সমূহ/সদুপায়

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

সমূহ ( S) প্রয়োজন আছে। ইহার উপরেও র্যাহারা অনাহুত ঔদ্ধত্য ও অনাবশ্বক উষ্ণবাক্য প্রয়োগ করির আমাদের কর্ষের দ্বন্ধহতাকে কেবলই বাড়াইয়া তুলিয়াছেন তাহার কি দেশের কাছে অপরাধী নহেন ? কাজের কঠোরতাকে সম্পূর্ণ গ্রহণ করিব, কিছুতেই পরাভব স্বীকার করিব না—দেশের শিল্পবাণিজ্যকে স্বাধীন করিয়া নিজের শক্তি অনুভব করিব, দেশের বিস্তাশিক্ষাকে স্বায়ত্ত করিব, সমাজকে দেশের কর্তব্যসাধনের উপযোগী বলিষ্ঠ করিয়া তুলিব ;--ইছা করিতে গেলে ঘরে পরে দুঃখ ও বাধার অবধি থাকিবে না, সেজন্য অপরাজিতচিত্তে প্রস্তুত হইব কিন্তু বিরোধকে বিলাসের সামগ্ৰী করিয়া তুলিব না। দেশের কাজ নেশার কাজ নহে, তাহ সংযমীর দ্বারা যোগীর चांब्राहे गांथा । মনে করিবেন না, ভয় বা সংকোচ বশত আমি এ-কথা বলিতেছি। দুঃপকে আমি জানি, দুঃখকে আমি মানি, দুঃখ দেবতারই প্রকাশ ; সেইজন্তই ইহার সম্বন্ধে কোনো চাপল্য শোভা পায় না। দুঃখ দুর্বলকেই হয় স্পর্ধায় নয় অভিভূতিতে লইয়া যায়। প্রচণ্ডতাকেই যদি প্রবলতা বলিয়া জানি, কলহকেই যদি পৌরুষ বলিয়া গণ্য করি, এবং নিজেকে সর্বত্র ও সর্বদাই অতিমাত্র প্রকাশ করাকেই যদি আত্মোপলব্ধির স্বরূপ বলিয়া স্থির করি তবে দুঃখের নিকট হইতে আমরা কোনো মহং শিক্ষা প্রত্যাশা করিতে পারিব না। দেশে আমাদের যে বৃহং কর্মস্থানকে প্রস্তুত করিয়া তুলিতে হইবে কেমন করিয়া তাহা আরম্ভ করিব ? উচ্চ চূড়াকে আকাশে তুলিতে গেলে তাহার ভিত্তিকে প্রশস্ত করিয়া প্রতিষ্ঠিত করিতে হয়। আমাদের কর্মশক্তির চূড়াকে ভারতবর্ষের কেন্দ্রস্থলে যদি অভ্ৰভেদী করিতে চাই তবে প্রত্যেক জেলা হইতে তাহার ভিত গাথার কাজ আরম্ভ করিতে হইবে। প্রভিনগল কনফারেন্সের ইহাই সার্থকতা। প্রত্যেক প্রদেশে একটি করির প্রাদেশিক প্রতিনিধিসভা স্থাপিত হইবে। এই সভ যথাসম্ভব গ্রামে গ্রামে আপনার শাখা বিস্তার করিয়া সমস্ত জেলাকে আচ্ছ* করিবে— প্রথমে সমস্ত প্রদেশের সর্বাংশের সকলপ্রকার তথ্য সম্পূর্ণরূপে সংগ্ৰহ করিবে— কারণ কর্মের ভূমিকাই জ্ঞান। যেখানে কাজ-করিতে হইবে সর্বাগ্রে তাহার সমস্ত অবস্থা জান চাই । দেশের সমস্ত গ্রামকে নিজের সর্বপ্রকা প্রয়ােজনসাধনক্ষম করিয়া গড়িয়া তুলিতে হইবে। কতকগুলি পর লইয়া এক-একটি মণ্ডলী স্থাপিত হইবে। সেই মণ্ডলীর প্রধানগণ দি গ্রামের সমস্ত কর্ণের এবং অভাবমোচনের ব্যবস্থা করিয়া মণ্ডলীকে নিজের মধ্যে পৰাপ্ত ৰরিয়া তুলিতে পারে তবেই স্বাক্ষত্তশাসনের চণ " সর্বত্র সত্য هو أسست و لا © Ꮌ8 রবীন্দ্র-রচনাবলী হইয়া উঠিবে। নিজের পাঠশালা, শিল্পশিক্ষালয়, ধর্মগোলা, সমবেত পণ্যভাণ্ডার ও ব্যাঙ্ক স্থাপনের জন্ত ইহাদিগকে শিক্ষা, সাহায্য ও উৎসাহ দান করিতে হইবে। প্রত্যেক মণ্ডলীর একটি করিয়া সাধারণ মণ্ডপ থাকিবে সেখানে কর্মে ও আমোদে সকলে একত্র হইবা স্থান পাইবে এবং সেইখানে ভারপ্রাপ্ত প্রধানের মিলিয়া সালিসের দ্বারা গ্রামের বিবাদ ও মামলা মিটাইয়া দিবে। জোতদার ও চাষা রায়ত যতদিন প্রত্যেকে স্বতন্ত্ৰ থাকিয়া চাষবাস করিবে ততদিন তাহাদের অসচ্ছল অবস্থা কিছুতেই ঘুচিবে না। পৃথিবীতে চারিদিকে সকলেই জোট বাধিয়া প্রবল হইয়া উঠিতেছে ; এমন অবস্থায় যাহারাই বিচ্ছিন্ন এককভাবে থাকিবে তাহাদিগকে চিরদিনই অন্তের গোলামি ও মজুরি করিয়া মরিতেই হইবে । অদ্যকার দিনে যাহার যতটুকু ক্ষমতা আছে সমস্ত একত্র মিলাইয়া বাধ বাধিবার সময় আসিয়াছে। এ না হইলে ঢালু পথ দিয়া আমাদের ছোটাে ছোটাে সামর্থ্য ও সম্বলের ধারা বাহির হইয়া গিয়া অন্তের জলাশয় পূর্ণ করিবে । অন্ন থাকিতেও আমরা অন্ন পাইব না এবং আমরা কী কারণে কেমন করিয়া যে মরিতেছি তাহা জানিতেও পারিব না । আজ যাহাদিগকে বাচাইতে চাই তাহাদিগকে মিলাইতে হইবে। যুরোপে আমেরিকায় কৃষির মানাপ্রকার মিতশ্রমিক যন্ত্র বাহির হইয়াছে—নিতান্ত দারিদ্র্যবশত সে-সমস্ত আমাদের কোনো কাজেই লাগিতেছে ন—অল্প জমি ও অল্প শক্তি লইয়া সে-সমস্ত যন্ত্রের ব্যবহার সম্ভব নহে। যদি এক-একটি মণ্ডলী অথবা এক-একটি । গ্রামের সকলে সমবেত হইয়া নিজেদের সমস্ত জমি একত্র মিলাইয়া দিয়া কৃষিকার্ষে প্রবৃত্ত হয় তবে আধুনিক যন্ত্রাদির সাহায্যে অনেক খরচ বাচিয়া ও কাজের সুবিধা হইয়া তাহারা লাভবান হইতে পারে। যদি গ্রামের উৎপন্ন সমস্ত ইক্ষু তাহার এক কলে মাড়াই করিয়া লক্ষ্ম তবে দামি কল কিনিয়া লইলে তাহদের লাভ বই লোকসান হয় না—পাটের খেত সমস্ত এক করিয়া লইলে প্রেসের সাহায্যে তাহারা নিজেরাই পাট বাধাই করিয়া লইতে পারে—গোয়ালার একত্র হইয়া জোট করিলে গোপালন ও মাখন ঘৃত প্রভৃতি প্রস্তুত করা সস্তায় ও ভালোমতে সম্পন্ন হয় । তাতিরা জোট বাধিয়া নিজের পল্লীতে যদি কল আনে এবং প্রত্যেকে তাহাতে আপনার থাটুনি দেয় তবে কাপড় বেশি পরিমাণে উৎপন্ন হওয়াতে তাহাদের প্রত্যেকেরই সুবিধ ঘটে । শহরে ধনী মহাজনের কারখানায় মজুরি করিতে গেলে শ্রমীদিগের মহুস্তত্ব কিরূপ নষ্ট হয় সকলেই জানেন । বিশেষত আমাদের যে-দেশের সমাজ গৃহের উপরে প্রতিষ্ঠিত, যেখানে গৃহুনীতি বিচলিত হইলে ধর্মের প্রধান অবলম্বন জীর্ণ হইয় পড়ে ও সমাজের नमूह © >☾ মৰ্মস্থানে বিষসঞ্চার হইতে থাকে সে-দেশে বড়ে বড়োকারখানা যদি শহরের মধ্যে আবর্ত রচনা করিয়া চারিদিকের গ্রামপী হইতে দরিদ্র গৃহস্থগিকে আকর্ষণ করিয়া আনে তবে স্বাভাবিক অবস্থা হইতে বিচ্যুত, বাসস্থান হইতে বিশ্লিষ্ট স্ত্রীপুরুষগণ নিরানন্দকর কলের কাজে ক্রমশই কিরূপ দুৰ্গতির মধ্যে নিমজ্জিত হইতে পারে তাহা জকুমান করা কঠিন নহে। কলের দ্বারা কেবল জিনিসপত্রের উপচয় করিতে গিয়া মানুষের অপচয় করিয়া বসিলে সমাজের অধিকদিন তাহা সহিবে না । অতএব পল্লীবাসীরাই একত্রে মিলিলে যে-সকল যন্ত্রের ব্যবহার সম্ভবপর হয় তাহারই সাহায্যে স্বস্থানেই কর্মের উন্নতি করিতে পারিলে সকলদিক রক্ষ হইতে পারে। শুধু তাই নয় দেশের জনসাধারণকে ঐক্যনীতিতে দীক্ষিত করিবার এই একটি উপায়। প্রাদেশিক সভা উপদেশ ও দৃষ্টাস্ত দ্বারা একটি মণ্ডলীকেও যদি