহীনভাবে রপ্ত করতে গিয়ে হাঁসজারু মানসিকতা ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠেছে। এই উপমহাদেশ, বিশেষভাবে বাঙালির ভুবন, পুঁজিবাদী। রূপান্তরের প্রমোদভ্রমণে সামিল হতে যত উৎসুক হয়ে উঠছে—লিটল ম্যাগাজিনের সংকটও ঘনীভূত হচ্ছে তত।

 এ সময় পশ্চিম বাংলায় সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানগুলি বিচিত্র সন্ধিলগ্নে পৌঁছেছে। একদিকে ফাপা হয়ে পড়ছে স্পর্ধিত ইমারতগুলি, আবার অন্যদিকে গড়ে উঠছে। নতুন-নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্র। একেক ক্ষেত্রে একেক মুখোশ। এদের দ্বন্দ্বে আরক্ত সাম্প্রতিক সাহিত্য। ছায়া ও প্রচ্ছায়ায় আকীর্ণ হয়ে অকারণ জটিলতা যত বাড়ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে যেন সৃষ্টির বৈচিত্র্য। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে লিটল ম্যাগাজিন নামক প্রতিষোতবাহী আন্দোলনের। লক্ষ্যভ্রষ্ট ও উদ্দেশ্যহীন পরিক্রমা ক্রমশ দিনের নিয়মে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক চেতনা যখন বিকল্প সন্দর্ভ ও বিকল্প নন্দনের আশ্রয়ভূমি হয়ে ওঠার কথা ছিল, তখন পোক বিনিময়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে প্রতিবাদী চলনের স্পৃহা। অতি অল্পেতে তুষ্ট হয়ে যাচ্ছেন সেইসব আশুতোষ লিখিয়েরা, বছর ত্রিশেক আগে বিপুল সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যে যাঁদের অগ্নিস্নান সম্পন্ন হয়েছিল। এঁদের দেখাদেখি তরুণতম লেখকেরাও, প্রস্তুতিপর্ব শেষ হওয়ার আগেই, যুগপৎ দুধ ও তামাকে অভ্যস্ত হওয়ার প্রক্রিয়াটি শিখে নিচ্ছেন। এতে প্রমাণিত হচ্ছে, লিটল ম্যাগাজিন যেমন প্রতিবাদী শক্তির প্রতীক তেমনি বহুধা-বিভক্ত হয়েও প্রতিষ্ঠান মূলত মানবিক নির্যাস শোষণকারী অপশক্তির অন্য নাম। বাঘের হিংস্রতা, কেউটের বিষ, শেয়ালের ধূর্ততা এবং যন্ত্রগণকের দক্ষতা সমন্বিত হতে দেখি প্রাতিষ্ঠানিক প্রতাপের কৃৎকৌশলে। এইজন্যে এ সম্পর্কে শৈলেশ্বর ঘোষের মন্তব্য আমাদের আলাদা মনোযোগ দাবি করে:

 ‘জীবনযাপনের অভিজ্ঞতাই হবে সাহিত্য। সাহিত্য আমাদের কাছে কল্পনাবিলাস বা ভাববিলাস নয়। জীবনের প্রকৃত বাস্তবতা দিয়ে আমাদের সাহিত্যের শুরু, শেষ হবে, আমরা মনে করি, প্রত্যেকের জীবনের সম্ভাবনার দুয়ার খুলে। চেতনার ক্রমপ্রসারণ প্রক্রিয়ায় দেখা দেবে এই সম্ভাবনা। এটা বুঝতেই হবে যে একজন স্রষ্টা আর একজন সাহিত্যব্যবসায়ীর মধ্যে পার্থক্য একজন ভ্রমণকারী ও একজন দারোয়ানের পার্থক্যের সমান!’ (প্রতিবাদের সাহিত্য: পৃ ৯৪)

