সাম্য
সাম্য
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
সম্পাদক :
শ্রীব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
শ্রীসজনীকান্ত দাস
বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ
২৪৩।১, অপার সারকুলার রোড
কলিকাতা
বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষৎ হইতে
শ্রীমন্মথমোহন বসু কর্তৃক
প্রকাশিত
আষাঢ়, ১৩৪৫
শনিরঞ্জন প্রেস
২৫|২ মোহনবাগান রো
কলিকাতা হইতে
শ্রীপ্রবোধ নান কর্ত্তৃক
মুদ্রিত
বিজ্ঞপ্তি
১২৪৫ বঙ্গাব্দের ১৩ই আষাঢ়, রবিবার, ( ১৮৩৮ খ্রীষ্টাব্দ, ২৭এ জুন ) রাত্রি ৯টায় কাঁটালপাড়ায় বঙ্কিমচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। বাংলা সাহিত্য-পঞ্জীতে সেটি স্মরণীয় দিন—ঐ দিন আকাশে কিন্নর-গন্ধর্বেরা নিশ্চয়ই দুন্দুভিধ্বনি করিয়াছিল—দেববালারা অলক্ষ্যে পুষ্পবৃষ্টি করিয়াছিল—স্বর্গে মহোৎসব নিষ্পন্ন হইয়াছিল। এই বৎসরের ১৩ই আষাঢ় বঙ্কিমচন্দ্রের জন্ম-শতবার্ষিকী। এই শতবার্ষিকী সুসম্পন্ন করিবার জন্য বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ নানা উদ্যোগ-আয়োজন করিতেছেন—দেশের প্রত্যেক সাহিত্য-প্রতিষ্ঠানকে এবং বিশিষ্ট সাহিত্যিকদিগকে উৎসবের অংশভাগী হইবার জন্য আমন্ত্রণ করা হইতেছে। সারা বাংলা দেশে বেশ সাড়া পড়িয়া গিয়াছে। বঙ্গের বাহিরেও নানা স্থান হইতে সহযোগের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যাইতেছে।
পরিষদের নানাবিধ আয়োজনের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য—বঙ্কিমচন্দ্রের যাবতীয় রচনার একটি প্রামাণিক ‘শতবার্ষিক সংস্করণ’-প্রকাশ। বঙ্কিমচন্দ্রের সমগ্র রচনা—বাংলা ইংরেজী, গদ্য পদ্য, প্রকাশিত অপ্রকাশিত, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, চিঠিপত্রের একটি নির্ভুল ও Scholarly সংস্করণ প্রকাশের উদ্যম এই প্রথম—১৩০০ বঙ্গাব্দের ২৬এ চৈত্র তাঁহার লোকান্তরপ্রাপ্তির দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বৎসর পরে—করা হইতেছে; এবং বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ যে এই সুমহৎ কার্যে হস্তক্ষেপ করিয়াছেন, তজ্জন্য পরিষদের সভাপতি হিসাবে আমি গৌরব বোধ করিতেছি।
পরিষদের এই উদ্যোগে বিশেষভাবে সহায়ক হইয়াছেন, মেদিনীপুর ঝাড়গ্রামের ভূম্যধিকারী কুমার নরসিংহ মল্লদেব বাহাদুর। তাঁহার বরণীয় বদান্যতায় বঙ্কিমের রচনা প্রকাশ সহজসাধ্য হইয়াছে। তিনি সমগ্র বাঙালী জাতির কৃতজ্ঞতাভাজন হইলেন। এই প্রসঙ্গে মেদিনীপুরের জিলা ম্যাজিষ্ট্রেট শ্রীযুক্ত বিনয়রঞ্জন সেন মহাশয়ের উদ্যমও উল্লেখযোগ্য।