এইরূপে গড়িয়া তুলিতে পারেন তবে এই দৃষ্টাস্তের সফলতা দেখিতে দেখিতে চারিদিকে ব্যাপ্ত হইয়া পড়িবে। এমনি করিয়া ভারতবর্ষের প্রদেশগুলি আত্মনির্ভরশীল ও বৃহবদ্ধ হইয়া উঠিলে ভারতবর্ষের দেশগুলির মধ্যে তাহার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা সার্থক হইয়া উঠিবে এবং সেই দৈশিক কেন্দ্রগুলি একটি মহাদেশিক কেন্দ্রচূড়ায় পরিণত হইবে। তখনই সেই কেন্দ্রটি ভারতবর্ষের সত্যকার কেন্দ্র হইবে। নতুবা পরিধি যাহার প্রস্তুতই হয় নাই সেই কেন্দ্রের প্রামাণিকতা কোথায় ? এবং যাহার মধ্যে দেশের কর্মের কোনো উদযোগ নাই কেবলমাত্র দুর্বল জাতির দাবি এবং দায়িত্বহীন পরামর্শ সে-সভা দেশের রাজকর্মসভার সহযোগী হুইবার আশা করিবে কোন সত্যের এবং কোন শক্তির বলে ? কল আসিয়া যেমন তাতকে মারিয়াছে তেমনি ব্রিটিশশাসনও সর্বগ্রহ ও সর্বব্যাপী হইয়া আমাদের গ্রাম্যসমাজের সহজ ব্যবস্থাকে নষ্ট করিয়া দিয়াছে। কালক্রমে প্রয়োজনের বিস্তারবশত ছোটো ব্যবস্থা যখন বড়ো ব্যবস্থায় পরিণত হয় তখন তাহাতে ভালো বই মন্দ হয় না—কিন্তু তাহা স্বাভাবিক পরিণতি হওয়া চাই। আমাদের ষে গ্রাম্যব্যবস্থা ছিল, ছোটো হইলেও তাহ আমাদেরই ছিল, ব্রিটিশ ব্যবস্থা যতবড়োই হউক তাহা আমাদের নহে । সুতরাং ত্যহাতে যে কেবল আমাদের শক্তির জড়তা ঘটিয়াছে তাহা নহে তাহ আমাদের সমস্ত প্রয়োজন ঠিকমতো করিয়া পূরণ করিতে। পারিতেছে না। নিজের চক্ষুকে অদ্ধ করিয়া পরের চক্ষু দিয়া কাজ চালানো কখনোই ঠিকমতে হইতে পারে না । এখন তাই দেখা যাইতেছে গ্রামের মধ্যে চেষ্টার কোনো লক্ষণ নাই। জলাশয় পূর্বে ছিল আজ তাহা বুজিয়া আসিতেছে, কেননা দেশের স্বাভাবিক কাজ বন্ধ। যে গোচারণের মাঠ ছিল তাছা রক্ষণের কোনো উপায় নাই ; ষে দেবালয় ছিল তাহ ○ >ぐり রবীন্দ্র-রচনাবলী (* সংস্কারের কোনো শক্তি নাই ; যে-সকল পণ্ডিত সমাজের বন্ধন ছিলেন র্তাহীদের গণ্ডমূর্খ ছেলের আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্যের ব্যবসায় ধরিয়াছে ; যে-সকল ধনিগৃহে ক্রিয়াকর্মে যাত্রায় গানে সাহিত্যরস ও ধর্মের চর্চা হইত তাহারা সকলেই শহরে আকৃষ্ট হইয়াছেন ; র্যাহারা দুর্বলের সহায়, শরণাগতের আশ্রয় ও দুষ্কৃতকারীর দণ্ডদাতা ছিলেন তাহাদের স্থান পুলিসের দারোগা আজ কিরূপভাবে পূরণ করিতেছে তাহা কাহারও অগোচর নাই ; লোকহিতের কোনো উচ্চ আদশ, পরার্থে আত্মত্যাগের কোনো উজ্জল দৃষ্টান্ত গ্রামের মাঝখানে আর নাই ; কোনো বিধিনিষেধের শক্তি ভিতর হইতে কাজ করিতেছে না, আইনে যে কৃত্রিম বাধ দিতে পারে তাহাই আছে মাত্র ; পরম্পরের বিরুদ্ধে মিথ্যা মকদ্দমায় গ্রাম উন্মাদের মতো নিজের নখে নিজেকে ছিন্ন করিতেছে, তাহাকে প্রকৃতিস্থ করিবার কেহ নাই ; জঙ্গল বাড়িয়া উঠিতেছে, ম্যালেরিয়া নিদারুণ হইতেছে, দুর্ভিক্ষ ফিরিয়া ফিরিয়া আসিতেছে ; আকাল পড়িলে পরবর্তী ফসল পর্যন্ত ক্ষুধ মিটাইয়। বঁচিবে এমন সঞ্চয় নাই ; ডাকাত অথবা পুলিস চুরি অথবা চুরি-তদন্ত জন্য ঘরে ঢুকিলে ক্ষতি ও অপমান হইতে আপনার গৃহকে বাচাইবে এমন পরস্পরঐক্যমূলক সাহস নাই ; তাহার পর যা থাইয়া শরীর বল পায় ও ব্যাধিকে ঠেকাইয়া রাখিতে পারে তাহার কী অবস্থা। ঘি দূষিত, দুধ দুমূল্য, মৎস্ত দুর্লভ, তৈল বিষাক্ত ; ষে-কয়ট স্বদেশী ব্যাধি ছিল তাহারা আমাদের ষরুং-প্লীহার উপর সিংহাসন পাতিয়া বসিয়াছে ; তাহার উপর বিদেশী ব্যাধিগুলা অতিথির মতো আসে এবং কুটুম্বের মতো রহিয়া যায় ;–ডিপথিরিয়া, রাজযক্ষ্মী, টাইফয়েড সকলেই এই রক্তহীনদের প্রতি এক্সপ্লয়টেশন-নীতি অবলম্বন করিয়াছে। অল্প নাই, স্বাস্থ্য নাই, আনন্দ নাই, ভরসা নাই, পরস্পরের সহযোগিতা নাই, আঘাত উপস্থিত হইলে মাথা পাতিয়া লই, মৃত্যু উপস্থিত হইলে নিশ্চেষ্ট হইয়া মরি, অবিচার উপস্থিত হইলে নিজের অদৃষ্টকেই দোষী করি এবং আত্মীয়ের বিপদ উপস্থিত হইলে দৈবের উপর তাহার ভার সমর্পণ করিয়া বসিয়া থাকি । ইহার কারণ কী । ইহার কারণ এই, সমস্ত দেশ যে-শিকড় দিয়া রস আকর্ষণ করিবে সেই শিকড়ে পোকা ধরিয়াছে, যে-মাটি হইতে বাচিবার খাদ্য পাইবে সেই মাটি পাথরের মতো কঠিন হইয়া গিয়াছে—যে গ্রামসমাজ জাতির জন্মভূমি ও আশ্রয়স্থান তাহার সমস্ত ব্যবস্থাবদ্ধন বিচ্ছিন্ন হইয়া গিয়াছে ; এখন সে ছিন্নমূল বৃক্ষের মতো নবীনকালের নির্দর বস্তার মুখে ভাসিয়া যাইতেছে। or দেশের মধ্যে পরিবর্তন বাহির হইতে আসিলে পুরাতন আশ্রয়ট যখন অব্যবহারে ভাঙিয়া পড়ে, এবং নূতন কালের উপযোগী কোনো নূতন ব্যবস্থাও গড়িয় উঠে না তখন সেইরূপ যুগান্তকালে বহুতর পুরাতন জাতি পৃথিবী হইতে লুপ্ত হইয়া গিয়াছে। সমূহ ¢ »ዓ আমরাও কি দিনে দিনে উদাস দৃষ্টির সম্মুখে স্বজাতিকে লুপ্ত হইতে দেখিব ? ম্যালেরিয়া, মারী, দুর্ভিক্ষ—এগুলি কি আকস্মিক ? এগুলি কি আমাদের সারিপাতিকের মজাগত দুলক্ষণ নহে? সকলের চেয়ে ভয়ংকর ভুলক্ষণ সমগ্র দেশের হৃদয়নিহিত হতাশ নিশ্চেষ্টত । কিছুরই যে প্রতিকার আমাদের নিজের হাতে আছে, কোনো ব্যবস্থাই যে আমরা নিজে করিতে পারি সেই বিশ্বাস যখন চলিয়া যায়, যখন কোনো জাতি কেবল করুণভাবে ললাটে করম্পর্শ করে ও দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া আকাশের দিকে তাকায় তখন কোনো সামান্ত আক্রমণও সে আর সহিতে পারে না, প্রত্যেক ক্ষুদ্র ক্ষত দেখিতে দেখিতে তাহার পক্ষে বিষক্ষত হইয় উঠে। তখন সে মরিলাম মনে করিয়াই মরিতে থাকে । কিন্তু কালরাত্রি বুঝি পোহাইল,—রোগীর বাতায়নপথে প্রভাতের আলোক আশা বহন করিয়া আসিয়াছে ; আজ আমরা দেশের শিক্ষিত ভদ্রমণ্ডলী—যাহারা একদিন সুখে দুঃখে সমস্ত জনসাধারণের সঙ্গী ও সহায় ছিলাম এবং আজ যাহারা ভদ্রতা ও শিক্ষার বিলাস বশতই চিন্তায় ভাষায় ভাবে আচারে কর্মে সর্ববিষয়েই সাধারণ হইতে কেবলই দূরে চলিয়া যাইতেছি, আমাদিগকে আর-একবার উচ্চনীচ সকলের সঙ্গে মঙ্গলসম্বন্ধে একত্র মিলিত হইয়া সামাজিক অসামঞ্জস্তের ভয়ংকর বিপদ হইতে দেশের ভবিষ্যংকে রক্ষা করিতে হুইবে । আমাদের শক্তিকে দেশের কল্যাণকর ও দেশের শক্তিকে আমাদের কর্মের সহযোগী করিয়া তুলিবার