সমাজ/আচারের অত্যাচার

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


“ ইংরেজিতে পাউণ্ড আছে , শিলিং আছে , পেনি আছে , ফার্দিং আছে—আমাদের টাকা আছে , আনা আছে , কড়া আছে , ক্রান্তি আছে , দন্তি আছে , কাক আছে , তিল আছে। ... ইংরেজ এবং অন্যান্য জাতি ক্ষুদ্রতম অংশ ধরে না , ছাড়িয়া দেয় ; আমরা ক্ষুদ্রতম অংশ ধরি , ছাড়ি না ... হিন্দু বলেন যে ধর্মজগতেও কড়াক্রান্তিটি বাদ যায় না , স্বয়ং ভগবান কড়াক্রান্তিটিও ছাড়েন না । তাই বুঝি হিন্দু সামাজিক অনুষ্ঠানেও কড়াক্রান্তি পর্যন্ত ছাড়েন নাই , কড়াক্রান্তিটির ভাবনাও ভাবিয়া গিয়াছেন , ব্যবস্থাও করিয়া গিয়াছেন । ”

— সাহিত্য , ৩য় ভাগ , ৭ম সংখ্যা

সকল দিক সমানভাবে রক্ষা করা মানুষের পক্ষে দুঃসাধ্য । এইজন্য মানুষকে কোনো - না - কোনো বিষয়ে রফা করিয়া চলিতেই হয় ।

কেবলমাত্র যদি থিয়োরি লইয়া থাকিতে হয় , তাহা হইলে তুমি কড়া , ক্রান্তি , দন্তি , কাক , সূক্ষ্ম , অতিসূক্ষ্ম এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভগ্নাংশ লইয়া , ঘরে বসিয়া , পাটিগণিতের বিচিত্র সমস্যা পূরণ করিতে পার । কিন্তু কাজে নামিলেই অতিসূক্ষ্ম অংশগুলি ছাঁটিয়া চলিতে হয় , নতুবা হিসাব মিলাইতে মিলাইতে কাজ করিবার সময় পাওয়া যায় না ।

কারণ , সীমা তো এক জায়গায় টানিতেই হইবে । তুমি সূক্ষ্মহিসাবী , দন্তি কাক পর্যন্ত হিসাব চালাইতে চাও , তোমার চেয়ে সূক্ষতর হিসাবী বলিতে পারেন , কাকে গিয়াই বা থামিব কেন । বিধাতার দৃষ্টি যখন অনন্ত সূক্ষ্ম , তখন আমাদের জীবনের হিসাবও অনন্ত সূক্ষ্মের দিকে টানিতে হইবে । নহিলে তাঁহার সম্পূর্ণ সন্তোষ হইবে না - তিনি ক্ষমা করিবেন না ।

