সমাজ/বিলাসের ফাঁস

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


ইংরেজ আত্মপরিতৃপ্তির জন্য পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি খরচ করিতেছে , ইহা লইয়া ইংরেজি কাগজে আলোচনা দেখা যাইতেছে । এ কথা তাহাদের অনেকেই বলিতেছে যে , বেতনের ও মজুরির হার আজকাল উচ্চতর হইলেও তাহাদের জীবনযাত্রা এখনকার দিনে পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি দুরূহ হইয়াছে । কেবল যে তাহাদের ভোগস্পৃহা বাড়িয়াছে তাহা নহে , আড়ম্বরপ্রিয়তাও অতিরিক্ত হইয়া উঠিয়াছে । কেবলমাত্র ইংলণ্ড এবং ওয়েল্‌সে বৎসরে সাড়ে তিন লক্ষের অধিক লোক দেনা শোধ করিতে না পারায় আদালতে হাজির হয় । এই - সকল দেনার অধিকাংশই আড়ম্বরের ফল । পূর্বে অল্প আয়ের লোক সাজে সজ্জায় যত বেশি খরচ করিত , এখন তাহার চেয়ে অনেক বেশি করে । বিশেষত মেয়েদের পোশাকের দেনা শোধ করিতে গৃহস্থ ফতুর হইতেছে । যে - স্ত্রীলোক মুদির দোকানে কাজ করে , ছুটির দিনে তাহার কাপড় দেখিয়া তাহাকে আমীর - ঘরের মেয়ে বলিয়া ভ্রম হইয়াছে , এমন ঘটনা দুর্লভ নহে । বৃহৎ ভূসম্পত্তি হইতে যে - সকল ড্যুকের বিপুল আয় আছে , বহুব্যয়সাধ্য নিমন্ত্রণ - আমন্ত্রণে তাহাদেরও টানাটানি পড়িয়াছে , যাহাদের অল্প আয় তাহাদের তো কথাই নাই । ইহাতে লোকের বিবাহে অপ্রবৃত্তি হইয়া তাহার বহুবিধ কুফল ফলিতেছে ।

এই ভোগ এবং আড়ম্বরের ঢেউ আমাদের দেশেও যে উত্তাল হইয়া উঠিয়াছে , সে কথা কাহারো অগোচর নহে । অথচ আমাদের দেশে আয়ের পথ বিলাতের অপেক্ষা সংকীর্ণ । শুধু তাই নয় । দেশের উন্নতির উদ্দেশ্যে যে - সকল আয়োজন আবশ্যক , অর্থাভাবে আমাদের দেশে তাহা সমস্তই অসম্পূর্ণ ।

আড়ম্বরের একটা উদ্দেশ্য লোকের কাছে বাহবা পাওয়া । এই বাহবা পাইবার প্রবৃত্তি এখনকার চেয়ে পূর্বকালে অল্প ছিল । সে কথা মানিতে পারি না । তখনো লোকসমাজে খ্যাত হইবার ইচ্ছা নিঃসন্দেহ এখনকার মতোই প্রবল ছিল । তবে প্রভেদ এই , তখন খ্যাতির পথ এক দিকে ছিল , এখন খ্যাতির পথ অন্য দিকে হইয়াছে ।

তখনকার দিনে দানধ্যান , ক্রিয়াকর্ম , পূজাপার্বণ ও পূর্তকার্যে ধনী ব্যক্তিরা খ্যাতি লাভ করিতেন । এই খ্যাতির প্রলোভনে নিজের সাধ্যাতিরিক্ত কর্মানুষ্ঠানে অনেক সম্পন্ন গৃহস্থ নিঃস্ব হইয়াছেন , এমন ঘটনা শুনা গেছে ।

