সমূহ/মুখুজ্জে বনাম বাঁড়ুজ্জে

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


রাজা প্যারীমোহন মুখোপাধ্যায় মহাশয় সম্প্রতি এক-সম্প্রদায় জমিদারের মুখপাত্র হইয়া কন্‌গ্রেস-পক্ষীয়ের প্রতি অবজ্ঞাপ্রকাশপূর্বক আক্ষেপ করিয়াছেন যে, দেশের যাঁহারা 'ন্যাচারাল লীডার' বা স্বাভাবিক অধিনেতা বা প্রকৃত মোড়ল, নানা অস্বাভাবিক কারণে ক্ষমতা তাহাদের হস্ত হইতে বিচ্যুত হইয়া পড়িতেছে।

রাজত্ব কাহার হইবে ইহা লইয়া অনেক দেশে অনেক লড়াই হইয়া গিয়াছে। কুরুপান্ডবের মধ্যেও একটা খুব বড়োরকম তর্ক হইয়াছিল যে, রাজ্যে কাহার স্বাভাবিক অধিকার। উভয় পক্ষ হইতে যে-সকল সূক্ষ্ম এবং স্থূল, তীক্ষ্ণ এবং গুরুতর মারাত্মক যুক্তি প্রয়োগ হইয়াছিল মহাভারতে তাহার বিস্তারিত বর্ণনা আছে।

দাদা ধৃতরাষ্ট্র বড়ো বটে কিন্তু তিনি অন্ধ, সেইজন্য কনিষ্ঠবংশে রাজ্যের ভার পড়িয়াছিল। আমাদের জমিদার-কৌরবপক্ষীয়ের যদি স্বাভাবিক অন্ধতা না থাকিত তবে কনিষ্ঠ কন্‌গ্রেস-পান্ডবগণের নেতৃত্ব-সিংহাসনে দাবি থাকিত না।

যাহা হউক, গৃহবিবাদে মঙ্গল নাই। কতকটা সুখের বিষয় এই যে, এ বিবাদ একটা মৌখিক অভিনয় মাত্র। মুখুজ্জেমহাশয় মনে মনে বেশ জানেন যে, বাঁড়ুজ্জেমহাশয় কম লোক নহেন, কিন্তু সরকারের কাছে সে কথা বলিয়া সুবিধা নাই। তাঁহাদের বলিতে হয়, হুজুরেরা যে কন্‌গ্রেসকে দু চক্ষে দেখিতে পারেন না, আমাদেরও ঠিক সেই দশা।

ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ, গান্ধারী সেই আক্ষেপে নিজের চোখে কাপড় বাঁধিতেন, কারণ তিনি সাধ্বী ছিলেন। গবর্মেন্ট্‌ যদি কাহারও প্রতি অন্ধ হন তবে মুখুজ্জেমহাশয়ের কর্তব্য চোখে কাপড় বাঁধা, কারণ তাঁহারা খয়ের-খাঁ।

কেবল রাজভক্তি নহে, ইহার মধ্যে একটু পাকা চালও আছে। উপরওয়ালা রাজপুরুষেরা আজকাল যখন স্পষ্টত নূতন জনসভা-সকলের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করিয়াছেন তখন এ কথা বলিবার সুযোগ হইয়াছে যে, সরকার যদি মুখুজ্জেমহাশয়দিগকে যথেষ্ট পরিমাণে বাড়াইয়া দেন তাহা হইলে বাঁড়ুজ্জেমহাশয়রা আর এত বাড়াবাড়ি করিতে পারেন না। আমরা স্বভাবতই বড়োলোক, তোমরাও আমাদিগকে বড়ো করিয়া রাখো, কন্‌গ্রেস আপনি ছোটো হইয়া যাইবে। আমরা স্ফীত আছি বটে, কিন্তু আরো স্ফীত হইতে পারি, তোমরা আর-একটু ফুঁ দাও যদি। তাহা হইলে ঐ চাকরি-বঞ্চিত নৈরাশ্যপীড়িত কৃশ কন্‌গ্রেসটাকে আরো অনেকটা ক্ষীণ দেখিতে হয়।