বিশুদ্ধ তর্কের হিসাবে ইহার বিরুদ্ধে কাহারো কথা কহিবার জো নাই—কিন্তু কাজের হিসাবে দেখিতে গেলে , জোড়হস্তে বিনীতস্বরে আমরা বলি , “ প্রভু , আমাদের অনন্ত ক্ষমতা নাই , সে তুমি জান । আমাদিগকে কাজও করিতে হয় এবং তোমার কাছে হিসাবও দিতে হয় । আমাদের জীবনের সময়ও অল্প এবং সংসারের পথও কঠিন । তুমি আমাদিগকে দেহ দিয়াছ , মন দিয়াছ , আত্মা দিয়াছ ; ক্ষুধা দিয়াছ , বুদ্ধি দিয়াছ , প্রেম দিয়াছ ; এবং এই - সমস্ত বোঝা লইয়া আমাদিগকে সংসারের সহস্র লোকের সহস্র বিষয়ের আবর্তের মধ্যে ফেলিয়া দিয়াছ । ইহার উপরেও পণ্ডিতেরা ভয় দেখাইতেছেন , তুমি হিন্দুর দেবতা অতি কঠিন , তুমি কড়াক্রান্তি দন্তিকাকের হিসাবও ছাড় না । তা যদি হয় , তবে তো হিন্দুকে সংসারের কোনো প্রকৃত কাজে , মানবের কোনো বৃহৎ অনুষ্ঠানে যোগ দিবার অবসর দেওয়া হয় না । তবে তো তোমার বৃহৎ কাজ ফাঁকি দিয়া , কেবল তোমার ক্ষুদ্র হিসাব কষিতে হয় । তুমি যে শোভাসৌন্দর্যবৈচিত্র্যময় সাগরাম্বরা পৃথিবীতে আমাদিগকে প্রেরণ করিয়াছ , সে - পৃথিবী তো পর্যটন করিয়া দেখা হয় না , তুমি যে উন্নত মানববংশে আমাদিগকে জন্মদান করিয়াছ , সেই মানবদের সহিত সম্যক্‌ পরিচয় এবং তাহাদের দুঃখমোচন , তাহাদের উন্নতিসাধনের জন্য বিচিত্র কর্মানুষ্ঠান , সে তো অসাধ্য হয় । কেবল ক্ষুদ্র পরিবারে ক্ষুদ্র গ্রামে বদ্ধ হইয়া , গৃহকোণে বসিয়া , গতিশীল বিপুল মানবপ্রবাহ ও জগৎসংসারের প্রতি দৃক্‌পাত না করিয়া আপনার ক্ষুদ্র দৈনিক জীবনের কড়াক্রান্তি গণিতে হয় । ইহাকে স্পর্শ করিব না , তাহার ছায়া মাড়াইব না , অমুকের অন্ন খাইব না , অমুকের কন্যা গ্রহণ করিব না , এমন করিয়া উঠিব , অমন করিয়া বসিব , তেমন করিয়া চলিব , তিথি নক্ষত্র দিন ক্ষণ লগ্ন বিচার করিয়া হাত পা নাড়িব , এমন করিয়া কর্মহীন ক্ষুদ্র জীবনটাতে টুকরা টুকরা করিয়া কাহনকে কড়াকড়িতে ভাঙিয়া স্তূপাকার করিয়া তুলিব , এই কি আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য । হিন্দুর দেবতা , এই কি তোমার বিধান যে , আমরা কেবলমাত্র ‘হিঁদু' হইব , মানুষ হইব না । ”

ইংরেজিতে একটা কথা আছে , “ পেনি ওয়াইজ পাউণ্ড ফুলিশ”—বাংলায় তাহার তর্জমা করা যাইতে পারে , “ কড়ায় কড়া কাহনে কানা । ” অর্থাৎ কড়ার প্রতি অতিরিক্ত দৃষ্টি রাখিতে গিয়া কাহনের প্রতি ঢিল দেওয়া । তাহার ফল হয় , “ বজ্র আঁটন ফসকা গিরো”—প্রাণপণ আঁটুনির ত্রুটি নাই কিন্তু গ্রন্থিটি শিথিল ।

আমাদের দেশেও হইয়াছে তাই । বিধিব্যবস্থা - আচরণবিচারের প্রতি অত্যধিক মনোযোগ করিতে গিয়া , মনুষ্যত্বের স্বাধীন উচ্চ অঙ্গের প্রতি অবহেলা করা হইয়াছে ।