কিন্তু , এ কথা স্বীকার করতে হইবে যে , যে - আড়ম্বরের গতি নিজের ভোগলালসা তৃপ্তির দিকে নহে , তাহা সাধারণত নিতান্ত অসংযত হইয়া উঠে না , এবং তাহাতে জনসাধারণের মধ্যে ভোগের আদর্শকে বাড়াইয়া তুলিয়া চতুর্দিকে বিলাসের মহামারী সৃষ্টি করে না । মনে করো , যে - ধনীর গৃহে নিত্য অতিথিসেবা ছিল , তাঁহার এই সেবার ব্যয় যতই বেশি হউক না অতিথিরা যে - আহার পাইতেন তাহাতে বিলাসিতার চর্চা হইত না । বিবাহাদি কর্মে রবাহূত অনাহূতদের নিষেধ ছিল না বটে , কিন্তু তাহার ফলে যজ্ঞের আয়োজন বৃহৎ হইলেও যথেষ্ট সরল হইত । ইহাতে সাধারণ লোকের চালচলন বাড়িয়া যাইত না ।

এখনকার দিনে ব্যক্তিগত ভোগের আদর্শ বাড়িয়া উঠিয়াছে , এইজন্য বাহবার স্রোত সেই মুখেই ফিরিয়াছে । এখন আহার পরিচ্ছদ , বাড়ি গাড়ি জুড়ি , আসবাবপত্র দ্বারা লোকে আপন মাহাত্ম্য ঘোষণা করিতেছে । ধনীতে ধনীতে এখন এই লইয়া প্রতিযোগিতা । ইহাতে যে কেবল তাহাদেরই চাল বাড়িয়া যাইতেছে তাহা নহে , যাহারা অশক্ত তাহাদেরও বাড়িতেছে । আমাদের দেশে ইহাতে যে কতদূর পর্যন্ত দুঃখ সৃষ্টি করিতেছে , তাহা আলোচনা করিলেই বুঝা যাইবে । কারণ , আমাদের সমাজের গঠন এখনো বদলায় নাই । এ সমাজ বহুসম্বন্ধবিশিষ্ট । দূর নিকট , স্বজন পরিজন , অনুচর পরিচয় , কাহাকেও এ সমাজ অস্বীকার করে না । অতএব এ সমাজের ক্রিয়াকর্ম বৃহৎ হইতে গেলেই সরল হওয়া অত্যাবশ্যক । না হইলে মানুষের পক্ষে অসাধ্য হইয়া পড়ে ।

পূর্বেই বলিয়াছি এ পর্যন্ত আমাদের সামাজিক কর্মে এই সরলতা ও বিপুলতার সামঞ্জস্য ছিল ; এখন সাধারণের চালচলন বাড়িয়া গেছে অথচ এখন আমাদের সমাজের পরিধি সে পরিমাণে সংকুচিত হয় নাই , এই জন্য সাধারণ লোকের সমাজকৃত্য দুঃসাধ্য হইয়া পড়িয়াছে। আমি জানি , এক ব্যক্তি ত্রিশ টাকা বেতনে কর্ম করে । তাহার পিতার মৃত্যু হইলে পর পিতৃবিয়োগের অপেক্ষা শ্রাদ্ধের ভাবনা তাহাকে অধিক পীড়িত করিতে লাগিল । আমি তাহাকে বলিলাম , “ তোমার আয়ের অনুপাতে তোমার সাধ্য অনুসারে কর্ম নির্বাহ করো - না কেন । ” সে বলিল , তাহার কোনো উপায় নাই , গ্রামের লোক ও আত্মীয়কুটুম্বমণ্ডলীকে না খাওয়াইলে তাহার বিপদ ঘটিবে । এই দরিদ্রের প্রতি সমাজের দাবি সম্পূর্ণই রহিয়াছে অথচ সমাজের ক্ষুধা বাড়িয়া গেছে । পূর্বে যেরূপ আয়োজনে সাধারণে তৃপ্তি হইত এখন আর তাহা হয় না । যাঁহারা ক্ষমতাশালী ধনী লোক , তাঁহারা সমাজকে উপেক্ষা করিতে পারেন । তাঁহারা শহরে আসিয়া কেবলমাত্র বন্ধুমণ্ডলীকে লইয়া সামাজিক ক্রিয়া সম্পন্ন করিতে পারেন , কিন্তু যাঁহারা সংগতিপন্ন নহেন , তাঁহাদের পলাইবার পথ নাই ।