কন্‌‍গ্রেসকে নির্বাসনে দিয়া নিজেরা পরিপুষ্ট হইবার জন্য জমিদার-সমাজ এ একটা দ্যূতক্রীড়ার সূচনা করিয়াছেন। তাঁহারা সময় বুঝিয়া যে অক্ষ ফেলিয়াছেন তাহা সম্পূর্ণ অকপট নহে ইহাই বর্তমান প্রবন্ধের আলোচ্য। এইবার পৌরাণিক তুলনাটাকে খতম করিয়া দিয়া প্রকৃত বিষয়ের অবতারণা করি।

প্রশ্ন এই যে, আমাদের দেশের জনসাধারণের স্বাভাবিক অধিনেতা কে। উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ, 'লীডার' ইংরেজি শব্দ যদিচ আমাদের অভ্যস্ত এবং তাহার বাংলা অনুবাদও সুকঠিন নহে, এবং সৈন্যগণের নেতা, ধর্মসম্প্রদায়ের নেতা প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপে নেতৃত্বের ভাব আমাদের নিকট পরিচিত বলিয়া জনসাধারণের নেতা শব্দটা আমাদের কানে খট্‌ করিয়া বাজে না, কিন্তু জিনিসটা এখানকার নহে। এই নেতৃত্বের কোনো ঐতিহাসিক নজির নাই, সুতরাং কাহার পক্ষে ইহা স্বাভাবিক, অর্থাৎ চিরপ্রথাসংগত তাহা হঠাৎ বলা যায় না।

প্রথম কথা এই যে, জনসাধারণ বলিয়া একটা পদার্থ এ দেশে ছিল না। গ্রাম ছিল, পল্লী ছিল, পরিবার ছিল, পঞ্চায়েত ছিল, মোড়ল ছিল, কর্তা ছিল, কিন্তু জনসাধারণ ছিল না, এবং তাহার অধিনেতা আরো দুর্লভ ছিল।

এক্ষণে ইংরাজের দৃষ্টান্ত শিক্ষা এবং একেশ্বর রাজত্বের বিপুল পক্ষপুটের তা লাগিয়া জনসাধারণ যদি ফুটিয়া উঠিবার উপক্রম করে, সে আপনার মাথা আপনি লইয়া আসিবে। গবর্মেন্ট্‌ জোর করিয়া মুখুজ্জেমহাশয়দিগকে তাহার সহিত যোজনা করিয়া দিলে আর-কিছু না হউক, তাহা তাঁহাদের কথিতমত ন্যাচারাল, অর্থাৎ স্বাভাবিক হইবে না। এমন-কি, জনসাধারণ-নামক বিরাট বিহঙ্গমের মুণ্ডটাই সব প্রথমে চক্ষুদ্বারা ঠুকিয়া ঠুকিয়া ডিম্ব বিদারণ করিয়া আলোকপথে দেখা দেয়, পুচ্ছ অংশ পরে বাহির হইয়া পড়ে। আমরা এখন সেই অবস্থায় আছি। জনসাধারণের মুণ্ড যাঁহারা তাঁহারাই সম্প্রতি বহুকলরবসহকারে প্রকাশমান, তাঁহাদেরই চঞ্চুযুগল মুক্তিপথের কঠিন আবরণ-অপসারণে প্রবৃত্ত, অবশিষ্ট অংশ এখনো বাধাদ্বারা গুপ্ত। মুখুজ্জেমহাশয়েরা যে সেই পুচ্ছের মধ্যে প্রচ্ছন্ন আছেন তাহা না হইতে পারে। তাঁহারা জনসাধারণ নহেন, তাঁহারা বিশিষ্টসাধারণ; মাটিতে তাঁহাদের বাসা নহে, উচ্চ শাখায় তাঁহাদের নীড়; কিন্তু তাঁহারা যতই মহৎ হউন-না কেন, জনসাধারণের মুখপাত্র নহেন।

অবশ্য, এ কথা স্বীকার করিতেই হয়, যাঁহার হস্তে ক্ষমতা অধিক অনেক লোক তাঁহার অনুবর্তী হইয়া থাকে। কিন্তু আমাদের শাস্ত্রে এবং দেশাচারে ক্ষমতা এমনি খন্ড খন্ড বিভাগ করিয়া দিয়াছে যে, যত বড়োই লোক হউন, তাঁহার ক্ষমতা পদে পদে সীমাবদ্ধ। আমাদের দেশে জমিদার জমিদারমাত্র। তিনি জুলুম করিয়া খাজনা আদায় করিতে পারেন, কিন্তু সমাজে তাঁহার অধিক অধিকার নাই। তাঁহারই একজন দীন প্রজা সমাজে হয়তো তাঁহা অপেক্ষা প্রতাপশালী। এইজন্য জাতি ও সমাজ লইয়া রাজা-মহারাজাকেও হিম্‌সিম্‌ খাইতে হয়।