শতবার্ষিক সংস্করণের সম্পাদন-ভার ন্যস্ত হইয়াছে শ্রীযুক্ত ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও শ্রীযুক্ত সজনীকান্ত দাসের উপর। বাংলা সাহিত্যের লুপ্ত কীর্তি পুনরুদ্ধারের কার্যে তাঁহারা ইতিমধ্যেই যশস্বী হইয়াছেন। বর্তমান সংস্করণ সম্পাদনেও তাঁহাদের প্রভূত নিষ্ঠা, অক্লান্ত অধ্যবসায় এবং প্রশংসনীয় সাহিত্য-বুদ্ধির পরিচয় মিলিবে। তাঁহারা বহু অসুবিধার মধ্যে এই বিরাট্ দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছেন, এই নিমিত্ত বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের পক্ষ হইতে আমি উভয়কে ধন্যবাদ ও আশীর্বাদ জানাইতেছি।
যাঁহারা স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া সম্পাদকদ্বয়কে বঙ্কিমের সাহিত্য-সৃষ্টি ও জীবনীর উপকরণ দিয়া সাহায্য করিতেছেন, তাঁহাদের সকলের নামোল্লেখ এখানে সম্ভব নয়। আমি এই সুযোগে সমবেতভাবে তাঁহাদিগকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি।
গ্রন্থ প্রকাশ সম্বন্ধে সংক্ষেপে এই মাত্র বক্তব্য যে, বঙ্কিমের জীবিতকালে প্রকাশিত যাবতীয় গ্রন্থের সর্বশেষ সংস্করণ হইতে পূর্ব পূর্ব সংস্করণের পাঠভেদ নির্দেশ করিয়া ও স্বতন্ত্র ভূমিকা দিয়া এই সংস্করণ প্রস্তুত হইতেছে। বঙ্কিমের যে সকল ইংরেজী-বাংলা রচনা আজিও গ্রন্থাকারে সংকলিত হয় নাই, অথবা এখন পর্যন্ত অপ্রকাশিত আছে, এবং বঙ্কিমের চিঠিপত্রাদি—এই সংস্করণে সন্নিবিষ্ট হইতেছে। সর্বশেষ খণ্ডে মল্লিখিত সাধারণ ভূমিকা, শ্রীযুক্ত যদুনাথ সরকার লিখিত ঐতিহাসিক উপন্যাসের ভূমিকা, শ্রীযুক্ত মোহিতলাল মজুমদার লিখিত বঙ্কিমের সাহিত্যপ্রতিভা বিষয়ক ভূমিকা, শ্রীযুক্ত ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সঙ্কলিত বঙ্কিমের রচনাপঞ্জী ও রাজকার্যের ইতিহাস এবং শ্রীযুক্ত সজনীকান্ত দাস সঙ্কলিত বঙ্কিমের সংক্ষিপ্ত জীবনী ও বঙ্কিম সম্পর্কে গ্রন্থ ও প্রবন্ধের তালিকা থাকিবে। শ্রীযুক্ত কালিদাস নাগ এই খণ্ডে বিভিন্ন ভাষায় বঙ্কিমের গ্রন্থাদির অনুবাদ সম্বন্ধে বিবৃতি দিবেন।
বিজ্ঞপ্তি এই পর্যন্ত। বঙ্কিমের স্মৃতি বাঙ্গালীর নিকট চিরোজ্জ্বল থাকুক।
|
১৩ই আষাঢ়, ১৩৪৫ |
শ্রীহীরেন্দ্রনাথ দত্ত |
ভূমিকা
১২৮০ সালের ‘বঙ্গদর্শনে’র জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় (পৃ. ৫৭-৬৪) ‘সাম্য’, আষাঢ় সংখ্যায় (পৃ. ১১৬-১২৩) ‘সাম্য—দ্বিতীয় সংখ্যা’ এবং ১২৮২ সালের কার্ত্তিক সংখ্যায় (পৃ. ৩০১-৩১৩) ‘সাম্য, তৃতীয় প্রস্তাব—স্ত্রীজাতি’ প্রকাশিত হয়। এই তিনটি প্রবন্ধের সহিত ১২৭৯ সালের ‘বঙ্গদর্শনে’ প্রকাশিত ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ শীর্ষক ধারাবাহিক প্রবন্ধের কিয়দংশ সন্নিবিষ্ট করিয়া ১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দে পুস্তকাকারে ‘সাম্য’ প্রকাশিত হয়। ‘বঙ্গদর্শনে’ প্রকাশিত ‘সাম্য’ সম্পর্কিত প্রবন্ধের তিনটি অংশ যথাক্রমে উক্ত গ্রন্থের ১ম, ২য় ও ৫ম পরিচ্ছেদরূপে স্থান পায়। প্রথম সংস্করণের পর ‘সাম্য’ পুনর্মুদ্রিত হয় নাই। এই প্রসঙ্গে শ্রীশচন্দ্র মজুমদার মহাশয় লিখিয়াছেন—