আমরা বীরভূম জেলায় একজন কৃষিজীবী গৃহস্থের বাড়ি বেড়াইতে গিয়াছিলাম । গৃহস্বামী তাহার ছেলেকে চাকরি দিবার জন্য আমাকে অনুরোধ করাতে আমি বলিলাম , “ কেন রে , ছেলেকে চাষবাস ছাড়াইয়া পরের অধীন করিবার চেষ্টা করিস কেন । ” সে কহিল , “ বাবু , একদিন ছিল যখন জমিজমা লইয়া আমরা সুখেই ছিলাম । এখন শুধু জমিজমা হইতে আর দিন চলিবার উপায় নাই । ” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম , “ কেন বল্‌ তো ?” সে উত্তর করিল , “ আমাদের চাল বাড়িয়া গেছে । পূর্বে বাড়িতে কুটুম্ব আসিলে চিঁড়াগুড়েই সন্তুষ্ট হইত , এখন সন্দেশ না পাইলে নিন্দা করে । আমরা শীতের দিনে দোলাই গায়ে দিয়া কাটাইয়াছি , এখন ছেলেরা বিলাতি র‍্যাপার না পাইলে মুখ ভারী করে । আমরা জুতা পায়ে না দিয়াই শ্বশুরবাড়ি গেছি , ছেলেরা বিলাতি জুতা না পরিলে লজ্জায় মাথা হেঁট করে । তাই চাষ করিয়া আর চাষার চলে না । ”

কেহ কেহ বলিবেন , এ - সমস্ত ভালো লক্ষণ ; অভাবের তাড়নায় মানুষকে সচেষ্ট করিয়া তোলে । ইহাতে তাহার সম্পূর্ণ ক্ষমতা বিকাশের উত্তেজনা জন্মে । কেহ কেহ এমনও বলিবেন , বহুসম্বন্ধবিশিষ্ট সমাজ ব্যক্তিত্বকে চাপিয়া নষ্ট করে । অভাবের দায়ে এই সমাজের বহুবন্ধনপাশ শিথিল হইয়া গেলে মানুষ স্বাধীন হইবে । ইহাতে দেশের মঙ্গল ।

এ - সমস্ত তর্কের মীমাংসা সংক্ষেপে হইবার নহে । য়ুরোপে ভোগের তাগিদ দিয়া অনেকগুলি লোককে মারিয়া কতকগুলি লোককে ক্ষমতাশালী করিয়া তোলে । হিন্দু সমাজতন্ত্রে কতকগুলি লোককে অনেকগুলি লোকের জন্য ত্যাগ করিতে বাধ্য করিয়া সমাজকে ক্ষমতাশালী করিয়া রাখে , এই উভয় পন্থাতেই ভালো মন্দ দুইই আছে । য়ুরোপীয় পন্থাই যদি একমাত্র শ্রেয় বলিয়া সপ্রমাণ হইত তাহা হইলে এ বিষয়ে কোনো কথাই ছিল না । য়ুরোপের মনীষিগণের কথায় অবধান করিলে জানা যায় যে , এ সম্বন্ধে তাঁহাদের মধ্যেও মতভেদ আছে ।

যেমন করিয়া হউক , আমাদের হিন্দুসমাজের সমস্ত গ্রন্থি যদি শিথিল হইয়া যায় , তহে ইহা নিশ্চয় যে বহু সহস্র বৎসরে হিন্দুজাতি যে - অটল আশ্রয়ে বহু ঝড় - ঝঞ্ঝা কাটাইয়া আসিয়াছে , তাহা নষ্ট হইয়া যাইবে । ইহার স্থানে নূতন আর - কিছু গড়িয়া উঠিবে কি না , উঠিলেও তাহা আমাদিগকে কিরূপ নির্ভর দিতে পারিবে , তাহা আমরা জানি না । এমন স্থলে , আমাদের যাহা আছে , নিশ্চিন্তমনে তাহার বিনাশদশা দেখিতে পারিব না ।