সময় প্রত্যহ বহিয়া যাইতেছে। যাহার স্বভাবতই এক অঙ্গ তাহাদের মাঝখানে বাধা পড়িয়া যদি এক রক্ত এক প্রাণ অবাধে সঞ্চারিত হইতে না পারে তবে যে একটা সাংঘাতিক ব্যাধি জন্মে সেই ব্যাধিতেই আজ আমরা মরিতে বসিয়াছি। পৃথিবীতে সকলেই আজ ঐক্যবদ্ধ হইতেছে, আমরাই কেবল সকলদিকে বিশ্লিষ্ট হইয়া পড়িতেছি আমরা টিকিতে পারিব কেমন করিয়া ? আমাদের চেতনা জাতীয় অঙ্গের সর্বত্রই ষে প্রসারিত হইতেছে না—আমাদের বেদনাবোধ যে অতিশয় পরিমাণে কেবল শহরে, কেবল বিশিষ্ট সমাজেই বদ্ধ তাহার একটা প্রমাণ দেখুন। স্বদেশী-উযোগটা তো শহরের শিক্ষিতমণ্ডলীই প্রবর্তন করিয়াছেন কিন্তু মোটের উপরে তাহার বেশ নিরাপদেই আছেন। যাহারা বিপদে পড়িয়াছে তাহারা কাহারা ? .' জগদল পাথর বুকের উপরে চাপাইয়া দেওয়া যে একটা দণ্ডবিধি তাহ রূপকথায় শুনিয়াছিলাম। বর্তমান রাজশাসনে রূপকথার সেই জগন্ধল পাথরটা পুনিটিভ পুলিসের বাস্তব মূর্তি ধরিয়া আসিয়াছে। " . J কিন্তু এই পাথরটা অসহায় গ্রামের উপরে চাপিয়াছে বলিয়াই ইহার চাপ আমাদের ○ >b" রবীন্দ্র-রচনাবলী সকলের বুকে পড়িতেছে না কেন ? বাংলাদেশের এই বক্ষের ভারকে আমরা সকলে মিলিয়া ভাগ করিয়া লইয়া বেদনাকে সমান করিয়া তুলিব না কেন ? স্বদেশী-প্রচার যদি অপরাধ হয় তবে পুনিটিভ পুলিসের ব্যয়ভার আমরা সকল অপরাধীই বাটিয়া লইব । এই বেদন যদি সকল বাঙালির সামগ্ৰী হইয় উঠে তবে ইহা আর বেদনাই থাকিবে না,* जांनमझे इझेब्रां ऊँठिएव । এই উপলক্ষে দেশের জমিদারের প্রতি আমার নিবেদন এই যে, বাঙলার পল্লীর মধ্যে প্রাণসঞ্চারের জন্য র্তাহারা উদযোগী না হইলে এ-কাজ কখনোই সুসম্পন্ন হইবে না। পল্লী সচেতন হইয়া নিজের শক্তি নিজে অমুভব করিতে থাকিলে জমিদারের কর্তৃত্ব ও স্বার্থ খর্ব হইবে বলিয়া আপাতত আশঙ্কা হইতে পারে—কিন্তু এক পক্ষকে দুর্বল করিয়া নিজের স্বেচ্ছাচারের শক্তিকে কেবলই বাধাহীন করিতে থাকা আর ডাইনামাইট বুকের পকেটে লইয়া বেড়ানো একই কথা—একদিন প্রলয়ের অস্ত্র বিমুখ হইয়া অস্ত্রীকেই বধ করে। রায়তদিগকে এমনভাবে সবল ও শিক্ষিত করিয়া রাখা উচিত যে, ইচ্ছ। করিলেও তাঁহাদের প্রতি অন্যায়, করিবার প্রলোভনমাত্র জমিদারের মনে না উঠিতে পারে। জমিদার কি বণিকের মতো কেবল দীনভাবে আদায় করিবার পথগুলিই সর্বপ্রকারে মুক্ত রাখিবেন ? কিন্তু সেইসঙ্গে মহংভাবে স্বাৰ্থত্যাগ করিবার সম্বন্ধ যদি একান্ত যত্বে না রক্ষা করেন, উচিত ক্ষতি উদারভাবে স্বীকার করিবার শক্তি যদি তাহার না থাকে তবে তাহার আত্মসম্মান কেমন করিয়া থাকিবে ? রাজহাটে উপাধি কিনিবার বেলায় তিনি তো লোকসানকে লোকসান জ্ঞান করেন না ? কিন্তু যথার্থ রাজা হইবার একমাত্র স্বাভাবিক অধিকার আছে তাহার রায়তদের কাছে । তিনি যে বহুতর লোকের প্রভু, বন্ধু ও রক্ষক, বহুলোকের মঙ্গলবিধানকর্তা, পৃথিবীতে এতবড়ে উচ্চপদলাভ করিয়া এ-পদের দায়িত্ব রক্ষা করিবেন না ? এ-কথা যেন না মনে করি যে, দূরে বসিয়া টাকা ঢালিতে পারিলেই রায়তের হিত করা যায়। এ-সম্বন্ধে একটি শিক্ষা কোনোদিন ভুলিব না। একসময়ে আমি মফস্বলে কোনো জমিদারি তত্ত্বাবধানকালে সংবাদ পাইলাম, পুলিসের কোনো উচ্চ কর্মচারী কেবল যে একদল জেলের গুরুতর ক্ষতি করিয়াছে তাহা নহে, তদস্তের উপলক্ষ্য করিয়া তাহাদের গ্রামে গৃহস্থদের মধ্যে বিষম অশাস্তি উপস্থিত করিয়াছে। আমি উৎপীড়িত জেলেদের ডাকিয়া বলিলাম, তোরা উৎপাতকারীর নামে দেওয়ানি ও ফৌজদারি যেমন ইচ্ছা নালিশ কর আমি কলিকাতা হইতে বড়ে কৌমুলি আনাইয়। মকদ্দমা চালাইব । তাহার হাত জোড় করিয়া কহিল, কর্তা, মামলায় জিতিয়া লাভ কী ? পুলিসের বিরুদ্ধে দাড়াইলে আমরা ভিটায় টিকিতেই পারিব না। সমূহ (t): আমি ভাবিয়া দেখিলাম দুর্বল লোক জিতিয়াও হারে ; চমৎকার অস্ত্রচিকিৎসা হয় কিন্তু ক্ষীণরোগী চিকিৎসার দায়েই মারা পড়ে। তাহার পর হইতে এই কথা আমাকে বারংবার ভাবিতে হইয়াছে আর-কোনো দান দানই নহে, শক্তিদানই একমাত্র দান। একটা গল্প আছে, ছাগশিশু একবার ব্রহ্মার কাছে গিয়া কাদিয়া বলিয়াছিল,”ভগবান, তোমার পৃথিবীতে আমাকে সকলেই থাইতে চায় কেন ?” তাহাতে ব্ৰক্ষা উত্তর করিয়াছিলেন “বাপু, অন্তকে দোষ দিব কী, তোমার চেহারা দেখিলে আমারই থাইতে ইচ্ছা করে।” পৃথিবীতে অক্ষম বিচার পাইবে, রক্ষা পাইবে এমন ব্যবস্থা দেবতাই করিতে পারেন না । ভারতমন্ত্রসভা হইতে আরম্ভ করিয়া পার্লামেণ্ট পর্যন্ত মাথা খুড়িয়া মরিলেও ইহার যথার্থ প্রতিবিধান হইতে পারে না । সাধু ইচ্ছা এখানে অশক্ত। দুর্বলতার সংস্রবে আইন আপনি দুর্বল হইয় পড়ে, পুলিস আপনি বিভীষিকা হইয় উঠে। এবং র্যাহাকে রক্ষাকর্তা বলিয়া দোহাই পাড়ি স্বয়ং তিনিই পুলিসের ধর্মবাপ হইয়া দাড়ান। এদিকে প্রজার দুর্বলতা সংশোধন আমাদের কর্তৃপক্ষদের বর্তমান রাজনীতির বিরুদ্ধ । যিনি পুলিস-কমিশনে বসিয়া একদিন ধর্মবুদ্ধির জোরে পুলিসকে অত্যাচারী বলিয়া কটবাক্য বলেন তিনিই লাটের গদিতে বসিবা কর্মবুদ্ধির কোকে সেই পুলিসের বিষদাঁতে সামান্ত আঘাতটুকু লাগিলেই অসহ বেদনায় অশ্রুবর্ষণ করিতে থাকেন। তাহার কারণ আর-কিছুই নহে, কচি পাঠাটিকে অন্তের হাত হইতে রক্ষণযোগ্য করিতে গেলে পাছে সে তাহার নিজের চতুমুখের পক্ষেও কিছুমাত্র শক্ত হইয়া উঠে এ আশঙ্কা তিনি ছাড়িতে পারেন না । দেবী দুর্বলঘাতকাঃ । তাই দেশের জমিদারদিগকে বলিতেছি, হতভাগ্য রায়তদিগকে পরের হাত এবং নিজের হাত হইতে রক্ষা করিবার উপযুক্ত শিক্ষিত, সুস্থ ও শক্তিশালী করিয়া না তুলিলে কোনো ভালো আইন বা অমুকুল রাজশক্তির দ্বারা ইহার কদাচ রক্ষা পাইতে পারিবে না । ইহাদিগকে দেখিবামাত্র সকলেরই জিহবা লালারিত হইবে। এমনি করিয়া দেশের অধিকাংশ লোককেই যদি জমিদার, মহাজন, পুলিস, কানুনগো, আদালতের আমলা, যে ইচ্ছা সে অনায়াসেই মারিয়া যায় ও মারিতে পারে তবে দেশের লোককে মানুষ হইতে না শিখাইয়াই রাজা হইতে শিখাইব কী করিয়া ? i অবশেষে বর্তমানকালে আমাদের দেশের যে-সকল দৃঢ়নিষ্ঠ যুবক সমস্ত সংকট উপেক্ষা করিয়াও স্বদেশহিতের জন্ত স্বেচ্ছাত্ৰত ধারণ করিতেছেন অন্ত এই সভাস্থলে