সমূহ/অপর পক্ষের কথা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


ভাদ্রমাসের ভারতীতে 'মুখুজ্জে বনাম বাঁড়ুজ্জে' প্রবন্ধের লেখক বাঁড়ুজ্জেমশায়দের হইয়া যে ওকালতি করিয়াছেন তাহা পক্ষপাতবিহীন নহে। ইংরাজ-প্রসাদ-বুভুক্ষু উপাধিভিক্ষুকদের পক্ষে আমি কোনো কথা বলিতে চাহি না, কিন্তু লেখক অন্যপক্ষীয়দের প্রতি যে-সমস্ত গুণের আরোপ করিয়াছেন তাহার কোনো প্রমাণ দেন নাই।

এ কথা সত্য হইতে পারে এখনকার জমিদারবর্গ রাজপুরুষদের অত্যন্ত ন্যাওটো হইয়া পড়িয়াছেন, দেশের লোকের দিকে তাঁহারা তাকান না স্বদেশীয়দের নিকট হইতে খ্যাতিলাভের জন্য এবং স্বদেশের প্রতি স্বাভাবিক বদান্যতা-বশত পুরাকালের জমিদারগণ যে-সকল কীর্তিকলাপ স্থাপন করিতেন, এখনকার জমিদারগণ তাহাতে উৎসাহ বোধ করেন না।

কেন করেন না। পূর্বোক্ত প্রবন্ধে তাহার কতকটা হেতু দেওয়া হইয়াছে। ইংরাজের প্রভাব আমাদের দেশে এত অধিক প্রবল হইয়াছে যে, তাহা সকল প্রভাবকে ছাড়াইয়া উঠিয়াছে। দেশের লোককে আমরা গণ্য জ্ঞান করি না। দেশের লোকের কাছে প্রশংসা পাওয়ার কোনো স্বাদ নাই।

মুসলমানদের আমলে আমরা স্বদেশকে তুচ্ছ বোধ করিতাম না। কারণ, বিজেতারা আমাদের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হইলেও আমাদেরও নানা বিষয়ে শ্রেষ্ঠতা ছিল। অন্তত আমাদের উভয়ের মধ্যে গুরুতর পার্থক্য ছিল না।

কিন্তু ইংরাজ-রাজার সঙ্গে আমাদের প্রভেদ সর্ব বিষয়ে এত অত্যধিক, তাহাদের বুদ্ধিবল যন্ত্রতন্ত্র বিলাসবিভূতি সর্বদাই আমাদের পক্ষে এত দুরায়ত্ত বলিয়া বোধ হয় যে, অলক্ষিতভাবে আপনাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা হ্রাস হইয়া আসিয়াছে।

যে অনিবার্য শ্রদ্ধার অভাবে ইংরাজ অনেক সময় আমাদের প্রতি সদ্‌বিচার করিতে পারে না সেই শ্রদ্ধার অভাবে স্বদেশের লোকও আমাদের প্রতি বিমুখ হইয়াছে।

সেইজন্য আমাদের দেশের অনেক শিক্ষিত লোক এবং বিলাত-ফেরতরা সাধারণ লোকদের হইতে আপনাদিগকে যেন স্বতন্ত্রশ্রেণীভুক্ত করিয়া রাখিতে ভালোবাসেন। বাহ্য বেশভূষা আচারব্যবহারেও তাঁহারা আপনাদের পার্থক্য কিছু যেন অস্বাভাবিক আড়ম্বরের সহিত জাহির করিয়া রাখিতে চান।

কতকটা পার্থক্য যে আপনিই হইয়া পড়ে সে কথা অস্বীকার করিবার জো নাই। ইংরাজি-শিক্ষিত এবং ইংরাজিতে অশিক্ষিত লোকদের মধ্যে যে কেবল শিক্ষার তারতম্য তাহা নহে, শিক্ষার শ্রেণীভেদ বর্তমান। পরস্পরের বিশ্বাস সংস্কার রুচি এবং চিন্তা করিবার প্রণালী ভিন্ন রকমের হইয়া যায়। এবং ইংরাজি-শিক্ষিত ব্যক্তি আপনাদিগকেই শিক্ষিত ও শ্রেষ্ঠ এবং অপরসাধারণকে অশিক্ষিত এবং পশ্চাদ্‌বর্তী না মনে করিয়া থাকিতে পারে না।

জ্ঞানস্পৃহা ও রসবোধ, বুদ্ধি এবং কল্পনা, সাহস ও বাহুবল, অধ্যবসায় ও আত্মসম্মানে য়ুরোপীয় জাতির যে এক মহোচ্চ আদর্শ ইংরাজি শিক্ষা আমাদের মনে জাজ্বল্যমান করিয়া তুলিতেছে তাহার যদি কোনো আকর্ষণ না থাকিবে তবে আমাদের শিক্ষাকে ধিক্‌!