মুসলমানের আমলে হিন্দুসমাজের যে কোনো ক্ষতি হয় নাই তাহার কারণ , সে - আমলে ভারতবর্ষের আর্থিক পরিবর্তন হয় নাই । ভারতবর্ষের টাকা ভারতবর্ষেই থাকিত , বাহিরের দিকে তাহার টান না পড়াতে আমাদের অন্নের স্বচ্ছলতা ছিল । এই কারণে আমাদের সমাজব্যবহার সহজেই বহুব্যাপক ছিল । তখন ধনোপার্জন আমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির চিন্তাকে এমন করিয়া আকর্ষণ করে নাই । তখন সমাজে ধনের মর্যাদা অধিক ছিল না এবং ধনই সর্বোচ্চ ক্ষমতা বলিয়া গণ্য ছিল না । ধনশালী বৈশ্যগণ যে সমাজে উচ্চস্থান অধিকার করিয়া ছিলেন তাহাও নহে । এই কারণে , ধনকে শ্রেষ্ঠ আসন দিলে জনসাধারণের মনে যে হীনতা আসে , আমাদের দেশে তাহা ছিল না । মুসলমানসমাজে বিলাসিতা যথেষ্ট ছিল এবং তাহা হিন্দুসমাজকে যে একেবারে স্পর্শ করে নাই তাহা বলিতে পারি না । কিন্তু বিলাসিতা সাধারণের মধ্যে ব্যাপ্ত হয় নাই । তখনকার দিনে বিলাসিতাকে নবাবী বলিত । অল্প লোকেরই সে নবাবী চাল ছিল । এখনকার দিনে বিলাসিতাকে বাবুগিরি বলে , দেশে বাবুর অভাব নাই ।

এখন টাকা সম্বন্ধে সমাজস্থ সকলেই অত্যন্ত বেশি সচেতন হইয়া উঠিয়াছে । সেইজন্য আমাদের সমাজেও এমন - একটা দীনতা আসিয়াছে যে টাকা নাই ইহাই স্বীকার করা আমাদের পক্ষে সকলের চেয়ে লজ্জাকর হইয়া উঠিতেছে । ইহাতে ধনাড়ম্বরের প্রবৃত্তি বাড়িয়া উঠে , লোকে ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যয় করে , সকলেই প্রমাণ করিতে বসে যে আমি ধনী । বণিকজাতি রাজসিংহাসনে বসিয়া আমাদিগকে এই ধনদাসত্বের দারিদ্র্যে দীক্ষিত করিয়াছে ।

এই বাবুয়ানার প্রতিযোগিতা উত্তরোত্তর বাড়িয়া উঠায় আমরা যে কত দিক হইতে কত দুঃখ পাইতেছি , তাহার সীমা নাই । ইহার একটা দৃষ্টান্ত দেখো । এক দিকে আমাদের সমাজবিধানে কন্যাকে একটা বিশেষ বয়সে বিবাহ দিতে সকলে বাধ্য , অন্য দিকে পূর্বের ন্যায় নিশ্চিন্তচিত্তে বিবাহ করা চলে না । গৃহস্থজীবনের ভার বহন করিতে যুবকগণ সহজেই শঙ্কা বোধ করে । এমন অবস্থায় কন্যার বিবাহ দিতে হইলে পাত্রকে যে পণ দিয়া ভুলাইতে হইবে , ইহাতে আশ্চর্য কী আছে । পণের পরিমাণও জীবনযাত্রার বর্তমান আদর্শ অনুসারে যা বাড়িয়া যাইবে , ইহাতে আশ্চর্য নাই । এই পণ - লওয়া প্রথার বিরুদ্ধে আজকাল অনেক আলোচনা চলিতেছে ; বস্তুত ইহাতে বাঙালি গৃহস্থের দুঃখ যে অত্যন্ত বাড়িয়াছে তাহাতেও সন্দেহমাত্র নাই , কন্যার বিবাহ লইয়া উদ্‌বিগ্ন হইয়া নাই এমন কন্যার পিতা আজ বাংলাদেশে অল্পই আছে । অথচ , এজন্য আমাদের বর্তমান সাধারণ অবস্থা ছাড়া ব্যক্তিবিশেষকে দোষ দেওয়া যায় না । এক দিকে ভোগের আদর্শ উচ্চ হইয়া সংসারযাত্রা বহুব্যয়সাধ্য ও অপর দিকে কন্যা - মাত্রকেই নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে বিবাহ দিতে বাধ্য হইলে পাত্রের আর্থিক মূল্য না বাড়িয়া গিয়া থাকিতে পারে না । অথচ এমন লজ্জাকর ও অপমানকর প্রথা আর নাই । জীবনের সর্বাপেক্ষা ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ দোকানদারি দিয়া আরম্ভ করা , যাহারা আজ বাদে কাল আমার আত্মীয়শ্রেণীতে গণ্য হইবে আত্মীয়তার অধিকার স্থাপন লইয়া তাহাদের সঙ্গে নির্লজ্জভাবে নির্মমভাবে দরদাম করিতে থাকা—এমন দুঃসহ নীচতা যে - সমাজে প্রবেশ করিয়াছে , সে - সমাজের কল্যাণ নাই , সে - সমাজ নিশ্চয়ই নষ্ট হইতে আরম্ভ করিয়াছে । যাঁহারা এই অমঙ্গল দূর করিতে চান তাঁহারা ইহার মূলে কুঠারাঘাত না করিয়া যদি ডাল ছাঁটিবার চেষ্টা করেন তবে লাভ কী । প্রত্যেকে জীবনযাত্রাকে সরল করুন , সংসারভারকে লঘু করুন , ভোগের আড়ম্বরকে খর্ব করুন , তবে লোকের পক্ষে গৃহী হওয়া সহজ হইবে , টাকার অভাব ও টাকার আকাঙ্ক্ষাই সর্বোচ্চ হইয়া উঠিয়া মানুষকে এতদূর পর্যন্ত নির্লজ্জ করিবে না । গৃহই আমাদের দেশের সমাজের ভিত্তি , সেই গৃহকে যদি আমরা সহজ না করি , মঙ্গল না করি , তাহাকে ত্যাগের দ্বারা নির্মল না করি , তবে অর্থোপার্জনের সহস্র নূতন পথ আবিষ্কৃত হইলেও দুর্গতি হইতে আমাদের নিষ্কৃতি নাই ।

