সমাজ/কোট বা চাপকান

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


আজকাল একটি অদ্ভুত দৃশ্য আমাদের দেশে দেখা যায় । আমাদের মধ্যে যাঁহারা বিলাতি পোশাক পরেন , স্ত্রীগণকে তাঁহারা শাড়ি পরাইয়া বাহির করিতে কুণ্ঠিত হন না । একাসনে গাড়ির দক্ষিণভাগে হ্যাট কোট , বামভাগে বোম্বাই শাড়ি । নব্য বাংলার আদর্শে হরগৌরীরূপ যদি কোনো চিত্রকর চিত্রিত করেন , তবে তাহা যদিবা ‘সাব্লাইম' না হয় , অন্তত সাব্লাইমের অদূরবর্তী আর - একটা কিছু হইয়া দাঁড়াইবে ।

পশুপক্ষীর রাজ্যে প্রকৃতি অনেক সময় স্ত্রীপুরুষের সাজের এত প্রভেদ করেন যে , দম্পতীকে একজাতীয় বলিয়া চেনা বিশেষ অভিজ্ঞতাসাধ্য হইয়া পড়ে । কেশরের অভাবে সিংহীকে সিংহের পত্নী বলিয়া চেনা কঠিন এবং কলাপের অভাবে ময়ূরের সহিত ময়ূরীর কুটুম্বিতানির্ণয় দুরূহ ।

বাংলাতেও যদি প্রকৃতি তেমন একটা বিধান করিয়া দিতেন , স্বামী যদি তাঁহার নিজের পেখম বিস্তার করিয়া সহধর্মিণীর উপরে টেক্কা দিতে পারিতেন , তাহা হইলে কোনো কথাই উঠিত না । কিন্তু গৃহকর্তা যদি পরের পেখম পুচ্ছে গুঁজিয়া ঘরের মধ্যে অনৈক্য বিস্তার করেন , তাহা হইলে সেটা যে কেবল ঘরের পক্ষে আপসোসের বিষয় হয় তাহা নহে , পরের চক্ষে হাস্যেরও বিষয় হইয়া ওঠে ।

যাহা হউক , ব্যাপারটা যতই অসংগত হউক , যখন ঘটিয়াছে তখন ইহার মধ্যে সংগত কারণ একটুকু আছেই ।

আমরা যে - কারণটি নির্ণয় করিয়াছি তাহার মধ্যে আমাদের মনের কতকটা সান্ত্বনা আছে । অন্তত সেইজন্যই আশা করি এইটেই যথার্থ কারণ । সে কারণ নির্দেশ করিবার পূর্বে বিষয়টা একটু বিস্তারিতভাবে সমালোচনা করা যাক ।

ইংরেজি কাপড়ের একটা মস্ত অসুবিধা এই যে , তাহার ফ্যাশনের উৎস ইংলণ্ডে । সেখানে কী কারণবশত কিরূপ পরিবর্তন চলিতেছে আমরা তাহা জানি না , তাহার সহিত আমাদের কোনো প্রত্যক্ষ সংস্রবমাত্র নাই । আমাদিগকে চেষ্টা করিয়া খবর লইতে এবং সাবধানে অনুকরণ করিতে হয় । যাঁহারা নূতন বিলাত হইতে আসেন তাঁহারা সাবেক দলের কলার এবং প্যান্টলুনের ছাঁট দেখিয়া মনে মনে হাস্য করেন , এবং সাবেকদলেরা নব্যদলের সাজসজ্জার নব্যতা দেখিয়া তাঁহাদিগকে “ফ্যাশানেব্‌ল” বলিয়া হাস্য করিতে ত্রুটি করেন না ।

ফ্যাশানের কথা ছাড়িয়া দেও । সকল দেশেরই বেশভূষার একটা ভদ্রতার আদর্শ আছে । যে - দেশে কাপড় না পরিয়া উলকি পরে সেখানেও উলকির ইতরবিশেষ ভদ্র অভদ্র চিহ্নিত হয় । ইংরেজি ভদ্রকাপড়ের সেই আদর্শ আমরা কোথা হইতে সংগ্রহ করিব । তাহা আমাদের ঘরের মধ্যে আমাদের সমাজের মধ্যে নাই । সে আদর্শ আমরা নিজের ভদ্রতাগৌরবে আমাদের নিজের সুরুচি ও সুবিচারের দ্বারা , আমাদের আপনাদের ভদ্রমণ্ডলীর সাহায্যে স্বাধীনভাবে গঠিত করিতে পারি না । আমাদিগকে ভদ্র সাজিতে হয় পরের ভদ্রতা - আদর্শ অনুসন্ধান করিয়া লইয়া ।

