সমূহ/সার লেপেল গ্রিফিন

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন



সার লেপেল গ্রিফিন

কুকুর-সম্প্রদায়ের মধ্যে খেকি কুকুর বলিয়া একটা বিশেষ জাত আছে, তাহাদের খেই খেই আওয়াজের মধ্যে কোনোপ্রকার গাষ্ঠীর্ষ অথবা গৌরব নাই কিন্তু সিংহের জাতে খেকি সিংহ কখনো শুনা যায় নাই। সার লেপেল গ্রিফিন জুন মাসের ফর্টনাইটলি রিভিয়ু পত্রে বাঙালিদের বিরুদ্ধে যে একটা প্রবন্ধ লিথিয়াছেন, তাহার মধ্যে ভারি একটা র্থেই খেই আওয়াজ দিতেছে, ইহাতে লেখকের জাতি নিরূপণ করা কিছু কঠিন হইয়া পড়িয়াছে।

কিন্তু লেখকের অভিপ্রায় যেমনই হউক বাঙালিদের তাহার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। কারণ, উক্ত আওয়াজে আর কোনো ফল না হউক আমাদিগকে সজাগ করিয়া রাখে। যে-সময় একটুখানি নিদ্রাকর্ষণ হইয়া আসে ঠিক সেই সময়ে যদি এই রকম একটা করিয়া বিদেশী হঠাং আমাদের প্রতি খেকাইয়া আসে তাহাতে চট করিয়া আমাদের তন্দ্র। ভাঙিয়া যাইতে পারে।

একটু যেন ঢুলুনি আসিয়াছিল—কনগ্রেসের মাথাটা তাহার স্বন্ধের উপর একটু যেন টলটল করিতেছিল, নানাকারণে তাহার স্নায়ু এবং পেশী যেন শিথিল হইতেছিল এমন সময়ে কেবল বন্ধুর উৎসাহ পাওয়ার অপেক্ষা শক্রপক্ষের নিকট হইতে দুই-একটা ধাক্কা ধাইলে বেশি কাজ দেখে। এজন্ত গ্রিফিন সাহেব ধন্ত।

তিনি আরও ধন্য যে, তিনি কোনো যুক্তি না দিয়া গালি দিয়াছেন। আমরা একটা জাতি নূতন শিক্ষা পাইয় একটা নূতন উচ্চ আশার আকর্ষণে অগ্রসর হইতে চেষ্ট করিতেছি, অবশুই আমাদের নানাপ্রকার ক্রটি, অক্ষমতা এবং অপরিপক্কতা পদে পদে প্রকাশ পাইবার কথা এবং রাজনীতিবিশারদ ইংরেজের চক্ষে সেগুলি ধরা পড়িবার সম্পূর্ণ সম্ভাবন। কিন্তু সেই দুর্বল ভাগে আমাদিগকে আক্রমণ না করিয়া গ্রিফিন যখন কেবল গালিমন্দ দিয়াছেন তখন আমরা বেশ নিশ্চিন্ত হইয়া বসিয়া থাকিতে পারি।