র্তাহারা সমস্ত বঙ্গদেশের আশীৰ্বাদ গ্রহণ করুন। রক্তবর্ণ প্রত্যুষে তোমরাই সর্বাগ্রে জাগিয়া উঠিয়া অনেক দ্বন্দ্রসংঘাত এবং অনেক দুঃখ গ্ৰহ করিলে। তোমাদের লেই (2、● রবীন্দ্র-রচনাবলী পৌরুষের উদবোধন কেবলমাত্র বজ্রঝংকারে ঘোষিত হইয় উঠে নাই, আজ করুণাবর্ষণে তৃষ্ণাতুর দেশে প্রেমের বাদল আনিয়া দিয়াছে। সকলে যাহাদিগকে অবজ্ঞা করিয়াছে, অপমানে যাহারা অভ্যস্ত, যাহাদের সুবিধার জন্য কেহ কোনোদিন এতটুকু স্থান ছাড়িয়া দেয় নাই, গৃহের বাহিরে যাহারা কাহারও কাছে কোনো সহায়তা প্রত্যাশা করিতেও জানে না তোমাদের কল্যাণে আজ তাহার দেশের ছেলেদিগকে ভাই বলিতে শিখিল । তোমাদের শক্তি আজ যখন প্রীতিতে বিকশিত হইয়া উঠিয়াছে তখন পাষাণ গলিয়া যাইবে, মরুভূমি উর্বর হইয়া উঠিবে, তখন ভগবান আর আমাদের প্রতি অপ্রসন্ন থাকিবেন না । তোমরা ভগীরথের ন্তায় তপস্যা করিয়া রুদ্রদেবের জটা হইতে এবার প্রেমের গঙ্গা আনিয়াছ ; ইহার প্রবল পুণ্যস্রোতকে ইন্দ্রের ঐরাবতও বাধা দিতে পরিবে না, এবং ইহার স্পর্শমাত্রেই পূর্বপুরুষের ভস্মরাশি সঞ্জীবিত হইয়া উঠিবে। হে তরুণতেজে উদ্দীপ্ত, ভারতবিধাতার প্রেমের দূতগুলি, আমি আজ তোমাদের জয়ধ্বনি উচ্চারণ করিয়া এই নিবেদন করিতেছি যে, দেশে অধোদয় যোগ কেবল একদিনের নহে। স্বদেশের অসহায় অনাথগণ যে বঞ্চিত, পীড়িত ও ভীত হইতেছে সে কেবল কোনো বিশেষ স্থানে বা বিশেষ উপলক্ষে নহে, এবং তাহাদিগকে যে কেবল তোমাদের নিজের শক্তিতেই রক্ষা করিয়া কুলাইয়া উঠিতে পারিবে সে-দুরাশা করিয়ো না । তোমরা যে পার এবং যেখানে পার এক-একটি গ্রামের ভার গ্রহণ করিয়া সেখানে গিয়া আশ্রয় লও। গ্রামগুলিকে ব্যবস্থাবদ্ধ করে । শিক্ষা দাও, কৃষিশিল্প ও গ্রামের ব্যবহারসামগ্ৰীসম্বন্ধে নূতন চেষ্টা প্রবর্তিত করে ; গ্রামবাসীদের বাসস্থান যাহাতে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও সুন্দর হয় তাহাদের মধ্যে সেই উৎসাহ সঞ্চার করে, এবং যাহাতে তাহারা নিজেরা সমবেত হইয়া গ্রামের সমস্ত কর্তব্য সম্পন্ন করে সেইরূপ বিধি উদ্ভাবিত করে । এ-কর্মে খ্যাতির আশা করিয়ো না এমন কি, গ্রামবাসীদের নিকট হইতে কৃতজ্ঞতার পরিবর্তে বাধা ও অবিশ্বাস স্বীকার করিতে হইবে । ইহাতে কোনো উত্তেজনা নাই, কোনো বিরোধ নাই, কোনো ঘোষণা নাই, কেবল ধৈধ এবং প্রেম, নিভৃতে তপস্তা—মনের মধ্যে কেবল এই একটিমাত্র পণ যে, দেশের মধ্যে সকলের চেয়ে যাহারা দুঃখী তাহাদের দুঃখের ভাগ লইয়া সেই দুঃপের মূলগত প্রতিকার সাধন করিতে সমস্ত জীবন সমর্পণ করিব। বাংলাদেশের প্রভিনগুগল কনফারেন্স যদি বাংলার জেলায় জেলার এইরূপ প্রাদেশিক সভা স্থাপন করিয়া তাহাকে পোষণ করিয়া তুলিবার ভার গ্রহণ করেন, এবং এই প্রাদেশিক সভাগুলি গ্রামে পল্লীতে আপন কলবান ও ছায়াপ্রদ শাখাপ্রশাখা বিস্তার করিয়া দেন তবেই স্বদেশের প্রতি আমাদের সত্য অধিকার জঙ্গিবে এবং স্বদেশের সর্বাঙ্গ সমূহ (?Հ> হইতে নানাধমনীযোগে জীবনসঞ্চারের বলে কনগ্রেস দেশের স্পদমান হৃৎপিণ্ডস্বরূপ মৰ্মপদার্থ হইয়া ভারতবর্ষের বক্ষের মধ্যে বাস করিবে । সভাপতির অভিভাষণে সভার কার্ধতালিকা অবলম্বন করিয়া আমি কোনো আলোচনা করি নাই। দেশের সমস্ত কার্বই ষে-লক্ষ্য ধরিয়া চলিবে আমি তাহার মূলতত্ত্ব কয়টি নির্দেশ করিয়াছি মাত্র। সে-কয়টি এই— প্রথম, বর্তমানকালের প্রকৃতির সহিত আমাদের দেশের অবস্থার সামঞ্জস্ত করিতে না পারিলে আমাদিগকে বিলুপ্ত হইতে হইবে। বর্তমানের সেই প্রকৃতিটি—জোট বাধা, বৃহবন্ধত, অর্গ্যানিজেস্তন। সমস্ত মহংগুণ থাকিলেও বৃহের নিকট কেবলমাত্র সমূহ আজ কিছুতেই টিকিতে পারিবে না । অতএব গ্রামে গ্রামে আমাদের মধ্যে যে বিশ্লিষ্টতা, যে মৃত্যুলক্ষণ দেখা দিয়াছে গ্রামগুলিকে সত্বর ব্যবস্থাবদ্ধ করিয়া তাহা ঠেকাইতে হুইবে । দ্বিতীয়, আমাদের চেতনা জাতীয়-কলেবরের সর্বত্র গিয়া পৌছিতেছে না । সেইজন্ত স্বভাবতই আমাদের সমস্ত চেষ্টা এক জায়গায় পুষ্ট ও অন্ত জায়গায় ক্ষীণ হইতেছে। জনসমাজের সহিত শিক্ষিতসমাজের নানাপ্রকারেই বিচ্ছেদ ঘটাতে জাতির ঐক্যবোধ সত্য হুইয়া উঠিতেছে না । তৃতীয়, এই ঐক্যবোধ কোনোমতেই কেবল উপদেশ বা আলোচনার দ্বারা সত্য হইতেই পারে না । শিক্ষিতসমাজ গণসমাজের মধ্যে র্তাহাদের কর্মচেষ্টাকে প্রসারিত করিলে তবেই আমাদের প্রাণের যোগ আপনিই সর্বত্র অবাধ সঞ্চারিত হইতে পারিবে । সর্বসাধারণকে একত্র আকর্ষণ করিয়া একটি বৃহং কর্মব্যবস্থাকে গড়িয়া তুলিতে হইলে শিক্ষিতসমাজে নিজের মধ্যে বিরোধ করিয়া তাহা কখনো সম্ভবপর হুইবে না । মতভেদ আমাদের আছেই, থাকিবেই এবং থাকাই শ্রেয় কিন্তু দূরের কথাকে দূরে রাখিয়া এবং তর্কের বিষয়কে তর্কসভায় রাখিয়া সমস্ত দেশকে বিনাশ ও বিচ্ছেদের হাত হইতে রক্ষা করিবার জন্ত সকল মতের লোককেই আজ এখনই একই কর্মের দুর্গম পথে একত্র যাত্রা করিতে হইবে, এ-সম্বন্ধে মতভেদ থাকিতেই পারে না। যদি থাকে, তবে বুঝিতে হইবে দেশের যে সাংঘাতিক দশ ঘটিয়াছে তাহা আমরা চোখ মেলিয়া দেখিতেছি না অথবা ওই সাংঘাতিক দশার যেটি সর্বাপেক্ষ দুলক্ষণ-নৈরাণ্ডের ঔদাসীন্ত—তাহা আমাদিগকেও দুরারোগ্যরূপে অধিকার করিয়া বসিয়াছে। ভ্রাতৃগণ, জগতের যে-সমস্ত বৃহং কর্মক্ষেত্রে মানবজাতি আপন মহত্তম স্বরূপকে পরম হঃখ ও ত্যাগের মধ্যে প্রকাশ করিয়া তুলিয়াছে, সেই উদার উন্মুক্ত ভূমিতেই আজ আমাদের চিত্তকে স্থাপিত করিব ;–ষে-সমস্ত মহাপুরুষ দীর্ঘকালের কঠোরতম সাধনার و يطي سمسحه ه لا @२२ রবীন্দ্র-রচনাবলী দ্বারা স্বজাতিকে সিদ্ধির পথে উত্তীর্ণ করিয়া দিয়াছেন, তাহাদিগকেই আজ আমাদের মনশ্চক্ষুর সম্মুখে রাখিয়া প্রণাম করিব, তাহ হইলেই অদ্য যে-মহাসভায় সমগ্র বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা আপন সফলতার জন্য দেশের লোকের মুখের দিকে চাহিয়াছে তাহার কর্ম যথার্থভাবে সম্পন্ন হইতে পারিবে । নতুবা সামান্ত কথাটুকুর কলহে আত্মবিশ্বত হইতে কতক্ষণ ? নহিলে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ হয়তো উদ্দেশ্বের পথে কাটা দিয়া উঠিবে এবং দলের