সেই আকর্ষণ আমাদিগকে অনেক সময় ছদ্মবেশ এবং আত্মপ্রতারণায় লইয়া যায়। কেবল ইংরাজি শিখিয়াই আমরা যেন ইংরাজের মহত্ত্বকে কতকটা আপনার বলিয়া মনে করি, এবং যাহারা ইংরাজি শেখে নাই তাহাদিগকে কতকটা বাহিরের লোকের মতো করিয়া দেখি। ইংরাজের মহত্ত্ব যে ঐতিহাসিক, তাহা যে বংশপরম্পরাগত, কর্মগত, চরিত্রগত– ইংরাজের ভাষা সাহিত্য বিজ্ঞান যে সেই ইতিহাস, সেই চরিত্র হইতে উদ্ভুত হইয়াছে– তাহা যে শুদ্ধমাত্র স্কুলে অধ্যয়ন এবং পরীক্ষা পাস হইতে নহে– ইহা আমরা চোখ বুজিয়া ভুলিতে ইচ্ছা করি। এবং ইংরাজের স্কুলে পড়িয়াছি বলিয়াই আমরা নিজেকে ইংরাজশ্রেণীয় জ্ঞান করি।

এইরূপ ইংরাজের টানে দেশ হইতে পৃথক হইয়া যাইবার যে ভাব আমাদের মধ্যে দেখা যাইতেছে তাহা কোনো এক পক্ষের মধ্যে বদ্ধ নহে; তাহা নানা আকারে নানা দিক হইতে প্রকাশ পায়। মুখুজ্জেমশায় এবং বাঁড়ুজ্জেমশায় কেহই তাহা হইতে পরিত্রাণ পান নাই।

আজকাল জমিদারবর্গ ইংরাজের মুখ না তাকাইয়া, উপাধির দিকে লক্ষ না রাখিয়া দেশহিতকর কোনো কাজে প্রবৃত্ত হইতে চান না– দেশের লোকের স্তুতিনিন্দা তাঁহাদের কাছে এতই ক্ষুদ্র হইয়া গেছে।

তেমনি আমাদের দেশে যাঁহারা জননায়ক বলিয়া সর্বদা সভামঞ্চের উপরে আরোহণ করেন তাঁহাদেরও ভাবগতিক দেখিয়া আমাদের মনে আশ্বাস হয় না। বরঞ্চ আমাদের জমিদারদিগকে দেখিতে শুনিতে ঠিক আমাদের দেশের লোকের মতো, কিন্তু আমাদের জননায়কদের অনেকেই যে দেশের মুরুব্বি বলিয়া আপনাদিগকে প্রচার করেন সে দেশকে আচারে ব্যবহারে জীবনযাত্রায় অহরহ অপমানিত করেন। ইংরাজরাহুকর্তৃক জমিদারদের যদি অর্ধগ্রাস হইয়া থাকে, ইহাদের একেবারে পূর্ণগ্রাস।

জমিদারগণ দেশের জন্য যাহা করেন তাহা গবর্মেন্টের মুখ তাকাইয়া, ইঁহারা যাহা করেন তাহাও ইংরাজের প্রতি লক্ষ রাখিয়া। তাহার ভাষা ইংরাজি, তাহার প্রণালী ইংরাজী, তাহার প্রচার ইংরাজিতে। ইংরাজ-দৃষ্টির প্রবল আকর্ষণ হইতে ইঁহারা আপনাদিগকে প্রাণ ধরিয়া বিচ্ছিন্ন করিতে পারেন না।