গালি-জিনিসটাও যে নিতান্ত সামান্ত তাহা নহে, কিন্তু গালিবিশেষ আছে। গ্রিফিন আমাদিগকে বলিয়াছেন, তোমাদিগকে রাজনৈতিক অধিকার দেওয়াও যা আর বানরকে দেওয়াও তা। একজন স্কুলের ছাত্রও চেষ্টা করিলে ইহা অপেক্ষা সুনিপুণ গালি দিতে পারে। গ্রিফিন ষে-জন্তুটার উল্লেখ করিয়াছেন সে-বেচারার কিচিমিচিপূর্বক মুখবিকার করা ছাড়া আক্রোশ প্রকাশের অন্ত উপায় নাই—কিন্তু ভদ্রলোকের হাতে এত প্রকার ভক্রোচিত অস্ত্র আছে যে, অশিষ্ট মুখভঙ্গিম তাহার পক্ষে নিতান্তই ○○ど。 রবীন্দ্র-রচনাবলী অনাবশুক । গ্রিফিন যখন সেই অশিষ্টতা অবলম্বন করিয়াছেন তখন আমরা তাহ হইতে কেবল কৌতুক লাভ করিবার চেষ্টা করিয়া তাহার অনুকরণে ক্ষাস্ত হইব। গালমন্দ বাদ দিয়া সমস্ত প্রবন্ধে গ্রিফিন সাহেবের একমাত্র কথা এই যে, বাঙালি দুর্বল অতএব রাজ্যতন্ত্রে বাঙালির কোনো স্থান থাকিতে পারে না । কিন্তু ইতিমধ্যে অনেক বাঙালি জিলা শাসনের ভার পাইয়াছে এবং অনেক বাঙালি মন্ত্ৰী-আসনও অধিকার করিয়াছে, যদি তাহাদের কোনো অযোগ্যতা আবিষ্কৃত হইয়া থাকে তবে প্রবন্ধে তাহার প্রমাণ দিলে তাহার যুক্তি পাকা হইত। ঘরে বসিয়া অনেক মূলতত্ত্ব গড়া যায়, কিন্তু সত্যের সঙ্গে যখন তাহার অনৈক্য হয় তখন স্বরচিত হইলেও তাহাকে বিসর্জন দেওয়া কর্তব্য । আমি একটা তত্ত্ব বাধিয়াছিলাম যে, ইংরেজ পুরুষের লেখায় যদি বা কোনো কারণে উদারতার অভাব লক্ষিত হয় তথাপি তাহার মধ্যে একটা সংযত আত্মমর্যাদা থাকে ; কারণ যে-লোক সৌভাগ্যবান এবং ক্ষমতাবান তাহার লেখার মধ্যে একটি বিনয় এবং সেই বিনয়ের মধ্যেই একটি প্রবল পৌরুষ থাকে-আমাদের মতে যাহারা দুর্ভাগ্য, যাহাদের মুখ ছাড়া আর কিছু নাই সময়ে সময়ে অক্ষম আক্রোশে তাহার অমিতভাষী হইয়া আপনার নিরুপায় দৌর্বল্যেরই পরিচয় দেয়। কিন্তু গ্রিফিনের লেখা ইংরেজি বড়ো কাগজে বাহির হইয়া থাকে এবং সেই সঙ্গে আমার প্রিয়তত্ত্বটিকে বিসর্জন দিতে হয় । গ্রিফিন বাঙালিকে রাজনৈতিক অধিকার হইতে বঞ্চিত করিবার পূর্বে নিজেদের পার্লামেণ্টে একট। নূতন নিয়ম প্রচার করিবার চেষ্টা করিবেন । এবার হইতে বক্তৃতামঞ্চে বাগযুদ্ধে পালামেন্টের মেম্বর নির্বাচিত না হইয়া মল্লভূমে স্বশ্বযুদ্ধে সভ্য স্থির হইবে । তাহা হইলে ইংরেজ মন্ত্রী-সভায় কেবল বীরমণ্ডলীই অধিকার লাভ করিবে এবং যাহারা শুদ্ধমাত্র কলম চালাইতে জানে তাহারা ফর্টনাইটলি রিভিয়ুতে অত্যন্ত ঝগড়াটে সুরে প্রবন্ধ লিখিবে । > S ?? পরিশিষ্ট । ¢öዓ ইংরেজের আতঙ্ক