ইংলন্ডে ইহা সম্ভবপর নহে। একজন ইংরাজ বড়ো জমিদার তাঁহার কোনো দীন প্রজা অপেক্ষা সমাজে খাটো হইতে পারেন না। তাঁহার ধনসম্পদ ও ক্ষমতা সমাজে তাঁহাকে উচ্চাসন দেয়। তাঁহার অধীনস্থ কোনো ফার্মার (বাংলার জোতদারের সমতুল্য ব্যক্তি) সোসাইটিতে তাঁহাকে অতিক্রম করিতে পারে না। অতএব সে স্থলে একজন ইংরাজ বড়ো জমিদার প্রজাদের নিকট হইতে সর্বতোভাবে মর্যাদালাভ করিতে পারেন।

কেবল তাহাই নহে। ইংলন্ডে উপাধিধারী প্রাচীন জমিদারবংশ আছে। শুনা যায়, এই-সকল প্রাচীন উপাধিধারীর প্রতি মুগ্ধভাব ইংরাজ জনসাধারণের মধ্যে অত্যন্ত প্রবল। তাহার কারণ, এই-সকল লর্ড্‌ প্রভৃতি উপাধির সহিত অধিনায়কতার ভাব দেশের লোকের মনে বদ্ধমূল। পূর্ব-ইতিহাসে যুদ্ধবিগ্রহ শান্তিস্থাপন এবং সর্বপ্রকার সাধারণকার্যের নেতৃত্বে ইঁহারাই এক কালে প্রধান ছিলেন। এখন যদিচ ইঁহাদের কার্যকারিতা হ্রাস হইয়া ইঁহারা অনেকটা অলংকারের কাজ করিতেছেন, তথাপি কালপরম্পরাগত সেই সম্মানপ্রবাহ তাঁহাদিগকে সমাজের অগ্রভাগে বহন করিয়া রাখিয়াছে।

আমাদের দেশে তাহার অনুরূপ আদর্শ ব্রাহ্মণমণ্ডলী। কিন্তু ভ্রান্ত উপমা খাটাইয়া আমাদের জমিদারবর্গ আপনাদিগকে ইংলন্ডের সেই লর্ড্‌শ্রেণীর সহিত তুলনীয় জ্ঞান করেন, এবং তাঁহাদের ভাবভঙ্গি অনুকরণেরও চেষ্টা করিয়া থাকেন। তাঁহারা বলেন, আমরা অ্যারিস্টক্র্যাট্‌স্‌।

অ্যারিস্টক্র্যাট্‌ শব্দের বাংলাই পাওয়া যায় না। প্রাচীন ‘অভিজাত’ শব্দ বাংলাদেশে অপরিচিত। ‘কুলীন’ শব্দ সর্বজনবিদিত। কিন্তু কৌলীন্য বিলাতিভাবের অ্যারিস্টক্র্যাসি নহে।

আমাদের দেশে ধনের সম্মান য়ুরোপের ন্যায় তেমন অধিক নহে। এমন-কি, যে-সকল জাতির মধ্যে ধনী মহাজন বিস্তর আছে তাহারা সমাজে উচ্চ স্থান লাভ করিতে পারে নাই।

আমাদের দেশে রাজা-রায়বাহাদুরদের দেখিয়াও লোকে অত্যন্ত অভিভূত হইয়া পড়ে না। তাহার একটা কারণ এই যে, এই-সকল পদবী-দ্বারা উপাধিধারিগণ সমাজে এক ইঞ্চি উপরে উঠিতে পারেন না। বিবাহ প্রভৃতি ব্যাপারে যাহাদের সহিত তাঁহাদের আদানপ্রদান চলে তাহাদের কেহ হয়তো যাত্রার দলে বেহালা বাজায়— এমন-কি, কেহ হয়তো কন্‌গ্রেসের উপাধিহীন প্রতিনিধি। ইংলন্ডীয় সমাজে যাঁহারা উপরকার দশজনা বলিয়া বিখ্যাত নীচেকার দশ লক্ষের সহিত তাঁহাদের ব্যবধান দুর্গম। এইজন্য সেই দশ লক্ষের ভক্তি সেই রহস্যাবৃত দশজনার দিকে ধাবিত হইতে থাকে। আমাদের দেশে গবর্মেণ্টের খেতাব দশ লক্ষের সন্নিধান হইতে সেই দশজনাকে কাঁটাগাছের মতো বেড়িয়া রাখিতে পারে নাই। বৈবাহিকমহাশয়েরা আভিজাত্যের ব্যূহ চারি দিক হইতেই ভেদ করিয়া দেন।

