সমাজ/নকলের নাকাল

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


ইংরেজিতে একটি বচন আছে , সাব্লাইম হইতে হাস্যকর অধিক দূর নহে । সংস্কৃত অলংকারে অদ্ভুতরস ইংরেজি সাব্‌লিমিটির প্রতিশব্দ । কিন্তু অদ্ভুত দুই রকমেরই আছে—হাস্যকর অদ্ভুত এবং বিস্ময়কর অদ্ভুত ।

দুইদিনের জন্য দার্জিলিঙে ভ্রমণ করিতে আসিয়া , এই দুই জাতের অদ্ভুত একত্র দেখা গেল । এক দিকে দেবতাত্মা নগাধিরাজ , আর - এক দিকে বিলাতি - কাপড় - পরা বাঙালি । সাব্‌লাইম এবং হাস্যকর একেবারে গায়েগোয়ে সংলগ্ন ।

ইংরেজি কাপড়টাই যে হাস্যকর , সে কথা আমি বলি না—বাঙালির ইংরেজি কাপড় পরাটাই যে হাস্যকর , সে - প্রসঙ্গও আমি তুলিতে চাহি না । কিন্তু বাঙালির গায়ে বিসদৃশ রকমের বিলাতি কাপড় যদি করুণা রসাত্মক না হয় , তবে নিঃসন্দেহই হাস্যকর । আশা করি , এ সম্বন্ধে কাহারো সহিত মতের অনৈক্য হইবে না ।

হয়তো কাপড় একরকমের , টুপি একরকমের , হয়তো কলার আছ টাই নাই , হয়তো যে - রঙটা ইংরেজের চক্ষে বিভীষিকা সেই রঙের কুর্তি ; হয়তো যে - অঙ্গাবরণকে ঘরের বাহিরে ইংরেজ বিবসন বলিয়া গণ্য করে , সেই অসংগত অঙ্গচ্ছদ । এমনতরো অজ্ঞানকৃত সঙসজ্জা কেন ।

যদি সম্মুখে কাছা ও পশ্চাতে কোঁচা দিয়া কোনো ইংরেজ বাঙালিটোলায় ঘুরিয়া বেড়ায় , তবে সে - ব্যক্তি সম্মানলাভের আশা করিতে পারে না । আমাদের বাঙালি ভ্রাতারা অদ্ভুত বিলাতি সাজ পরিয়া গিরিরাজের রাজসভায় ভাঁড় সাজিয়া ফিরেন , তাঁহারা ঘরের কড়ি খরচ করিয়া ইংরেজ দর্শকের কৌতুকবিধান করিয়া থাকেন ।

বেচারা কী আর করিবে । ইংরেজ - দস্তুর সে জানিবে কী করিয়া । যে বিলাতফেরত বাঙালি দস্তুর জানেন , তাঁহার স্বদেশীয়ের এই বেশবিভ্রমে তিনিই সব চেয়ে লজ্জাবোধ করেন । তিনিই সব চেয়ে তীব্রস্বরে বলিয়া থাকেন , যদি না জানে তবে পরে কেন । আমাদের সুদ্ধ ইংরেজের কাছে অপদস্থ করে ।

না পরিবে কেন । তুমি যদি পর , এবং পরিয়া দেশীপরিচ্ছদধারীর চেয়ে নিজেকে বড়ো মনে কর , তবে সে - গর্ব হইতে সেই - বা বঞ্চিত হইবে কেন । তোমার যদি মত হয় যে , আমাদের স্বদেশীয় সজ্জা ত্যাজ্য এবং বিদেশী পোশাকই গ্রাহ্য , তবে দলপুষ্টিতে আপত্তি করিলে চলিবে না ।

তুমি বলিবে , বিলাতি সাজ পরিতে চাও পরো , কিন্তু কোন্‌টা অভদ্র কোন্‌টা সংগত কোন্‌টা অদ্ভুত , সে - খবরটা লও ।

কিন্তু সে কখনোই সম্ভব সইতে পারে না । যাহারা ইংরেজিসমাজে নাই , যাহাদের আত্মীয়স্বজন বাঙালি , তাহারা ইংরেজি দস্তুরের আদর্শ কোথায় পাইবে ।