সামাজিক আচার হইতে আরম্ভ করিয়া ধর্মনীতির ধ্রুব অনুশাসনগুলি পর্যন্ত সকলেরই প্রতি সমান কড়াক্কড় করাতে ফল হইয়াছে , আমাদের দেশে সমাজনীতি ক্রমে সুদৃঢ় কঠিন হইয়াছে কিন্তু ধর্মনীতি শিথিল হইয়া আসিয়াছে । একজন লোক গোরু মারিলে সমাজের নিকট নির্যাতন সহ্য করিবে এবং তাহার প্রায়শ্চিত্ত স্বীকার করিবে , কিন্তু মানুষ খুন করিয়া সমাজের মধ্যে বিনা প্রায়শ্চিত্তে স্থান পাইয়াছে এমন দৃষ্টান্তের অভাব নাই । পাছে হিন্দুর বিধাতার হিসাবে কড়াক্রান্তির গরমিল হয় , এইজন্য পিতা অষ্টমবর্ষের মধ্যেই কন্যার বিবাহ দেন এবং অধিক বয়সে বিবাহ দিলে জাতিচ্যুত হন ; বিধাতার হিসাব মিলাইবার জন্য সমাজের যদি এতই সূক্ষ্মদৃষ্টি থাকে তবে উক্ত পিতা নিজের উচ্ছৃঙ্খল চরিত্রের শত শত পরিচয় দিলেও কেন সমাজের মধ্যে আত্মগৌরব রক্ষা করিয়া চলিতে পারে । ইহাকে কি কাকদন্তির হিসাব বলে । আমি যদি অস্পৃশ্য নীচজাতিকে স্পর্শ করি , তবে সমাজ তৎক্ষণাৎ সেই দন্তিহিসাব সম্বন্ধে আমাকে সতর্ক করিয়া দেন , কিন্তু আমি যদি উৎপীড়ন করিয়া সেই নীচজাতির ভিটামাটি উচ্ছিন্ন করিয়া দিই , তবে সমাজ কি আমার নিকট হইতে সেই কাহনের হিসাব তলব করেন । প্রতিদিন রাগদ্বেষ লোভমোহ মিথ্যাচরণে ধর্মনীতির ভিত্তিমূল জীর্ণ করিতেছি , অথচ স্নান তপ বিধিব্যবস্থার তিলমাত্র ত্রুটি হইতেছে না । এমন কি দেখা যায় না ।

আমি বলি না যে , হিন্দুশাস্ত্রে ধর্মনীতিমূলক পাপকে পাপ বলে না । কিন্তু মনুষ্যকৃত সামান্য সামাজিক নিষেধগুলিকেও তাহার সমশ্রেণীতে ভুক্ত করাতে যথার্থ পাপের ঘৃণ্যতা স্বভাবতই হ্রাস হইয়া আসে । অত্যন্ত বৃহৎ ভিড়ের ভিতর শ্রেণীবিচার দুরূহ হইয়া উঠে । অস্পৃশ্যকে স্পর্শ করা এবং সমুদ্রযাত্রা হইতে নরহত্যা পর্যন্ত সকল পাপই আমাদের দেশে গোলে হরিবল দিয়া মিশিয়া পড়ে ।

পাপখণ্ডনেরও তেমনই শত শত সহজ পথ আছে । আমাদের পাপের বোঝা যেমন দেখিতে দেখিতে বাড়িয়া উঠে , তেমনই যেখানে - সেখানে তাহা ফেলিয়া দিবারও স্থান আছে । গঙ্গায় স্নান করিয়া আসিলাম , অমনি গাত্রের ধুলা এবং ছোটোবড়ো সমস্ত পাপ ধৌত হইয়া গেল । যেমন রাজ্যে বৃহৎ মড়ক হইলে প্রত্যেক মৃতদেহের জন্য ভিন্ন গোর দেওয়া অসাধ্য হয় , এবং আমীর হইতে ফকির পর্যন্ত সকলকে রাশীকৃত করিয়া এক বৃহৎ গর্তের মধ্যে ফেলিয়া সংক্ষেপে অন্ত্যেষ্টিসৎকার সারিতে হয় , আমাদের দেশে তেমনই খাইতে শুইতে উঠিতে বসিতে এত পাপ যে , প্রত্যেক পাপের স্বতন্ত্র খণ্ডন করিতে গেলে সময়ে কুলায় না ; তাই মাঝে মাঝে একেবারে ছোটোবড়ো সকলগুলাকে কুড়াইয়া অতি সংক্ষেপে এক সমাধির মধ্যে নিক্ষেপ করিয়া আসিতে হয় । যেমন বজ্র আঁটন তেমন ফসকা গিরো ।