একবার ভাবিয়া দেখো , আজ চাকরি সমস্ত বাঙালি ভদ্রসমাজের গলায় কী ফাঁসই টানিয়া দিয়াছে । এই চাকরি যতই দুর্লভ হইতে থাক্‌ , ইহার প্রাপ্য যতই স্বল্প হইতে থাক্‌ , ইহার অপমান যতই দুঃসহ হইতে থাক্‌ , আমরা ইহারই কাছে মাথা পাতিয়া দিয়াছি । এই দেশব্যাপী চাকরির তাড়নায় আজ সমস্ত বাঙালিজাতি দুর্বল , লাঞ্ছিত , আনন্দহীন । এই চাকরির মায়ায় বাংলার বহুতর সুযোগ্য শিক্ষিত লোক কেবল যে অপমানকেই সম্মান বলিয়া গ্রহণ করিতেছে তাহা নহে , তাহারা দেশের সহিত ধর্মসম্বন্ধে বিচ্ছিন্ন করিতে বাধ্য হইতেছে । আজ তাহার দৃষ্টান্ত দেখো । বিধাতার লীলাসমুদ্র হইতে জোয়ার আসিয়া আজ যখন সমস্ত দেশের হৃদয়স্রোত আত্মশক্তির পথে মুখ ফিরাইয়াছে তখন বিমুখ কারা । তখন গোয়ান্দাগিরি করিয়া সত্যকে মিথ্যা করিয়া তুলিতেছে কারা । তখন ধর্মাধিকরণে বসিয়া অন্যায়ের দণ্ডে দেশপীড়নের সাহায্য করিতেছে কারা । তখন বালকদের অতি পবিত্র গুরুসম্বন্ধ গ্রহণ করিয়াও তাহাদিগকে অপমান ও নির্যাতনের হস্তে অনায়াসে সমর্পণ করিতে উদ্যত হইতেছে কারা । যারা চাকরির ফাঁস গলায় পরিয়াছে । তারা যে কেবল অন্যায় করিতে বাধ্য হইতেছে তাহা নয় , তারা নিজেকে ভুলাইতেছে , তারা প্রমাণ করিতে চেষ্টা করিতেছে যে দেশের লোক ভুল করিতেছে। বলো দেখি , দেশের যোগ্যতম শিক্ষিত সম্প্রদায়ের কণ্ঠে এই - যে চাকরি - শিকলের টান , ইহা কী প্রাণান্তকর টান । এই টানকে আমরা প্রত্যহই বাড়াইয়া তুলিতেছি কী করিয়া । নবাবিয়ানা , সাহেবিয়ানা , বাবুয়ানাকে প্রত্যহই উগ্রতর করিয়া মনকে বিলাসের অধীন করিয়া আপন দাসখতের মেয়াদ এবং কড়ার বাড়াইয়া চলিয়াছি । জীবনযাত্রাকে লঘু করিয়া মাত্র দেশব্যাপী এই চাকরির ফাঁসি এক মুহূর্তে আলগা হইয়া যাইবে । তখন চাষবাস বা সামান্য ব্যবসায়ে প্রবৃত্ত হইতে ভয় হইবে না । তখন এত অকাতরে অপমান সহ্য করিয়া পড়িয়া থাকা সহজ হইবে না ।