আবার রাজা-রায়বাহাদুর-বংশের শাখা-প্রশাখা আত্মীয়-কুটুম্ব ভাগিনেয়-ভ্রাতুষ্পুত্র খুড়তুত-মাসতুত ভাইরা মিলিয়া উক্ত বংশকে বংশমর্যাদার বহুদূর বাহিরে ব্যাপ্ত বিক্ষিপ্ত করিয়া দেয়। বটের উচ্চ শাখা যেমন তাহার নিম্নগামী অসংখ্য ঝোরাকে ঝাড়িয়া ফেলিতে পারে না, যতই অদ্ভুত এবং যতই গুরুতর হউক তাহাদিগকে রাত্রিদিন ঘনিষ্ঠভাবে বহন করিতে থাকে, তেমনি আমাদের দেশে নিম্নগামী দূরতম এবং দীনতম কুটুম্বস্বজনকেও ত্যাগ করিবার জো নাই; যদি-বা তাহাদিগকে অন্ন হইতে বঞ্চিত করা যায় তথাপি সর্বপ্রকার ক্রিয়াকর্মে লৌকিকাচারে তাহাদের স্পর্শক্রামকতা হইতে আপন আভিজাত্যকে বাঁচাইয়া চলিবার কোনো উপায় নাই। এইরূপে উচ্চ পদবী বাহিরকে ভিতর হইতে এবং ভিতরকে বাহির হইতে ঠেকাইয়া রাখিতে পারে না। সাধারণ এবং অসাধারণের মাঝখানে মায়াগন্ডি কিছুতেই টিকে না।

আমাদের দেশে কঠিন জাতিভেদ যেমন এক দিকে ভিন্ন বর্ণের মধ্যে অলঙ্ঘ্য সামাজিক ব্যবধান স্থাপন করিয়াছে তেমনি অন্য দিকে ধনী দরিদ্র, উচ্চ নীচ, রাজটিকা-লাঞ্ছিত ও খেতাববঞ্চিতদিগকে সমান করিয়া রাখিয়াছে।

প্রাচীন বংশের একটা মোহ আছে বটে। কিন্তু বর্তমান ধনী জমিদারদের মধ্যে নাটোর প্রভৃতি দুই-এক ঘর ছাড়া প্রাচীন বংশ নাই বলিলেই হয়। আমাদের দেশে যেরূপ সম্পত্তিবিভাগ তাহাতে ধনগৌরবকে প্রাচীন করিয়া তোলা একপ্রকার অসাধ্য; দায়ভাগের শতঘ্নীপ্রহারে সে দেখিতে দেখিতে শতধাবিভক্ত হইয়া অকালে পঞ্চত্ব এমন-কি, পঞ্চাধিকত্ব প্রাপ্ত হয়।

এই তো গেল গৌরবের কথা। কিন্তু আমাদের দেশে ধনের গৌরব অদ্যাপি যথেষ্ট জাগে নাই বটে তবু তাহার প্রয়োজন যথেষ্ট আছে, এ কথা অস্বীকার করা যায় না। অতএব যাঁহাদের হাতে ধন আছে তাঁহারা প্রয়োজনসাধন করিয়া সাধারনের আনুগত্য আকর্ষণ করিতে পারেন। তাঁহাদের পক্ষে নেতা হইবার সেই একটা সোনার রাস্তা আছে।

কিন্তু আমাদের অভিজাতগণ যাহাকে রাজপথ জ্ঞান করেন তাহা রাজা হইবার পথ। অন্য পথের শেষে দেশের কল্যাণ ও সাধারণের হৃদয় থাকিতে পারে কিন্তু খেতাবের খনি নাই, এইজন্য সে পথে বড়োলোকের জুড়িগাড়ি প্রায় দেখা যায় না। একটা দৃষ্টান্ত দিলেই তাহা সকলের প্রতীত হইবে। সার আল্‌ফ্রেড ক্রফ্‌ট্‌ হয়তো ভালো লোক এবং বড়োলোক, কিন্তু বিদ্যাসাগর তাঁহা অপেক্ষা অনেক বেশি ভালো লোক এবং বড়োলোক, এবং সকলের বেশি, তিনি আমাদের স্বদেশী লোক। কিন্তু ক্রফ্‌ট্‌-সাহেব ভারত ছাড়িয়া স্বদেশে গিয়াছেন, সেই শোকে বিহবল হইয়া তাঁহার স্মৃতিচিহ্ননির্মাণে ধনীগণ উৎসুক হইয়া উঠিয়াছেন; আর, বিদ্যাসাগর ইহসংসার ত্যাগ করিয়া গেলেন, দেশের ধনশালীরা কোনোপ্রকার চেষ্টা করিলেন না। ইহারা দেশের ন্যাচারাল লীডার! আমাদের স্বাভাবিক চালক! ইহারা কোন্‌ দিকে আমাদিগকে চালনা করিবেন? আমাদের দেশের মহোচ্চ মহদাশয়দিগের দিকে নহে, ইংরাজ মেজোসাহেব সেজোসাহেব ছোটোসাহেবের দিকে; আমাদের দীনহীন দেশের সহস্র অভাবমোচনের দিকে নহে, সাহেবের নিকুঞ্জবনে গড়ের বাদ্যের শ্রীবৃদ্ধিসাধনের দিকে। সাহেব রাজকর্মচারীরা বিলাতে চলিয়া গেলে দেশীয় ধনীগন তাঁহাদের প্রতিমা স্থাপন করিবেন ইহাতে আমরা আপত্তি করি না, কিন্তু দেশীয় পূজ্যগণের জন্যও যদি সেই পরিমানে কিছু ত্যাগস্বীকার করেন তবে দেশের নায়কত্বে তাঁহাদের কথঞ্চিৎ দাবি থাকে।

সেকালের ধনী জমিদারগণ নবাব-সরকারে প্রতিপত্তি ও পদবী-লাভের জন্য কিরূপ চেষ্টা করিতেন ও কোনো চেষ্টা করিতেন কি না, তাহা আমরা ভালোরূপ জানি না। তখন নবাব-দরবারের প্রসন্নতা হইতে কেবল শূন্যগর্ভ খেতাব ফলিত না, তখন সম্মানের মধ্যে সৌভাগ্য এবং রাজপদের মধ্যে সম্পদ পূর্ণ থাকিত; অতএব তাহা লাভের জন্য অনেকেই চেষ্টা করিতেন সন্দেহ নাই। কিন্তু তখনকার যাহা সাধারণ হিতকার্য– অর্থাৎ দিঘি-খনন, মন্দির-স্থাপন, বাঁধ-নির্মান, এই সকলকেই তাঁহারা যথার্থ কীর্তি বলিয়া জ্ঞান করিতেন, খেতাব-লাভকে নহে। দশের নিকট ধন্য হইবার আকাঙক্ষা তাঁহাদের প্রবল ছিল। তখন এই-সকল হিতকার্য রাজসম্মানের মূল্যস্বরূপ ছিল না, ইহাতে সাধারণের সম্মান আকর্ষণ করিত। সেই সাধারনের সম্মানের প্রতি তাঁহাদের উপেক্ষা ছিল না। রানী ভবানী, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, ইঁহারা তৎকালীন নবাব-দত্ত বিশেষ অনুগ্রহের দ্বারা উজ্জ্বল নহেন, ইঁহারা বিচিত্র কীর্তি-দ্বারা লোকসাধারণের হৃদয়ের মধ্যে আপন অক্ষয় মূর্তি স্থাপন করিয়াছেন। তখন জনগণের নিকট হইতে হিতকারী দেশপতিগণ যে খেতাব লাভ করিতেন তাহা আধুনিক দেশী বিলাতি সর্বপ্রকার খেতাবের অপেক্ষা অনেক উচ্চ, তাহা নিম্নে উদ্‌ধৃত হইল— আর্তানাম্‌ ইহ জন্তুনাম্‌ আর্তিচ্ছেদং করোতি যঃ

শঙ্খচক্রগদাহীনো দ্বিভুজঃ পরমেশ্বরঃ।

কীর্তিস্থাপনের দ্বারা লোকহিতসাধন অথবা সাধারণের নিকট খ্যাতিলাভ এখনকার ধনীগণের নিকট তেমন স্পৃহনীয় নহে।