যাহাদের নিকট হইতে অনুসন্ধান এবং ধার করিয়া লইতে হইবে , তাহাদের সমাজে আমাদের গতিবিধি নাই । তাহাদের দোকান হইতে আমরা ঈভনিং কোর্তা কিনি , কিন্তু তাহাদের নিমন্ত্রণে সেটা ব্যবহার করিবার সুযোগ পাই না ।

এমন আবস্থায় ক্রমে দোকানে - কেনা আদর্শ হইতেও ভ্রষ্ট হইতে হয়। ক্রমে কলারের শুভ্রতায় টাইয়ের বন্ধনে প্যান্টলুনের পরিধিতে শৈথিল্য আসিয়া পড়ে । শুনিতে পাই ইংরেজিবেশী বাঙালির মধ্যে এমন দৃষ্টান্ত আজকাল প্রায় দেখা যায় ।

একে বিলাতি সাজ স্বভাবতই বাঙালিদেহে অসংগত , তাহার উপরে যদি তাহাতে ভদ্রোচিত পারিপাট্য না থাকে , তবে তাহাতে হাসিও আসে অবজ্ঞাও আনে । এ কথা সহজেই মুখে আসে যে , যদি পরিতে না জান এবং শক্তি না থাকে , তবে পরের কাপড়ে সাজিয়া বেড়াইবার দরকার কী ছিল ।

ইংরেজি কাপড়ে ‘খেলো' হইলে যত খেলো এবং যত দীন দেখিতে হয় , এমন দেশী কাপড়ে নয় । তাহার একটা কারণ ইংরেজি সাজে সারল্য নাই , তাহার মধ্যে আয়োজন এবং চেষ্টার বাহুল্য আছে । ইংরেজি কাপড় যদি গায়ে ফিট না হইল , যদি তাহাতে টানাটানি প্রকাশ পাইল , তবে তাহা ভদ্রতার পক্ষে অত্যন্ত বেআবরু হইয়া পড়ে ; কারণ , ইংরেজি কাপড়ের আগাগোড়ায় গায়ে ফিট করিবার চরম উদ্দেশ্য , দেহটাকে খোসার মতো মুড়িয়া ফেলিবার সযত্ন চেষ্টা সর্বদা বর্তমান । সুতরাং প্যান্টলুন যদি একটু খাটো হয় , কোট যদি একটু উঠিয়া পড়ে , তবে নিজেকেই ছোটো বলিয়া মনে হয় , সেইটুকুতেই আত্মসম্মানের লাঘব হইতে থাকে—যে - ব্যক্তি এ সম্বন্ধে অজ্ঞতাসুখে অচেতন , অন্যলোকে তাহার হইয়া লজ্জা বোধ করে ।

যাঁহারা আজকাল ইংরেজি বস্ত্র ধরিয়াছেন লক্ষ্মী তাঁহাদের প্রতি সুপ্রসন্ন থাকুন , তাঁহাদিগকে কখনো যেন চাঁদনিতে ঢুকিতে না হয় । কিন্তু তাঁহাদের পুত্রপৌত্রেরা সকলেই যে র‍্যানকিনের বাড়ি গতিবিধি রক্ষা করিয়া চলিতে পারিবে , এমন আশা কিছুতেই করা যায় না । অথচ পৈতৃক বেশের সহিত পৈতৃক দুর্বলতাটুকুও যদি তাহারা পায় , সহেবিয়ানা পরিহার করিবার শক্তি যদি তাহাদের না থাকে , তবে তাহাদের সম্মুখে দারুণ চুনাগলি ছাড়া আর কিছুই দেখিতে পাই না ।

