সমাজ/অযোগ্য ভক্তি

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


ইষ্টি আর পুরোহিত
যাহা হতে সর্বস্থিত
তারা যদি আসে বাড়ি পরে ,
শুধু হাতে প্রণামেতে
ভার হয়ে যান তাতে
মুখে হাসি অন্তরে বেজার ।
তিনটাকা নগদে দিলে
চরণ তুলি মাথা পরে
প্রসন্ন বদনে দেন বর ।

উল্লিখিত শ্লোক তিনটি টাকা সম্বন্ধীয় একটি ছড়া হইতে উদৃধৃত করিয়া দিলাম । ইহার ছন্দ মিল এবং কবিত্ব সম্বন্ধে আমি কোনো জবাবদিহি স্বীকার করিতে প্রস্তুত নই ।

কেবল দেখিবার বিষয় এই যে , ইহার মধ্যে যে - সত্যটুকু বর্ণিত হইয়াছে তাহা আমাদের দেশে সাধারণের মধ্যে প্রচলিত , তাহা সর্ববাদিসম্মত ।

টাকার যে কী আশ্চর্য ক্ষমতা তাহারই অনেকগুলি দৃষ্টান্তের মধ্যে আমাদের অখ্যাতনামা কবি উপরের দৃষ্টান্তটিও নিবিষ্ট করিয়াছেন । কিন্তু এ দৃষ্টান্তে টাকার ক্ষমতা অপেক্ষা মানুষের মনের সেই অত্যাশ্চর্য ক্ষমতা প্রকাশ করিতেছে যাহার প্রভাবে সে একই সময়ে একই লোককে যুগপৎ ভক্তি এবং অশ্রদ্ধা করিতে পারে ।

সাধারণত গুরুপুরোহিত যে সাধুপুরুষ নহেন , সামান্য বৈষয়িকদের মতো পয়সার প্রতি তাঁহার যে বিলক্ষণ লোভ আছে সে সম্বন্ধে আমাদের কিছুমাত্র অন্ধতা নাই , তথাপি তাঁহার পায়ের ধুলা মাথায় লইয়া আমরা কৃতার্থ হইয়া থাকি কেননা গুরু ব্রহ্ম । এরূপ ভক্তি দ্বারা আমরা নিজেকে অপমানিত করি , এবং উপযুক্ত ব্যক্তিকে সম্মান করাই যে আত্মসম্মান এ কথা আমরা মনেই করি না ।

কিন্তু অন্ধ ভক্তি অন্ধ মানুষের মতো অভ্যাসের পথ দিয়া অনায়াসে চলিয়া যায় । সকল দেশেই ইহার নজির আছে । বিলাতে একজন লর্ডের ছেলে সর্বতোভাবে অপদার্থ হইলেও অতি সহজেই যোগ্য লোকের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিয়া থাকে ।

যাহাকে অনেকদিন অনেকে পূজা করিয়া আসিতেছে তাহাকে ভক্তি করিবার জন্য কোনো ভক্তিজনক গুণ বা ক্ষমতাবিচারের প্রয়োজনই হয় না । এমন - কি , সে স্থলে অভক্তির প্রত্যক্ষ কারণ থাকিলেও তাহার পদমূলে অর্ঘ্য আপনি আসিয়া অকৃষ্ট হয় ।

এইরূপ আমাদের মনের মধ্যে স্বভাবতই অনেকটা পরিমাণে জড়ধর্ম আছে । সেই কারণে আমাদের মন অভ্যাসের গড়ানো পথে মোহের আকর্ষণে আপনিই পাথরের মতো গড়াইয়া পড়ে , যুক্তি তাহার মাঝখানে বাধা দিতে আসিলে যুক্তি চূর্ণ হইয়া যায় ।

সভ্যতার মধ্যে সেই জাগ্রত শক্তি আছে যাহা আমাদের মনের স্বাভাবিক জড়ত্বের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করিবার জন্য আমাদিগকে উৎসাহিত করে ; যাহা আমাদিগকে কঠিন প্রমাণের পর বিশ্বাস করিতে বলে , যাহা আমাদিগকে শিক্ষিত রুচির দ্বারা উপভোগ করিতে প্রবৃত্ত করে , যাহা আমাদিগকে পরীক্ষিত যোগ্যতার নিকট ভক্তিনম্র হইতে উপদেশ দেয় , যাহা এইরূপে ক্রমশই আমাদের সচেষ্ট মনকে নিশ্চেষ্ট জড়বন্ধনের জাল হইতে উদ্ধার করিতে থাকে । এই অশ্রান্ত সভ্যতাশক্তির উত্তেজনাতেই য়ুরোপখণ্ডে ভক্তিবৃত্তির জড়ত্বকে সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করিতে না পারিলেও তাহাকে নিন্দা করিয়া থাকে । ইংরেজ একজন লর্ডকে সুদ্ধমাত্র লর্ড বলিয়াই বিশেষ ভক্তি না করিয়া থাকিতে পারে না এবং সেইসঙ্গে এইরূপ অযোগ্য ভক্তিকে “স্নবিসনেস” বলিয়া লাঞ্ছিত করে । ক্রমশ ইহার ফল দুই দিকেই ফলে—অর্থাৎ আভিজাত্যের প্রতি সাধারণ লোকের অসংগত ভক্তি শিথিল হয় এবং অভিজাতগণও এই বরাদ্দ ভক্তির প্রতি নির্ভর করিয়া কোনো নিন্দনীয় কাজ করিতে সাহস করেন না ।