 শৈলেশ্বর যখন বলেন ‘জীবনের প্রকৃত বাস্তবতার কথা, স্পষ্টত তা প্রাতিষ্ঠানিক পণ্য-সাহিত্যের মেকি বাস্তবতাকে চোখে আঙুল দিয়ে স্পষ্ট করে তোলে। হাংরি প্রজন্মের দর্শন যদিও এতে ব্যক্ত হয়েছে, আসলে তা খাঁটি লিটল ম্যাগাজিনের অন্বিষ্ট। জীবনকে যে অপশক্তি খাঁচায় বন্দী করতে চায়, তার লক্ষ্যই হল মিথ্যার আবর্জনাস্থূপের সম্প্রসারণ। এর মোকাবিলা করতে চায় যারা, তাদের সমিধ সংগ্রহের জন্যে কোনো বানানো বাস্তবতায় গেলে চলে না। জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা থেকে রসদ নিয়ে তাদের বিনির্মাণ করতে হয় যাবতীয় সন্ত্রাস ও রুদ্ধতার কারিগরিকে। মানুষের নিষ্কর্য হিসেবে গড়ে তুলতে হয় সেই নবীন চেতনাকে যা কেবলই যথাপ্রাপ্ত পরিসরকে পুনর্নির্মাণ করে। চেতনা অনবরত সম্প্রসারিত হয় যখন, স্থবিরতার উল্টো মেরুতে গতি তীব্র দ্যুতি অর্জন করে নেয়। মানুষের হওয়া আর হয়ে ওঠা কত যে সম্ভাবনায় স্পন্দিত, সেই বার্তা পৌঁছে দেয় সৃষ্টি-প্রক্রিয়া। রোলা বার্তের কথায়, এই উদ্দেশ্য হল ‘To undo our own reality under the effect of other formulation!’ প্রতিষ্ঠানের চক্রান্তকে ওই সম্ভাবনার নিরন্তর কর্ষণ করেই প্রতিহত করতে পারেন ছোট পত্রিকার লড়াকু যোদ্ধারা। শৈলেশ্বর লিখেছেন: ‘প্রতিষ্ঠান যা প্রত্যাখ্যান করে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী তাই গ্রহণ করে, প্রতিষ্ঠান যা ঘৃণা করে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী তাতেই আনন্দ পায়, প্রতিষ্ঠান যা ধ্বংস করতে চায় প্রতিষ্ঠান-বিরোধী তাই লালন করে, প্রতিষ্ঠান যা পাপ মনে করে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী তাকেই ধর্ম মনে করে, প্রতিষ্ঠানের থাকে পোষা কুকর, প্রতিষ্ঠানবিরোধীর থাকে ক্ষুধার্ত বাঘ, প্রতিষ্ঠানের কাছে যা যৌনতা প্রতিষ্ঠান-বিরোধীর কাছে তাই ভালোবাসা, প্রতিষ্ঠানের কাছে যা জীবন, প্রতিষ্ঠান-বিরোধীর কাছে তাই মৃত্যু। প্রতিষ্ঠান অপেক্ষা করে বিদ্রোহীর দুর্বলতা খুঁজে নিয়ে তাকে ইতিহাসে ঢুকিয়ে দ্যায় কিন্তু প্রতিষ্ঠান-বিরোধী এমন অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে যা প্রতিষ্ঠানের মাথায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেয় এবং বুর্জোয়া ইতিহাস তাকে ভয় পায়।’(তদেব)