  • ১৮৫৫ খ্ৰীস্টাৰে হিন্দু মহাজনদের দ্বারা একান্ত উৎপীড়িত হইয়। গবর্মেন্টের নিকট নালিশ করিবার জন্ত সাওতালগণ তাহাদের অরণ্য-আবাস ছাড়িয়া কলিকাত অভিমুখে যাত্রা করিয়াছিল । তখন ইংরেজ সাওতালকে ভালো করিয়া চিনিত না ;–তাহার কী চায়, কেন বাহির হইয়াছে কিছুই বুঝিতে পারিল না । এদিকে পথের মধ্যে পুলিস তাহাদের সহিত লাগিল—আহারও ফুরাইয়া গেল—পেটের জালায় লুটপাট আরম্ভ হইল। অবশেষে গবর্মেন্টের ফৌজ আসিয়া তাহাদিগকে দলকে-দল গুলি করিয়৷ ভূমিসাং করিতে লাগিল ।

এই ঘটনার উপলক্ষে হান্টার সাহেব বলেন, ভারতবর্ষে অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান সম্প্রদায়ের সংখ্যা অল্প এবং তাহারা বহুসংখ্যক ভিন্নজাতীয় অধিবাসীর দ্বারা পরিবেষ্টিত । এরূপ অবস্থায় সামান্ত স্বত্রপাতেই বিপদের আশঙ্কাটা অত্যন্ত প্রবল. হইয় উঠে। তখন পরিণামের প্রতি লক্ষ্য করিয়া ধীরভাবে বিবেচনা করিবার সময় থাকে না—অতিসত্বর সবলে একটা চুড়ান্ত নিম্পত্তি করিয়া ফেলিবার প্রবৃত্তি জন্মে। যধন অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ানগণ এইরূপ কোনো কারণে অকস্মাং সন্ত্রস্ত হইয়া উঠে তখনই গবর্মেন্টের মাথা ঠাণ্ড রাখা বিশেষরূপে আবশ্বক হয় । হান্টার বলেন, এরূপ উত্তেজনার সময় ভারত-গবর্মেন্টকে প্রায়ই ঠাণ্ডা থাকিতে দেখা গিয়াছে। উপরি-উক্ত সাওতাল-উপপ্লবে কাটাকুটির কার্যটা বেশ রীতিমতো সমাধা করিয়া এবং বীরভূমের রাঙা মাটি সাওতালের রক্তে লোহিততর করিয়া দিয়া তাহার পরে ইংরেজরাজ হতভাগ্য বস্তুদিগের দুঃখনিবেদনে কর্ণপাত করিলেন । যখন বন্দুকের আওয়াজটা বন্ধ করিয়া তাহাদের সকল কথা ভালো করিয়া শুনিলেন তখন বুঝিলেন তাহাদের প্রার্থনা অন্যায় নহে। তখন তাহাদের আবশুকমতো আইনের সংশোধন, পুলিসের পরিবর্তন এবং যথোপযুক্ত বিচারাশালার প্রতিষ্ঠা করা হইল । কিন্তু অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান সম্প্রদায়ের উন্ম তখনও নিবারণ হইল না । বিদ্রোহীদের প্রতি নিরতিশয় নির্দয় শাস্তিবিধান না করিয়া তাহারা ক্ষম্ভ হইতে চাহে না । তাহারা বলিল, বিদ্রোহীর স্বাহ চাহিয়াছিল সকলই যদি পাইল তবে তো তাহাদের বিদ্রোহের সার্থকতাসাধন করিয়া একপ্রকার পোষকতা করাই হইল। ক্যালকাটা রিভিপত্রের কোনো ইংরেজ লেখক এই শান্তিপ্রিয় নিরীহ সাওতালদিগকে বনের ব্যাঘ্ৰ, রক্তপিপাসু বর্বর প্রভৃতি বিশেষণে অভিহিত করিয়া, এক