এই শক্তির বলে অন্ধ রাজভক্তির মোহপাশ ছেদন করিয়া য়ুরোপ কেমন করিয়া আপনি রাজা হইয়া উঠিতেছে তাহা কাহারো অগোচর নাই । পুরোহিতের প্রতি অন্ধভক্তির বিরুদ্ধেও য়ুরোপীয় সভ্যতার মধ্যে একটা বিদ্রোহী শক্তি কাজ করিতেছে ।

জনসমাজে স্বাধীন ক্ষমতাবিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সম্প্রতি য়ুরোপে টাকার থলি একটা পূজার বেদী অধিকার করিবার উপক্রম করিতেছে সন্দেহ নাই । কিন্তু সাহিত্যে তাহা সর্বদা উপহসিত । কার্লাইল প্রভৃতি নমস্বীগণই হার

বিরুদ্ধে রক্তধ্বজা আন্দোলন করিতেছেন ।

যে ক্ষমতার কাছে মস্তক নত করিলে মস্তকের অপমান হয় , যেমন টাকা , পদবী , গায়ের জোর এবং অমূলক প্রথা—যাহাকে ভক্তি করিলে ভক্তি নিষ্ফলা হয় , অর্থাৎ চিত্তবৃত্তির প্রসার না ঘটিয়া কেবল সংকোচ ঘটে তাহার দুর্দান্ত শাসন হইতে মনকে স্বাধীন ও ভক্তিকে মুক্ত করা মনুষ্যত্ব রক্ষার প্রধান সাধনা ।

ভক্তির দ্বারা যে - বিনতি আনয়ন করে সে - বিনতি সকল ক্ষেত্রেই শোভন নহে । এই বিনতি , কেবল গ্রহণ করিবার শিক্ষা করিবার , মাহাত্ম্যপ্রভাবের নিকট আপনার প্রকৃতিকে সাষ্টাঙ্গে অনুকূল করিবার জন্য । কিন্তু অমূলক বিনতি , অস্থানে বিনতি সেই কারণেই দুর্গতি আনয়ন করে । তাহা হীনকে ভক্তি করিয়া হীনতা লাভ করে , তাহা অযোগ্যের নিকট নত হইয়া অযোগ্যতার জন্য আপনাকে অনুকূল করিয়া রাখে ।

ভক্তি আমাদিগকে ভক্তিভাজনের আদর্শের প্রতি স্বতঃ আকর্ষণ করে বলিয়াই সজীব সভ্যসমাজে কতকগুলি কঠিন বিচার প্রচলিত আছে । সেখানে যে - লোকের এমন কোনো ক্ষমতা আছে যাহা সাধারণের দৃষ্টি ও শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে তাহাকে সমাজ সকল বিষয়েই নিষ্কলঙ্ক হইতে প্রত্যাশা করে । যে লোক রাজনীতিতে শ্রদ্ধেয় সেলোক ধর্মনীতিতে হেয় হইলে সাধারণ দুর্নীতিপর লোক অপেক্ষা তাহাকে অনেক বেশি নিন্দনীয় হইতে হয় ।

এক হিসাবে ইহার মধ্যে কিঞ্চিৎ অন্যায় আছে । কারণ , ক্ষমতা সর্বতোব্যাপী হয় না , রাষ্ট্রনীতিতে যাহার বিচক্ষণতা , তাহার ক্ষমতা এবং চরিত্রের অপর অংশ সাধারণ লোকের অপেক্ষা যে উন্নত হইবেই এমন কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম নাই , অতএব সাধারণ লোককে যে - আদর্শে বিচার করি , রাষ্ট্রনীতিতে বিচক্ষণ ব্যক্তিকে রাষ্ট্রনীতি ব্যতীত অন্য অংশে সেই আদর্শে বিচার করাই উচিত । কিন্তু সমাজ কেবলমাত্র আত্মরক্ষার জন্য এ সম্বন্ধে কিয়ৎ পরিমাণে অবিচার করিতে বাধ্য ।

কারণ , পূর্বেই বলিয়াছি ভক্তির দ্বারা মন গ্রহণ করিবার অনুকূল অবস্থায় উপনীত হয় । এক অংশ লইব এবং অপর অংশ লইব না এমন বিচক্ষণশক্তি তাহার থাকে না । কোনো সূত্রে যে - লোক আমার ভক্তি আকর্ষণ করে , অলক্ষে , নিজের অজ্ঞাতসারে আমি তাহার অনুকরণ করিতে থাকি । ভক্তির ধর্মই এই ।