অভিমানকেই কোনোমতে জয়ী করাকে স্বদেশের জয় বলিয়া ভুল করিয়া বসিব । আমরা এক-এক কালের লোক কালের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে কোথায় নিশ্রশস্ত হইয়া চলিয়া যাইব—কোথায় থাকিবে আমাদের ষত ক্ষুদ্রতা মান-অভিমান তর্কবিতর্ক বিরোধ—কিন্তু বিধাতার নিগৃঢ় চালনায় আমাদের জীবনের কর্ম নিশ্চয়ই ধীরে ধীরে স্তরে-স্তরে আকৃতি দান করিয়া আমাদের দেশকে উপরের দিকে গড়িয়া তুলিবে । অদ্যকার দীনতার শ্ৰীহীনতার মধ্য দিয়৷ সেই মেঘবিমুক্ত সমুজ্জল ভবিষ্যতের অভু্যদয়কে এইখানেই আমাদের সম্মুপে প্রত্যক্ষ করে। যেদিন আমাদের পৌত্রগণ সগৌরবে বলিতে পারিবে, এ-সমস্তই আমাদের, এ-সমস্তই আমরা গড়িয়াছি। আমাদের মাঠকে আমরা উর্বর করিয়াছি, জলাশয়কে নির্মল করিয়াছি, বায়ুকে নিরাময় করিয়াছি, বিদ্যাকে বিস্তৃত করিয়াছি ও চিত্তকে নির্ভীক করিয়াছি। বলিতে পারিবে আমাদের এই পরম সুন্দর দেশ–এই সুজলা সুফল। মলয়জশীতলা মাতৃভূমি, এই জ্ঞানে ধর্মে কর্মে প্রতিষ্ঠিত বীর্ষে বিধৃত জাতীয় সমাজ এ আমাদেরই কীর্তি—যেদিকে চাহিয়া দেপি সমস্তই আমাদের চিস্তা, চেষ্টা ও প্রাণের দ্বারা পরিপূর্ণ, আনন্দগানে মুখরিত এবং নূতন নূতন আশাপথের যাত্রীদের অক্লান্ত পদভারে কম্পমান । > ○>8 সদুপায় বরিশালের কোনো এক স্থান হইতে বিশ্বস্তস্থত্রে খবর পাইলাম যে, যদিও আজকাল করকচ লবণ বিলাতি লবণের চেয়ে সস্ত হইয়াছে তবু আমাদের সংবাদদাতার পরিচিত মুসলমানগণ অধিক দাম দিয়াও বিলাতি লবণ পাইতেছে । তিনি বলেন যে, সেখানকার মুসলমানগণ আজকাল সুবিধা বিচার করিয়া বিলাতি কাপড় বা লবণ ব্যবহার করে না । তাহারা নিতান্তই জেদ করিয়া করে । it i অনেক স্থলে নমপূদ্রদের মধ্যেও এইরূপ ঘটনার সংবাদ পাওয়া যাইতেছে। সমূহ ৫২৩ আমরা পার্টিশন-ব্যাপারে বিরক্ত হইয়া একদিন দেশকে বিলাতি কাপড় ছাড়াইব ইহাই পণ করিয়াছিলাম, ইহা অপেক্ষ বড়ো কথা এবং দূরের কথা আমরা ভাবি নাই। যদি জিজ্ঞাসা কর ইহা অপেক্ষা বড়ো কথাটা কী তবে আমি এই উত্তর দিব ষে, ধাংলাদেশকে দুইভাগ করার দ্বারা যে আশঙ্কার কারণ ঘটয়াছে সেই কারণটাকেই দূর করিবার প্রাণপণ চেষ্টা করা—রাগ প্রকাশ করা তাহার কাছে গৌণ। পার্টিশনে আমাদের প্রধান আশঙ্কার কারণ কী ? সে-কথা আমরা নিজের অনেকবার আলোচনা করিয়াছি ; এমন কি, আমাদের মনে এই ধারণা আছে যে, সেইদিকে লক্ষ্য রাপিয়াই কর্তৃপক্ষ বাংলাকে পূর্ব ও অপূর্ব এই দুইভাগে বিভক্ত করিয়া বঙ্গকে ব্যঙ্গ অর্থাং বিকলাঙ্গ করিয়াছেন। * বাংলাদেশের পূর্বভাগে মুসলমানের সংখ্যাই অধিক। ধর্মগত ও সমাজগত কারণে মুসলমানের মধ্যে হিন্দুর চেয়ে ঐক্য বেশি—সুতরাং শক্তির প্রধান উপকরণ তাহদের মধ্যে নিহিত হইয়া আছে। এই মুসলমান-অংশ, ভাষা সাহিত্য শিক্ষা প্রভৃতির একত্ববশত হিন্দুদের সঙ্গে অনেকগুলি বন্ধনে বদ্ধ আছে। যদি বাংলাকে হিন্দুপ্রধান ও মুসলমান-প্রধান এই দুই অংশে একবার ভাগ করা যায়, তবে ক্রমে ক্রমে হিন্দুমুসলমানের সকল বন্ধনই শিথিল করিয়া দেওয়া সহজ হয়। 缺 ম্যাপে দাগ টানিয়া হিন্দুর সঙ্গে হিন্দুকে পৃথক করিয়া দেওয়া কঠিন। কারণ বাঙালি হিন্দুর মধ্যে সামাজিক ঐক্য আছে। কিন্তু মুসলমান ও হিন্দুর মাঝখানে একটা ভেদ রহিয়া গেছে। সেই ভেদটা যে কতপানি তাহ উভয়ে পরস্পর কাছাকাছি আছে বলিয়াই প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করা যায় নাই ;—দুই পক্ষে একরকম করিয়া মিলিয়া ছিলাম । কিন্তু যে-ভেদটা আছে রাজা যদি চেষ্টা করিয়া সেই ভেদটাকে বড়ো করিতে চান, এবং দুইপক্ষকে যথাসম্ভব স্বতন্ত্র করিয়া তোলেন তবে কালক্রমে হিন্দুমুসলমানের দূরত্ব এবং পরম্পরের মধ্যে ঈর্ষাবিদ্বেষের তীব্রতা বাড়িয়া চলিবে তাহাতে সন্দেহ নাই। : আসল কথা, আমাদের দুর্ভাগ্য দেশে ভেদ জন্মাইয়া দেওয়া কিছুই শক্ত নহে, মিলন ঘটাইয়া তোলাই কঠিন। বেহারিগণ বাঙালির প্রতিবেশী এবং বাঙালি অনেক দিন হইতেই বেহারিগণের সঙ্গে কারকারবার করিতেছে কিন্তু বাঙালির সঙ্গে বেহারির সৌহৃষ্ট নাই সে-কথা বেহারবাসী বাঙালিমাত্রেই জানেন। শিক্ষিত উড়িয়াগণ বাঙালি হইতে নিজেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বলিয়া দাড় করাইতে উংস্থক এবং আসামিদেরও সেইরূপ অবস্থা। অতএব উড়িয়া আসাম বেহার ও বাংলা জড়াইয়া আমরা যে-দেশকে বহুদিন হইতে বাংলাদেশ বলিয়া জানিয়া আসিয়াছি তাহার সমস্ত অধিবাসী আপনাদিগকে t Q સ્વદર রবীন্দ্র-রচনাবলী বাঙালি বলিয়া কখনো স্বীকার করে নাই এবং বাঙালিও বেহারি উড়িয়া এবং আসামিকে আপন করিয়া লইতে কখনো চেষ্টামাত্র করে নাই বরঞ্চ তাহাদিগকে নিজেদের অপেক্ষা হীন মনে করিয়া অবজ্ঞাদ্বারা পীড়িত করিয়াছে। অতএব বাংলাদেশের যে-অংশের লোকেরা আপনাদিগকে বাঙালি বলিয়া জানে সে-অংশটি খুব বড়ো নহে এবং তাহার মধ্যেও যে ভূভাগ ফলে শস্তে উর্বর, ধনে ধান্তে পূর্ণ, যেখানকার অধিবাসীর শরীরে বল আছে, মনে তেজ আছে, ম্যালেরিয়া এবং দুর্ভিক্ষ যাহাদের প্রাণের সার শুষিয়া লয় নাই সেই অংশটিই মুসলমানপ্রধান—সেখানে মুসলমানসংখ্যা বংসরে বংসরে বাড়িয়া চলিয়াছে, হিন্দু বিরল হইয়া পড়িতেছে। এমন অবস্থায় এই বাঙালির বাংলাটুকুকেও এমন করিয়া যদি ভাগ করা যায় যাহাতে মুসলমান-বাংলা ও হিন্দু-বাংলাকে মোটামুটি স্বতন্ত্র করিয়া ফেলা যায় তাহ হইলে বাংলাদেশের মতো এমন খণ্ডিত দেশ ভারতবর্ষে আর-একটিও থাকিবে না। এমন স্থলে বঙ্গবিভাগের জন্য আমরা ইংরেজরাজের প্রতি যতই রাগ করি না কেন এবং সেই ক্ষোভ প্রকাশ করিবার জন্য বিলাতি বর্জন আমাদের পক্ষে যতই একান্ত আবগুক হউক না, তাহার চেয়ে বড়ো আবশ্বক আমাদের পক্ষে কী ছিল ? না, রাজকৃত বিভাগের দ্বারা আমাদের মধ্যে যাহাতে বিভাগ না ঘটে নিজের চেষ্টায় তাহারই সর্বপ্রকার ব্যবস্থা করা । সেদিকে দৃষ্টি না করিয়া আমরা বয়কট-ব্যাপারটাকেই এত একমাত্র কর্তব্য বলিয়া ধরিয়া লইয়াছিলাম, যে-কোনোপ্রকারেই হ’ক বয়কটকে জয়ী করিয়া তোলাতেই আমাদের সমস্ত জেদ এত বেশিমাত্রায় চড়িয়া গিয়াছিল যে, বঙ্গবিভাগের যে-পরিণাম আশঙ্কা করিয়া পার্টিশনকে আমরা বিভীষিকা বলিয়া জানিয়াছিলাম সেই পরিণামকেই অগ্রসর হইতে আমরা সহায়তা করিলাম । আমরা ধৈর্ব হারাইয়া সাধারণের ইচ্ছা-অনিচ্ছা সুবিধা-অসুবিধা বিচারমাত্র না করিয়া বিলাতি লবণ ও কাপড়ের বহিষ্কারসাধনের কাছে আর-কোনো ভালোমন্দকে গণ্য করিতে ইচ্ছাই করিলাম না। ক্রমশ লোকের সম্মতিকে জয় করিয়া লইবার বিলম্ব আমরা সহিতে পারিলাম না, ইংরেজকে হাতে হাতে তাহার কর্মফল দেখাইবার জন্ত ব্যস্ত হইয়া পড়িলাম। এই উপলক্ষে আমরা দেশের নিয়শ্রেণীর প্রজাগণের ইচ্ছা ও সুবিধাকে দলন করিবার আয়োজন করিয়াছিলাম সে-কথা স্বীকার করিতে আমাদের ভালো লাগে না কিন্তু কথাটাকে মিথ্যা বলিতে পারি না। তাহার ফল এই হইয়াছে, বাসনার অত্যুগ্রতা দ্বারা আমরা নিজের চেষ্টাতেই দেশের সমূহ ৫২৫ এক দলকে আমাদের বিরুদ্ধে দাড় করাইয়াছি। তাহাদিগকে আমাদের মনের মতো কাপড় পরাইতে কতদূর পারিলাম তাহ জানি না কিন্তু তাহদের মন খোয়াইলাম। ইংরেজের শত্রুতসাধনে কতটুকু কৃতকার্ধ হইয়াছি বলিতে পারি না, দেশের মধ্যে শক্ৰতাকে জাগ্রত কবিয়া তুলিয়াছি তাহাতে সম্মেহমাত্ৰ নাই। আমৱা যে সকল স্থানেই মুসলমান ও নিয়শ্রেণীর হিন্দুদের অসুবিধা ঘটাইয়া বিরোধ জাগাইয়া তুলিয়াছি এ-কথা সত্য নহে। এমন কি, যাহার বয়কটের কল্যাণে বিশেষ লাভবান হইয়াছে তাহারাও যে আমাদের বিরুদ্ধ হইয়াছে এমন প্রমাণও আছে। ইহার কারণ, আমরা ইহাদিগকে কাজে প্রবৃত্ত করিবার চেষ্টার পূর্বে এবং সঙ্গে সঙ্গে ইহাদের মন পাই নাই, মন পাইবার প্রকৃত পন্থা অবলম্বন করি নাই, আমাদের প্রতি ইহাদের অবিশ্বাস ও দূরত্ব দূর করি নাই। আমরা ইহাদিগকে নিজের মতে চালাইবার এবং কাজে লাগাইবারই চেষ্টা করিয়াছি কিন্তু ইহাদিগকে কাছে টানি নাই। সেইজন্য সহসা একদিন ইহাদের সুপ্তপ্রায় ঘরের কাছে আসিয়া ইহাদিগকে নাড়া দিতে গিয়া ইহাদের সন্দেহকে বিরোধকেই জাগাইয়া তুলিয়াছি। ইহাদিগকে আত্মীয় করিয়া না তুলিয়াই ইহাদের নিকট হইতে আত্মীয়তা দাবি করিয়াছি। এবং যে-উংপাত আপন লোক কোনোমতে সন্থ করিতে পারে সেই উংপাতের দ্বারা ইহাদিগকে পূর্বের চেয়ে দ্বিগুণ দূরে ফেলিয়াছি। এবারে এতকাল পরে আমাদের বক্তারা ইংরেজি সভার উচ্চমঞ্চ ছাড়িয়া দেশের সাধারণ লোকের স্বারে আসিয়া দাড়াইয়াছিলেন। দেশের লোকের মনে একটা প্রশ্ন উদয় হইল—এ কী ব্যাপার, হঠাৎ আমাদের জন্য বাবুদের এত মাথাব্যথা হইল কেন ? বস্তুতই তাহাদের জন্ত আমাদের মাথাব্যথা পূর্বেও অত্যন্ত বেশি ছিল না, এখনও একমুহূর্তে অত্যন্ত বেশি হইয় উঠে নাই। আমরা এই কথা মনে লইয়া তাহদের কাছে যাই নাই যে, দেশী কাপড় পরিলে তোমাদের মঙ্গল হইবে এইজন্যই আমাদের দিনে আহার নাই এবং রাত্রে নিদ্রার অবকাশ ঘটিতেছে না। আমরা এই বলিয়াই গিয়াছিলাম যে, ইংরেজকে জব্ব করিতে চাই কিন্তু তোমরা আমাদের সঙ্গে যোগ না দিলে বয়কট সম্পূর্ণ হইবে না অতএব ক্ষতি স্বীকার করিয়াও তোমাদিগকে দেশী কাপড় পরিতে হইবে। কখনো যাহাদের মঙ্গলচিস্তা ও মঙ্গলচেষ্টা করি নাই, বাহাদিগকে আপন লোক বলিয়া কখনো কাছে টানি নাই, যাহাদিগকে বরাবর অশ্রদ্ধাই করিয়াছি, ক্ষতিস্বীকার করাইবার বেলা তাহাদিগকে ভাই বলিয়া ডাক পাড়িলে মনের সঙ্গে তাহাজের সাড়া পাওয়া সম্ভবপর হয় না । o ৫২৬ রবীন্দ্র-রচনাবলী সাড়া যখন না পাই তখন রাগ হয় । মনে এই হয় যে, কোনোদিন যাহাদিগকে গ্রাহমাত্র করি নাই আজ তাহাদিগকে এত আদর করিয়াও বশ করিতে পারিলাম না ! উলটা ইহাদের শুমর বাড়িয়া যাইতেছে। যাহারা উপরে থাকে, যাহারা নিজেদিগকে শ্রেষ্ঠ বলিয়া জানে, নিচের লোকদের সম্বন্ধে তাহাদের এইরূপ অধৈর্য ঘটে। অশ্রদ্ধাবশতই মানবপ্রকৃতির সঙ্গে তাহাদের অপরিচয় জন্মে। ইংরেজও ঠিক এই কারণবশতই আমাদের দ্বারা তাহার কোনো অভিপ্রায়সাধনের ব্যাঘাত ঘটিলেই কার্যকারণ বিচার না করিয়া একেবারে রাগিয়া উঠে —আমরা যখন নিচে আছি তখন উপরওআলার ইচ্ছা আমাদের ইচ্ছা দ্বারা অত্যন্ত স্বাভাবিক কারণে বাধা পাইলেও সেটাকে অবিমিশ্র স্পর্ধা বলিয়া মনে হয় । ময়মনসিং প্রভৃতি স্থানে আমাদের বক্তারা যখন মুসলমান কৃষি-সম্প্রদায়ের চিত্ত আকর্ষণ করিতে পারেন নাই তখন র্তাহারা অত্যন্ত রাগ করিয়াছিলেন । এ-কথা তাহারা মনেও চিন্তা করেন নাই যে, আমরা যে মুসলমানদের অথবা আমাদের দেশের জনসাধারণের যথার্থ হিতৈষী তাহার কোনো প্রমাণ কোনোদিন দিই নাই, অতএব তাহার আমাদের হিতৈষিতায় সন্দেহ বোধ করিলে তাহাদিগকে দোষী করা যায় না। ভাইয়ের জন্য ভাই ক্ষতিস্বীকার করিয়া থাকে বটে কিন্তু ভাই বলিয়া একজন খামক আসিয়া দাড়াইলেই যে অমনি তখনই কেহ তাহাকে ঘরের অংশ ছাড়িয়া দেয় এমনতরো ঘটে না । আমরা যে দেশের সাধারণ লোকের ভাই তাহা দেশের সাধারণ লোকে জানে না এবং আমাদের মনের মধ্যেও যে তাহাদের প্রতি ভ্রাতৃভাব অত্যন্ত জাগরূক আমাদের ব্যবহারে এপনও তাহার প্রমাণ পাওয়া যায় নাই । পূর্বেই বলিয়াছি সত্য কথাটা এই যে, ইংরেজের উপরে রাগ করিয়াই আমরা দেশের লোকের কাছে ছুটিয়াছিলাম, দেশের লোকের প্রতি ভালোবাসাবশতই যে গিয়াছিলাম তাহা নহে। এমন অবস্থায় “ভাই” শব্দটা আমাদের কণ্ঠে ঠিক বিশুদ্ধ কোমল সুরে বাজে না—যে কড়ি মুরটা আর-সমস্ত স্বরগ্রাম ছাপাইয়া কানে আসিয়া বাজে সেটা অন্তের প্রতি বিদ্বেষ । 劇 আমরা দেশের শিক্ষিত লোকের জন্মভূমিকে লক্ষ্য করিয়া “মা” শব্দটাকে ধ্বনিত করিয়া তুলিয়াছি। এই শব্দের দ্বারা আমাদের হৃদয়াবেগ এতই জাগিয়া উঠে যে, আমরা মনে করিতে পারি না দেশের মধ্যে মাকে আমরা সত্য করিয়া তুলি নাই। আমরা মনে করি কেবল গানের দ্বারা কেবল ভাবোন্মাদের দ্বারা মা সমস্ত দেশের মধ্যে প্রত্যক্ষ হইয়া উঠিয়াছেন। এইজন্য দেশের সাধারণ গণ-সমাজ যদি স্বদেশের মধ্যে মাকে অনুভব না করে তবে আমরা অধৈর্ধ হইয়া মনে করি সেটা হয় তাহাদের ইচ্ছাকৃত नमूह (?ՀԳ অন্ধতার ভান, নয় আমাদের শত্রুপক্ষ তাহাদিগকে মাতৃবিস্রোহে উত্তেজিত করিয়াছে। কিন্তু আমরাই যে মাকে দেশের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করি নাই এই অপরাধটা আমর কোনোমতেই নিজের স্বন্ধে লইতে রাজি নহি । ছাত্রকে মাস্টার পড়া বুঝাইয়া দেয় নাই, বুঝাইবার ক্ষমতাও তাহার নাই, অথচ ছাত্র যখন পড়া বলিতে পারে না তখন রাগিয়া তাহাকে মারিতে যাওয়া যেমন এও তেমনি । আমরাই দেশের সাধারণ লোককে দূরে রাখিয়াছি, অথচ প্রয়োজনের সময় তাহার দূরে থাকে বলিয়া আমরাই রাগ করি। অবশেষে যাহারা আমাদের সঙ্গে স্বাভাবিক কারণেই যোগ দিতে পারে নাই, যাহারা বরাবর যে-পথে চলিয়া আসিতেছিল সেই চিরাভ্যন্ত পথ হইতে হঠাৎ ইংরেজিপড়া বাবুদের কথায় সরিতে ইচ্ছা করিল না, আমরা যথাসাধ্য তাহদের প্রতি বলপ্রয়োগ করিয়াছি, তাহাদিগকে পরাস্ত করিবার জন্য আমাদের জেদ বাড়িয়া গিয়াছে। আমরা নিজেকে এই বলিয়া বুঝাইয়াছি, বাহারা আত্মহিত বুঝে না বলপূর্বক তাহাদিগকে আত্মহিতে প্রবৃত্ত করাইব । আমাদের দুর্ভাগ্যই এই, আমরা স্বাধীনত চাই কিন্তু স্বাধীনতাকে আমরা অস্তরের সহিত বিশ্বাস করি না । মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির প্রতি শ্রদ্ধ। রাধিবার মতো ধৈর্য আমাদের নাই –আমরা ভয় দেখাইয় তাহার বুদ্ধিকে দ্রুতবেগে পদানত করিবার জন্য চেষ্টা করি । পিতৃপুরুষকে নরকস্থ করিবার ভয়, ধোবানাপিত বন্ধ করিবার শাসন, ঘরে অগ্নিপ্রয়োগ বা পথের মধ্যে ধরিয়া ঠেঙাইয়া দিবার বিভীষিকা, এ সমস্তই দাসবৃত্তিকে অস্তরের মধ্যে চিরস্থায়ী করিয়া দিবার উপায় ;—কাজ ফাকি দিবার জন্য পথ বাচাইবার জন্য আমরা যখনই এই সকল উপায় অবলম্বন করি তখনই প্রমাণ হয়, বুদ্ধির ও আচরণের স্বাধীনত ষে মানুষের পক্ষে কী অমূল্য ধন তাহা আমরা জানি না । আমরা মনে করি আমার মতে সকলকে চালানোই সকলের পক্ষে চরম শ্রেয়, অতএব সকলে যদি সত্যকে বুঝিয়া সে-পথে চলে তবে ভালোই, যদি না চলে তবে ভুল বুঝাইয়াও চালাইতে হইবে অথবা চালনার সকলের চেয়ে সহজ উপায় আছে জবরদস্তি । বয়কটের জেদে পড়িয়া আমরা এই সকল সংক্ষিপ্ত উপায় অবলম্বন করিয়া হিতবুদ্ধির মূলে আঘাত করিয়াছি তাহতে সন্দেহ নাই । অল্পদিন হইল মফস্বল হইতে পত্র পাইয়াছি সেখানকার কোনো একটি বড়ো বাজারের লোকে নোটস পাইয়াছে যে, যদি তাহারা বিলাতি জিনিস পরিত্যাগ করিয়া দেশী জিনিসের আমদানি না করে তবে নির্দিষ্ট কালের মেয়াদ উত্তীণ হইলেই বাজারে আগুন লাগিবে। সেই সঙ্গে স্থানীয় ও নিকটবর্তী জমিদারের আমলাদিগকে প্রাণহানির ভয় দেখানো হইয়াছে। । Q、br & রবীন্দ্র-রচনাবলী t এইরূপভাবে নোটিস দিয়া কোথাও কোথাও আগুন লাগানো হইয়াছে। ইতিপূর্বে জোর করিয়া মাল আমদানি বন্ধ করিবার চেষ্ট হইয়াছে এবং খরিদদারদিগকে বলপূর্বক বিলাতি জিনিস খরিদ করিতে নিরস্ত করা হইয়াছে। ক্রমে এখন সেই উৎসাহ ঘরে আগুন লাগানো এবং মানুষ মারাতে গিয়া পৌঁছিয়াছে। t দুঃখের বিষয় এই যে, এইরূপ উংপাতকে আমাদের দেশের অনেক ভদ্রলোক আজও অন্যায় বলিয়া মনে করিতেছেন না—ৰ্তাহারা স্থির করিয়াছেন, দেশের হিতসাধনের উপলক্ষে এরূপ উপদ্রব করা যাইতে পারে। ইহাদের নিকট ন্যায়ধর্মের দোহাই পাড়া মিথ্যা –ইহার বলেন, মাতৃভূমির মঙ্গলের জন্ত বাহ করা যাইবে তাহ অধৰ্ম হইতে পারে না। কিন্তু অধর্মের দ্বারা যে মাতৃভূমির মঙ্গল কখনোই হইবে না সে-কথা বিমুখ বুদ্ধির কাছেও বারবার বলিতে হইবে । জিজ্ঞাসা করি, বাজারে আগুন লাগাইয়া অথবা অনিচ্ছুক লোকের মাথা ভাঙিয়া যদি আমরা বিলাতি কাপড় ছাড়াইয়া একদল লোককে দেশী কাপড় ধরাই তবে বাহিরে মাত্র দেশী কাপড় পরাইয়া ইহাদের সমস্ত অস্তঃকরণকে কি স্বদেশীর বিরুদ্ধে চিরদিনের জন্য বিদ্রোহী করিয়া তুলি না ? দেশের যে-সম্প্রদায়ের লোক স্বদেশী প্রচারের ব্ৰত লইয়াছেন তাহাদের প্রতি এই সকল লোকের বিদ্বেষকে কি চিরস্থায়ী করা হয় না ? এইরূপ ঘটনাই কি ঘটিতেছে না ? “যাহারা কখনো বিপদে আপদে মুখে দুঃখে আমাদিগকে স্নেহ করে নাই, আমাদিগকে যাহারা সামাজিক ব্যবহারে পশুর অপেক্ষা অধিক ঘৃণা করে তাহারা আজ কাপড় পরানো বা অন্য যে-কোনো উপলক্ষে আমাদের প্রতি জবরদস্তি প্রকাশ করিবে, ইহা আমরা সহ করিব না” দেশের নিয়শ্রেণীর মুসলমান এবং নমসূত্রের মধ্যে এইরূপ অসহিষ্ণুতা জাগিয়া উঠিয়াছে। ইহার জোর করিয়া, এমন কি, ক্ষতিস্বীকার করিয়াও বিলাতি সামগ্ৰী ব্যবহার করিতেছে। তাই বলিতেছি, বিলাতি দ্রব্য ব্যবহারই দেশের চরম অহিত নহে, গৃহবিচ্ছেদের মতো এতবড়ো অহিত আর কিছুই নাই। দেশের এক পক্ষ প্রবল হইয়া কেবলমাত্র জোরের দ্বারা অপর ক্ষীণ পক্ষকে নিজের মতশৃঙ্খলে দাসের মতো আবদ্ধ করিবে ইহার মতে ইষ্টহানিও আর কিছু হইতে পারে না। এমন করিয়া, বন্দে মাতরম্ মন্ত্র উচ্চারণ করিলেও মাতার বন্দন করা হইবে না—এবং দেশের লোককে মুখে ভাই বলিয়া কাজে ভ্রাতৃত্রোহিত করা হইবে। সবলে গল টিপিয়া ধরিয়া মিলনকে মিলন বলে না,— ভয় দেখাইয়া, এমন কি, কাগজে কুৎসিত গালি দিয়া মতের অনৈক্য নিরন্ত করাকেও জাতীয় ঐক্য সাধন বলে না। সমূহ 4ఖఏ এ-সকল প্রণালী দাসত্বেরই প্রণালী । যাহার এইরূপ উপদ্রবকে দেশহিতের উপায় বলিয়া প্রচার করে তাহার স্বজাতির লজ্জাকর হীনতারই পরিচয় দেয় এবং এইপ্রকার উংপাত করিয়া যাহাদিগকে দলন দমন করিয়া দেওয়া যায় তাহাদিগকেও হীনতাতেই দীক্ষা দেওয়া হয়। o সেদিন কাগজে দেখিতেছিলাম, মর্লিকে যখন বলা হইয়াছিল ষে প্রাচ্যগণ কোনোপ্রকার আপসে অধিকারপ্রাপ্তির মূল্য বোঝে না, তাহারা জোরকেই মানে— তপন তিনি বলিয়াছিলেন, তাহা হইতে পারে কিন্তু আমরা তো প্রাচ্য নই আমরা পাশ্চাত্য । কথাটা গুনিয়া মনের মধ্যে আক্ষেপ বোধ হইয়াছিল। আক্ষেপের কারণ এই যে, আমাদের ব্যবহারে আমরা প্রাচ্যদের বিরুদ্ধে এই গুরুতর অপবাদের সমর্থন করিয়া থাকি । অন্তকে জোরের দ্বারা অভিভূত করিয়া চালনা করিব এই অতি হীনবুদ্ধিকে আমরা কিছুতে ছাড়িতে চাহি না । যেখানে আমরা মুখে স্বাধীনত চাই সেখানেও আমরা নিজের কর্তৃত্ব অন্যের প্রতি অবৈধ বলের সহিত খাটাইবার প্রবৃত্তিকে খর্ব করিতে পারি না । উহার প্রতি জোর না পাটাইলে উহার মঙ্গল হইবে না অতএব যেমন করিয়া পারি আমাকে উহার উপরে কর্তী হইতে হইবে । হিতাকুষ্ঠানের উপায়ের দ্বারাও আমরা মানুষের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করি