যাহাদের টাকা আছে , তাহারা র‍্যাঙ্কিন - হার্মানের হস্তে চক্ষু বুজিয়া আত্মসমর্পণ করে , এবং বড়ো বড়ো চেকে সই করিয়া দেয় , মনে মনে সান্ত্বনা লাভ করে , নিশ্চয়ই আর কিছু না হউক আমাকে দেখিয়া অন্তত ভদ্র ফিরিঙ্গি বলিয়া লোকে আন্দাজ করিবে—ইংরেজি কায়দা জানে না , এমন মূর্ছাকর অপবাদ কেহ দিতে পারিবে না ।

কিন্তু পনেরো - আনা বাঙালিরই অর্থাভাব , এবং চাঁদনিই তাহাদের বাঙালি সজ্জার চরম মোক্ষস্থান । অতএব উলটা - পালটা ভুলচুক হইতেই হইবে । এমন স্থলে পরের সাজ পরিতে গেলে , অধিকাংশ লোকেরই সঙসাজা বৈ গতি নাই ।

স্বজাতিকে কেন এমন করিয়া অপদস্থ করা । এমন কাজ কেন , যাহার দৃষ্টান্তে দেশের লোক হাস্যকর হইয়া উঠে । দু - চারিটা কাক অবস্থাবিশেষে ময়ূরের পুচ্ছ মানান - সই করিয়া পরিতেও পারে , কিন্তু বাকি কাকেরা তাহা কোনোমতেই পারিবে না , কারণ ময়ূরসমাজে তাহাদের গতিবিধি নাই , এমন অবস্থায় সমস্ত কাকসম্প্রদায়কে বিদ্রূপ হইতে রক্ষা করিবার জন্য উক্ত কয়েকটি ছদ্মবেশীকে ময়ূরপুচ্ছের লোভ সম্বরণ করিতেই হইবে । না যদি করেন , তবে পরপুচ্ছ বিকৃতভাবে আস্ফালনের প্রহসন সর্বত্রই ব্যাপ্ত হইয়া পড়িবে । এই লজ্জা হইতে , ইংরেজিয়ানার এই বিকার হইতে , স্বদেশকে রক্ষা করিবার জন্য আমরা কি সক্ষম নকলকারীকে সানুনয়ে অনুরোধ করিতে পারি না , কারণ , তাঁহারা সক্ষম , আর - সকলে অক্ষম । এমন - কি , অবস্থাবিশেষে তাঁহাদের পুত্রপৌত্রেরাও অক্ষম হইয়া পড়িবে । তাহারা যখন ফিরিঙ্গিলীলার অধস্তন রসাতলের গলিতে গলিতে সমাজচ্যুত আবর্জনার মতো পড়িয়া থাকিবে , তখন কি র‍্যাঙ্কিনবিলাসীর প্রেতাত্মা শান্তিলাভ করিবে ।

দরিদ্র কোনোমতেই পরের নকল ভদ্ররকমে করিতে পারে না । নকল করিবার কাঠখড় বেশি । বাহির হইতে তাহার আয়োজন করিতে হয় । যাহাকে নকল করিতে হইবে , সর্বদা তাহার সংসর্গে থাকিতে হয় , দরিদ্রের পক্ষে সেইটেই সর্বাপেক্ষা কঠিন । সুতরাং সে - অবস্থায় নকল করিতে হইলে , আদর্শভ্রষ্ট হইয়া কিম্ভূতকিমাকার একটা ব্যাপার হইয়া পড়ে । বাঙালির পক্ষে খাটো ধুতি পরা লজ্জাকর নহে , কিন্তু খাটো প্যান্টলুন পরা লজ্জাজনক । কারণ , খাটো প্যান্টলুনে কেবল অসামর্থ্য বুঝায় না , তাহাতে পর সাজিবার যে - চেষ্টা যে - স্পর্ধা প্রকাশ পায় , তাহা দারিদ্র্যের সহিত কিছুতেই সুসংগত নহে ।