এই স্থলে আমাদের কোনো বন্ধুর লেখা হইতে নিন্মলিখিত সংবাদটি আমরা উদ্‌ধৃত করি–

স্বর্গীয় ভূদেব মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের স্বদেশপ্রীতির বিষয় অনেকেই অবগত আছেন। দুই-তিন বার কন্‌গ্রেস হইবার পর একজন ভদ্রলোক তাঁহাকে কন্‌গ্রেস সম্বন্ধে অভিপ্রায় জিজ্ঞাসা করাতে তিনি বলেন, 'ভারতবর্ষ একটা মহাদেশ; এই মহাদেশের অন্তর্গত প্রত্যেক বিভাগের নেতাগণের যত্নে যদি সমস্ত দেশ মিলিত হইতে পারে তাহা হইলে এক মহাজাতির অভ্যুত্থান কল্পনা করিতে পারি বটে, কিন্তু বর্তমান কন্‌গ্রেসওয়ালাদিগের দ্বারা যে তাহা সংসাধিত হইবে না তাহা নিশ্চয় বলা যায়। ইহাদের উদ্যম-আলোচনা-আন্দোলনের ফলে চাই কি আমাদের অনেক অভাব-অবিচার দূর হইতে পারে, কিন্তু রাজার নিকট সুবিচারপ্রাপ্তি কিংবা দুই-এক স্থলে রাজার সহিত সমান অধিকার-প্রাপ্তিই যদি কন্‌গ্রেসের লক্ষ্য হয় তাহা হইলে কন্‌গ্রেসের উদ্দেশ্য যে অতি ক্ষুদ্র সংকীর্ণ ও অদূরদর্শী তাহা বলিতে বাধ্য হইব। কন্‌গ্রেসওয়ালারা যদি সুসজ্জিত পট্টাবাসের পরিবর্তে হোগলার চালা, চেয়ারের পরিবর্তে কেবলমাত্র মাদুর, পেন্টুলুনের পরিবর্তে ধুতি, এবং ইংরাজির পরিবর্তে ভারতবর্ষীয় ভাষার ব্যবহার করিতে সংকুচিত হয়েন তাহা হইলে বর্তমান কন্‌গ্রেস দ্বারা দেশের কোনো স্থায়ী উপকার সম্ভবপর নহে।’

মুখে মুখে কথা বিকৃত হয় এবং ভূদেববাবু ঠিক কী কথাটা বলিয়াছিলেন তাহা জানি না। আমাদের মনে উদ্দেশ্য যাহাই থাক্‌, তাহা যতই সংকীর্ণ হউক, কিন্তু অনুষ্ঠান যদি বৃহৎ হয় তবে উদ্দেশ্যও আপনি বাড়িয়া চলে। সূচির মুখে সুতা পরাইতেও যদি বাতি জ্বালি তবে সেই বাতিতে সমস্ত ঘর আলোকিত হইয়া উঠে। তেমনি যে উদ্দেশ্যেই কন্‌গ্রেস হউক, তাহা স্বভাবতই আপন উদ্দেশ্যকে বহুদূরে ছাড়াইয়া গিয়া দেশের বৃহৎ মঙ্গলের অবতারণা করিবে ইহা আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস। কিন্তু জনসভা ও জনসভাপতিদের মধ্যে ভূদেববাবু যে-সকল দুর্লক্ষণ লক্ষ্য করিয়াছেন তাহাও আমাদের ভাবিবার কথা। আমরা মাছ ধরিতে চাই, কিন্তু জলের সহিত সংস্রব রাখিতে চাই না; আমরা দেশের হিত করিব, কিন্তু দেশকে আমরা স্পর্শ করিব না।

দেশকে কেমন করিয়া স্পর্শ করিতে হয়? দেশের ভাষা বলিয়া, দেশের বস্ত্র পরিয়া। ইংরাজের প্রবল আদর্শ যদি মাতার ভাষা এবং ভ্রাতার বস্ত্র হইতে আমাদিগকে দূরে বিচ্ছিন্ন করিয়া লইয়া যায় তবে জননায়কের পদ গ্রহণ করিতে যাওয়া নিতান্তই অসংগত।

কিন্তু ভিন্নভাষী ভারতকে এক করিবার জন্য কন্‌গ্রেসের ভাষা ইংরাজি হওয়া উচিত এমন তর্ক যাঁহারা এ স্থলে উত্থাপন করিবেন তাঁহারা আমার কথা সম্পূর্ণ বুঝিতে পারেন নাই। যেখানে ইংরাজি বলা দরকার সেখানে অবশ্য ইংরাজি বলিবে। কিন্তু তোমার ভাষাটা কী? তোমার লেখাপড়া ধ্যানধারণা মন্ত্রতন্ত্র সমস্তই ইংরাজিতে কি না? জনসভার বাহিরে দেশের সহিত তুমি কিরূপ সংস্রব রাখিয়া চল? ইংরাজি ভাষায় যেটুকু কর্তব্য তাহা যেন সাধন করিলে, কিন্তু দেশী ভাষায় যে কর্তব্যপুঞ্জ পড়িয়া আছে, যাহা কাগজে রিপোর্টের জন্য নহে, যাহা সমুদ্রপারে উদ্‌বেলিত হইবার জন্য নহে, যাহার ফলাফল যাহার ধ্বনিপ্রতিধ্বনি সুদ্ধমাত্র আমাদের দেশীমন্ডলীর মধ্যে বদ্ধ, তাহাতে হাত দিতে তোমার মন উঠে? গবর্মেন্টের সম্মান যাঁহাদের কর্তব্যবুদ্ধির আশ্রয়দণ্ড তাঁহাদিগকে তোমরা নিন্দা কর, কিন্তু ইংরাজ-করতালির এলাকার বাহিরে যাঁহাদের কর্তব্যবুদ্ধি পদনিক্ষেপ করে না তাঁহারাই কি প্রচুর সম্মানের অধিকারী!

কন্‌‍গ্রেস যেমন সমস্ত ভারতবর্ষের মিলন-সভা, কন্ফারেন্স তেমনি সমস্ত বাংলার। সেই সমগ্র বাংলার মিলনক্ষেত্রে বাঙালির কী অভাব, বাঙালির কী কর্তব্য, সেও যদি আমরা ইংরাজি ভাষায় বলিবার প্রলোভন সংবরণ করিতে না পারি তবে তাহা হইতে কী প্রমাণ হয়। এই প্রমাণ হয় যে, দেশকে যাঁহারা চালনা করিতে চাহেন তাঁহারা, হয় দেশী ভাষা জানেন না, নয়, কর্তব্যের ক্ষতি করিয়াও ইংরাজি ভাষা ব্যবহার না করিলে তাঁহাদের অভিমান চরিতার্থ হয় না।

অতএব ভালো করিয়া দেখিলে দেখা যায়, জমিদারের চরিত্রে যে ঘুণ ঢুকিয়াছে আমাদের জননায়কদের চরিত্রেও সেই ঘুণ। ইংরাজের কৈশিকাকর্ষণ আমাদের দুই পক্ষেরই মস্তকের উপরে। ইংরাজকে বাদ দিলে আমাদের কর্তব্যে স্বাদ থাকে না, সম্মানে গৌরব থাকে না, বেশভূষায় মর্যাদা থাকে না; আমাদের দেশের লোকের খ্যাতি অপেক্ষা গবর্মেন্টের খেতাব, আমাদের দেশের লোকের আর্শীবাদ অপেক্ষা বিলাতি কাগজের রির্পোট্ আমাদের কাছে শ্রেয়।

ইংরাজের সহিত সমান অধিকার ভিক্ষা করিয়া লইবার জন্য ইংরাজি ভাষা আবশ্যক হইতে পারে, কিন্তু স্বদেশকে উচ্চতর অধিকারের উপযোগী করিয়া তুলিবার জন্য দেশীয় ভাষা, দেশীয় সাহিত্য, দেশীয় সমাজের মধ্যে থাকিয়া সমাজের উন্নতিসাধন একমাত্র উপায়। যাঁহারা স্বদেশ অপেক্ষা আপনাকে অনেক ঊর্ধ্বে অধিষ্ঠিত বলিয়া জানেন, যাঁহারা স্বদেশের সহিত এক পঙ্‌ক্তিতে বসিতে লজ্জাবোধ করেন তাঁহারাও স্বদেশকে অনুগ্রহ করিয়া থাকেন, স্বীকার করি। কিন্তু সেটুকু না করিয়া যদি তাঁহারা নিজের দেশকে নিজের উপযুক্ত জ্ঞান করেন এবং নিজেকে স্বদেশের উপযুক্ত করিয়া তুলিতে চেষ্টা করেন তবে তাহাতে তাঁহাদেরও আত্মসম্মান থাকে এবং দেশকেও সম্মান করা হয়।