 সুতরাং, দুটো-চারটে গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ ছাপিয়ে দিয়ে লিটল ম্যাগাজিনের দায় শেষ হতে পারে না। সমস্ত প্রচলিত নান্দনিক-সামাজিক অভ্যাস ও সংস্কারকে প্রত্যাহ্বান জানায় না যেসব লেখাপত্র অর্থাৎ যা আধিপত্যবাদী বর্গের নিশ্চিন্ত নিরুদ্বিগ্ন উদ্ধত অবস্থানে অস্বস্তি জাগাতে পারে না—ছোট পত্রিকার দুর্মূল্য পাতা ভরানোর কোনো অধিকার তাদের নেই। এর মানে এই যে, কেবলমাত্র প্রতিবাদ বা এমন কি বিদ্রোহ করে ক্ষান্ত হলে চলবে না, ছোট পত্রিকাকে বিস্ফোরক উত্তাপের কেন্দ্রও হয়ে উঠতে হবে। নইলে ধারাবাহিক ভাবে অবক্ষয়ের বিষ-জীবাণু সংক্রামিত করে তরুণ লেখক-প্রজন্মকে পথভ্রষ্ট করতে থাকবে প্রতিষ্ঠান। লিটল ম্যাগাজিনের পালের হাওয়া সহজে কেড়ে নেওয়া যায় না নিশ্চয়। কিন্তু এও অনস্বীকার্য যে, বারবার চিলের মতো ছো ঁদিয়ে প্রতিষ্ঠান যদি শিকার তুলে নিতে থাকে—ছোট পত্রিকার অস্তিত্বগত তাৎপর্য অনেকখানি অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। বিশেষত লড়াই যখন সম্মিলিত তারুণ্যের সঙ্গে সর্বগ্রাসী দাম্ভিক মিথ্যার, এই অপক্রিয়ার সম্ভাব্য পরিণতি জনিত সংকটকে হাল্কাভাবে দেখা চলে না। এ বিষয়ে বিশেষ অবহিত সুবিমল লিখেছেন: ‘প্রতিষ্ঠানের প্রভাব এমন গভীর ও নেপথ্যচারী যে খুব কম সাহিত্যিকের পক্ষেই সম্ভব তার গ্রাস থেকে রেহাই পাওয়া। প্রতিষ্ঠান প্রতিশ্রুতিশীল, প্রতিভাসম্পন্ন উঠতি তরুণ কবি-সাহিত্যিকের সামনে এক আপাত-দুর্ভেদ্য, অথচ বহু বর্ণ-সমন্বিত মায়াবী রহস্যের দরজা খুলে দেয়, ঝালরি পর্দা দোলায়, তখন খ্যাতির মোহ, অর্থের লোভ, প্রতিষ্ঠার নিশ্চিতি থেকে নিজেকে নিরাপদে সরিয়ে রাখা সত্যিই দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ওরা মুক্ত চিন্তার, নিশ্চিতির কথা বলে, গণতন্ত্রের কথা বলে, উদার নীতির কথা শোনায়, চাই কি গভীর বোধজাত নান্দনিকতার কথা উচ্চারণ করে, প্রতিষ্ঠানে প্রবিষ্ট হবার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত, কিন্তু একবার স্বর্ণশৃঙ্খলিত ফটক পেরুলেই চিরবন্দী।” (১৯৯৫:৭৬) খুব সত্যি কথা। এত দৃষ্টান্ত আমাদের চোখের সামনে আছে যে বন্দিত্বের আগে ও পরে কীভাবে একই মানুষ দুই মানুষে পরিণত হয়—এটা খোজার জন্যে কোনো তাত্ত্বিক বয়ানের প্রয়োজন পড়ে। ছোট পত্রিকার ধ্বজদণ্ড যাঁরা বহন করেন, তাদের আসলে শুরুতেই জীবন সম্পর্কে একটি মৌলিক ঘোষণা করে নিতে হয়। অন্য কারও কাছে নয়, নিজেরই কাছে। একটাই। তো জীবন আমাদের, একে স্বাধীন রাখব নাকি সম্ভোগের নেশায় বন্ধক রাখব প্রতাপের কাছে? কী করব এই জীবন নিয়ে: বাঙালির কাছে এই প্রশ্ন নতুন নয়। লিটল ম্যাগাজিনের আন্দোলনে যাঁরা শরিক, তাঁরা এই পুরনো প্রশ্ন তবু পুনরুত্থাপন করছেন অনেক বেশি মরিয়া হয়ে। বলা ভালো, কার্যত জীবন-মরণ প্রশ্ন হিসেবে।