আজকাল ইংরেজি সাজ কিরূপ চলতি হইয়া আসিতেছে , এবং যতই চলতি হইতেছে ততই তাহা কিরূপ বিকৃত হইয়া উঠিতেছে , দার্জিলিঙের মতো জায়গায় আসিলে অল্পকালের মধ্যেই তাহা অনুভব করা যায় । বাঙালির দুরদৃষ্টি বাঙালিকে অনেক দুঃখ দিয়াছে—পেটে প্লীহা , হাড়ের মধ্যে ম্যালেরিয়া , দেহে কৃশতা , চর্মে কালিমা , ভাণ্ডারে দৈন্য ; অবশেষে তাহাকে কি অদ্ভুত সাজে সাজাইয়া ব্যঙ্গ করিতে আরম্ভ করিবে । চিত্তদৌর্বল্যে যখন হাস্যকর করিয়া তোলে , তখন ধরণী দ্বিধা হওয়া ছাড়া লজ্জানিবারণের আর উপায় থাকে না ।

আচারব্যবহার সাজসজ্জা উদ্ভিদের মতো , তাহাকে উপড়াইয়া আনিলে শুকাইয়া পচিয়া নষ্ট হইয়া যায় । বিলাতি বেশভূষা - আদবকায়দার মাটি এখানে কোথায় । সে কোথা হইতে তাহার অভ্যস্ত রস আকর্ষণ করিয়া সজীব থাকিবে । ব্যক্তিবিশেষ খরচপত্র করিয়া কৃত্রিম উপায়ে মাটি আমদানি করিতে পারেন এবং দিনরাত সযত্নসচেতন থাকিয়া তাহাকে কোনোমতে খাড়া রাখিতে পারেন । কিন্তু সে কেবল দুই - চারিজন শৌখিনের দ্বারাই সাধ্য ।

যাহাকে পালন করিতে , সজীব রাখিতে পারিবে না , তাহাকে ঘরের মধ্যে আনিয়া পচাইয়া হাওয়া খারাপ করিবার দরকার ? ইহাতে পরেরটাও নষ্ট হয় , নিজেরটাও মাটি হইয়া যায় । সমস্ত মাটি করিবার সেই আয়োজন বাংলাদেশেই দেখিতেছি ।

তবে কি পরিবর্তন হইবে না । যেখানে যাহা আছে . চিরকাল কি সেখানে তাহা একই ভাবে চলে ।

প্রয়োজনের নিয়মে পরিবর্তন হইবে , অনুকরণের নিয়মে নহে । কারণ , অনুকরণ অনেক সময়ই প্রয়োজনবিরুদ্ধ । তাহা সুখশান্তিস্বাস্থ্যের অনুকূল নহে । চতুর্দিকের অবস্থার সহিত তাহার সামঞ্জস্য নাই । তাহাকে চেষ্টা করিয়া আনিতে হয় , কষ্ট করিয়া রক্ষা করিতে হয় ।

অতএব রেলওয়ে ভ্রমণের জন্য , আপিসে বাহির হইবার জন্য , নূতন প্রয়োজনের জন্য ছাঁটা - কাটা কাপড় বানাইয়া লও । সে তুমি নিজের দেশ , নিজের পরিবেশ , নিজের পূর্বাপরের প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া প্রস্তুত করো । সম্পূর্ণ ইতিহাসবিরুদ্ধ ভাববিরুদ্ধ সংগতিবিরুদ্ধ অনুকরণের প্রতি হতবুদ্ধির ন্যায় ধাবিত হইয়ো না ।

পুরাতনের পরিবর্তন ও নূতনের নির্মাণে দোষ নাই । আবশ্যকের অনুরোধে তাহা সকল জাতিকেই সর্বদা করিতে হয় । কিন্তু এরূপ স্থলে সম্পূর্ণ অনুকরণ প্রযোজনের দোহাই দিয়া চলে না । সে প্রয়োজনের দোহাই একটা ছুতামাত্র । কারণ সম্পূর্ণ অনুকরণ কখনোই সম্পূর্ণ উপযোগী হইতে পারে না । তাহার হয়তো একাংশ কাজের হইতে পারে , অপরাংশ বাহুল্য । তাহার ছাঁটা কোর্তা হয়তো দৌড়ধাপের পক্ষে প্রয়োজনীয় হইতে পারে , কিন্তু তাহার ওয়েস্টকোট হয়তো অনাবশ্যক এবং উত্তাপজনক । তাহার টুপিটা হয়তো খপ্‌ করিয়া মাথায় পরা সহজ হইতে পারে , কিন্তু তাহার টাই - কলার বাঁধিতে অনর্থক সময় দিতে হয় । যেখানে পরিবর্তন ও নূতন নির্মাণ অসম্ভব ও সাধ্যাতীত সেইখানেই অনুকরণ মার্জনীয় হইতে পারে । বেশভূষায় সে - কথা কোনোক্রমেই খাটে না ।

বিশেষত বেশভূষায় কেবলমাত্র অঙ্গাবরণের প্রয়োজন সাধন করে না , তাহাতে ভদ্রাভদ্র , দেশী - বিদেশী , স্বজাতি - বিজাতির পরিচয় দেওয়া হয় । ইংরেজি কাপড়ের ভদ্রতা ইংরেজ জানে । আমাদের ভদ্রলোকদের অধিকাংশের তাহা জানিবার সম্ভাবনা নাই । জানিতে গেলেও সর্বদাই ভয়ে ভয়ে পরের মুখ তাকাইতে হয় ।

তার পরে স্বজাতি - বিজাতির কথা । কেহ কেহ বলেন , স্বজাতির পরিচয় লুকাইবার জন্যই বিলাতি কাপড়ের প্রয়োজন হয় ।

এ কথা বলিতে যাহার লজ্জাবোধ না হয় , তাহাকে লজ্জা দেওয়া কাহারো সাধ্য নহে , পরের বাড়িতে ছদ্মবেশে সম্বন্ধী সাজিয়া গেলে আদর পাওয়া যাইতে পারে , তবু যাহার কিছুমাত্র তেজ ও ভদ্রতাজ্ঞান আছে , সেই আদরকে সে উপেক্ষা করিয়া থাকে । রেলওয়ে ফিরিঙ্গি গার্ড ফিরিঙ্গিভ্রাতা মনে করিয়া যে - আদর করে তাহার প্রলোভন সংবরণ করাই ভালো । কোনো কোনো রেল - লাইনে দেশী - বিলাতির স্বতন্ত্র গাড়ি আছে , কোনো কোনো হোটেলে দেশী লোককে প্রবেশ করিতে দেয় না , সেজন্য রাগিয়া কষ্ট পাইবার অবসর যদি হাতে থাকে তবে সে - কষ্ট স্বীকার করো , কিন্তু জন্ম ভাঁড়াইয়া সেই গাড়িতে বা সেই হোটেলে প্রবেশ করিলে সম্মানের যে কী বৃদ্ধি হয় , তাহা বুঝা কঠিন ।

পরিবর্তন কোন্‌ পর্যন্ত গেলে অনুকরণের সীমার মধ্যে আসিয়া পড়ে , তাহা নির্দিষ্ট করিয়া বলা শক্ত । তবে সাধারণ নিয়মের স্বরূপ একটা কথা বলা যাইতে পারে ।

যেটুকু লইলে বাকিটুকুর সহিত বেখাপ হয় না , তাহাকে বলে গ্রহণ করা ; যেটুকু লইলে বাকিটুকুর সহিত অসামঞ্জস্য হয় তাহাকে বলে অনুকরণ করা ।

মোজা পরিলে কোট পরা অনিবার্য হয় না , ধুতির সঙ্গে মোজা বিকল্পে চলিয়া যায় কিন্তু কোটের সঙ্গে ধুতি , অথবা হ্যাটের সঙ্গে চাপকান চলে না । সাধু ইংরেজিভাষার মধ্যেও মাঝে মাঝে ফরাসি , মিশাল চলে , তাহা ইংরেজি - পাঠকেরা জানেন । কিন্তু কী - পর্যন্ত চলিতে পারে , নিশ্চয়ই তাহার একটা অলিখিত নিয়ম আছে , সে - নিয়ম বুদ্ধিমান ব্যক্তিকে শেখানো বাহুল্য । তথাপি তার্কিক বলিতে পারে , তুমি যদি অতটা দূরে গেলে , আমি না - হয় আরো কিছুদূর গেলাম , কে আমাকে নিবারণ করিবে । সে তো ঠিক কথা । তোমার রুচি যদি তোমাকে নিবারণ না করে , তবে কাহার পিতৃপুরুষের সাধ্য তোমাকে নিবারণ করিয়া রাখে ।

বেশভূষাতেও সেই তর্ক চলে । যিনি আগাগোড়া বিলাতি ধরিয়াছেন তিনি সমালোচককে বলেন , তুমি কেন চাপকানের সঙ্গে প্যান্টলুন পরিয়াছ । অবশেষে তর্কটা ঝগড়ায় গিয়া দাঁড়ায় ।