কিন্তু যে - বিষয়ে কোনো লোক অসাধারণ , ঠিক সেই বিষয়েই সাধারণ লোকের পক্ষে তাহার অনুকরণ দুঃসাধ্য । সুতরাং যে - অংশে সে সাধারণ লোকের অপেক্ষা উচ্চ নহে , এমন - কি , যে - অংশে তাহার দুর্বলতা , সেই অংশেরই অনুকরণ দেখিতে দেখিতে ব্যাপ্ত এবং সফল হইয়া উঠে । এইজন্য যে - লোক এক বিষয়ে মহৎ সে - লোক অন্য বিষয়ে হীন হইলে সমাজ প্রথমত তাহার এক বিষয়ের মহত্ত্বও অস্বীকার করিতে চেষ্টা করে , তাহাতে যদি কৃতকার্য না হয় তবে তাহার হীনতার প্রতি সাধারণ হীনতা অপেক্ষা গাঢ়তর কলঙ্ক আরোপ করে । আত্মরক্ষার জন্য সভ্যসমাজের এইরূপ চেষ্টা । যে লোক আসাধারণ , তাহাকে সংশোধন করিবার জন্য ততটা নহে , কিন্তু যাহারা সাধারণ লোক তাহাদিগকে ভক্তির কুফল হইতে রক্ষা করিবার জন্য । অহংকারের কুফল সম্বন্ধে নীতিশাস্ত্রমাত্রেই আমাদিগকে সতর্ক করিয়া রাখে । অহংকারে লোকের পতন হয় কেন । প্রথম কারণ , নিজের বড়োত্ব সম্বন্ধে অতিবিশ্বাস থাকাতে সে পরকে ঠিকমত জানিতে পারে না ; যে - সংসারে পাঁচজনের সহিত বাস করিতে ও কাজ করিতে হয় সেখানে নিজের তুলনায় অন্যকে যথার্থরূপে জানিতে পারিলে তবেই সকল বিষয়ে সফলতা লাভ করা সম্ভব । চীনদেশ আত্মাভিমানের প্রবলতায় জাপানকে চিনিতে পারে নাই , তাই তাহার এমন অকস্মাৎ দুর্গতি ঘটিল । জার্মানির সহিত যুদ্ধের পূর্বে ফ্রান্সেরও সেই দশা ঘটিয়াছিল । আর অতিদর্পে হতা লঙ্কা , এ কথা আমাদের দেশে প্রসিদ্ধ । ইংরাজিতে একটা প্রবাদ আছে , জ্ঞানই বল । কী গৃহে কী কর্মক্ষেত্রে পরের সম্বন্ধে ঠিকমত জ্ঞানই আমাদের প্রধান বল । অহংকার সেই সম্বন্ধে অজ্ঞতা আনয়ন করিয়া আমাদের দুর্বলতার প্রধান কারণ হইয়া থাকে ।

অহংকারের আর - এক বিপদ , তাহা সংসারকে আমাদের প্রতিকূলে দাঁড় করায় । যিনি যত বড়ো লোকই হোন - না কেন , সংসারের কাছে নানা বিষয়ে ঋণী ; যে - লোক সবিনয়ে সেই ঋণ স্বীকার করিতে না চাহে তাহার পক্ষে ঋণ পাওয়া কঠিন হয় ।

কিন্তু সর্বাপেক্ষা বিপদ আর - একটি আছে । বড়োকে বড়ো বলিয়া জানায় একটি আধ্যাত্মিক আনন্দ আছে । আত্মার বিস্তার হয় বলিয়া সে - আনন্দ । অহংকার আমাদিগকে নিজের সংকীর্ণতার মধ্যে বদ্ধ করিয়া রাখে ; যাহার ভক্তি নাই , সে জানে না অহংকারের অধিকার কত সংকীর্ণ ; যাহার ভক্তি আছে সেই জানে আপনার বাহিরে যে - বৃহত্ত্ব যে - মহত্ত্ব তাহাই অনুভব করাতেই আত্মার মুক্তি ।

এইজন্য বৈষয়িক এবং আধ্যাত্মিক উভয় হিসাবেই অহংকারের এত নিন্দা ।

কিন্তু অযথা ভক্তিও যে অহংকারের মতো সর্বতোভাবে দূষ্য , নীতিশাস্ত্রে সে কথার উল্লেখ থাকা উচিত । অন্ধ ভক্তিও পরের সম্বন্ধে আমাদের অজ্ঞতার কারণ হয় । এবং অযোগ্য ভক্তিতে আমাদিগকে যদি আপনার সমকক্ষ অথবা আপনার অপেক্ষা হীনের নিকট নত করে , তবে তাহাতে যে দীনতা উপস্থিত করে তাহা অহংকারের সংকীর্ণতা অপেক্ষা অল্প হেয় নহে ।

এইজন্য ইংরেজসমাজে অভিমানকে অহংকারের মতো নিন্দনীয় বলে না । অভিমান না থাকিলে মনুষ্যত্বের হানি হয় , এ কথা তাহারা স্বীকার করে ।

যাহার মনুষ্যত্বের অভিমান আছে , সে কখনোই অযোগ্য স্থানে আপনাকে নত করিতে পারে না । তাহার ভক্তিবৃত্তি যদি চরিতার্থ চায় তা তবে সে যেখানে - সেখানে লুটাইয়া পড়ে না—সে যথোচিত সন্ধান ও প্রমাণের দ্বারা যথার্থ ভক্তিভাজনকে বাহির করে ।