এইরূপ পাপপুণ্য যে মনের ধর্ম , মানুষ ক্রমে ক্রমে সেটা ভুলিয়া যায় । মন্ত্র পড়িলে , ডুব মারিলে , গোময় খাইলে যে পাপ নষ্ট হইতে পারে এ বিশ্বাস মনে আনিতে হয় । কারণ , মানুষকে যদি মানুষের হিসাবে না দেখিয়া যন্ত্রের হিসাবে দেখ , তবে তাহারও নিজেকে যন্ত্র বলিয়া ভ্রম হইবে । যদি সামান্য লাভলোকসান ব্যাবসাবাণিজ্যিক ছাড়া আর কোনো বিষয়েই তাহার স্বাধীন বুদ্ধিচালনার অবসর না দেওয়া হয় , যদি ওঠাবসা মেলামেশা ছোঁওয়াখাওয়াও তাহার জন্য দৃঢ়নির্দিষ্ট হইয়া থাকে , তবে মানুষের মধ্যে যে একটা স্বাধীন মানসিক ধর্ম আছে সেটা ক্রমে ভুলিয়া যাইতে হয় । পাপপুণ্য সকলই যন্ত্রের ধর্ম , মনে করা অসম্ভব হয় না এবং তাহার প্রায়শ্চিত্তও যন্ত্রসাধ্য বলিয়া মনে হয় ।

কিন্তু অতিসূক্ষ্ম যুক্তি বলে , যদি মানুষের স্বাধীন বুদ্ধির প্রতি কিঞ্চিৎমাত্র নির্ভর করা যায় তবে দৈবাৎ কাকদন্তির হিসাব না মিলিতে পারে । কারণ , মানুষ ঠেকিয়া শেখে—কিন্তু তিলমাত্র ঠেকিলেই যখন পাপ , তখন তাহাকে শিখিতে অবসর না দিয়া নাকে দড়ি দিয়া চালানোই যুক্তিসংগত । ছেলেকে হাঁটিতে শিখাইতে গেলে পড়িতে দিতে হয় , তাহা অপেক্ষা তাহাকে বুড়াবয়স পর্যন্ত কোলে করিয়া লইয়া বেড়ানোই ভালো । তাহা হইলে তাহার পড়া হইল না , অথচ গতিবিধিও বন্ধ হইল না । ধূলির লেশমাত্র লাগিলে হিন্দুর দেবতার নিকট হিসাব দিতে হইবে , অতএব মনুষ্যজীবনকে তেলের মধ্যে ফেলিয়া শিশির মধ্যে নীতি - মিউজিয়ামের প্রদর্শনদ্রব্যের স্বরূপ রাখিয়া দেওয়াই সুপরামর্শ ।

ইহাকেই বলে কড়ার কড়া , কাহনে কানা । কী রাখিলাম আর কী হারাইলাম সে কেহ বিচার করিয়া দেখে না । কবিকঙ্কণে বাণিজ্যবিনিময়ে আছে -

শুকুতার বদলে মুকুতা দিবে

ভেড়ার বদলে ঘোড়া ।

আমরা পণ্ডিতেরা মিলিয়া অনেক যুক্তি করিয়া শুক্তার বদলে মুক্তা দিতে প্রস্তুত হইয়াছি । মানসিক যে স্বাধীনতা না থাকিলে পাপপুণ্যের কোনো অর্থই থাকে না , সেই স্বাধীনতাকে বলি দিয়া নামমাত্র পুণ্যকে তহবিলে জমা করিয়াছি ।

পাপপুণ্য - উত্থানপতনের মধ্য দিয়া আমাদের মনুষ্যত্ত্ব উত্তরোত্তর পরিস্ফুট হইয়া উঠিতে থাকে । স্বাধীনভাবে আমরা যাহা লাভ করি সে - ই আমাদের যথার্থ লাভ ; অবিচারে অন্যের নিকট হইতে যাহা গ্রহণ করি তাহা আমরা পাই না । ধূলিকর্দমের উপর দিয়া , আঘাতসংঘাতের মধ্য দিয়া , পতনপরাভব অতিক্রম করিয়া অগ্রসর হইতে হইতে যে - বল সঞ্চার করি , সেই বলই আমাদের চিরসঙ্গী । মাটিতে পদার্পণমাত্র না করিয়া , দুগ্ধফেনশুভ্র শয়ান থাকিয়া হিন্দুর দেবতার নিকটে জীবনের একটি অতিনিষ্কলঙ্ক হিসাব প্রস্তুত করিয়া দেওয়া যায়—কিন্তু সে - হিসাব কী । একটি শূন্য শুভ্র খাতা । তাহাতে কলঙ্ক নাই এবং অঙ্কপাত নাই । পাছে কড়াক্রান্তি - কাকদন্তির গোল হয় এইজন্য আয় ব্যয় স্থিতিমাত্র নাই ।