সে স্থলে আমার বক্তব্য এই যে , যদি অন্যায় হইয়া থাকে , নিন্দা করো , সংশোধন করো , প্যান্টলুনের পরিবর্তে অন্য কোনোপ্রকার পায়জামা যদি কার্যকর ও সুসংগত হয় তবে তাহার প্রবর্তন করো—তাই বলিয়া তুমি আগাগোড়া দেশীবস্ত্র পরিহার করিবে কেন । একজন এক কান কাটিয়াছে বলিয়া দ্বিতীয় ব্যক্তি খামকা দুই কান কাটিয়া বসিবে , ইহার বাহাদুরিটা কোথায় বুঝিতে পারি না ।

নূতন প্রয়োজনের সঙ্গে যখন প্রথম পরিবর্তনের আরম্ভ হয় , তখন একটা অনিশ্চয়তার প্রাদুর্ভাব হইয়া থাকে । তখন কে কতদূরে যাইবে তাহার সীমা নির্দিষ্ট থাকে না । কিছুদিনের ঠেলাঠেলির পরে পরস্পর আপসে সীমানা পাকা হইয়া আসে । সেই অনিবার্য অনিশ্চয়তার প্রতি দোষারোপ করিয়া যিনি পুরা নকলের দিকে যান , তিনি অত্যন্ত কুদৃষ্টান্ত দেখান ।

কারণ , আলস্য সংক্রামক । পরের তৈরি জিনিসের লোভে তাহাতে আকৃষ্ট হয় । ভুলিয়া যায় , পরের জিনিস কখনোই আপনার করা যায় না । ভুলিয়া যায় , পরের কাপড় পরিতে হইলে , চিরকালই পরের দিকে তাকাইয়া থাকিতে হইবে ।

জড়ত্ব যাহার আরম্ভ , বিকার তাহার পরিণাম । আজ যদি বলি , কে অত ভাবে , তার চেয়ে বিলিতি দোকানে গিয়া একসুট অর্ডার দিয়া আসি—তবে কাল বলিব , প্যান্টলুনটা খাটো হইয়া গেছে , কে এত হাঙ্গাম করে , ইহাতেই কাজ চলিয়া যাইবে ।

কাজ চলিয়া যায় । কারণ , বাঙালি - সমাজে বিলাতি কাপড়ের অসংগতির দিকে কেহ দৃষ্টিপাত করে না । সেইজন্য বিলাতফেরতদের মধ্যেও বিলাতি সাজ সম্বন্ধে ঢিলাভাব দেখা যায় ; সস্তার চেষ্টায় বা আলস্যের গতিকে তাঁহারা অনেকে এমন ভাবে বেশবিন্যাস করেন , যাহা বিধিমত অভদ্র ।

কেবল তাহাই নহে । বাঙালি বন্ধুর বাড়িতে বিবাহ প্রভৃতি শুভকর্মে বাঙালিভদ্রলোক সাজিয়া আসিতে তাঁহারা অবজ্ঞা করেন , আবার বিলাতি ভদ্রতার নিয়মে নিমন্ত্রণ সাজ পরিয়া আসিতেও আলস্য করেন । পরসজ্জা সম্বন্ধে কোন্‌টা বিহিত , কোন্‌টা অবিহিত , সেটা আমাদের মধ্যে প্রচলিত নাই বলিয়া তাঁহারা শিষ্টসমাজের বিধিবিধানের অতীত হইয়া যাইতেছেন । ইংরেজি সমাজে তাঁহারা সামাজিকভাবে চলিতে ফিরিতে পান না । দেশী সমাজকে তাঁহারা সামাজিকভাবে উপেক্ষা করিয়া থাকেন—সুতরাং তাঁহাদের সমস্ত বিধান নিজের বিধান , সুবিধার বিধান ; সে বিধানে আলস্য ঔদাসীন্যকে বাধা দিবার কিছুই নাই । বিলাতের এই - সকল ছাড়া - কাপড় ইহাদের পরপুরুষের গাত্রে কিরূপ বীভৎস হইয়া উঠিবে , তাহা কল্পনা করিলে লোমহর্ষণ উপস্থিত হয় ।

কেবল সাজসজ্জা নহে , আচারব্যবহারে এ - সকল কথা আরো অধিক খাটে । বিলাত হইতে ফিরিয়া আসিয়া দেশী প্রথা হইতে যাঁহারা নিজেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন করিয়াছেন , তাঁহাদের আচারব্যবহারকে সদাচার - সদ্‌ব্যবহারের সীমামধ্যে আবদ্ধ করিয়া রাখিবে কিসে । যে - ইংরেজের আচার তাঁহারা অবলম্বন করিয়াছেন তাঁহাদের সহিত ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ রাখিতে পারেন না , দেশী সমাজের ঘনিষ্ঠতা তাঁহারা বলপূর্বক ছেদন করিয়াছেন ।

এঞ্জিন কাটিয়া লইলেও গাড়ি খানিকক্ষণ চলিতে পারে , বেগ একেবারে বন্ধ হয় না । বিলাতের ধাক্কা বিলাতফেরতের উপর কিছুদিন থাকিতে পারে , তাহার পরে চলিবে কিসে ।

সমাজের হিতার্থে সকল সমাজের মধ্যেই কতকগুলি কঠোর শাসন আপনি অভিব্যক্ত হইয়া উঠে । যাঁহারা স্বেচ্ছাক্রমে আত্মসমাজের ত্যাজ্যপুত্র , এবং চেষ্টাসত্ত্বেও পরসমাজের পোষ্যপুত্র নহেন , তাঁহারা স্বভাবতই দুই সমাজের শাসন পরিত্যাগ করিয়া সুখটুকু লইবার চেষ্টা করিবেন । তাহাতে কি মঙ্গল হইবে ।

ইহাদের একরকম চলিয়া যাইবে , কিন্তু ইহাদের পুত্রপৌত্রেরা কী করিবে , এবং যাহারা নকলের নকল করে , তাহাদের কী দুরবস্থা হইবে ।

দেশী দরিদ্রেরও সমাজ আছে । দরিদ্র হইলেও সে ভদ্র বলিয়া গণ্য হইতে পারে । কিন্তু বিলাতি - সাজা দরিদ্রের কোথাও স্থান নাই । বাঙালি - সাহেব কেবলমাত্র ধনসম্পদ ও ক্ষমতার দ্বারা আপনাকে দুর্গতির ঊর্ধ্বে খাড়া রাখিতে পারে । ঐশ্বর্য হইতে ভ্রষ্ট হইবামাত্র সেই সাহেবের পুত্রটি সর্বপ্রকার আশ্রয়হীন অবমাননার মধ্যে বিলুপ্ত হইয়া যায় । তখন তাহার ক্ষমতাও নাই , সমাজও নাই । তাহার নূতনলব্ধ পৈতৃক গৌরবেরও চিহ্ন নাই , চিরাগত পৈতামহিক সমাজেরও অবলম্বন নাই । তখন সে কে ।

কেবলমাত্র অনুকরণ এবং সুবিধার আকর্ষণে আত্মসমাজ হইতে যাঁহারা নিজেকে বিচ্ছিন্ন করিতেছেন , তাঁহাদের পুত্রপৌত্রেরা তাঁহাদের নিকট কৃতজ্ঞ হইবে না , ইহা নিশ্চয় , এবং যে - দুর্বলচিত্তগণ ইঁহাদের অনুকরণে ধাবিত হইবে , তাহারা সর্বপ্রকারে হাস্যজনক হইয়া উঠিবে , ইহাতেও সন্দেহ নাই ।

যেটা লজ্জার বিষয় , সেইটে লইয়াই বিশেষরূপে গৌরব অনুভব করিতে বসিলে বন্ধুর কর্তব্য তাহাকে সচেতন করিয়া দেওয়া । যিনি সাহেবের অনুকরণ করিয়াছি মনে করিয়া গর্ববোধ করেন তিনি বস্তুত সাহেবির অনুকরণে করিতেছেন । সাহেবির অনুকরণ সহজ , কারণ তাহা বাহ্যিক জড় অংশ ; সাহেবের অনুকরণ শক্ত , কারণ তাহা আন্তরিক মনুষ্যত্ব । যদি সাহেবের অনুকরণ করিবার শক্তি তাঁহার থাকিত , তবে সাহেবির অনুকরণ কখনোই করিতেন না । অতএব কেহ যদি শিব গড়িতে গিয়া মাটির গুণে অন্য কিছু গড়িয়া বসেন , তবে সেটা লইয়া লম্ফঝম্ফ না করাই শ্রেয় ।