কিন্তু আমরা ভক্তিপ্রবণ জাতি । ভক্তি করাকেই আমরা ধর্মাচরণ বলিয়া থাকি ; কাহাকে ভক্তি করি তাহা বিচার করা আমাদের পক্ষে বাহুল্য ।

আমাদের সৎ - প্রবৃত্তিরও পথ যদি অত্যন্ত অবাধ হয় , তাহাতে ভালো ফল হয় না । তাহার বল , তাহার সচেষ্টতা , তাহার আধ্যাত্মিক উজ্জ্বলতা রক্ষার জন্য , তাহাকে অমোঘ হইবার জন্য , বাধার সহিত তাহার সংগ্রাম আবশ্যক ।

যেমন বৈজ্ঞানিক সত্য নির্ণয় করিতে হইলে তাহাকে পদে পদে সংশয়ের দ্বারা বাধা দিতে হয় , আপাতদৃষ্টিতে বিশ্বসাধারণের কাছে যাহা অসন্দিগ্ধ সত্য বলিয়া খ্যাত , তাহাকেও কঠিন প্রমাণের দ্বারা বারংবার বিচিত্রভাবে পরীক্ষা করিয়া দেখিতে হয় । যে লোক অতিব্যগ্রতার সহিত তাড়াতাড়ি আপনার প্রশ্নের উত্তর পাইতে চায় তাহার উত্তর জানিবার ব্যাকুলতা সহজে পরিতৃপ্ত হইতে পারে , কিন্তু অধিকাংশ স্থলেই সে ভুল উত্তর পায় । বৈজ্ঞানিকের ব্যাকুলতা সহজে নিবৃত্ত হইতে পায় না , কিন্তু বহু কষ্টে বহু বাধা অতিক্রম করিয়া সে যে - উত্তরটুকু পায় তাহা খাঁটি । এখানে যে - কোনো প্রকারে হউক জিজ্ঞাসাবৃত্তির নিবৃত্তির মুখ্য লক্ষ্য হওয়া উচিত নহে , সত্যনির্ণয়ই জিজ্ঞাসার পরিণাম । তেমনি , তাড়াতাড়ি কোনো প্রকারে ভক্তিবৃত্তির পরিতৃপ্তির সাধনই ভক্তির সার্থকতা নহে , বরঞ্চ কোনোমতে আপনাকে পরিতৃপ্ত করিবার আগ্রহে সে আপনাকে ভ্রান্ত পথে লইয়া যায় । এইরূপে সে মিথ্যা দেবতা , আত্মাবমান ও সহজ সাধনার সৃষ্টি করিতে থাকে । মহত্ত্বের ধারণাই ভক্তির লক্ষ্য তা সে যতই কঠিন হউক ; আত্ম - পরিতৃপ্তি নহে , তা সে যতই সহজ ও সুখকর হউক ।

জিজ্ঞাসাবৃত্তির পথে বুদ্ধিবিচারই প্রধান আবশ্যক বাধা । সেইসঙ্গে একটা অভিমানও আছে । অভিমান বলে , আমাকে ফাঁকি দিতে পারিবে না । আমি এমন অপদার্থ নহি । যাহা - তাহাকে আমি সত্য বলিয়া মানিতে পারি না । আগে আমার সমস্ত সংশয় পরাস্ত করো , তবেই আমি সত্যকে সত্য বলিয়া গ্রহণ করিতে পারি ।

ভক্তিপথেও সেই বুদ্ধিবিচার ও অভিমানই অত্যাবশ্যক বাধা । সেই বাধা থাকিলে তবেই যথার্থ ভক্তিভাজনকে আশ্রয় করিয়া ভক্তি আপনাকে চরিতার্থ করে । অভিমান সহজে নাথা নত হইতে দেয় না । যখন সে আত্মসমর্পণ করে তখন ভক্তিভাজনের পরীক্ষা হইয়া গেছে , রামচন্দ্র তখন ধনুক ভাঙিয়া তবে তাঁহার বলের প্রমাণ দিয়াছেন । সেই বাধা না থাকিলে ভক্তি অলস হইয়া যায় , অন্ধ হইয়া যায় , কলের পুতুলের মতো নির্বিচারে ক্ষণে ক্ষণে মাথা নত করিয়া সে আপনাকে কৃতার্থ জ্ঞান করে । এইরূপে ভক্তি অধ্যাত্মশক্তি হইতে মোহে পরিণত হয় ।

অনেক সময় আমরা ভুল বুঝিয়া ভক্তি করি । যাহাকে মহৎ মনে করি সে হয়তো মহৎ নয় । কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আমার কল্পনায় সে মহৎ , ততক্ষণ তাহাকে ভক্তি করিলে ক্ষতির কারণ অল্পই আছে ।

ক্ষতির কারণ কিছু নাই তাহা নয় । পূর্বেই বলিয়াছি যাহাকে মহৎ বলিয়া ভক্তি করি , জ্ঞাত এবং অজ্ঞাতসারে তাহার অনুকরণে প্রবৃত্ত হই । যে - লোক প্রকৃত মহৎ নহে , কেবল আমাদের কল্পনায় ও বিশ্বাসে মহৎ , অন্ধভাবে তাহার আচরণের অনুকরণ আমাদের পক্ষে উন্নতিকর নহে ।