এবং এই প্রকার অশ্রদ্ধার ঔদ্ধত্য দ্বারা আমরা নিজের এবং অন্য পক্ষের মকুন্যত্বকে নষ্ট করিতে থাকি । যদি মানুষের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা থাকে তবে লোকের ঘরে আগুন লাগানো এবং মারধর করিয়া গুগুমি করিতে আমাদের কদাচই প্রবৃত্তি হইবে না ; তবে আমরা পরম ধৈর্ধের সহিত মানুষের বৃদ্ধিকে হৃদয়কে মানুষের ইচ্ছাকে মঙ্গলের দিকে ধর্মের দিকে আকর্ষণ করিতে প্রাণপাত করিতে পারিব। তখন আমরা মানুষকেই চাহিব, মানুষ কী কাপড় পরিবে বা কী কুন খাইবে তাহাই সকলের চেয়ে বড়ো করিয়া চাহিব না। মানুষকে চাহিলে মানুষের সেবা করিতে হয়, পরস্পরের ব্যবধান দূর করিতে হয়—নিজেকে নম্র করিতে হয়। মানুষকে যদি চাই তবে যথার্থভাবে মানুষের সাধনা করিতে হুইবে ; তাহাকে কোনোমতে আমার মতে ভিড়াইবার আমার দলে টানিবার জন্তু টানাটানি-মারামারি না করিয়া আমাকে তাহার কাছে আত্মসমর্পণ করিতে হইবে। সে যখন বুৰিবে আমি তাহাকে আমার আহ্ববর্তী অধীন করিবার জন্য বলপূর্বক চেষ্টা করিতেছি না, আমি নিজেকে তাহারই মঙ্গলসাধনের জন্ত উংসর্গ করিয়াছি তখনই সে বুঝিবে, আমি মানুষের সঙ্গে মনুষোচিত ব্যবহারে প্রবৃত্ত হইয়াছি—তখনই সে বুঝিবে, বলে মাতরম্ মন্ত্রের দ্বারা আমরা সেই মাকে বন্দনা করিতেছি দেশের ছোটােবড়ে ۹ وهساس • لا Ç (?S)e রবীন্দ্র-রচনাবলী সকলেই যাহার সন্তান। তখন মুসলমানই কি আর নমপূত্রই কি, বেহারি উড়িয়া অথবা অন্ত যে-কোনো ইংরেজিশিক্ষায় পশ্চাদবর্তী জাতিই কি, নিজের শ্রেষ্ঠতার অভিমান লইয়া কাহাকেও ব্যবহারে বা বাক্যে বা চিন্তায় অপমানিত করিব না। তখনই সকল মাহুষের সেবা ও সম্মানের দ্বার, যিনি সকল প্রজার প্রজাপতি, তাহার প্রসন্নতা এই ভাগ্যহীন দেশের প্রতি আকর্ষণ করিতে পারিব। নতুবা, আমার রাগ হইয়াছে বলিয়াই দেশের সকল লোককে আমি রাগাইয়া তুলিব, অথবা আমি ইচ্ছা করিতেছি বলিয়া দেশের সকল লোকের ইচ্ছাকে আমার অনুগত করিব ইহা কোনো বাগ্মিতার দ্বারা কদাচ ঘটিবে না । ক্ষণকালের জন্য একটা উৎসাহের উত্তাপ জাগাইয়া তুলিতে পারি কিন্তু তাহা সত্যকার ইন্ধনের অভাবে কখনোই স্থায়ী হইতে পরিবে না। সেই সত্যপদার্থ মাহুষ—সেই সত্যপদার্থ মানুষের হৃদয় বুদ্ধি, মানুষের মন্থন্তত্ব, স্বদেশী মিলের কাপড় অথবা করকচ লবণ নহে। সেই মানুষকে প্রত্যহ অপমানিত করিয়া মিলের কাপড়ের পূজা করিতে থাকিলে আমরা দেবতার বর পাইব না। বরঞ্চ উলটা ফলই পাইতে থাকিব । ബ একটি কথা আমরা কখনো ভুলিলে চলিবে না যে, অন্যায়ের দ্বারা, অবৈধ উপায়ের দ্বারা কার্যোদ্ধারের নীতি অবলম্বন করিলে কাজ আমরা অল্পই পাই অথচ তাহাতে করিয়া সমস্ত দেশের বিচারবুদ্ধি বিকৃত হইয়া যায়। তখন কে কাহাকে কিসের দোহাই দিয়া কোন সীমার মধ্যে সংযত করিবে ? দেশহিতের নাম করিয়া যদি মিথ্যাকেও পবিত্র করিয়া লই এবং অন্যায়কেও ন্যায়ের আসনে বসাই তবে কাহাকে কোনখানে ঠেকাইব ? শিশুও যদি দেশের হিতাহিত সম্বন্ধে বিচারক হইয়া উঠে এবং উন্মত্তও যদি দেশের উন্নতিসাধনের ভারগ্রহণ করে তবে সেই উচ্ছম্বলতা সংক্রামক হইতে থাকিবে, মহামারীর ব্যাপ্তির মতো তাহাকে রোধ করা কঠিন হইবে। তখন দেশহিতৈষীর ভয়ংকর হস্ত হইতে দেশকে রক্ষা করাই আমাদের পক্ষে সকলের চেয়ে দুঃখকর সমস্ত হইয়া পড়িবে। দুবুদ্ধি স্বভাবতই কোনো বন্ধন স্বীকার করে না ; বৃহংভাবে সকলের সহিত যুক্ত হইয়া বৃহৎ কাজ করিতে সে সহজেই অক্ষম । দুঃস্বপ্ন যেমন দেখিতে দেখিতে অসংগত অসংলগ্নভাবে এক বিভীষিকা হইতে আর-এক বিভীষিকায় লাফ দিয়া চলিতে থাকে তেমনি মঙ্গলবুদ্ধির অরাজকতার দিনে নিতান্তই সামান্ত কারণে চন্দননগরের মেয়রকে হত্যা করিবার আয়োজন হয়, কোথাও কিছু নাই হঠাৎ কুষ্টিয়ার নিতান্ত নিরপরাধ পাদ্রির পৃষ্ঠে গুলি বর্ষিত হয়, কেন যে ট্রামগাড়ির প্রতি সাংঘাতিক আক্রমণের উদযোগ হয় তাহা কিছুই বুঝিতে পারা যায় না ; বিভীষিকা অত্যন্ত তুচ্ছ উপলক্ষ্য অবলম্বন করিয়া চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িতে থাকে, এবং কাগুজ্ঞানহীন মত্তত মাতৃভূমির Q সমূহ (9) হৃৎপিণ্ডকেই বিীর্ণ করিয়া দেয়। এইরূপ ধর্মহীন ব্যাপারে প্রণালীর ঐক্য থাকে না, প্রয়োজনের গুরুলযুত বিচার চলিয়া যায়, উদেশ্ব ও উপায়ের মধ্যে মুসংগতি স্থান পায় না, একটা উদভ্ৰান্ত দুঃসাহসিকতাই লোকের কল্পনাকে উত্তেজিত করিয়া তুলে। অন্ত বারবার দেশকে স্মরণ করাইয়া দিতে হইবে যে, অধ্যবসায়ই শক্তি এবং অধৈৰ্যই দুর্বলতা ; প্রশস্ত ধর্মের পথে চলাই নিজের শক্তির প্রতি সম্মান এবং উৎপাতের সংকীর্ণ পথ সন্ধান করাই কাপুরুষতা, তাহাই মানবের প্রকৃত শক্তির প্রতি অশ্রদ্ধা, মানবের মহন্তধর্মের প্রতি অবিশ্বাস । অসংযম নিজেকে প্রবল বলিয়া অহংকার করে ; কিন্তু তাহার প্রবলতা কিসে ? সে কেবল আমাদের যথার্থ অন্তরতর বলের সম্বলকে অপহরণ করিবার বেলায় । এই বিকৃতিকে যে-কোনো উদ্বেগুসাধনের জন্যই একবার প্রশ্রয় দিলে শয়তানের কাছে মাথা বিকাইয়া রাখা হয়। প্রেমের কাজে স্বজনের কাজে পালনের কাজেই যথার্থভাবে আমাদের সমস্ত শক্তির বিকাশ ঘটে ; কোনো একটা দিকে আমরা মঙ্গলের পথ নিজের শক্তিতে একটুমাত্র কাটিয়া দিলেই তাহ অভাবনীয়রূপে শাখায় প্রশাখায় ব্যাপ্ত হইয়া পড়ে ;–একটা কিছুকে গড়িয়া তুলিলে কতকটা কৃতকার্য হইবামাত্র সেই আনন্দে আমাদের শক্তি অচিন্তনীয়রূপে নবনব স্বষ্টিদ্বারা নিজেকে চরিতার্থ করিতে থাকে। এই মিলনের পথ স্বজনের পথই ধর্মের পথ। কিন্তু ধর্মের পথ দুর্গম—দুর্গং পথস্তং কবয়ে বদন্তি । এই পথেই আমাদের সমস্ত পৌরুষের প্রয়োজন, ইহার পাথেয় সংগ্ৰহ করিতেই আমাদের সর্বস্ব ত্যাগ করিতে হইবে ; ইহার পারিতোষিক অহংকারতুপ্তিতে নহে, অহংকারবিসর্জনে ; ইহার সফলতা অন্তকে পরাস্ত করিয়া নহে, নিজেকে পরিপূর্ণ করিয়া । >\○>● S DDDDD DDDDD DDDD DDDDDDD BD DD DD DBBBBB BD DBDD BB gg DDD DDD DDS BB D HHHH DDDD DDD BDD DDBB BDD DDD DDDD ठांशं किब्रहण विवृद्धिरङ जहेत्र षांत्र अहे जखांकब्र cनोक्लबौद्र पठेनारे उांशंद्र यवां१ ।।