 কিন্তু ‘করছেন’ ক্রিয়াপদটি কি যথার্থ প্রয়োেগ হল? সত্যিই করছেন কি তারা! নাকি অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতে প্রসারিত সামাজিক বিষয়বস্তুকে দেখার মতো দ্রষ্টা-চক্ষু যাদের অধিগত, সংখ্যাগত বিচারে তারা আসলে হাজারে এক? তাহলে, ছোট পত্রিকা কেন করছেন সরকার আশরাফ বা সমীরণ মজুমদারের মতো সম্পাদক-সংগঠক? তারাও কি মনের মতো লেখা ছাপাতে পারেন সব সময়! নাকি স্বপ্নের লেখা ছাপানোর স্বপ্ন দেখতে দেখতে পেরিয়ে যাচ্ছে অনেক দিনরাত্রি! প্রচলিত পদ্ধতিতে যা কুলোয়, সেই সময়-বাহিত অস্তবস্তু কটি প্রতিবেদনে থাকে? বিপ্লবী বক্তব্যের জন্যে বিপ্লবী উপস্থাপনার অনিবার্যতা কজন জানেন, বোঝেন এবং প্রয়োগ করছেন! এই প্রশ্নমালার জবাবে যে অনিশ্চিত উত্তর আসবে বলে অনুন করছি, তাতেই কি ছোট পত্রিকার আন্দোলন স্তিমিত হওয়ার কারণ নিহিত নেই? এই নিবন্ধের শুরুতে আত্মবিনির্মাণের কথা যে লিখেছি, সেখানেই কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের সবচেয়ে বড়ো জোর। কেননা নিজেকে অনবরত ভাঙতে পারে না যে, প্রতিটি পরবর্তী মুহূর্তে সে তো আত্মপ্রতিষ্ঠানে আরেকটি ইট যোগ করবে। অতএব ছোট পত্রিকা জগৎ ও জীবন সম্পর্কে কেবলই প্রশ্ন তুলে ধরুক, পড়ুয়াদের জন্যে অস্বস্তি তৈরি করুক। সাহিত্য করা’ কথাটার মধ্যে যে সামন্তবাদী দাতা-গ্রহীতার বিভাজন ইঙ্গিতে রয়ে যায়, তাকে ভেঙে দিয়ে জীবন ও জগতের সাহিত্য-হওয়া লক্ষ করুন পড়ুয়ারা। বলা ভালো, তারা নিজেরা ওই প্রতিবেদন-নির্মিতির অবিভাজ্য অঙ্গ হয়ে উঠুন। কেবলমাত্র এভাবেই গড়ে উঠতে পারে বিকল্প নন্দন, বিকল্প সন্দর্ভ, বিকল্প অনুভূতির পরম্পরা।

 কথা হলো, বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধার মতো স্বেচ্ছাব্রতী ইদুর সমাজে পাওয়া ভার। ভক্ষকের সঙ্গে ভক্ষ্যের মৈত্রী অসম্ভব, এমন কি আপাত-মৈত্রীও আত্মহননের মূখ উচ্ছ্বাসমাত্র। আজকের বাঙালি সমাজ যাদের স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি চক্রান্তের চাতুর্যে শতধা-বিচ্ছিন্ন এবং প্রতিটি একক সত্তা অন্য একক সত্তা থেকে দ্বীপের মতো সুদৃঢ় ও অনধিগম্য, তাদের জটিল গ্রন্থনাকে শনাক্ত করাই লিটল ম্যাগাজিনের সাহিত্যকৃতি। শুধুমাত্র সপ্রতিভ ভঙ্গি দিয়ে যেসব বন্ধুরা অন্যের চোখে ধুলো দিতে ও ঠুলি পরাতে চান, তারা আসলে যে নিজেদের আধিপত্যবাদী বর্গের ঢাকের কাঠিমাত্র করে তোলেন—এ বিষয়ে অণুমাত্র সন্দেহ নেই। ছোট পত্রিকার নামে আত্মপ্রত্যাখ্যানের এই মারক অভ্যাসও যে অনেকে আয়ত্ত করে নিয়েছেন, তা অস্বীকার করব কীভাবে! নিসর্গ বা অমৃতলোক বা উত্তরাধিকার এই সত্য যদি জেনে থাকেন, তাহলে তারা কাগুজে বাঘদের প্রতি তর্জনি সংকেতের