আরব্য উপন্যাসে সিন্ধবাদের কাহিনীতে পড়া যায় যে, চুম্বকশৈলের আকর্ষণে দূর হইতে জাহাজের সমস্ত লোহার পেরেক ছুটিয়া বাহির হইয়া আসিত, তেমনি আমাদের যে-সকল ধনী জমিদার আপন আপন ভূখন্ডের মধ্যে দৃঢ়ভাবে নিহিত ছিলেন, দানধ্যান ক্রিয়াকলাপ এবং লোকহিতকর বিচিত্র স্থায়ী কীর্তি-দ্বারা এই জীর্ণ দেশটাকে একপ্রকার জুড়িয়া রাখিয়া বহুলোকবহনকার্য সম্পন্ন করিতেছিলেন, প্রবল ইংরাজ-রাজার সমুচ্চ চুম্বকশৈল অলক্ষ্যে অনায়াসে তাঁহাদিগকে দেশের লোকের নিকট হইতে ছিঁড়িয়া যেন একমাত্র নিজের দিকে আকর্ষণ করিয়া আনিতেছে। সমস্ত পূজা-অর্চনা দান-দক্ষিণা সাহেবের অভিমুখে, সমস্ত খ্যাতি-প্রতিপত্তি সম্মান-সমাদর সাহেবের হস্ত হইতে। সেকালে রাজার আকর্ষণ এবং স্বদেশী সাধারণের আকর্ষণ অন্তত সমান ছিল— নবাব-বাদশারা আমাদের ধনী জমিদারগণকে দেশের কাছ হইতে এমন করিয়া টানিয়া গ্রাস করিতে পারে নাই; কর্তব্য-অকর্তব্যের আদর্শ, স্ততি-নিন্দার চরম দণ্ড-পুরস্কার-বিধান দেশের লোকের হাতে ছিল।

অতএব দেখা যাইতেছে, সেকালে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সর্বসাধারনের সহিত যে হিতানুষ্টানসূত্রে বদ্ধ ছিলেন একালে তাহাও নাই, আবার নিজেদের মধ্যে একটা অভিজাতমন্ডলী বন্ধন করিয়া সম্প্রদায়গত মহত্ত্বকে অক্ষুণ্ণভাবে রক্ষণ ও পোষণ তাহারও সম্ভাবনা নাই। ইঁহারা নিজ গৌরবেও উচ্চ নহেন, সর্বসাধারনের সহিত ঐক্য-দ্বারাও বৃহৎ বলিষ্ঠ নহেন। ইঁহারা বিলাতের লর্ড্‌দের ন্যায় স্বতন্ত্র নহেন, বিলাতের জননায়কদের ন্যায়ও প্রবল নহেন। ইঁহারা বনস্পতির ন্যায় বিচ্ছিন্ন বৃহৎ নহেন, ওষধির মতো ব্যাপ্ত বিস্তৃতও নহেন, ইঁহারা কুষ্মাণ্ডলতার ন্যায় একমাত্র গবর্মেন্টের আশ্রয়যষ্টি বাহিয়া উন্নতির পথে চড়িতে চাহেন— ভুলিয়া যান যে, সেই সংকীর্ণ রাজদণ্ডবাহী উচ্চতা অপেক্ষা গুল্মসমাজের খর্বতা শ্রেয় এবং তৃণসমাজের নম্রতা শোভন।

পুরাকালের বড়ো জমিদারগণ রাস্তাঘাট করিয়া সাধারণের অভাবমোচন, যাত্রাগান প্রভৃতি উৎসবের দ্বারা সাধারণের আমোদ-বিধান, এবং গুণী পন্ডিত ও কবিদের প্রতিপালন-দ্বারা দেশের শিল্পসাহিত্যের রক্ষণ ও পালন করিতেন। তাঁহারাই আমাদের দেশে দানশীলতার ও সমাজহিতৈষার উচ্চ আদর্শ জাগ্রত করিয়া রাখিয়াছিলেন। শুভানুষ্টান উপলক্ষে ত্যাগস্বীকারে পরাঙ্মুখতা যে লজ্জাকর তাহা তাঁহারাই দেশের হৃদয়ে বদ্ধমূল করিয়াছিলেন।