কিন্তু আমাদের দেশে , আশ্চর্যের বিষয় এই যে , আমরা ভুল বুঝিয়াও ভক্তি করি । আমরা যাহাকে হীন বলিয়া জানি , তাহার পদধূলি অকৃত্রিম ভক্তিভরে মস্তকে ধারণ করিতে ব্যগ্র হই । ইহা অপেক্ষা আত্মাবমাননা কল্পনা করা যায় না ।

সৈন্যগণকে যেমন মরিবার মুখে লইয়া যাইতে হইলে বহুদিনের কঠিন চর্চায় যন্ত্রবৎ বশ্যতা অভ্যাস করাইয়া লইতে হয় তেমনি পদে পদে আমাদের জাতিকে বিনাশের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত করা হইয়াছে । আমাদের শাস্ত্র আমাদের আচার আমাদিগকে বিশ্ব - জগতের কাছে নত এবং বশীভূত করিয়া রাখিয়াছে ।

আমাদের দেশে মোহান্তের মহৎ , পুরোহিতের পবিত্র এবং দেবচরিত্রের উন্নত হওয়ার প্রয়োজন হয় না , কারণ আমরা ভক্তি লইয়া প্রস্তুত রহিয়াছি । যে - মোহান্ত জেলে যাইবার যোগ্য তাহার চরণামৃত পান করিয়া আমরা আপনাকে অপমানিত জ্ঞান করি না , যে - পুরোহিতের চরিত্র বিশুদ্ধ নহে এবং যে - লোক পূজানুষ্ঠানের মন্ত্রগুলির অর্থ পর্যন্তও জানে না তাহাকে ইষ্ট গুরুদেব বলিয়া স্বীকার করিতে আমাদের মুহূর্তের জন্যও কুণ্ঠাবোধ হয় না , এবং আমাদেরই দেশে দেখা যায় , যে - সকল দেবতার পুরাণবর্ণিত আচরণ লক্ষ করিয়া আলাপে ও প্রচলিত কাব্যে ও গানে অনেক স্থলে নিন্দা ও পরিহাস করি , সেই দেবতাকেই আমরা পূর্ণ ভক্তিতে পূজা করিয়া থাকি ।

সুতরাং এ স্থলে সহজেই মনে প্রশ্ন উঠে , কেন পূজা করি । তাহার এক উত্তর এই যে , অভ্যাসবশত অর্থাৎ মনের জড়ত্ববশত ; দ্বিতীয় উত্তর এই যে , ভক্তিজনক গুণের জন্য নহে , পরন্তু শক্তি কল্পনা করিয়া এবং সেই শক্তি হইতে ফল কামনা করিয়া ।

আমাদের উদ্‌ধৃত শ্লোকের প্রথমেই আছে , “ ইষ্টি আর পুরোহিত যাহা হতে সর্বস্থিত । ” ইহাতেই বুঝা যাইতেছে গুরু ও পুরোহিতের মধ্যে আমরা একটা গূঢ় শক্তি কল্পনা করিয়া থাকি ; তাঁহাদের শিক্ষা , চরিত্র ও আচরণ যেমনই হউক তাঁহারা আমাদের সাংসারিক মঙ্গলের প্রধান কারণ এবং তাঁহাদের প্রতি ভক্তিতে লাভ ও অভক্তিতে লোকসান আছে , এই বিশ্বাস আমাদের মাথাকে তাঁহাদের পায়ের কাছে নত করিয়া রাখিয়াছে । কোনো কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে এ বিশ্বাস এতদূর পর্যন্ত গিয়াছে যে , তাঁহারা গৃহধর্মনীতির সুস্পষ্ট ব্যভিচার দ্বারাও গুরুভক্তিকে অন্যায় প্রশ্রয় দিয়া থাকেন।

দেবতা সম্বন্ধেও সে কথা খাটে । দেবচরিত্র আমাদের আদর্শ চরিত্র হইবে , এমন আবশ্যক নাই । দেবভক্তিতে ফল আছে , কারণ দেবতা শক্তিমান।

ব্রাহ্মণ সম্বন্ধেও তাহাই । ব্রাহ্মণ দুশ্চরিত্র নরাধাম হইলেও ব্রাহ্মণ বলিয়াই পূজ্য । ব্রাহ্মণের কতকগুলি নিগূঢ় শক্তি আছে । তাঁহাদের প্রসাদে ও বিরাগে আমাদের ভালো মন্দ ঘটিয়া থাকে । এরূপ ভক্তিতে ভক্ত ও ভক্তিপাত্রের মধ্যে আধ্যাত্মিক সম্বন্ধ থাকে না , দেনা - পাওনার সম্বন্ধই দাঁড়াইয়া যায় । সেই সম্বন্ধে ভক্তিপাত্রকেও উচ্চ হইতে হয় না এবং ভক্তও নীচতা লাভ করে ।

কিন্তু আমাদের দেবভক্তি সম্বন্ধে আধুনিক শিক্ষিত অনেকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম তর্ক করেন । তাঁহারা বলেন , ঈশ্বর যখন সর্বজ্ঞ সর্বব্যাপী তখন ঈশ্বর বলিয়া আমরা যাঁহাকেই পূজা করি , ঈশ্বরই সে - পূজা গ্রহণ করেন । অতএব এরূপ ভক্তি নিষ্ফল নহে ।