দায়িত্ব নিন। শুধু কি তাই! বিশ্বজুড়ে আজ মৌলবাদী প্রতিক্রিয়ার বাড়বাড়ন্ত। তারই সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষত বাঙালির ভুবনে, পেছনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার তাড়নায় সাংস্কৃতিক মৌলবাদ ক্রমশ পরিশীলিত ছায়া ছড়িয়ে দিচ্ছে। পশ্চিম বাংলায়, বাংলাদেশে এবং বাঙালির অন্য ভূগোলেও ঐতিহ্য-মূলকতার নামে কিছু কিছু লিটল ম্যাগাজিন অতীতমোহ বিস্তার করতে চাইছে। অবধারিত ভাবে ধর্মীয় কুহক তাতে পুনর্বাসন পেয়ে যাচ্ছে। এই কি অপ্রাতিষ্ঠানিকতার নিদর্শন! সমস্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হিংস্রতম ও কুটিলতম অচলায়তনে ফিরে যাচ্ছেন যাঁরা সূক্ষ্ম ও কৃকুশলী পরিশীলনের আড়ালে-তাদের ইতিহাসবোেধ ঝাপসা। অন্তত বাঙালির হাজার বছরের উত্থান-পতন অগ্রগতি-পশ্চাত্বর্তন স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ আত্মহনন-পুনর্নির্মাণ থেকে কোনো পাঠ এরা নেননি। সবচেয়ে বড়ো কথা, সব ধরনের প্রতিষ্ঠানিকতা ভেঙেই যে বাঙালি চিরকাল বিকল্প পথ, পাথেয় ও গন্তব্য গড়ে নিয়েছে—এই মূল সত্য তাদের উপলব্ধিতে নেই। সমস্ত দিক দিয়ে আজ আমরা ক্রান্তিকালের আবর্তে। এ সময় খাটি লিটল ম্যাগাজিনের পতাকাবাহকেরাই কেবল আমাদের পৌছে দিতে পারেন নতুন সম্ভাবনার সহস্রাব্দে। তারা যদি ব্যর্থ হন, বাঙালির লেখা-লেখা খেলা থেকে নির্বাসিত হবে আবহমান বাংলা।

 লিটল ম্যাগাজিনের যারা শত্রু, তাদের জীবনেরই শত্রু বলে অনায়াসে শনাক্ত করা যায় আজ। আমাদের দৈনন্দিন প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে ধ্বংসস্তুপে। আমরা যত নগ্ন হচ্ছি, তত তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অবসাদ আর আত্মপ্রতারণা। কিন্তু উল্টো দিকে শত্রুপক্ষের চাতুর্য বাড়ছে, পরিশীলন বাড়ছে, মুখোশের কারুকাজ বাড়ছে। কোনো সন্দেহ নেই যে, অর্ধেক দশক যেতে না যেতে ভেঙে যাচ্ছে সংঘ। বড়ো বেশি একক অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার আয়োজন। ছোট পত্রিকার ভেতর থেকেই তাকে চুরমার করে দেওয়ার কসরত। প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করার নামে নিজেরা খুদে খুদে প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে চাইছি আমরা। লিটল ম্যাগাজিন মানে বিকল্প পথ-পাথেয়-গন্তব্য এবং বিকল্প দর্শন-নন্দন-গ্রন্থনা: এই গোড়ার কথাটা অনেকেই আজ মনে রাখছি না। তবে কি সাহিত্যের মুষলপর্ব এসে গেছে, যখন, প্রত্যেক সহযাত্রীর মুঠোয় ধরা পাটকাঠিও বল্লমে রূপান্তরিত হবে! প্রয়োজন কি সত্যি ফুরিয়েছে লিটল ম্যাগাজিনের? এবার তাহলে লেখা হবে সমবেত এপিটাফ, কারণ, আন্দোলন হিসেবে তার মৌল অস্তিত্ব আজ অস্বীকৃত। এখন কেবল অশ্মীভবনের অন্তিম পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্যে নিরাবেগ প্রতীক্ষা।