নিখুঁত সম্পূর্ণতা মনুষ্যের জন্য নহে । কারণ , সম্পূর্ণতার মধ্যে একটা সমাপ্তি আছে । মানুষ ইহজীবনের মধ্যেই সমাপ্ত নহে । যাঁহারা পরলোক মানেন না , তাঁহারাও স্বীকার করিবেন , একটি জীবনের মধ্যেই মানুষের উন্নতিসম্ভাবনার শেষ নাই ।

নিম্নশ্রেণীর জন্তুরা ভূমিষ্ঠকাল অবধি মানবশিশুর অপেক্ষা অধিকতর পরিণত । মানবশিশু একান্ত অসহায় । ছাগশিশুকে চলিবার আগে পড়িতে হয় না । যদি বিধাতার নিকট চলার হিসাব দিতে হয় , তবে ছাগশাবক কাকদন্তির হিসাব পর্যন্ত মিলাইয়া দিতে পারে । কিন্তু মনুষ্যের পতন কে গণনা করিবে ।

জন্তুদের জীবনের পরিসর সংকীর্ণ , তাহারা অল্পদূর গিয়াই উন্নতি শেষ করে—এইজন্য আরম্ভকাল হইতেই তাহারা শক্তসমর্থ । মানুষের জীবনের পরিধি বহুবিস্তীর্ণ , এইজন্য বহুকাল পর্যন্ত সে অপরিণত দুর্বল ।

জন্তুরা যে - স্বাভাবিক নৈপুণ্য লইয়া জন্মগ্রহণ করে ইংরেজিতে তাহাকে বলে ইন্‌স্‌টিংক্‌ট্‌ , বাংলায় তাহার নাম দেওয়া যাইতে পারে সহজ - সংস্কার । সহজ - সংস্কার , অশিক্ষিতপটুত্ব একেবারেই ঠিক পথ দিয়া চলিতে পারে , কিন্তু বুদ্ধি ইতস্তত করিতে করিতে ভ্রমের মধ্য দিয়া আপনার পথ সন্ধান করিয়া বাহির করে । সহজ - সংস্কার পশুদের , বুদ্ধি মানুষের । সহজ - সংস্কারের গম্যস্থান সামান্য সীমার মধ্যে , বুদ্ধির শেষ লক্ষ্য এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নাই ।

আবশ্যকের আকর্ষণ চতুষ্পার্শ্ব বাঁচাইয়া , পথঘাট দেখিয়া , ক্ষেত্র নিষ্কণ্টক করিয়া , সুবিধার পথ দিয়া আমাদিগকে স্বার্থপরতার সীমা পর্যন্ত লইয়া যায় ; প্রেমের আকর্ষণ আমাদিগকে সমস্ত গণ্ডীর বাহিরে লইয়া , আত্মবিসর্জন করাইয়া , কখনো ভূতলশায়ী কখনো অশ্রুসাগরে নিমগ্ন করে । আবশ্যকের সীমা আপনার মধ্যে , প্রেমের সীমা কোথায় কেহ জানে না । তেমনই , পূর্ব হইতে সমস্ত নির্দিষ্ট করিয়া , সমস্ত পতন সমস্ত গ্লানি হইতে রক্ষা করিয়া একটি নিরতিশয় সমতল সমাজের মধ্যে নিরাপদে জীবন চালনা করিলে , সে - জীবনের পরিসর নিতান্ত সামান্য হয় ।

আমরা মানবসন্তান বলিয়াই বহুকাল আমাদের শারীরিক মানসিক দুর্বলতা ; বহুকাল আমরা পড়ি , বহুকাল আমরা ভুলি , বহুকাল আমাদিগের শিক্ষা করিতে যায়—আমরা অনন্তের সন্তান বলিয়া বহুকাল ধরিয়া আমাদের আধ্যাত্মিক দুর্বলতা , পদে পদে আমাদের দুঃখ কষ্ট পতন । কিন্তু সে - ই আমাদের সৌভাগ্য , সে - ই আমাদের চিরজীবনের লক্ষণ , তাহাতেই আমাদিগকে বলিয়া দিতেছে , এখনো আমাদের বুদ্ধি ও বিকাশের শেষ হইয়া যায় নাই ।