আমাদের মধ্যে বিলাসিতা বাড়িয়াছে বলিয়া অনেকে কল্পনা করেন যে ইহা আমাদের ধনবৃদ্ধির লক্ষণ । কিন্তু এ কথা বিচার করিয়া দেখিতে হইবে যে , পূর্বে যে অর্থ সাধারণের কার্যে ব্যয়িত হইত , এখন তাহা ব্যক্তিগত ভোগে ব্যয়িত হইতেছে । ইহাতে ফল হইতেছে দেশের ভোগবিলাসের স্থানগুলি সমৃদ্ধিশালী হইয়া উঠিতেছে , শহরগুলি ফাঁপিয়া উঠিতেছে , কিন্তু পল্লীগুলিতে দারিদ্র্যের অবধি নাই । সমস্ত বাংলাদেশে পল্লীতে দেবমন্দির ভাঙিয়া পড়িতেছে , পুষ্করিণীর জল স্নান - পানের অযোগ্য হইতেছে , গ্রামগুলি জঙ্গলে ভরিয়া উঠিয়াছে , এবং যে - দেশ বারো মাসে তেরো পার্বণে মুখরিত হইয়া থাকিত সে - দেশ নিরানন্দ নিস্তব্ধ হইয়া গেছে । দেশের অধিকাংশ অর্থ শহরে আকৃষ্ট হইয়া , কোঠাবাড়ি গাড়িঘোড়া সাজসরঞ্জাম আহারবিহারেই উড়িয়া যাইতেছে । অথচ যাঁহারা এইরূপ ভোগবিলাসে ও আড়ম্বরে আত্মসমর্পণ করিয়াছেন , তাঁহারা প্রায় কেহই সুখে স্বচ্ছন্দে নাই ; তাঁহাদের অনেকেরই টানাটানি , অনেকেরই ঋণ , অনেকেরই পৈতৃক সম্পত্তি মহাজনের দায়মুক্ত করিবার জন্য চিরজীবন নষ্ট হইতেছে—কন্যার বিবাহ দেওয়া , পুত্রকে মানুষ করিয়া তোলা , পৈতৃক কীর্তি রক্ষা করিয়া চলা , অনেকেরই পক্ষে বিশেষ কষ্টসাধ্য হইয়াছে । যে - ধন সমস্ত দেশের বিচিত্র অভাবমোচনের জন্য চারি দিকে ব্যাপ্ত হইত , সেই ধন সংকীর্ণ স্থানে আবদ্ধ হইয়া যে ঐশ্বর্যের মায়া সৃজন করিতেছে তাহা বিশ্বাসযোগ্য নহে । সমস্ত শরীরকে প্রতারণা করিয়া কেবল মুখেই যদি রক্ত সঞ্চার হয় , তবে তাহাকে স্বাস্থ্য বলা যায় না । দেশের ধর্মস্থানকে বন্ধুস্থানকে জন্মস্থানকে কৃশ করিয়া , কেবল ভোগস্থানকে স্ফীত করিয়া তুলিলে , বাহির হইতে মনে হয় যেন দেশের শ্রীবৃদ্ধি হইতে চলিল । সেইজন্য এই ছদ্মবেশী সর্বনাশই আমাদের পক্ষে অতিশয় ভয়াবহ । মঙ্গল করিবার শক্তিই ধন , বিলাস ধন নহে ।