 অর্থাৎ গণশত্রুদের পোয়াবারো। তাদেরই উদ্যত খড়গের নিচে নতশির হবে জীবনের সংস্কৃতি! এরা মিথ্যা দিয়ে সত্যকে বলাৎকার করাবে, ক্রয়মূল্য দিয়ে ঠিক করে দেবে অস্তিত্বের উপযোগিতা, ঘাতকের বেপরোয়া হিংস্রতার কাছে যাবতীয় মানবতাকে কুঁকড়ে যেতে বাধ্য করবে। লিটল ম্যাগাজিনের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়া কি এই অনিবার্য ভবিতব্য নয়? নিশ্চয় সরকার আশরাফ বা সমীরণ মজুমদার বা তাদের অন্য সহযোদ্ধারা এই আত্মবিলয় মেনে নেবেন না। বরং তারা আরও স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করবেন, ছোট পত্রিকার একটি সংখ্যা প্রকাশ মানে আপসহীন যুদ্ধ জারি রাখার ঘোষণা। সুতরাং এর প্রতিটি পাতা যেন লক্ষ্যভেদী হয়, প্রতিটি রচনা যেন হয় রণক্ষেত্রের বিস্তার-নতুন করে বরং এই চিন্তায় তাঁরা শান দিন। অন্ধকার এই মুহূর্তে গাঢ়তম বলেই তো নিসর্গের-একবিংশের-অমৃতলোকের-কবিতীর্থের নিরবচ্ছিন্ন আলোর ঝলকানি এতখানি প্রয়োজনীয় বিবেচিত হচ্ছে। তবে পরিশীলিত শত্রুরা যখন কৌশলী: ও সংঘবদ্ধ, সে-সময় ছোট পত্রিকার কর্ণধারদের মধ্যে অর্থহীন (ও, কখনো-কখনো, ন্যক্কারজনক) কলহ বন্ধ হোক। ঈর্ষা ও অসূয়া সমবায়ী চেতনার পক্ষে মৃত্যুকীট। বলা বাহুল্য, ওই সমবায়ী চেতনার সমৃদ্ধিতে ছোট পত্রিকার আয়ুষ্কাল নির্ধারিত হয়ে থাকে। পথ আলাদা হোক, ক্ষতি নেই। কেননা এসময় বহুত্বদ্যোতক, বহুস্বর-সঙ্গতি একালের অন্বিষ্ট।

 বরং, তৃতীয় সহস্রাব্দের সূচনাপর্বে দাঁড়িয়ে, লিটল ম্যাগাজিনের যোদ্ধারা আত্মখননকে সমাজখনন ও সময়খননের দ্বিবাচনিকতায় প্রতিষ্ঠিত করার নতুন-নতুন পথ ও পাথেয় খুঁজে নিন। বিষয় নিয়ে কিছু ভাবতে হবে না, আঙ্গিক নিয়েও নয়। দ্রষ্টা চক্ষু যখন মেলে রাখছি আমরা, অপ্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের প্রতি দায়বদ্ধতা যখন অবিচল রাখছি—বিষয়। ও আঙ্গিক নিজে থেকেই ধরা দেবে। ক্রান্তিকালে পরিধির অবিরাম বিস্তার ঘটিয়ে যাওয়াই কাম্য। যন্ত্রসভ্যতার সাম্প্রতিক উৎকর্ষের পর্যায়ে যেভাবে চিন্তার বিশ্বায়ন ঘটে গেছে, তাতে লিটল ম্যাগাজিনের জন্যে তৈরি হয়েছে অভূতপূর্ব প্রত্যাহ্বানের পসরা। পাঁচ বছর আগেও বাঙালির ভুবন ঠিক এরকম ছিল না। সন্দেহ নেই যে, পাঁচ বছর। পরেও আজকের মতো থাকবে না। খাটি হাওয়ামোরগের মতো লিখিয়েদের, সম্পাদকদের আজ শুযে নিতে হবে