শৈশবেই যদি মানুষের উপসংহার হইত , তাহা হইলে মানুষের অপরিস্ফুটতা সমস্ত প্রাণীসংসারে কোথাও পাওয়া যাইত না ; অপরিণত পদস্খলিত ইহজীবনেই যদি আমাদের পরিসমাপ্তি হয় , তবে আমরা একান্ত দুর্বল ও হীন তাহার আর সন্দেহ নাই । কিন্তু আমাদের বিলম্ববিকাশ , আমাদের ত্রুটি , আমাদের পাপ আমাদের সম্মুখবর্তী সুদূর ভবিষ্যতের সূচনা করিতেছে । বলিয়া দিতেছে , কড়াক্রান্তি কাকদন্তি চোখবাঁধা ঘানির বলদের জন্য ; সে তাহার পূর্ববর্তীদের পদচিহ্নিত একটি ক্ষুদ্র সুগোলচক্রের মধ্যে প্রতিদিন পাক খাইয়া সর্ষপ হইতে তৈলনিষ্পেষণ - নামক একটি বিশেষনির্দিষ্ট কাজ করিয়া জীবননির্বাহ করিতেছে , তাহার প্রতি মুহূর্ত এবং প্রতি তৈলবিন্দু হিসাবের মধ্যে আনা যায়—কিন্তু যাহাকে আপনার সমস্ত মনুষ্যত্ব অপরিমেয় বিকাশের দিকে লইয়া যাইতে হইবে , তাহাকে বিস্তর খুচরা হিসাব ছাঁটিয়া ফেলিতে হইবে ।

উপসংহারে একটি কথা বলিয়া রাখি , একিলিস এবং কচ্ছপ নামক একটি ন্যায়ের কুতর্ক আছে । তদ্‌দ্বারা প্রমাণ হয় যে , একিলিস যতই দ্রুতগামী হউক , মন্দগতি কচ্ছপ যদি একত্রে চলিবার সময় কিঞ্চিন্মাত্র অগ্রসর থাকে , তবে একিলিস তাহাকে ধরিতে পারিবে না । এই কুতর্কে তার্কিক অসীম ভগ্নাংশের হিসাব ধরিয়াছেন—কড়াক্রান্তি - দন্তিকাকের দ্বারা তিনি ঘরে বসিয়া প্রমাণ করিয়াছেন যেন কচ্ছপ চিরদিন অগ্রবর্তী থাকিবে । কিন্তু এ দিকে প্রকৃত কর্মভূমিতে একিলিস এক পদক্ষেপে সমস্ত কড়াক্রান্তি - দন্তিকাক লঙ্ঘন করিয়া কচ্ছপকে ছাড়াইয়া চলিয়া যায় । তেমনই আমাদের পণ্ডিতেরা সূক্ষ্মযুক্তি দ্বারা প্রমাণ করিতে পারেন যে , কড়াক্রান্তি - দন্তিকাক লইয়া আমাদের কচ্ছপসমাজ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে অগ্রসর হইয়া আছে ; কিন্তু দ্রুতগামী মানবপথিকেরা এক - এক দীর্ঘ পদক্ষেপে আমাদের সমস্ত সূক্ষ্ম প্রমাণ লঙ্ঘন করিয়া চলিয়া যাইতেছে ; তাহাদিগকে যদি ধরিতে চাই তবে চুল চেরা হিসাব ফেলিয়া দিয়া রীতিমত চলিতে আরম্ভ করা যাক । আর তা যদি না চাই , তবে অন্ধ আত্মাভিমান বৃদ্ধি করিবার জন্য চোখ বুজিয়া পাণ্ডিত্য করা অলস সময়যাপনের একটা উপায় বটে । তাহাতে আমাদের পুণ্য প্রমাণ হয় কি না জানি না , কিন্তু নৈপুণ্য প্রমাণ হয় ।