বর্তমান জমিদারগণ যদি সেকালের দৃষ্টান্ত অনুসারে, কেবল রাজার মুখ না চাহিয়া খেতাবের লক্ষ্য ছাড়িয়া, জনহিতসাধন ও দেশের শিল্পসাহিত্যের রক্ষণ-পালনে সহায়তা করেন তবেই তাঁহাদের ক্ষমতার সার্থকতা হয় এবং গৌরব বাড়িয়া উঠে।

যখন আমাদের রাজা বিদেশী, এবং তাঁহাদের রুচি ভাষা ও সাহিত্য স্বতন্ত্র, তখন দেশী ভাষা ও সাহিত্যের অবহেলা অবশ্যম্ভাবী। যাঁহারা জীবিকাসংগ্রামে প্রবৃত্ত, বাংলা ভাষার দিকে তাকাইবার সময় তাঁহাদের নাই। সর্বত্রই দেশের ধনীগণ স্বদেশীয় তরুণ সাহিত্যের পালনকর্তা। আমাদের বিদেশীশাসিত দেশে সাহিত্যের পক্ষে ধনীদের সহায়তা বিশেষ আবশ্যক।

কিন্তু মুখ্য জমিদারগণ— জমিদার-সভার প্রধান প্রতিনিধিবর্গ ইংরাজি শেখেন, ইংরাজি লেখেন, ইংরাজি বলেন। পিতাকেও চিঠি লিখিতে ইংরাজি ভাষা ব্যবহার করেন। তাঁহারা বলেন, ইংলন্ডের অভিজাতবর্গের মতো আমরা রক্ষণশীল; কিন্তু মাতৃভাষাকেও তাঁহারা রক্ষা করেন না। দেশের জনসাধারণের ন্যায় দেশের ভাষাও তাঁহাদের নিকট কৃতজ্ঞ নহে। তাহার কারণ পূর্বেই বলিয়াছি— এমন কিছুতে তাঁহাদের উৎসাহ নাই রাজার নিকট যাহার কোনোপ্রকার আদর না থাকে, যাহা কেবলমাত্র দেশের।

দেশীয় রুচি এবং শিল্প এখনো কিয়ৎপরিমাণে তাঁহাদের আদর পায়, কিন্তু তাহাও ক্রমশ হ্রাস হইয়া আসিতেছে। বিলাতি রুচির সঙ্গে সঙ্গে বিলাতি পণ্য তাঁহাদের গৃহ হইতে দেশের শিল্পকে অবমাননা-সহকারে নির্বাসিত করিয়া দিতেছে।

সংক্ষেপত, এ দেশে পূর্বকালে জমিদার-সম্প্রদায়ের যে গৌরব ছিল তাহা খেতাব-অবলম্বনে ছিল না— তাহা দান, অর্চনা, কীর্তিস্থাপন, আর্তগণের আর্তিচ্ছেদ, দেশের শিল্পসাহিত্যের পালন-পোষণের উপর নির্ভর করিত। সেই মহৎ গৌরব এখনকার জমিদাররা প্রতিদিন হারাইতেছেন। দেশ যখন চাহিতেছে রুটি তাঁহারা দিতেছেন প্রস্তর; বঙ্গভূমি তাহার জলকষ্ট, তাহার অন্নকষ্ট তাহার শিল্পনাশ, তাহার বিদ্যাদৈন্য, তাহার রোগতাপ লইয়া তাঁহাদের মুখের দিকে চাহিয়া আছে, আর তাঁহারা স্বদেশপ্রত্যাগত সাহেব-রাজকর্মচারীদের পাষাণ-প্রতিমূর্তি গড়িয়া দিতেছেন।

সাহেবের জন্য তাঁহারা অনেক করেন, কিন্তু সাহেবেরা চেষ্টা করিলেও তাঁহাদিগকে দেশীয় সাধারণের স্বাভাবিক অধিনেতা করিতে পারিবেন না। কারণ, ইংরাজ-রাজা অস্বাভাবিককে স্বাভাবিক করিয়া তুলিতে পারেন না। যদি তাঁহারা আপন পুরাতন উচ্চ স্থান অধিকার করিতে চাহেন, তবে গবর্মেন্ট্‌-প্রাসাদের গম্বুজটার দিকে অহরহ ঊর্ধ্বমুখে না তাকাইয়া নিম্নে একবার দেশের দিকে, সাধারণের দিকে মুখ ফিরাইতে হইবে।