প্রবন্ধ লিখিলেন, তাহাতে, কেবল ميون سدس ه لا রবীন্দ্র-রচনাবলী دروس ) দোষীদিগকে নহে, বিদ্রোহী জেলার অধিবাসিবর্গকে একেবারে সর্বসমেত সমুদ্রপারে দ্বীপান্তরিত করিয়া দিবার জন্য গবর্মেন্টকে অনুরোধ করিলেন । মনে একবার ভয় ঢুকিলে বিচারও থাকে না, দয়াও থাকে না। আমাদের সংস্কৃতশাস্ত্রে আছে—শক্তস্ত ভূষণং ক্ষম । কেবল ভূষণ কেন, তাহ স্বাভাবিক বলিলেওঁ নিতান্ত অত্যুক্তি হয় না। যেখানে মনে মনে আত্মশক্তির অভাব আশঙ্কা হয়, সেখানে মানুষ, হয় অগত্যা ক্ষমা করে, নয় লেশমাত্র ক্ষমা করে না, নিষ্ঠুরভাবে অন্তকে ভয় দেখাইতে চেষ্টা করে। অনেক সময় হিংস্র পশু যে অগ্রসর হইয়। আক্রমণ করে, সকলেই জানেন ভয়ই তাহার মূল কারণ, হিংশ্রত নহে। ইংরেজ যখন কোনো কারণে আমাদিগকে ভয় করে তখনই সেটা আমাদের পক্ষে বড়ো ভয়ের বিষয় হইয়া দাড়ায়—তখনই ভয়ের কম্পনে দয়ামায়া সুবিচার আপাদমস্তক টলমল করিতে থাকে । ইংরেজ হঠাৎ কনগ্রেসের মূর্তি দেখিয়া প্রথমটা আচমকা ডরাইয়া উঠিয়াছিল। তাহার কারণ, মানুষ চিরসংস্কারবশত স্বদেশী জুজুকে যতটা ভয় করে, বিদেশী বিভীষিকাকে ততটা নহে। এইজন্য ভারতবর্ষের সুপশয়নাগারে হঠাৎ সেই পোলিটিকাল জুজুর আবির্ভাব দেখিয়া ইংরেজের সুস্থ প্লীহাও চমকিয়৷ উঠিয়াছিল । কিন্তু কনগ্রেসটার উপরে প্রত্যক্ষভাবে কোনোরূপে আঘাত করা হয় নাই । তাহার কারণ, ঢাকের উপরে ঘা মারিলে ঢাক আরও বেশি করিয়া বাজিয়া উঠে । কনগ্রেসের আর-কোনো ক্ষমতা থাক্ বা না থাকু গলার জোর আছে, তাহার শব্দ সমুদ্রপার পর্যন্ত গিয়া পৌঁছে। সুতরাং এই নবনির্মিত জাতীয় জয়ঢাকটার উপরে কাঠি না মারিয়া তাহাকে তলে তলে ছিদ্র করিবার আয়োজন করা হইল। মুসলমানের প্রথমে কনগ্রেসে যোগ দিবার উপক্রম করিয়া সহসা যে বিমুখ হইয়া দাড়াইল তাহার কারণ বোঝা নিতান্ত কঠিন নহে–এবং পাঠকদের নিকট সে-কারণ স্পষ্ট করিয়া নির্দেশ করা অনাবশ্বক বোধ করি । * কিন্তু এতদিনে ইংরেজ এ-কথা কতকটা বুঝিয়া থাকিবে যে, হিন্দুর হস্তে পলিটিক্স তেমন মারাত্মক নহে। আবহমান কালের ইতিহাস অনুসন্ধান করিয়া দেখিলেও ভারতবর্ষে পোলিটিকাল ঐক্যের কোনো লক্ষণ কোনোকালে দৃষ্টিগোচর হয় না। ঐক্য কাহাকে বলে মুসলমান তাহ জানে এবং পলিটিক্সও তাহার প্রকৃতিবিরুদ্ধ নহে ; মুসলমান যদি দূরে থাকে তবে কনগ্রেস হইতে আগু আশঙ্কার কোনো কারণ নাই । হিন্দুজাতির প্রতি পলিটিক্সের প্রভাব যে তেমন প্রবল নহে কনগ্রেগই তাহার