পূজা যেন খাজনা দেওয়ার মতো ; স্বয়ং রাজার হস্তেই দিই আর তাঁহার তহসিলদারের হস্তেই দিই , একই রাজভাণ্ডারে গিয়া জমা হয় ।

দেবতার সহিত দেনা - পাওনার সম্বন্ধ আমদের মনে এমনই বদ্ধমূল হইয়া গিয়াছে যে , পূজার দ্বারা ঈশ্বরের যেন একটা বিশেষ উপকার করিলাম এবং তাহার পরিবর্তে একটা প্রত্যুৎপকার আমার পাওনা রহিল , ইহাই ভুলিতে না পারিয়া আমরা দেবভক্তি সম্বন্ধে এমন দোকানদারির কথা বলিয়া থাকি । পূজাটা দেবতার হস্তগত হওয়াই যখন বিষয় , এবং সেটা ঠিকমত তাঁহার ঠিকানায় পৌঁছিলেই যখন আমার কিঞ্চিৎ লাভ আছে , তখন যত অল্প ব্যয়ে অল্প চেষ্টায় সেটা চালান করা যায় ধর্ম - ব্যবসায়ে ততই আমার জিত । দরকার কী ঈশ্বরের স্বরূপ ধারণার চেষ্টায় , দরকার কী কঠোর সত্যানুসন্ধানে; সম্মুখ কাষ্ঠ প্রস্তর যাহা উপস্থিত থাকে তাহাকে ঈশ্বর বলিয়া পূজা নিবেদন করিয়া দিলে যাঁহার পূজা তিনি আপনি ব্যগ্র হইয়া আসিয়া হাত বাড়াইয়া লইবেন।

আমাদের পূরাণে ও প্রচলিত কাব্যে যেরূপ বর্ণনা আছে , তাহাতে মনে হয় যেন দেবতারা আপনাদের পূজা গ্রহণের জন্য মৃতদেহের উপর শকুনি - গৃধিনীর ন্যায় কাড়াকাড়ি ছেঁড়াছিঁড়ি করিতেছেন । অতএব আমাদের নিকট হইতে ভক্তিগ্রহণের লোলুপতা যে ঈশ্বরেরই , এ কথা আমাদের শিক্ষিতসম্প্রদায়ের মনেও অলক্ষে বিরাজ করিতেছে ।

কিন্তু কী মনুষ্যপূজায় এবং কী দেবপূজায় , ভক্তি ভক্তেরই লাভ । যাঁহাকে ভক্তি করি তিনি না জানিলেও ক্ষতি নাই । কিন্তু তাঁহাকে আমার জানা চাই , তবেই আমার ভক্তির সার্থকতা । পূজ্য ব্যক্তির আদর্শকে আমাদের প্রকৃতির সহিত সম্পূর্ণ মিশাইয়া লইতে চাহিলে ভক্তি ছাড়া আর কোনো উপায় নাই । আমরা যাঁহাকে পূজা করি তাঁহাকেই যদি বস্তুত চাই তবে তাঁহার প্রকৃতির আদর্শ তাঁহার সত্যস্বরূপ একান্ত ভক্তিযোগে হৃদয়ে স্থাপনা করিতে হয় । সেরূপ অবস্থায় ফাঁকি দিতে স্বতই প্রবৃত্তি হয় না ; তাঁহার সহিত বৈসাদৃশ্য ও দূরত্ব যতই দীনত্বের সহিত অনুভব করি , ততই ভক্তি বাড়িয়া উঠিয়া ক্ষুদ্র আপনাকে তাঁহার সহিত লীন করিবার চেষ্টা করে ।

ইহাই ভক্তির গৌরব । ভক্তিরস সেই আধ্যাত্মিক রসায়নশক্তি যাহা ক্ষুদ্রকে বিগলিত করিয়া মহতের সহিত মিশ্রিত করিতে পারে ।

অতএব ঈশ্বরকে যখন ভক্তি করি তখন তদ্বারা তাঁহার ঐশ্বর্য বাড়ে না ,. আমরাই সেই রসস্বরূপের রাসায়নিক মিলন লাভ করি । আমাদের ঈশ্বরের আদর্শ যত মহৎ মিলনের আনন্দ ততই প্রগাঢ় , এবং তদ্বারা আত্মার প্রসার ততই বিপুল হইবে ।

ভক্তি আমরা যাঁহাকে করি , তাঁহাকে ছাড়া আর কাহাকেও পাই না । যদি গুরুকে ব্রহ্ম বলিয়া ভক্তি করি , তবে সে গুরুর আদর্শই আমাদের মনে অঙ্কিত হয় । ভক্তির প্রবলতায় সেই গুরুর মানস আদর্শ তাঁহার স্বাভাবিক আদর্শ অপেক্ষা কতকটা পরিমাণে আপনি বাড়িয়া যায় সন্দেহ নাই , কিন্তু তাহা হইতে স্বতন্ত্র হইতে পারে না ।

অস্থানে ভক্তি করিবার একটা মহৎ পাপ এই যে , যিনি যথার্থ পূজ্য , অযোগ্য পাত্রদের সহিত তাঁহাকে একাসনভুক্ত করিয়া দেওয়া হয় । দেবতায় উপদেবতায় প্রভেদ থাকে না ।

আমাদের দেশে এই অন্যায় মিশ্রণ সকল দিকেই ঘটিয়াছে । আমাদের দেশে অনাচার এবং পাপ এক কোঠায় পড়িয়া গেছে । ইতর জাতিকে স্পর্শ করাও পাপ , ইতর জাতিকে হত্যা করাও পাপ । নরহত্যা করিয়া সমাজে নিষ্কৃতি আছে কিন্তু গোহত্যা করিয়া নিষ্কৃতি নাই । অন্যায় করিয়া যবনের অন্ন মারিলে ক্ষমা আছে কিন্তু তাহার অন্ন গ্রহণ করিলে পাতক ।

প্রায়শ্চিত্ত - বিধিও তেমনি । তিলক রাজদ্রোহ অভিযোগে জেলে গিয়াছেন—সেখানে অনিবার্য রাজদণ্ডের বিধানে তাঁহাকে দূষিত অন্ন গ্রহণ করিতে হইয়াছে ; মাথা মুড়াইয়া গোঁফ কামাইয়া কঠিন প্রায়শ্চিত্ত বিধানের জন্য সমাজ তাঁহাকে আহ্বান করিতেছে । তিলক যে সত্য রাজদ্রোহী এ কথা কেহ বিশ্বাস করে না এবং যদি - বা করিত সেজন্য তাঁহাকে দণ্ডনীয় করিত না—কিন্তু যে অনিচ্ছাকৃত অনাচারে তাঁহার সাধু চরিত্রকে কিছুমাত্র স্পর্শ করে নাই তাহাই তাঁহার পক্ষে পাপ , এবং সে পাপের প্রায়শ্চিত্ত মস্তকমুণ্ডন ।

যে - সমস্ত পাপ অনাচার মাত্র নহে—যাহা মিথ্যাচরণ , চৌর্য , নিষ্ঠুরতা প্রভৃতি চরিত্রের মূলগত পাপ তাহারও খণ্ডন তিথিবিশেষে গঙ্গাস্নানে তীর্থযাত্রায় ।

অনাচার আচারের ত্রুটি এবং ধর্মনিয়মের লঙ্ঘনকে একত্র মিশ্রিত করিয়া আমরা এমনই একটি ঘোরতর জড়বাদ , এমনই নিগূঢ় নাস্তিকতায় উপনীত হইয়াছি ।

ভক্তিরাজ্যেও সেইরূপ মিশ্রণ ঘটাইয়া আমরা ভক্তির আধ্যাত্মিকতা নষ্ট করিয়াছি । সেইজন্যই আমরা বরঞ্চ সাধু শূদ্রকে ভক্তি করি না , কিন্তু অসাধু ব্রাহ্মণকে ভক্তি করি । আমরা প্রভাতসূর্যালোকিত হিমাদ্রিশিখরের প্রতি দৃক্‌পাত না করিয়া চলিয়া যাইতে পারি কিন্তু সিন্দুরলিপ্ত উপলখণ্ডকে উপেক্ষা করিতে পারি না ।

সত্য এবং শাস্ত্রের মধ্যেও আমরা এইরূপ একটা জটা পাকাইয়াছি । সমুদ্রযাত্রা উচিত কি না তাহা নির্ণয় করিতে ইহাই দেখা কর্তব্য যে , নূতন দেশ ও নূতন আচার ব্যবহার দেখিয়া আমাদের জ্ঞানের বিস্তার হয় কি না , আমাদের সংকীর্ণতা দূর হয় কি না , ভূখণ্ডের একটি ক্ষুদ্র সীমার মধ্যে কোনো জ্ঞানপিপাসু উন্নতি - ইচ্ছুক ব্যক্তিকে বলপুর্বক বদ্ধ করিয়া রাখিবার ন্যায্য অধিকার কাহারো আছে কি না । কিন্তু তাহা না দেখিয়া আমরা দেখিব , পরাশর সমুদ্র পার হইতে বলিয়াছেন কি না এবং অত্রি কী বলিয়া তাহার সমর্থন করিয়াছেন ।

বালবিধবাকে চিরকুমারী করিয়া রাখা ব্যক্তিবিশেষের পক্ষে নিদারুণ ও সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক কি না ইহা আমাদের দ্রষ্টব্য বিষয় নহে কিন্তু বহু প্রাচীনকালে সমাজের শিক্ষা আচার ও অবস্থার একান্ত পার্থক্যের সময় কোন্‌ বিধানকর্তা কী বলিয়াছেন তাহাই আলোচ্য ।

এমন বিপরীত বিকৃতি কেন ঘটিল । ইহার প্রধান কারণ এই যে , স্বাধীনতাতেই যে - সমস্ত প্রবৃত্তির প্রধান গৌরব তাহাদিগকেই বন্ধনে বদ্ধ করা হইয়াছে ।

অভ্যাস বা পরের নির্দেশবশত নহে , পরন্তু স্বাধীন বোধশক্তি যোগে ভক্তিবলে আমরা মহত্ত্বের নিকট আত্মসমর্পণ করি , তাহাই সার্থক ভক্তি ।

কিন্তু আশঙ্কা এই যে , যদি বোধশক্তি তোমার না থাকে । অতএব নিয়ম বাঁধিয়া দেওয়া গেল , অমুক সম্প্রদায়কে এই প্রণালীতে ভক্তি করিতেই হইবে । না করিলে সাংসারিক ক্ষতি ও পুরুষানুক্রমে নরকবাস ।

যে - ভক্তি স্বাধীন হৃদয়ের তাহাকে মৃত শাস্ত্রে রাখা হইল ; যে - ভক্তির প্রকৃত লাভ - ক্ষতি আমাদের অন্তঃকরণে আমাদের অন্তরাত্মায় তাহা সংসারের খাতায় ও চিত্রগুপ্তের কাল্পনিক খতিয়ানে লিখিত হইল ।

গাছ মাটিতে রোপণ করিলে তাহাকে গোরুতে খাইতে পারে , তাহাকে পথিকে দলন করিতে পারে , এই ভয়ে তাহাকে লোহার সিন্দুকে বন্ধ রাখা হইল । সেখানে সে নিরাপদে রহিল , কিন্তু তাহাতে ফল ধরিল না ; সজীব গাছ মৃত কাষ্ঠ হইয়া গেল ।

মানুষের বুদ্ধিকে যতক্ষণ স্বাধীনতা না দেওয়া যায় ততক্ষণ সে ব্যর্থ কিন্তু যদি সে ভুল করে , অতএব তাহাকে বাঁধো ; আমি বুদ্ধিমান যে - ঘানিগাছ রোপণ করিলাম চোখে ঠুলি দিয়া সেইটেকে সে নিত্যকাল প্রদক্ষিণ করিতে থাক্‌ । স্বাস্থ্যতত্ত্ব সম্বন্ধে তাহাকে কোনোদিন মাথা ঘুরাইতে হইবে না—আমি ঠিক করিয়া দিলাম কোন্‌ তিথিতে মূলা খাইলে তাহার নরক এবং চিঁড়া খাইলে তাহার অক্ষয় ফল । তোমার মূলা ছাড়িয়া চিঁড়া খাইয়া তাহার কী উপকার হইল তাহার কোনো প্রমাণ নাই , কিন্তু যাহা অপকার হইল ইতিহাসে তাহা উত্তরোত্তর পুঞ্জীকৃত হইয়া উঠিতেছে ।

একটি সামান্য উদাহরণ এখানে উল্লেখযোগ্য । আমাদের দেশে যাহারা রেশম কীটের চাষ করে তাহাদের মধ্যে একটা প্রবাদ আছে যে , নিরামিষ আহার , নিয়ম পালন ও গঙ্গাজল প্রভৃতি দ্বারা নিজেকে সর্বদা পবিত্র না রাখিলে রেশমব্যবসায়ীর সাংসারিক অমঙ্গল ঘটে ।

শিক্ষিত ব্যক্তিরা বলিয়া উঠিবেন , পাছে মলিনতা দ্বারা রেশমকীটের মধ্যে সংক্রামক রোগবীজ প্রবেশ করিয়া ফসল নষ্ট হয় এইজন্য বুদ্ধিমান কর্তৃক এইরূপ প্রবাদ প্রচারিত হইয়াছে । কিন্তু চাষাকে প্রকৃত তত্ত্ব না বুঝাইয়া দিয়া তাহার বুদ্ধিকে চিরকালের মতো অন্ধ করিয়া পরিণামে বিষময় ফল হয় । চাষা অনির্দিষ্ট অমঙ্গল আশঙ্কায় নিজে নিয়ম পালন করে কিন্তু কীটদের সম্বন্ধে নিয়ম রক্ষা করে না—স্নানপানাদির দ্বারা নিজে পবিত্র থাকে কিন্তু কীটের ঘরে এক পাতায় তিন দিন চলিতেছে , মলিনতা সঞ্চিত হইতেছে তাহাতে দৃষ্টি নাই ।

শোয়া বসা চলা ফিরা কোনো ক্ষুদ্র বিষয়েই যাহাকে স্বাধীন বুদ্ধি চালনা ও নিজের শুভাশুভ বিচার করিতে হয় না তাহার কাছে অদ্য বৈজ্ঞানিক সত্য বুঝাইতে গিয়া মাথায় করাঘাত করিয়া ফিরিয়া আসিতে হয় ।

এইরূপে নীতি , ভক্তি ও বুদ্ধি—স্বাধীনতাতেই যাহার বল , যাহার জীবন , স্বাধীনতাতেই যাহার যথার্থ স্বরূপ রক্ষিত ও বিকশিত হয় , তাহাদিগকে সর্বপ্রকার স্বাভাবিক আপদ হইতে রক্ষা করিবার জন্য সযত্নে মৃত্যু ও বিকৃতির মধ্যে লইয়া যাওয়া হইয়াছে । ইহাতে আমাদের মানসিক প্রকৃতির এমনই নিদারুণ জড়ত্ব জন্মিয়াছে যে , যাহাকে আমরা জ্ঞানে জানি ভক্তির অযোগ্য তাহাকেও প্রথার অভ্যাসে ভক্তি করিতে সংকোচমাত্র অনুভব করি না ।