যাঁহারা বিলাতে গিয়াছেন তাঁহারা বিলাতি বসনভূষণের অন্ধিসন্ধি কতকটা বুঝিয়া চলিতে পারেন ; যাঁহারা যান নাই তাঁহারা অনেক সময় অদ্ভুত কাণ্ড করেন । তাঁহারা দার্জিলিঙের প্রকাশ্যপথে ড্রেসিংগাউন পরিয়া বেড়ান , এবং ছোটো কন্যাকে মলিন সাদা ফুলমোজার উপরে বিলাতি ফ্রক এবং টুপি উলটা করিয়া পরাইয়া সভায় লইয়া আসেন ।

এ সম্বন্ধে দুটো কথা আছে । প্রথমে ঠিক দস্তুর - মতো ফ্যাশান - মতো কাপড় পরিতেই হইবে , এমন কী মাথার দিব্য আছে । এ কথাটা খুব বড়োলোকের , খুব স্বাধীনচেতার মতো কথা বটে । দশের দাসত্ব্ব , প্রথার গোলামি , এ - সমস্ত ক্ষুদ্রতাকে ধিক্‌ । কিন্তু এ স্বাধীনতার কথা তাহাকে শোভা পায় না যে—লোক গোড়াতেই বিলাতি সাজ পরিয়া অনুকরণের দাসখত আপাদমস্তকে লিখিয়া রাখিয়াছে । পাঁঠা যদি নিজের হয় , তবে তাহাকে কাটা সম্বন্ধেও স্বাধীনতা থাকে ; নিজেদের ফ্যাশানে যদি চলি , তবে তাহাকে লঙ্ঘন করিয়াও মহত্ত্ব দেখাইতে পারি । পরের পথেও চলিব , আবার সে - পথ কলুষিতও করিব , এমন বীরত্বের মহত্ত্ব বোঝা যায় না ।

আর - একটা কথা এই যে , যেমন ব্রাহ্মণের পইতা তেমনই বিলাতফেরতের বিলাতি কাপড় , ওটা সাম্প্রদায়িক লক্ষণরূপে স্বতন্ত্র করা কর্তব্য । কিন্তু সে বিধান চলিবে না । গোড়ায় সেই - মতোই ছিল বটে , কিন্তু আজকাল সমুদ্র পার না হইয়াও অনেকে চিহ্নধারণ করিতে শুরু করিয়াছেন । আমাদর উর্বর দেশে ম্যালেরিয়া ওলাউঠা প্রভৃতি যে - কোনো ব্যাধি আসিয়াছে , ব্যাপ্ত না হইয়া ছাড়ে নাই ; বিলাতি কাপড়েরও দিন আসিয়াছে ; ইহাকে দেশের কোনো অংশবিশেষে পৃথক্‌করণ কাহারো সাধ্যায়ত্ত নহে ।

দীন ভারতবর্ষ যেদিন ইংলণ্ডের পরিত্যক্ত ছিন্নবস্ত্রে ভূষিত হইয়া দাঁড়াইবে , তখন তাহার দৈন্য কী বীভৎস বিজাতীয় মূর্তি ধারণ করিবে । আজ যাহা কেবলমাত্র শোকাবহ আছে সেদিন তাহা কী নিষ্ঠুর হাস্যজনক হইয়া উঠিবে । আজ যাহা বিরল - বসনের সরল নম্রতার দ্বারা সংবৃত সেদিন তাহা জীর্ণ কোর্তার ছিদ্রপথে অর্ধাবরণের ইতরতায় কী নির্লজ্জভাবে দৃশ্যমান হইয়া উঠিবে । চুনাগলি যেদিন বিস্তীর্ণ হইয়া সমস্ত ভারতবর্ষকে গ্রাস করিতে আসিবে , সেদিন যেন ভারতবর্ষ একটি পা মাত্র অগ্রসর হইয়া তাঁহারই সমুদ্রের ঘাটে তাঁহার মলিন প্যান্টলুনের ছিন্ন প্রান্ত হইতে ভাঙা টুপির মাথাটা পর্যন্ত নীলাম্বুরাশির মধ্যে নিলীন করিয়া নারায়ণের অনন্তশয়নের অংশ লাভ করেন ।

কিন্তু এ হল সেন্টিমেন্ট , ভাবুকতা—প্রকৃতিস্থ কাজের লোকের মতো কথা ইহাকে বলা যায় না । ইহা সেন্টিমেন্ট বটে । মরিব তবু অপমান সহিব না , ইহাও সেন্টিমেন্ট । যাহারা আমাদিগকে ক্রিয়া - কর্মে আমোদপ্রমোদ সামাজিকতায় সর্বতোভাবে বাহিরে ঠেলিয়া রাখে , আমরা তাহাদিগকে পূজার উৎসবে ছেলের বিবাহে বাপের অন্ত্যেষ্টিসৎকারে ডাকিয়া আনিব না , ইহাও সেন্টিমেন্ট । বিলাতি কাপড় ইংরেজের জাতীয় গৌরবচিহ্ন বলিয়া সেই ছদ্মবেশে স্বদেশকে অপমানিত করিব না , ইহাও সেন্টিমেন্ট । এই - সমস্ত সেন্টিমেন্টেই দেশের যথার্থ বল , দেশের যথার্থ গৌরব ; অর্থে নহে , রাজপদে নহে , ডাক্তারির নৈপুণ্য অথবা আইন ব্যবসায়ের উন্নতিসাধনে নহে ।

আশা করিতেছি এই সেন্টিমেন্টের কিঞ্চিৎ আভাস আছে বলিয়াই বিলাতি বেশধারীগণ অত্যন্ত অসংগত হইলেও তাঁহাদের অর্ধাঙ্গিনীদের শাড়ি রক্ষা করিয়াছেন ।

পুরুষেরা কর্মক্ষেত্রে কাজের সুবিধার জন্য ভাবগৌরবকে বলিদান দিতে অনেকে কুণ্ঠিত হন না । কিন্তু স্ত্রীগণ যেখানে আছেন সেখানে সৌন্দর্য এবং ভাবুকতার রাহুরূপী কর্ম আজিও আসিয়া প্রবেশ করে নাই । সেইখানে একটু ভাবরক্ষার জায়গা রহিয়াছে , সেখানে আর স্ফীতোদর গাউন আসিয়া আমাদের দেশীয় ভাবের শেষ লক্ষণটুকু গ্রাস করিয়া যায় নাই ।

সাহেবিয়ানাকেই যদি চরম গৌরবের বিষয় বলিয়া জ্ঞান করি , তাহা হইলে স্ত্রীকে বিবি না সাজাইয়া স - গৌরব অর্ধেক অসম্পূর্ণ থাকে । তাহা যখন সাজাই নাই , তখন শাড়িপরা স্ত্রীকে বামে বসাইয়া এ কথা প্রকাশ্যে কবুল করিতেছি যে , আমি যাহা করিয়াছি তাহা সুবিধার খাতিরে—দেখো , ভাবের খাতির রক্ষা করিয়াছি আমার ঘরের মধ্যে , আমার স্ত্রীগণের পবিত্র দেহে ।

কিন্তু আমরা আশঙ্কা করিতেছি , ইহাদের অনেকেই এই প্রসঙ্গে একটা অত্যন্ত নিষ্ঠুর কথা বলিবেন । বলিবেন , পুরুষের উপযোগী জাতীয় পরিচ্ছদ তোমাদের আছে কোথায় যে আমরা পরিব ? ইহাকেই বলে আঘাতের উপরে অবমাননা । একে তো পরিবার বেলা ইচ্ছাসুখেই বিলাতি কাপড় পরিলেন , তাহার পর বলিবার বেলা সুর ধরিলেন যে , তোমাদের কোনো কাপড় ছিল না বলিয়াই আমাদিগকে এই বেশ ধরিতে হইয়াছে । আমরা পরের কাপড় পরিয়াছি বটে , কিন্তু তোমাদের কোনো কাপড়ই নাই—সে আরো খারাপ ।

বাঙালি সাহেবেরা ব্যঙ্গসুরে অবজ্ঞা করিয়া বলেন , তোমাদের জাতীয় পরিচ্ছদ পরিতে গেলে পায়ে চটি , হাঁটুর উপরে ধুতি এবং কাঁধের উপরে একখানা চাদর পরিতে হয় ; সে আমরা কিছুতেই পারিব না । শুনিয়া ক্ষোভে নিরুত্তর হইয়া থাকি ।

যদিও কাপড়ের উপর মানুষ নির্ভর করে না , মানুষের উপর কাপড় নির্ভর করে ; এবং সে হিসাবে মোটা ধুতি চাদর লেশমাত্র লজ্জাকর নহে । বিদ্যাসাগর , একা বিদ্যাসাগর নহেন , আমাদের দেশে বহুসংখ্যক মোটা চাদরধারী ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের সহিত গৌরবে গাম্ভীর্যে কোর্তাগ্রস্ত কোনো বিলাতফেরতই তুলনীয় হইতে পারেন না । যে - ব্রাহ্মণেরা এককালে ভারতবর্ষকে সভ্যতার উচ্চ শিখরে উত্তীর্ণ করিয়া ছিলেন , তাঁহাদের বসনের একান্ত বিরলতা জগদ্‌বিখ্যাত । কিন্তু সে - সকল তর্ক তুলিতে চাহি না । কারণ সময়ের পরিবর্তন হইয়াছে , এবং সেই পরিবর্তনের একেবারে বিপরীতমুখে চলিতে গেলে আত্মরক্ষা করা অসম্ভব হইয়া উঠে ।

অতএব এ কথা স্বীকার করিতে হইবে যে , বাংলাদেশে যে - ভাবে ধুতি চাদর পরা হয় , তাহা আধুনিক কাজকর্ম এবং আপিস - আদালতের উপযোগী নয় । কিন্তু আচকান - চাপকানের প্রতি সে - দোষারোপ করা যায় না ।

সাহেবী বেশধারীরা বলেন , ওটাও তো বিদেশী সাজ । বলেন বটে , কিন্তু সে একটা জেদের তর্ক মাত্র । অর্থাৎ বিদেশী বলিয়া চাপকান তাঁহারা পরিত্যাগ করেন নাই , সাহেব সাজিবার একটা কোনো বিশেষ প্রলোভন আছে বলিয়াই ত্যাগ করিয়াছেন ।

কারণ যদি চাপকান এবং কোট দুটোই তাঁহার নিকট সমান নূতন হইত , যদি তাঁহাকে আপিসে প্রবেশ ও রেলগাড়িতে পদার্পণ করিবার দিন দুটোর মধ্যে একটা প্রথম বাছিয়া লইতে হইত , তাহা হইলে এ - সকল তর্কের উত্থাপন হইতে পারিত ।

চাপকান তাঁহার গায়েই ছিল , তিনি সেটা তাঁহার পিতার নিকট হইতে পাইয়াছিলেন । তাহা ত্যাগ করিয়া সেদিন কালো কুর্তির মধ্যে প্রবেশপূর্বক গলায় টাই বাঁধিলেন , সেদিন আনন্দে এবং গৌরবে এ তর্ক তোলেন নাই যে , পিতা ও চাপকানটা কোথা হইতে পাইয়াছিলেন । তোলাও সহজ নহে , কারণ চাপকানের ইতিবৃত্ত ঠিক তিনিও জানেন না , আমিও জানি না । কেননা মুসলমানদের সহিত বসনভূষণ শিল্পসাহিত্যে আমাদের এমন ঘনিষ্ঠ আদানপ্রদান হইয়া গেছে যে , উহার মধ্যে কতটা কার , তাহার সীমা নির্ণয় করা কঠিন । চাপকান হিন্দু - মুসলমানের মিলিত বস্ত্র । উহা যে - সকল পরিবর্তনের মধ্য দিয়া বর্তমান আকারে পরিণত হইয়াছে , তাহাতে হিন্দু মুসলমান উভয়েই সহায়তা করিয়াছে । এখনো পশ্চিমে ভিন্ন ভিন্ন রাজাধিকারে চাপকানের অনেক বৈচিত্র্য দেখা যায় ; সে - বৈচিত্র্যে যে একমাত্র মুসলমানের কর্তৃত্ব তাহা নহে ., তাহার মধ্যে হিন্দুরও স্বাধীনতা আছে ।

যেমন আমাদের ভারতর্ষীয় সংগীত মুসলমানেরও বটে হিন্দুরও বটে , তাহাতে উভয়জাতীয় গুণীরই হাত আছে ; যেমন মুসলমান রাজ্যপ্রণালীতে হিন্দু মুসলমান উভয়ের স্বাধীন ঐক্য ছিল ।

তাহা না হইয়া যায় না । কারণ মুসলমানগণ ভারতবর্ষের অধিবাসী ছিল । তাহাদের শিল্পবিলাস ও নীতিপদ্ধতির আদর্শ ভারতবর্ষ হইতে সুদূরে থাকিয়া আপন আদিমতা রক্ষা করে নাই ; এবং মুসলমান যেমন বলের দ্বারা ভারতবর্ষকে আপনার করিয়া লইয়াছিল , ভারতবর্ষও তেমনই স্বভাবের অমোঘ নিয়মে কেবল আপন বিপুলতা আপন নিগূঢ় প্রাণশক্তি দ্বারা মুসলমানকে আপনার করিয়া লইয়াছিল । চিত্র , স্থাপত্য , বস্ত্রবয়ন , সূচিশিল্প , ধাতুদ্রব্য - নির্মাণ , দন্তকার্য , নৃত্য , গীত এবং রাজকার্য , মুসলমানের আমলে ইহার কোনোটাই একমাত্র মুসলমান বা হিন্দুর দ্বারা হয় নাই ; উভয়ে পাশাপাশি বসিয়া হইয়াছে । তখন ভারতবর্ষের যে একটি বাহ্যবরণ নির্মিত হইতেছিল , তাহাতে হিন্দু ও মুসলমান ভারতবর্ষের ডান হাত ও বাম হাত লইয়া টানা ও পোড়েন বুনিতেছিল ।

অতএব এই মিশ্রণের মধ্যে চাপকানের খাঁটি মুসলমানত্ব যিনি গায়ের জোরে প্রমাণ করিতে চান , তাঁহাকে এই কথা বলিতে হয় যে , তোমার যখন গায়ের এতই জোর , তখন কিছুমাত্র প্রমাণ না করিয়া ঐ গায়ের জোরেই হ্যাটকোট অবলম্বন করো ; আমরা মনের আক্ষেপ নীরবে মনের মধ্যে পরিপাক করি ।

এক্ষণে যদি ভারতবর্ষীয় জাতি বলিয়া একটা জাতি দাঁড়াইয়া যায় , তবে তাহা কোনমতেই মুসলমানকে বাদ দিয়া হইবে না । যদি বিধাতার কৃপায় কোনোদিন সহস্র অনৈক্যের দ্বারা খণ্ডিত হিন্দুরা এক হইতে পারে , তবে হিন্দুর সহিত মুসলমানের এক হওয়াও বিচিত্র হইবে না । হিন্দু মুসলমানের ধর্মে না - ও মিলিতে পারে , কিন্তু জনবন্ধনে মিলিবে—আমাদের শিক্ষা আমাদের চেষ্টা আমাদের মহৎ স্বার্থ সেই দিকে অনবরত কাজ করিতেছে । অতএব যে - বেশ আমাদের জাতীয় বেশ হইবে তাহা হিন্দু মুসলমানের বেশ ।

যদি সত্য হয় , চাপকান পায়জামা একমাত্র মুসলমানদেরই উদ্‌ভাবিত সজ্জা , তথাপি এ কথা যখন স্মরণ করি , রাজপুতবীরগণ শিখসর্দারবর্গ এই বেশ পরিধান করিয়াছেন , রাণাপ্রতাপ রণজিৎ সিংহ এই চাপকান পায়জামা ব্যবহার করিয়া ইহাকে ধন্য করিয়া গিয়াছেন , তখন মিস্টার ঘোষ - বোস - মিত্র , চাটুয্যে - বাঁড়ুয্যে - মুখুয্যের এ বেশ পরিতে লজ্জার কারণ কিছুই দেখি না ।

কিন্তু সর্বাপেক্ষা সাংঘাতিক কথা এই যে , চাপকান পায়জামা দেখিতে অতি কুশ্রী । তর্ক যখন এইখানে আসিয়া ঠেকে তখন মানে মানে চুপ করিয়া যাওয়া শ্রেয় । কারণ রুচির তর্কের , শেষকালে প্রায় বাহুবলে আসিয়াই মীমাংসা হয় ।