দ্রুত ধাবমান সময়ের বার্তা। তবু শব্দাতিগ গতির এই পরিবর্তনমালায় পুঞ্জীভূত আন্তর্জাতিকতা চিন্তাবিষে যে-বিস্ফোরণ ঘটিয়ে চলেছে—তা যেন বাঙালির নিজস্ব অনুভবকে গ্রাস না করে। কতখানি গ্রহণ করব কতখানি বর্জন আর কতখানি বা পুনর্নির্মাণ করব-পড়ুয়াদের কাছে এ বিষয়ে অত্যন্ত জরুরি দিগদর্শক সংকেত পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন লিটল ম্যাগাজিনের যোদ্ধারা। এত গতির ঘূর্ণাবর্তেও কোন উপকরণ স্থির অপরিবর্তনীয়—নতুন-নতুন প্রতিবেদন ও বয়ন তৈরি করে সেদিকেও তারা আলোকপাত করুন। এই মুহুর্তে এর চেয়ে বড়ো দায়। আর কিছু নেই।

 এসময় নাকি সংশয়ের, আকছার শোনা যায় একথা। সত্যভ্রম নাকি এখন বেশি। জোরালো ও কার্যকরীএমন ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু বোধহয় কর্কশ সত্যটা বলে নেওয়াই ভালো। যাদের কোনো কেন্দ্র নেই, এমনকি কেন্দ্রহীনতাই যাদের অভিজ্ঞান ও প্রত্যয়—এরা কিন্তু ছদ্মবেশীঅপ্রাতিষ্ঠানিকতা তাদের কাছে সিঁড়িমা, ব্যবহার করুন এবং যুঁড়ে ফেলে দিন গোছের আসবাব। গাছের খেতে খেতে আর তলার কুড়োতে কুড়োতে এরাই ফন্দিফিকির খুঁজে বেড়ায়, কীভাবে কোথায় উপরে ওঠার পথটা লুকোনো। সাহিত্য ‘করাএদের কাছে নামী-দামী হওয়ার জন্যেকোনো সত্যের মুখোমুখি হওয়ার জন্যে নয়। ছদ্মবেশও তাই যখন-যেমন পরে নেয় এরা। সংশয়। এদের জন্যে কারণ চোখের কূলিটা তো নজরে পড়ে না কখনো। লেখক-জীবনের শুরুতে অধ্যবসায় থাকে, থাকে আবিষ্কারের পৃহা। কিন্তু পরে একে একে সব ঝরে। যায়। যে যে আকল্প পদ্রুয়ারা সাদরে নিয়েছেন, এরা কেবলই এর পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। নিজেকে ভাঙার মধ্যে পাঠকের সমর্থন হারানোর শঙ্কা থাকে বলে নিজের মৌচাকে নিজেই ঝুদ হয়ে থাকতে চায়। সংশয়বাদ এদের খেয়া-পারানির কড়ি হয়ে পড়ে।

 স্বভাবত লিটল ম্যাগাজিন এই সংশয়বাদে বিশ্বাসী নয়। অন্তত সাম্প্রতিক পৰ্বাত্তরের আবহে নিশ্চিতভাবে ছোট পত্রিকার ওপর ঐতিহাসিক দায়িত্ব বর্তেছে। অধির মধ্য দিয়ে পথ ও পাথেয় চিনে নেওয়ার এই দায় যুগপৎ আত্মবিনির্মাণের, জগৎবিনির্মাণেরও। বাঙালির শেকড়ে জল নেই নানা কারণে। জল দাও, আর্তিকে মান্য করে প্রাকৃতায়নকেও শ্রদ্ধা জানাতে হবে। অথচ একই সঙ্গে আত্মস্থ করে নিতে হবে চিন্তার বিশ্বায়ন-সম্পূক্ত। প্রবণতাগুলিকেও। সত্য যে দিবাচনিক, ছোট পত্রিকা নিজের বহুমাত্রিকতার মধ্য দিয়ে। তা স্পষ্ট করে তুলুক। ঘটতে থাকুক অজস্র বিছুরণ, উথাপিত হোক প্রশ্নের পরে প্রশ্ন। লিটল ম্যাগাজিন নামক শমীবৃক্ষে মেগা প্রশ্নমালার আগুন যেন নিৰ্বাপিত না হয়। কখনো।