বঙ্কিম বাবু বলিলেন, ‘এক সময়ে মিলের আমার উপর বড় প্রভাব ছিল, এখন সে সব গিয়াছে।’ নিজের লিখিত প্রবন্ধের কথা উঠিলে বলিলেন, ‘সাম্য’টা সব ভুল, খুব বিক্রয় হয় বটে, কিন্তু আর ছাপাব না।—বঙ্কিম-প্রসঙ্গ, পৃ. ১৯৮।
১৮৯২ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত ‘বিবিধ প্রবন্ধ’ দ্বিতীয় ভাগে ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ শীর্ষক প্রবন্ধের ভূমিকায় বঙ্কিমচন্দ্র স্বয়ং লিখিয়াছেন—
এ প্রবন্ধ যখন প্রকাশিত হয়, তখন কিছু যশোলাভ করিয়াছিল এবং আমি বঙ্গদর্শনে ‘সাম্য’ নামে একটি প্রবন্ধ রচনা করিয়া পশ্চাৎ তাহা পুনর্মুদ্রিত করিয়াছিলাম। ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ আর পুনর্মুদ্রিত করিব না, বিবেচনায় তাহার কিয়দংশ ‘সাম্য’মধ্যে প্রক্ষিপ্ত করিয়াছিলাম। এক্ষণে সেই ‘সাম্য’ শীর্ষক পুস্তকখানি বিলুপ্ত কবিয়াছি। সুতরাং ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ পুনর্মুদ্রিত করার আর একটা কারণ হইয়াছে।
সাম্য
[ ১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দে মুদ্রিত প্রথম সংস্করণ হইতে]
বিজ্ঞাপন
এই প্রবন্ধের প্রথম, দ্বিতীয় ও পঞ্চম পরিচ্ছেদ বঙ্গদর্শনের সাম্যশীর্ষক প্রবন্ধ। তৃতীয় ও চতুর্থ পরিচ্ছেদ ঐ পত্রে প্রকাশিত “বঙ্গদেশের কৃষক” নামক প্রবন্ধ হইতে নীত। কৃষকের কথা যে আধুনিক সামাজিক বৈষম্যের উদাহরণস্বরূপ লিখিত হইয়াছে, এমত নহে। প্রাচীন বর্ণ-বৈষম্যের ফলস্বরূপ বণিত হইয়াছে। পাঠক যেন এই কথাটি স্মরণ রাখেন।
সাম্যনীতি নৃতন তত্ত্ব নহে, কিন্তু ইউরোপীয়েরা যে ভাবে ইহার বিচার করেন, আমি তাহা করি নাই। যে ভাবে আমি সাম্যনীতি যেমন মোটামুটি বুঝিয়াছি—সেইরূপ লিখিয়াছি। অতএব ইউরোপীয় নীতিশাস্ত্রের সহিত প্রভেদ দেখিলে, কেহ রাগ করিবেন না। আরও, স্বদেশীয় সাধারণজনগণকে এই তত্ত্বটি বুঝাইবার জন্য লিখিয়াছি। সুশিক্ষিত যদি ইহাতে কিছু পঠিতব্য না পান, আমি দুঃখিত হইব না। অশিক্ষিত পাঠকদিগের হৃদয়ে এই নীতি অঙ্কুরিত হইলে আমি চরিতার্থ হইব।
শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
পরিচ্ছেদ (মূল গ্রন্থে নেই)
সূচীপত্র
এই লেখাটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত কারণ এটির উৎসস্থল ভারত এবং ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে এর কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর ৬০ বছর পর (স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত) বা প্রথম প্রকাশের ৬০ বছর পর (বেনামে বা ছদ্মনামে এবং মরণোত্তর প্রকাশিত) পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে তাঁর সকল রচনার কপিরাইটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ ২০২৬ সালে, ১ জানুয়ারি ১৯৬৬ সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে।