বিষয়বস্তুতে চলুন

সীতারাম (১৯৩৯)/পাঠভেদ

উইকিসংকলন থেকে

পাঠভেদ

 ১২৯১ সালের শ্রাবণ মাস হইতে ১২৯৩ সালের মাঘ মাস পর্য্যন্ত ‘প্রচারে’ ধারাবাহিক ভাবে ‘সীতারাম’ প্রকাশিত হয়, মধ্যে কয়েক মাস বন্ধ ছিল। ১২৯৩ সালে ইহা প্রথম পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। ‘প্রচারে’ প্রকাশিত ‘সীতারামে’র সহিত ১ম সংস্করণ পুস্তকের পার্থক্য খুব বেশী নয়, কয়েকটি অনুচ্ছেদ পরিত্যক্ত হইয়াছে এবং কয়েকটি শব্দ পরিবর্ত্তিত হইয়াছে মাত্র। ‘সীতারামে’র দ্বিতীয় সংস্করণ ১৮৮৮ খ্রীষ্টাব্দে (১২৯৫ সালে) বাহির হয়, এই সংস্করণে বিশেষ পরিবর্ত্তন সাধিত হইয়াছিল, ১ম সংস্করণের বহু পরিচ্ছেদ ও বহু অনুচ্ছেদ বাদ দেওয়া হয়। ১৮৯৪ সালের মে মাসে সীতারামের তৃতীয় সংস্করণ বাহির হয়, বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যুর কয়েক দিন পরেই। বঙ্কিমচন্দ্রের জীবিতকালেই ইহা মুদ্রিত হইয়াছিল, সুতরাং এই সংস্করণের পাঠই মূল পাঠ হইয়াছে। ১ম সংস্করণের পুস্তকের পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ৪১৯, ৩য় সংস্করণে পৃষ্ঠাসংখ্যা হয় ৩২২। ১ম ও ৩য় সংস্করণের পাঠভেদ নিচে দেওয়া হইল।

 পৃষ্ঠা ৫, পংক্তি ৬, “তখন সেই ভূষণায়...বাস করিতেন।” এই কথাগুলির পরিবর্ত্তে ছিল—

তখন সেই ভূষণা অতিশয় সমৃদ্ধিশালিনী নগরী ছিল। একজন ফৌজদার সেখানে বাস করিতেন।

 পৃ. ৯, পংক্তি ১৪-১৭, “ভিখারির পক্ষে...চলিয়া গেল।” এই অংশের পরিবর্ত্তে ছিল—

শ্রী একটু মাথা তুলিয়া, একটু ঘোম্টা কম করিয়া লজ্জায় বড় জড়সড় হইয়া কোন রকমে কিছু বলিল। কিন্তু কথাগুলি এত অস্ফুট যে, ভাণ্ডারী তাহার কিছু শুনিতে পাইল না। ভাণ্ডারী তখন, পাঁচকড়ির মাকে জিজ্ঞাসা করিল, “কি বলে? কিছুই ত শুনিতে পাই না।” তখন পাঁচকড়ির মা কথা বুঝাইয়া দিল। সে বলিল, “উনি বলিতেছেন যে, আমি তোমার হাতে যা দিতেছি, তাহা তোমার মুনিবের হাতে দিও। তিনি যা বলেন আমাকে আসিয়া বলিও। আমি এইখানে আছি।”

 এই বলিয়া শ্রী কাঁকালের কাপড় হইতে একটা মোহর বাহির করিল। সেই মোহর পাঁচকড়ির মা ভাণ্ডারীর হাতে দিল। ভাণ্ডারী লইয়া প্রস্থান করিল। যাইতে যাইতে জীবন দরজার প্রদীপে সেই মোহরটি একবার দেখিল। দেখিল, একটা সোণার আকব্বরী মোহর। কিন্তু তাহাতে একটা ত্রিশূলের দাগ আছে। ভাণ্ডারী মহাশয় স্থির করিলেন, “এ বেটী ত ভিখারী নয়—এই ত আমার মুনিবকে ভিক্ষা দিতে আসিয়াছে। প্রভু আমার ধনবান, তাঁর মোহরে দরকার কি? এটা জীবন ভাণ্ডারীর পেটারার মধ্যে প্রবেশ করিলেই শোভা পায়। তবে কি না, যে ত্রিশূলের দাগ দেখিতেছি, এ ধরা পড়া বড় বিচিত্র নহে। ও সব মতিগতি আমার মত দুঃখী প্রাণীর ভাল না—যার ধন তার কাছে পৌঁছাইয়া দেওয়াই ভাল।” এইরূপ বিবেচনা করিয়া জীবন ভাণ্ডারী লোভ সম্বরণ পূর্ব্বক যেখানে প্রভু গদির উপর বসিয়া আলবোলায় সুগন্ধি তামাকু টানিতেছিলেন, সেইখানে মোহর পৌঁছাইয়া দিল। এবং সবিশেষ বৃত্তান্ত নিবেদিত হইল।

 জীবন ভাণ্ডারীর মুনিব অভি সুপুরুষ। ত্রিশ বৎসরের যুবা, অতি বলিষ্ঠ গঠন, রূপে কার্ত্তিকেয়। তিনি মোহরটি লইয়া দুই চারি বার আলোতে ধরিয়া ভাল করিয়া নিরীক্ষণ করিলেন। শেষে দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিলেন, “দুর্গে! এ কি এ!”

 ভাণ্ডারী বলিল, “কি বলিব?”

 প্রভু বলিলেন, “যে তোকে মোহর দিয়েছে, তাকে এইখানে ডেকে নিয়ে আয়। সঙ্গে কেহ আছে?”

 ভাণ্ডারী মহাশয় তরকারীর কথাটা একেবারে গোপন করিবার মানসে বলিলেন, “এক জন মেছুনি আছে।”

 প্রভু। সে যেন আসে না, তুইও পৌঁছাইয়া দিয়াই চলিয়া যাইবি।

 শুনিয়া ভাণ্ডারী বেগে প্রস্থান করিল। এবং অচিরাৎ শ্রীকে পৌঁছাইয়া দিয়া চলিয়া গেল।

 পৃ. ৯, পংক্তি ১৯-২২, “তুমি কে?...সীতারাম রায়।” এই অংশের পরিবর্ত্তে ছিল—

 আমি সীতারাম রায়—তুমি কে? তোমার মুখে ঘোম্টা—কথা কহিতেছ না, আমি চিনিব কি প্রকারে?

 পৃ. ৯, পংক্তি ২৪, “এত সুন্দরী!” কথা দুইটি ছিল না।

 পংক্তি ২৫-২৬, “শ্রী বলিল...লাগিল।” এই কথাগুলির পরিবর্ত্তে ছিল— গুনিয়া শ্রী কাঁদিয়া উঠিল।

 পৃ. ১১, পংক্তি ৩-৪, “একবার আবার...অন্য কথা।” এই কথাগুলি ছিল না।

 পংক্তি ৬, এই “তৃতীয়” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “চতুর্থ” পরিচ্ছেদ। এই পরিচ্ছেদের পূর্ব্বে প্রথম সংস্করণে আর একটি পরিচ্ছেদ ছিল। নিম্নে তাহা মুদ্রিত হইল।—

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

দণ্ড চারি ছয় পরে, সীতারাম দ্বার খুলিয়া, জীবন ভাণ্ডারীকে ডাকিয়া বলিলেন, “মৃণ্ময়কে ভাকিয়া আন” মৃণ্ময় সীতারামের স্বজাতি ও কুটুম্ব, এবং অতিশয় অনুগত ও বশম্বদ। তবে তাঁহার আকার এবং অগাধ বল ও সাহস বড় বিখ্যাত ছিল। মৃণ্ময়, তলব মত সীতারামের নিকট উপস্থিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কি জন্য ডাকিয়াছেন?”

 সীতারাম বলিলেন, “বড় জরুরি কাজ আছে। আমার পরিবারবর্গকে এখান হইতে লইয়া যাইতে হইবে।”

 মৃণ্ময়। কবে?

 সীতা। আজ রাত্রেই—এখনই।

 মৃ। কোথায় নিয়ে যাব?

 সীতারাম সে সকল বিষয়ে মৃণ্ময়কে উচিত উপদেশ প্রদান করিয়া অন্তঃপুরে গেলেন।

 অন্তঃপুরে প্রশস্ত চত্ত্বর মধ্যে বিস্তৃত প্রাঙ্গণ। চারি দিকে রোয়াক। কোথাও বঁটী পাতিয়া বিপুল স্থুল ঘোর কৃষ্ণাঙ্গী পরিচারিকা মংস্য জাতির প্রাণাবশিষ্ট সংহারে সমুদ্যত। কোথাও ঘটোরী গাভী কদলী—পত্রাদি বিমিশ্র উদ্ভিদ প্রভৃতি কবলে গ্রহণ পূর্ব্বক মীলিতলোচনে সুখে রোমন্থ করিতেছে; পারিসনগরী কবলিত করিয়া চতুর্থ ফ্রেডেরিক্ উইলিয়মের সে সুখ হইয়াছিল কি না জানি না, কেন না তিনি ত রোমন্থ করিতে পারেন নাই। কোথাও কৃষ্ণশ্বেতবর্ণবিমিশ্র মার্জ্জার মৎস্যাধারের কিঞ্চিদ্দুরে লাঙ্গুলাসনে অবস্থিত হইয়া মংস্যকর্ত্তনকর্ত্রীর কিঞ্চিন্মাত্র অনবধানতার প্রতীক্ষা করিতেছে। কোথাও নিঃশব্দ কুকুর অতি ধূর্ত্তভাবে কোন্ ঘরের দ্বার অবারিত তাহার অনুসন্ধানে নিযুক্ত। কোথাও বহু বালকগণ একমাত্র অল্পপাত্রকে বেষ্টন করিয়া বর্ষীয়সী কুটুম্বিনীর বহুবিধ প্ররোচনে উপশমিত ক্ষুধাতেও আহারে নিযুক্ত। কোথাও অন্য বালকবালিকাসম্প্রদায় কৃতাহার এবং কৃতকার্য্য হইয়া সাতুরে—পাটী পাতিয়া ঈষচ্চঞ্চলশীতলমন্দানিলস্নিগ্ধচন্দ্রালোকে শয়ন করিয়া অতি প্রাচীনার নিকট সহস্রবার শ্রুত উপন্যাস পুনঃশ্রবণ করিতেছে। কোথাও নবোঢ়া যুবতী এবং বালিকাগণ বাটনাবাটা কুটনাকোটা দুধজাল ইত্যাদি গৃহকার্য্য উপলক্ষ করিয়া পরস্পরের কাছে আপনাপন আশা ভরসা, সুখ সৌন্দর্য্য এবং সৌভাগ্যের কথা বলিতেছে। এমন সময়ে অকালোদিতজলদবৎ, উত্থান-বিহারকালে বৃষ্টিবৎ, দুঃখের চিন্তার কালে অপ্রার্থিত বন্ধুবৎ, নিদ্রাকালে বৈদ্যবৎ, শুরু ভোজনের পর নিমন্ত্রণবৎ এবং অর্থ-শেষ-কালে ভিক্ষুকবতৎ, সীতারাম আসিয়া সেখানে দর্শন দিলেন।

 “এত কি গোল কচ্চিস্ গো তোরা?” সীতারাম এই কথা বলিবামাত্র কৃষ্ণকায়াশালিনী মংস্য-বিধ্বংসিনীর মৎস্য–কর্ত্তনশব্দ সহসা নির্ব্বাপিত হইল। তাহাকে অনাবৃত শিরোদেশে কিঞ্চিন্মাত্র অবগুণ্ঠন সংস্থানের উদ্যোগিনী দেখিয়া, ছিদ্রান্বেষিণী মার্জ্জারী মংস্যমুণ্ড গ্রহণ পূর্ব্বক যথেপ্সিত স্থানে প্রস্থান করিল। গৃহস্বামীর কণ্ঠস্বর শুনিবামাত্র অন্যা পরিচারিকা সেই সুখনিমীলিতনেত্রা কদলীপত্র-ভোজিনী গাভীর প্রতি ধাবমানা হইয়া তাহার প্রতি নানাবিধ উপদ্রব আরম্ভ করিল। এবং তস্যা স্বামিনীকে চক্ষুরাদি-ভোজিনী ইত্যাদি নবরসাত্মক বাক্যে অভিহিত করিতে আরম্ভ করিল। উপন্যাস-দত্তমনা পাত্রাবশিষ্টভোজী শিশুগণ অকস্মাৎ উপন্যাসের রসভঙ্গ দেখিয়া আহার্য্যের প্রতি নানাবিধ দোষারোপ পূর্ব্বক অধৌত বদনে দশদিকে প্রস্থান আরম্ভ করিল। যাহারা আহার সমাপন পূর্ব্বক চন্দ্রকিরণ-শীতলশয্যায় শয়ন করিয়া উপন্যাস শ্রবণ করিতেছিল, তাহারা তাহার অকালে সমাপন দেখিয়া ঘোরতর অসূয়াসূচক সমালোচনার অবতারণা করিল। উদ্ভিদ্‌-কর্ত্তন-পরাযণা সুন্দরীগণ অস্পষ্টালোকে স্ব স্ব কার্য্য নির্ব্বাহ করিতেছিলেন, তথাপি অবগুণ্ঠন দীর্ঘীকৃত করিলেন। যে মেয়ের বাটনা বাটিতেছিল, তাহারা বড় গোলে পড়িল। এত ঠক্ ঠক্‌ করিয়া শব্দই বা করি কি করে? আর কাজ বন্ধ করিলেই বা কি মনে করিবেন? আর যাহারা দুগ্ধকটাহের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত ছিল, তাহারা আরও গোলে পড়িল। তাহারা হঠাৎ একটু অন্তমনস্ক হওয়ায় সব দুধটুকু উছলিয়া পড়িয়া গেল।

 সীতারাম বললেন, “তোমরা কেউ গঙ্গাস্নানে যাবে গা?” অমনি “বাবা আমি যাব,” “দাদা আমি যাব,” “জ্যাঠা আমি যাব,” “মামা আমি যাব,” ইত্যাদি শব্দ নানা দিক্‌ হইতে উখিত হইতে লাগিল। বৃদ্ধা, অর্দ্ধবয়স্কা, প্রৌঢ়া, যুবতী, কিশোরী, বালিকা, পোগণ্ড এবং অপোগণ্ড শিশু, সকলেই এক স্বরে বলিল, “আমি যাব।” অকর্ত্তিত মংস্য অরক্ষিত হইয়া কুকুর এবং বিড়ালের মনোহরণ করিতে লাগিল। যত্ন-প্রস্তুত এবং কর্ত্তিত অলাবু এবং বার্ত্তাকুরাশি রোমন্থশালিনী গাভী জিহ্বা প্রসারণ পূর্বক উদরসাৎ করিতে লাগিল, কেহ দেখিল না। কাহারও দুধ আঁকিয়া গেল, কেহ শিল নোড়া বাঁধিয়া পড়িয়া গেল। কাহারও ছেলে কাঁদিয়া বড় গণ্ডগোল বাধাইল, কিন্তু কিছুতেই কাহারও দৃক্পা‌ত নাই।

 সীতারাম বলিলেন, “তবে সকলেই চল। কিন্তু আর সময় নাই, আজ রাত্রে দিন ভাল, খাওয়া দাওয়ার পর সকলকেই যাত্রা করিতে হইবে। অতএব এই বেলা উদ্যোগ কর।”

 তৎপরে সীতারাম যথাকালে গৃহিণীর নিকট দেখা দিলেন। গৃহিণী বলিলে একটু দোষ পড়ে। কেন না, গৃহিণী শব্দ এক বচন। এদিকে গৃহিণী, দুইটি। তবে বাঙ্গালায় দ্বিবচন নাই; আর একবারেও দুই গৃহিণীর সাক্ষাৎ হইতে পারে না। এই জন্য বৈয়াকরণদিগের নিকট করযোড়ে মার্জ্জনা প্রার্থনা করিয়া আমরা গৃহিণী শব্দই প্রয়োগ করিলাম।

 গৃহিণী দুইটি বলিয়া লোকে নাম রাখিয়াছিল, সত্যভামা আর রুক্মিণী। সত্যভামা এবং রুক্মিণীর চরিত্রের সঙ্গে তাহাদের চরিত্রের যে কোন সাদশ্য ছিল, এমন আমরা অবগত নহি। তাহাদিগের প্রকৃত নাম নন্দা ও রমা। যাঁহার কাছে এখন সীতারাম আসিলেন, তিনি নন্দা। লোকে বলিত সত্যভামা।

 নন্দ অন্তরাল হইতে সব শুনিয়াছিল। সীতারামকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “হঠাৎ গঙ্গাস্নানের এত ঘটা কেন?” -

 সীতারাম বলিলেন, “গঙ্গে গঙ্গেতি যে ব্রৃঁয়াৎ—”

 নন্দা। তা জানি; তিনি মাথায় থাকুন। হঠাৎ তাঁর উপর এ ভক্তি কেন?

 সীতা। দেখ, তোমাদের ঐহিক সুখের জন্য আমার যেমন জবাবদিহি, তোমাদের পরকালের সুখের জন্যও আমার তেমনি জবাবদিহি। সামনে একটি যোগ আছে, তোমাদের গঙ্গাস্নানে পাঠাব না?

 নন্দয়া। তুমি যখন কাছে আছ, তখন আবার আমাদের গঙ্গাস্নান কি? তুমিই আমাদের সকল তীর্থ। তোমার পাদোদক খাইলেই আমার এক শ গঙ্গাস্নানের ফল হইবে। আমি যাব না।

 সীতা। (সত্যভামার নিকট হার মানিয়া) তা তুমি না যাও না যাবে, যারা যেতে চায়, তারা যাক্‌।  নন্দা। তা যাক্। সবাই যাক্, আমি একা থাকিব, একটু ভূতের ভয় করিবে, তা কি করিব? কিন্তু আসল কথা কি, বল দেখি?

 সীতা। আসল আর নকল কিছু আছে না কি?

 নন্দা। তুমি ত ভাজ পটল, বল উচ্ছে।

 সীতা। তবু ভাল, উচ্ছে ভেজে ত পটল বলি না?

 নন্দা। তা বল না, কিন্তু আমাদের কাছে দুই সমান; লুকোচুরিতেই প্রাণ যায়। ভিতরের কথা কি বলিবে?

 সীতা। বলিবার হইত ত বলিতাম।

 অমনি নন্দার মুখখানা মেঘঢাকা মেঘঢাকা আকাশের মত, জলভরা জলভরা ফোটা পদ্মটার মত, হাই দিলে আরসি যেমন হয়, সেই মত এক রকম কি হইয়া গেল। একটু ধরা ধরা ভরা ভরা আওয়াজে নন্দা বলিল, “তা নাই বলিলে, তা সন্ধ্যার পর তোমার কাছে কে এসেছিল, সেইটা বল?

 সীতা। তা ঢের লোক ত আমার কাছে আসে। সন্ধ্যার পর অনেক লোক এয়েছিল।

 নন্দা। মেয়েমানুষ কে এয়েছিল?

 সীতা। তাও ত ঢের আসে। খাজনা মিটাতে, ভিক্ষা মাঙ্গ্তে‌, দায়ে অদায়ে পড়িয়া ঢের মাগী ত আমার কাছে আসে। স্ত্রীলোক প্রায় সন্ধ্যার পরই আসে।

 নন্দা। আজ সন্ধ্যার পর কজন স্ত্রীলোক এয়েছিল?

 সীতা। মোটে এক জন।

 নন্দা। সে কে?

 সীতা। তার ভাই বাঁচে না।

 নন্দা। তা নয়—সে কে? নাম কি?

 সীতা। আর এক দিন বলিব।

 এইবার মেঘ বর্ষিল, দর্পণস্থ বাষ্পরাশি জলবিন্দুতে পরিণত হইল,—সত্যভামা কাঁদিল।

 তখন সীতারাম নন্দার চিবুক গ্রহণ পূর্ব্বক বড় মধুর আদর করিয়া সেখান হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন।

 যেখানে রমা ঠাকুরাণী দর্পণ লইয়া সরু সরু কালোকুচ্কু‌চে চুলের দড়িগুলি গুচাইতেছিলেন, সেইখানে গিয়া সীতারাম দর্শন দিলেন। রমা কনিষ্ঠা,—নন্দার অপেক্ষা একে বয়সে ছোট, আবার আকারেও ছোট, সুতরাং নন্দার অপেক্ষা অনেক ছোট দেখাইত। নন্দার যৌবন এবং রূপ উভয়ই পরিপূর্ণ, শ্রাবণের গঙ্গা,—রমার দুইই অপরিপূর্ণ, বসন্তনিকুঞ্জপ্রহ্লাদিনী ক্ষুদ্রা কল্লোলিনী। নন্দা তপ্তকাঞ্চনবৎ শ্যামাঙ্গ———রমা হিমানীপ্রতিফলিত কৌমুদীবতৎ গৌরাঙ্গী। সেইখানে গিয়া সীতারাম দর্শন দিলেন। বলিলেন, “রুক্মিণি! গঙ্গাস্নানের কথা শুনেছ?” রমা। ছি ছি, ও কি কথা! সীতা। কোন্‌টা ছি ছি? গঙ্গাস্নান ছি ছি? না রুক্মিণী ছি ছি?  রমা। তাঁরা হোলেন দেবতা, লক্ষ্মী,— আর সেই একটা কি নাম মনে আসে না—

 সীতা। শিশুপালের গল্পটা বটে? তা সে কথা রহিল। গঙ্গাস্নানের কথাটা কি? শুনেছ?

 রমা। শুনেছি বৈ কি।

 সীতা। যাবে?

 রমা। তাই ত চুলের দড়ি গোছাচ্চি।

 সীতা। কেন যাবে? এই ত আমি তোমার সর্ব্বতীর্থ কাছে আছি।

 রমা। যেতে না বল, যাব না।

 সীতা। তবে যাইবার উদ্যোগ করিতেছিলে কেন?

 রমা। যাইতে বলিতেছিলে বলিয়া।

 সীতা। আমি ত যাইতে বলি নাই—আমি কেবল সবাইকে জিজ্ঞাসা করিতেছিলাম যে, কেহ যাবে? তা তুমি যাবে কি?

 রমা। তুমি যাবে কি?

 সীতা। যাব।

 রমা। তবে আমিও যাব।

 সীতা। কিন্তু আজ আমি তোমাদের সঙ্গে যাব না। কাল পথে মিলিব।

 রমা। আজ আমাদের নিয়ে যাবে কে?

 সীতা। মৃণ্ময় নিয়ে যাবে।

 রমা। তা হোক্। একটা কথা বলিব?

 সীতা। কি?

 রমা। তোমার কি কাজ?

 সীতা। সব কথা কি বলা যায়?

 রমা। (সীতারামকে উভয় বাহুদ্বারা বেষ্টন করিয়া) বলিতে হইবে। তোমার বড় সাহস, আমার বড় ভয় করে, তুমি কোন দুঃসাহসের কাজ করিবে,—তাই আমাদের সরাইয়া দিতেছ।

 সীতারাম ক্রুদ্ধ হইয়া রমার খোঁপা ধরিয়া টানিল, মারিবার জন্য এক চড় উঠাইল, শেষে রমার নাক ধরিয়া নাড়িয়া দিল। বলিল, “আমি বড় দুঃসাহসের কাজ করিব সত্য, কিন্তু কোন ভয় নাই।”

 রমা। তোমার ভয় নাই—আমার আছে। তোমার ভয় আমার ভয় কি স্বতন্ত্র? শোন, আজ সবার গঙ্গাস্নান যাওয়া বন্ধ। তুমি আজ আমার এই ঘরের ভিতর কয়েদী।

 বলিতে বলিতে রমা দ্বার অর্গলবন্ধ করিয়া দ্বারে পিঠ দিয়া বসিল। বলিল, “যাইতে হয়, আমার গলায় পা দিয়া যাও। এখন বল দেখি, আজ তোমার কাছে কে আসিয়াছিল?”

 সীতা। তোমাদের কি অষ্ট প্রহর চর ফেরে নাকি?

 রমা। ভাণ্ডারী মহাশয় কিছু তরকারির প্রত্যাশায় বঞ্চিত হয়েছেন, তাই আমরা ও কথাটাও শুনিয়াছি। সে কে?

 সীতা। শ্রী।

 রমা। সে কি? শ্রী? কেন আসিয়াছিল?

 সীতা। তার একটি ভিক্ষা ছিল।

 রমা। ভিক্ষা পাইয়াছে কি?

 সীতা। তুমি কি ভিক্ষুককে ফিরাইয়া থাক?

 রমা। তবে ভিক্ষা সে পাইয়াছে। কি দিলে?

 সীতা। কিছু দিই নাই, দিব স্বীকার করিয়াছি।

 রমা। কি দিবে শুনিতে পাই না?

 সীতা। এখন না; দ্বার ছাড়।

 রমা। সকল কথা ভাঙ্গিয়া না বলিলে, আমি দ্বার ছাড়িব না।

 সীতা। তবে শুন, কাজি সাহেব শ্রীর ভাইকে জীয়ন্ত পুঁতিয়া ফেলিবার হুকুম দিয়াছেন। শ্রীর ভিক্ষা, আমি তাহার ভাইকে রক্ষা করি। আমি তাহা স্বীকার করিয়াছি।

 রমা। তাই, আমরা আজ গঙ্গাস্নানে যাইব! তুমি আমাদের পাঠাইয়া দিয়া, নির্ব্বিঘ্নে ফৌজদারের ফৌজের সঙ্গে লাঠালাঠি দাঙ্গা করিবে।

 সীতা। সে সকল কথায়, মেয়ে মানুষের কাজ কি?

 রমা। কাজ কি? কিছুই কাজ নাই। তবে কি না, আমি গঙ্গাস্নানে যাইব না।

 এই বলিয়া রমা, ভাল করিয়া দ্বার চাপিয়া বসিল। সীতারাম অনেক মিনতি করিতে লাগিল। রমা বলিল, “তবে আমারও কাছে একটা সত্য কর, দ্বার ছাড়িয়া দিতেছি।”

 সীতা। কি বল?

 রমা। তুমি বিনা বিবাদ বিসম্বাদে—দাঙ্গা লড়াই না করিয়া শ্রীর ভ্রাতার জন্য যাহা পার, কেবল তাহাই করিবে, ইহা স্বীকার কর।

 সীতা। তাতে আমি খুব সম্মত। দাঙ্গা লড়াই, আমার কাজও নয়, ইচ্ছাও নয়। কিন্তু যত্ন সফল হইবে কি না, সন্দেহ।

 রমা। হৌক্‌ না হৌক্‌—বিনা অস্ত্রে যা হয়, কেবল তাই করিবে, স্বীকার কর।

 কিছুক্ষণ ভাবিয়া সীতারাম বলিলেন, “স্বীকার করিলাম।”

 রমা প্রসন্নমনে, দ্বার ছাড়িয়া দিল। বলিল, “তবে আমরা গঙ্গাস্নানে যাইব না।”

 সীতারাম ভাবিলেন। বলিলেন, “যখন কথা মুখে আনা হইয়াছে, তখন যাওয়াই ভাল।”

 রমা বিষণ্ণ হইল, কিন্তু আর কিছু বলিল না। সীতারাম আর কাহাকে কিছু না বলিয়া বাড়ী হইতে বাহির হইয়া গেলেন। আর ফিরিলেন না।

 পৃ.১১, পংক্তি ১২-১৫, “আমরা আজিকার ... কিছু ক্ষণ পরে” এই অংশের পরিবর্ত্তে ছিল—

সীতারাম একখানি ভাল বাড়ী তাঁহাকে থাকিতে দিয়াছিলেন।

 পৃ.১১,পংক্তি ১৭-২০, “কথাবার্ত্তার ফল...পাঠাইয়া দিলেন।” এই অংশের পরিবর্ত্তে ছিল—

চন্দ্রচূড়ের কাছে লুকাইবার যোগ্য সীতারামের কোন কথাই ছিল না। শ্রীর কাছে আর রমার কাছে যে দুইটি প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, সীতারাম তাহা সবিস্তারে নিবেদিত হইলেন। বলিলেন, “এই উভয় সঙ্কটে কি প্রকারে মঙ্গল হইবে, আমি বুঝিতে পারিতেছি না। নারায়ণ মাত্র ভরসা। মারামারি কাটাকাটিতে আমার কিছুমাত্র প্রবৃত্তি নাই আমি সেই জন্যই মৃন্ময়কে সরাইয়াছি। কিছু স্তুতি মিনতিতেও কার্য্যসিদ্ধি হইবে, এমন ভরসা করি না। যাই হৌক, প্রাণপাত করিয়াও আমি এ কাজ উদ্ধার করিতে রাজি আছি। সিদ্ধি আপনার আশীর্ব্বাদ। যদি সিদ্ধি না হয়, তবে পাপশান্তির জন্য কাল প্রাতে তীর্থযাত্রা করিব। তাই আপনাকে প্রণাম করিতে আসিয়াছি।”

 চন্দ্রচূড়। আমি সর্ব্বদাই আশীর্ব্বাদ করিয়া থাকি, এখনও করিতেছি, মঙ্গল হইবে। সম্প্রতি এই রাত্রেই কি তুমি কাজির নিকট যাইবে?

 সীতা। না। কাল উপযুক্ত সময়ে কাজির নিকট উপস্থিত হইব।

 চন্দ্রচূড় তর্কালঙ্কার, সহজ লোক নহেন। তিনি মনে মনে ভাবিতেছিলেন, “বাবাজি একটু গোলে পড়িয়াছেন, দেখিতেছি। যুদ্ধ বিগ্রহে যে ইচ্ছা নাই, সে কথাটা মনকে চোক্‌-ঠারাই বোধ হইতেছে। সেই রুক্মিণী বেটীই যত নষ্টের গোড়া। তা বেটী মনে করে কি, রুক্মিণী আছে, নারদ নাই! জাত নেড়ে, বাপু বাছার কি কাজ! নারায়ণ কি নেড়ের দমন করিবেন না? কত কাল আর হিন্দু এ অত্যাচার সহ্য করিবে? একবার দেখি না, সীতারামের বাহুতে বল কত? বৃথাই কি নারায়ণকে তুলসী দিই?”

 এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে তর্কালঙ্কার বলিলেন, “তুমি তীর্থযাত্রা করিবে, এবং পরিবারবর্গকে গঙ্গাস্নানে পাঠাইবে শুনিয়া, আমি বড় বিপন্ন হইলাম।”

 সীতা। কি? আজ্ঞা করুন।

 চন্দ্র। আমি তোমাদের মঙ্গলার্থ কোন যজ্ঞের সঙ্কল্প করিয়াছি। তাহাতে এক সহস্র রৌপ্যের প্রয়োজন। তাই বা আমায় দিবে কে? উদ্যোগই বা করিয়া দেয় কে?

 সীতা। টাকা এখনই আনাইয়া দিতেছি। আর উদ্যোগের জন্য কাহাকে চাই?

 চন্দ্র। যজ্ঞের যে সকল আয়োজন করিতে হইবে, জীবন ভাণ্ডারী তাহাতে বড় সুপটু। জীবন ভাণ্ডারীকেও আনাইয়া দাও। আমার এই তল্পিদার ভৃত্য রামসেবক বড় গুণবান্ আর বিশ্বাসী। তার হস্তে খাজাঞ্চিকে পত্র পাঠাইয়া দাও, টাকা ও জীবন ভাণ্ডারীকে আনিবে।

 সীতারাম তখন একটু কলাপাতে বাঁকারির কলমে খাজাঞ্চির উপর এক হাজার টাকা ও জীবন ভাণ্ডারীর জন্য চিঠি পাঠাইলেন। রামসেবক তাহা লইয়া গেল। চন্দ্রচূড় তর্কালঙ্কার তখন সীতারামকে বলিলেন, “এক্ষণে তুমি গমন কর। আমি আশীর্ব্বাদ করিতেছি, মঙ্গল হইবে।”

 তখন সীতারাম গুরুদেবকে প্রণাম করিয়া প্রস্থান করিলেন। এদিকে অনতিবিলম্বে জীবন ভাণ্ডারী সহস্র রৌপ্য লইয়া আসিয়া তর্কালঙ্কার মহাশয়কে প্রদান করিল। তর্কালঙ্কার বলিলেন, “কেমন জীবন! এ সহরে তোমার মুনিবের যে যে প্রজা, যে যে খাতক আছে, সকলের বাড়ী চেন ত?”

 জীবন। আজ্ঞা হাঁ, সব চিনি।

 চন্দ্র। আজ রাত্রে সব আমায় দেখাইয়া দিতে পারিবে ত?

 জীবন। আজ্ঞা হাঁ, চলুন না। কিন্তু আপনি এত রাত্রে সে সব চাঁড়াল বাগ্দীর বাড়ী গিয়া কি করিবেন?

 চন্দ্র। বেটা, তোর সে কথায় কাজ কি? তোর মুনিব আমার কথায় কথা কয় না,—তুই বকিস! আমি যা বলিব, তাই করিবি, কথা কহিবি না।

 জীবন। যে আজ্ঞা, চলুন। এ টাকা কোথায় রাখিব?

 চন্দ্র। টাকা সঙ্গে নিয়ে চল্। আমি যা করিব, তা যদি কাহারও সাক্ষাতে প্রকাশ করিস্, তবে তোর শূল-বেদনা ধরিবে—আর তুই শিয়ালের কামড়ে মরিবি।

 এখন জীবন ভাণ্ডারী শূল-বেদনা এবং শৃগাল এ উভয়কেই বড় ভয় করিত—সুতরাং সে ব্রহ্মশাপ ভয়ে আর দ্বিরুক্তি করিল না। চন্দ্রচূড় তর্কালঙ্কার তখন পূজার ঘর হইতে এক আঁজলা প্রসাদী ফুল নামাবলীতে লইয়া জীবন ভাণ্ডারী ও সহস্র রৌপ্য সহায় হইয়া বাহির হইলেন। কিয়দ্দুর গিয়া জীবন ভাণ্ডারী একটা বাড়ী দেখাইয়া দিয়া বলিল, “এই এক জন।”

 চন্দ্র। এর নাম কি?

 জীবন। এর নাম যুধিষ্ঠির মণ্ডল।

 চন্দ্র। ডাক তাকে।

 তখন জীবন ভাণ্ডারী “মণ্ডলের পো! মণ্ডলের পো!” বলিয়া যুধিষ্ঠিরকে ডাকিল। যুধিষ্ঠির বলিল, “কে গা?”

 চন্দ্রচূড় বলিলেন, “কাল গঙ্গারাম দাসের জীয়ন্তে কবর হইবে শুনিয়াছ?”

 যুধিষ্ঠির। শুনিয়াছি।

 চন্দ্র। দেখিতে যাইবে?

 যুধিষ্ঠির। নেড়ের দৌরাত্ম্য, কি হবে ঠাকুর, দেখে?

 চন্দ্র। দেখিতে যাইও। লক্ষ্মীনারায়ণজীউর হুকুম। এই হুকুম নাও।

 এই বলিয়া তর্কালঙ্কার ঠাকুর একটি প্রসাদী ফুল নামাবলী হইতে লইয়া যুধিষ্ঠিরের হাতে দিলেন। যুধিষ্ঠির তাহা মাথায় ঠেকাইয়া বলিল, “যে আজ্ঞে। যাইব।”

 চন্দ্র। তোমার হাতিয়ার আছে?

 যুধি। আজ্ঞে, এক রকম আছে। মুনিবের কাজে মধ্যে মধ্যে ঢাল শড়কী ধরিতে হয়।

 চন্দ্র। লইয়া যাইও। লক্ষ্মীনারায়ণজীউর হুকুম। এই হুকুম লও।

 এই বলিয়া চন্দ্রচূড় তর্কালঙ্কার জীবন ভাণ্ডারীর থলিয়া হইতে একটি টাকা লইয়া যুধিষ্ঠিরকে দিলেন।

 যুধিষ্ঠির টাকা লইয়া— মাথায় ঠেকাইয়া বলিল, “যে আজ্ঞে, অবশ্য লইয়া যাইব। কিন্তু একটা কথা বলিতেছিলাম কি―একা যাব?”

 চন্দ্র। কাকে নিয়ে যেতে চাও?

 যুধি। এই পেসাদ মণ্ডল জোয়ানটাও খুব, খেলোয়াড়ও ভাল—সে গেলে হইত।

 তখন চন্দ্রচূড় আরও কতকগুলি প্রসাদী ফুল ও টাকা যুধিষ্ঠিরের হাতে দিলেন। বলিলেন, “যত লোক পার, লইয়া যাইও।”

 এই বলিয়া চন্দ্রচূড় ঠাকুর সেখান হইতে জীবন ভাণ্ডারীর সঙ্গে গৃহান্তরে গমন করিলেন। সেখানেও ঐরূপ টাকা ও ফুল বিতরণ করিলেন। এইরূপে সহস্র মুদ্রা বিতরণ করিয়া রাত্রিশেষে গৃহে ফিরিয়া আসিলেন। শ্রীতে রমাতে সে রাত্রে এমনই আগুন জ্বালাইয়া তুলিয়াছিল।

 পৃ. ১১, পংক্তি ২১, এই “চতুর্থ” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “পঞ্চম” পরিচ্ছেদ।

 পৃ. ১৩, পংক্তি ৫, এই পংক্তির শেষে ছিল—

তিনি অতি প্রত্যূষে উঠিয়া যে পথে শ্রীকে নগর হইতে প্রান্তরে আসিতে হইবে, সেই পথে দাঁড়াইয়া ছিলেন। শ্রীকে দেখিয়া উপযাচক হইয়া তাহার সহায় হইয়াছিলেন। শ্রী তাঁহাকে চিনিত, তিনিও শ্রীকে চিনিতেন। সে পরিচয়ের কারণ পরে জানা যাইতে পারে।

 পৃ. ২০, পংক্তি ১৭, এই “পঞ্চম” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “ষষ্ঠ” পরিচ্ছেদ।

 পৃ. ২১, পংক্তি ১৬-১৭, “করিলেন। গঙ্গারাম সীতারামের” এই কথা কয়টির পরিবর্ত্তে ছিল—

করিয়া বলিলেন, “আমি এখন ফৌজদারের কাছে যাইব— তুমি আমার সঙ্গে যাইবে?”

 গঙ্গারাম সীতারামের কথা শুনিয়া না হউক,

 পৃ. ২১, পংক্তি ১৯, “চন্দ্রচূড়...শ্রী এদিকে” এই পংক্তিটির পরিবর্ত্তে ছিল—

 এদিকে চন্দ্রচূড় ঠাকুর মূর্ছিতা শ্রীকে “ঝাড় ফুঁক” করিতেছিলেন। যদি সভ্য ভাষায় বলিতে হয়, বল, মেস্মেরাইস্ করিতেছিলেন। পরে শ্রী, যে কারণেই হউক,

 পৃ. ২১, পংক্তি ২১, এই পংক্তির শেষে ছিল— তার পর কাহাকে কিছু না বলিয়া ধীরে ধীরে নগরাভিমুখে চলিয়া গেল।

 সে কিছু দূর গেলে সীতারাম চন্দ্রচূড়কে বলিলেন, “আপনি ওঁর পিছু পিছু যান। ওঁর যাহাতে রক্ষা হয়, সে ব্যবস্থা করিবেন। আপনাকে বেশী বলিতে হইবে না।”

 চন্দ্র। আর তুমি এখন কি করিবে?

 সীতা। তাহা স্থির করি নাই। আপনি শ্যামপুরে গমন করুন। যদি জীবিত থাকি, সেইখানে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হইবে।

 শুনিয়া চন্দ্রচূড়, বিষণ্নমনে বিদায় গ্রহণ করিয়া, শ্রীর পশ্চাদ্বর্ত্তী হইলেন। গুরু শিষ্য, পরস্পরকে ভাল চিনিতেন। সুতরাং চন্দ্রচূড় কোন কথা কহিতে পারিলেন না।

 সকলেই চলিয়া গেল। মাঠে আর কেহ নাই। কেবল একা সীতারাম—সেই বৃক্ষমূলে, যে ডালের উপর চণ্ডীমূর্ত্তি শ্রী দাঁড়াইয়া রণজয় করিয়াছিল, সেই ডাল ধরিয়া ভূতলে দাঁড়াইয়া সীতারাম একা। আমাদের সকলেরই কখনও কখনও এমন সময় উপস্থিত হয়, যখন এক মুহূর্ত্তের দ্বারা সমস্ত জীবন শাসিত হয়। সীতারামের তাই হইল। ভাবিতেছিলেন, এ কাণ্ড কি? কেন হইল? কে করিল? ভাল হইয়াছে কি? ইহার কারণ কি? উপায় কি? কিসের লক্ষণ?

 যে দিকে সীতারাম মনশ্চক্ষু ফিরান, সেই দিকে দেখিতে পান, মুসলমানের অত্যাচার!

 সুরাসুর মনে পড়িল। বৃত্র, সম্বর, ত্রিপুর, সুন্দ, উপসুন্দ, বলি, প্রহলাদ, বিরোচন— কে মারিল? কেন মরিল? কেনই বা হইল? কেনই মরিল?

 তাহার পর রাক্ষস—মানুষ, ইহাদের কথা মনে পড়িল। রাবণ, কুম্ভকর্ণ, ইন্দ্রজিৎ, অলম্বুষ, হিড়িম্ব, বক, ঘটোৎকচ, দন্তবক্র, শিশুপাল, একলব্য, দুর্য্যোধন, কংস, জরাসন্ধ, কে মারিল? কেন মরিল? নহুস কেন অজগর হইল?

 শেষ মনে মনে স্থির হইল, সেই দুর্দ্দমনীয় মানসিক স্রোতের প্রক্ষিপ্ত সার এই পাইলেন -দেব। দেব—অর্থে ধর্ম্ম।

 তখন একটা প্রকাণ্ড কাণ্ড সীতারামের মনের ভিতর উপস্থিত হইল। যেমন আলোক দেখিতে দেখিতে চোখ বুজিলে, তবু অন্ধকারের ভিতর একটু রাঙ্গা রাঙ্গা ছায়া দেখা যায়, প্রথমে মনে হয়, ভ্রম মাত্র, তার পর বুঝা যায় যে, ভ্রম নয়, সত্য আলোকের ছায়া—সীতারাম সেই রকম একটু রাঙ্গা ছায়া দেখিলেন মাত্র। তার পর, যেমন, বনস্থ ভূপতিত পত্ররাশি মধ্যে প্রথম যেন একটু খদ্যোতোন্মেষবং অগ্নি দেখা যায়, বড় ক্ষীণ বটে, কিন্তু তবু আলো, তেমনি আলো বলিয়া, সীতারামের বোধ হইল। হায়! হৃদয়ের ভিতর আলো কি মধুর! কি স্বর্গ! অথবা স্বর্গ ইহার কাছে কোন্ ছার! যে একবার, আপনার হৃদয়ে আলো দেখিয়াছে, সে আর ভুলে না! জগতের সার সুখ প্রতিভা। প্রতিভাই ঈশ্বরকে দেখায়।

 জোনাকির মত তেমনি একটা আলোক, সীতারাম, আপনার হৃদয়মধ্যে দেখিলেন। যেমন বনতলস্থ শুষ্ক পত্ররাশি মধ্যে সেই খদ্যোতবং ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ, ক্রমে একটু একটু করিয়া বাড়ে, ক্রমে একটু একটু করিয়া জ্বলে, সীতারামও আপনার হৃদয়ে তাই দেখিলেন। দেখিলেন, ক্রমে অনেক শুষ্ক পত্র ধরিয়া গেল, ক্রমে সেই অন্ধকার বন আলো হইতে লাগিল। ক্রমে সে শ্যামল পল্লবরাশি শ্যামলতা হারাইয়া উজ্জ্বল হরিৎ প্রভা প্রতিহত করিতে লাগিল,—ফুলে, ফলে, পাতায়, লতায়, কাণ্ডে, দণ্ডে, উজ্জ্বল জ্বালা কাঁপিতে লাগিল। ক্রমে সব আলো—শেষ ঘোর দাবানল, সব অগ্নিময়, শত সূর্য্য-প্রকাশ! তখন সীতারাম বুঝিলেন, হৃদয়ের সে আলোটা কি? বুঝিলেন, হৃদয়ে সহসা যে প্রভাকর উদিত হইয়াছে, তাহার নাম—

ধর্ম্ম-রাজ্য-স্থাপন!

 বুঝিলেন, এই সূর্য্যে সকল অন্ধকার মোচন করিবে।

 সীতারাম বুঝিবামাত্র ক্ষিপ্তবৎ হইলেন। প্রতিভা কে হৃদয়ে ধারণ করিয়া, ধৈর্য্য রক্ষা করে! প্রথম উচ্ছ্বাসে তিনি বাহ্বাস্ফোটন করিয়া, বলিলেন, “এই বাহু! ইহাতে কি বল নাই? কে এমন তরবারি ধরিতে পারে? কাহার বন্দুকের এমন লক্ষ্য! কাহার মুষ্টিতে এত জোর!এ রসনায় কি বাগ্দেবীর প্রসাদ নাই? কে লোকের এমন মন হরণ করিতে পারে! আমি কি কৌশল জানি না—”

 সহসা যেন সীতারামের মাথায় বজ্রাঘাত হইল। হৃদয়ের আলো একেবারে নিবিয়া গেল! “এ কি বলিতেছি! আমি কি পাগল হইয়াছি! আমি কি করিতেছি! আমি কে! আমি কি! আমি ত একটি ক্ষূদ্র পিপীলিকা—সমুদ্র-তীরের একটি বালি! আমার এত দর্প! এই বুদ্ধিতে সাম্রাজ্যের কথা আমার মনে আসে! ধিক্ মনুষ্যের বুদ্ধিতে!”

 তখন সীতারাম কায়মনোবাক্যে জগদীশ্বরে চিত্ত সমর্পণ করিলেন। অনন্ত, অব্যয়, নিখিল জগতের মূলীভূত, সর্ব্বজীবের প্রাণস্বরূপ, সর্ব্বকার্য্যের প্রবর্ত্তক, সর্ব্বকর্ম্মের ফলদাতা, সর্ব্বাদৃষ্টের নিয়ন্তা, তাঁহার শুদ্ধি, জ্যোতি, অনন্ত প্রকৃতি ধ্যান করিতে লাগিলেন। তখন বুঝিলেন, “তিনিই বল! তিনিই বাহুবল! তিনিই ধর্ম্ম! ধর্ম্মচ্যুত যে বাহু-বল, তাহা পরিণামে দুর্ব্বলতা।” সীতারাম তখন বুঝিলেন,

ধর্ম্মই ধর্ম্ম-সাম্রাজ্য সংস্থাপনের উপায়।

 সীতারামের হৃদয়, অতিশয় স্নিগ্ধ, সন্তুষ্ট ও শীতল হইল।

 তখন প্রান্তর পানে চাহিয়া সীতারাম দেখিলেন, মাঠ অশ্বারোহী মুসলমান-সেনায় ভরিয়া গিয়াছে।

 পৃ. ২১, পংক্তি ২২, এই “ষষ্ঠ” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “দশম” পরিচ্ছেদ। এই পরিচ্ছেদের পূর্ব্বে প্রথম সংস্করণে আরও তিনটি পরিচ্ছেদ ছিল। নিম্নে সেগুলি মুদ্রিত হইল।—

সপ্তম পরিচ্ছেদ

 মুসলমান সেনা নির্গমের পূর্ব্বেই ফৌজদারের হুজুরে সম্বাদ পৌঁছিল যে, বিদ্রোহীরা পলাইয়াছে। অতএব এক্ষণে যুদ্ধার্থে সেনা নির্গত না হইয়া কেবল বিদ্রোহীর ধৃতার্থ অশ্বারোহী সেনাগণ নির্গত হইয়াছিল। বহুসংখ্যক সেনা প্রান্তর মধ্যে উপস্থিত হইয়া, কাহাকেও না দেখিয়া, কেহ গ্রামাভিমূখে, কেহ নগরাভিমুখে ধাবমান হইতেছিল। তাহারই এক জন সীতারামের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইল। বলিল, “তোম্ কোন্?”

 সীতা। মনুষ্য।

 সিপাহী। সো তো দেখ্‌তে হেঁ। নাম কিয়া তোমার?

 সীতা। কি কাজ বাপু তোমার নামে?

 সিপাহী। তোম্ বদমাস্।

 সীতা। হবে।

 সিপাহী। খানাবদোষ।

 সী। সম্ভব।

 সি। ডাকু হো?

 সী। বোধ হয় কি?

 সি। চোট্টা হৌগে।

 সী। দিল্লীর বাদশাহের চেয়ে?

 সি। কিয়া বোলো?

 সী। বলি তুমি আমায় দিক্ করিতেছ কেন?

 সি। তোম্‌কো গিরেফ্‌তার কোরেঙ্গে?

 সী। আপত্তি কি?

 সি। চল্।

 সী। কোথায়?

 সি। ফাটক্‌মে।

 সী। চল। কিন্তু তুমি ত ঘোড়ায়। আমি হাঁটিয়া তোমার সঙ্গে যাইব কি প্রকারে?

 সি। কদম কদম আও।

 সিপাহী সাহেব কদম কদম চলিলেন। সীতারাম সঙ্গে সঙ্গে চলিলেন। সিপাহী এক জন পাইকের সাক্ষাৎ পাইয়া তাহাকে হুকুম দিলেন যে, “এই ব্যক্তি চোর, ইহাকে ফাটকের জমাদ্দারের কাছে পঁহুছাইয়া দিবে।”

অষ্টম পরিচ্ছেদ

 চন্দ্রচূড় তর্কালঙ্কার শ্রীকে লইয়া নির্বিঘ্নে নগর মধ্যে প্রবেশ করিলেন। প্রবেশ করিয়া তাহাকে লইয়া এক নিভৃত ক্ষুদ্র বাটিকা মধ্যে গমন করিলেন, বলিলেন, “আইস বাছা! এখানে বড় জাগ্রত কালী আছেন, প্রণাম করিয়া যাই। তিনি মঙ্গল করিবেন।”

 গৃহমধ্যে প্রবেশ করিয়া শ্রী দেখিলেন, গৃহ বড় নিভৃত, তাহার এক ঘরে এক কালী মুর্ত্তি, ফুল বিল্বপত্রে অর্দ্ধেক ঢাকা পড়িয়া আছেন। গৃহে কেহ নাই, কেবল এক অশীতিপর বৃদ্ধা ব্রাহ্মণী। তিনিই দেবীর অধিকারিণী। চন্দ্রচূড়কে দেখিয়া বৃদ্ধা বলিল, “তর্ক বাবা যে গো?”

 চন্দ্র। কেমন মা? মার পূজা চলিতেছে কেমন?

 অশীতিপর বৃদ্ধার শ্রবণেন্দ্রিয় বড় তীক্ষ্ণ নহে। সে শুনিল, “তোমার বোন্পো‌ আছে কেমন?” উত্তরে বলিল, “আজও জ্বর সারে নাই, তার উপর পেটের ব্যামো, মা কালী রক্ষা করিলে হয়।” চন্দ্রচূড় এইরূপ দুই চারিটা কথাবার্ত্তা বৃদ্ধার সঙ্গে কহিবাতে শ্রী বুঝিল—বুড়ী ঘোর কালা। চন্দ্রচূড় তখন শ্রীকে বলিলেন, “এই বৃদ্ধা ব্রাহ্মণীর ঘরে তুমি আজ কাল থাক। তার পর গঙ্গারাম সুস্থির হইলে, আমি তোমাকে তাহার কাছে লইয়া যাইব। তোমার নিজ বাড়ীতে এখন একা থাকিবে কি প্রকারে? বিশেষ মুসলমানের ভয়।”

 শ্রী। ঠাকুর! মুসলমানের এ দৌরাত্ম্য কত কাল আর থাকিবে? শাস্ত্রে কি কিছু নাই?

 চন্দ্র। কিছু না, মা। এ শাস্ত্রের কথা নয় মা। হিন্দুর গায়ে বল হইলেই হইল।

 শ্রী। ঠাকুর! হিন্দুর গায়ে বলের কি অভাব? এই ত এখনই দেখিলেন?

 বলিতে বলিতে শ্রী, দৃপ্তা সিংহীর মত ফুলিয়া উঠিল।

 চন্দ্র। যা দেখিলাম মা, সে তোমারই বল—এমন কি আবার হইবে?

 দৃপ্তা সিংহী লজ্জায় মুখ অবনত করিল। আবার মুখ তুলিয়া বলিল, “হিন্দুর গায়ে বলের এত অভাব কেন? কত লোকের বলের গল্প শুনি।”

 তীক্ষ্ণবুদ্ধি চন্দ্রচূড় শ্রীর অলক্ষ্যে, শ্রীর আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিলেন, মনে মনে বলিলেন, “বেশ বাছা, বেশ! আমার মনের মত মেয়ে তুমি। আমিও সেই কথাটা ভাবিতেছিলাম।” প্রকাশ্যে বলিলেন, “হিন্দুর মধ্যে বলবান্ কি নাই? আছে বৈ কি। কিন্তু তাহারা মুসলমানের মুখ চায়। এই দেখ সীতারাম—সীতারাম না পারে কি? কিন্তু সীতারাম রাজভক্ত—বাদশাহের অনুগৃহীত—অকারণে রাজদ্রোহী হইবে না। কাজেই কে ধর্ম্ম রক্ষা করে?”

 শ্রী। কারণ কি নাই?

 জিজ্ঞাসা করিয়া শ্রী আবার লজ্জায় মুখ নামাইল। বলিল, “আমি অবলা —আপনাকে কেন এত জিজ্ঞাসা করিতেছি, জানি না,— আমার মার শোকে ভাইয়ের দুঃখে মন কেমন হইয়া গিয়াছে—তাই আমার জ্ঞান বুদ্ধি নাই।”

 চন্দ্রচূড় সে কৈফিয়ৎটা কানেও না তুলিয়া, বলিলেন, “কারণ ত ঘটে নাই। ঘটিলে কি হইবে বলিতে পারি না। সীতারাম যত দিন মুসলমানের দ্বারা অত্যাচার প্রাপ্ত না হয়েন, বোধ হয় তত দিন তিনি রাজদ্রোহ-পাপে সম্মত হইবেন না।”

 শ্রী অনেকক্ষণ নীরবে ভাবিতে লাগিল। চাতক পক্ষী যেমন মেঘের প্রতি চাহিয়া থাকে, ততক্ষণ চন্দ্রচূড় তাহার মুখ প্রতি সেইরূপ করিয়া চাহিয়া রহিলেন। শ্রী বহুক্ষণ অন্যমনা হইয়া ভাবিতেছে, সংজ্ঞালক্ষণ নাই দেখিয়া, শেষে চন্দ্রচূড় জিজ্ঞাসা করিলেন, “মা! তবে তুমি এক্ষণে এখানে বাস কর, আমি এখন যাই।”

 শ্রী কোন উত্তর করিল না—কথা তাহার কানে গিয়াছে, এমনও বোধ হইল না। চন্দ্রচূড় অপেক্ষা করিতে লাগিলেন—প্রতিভা কখন ফুটে, কখন নিবে, কখন স্থির, কখন আন্দোলিত, চন্দ্রচূড় তাহাকে চিনিতেন, অতএব ফলাকাঙ্ক্ষায় নীরবে শ্রীর মুখপ্রতি চাহিয়া রহিলেন। শেষ দেখিলেন, শ্রী সুস্থিরা, প্রফুল্লমুখী, ভাস্বর কটাক্ষবিশিষ্টা হইল। তখন বুঝিলেন, এবার মেঘ বারিবর্ষণ করিবে—চাতকের তৃষা ভাঙ্গিবে।

 শ্রী অল্প ঘোমটা টানিয়া—অল্প সলজ্জ হাসি হাসিয়া বলিল, “ঠাকুর! এখন কি একবার সে মাঠে যাওয়া যায় না?”

 চন্দ্র। কেন? সেখানে এখন বিশেষ ভয়—চারি দিকে ফৌজ বেড়াইতেছে।

 শ্রী। আমি সেখানে একটা কোন বিশেষ সামগ্রী হারাইয়া আসিয়াছি— আমার না গেলেই নয়। আপনি না হয় এইখানে থাকুন, আমি একা যাইতেছি। কিন্তু আপনি আসিলে ভাল হইত।

 চন্দ্র। যে সাহস তোমার আছে, সে সাহস কি আমার নাই? চল, তোমার সঙ্গে যাইব।

 তখন, শ্রী আগে আগে, চন্দ্রচূড় পিছে পিছে সেই মাঠে চলিলেন। সেখানে অনেক অশ্বারোহী পদাতিক বিদ্রোহীর অনুসন্ধানে ফিরিতেছিল—এক জন আসিয়া চন্দ্রচূড়কে ধরিল। জিজ্ঞাসা করিল, “তোম্‌ কোন্ হো?”

 চন্দ্র। এই ত দেখিতেছ—ভট্টাচার্য ব্রাহ্মণ। যজমানের বাড়ী পার্ব্বণের শ্রাদ্ধ-তাই গ্রামান্তরে যাইতেছি। কি করিতে হইবে বল—করি।

 সিপাহী। আচ্ছা, তোম্ যাও—তোম্‌কো ছোড়, দেতেহেঁ। যেহি আবরৎ[] তোমারা কোন্ লগ্‌তী?

 চন্দ্র। না বাপু—ও আমার কেহ হয় না।

 এই বলিয়া চন্দ্রচূড় শ্রীর নিকট হইতে সরিয়া দাঁড়াইলেন, জানেন, এখন শ্রীর বুদ্ধিতে চলিতে হইবে।

 তখন সিপাহী শ্রীকে জিজ্ঞাসা করিল, “তোম্ কোন্ হো? বোল্‌কে ঘর যাও। হম্‌লোগোঁকো হুকুম নেহি হৈ কে আবরৎকে পকড়েঁ। স্রেফ্‌ এক বেওয়াকো হম্‌লোগ্ ঢুণ্ড্‌তে হেঁ।”

 শ্রী। যে ঐ গাছের উপর দাঁড়াইয়া তোমাদের দুর্দ্দশা করিয়াছিল?

 সিপাহী। হাঁ—হাঁ—চন্দী বস্‌কী নাম হৈ।

 শ্রী। চণ্ডী নাম নয়। চণ্ডী নাম হউক—আর যাই নাম হউক—আমিই সেই হতভাগিনী।

 সিপাহী। (শিহরিয়া) কিয়া!!!

 শ্রী। আমিই সেই হতভাগিনী।

 সি। তোবা!! বেসা মৎ বোলো মায়ি! তোম্ ঘর্ যাও।

 শ্রী। তোমার কল্যাণ হউক-আমি ঘরে চলিলাম।

 এমন সময়ে, আর এক জন সিপাহী সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইল। বলিল, “আরে আবরৎকো পকড়্‌তে হো কাহে?”

 প্রথম সিপাহী দেখিল বিপদ্। যদি দ্বিতীয় সিপাহীর সঙ্গে স্ত্রীলোকটার কথাবার্ত্তা হয়, আর স্ত্রীলোকও যদি স্বীকার করে, তবে সিপাহী বিপন্ন হইবার সম্ভাবনা— প্রধান বিদ্রোহিণীকে ছাড়িয়া দেওয়ার অভিযোগ তাহার নামে হওয়া বিচিত্র নহে। অতএব সেই দয়ার্দ্র সিপাহী অগত্যা বলিল, “যেস্কি তোম্ ঢুণ্ড্‌কে সো যেহি হোতী হৈ।”

 দ্বিতীয় সিপাহী। আল্লা আকবর! চলো, চলো, বস্‌কী হুজুরমে লে চলে।—হম্ দোনোকে বখ্‌সিস্ মিল্‌ যায়েগা।

 প্রথম সিপাহী। ভাই! তোম্ লে যাও! হমারা কুছ কাম হৈ।

 দ্বিতীয় সিপাহী এ কথা শুনিয়া বড় আনন্দিত হইল—শ্রীর ঘাড়ে ধাক্কা দিয়া লইয়া চলিল। প্রথম সিপাহী বড় বিষণ্ণ বদনে দাঁড়াইয়া রহিল। দুই জনের নাম দুইটা বলা যাক— প্রথমের নাম, খয়ের আলি—দ্বিতীয়, পীর বক্‌স।

 সিপাহীর কাছে ঘাড়-ধাক্কা খাইয়া শ্রী মৃদু হাসিল। তখন সে ডাকিয়া, চন্দ্রচূড়কে বলিল, “ঠাকুর! যদি আমার স্বামীকে চেনেন, তবে বলিবেন, আমার উদ্ধার তাঁহার কাজ।”

 শুনিয়া চন্দ্রচূড়ের চক্ষে দর দর ধারা পড়িতে লাগিল। চন্দ্রচূড় কাঁদিতে কাঁদিতে বলিলেন, “মা, তুমিই ধন্যা।”

নবম পরিচ্ছেদ

 সিপাহীরা পালে পালে বিদ্রোহী ধরিয়া আনিতে লাগিল। যাহারা লাঠি চালাইয়াছিল, তাহারা নির্ব্বিঘ্নে স্বস্থানে অবস্থানপূর্ব্বক তামাসা দেখিতে লাগিল। যাহারা ধৃত হইল, তাহারা প্রায় নির্দ্দোষী। লোক ধরিয়া আনিতে হইবে, কাজেই সিপাহীরা যাহাকে পাইল, তাহাকে ধরিয়া আনিল। দোষীরা সাবধান ছিল, তাহাদিগকে পাওয়া গেল না। নির্দ্দোষীরা সতর্ক থাকা আবশ্যক বিবেচনা করে নাই— তাহারা ধৃত হইতে লাগিল। কেহ হাঁ করিয়া সিপাহী দেখিতেছিল, অতি সাহসী বলিয়া সে ধৃত হইল। কেহ সিপাহী দেখিয়া ভয়ে পলাইল, যে পলায়, সে দোষী বলিয়া ধৃত হইল। কেহ সিপাহীর প্রশ্নে চোট পাট উত্তর দিল; সে চতুর, কাজেই, “বদ্‌মাষ” বলিয়া ধৃত হইল। কেহ কোন উত্তর দিতে পারিল না,— অপরাধীই নিরুত্তর হয়, এই বলিয়া সেও ধৃত হইল। কেহ দুর্ব্বল, তাহাকে ধৃত করার কোন কষ্ট নাই, সিপাহীরা অনুগ্রহ করিয়া তাহাকে ধৃত করিলেন; কেহ বলবান্, কাজেই দাঙ্গাবাজ, সেও ধৃত হইল। কেহ দরিদ্র, দরিদ্রেরাই বদ্‌মাষ হইয়া থাকে, এজন্য সে ধৃত হইল; কেহ ধনী, ধনীরা টাকা দিয়া লোক নিযুক্ত করিয়া এই দাঙ্গা উপস্থিত করিয়াছে সন্দেহ নাই, তাহারাও ধৃত হইল। এইরূপে অনেক লোকে ধৃত হইল। এক জন মাত্র স্ত্রীলোককে ধরিবার আদেশ ছিল—যে গাছে চড়িয়া “মার! মার!” শব্দে হুকুম দিয়াছিল, তাহাকে। একের স্থানে শত জনে শত জন স্ত্রীলোককে ধরিয়া আনিল। কেহ শুনিয়াছিল সে বিধবা, অতএব সে বিধবা দেখিয়াই ধরিল, কেহ শুনিয়াছিল সে সুন্দরী, সে সুন্দরী দেখিয়াই ধৃত করিল। কেহ শুনিয়াছিল, সে যুবতী; এজন্য অনেক যুবতী এক কালে বন্ধন ও পূজা প্রাপ্ত হইল। কেহ কেহ শুনিয়াছিল যে, বৃক্ষবিহারিণী মুক্তকুন্তলা ছিল; অতএব স্ত্রীলোকের এলো চুল দেখিলেই তাহাদের হজুরে আনিয়া সিপাহীরা হাজির করিতে লাগিল।

 এইরূপে ফৌজদারী কারাগার স্ত্রীপুরুষে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল—আর ধরে না। তখন সে দিনের মত কারাগার বন্ধ হইল। সে দিন কয়েদীরা বন্ধ রহিল—তাহাদের নিস্‌বতে পর দিন যাহা হয় হুকুম হইবে। সীতারামও এই সঙ্গে আবদ্ধ রহিলেন।

 সীতারামকে অনেকেই চিনিত। ইচ্ছা করিলে তিনি ফৌজদারের সঙ্গে সাক্ষাতের উপায় করিতে পারিতেন, অথবা যাহাতে সামান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে একত্রে গাদাগাদি করিয়া থাকিতে না হয়, সে বন্দোবস্ত করিয়া লইতে পারিতেন। তিনি সে চেষ্টা কিছুই করিলেন না। তাঁহাকে চিনে, এমন লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হইলে, ইঙ্গিতে তাঁহাকে চিনিতে নিষেধ করিলেন। তিনি মনে মনে এই ভাবিতেছিলেন, “আমি যদি ইহাদিগকে ছাড়িয়া যাই, তবে ইহাদিগের মুক্তির কোন উপায় হইবে না।”

 রাত্রি উপস্থিত। কারাগারের একটি মাত্র দ্বার, প্রহরীরা সেই দ্বার বাহির হইতে রুদ্ধ করিয়া, প্রহরায় নিযুক্ত রহিল।

 কেহ কিছু খাইতে পায় নাই। সন্ধ্যার পর যে যেখানে পাইল, কাপড় পাতিয়া শুইতে লাগিল। সীতারাম তখন সকলের কাছে কাছে গিয়া বলিতে লাগিলেন, “তোমরা কেহ ঘুমাইও না, ঘুমাইলে রক্ষা নাই।”

  সকলে সভয়ে শুনিল। কথাটা কেহ বুঝিতে পারিল না। কাহারও কিছু জিজ্ঞাসা করিতে সাহস হইল না। কিন্তু কেহ ঘুমাইল না। পেটে ক্ষুধা—মনে ভয়; নিদ্রার সম্ভাবনা বড় অল্প। একবার প্রহর বাজিয়া গেল—ঝিঁঝিট-খাম্বাজে নবতওয়ালা একটু মধুরালাপ করিয়া, আহারাদির অন্বেষণে নবতখানা হইতে নামিল। তখন সীতারাম এক স্থানে, কতকগুলি কয়েদীর খেদোক্তি শুনিতেছিলেন। তাহাদের কথা সমাপ্ত হইলে সীতারাম বলিলেন, “ভাই, অত কাদা কাটার দরকার কি? আমরা মনে করিলেই ত বাহির হইয়া যাইতে পারি।”

 এক জন বলিল, “কেমন করিয়া যাইব?”

 সীতারাম বলিলেন, “কেন? দ্বার ভাঙ্গিব।”

 আর ব্যক্তি বলিল, “তুমি কি পাগল?”

 সীতারাম বলিলেন, “কেন বাপু! এখানে আমরা কত লোক আছি মনে কর?”

 এক জন বলিল, “তা জন শ পাঁচ ছয় হইবে। তাতে কি হলো?”

 সীতরাম বলিলেন, পাঁচ শ লোকে একটা দরওয়াজা ভাঙ্গিতে পারি না?”

 সকলে হাসিতে লাগিল। একজন বলিল, “দরওয়াজা যে লোহার?”

 সীতা। মানুষ কি মিছরির? না কাদার?

 আর এক জন বলিল, “লোহার কপাট কি হাত দিয়া ভাঙ্গিব? না দাঁত দিয়া কাটিব? না নখ দিয়া ছিঁড়িব?”

 সকলে হাসিল। সীতারাম বলিলেন, “কেন, পাঁচ শ লোকের লাথিতে এক জোড়া কপাট কি ভাঙ্গে না? হোক না কেন লোহা—এক হয়ে কাজ করিলে, লোহার কথা দূরে থাক, পাহাড়ও ভাঙ্গা যায়, সমুদ্রও বাঁধা যায়। কাঠবিড়ালীতে সমুদ্র বাঁধার কথা শুন নাই?”

 তখন এক জন বলিল, “লোকটা বলিতেছে মন্দ নয়। তা ভাই, না হয় যেন লোহার কপাটও ভাঙ্গিলাম—বাহিরে যে সিপাহী তাহারা?”

 সীতারাম। কয় জন?

 সে ব্যক্তি বলিল, “দুই জন চারি জন থাকিতে পারে।”

 সীতারাম। এই পাঁচ শ লোকে আর দুই চারি জন সিপাহী মারিতে পারিব না?

 অপর এক জন কহিলেন, “তাদের যে হাতিয়ার আছে? আমরা আঁচড়ে কামড়ে কি করিব?”

 সীতারাম বলিলেন, “তখন আমি তোমাদিগকে হাতিয়ার দিব।”

 “তুমি হাতিয়ার কোথা পাইবে?”

 “আমি সীতারাম রায়।”

 শুনিয়া, যাহারা, সীতারামের সঙ্গে তর্ক বিতর্ক করিতেছিল, তাহারা একটু কুণ্ঠিত হইয়া সরিয়া বসিল। এক জন বলিল, “বুঝিলাম, আমাদের উদ্ধারের জন্যই আপনি ইহার ভিতর প্রবেশ করিয়াছেন। আপনি যাহা বলিবেন, আমি তাহাই করিব।”

 যে কয় জনের সঙ্গে সীতারাম কথোপকথন করিতেছিলেন, সকলেরই এই মত হইল। সীতারাম তখন আর এক স্থানে গিয়া বসিলেন, সেই রকম করিয়া তাহাদের সঙ্গে কথা কহিলেন, সেই রকম করিয়া তাহাদিগকে বশীভূত করিলেন; তাহারাও যথাসাধ্য সাহায্যে উদ্যত, এবং উত্তেজিত হইল। এইরূপে সীতারাম ক্রমে ক্রমে, অসাধারণ বুদ্ধি, অসাধারণ কৌশল, অসাধারণ বাগ্মিতার গুণে সেই বহুসংখ্যক বন্দিবৃন্দকে একমত, উৎসাহিত, এবং প্রাণপাতে পর্য্যস্ত সম্মত করিলেন।

  তখন সীতারাম সেই সমস্ত বন্দিবর্গকে দাঁড়াইতে বলিলেন। তাহারা দাঁড়াইল। তখন সীতারাম তাহাদিগকে শ্রেণীবদ্ধ করিয়া সাজাইতে লাগিলেন। দ্বারের সম্মুখে প্রথম সারি, তার পর আর এক সারি—এইরূপ বরাবর; প্রতি শ্রেণীমধ্যস্থ ব্যক্তিদিগকে তিন তিন জন করিয়া আবার বিভাগ করিলেন। আবার সেই তিন জনকে এমত করিয়া দাঁড় করাইলেন যে, দুই জনের মধ্য দিয়া এক জন মনুষয় যাইতে পারে। তাহাতে এইরূপ ফল দাঁড়াইল যে, অনায়াসে পলক মধ্যে কোন তিন ব্যক্তির পিছনের সারি হইতে তিন জন আগু হইয়া পলক মধ্যে তাহাদের স্থান লইতে পারে—ঠেলাঠেলি হয় না।

  এই সকল বন্দোবস্ত করিতে আবার প্রহর বাজিল। “দগড়া নগড়া গড়াগড়ি” বলিয়া দামামা কি বলিতে লাগিল। তার সঙ্গে মধুর বেহাগ রাগিণী যামিনীকে গভীরা, মূর্ত্তিমতী, ভয়ঙ্করী করিয়া তুলিল। তখন সীতারাম বুঝিলেন, উত্তম সময়, পাহারার সিপাহী ভিন্ন অন্য সিপাহী সকল ঘুমাইয়াছে— কর্ত্তৃপক্ষেরা নিদ্রিত। তখন সীতারাম দ্বারের সমীপস্থ তিন জনকে বলিলেন, “তোমরা তিন জন প্রথমে দ্বারে লাথি মার। গায়ে যত জোর আছে, তত জোরে তিন বার মাত্র লাথি মারিবে। তার পর পিছে সরিয়া দাঁড়াইবে। কিন্তু দেখিও, তিন খানা পা, যেন একেবারেই কপাটের উপর পড়ে; অগ্র পশ্চাৎ হইলে সকল বৃথা। একেবারে তিন জন লাথি মারিবার স্থান এ কপাটে আছে—তাই মাপ করিয়া তিন তিন জন করিয়া সাজাইয়াছি। মুখে বলিও—লছমী নারায়েণকি জয়!”

 বন্দীরা বুঝিল। “লছমী-নারায়েণকি জয়!” বলিয়া, তিন জনে ঠিক এক তালে, প্রাণপণ শক্তিতে, সেই লোহার কপাটে পদাঘাত করিল।

 বাহিরে চারি জন সিপাহী পাহারায় ঢুলিতেছিল, বজ্রের মত শব্দ সহসা তাহাদের কর্ণে প্রবেশ করাতে তাহারা চমকিয়া উঠিল। কোথায় কিসের শব্দ তাহা বুঝিতে না পারিয়া, এদিক্‌ ওদিক্‌ চাহিতে লাগিল।

 এ দিকে প্রথম তিন জন সরিয়া পিছনে গিয়াছে; আর তিন জন আসিয়া পলক মধ্যে তাহাদের স্থান লইয়া সেই এক তালে তিন বার কপাটে পদাঘাত করিল। লোহার কপাটের তাহাতে কি হইবে? কিন্তু বড় ঝঞ্চনা বাজিতে লাগিল। এক জন সিপাহী বলিল, “কিয়া রে?”

 কিন্তু ভিতর হইতে “লছমী-নারায়েণকি জয়!” ভিন্ন অন্য কোন উত্তর হইল না। দ্বিতীয় সিপাহী বলিল, “শালা লোগ কেওয়াড়ি তোড়নে মাঙ্গ্‌তা হৈ।”

 তৃতীয় সিপাহী। আরে তোড়্‌নে দেও। বাঙ্গালী লোহেকি কেওয়াড়ি তোড়েগা!

 চতুর্থ সিপাহী। কেওয়াড়ি খোল্‌কে দো চার থাপ্পড় লাগা দেঙ্গে?

 প্রথম সিপাহী। আরে যানে দেও। আপহিসে বহ লোগ ঠণ্ডা হো যায়েগা।

 এ সকল কথা বন্দীরাও বড় শুনিতে পাইল না। কেন না এখন, বড় ঝড়ের সময়ে যেমন বজ্রাঘাত থামে না, তাহার যেমন উপর্য্যুপরি শব্দ থামে না, সেইরূপ শব্দে এখন লোহার কপাটের উপর পদাঘাত বৃষ্টি হইতেছিল—আর কিছুই শোনা যায় না। কয়েদীরা মাতিয়া উঠিয়াছিল—কিন্তু সীতারাম তাহাদিগকে ধৈর্য্যবিশিষ্ট করিয়া, যাহার যে নির্দ্দিষ্ট স্থান, তাহাকে সেইখানে স্থির রাখিতে লাগিলেন। ফাটকের ভিতর কিছুমাত্র গোলযোগ বা বিশৃঙ্খলা ছিল না।

 সিপাহীরা প্রথমে রঙ্গ দেখিতেছিল। মনে করিতেছিল যে, কয়েদীরা কৌতুক করিতেছে, এখনই নিবৃত্ত হইবে। ক্রমে দেখিল যে, সে গতিক নহে—ক্রমে কয়েদীদিগের বল বাড়িতে লাগিল। তখন তাহারা কয়েদীদিগকে শাসিত করা নিতান্তই প্রয়োজন বোধ করিল। তিন জনে পরামর্শ এই করিল যে, তাহারা কপাট খুলিয়া ভিতরে প্রবেশ করিয়া, কয়েদীদিগকে ভাল রকম প্রহার করিয়া নিরস্ত করিবে।

 তিন জনের মত হইল, কিন্তু এক জনের হইল না। আলিয়ার খাঁ সকলের প্রাচীন—দাড়ি একেবারে শণের মত। সে বলিল, “বাবা! যদি সত্য সত্যই কয়েদী ক্ষেপিয়া থাকে, তবে আমরা চারি জনে কি তাহাদের থামাইতে পারিব? বরং দ্বার খোলা পাইলে, তাহারা আমাদের চারি জনকে পিষিয়া ফেলিয়া পিল পিল করিয়া পলাইয়া যাইবে। তখন আমরা কি করিব? বরং জমাদ্দারকে খবর দেওয়া যাক্।”

 দ্বিতীয় সিপাহী। কেন জমাদ্দারকে খবর দিবারই তবে প্রয়োজন কি? সত্য সত্য উহার কপাট ভাঙ্গিতে পারিবে, সে শঙ্কা ত আর করিতেছি না। তবে বড় দিক করিতেছে—তার জন্য জমাদ্দারকে দিক করিয়া কি হইবে? আজ থাক, কাল প্রাতে উহাদিগের উচিত সাজা হইবে।

 কিছুক্ষণ সিপাহীরা এই মতাবলম্বী হইয়া নিরস্ত হইল। কয়েদীদিগের দ্বার ভঙ্গের উদ্যম দেখিয়া নানাবিধ হাস্য পরিহাস করিতে লাগিল। বলিতে লাগিল, “বাঙ্গালী লোহার কপাট ভাঙ্গিবে, আর বানরে সঙ্গীত গায়িবে, সমান কথা।”

 লোহা সহজে ভাঙ্গে না বটে, কিন্তু দেয়াল ফাটিতে পারে। লোহার চৌকাট দেয়ালের ভিতর গাথা ছিল। দুই চারি দণ্ড পরে আলিয়ার খাঁ জ্যোৎস্নার আলোকে সভয়ে দেখিল, অবিরত সবল পদাঘাতের তাড়নে দেয়াল ফাটিয়া উঠিয়াছে। তখন সে বলিল, “আর দেখ কি? জমাদ্দারজিকে সম্বাদ দাও। এইবার কপাট পড়িবে।”

 এক জন সিপাহী জমাদারকে খবর দিতে শীঘ্র গেল। আর তিন জন হা করিয়া কপাট পানে চাহিয়া রহিল।

 দেখিল, ক্রমে দেয়াল বেশী বেশী ফাটিতে লাগিল। তার পর, দেয়ালটা ফাপিয়া উঠিল—ভিতরে চৌকাট ঢক্‌ ঢক্‌ করিয়া নড়িতে লাগিল— ঝন্ ঝন্ শব্দ বড় বাড়িয়া উঠিল। লাথির জোর আরও বাড়িতে লাগিল—বজ্রাঘাতের উপর বজ্রাঘাতের মত শব্দ হইতে লাগিল—শেষ, চতুর্দ্দিক্ প্রতিধ্বনিত করিয়া সেই লোহার কপাট, চৌকাট সমেত, দেয়াল ভাঙ্গিয়া মাটিতে পড়িয়া গেল। লক্ষ্মীনারায়ণ জিউর জয় শব্দে গগন বিদীর্ণ হইল।

 নির্ব্বোধ হিন্দুস্থানীরা, হাঁ করিয়া দাঁড়াইয়া দেখিতেছিল, সরিয়া দাঁড়াইতে ভুলিয়া গিয়াছিল। যখন কপাট পড়িতেছে দেখিল, তখন দৌড়াইয়া পলাইতে লাগিল। দুই জন বাঁচিল, কিন্তু এক জনের পায়ে উপর কপাট পড়ায় সে ভগ্নপদ হইয়া ভূতলে পড়িয়া গেল। এ দিকে কপাট পড়িবামাত্র ভিতর হইতে, বাঁধ ভাঙ্গিলে জলপ্রবাহের মত বন্দি-স্রোত পতিত কপাটের উপর দিয়া হরিধ্বনি করিতে করিতে পতিত প্রহরীকে পদতলে পিষিয়া, গভীর গর্জনে ছুটিল। সর্ব্বাগ্রে সীতারাম বাহির হইয়া আহত প্রহরীর ঢাল সড়্ কী কী তরবারি কাড়িয়া লইয়া আর দুই জনকে যমদূতের ন্যায় আক্রমণ করিলেন। তাঁহার তখনকার ভীষণ মূর্ত্তি দেখিয়া ও তাঁহার দারুণ প্রহারে আহত হইয়া প্রহরিদ্বয় উর্দ্ধশ্বাসে পলায়ন করিল। জমাদ্দার সাহেব তখনও আসিয়া পৌঁছেন নাই।

 বন্দীগণ হরিধ্বনি করিতে করিতে ছুটিতে লাগিল—সীতারাম অসি হস্তে স্থির হইয়া এক স্থানে দাঁড়াইয়া তাহাদিগের পৃষ্ঠ রক্ষা করিতে লাগিলেন। সকলেই বাহির হইয়া গেলে, সীতারাম আবার একবার কারাগারের ভিতর প্রবেশ করিলেন। তাঁহার স্মরণ হইল যে, এক কোণে এক জন বন্দীকে মুড়ি দিয়া পড়িয়া থাকিতে দেখিয়াছিলেন। সে একবারও উঠে নাই বা কোন সাড়া দেয় নাই। সীতারাম মনে করিয়াছিলেন, সে পীড়িত। এখন তাঁহার মনে হইল, সে হয় ত বিনা সাহায্যে উঠতে পারে নাই বা বাহির হইতে পারে নাই। সে বাহির হইয়াছে কি না, দেখিবার জন্য সীতারাম কারাগৃহ মধ্যে পুনঃপ্রবেশ করিলেন। দেখিলেন, সে তেমনি ভাবে সেই কোণে সর্ব্বাঙ্গ আবৃত করিয়া গুইয়া আছে।

 সীতারাম ডাকিয়া বলিলেন, “ওগো! সবাই বাহির হইল, তুমি শুইয়া কেন?”

 যে শুইয়াছিল, সে বলিল, “কি করিব?”

 এ ত স্ত্রীলোকের গলা। চেনা গলা বলিয়াই সীতারামের বোধ হইল। তিনি আগ্রহ সহকারে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কে গা?'

 সে বলিল, “আমি শ্রী।”

 পু. ২১, পংক্তি ২৩, “সীতারাম...যাইবে?” এই পংক্তিটির পরিবর্ত্তে ছিল—

 সীতারাম বলিলেন, “শ্রী—তুমি এখানে কেন?”

 শ্রী। সিপাইতে ধরিয়া আনিয়াছে

 সীতা। হাঙ্গামায় ছিলে বলিয়া? তা, ইহাদের বোধ সোধ নাই। অত্যাচার বেশী হইতেছে। যাই হউক, এখন ভগবানের রুপায় আমরা মুক্ত হইয়াছি। এখন তুমি এখানে পড়িয়া কেন? আপনার স্থানে যাও।

 পৃ. ২২, পংক্তি ১, “সেখানে কে আছে?” এই কথা কয়টির পর ছিল— আমার উপর এখন দৌরাত্ম্য

 পৃ. ২২, পংক্তি ৪, “মাঠ” কথাটির স্থলে “কারাগার” ছিল।

 পংক্তি ২৪, “আমি তোমার বিবাহিত স্ত্রী,” এই কথা কয়টির পর ছিল— তোমার স্নেহের অধিকারিণী, আমি

 পৃ. ২৩, পংক্তি ১-২, “তোমার আর দুই স্ত্রী আছে, কিন্তু” এই কথা কয়টির পরিবর্ত্তে ছিল

নন্দা তোমার দ্বিতীয়া স্ত্রী,

 পৃ. ২৩, পংক্তি ১৭, এই “সপ্তম” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “একাদশ” পরিচ্ছেদ।

 পংক্তি ১৮-১৯, “পলায়নের...হইয়াছে। সীতারাম” এই অংশটি ছিল না।

 পৃ. ২৫, পংক্তি ৮, “শ্রী আবার দাঁড়াইয়া উঠিল। বলিল,” এই কথা কয়টির পর ছিল—

 “এই আধখানা মোহর তুমি আমাকে পাঠাইয়া দিয়াছিলে—বিপদে পড়িলে নিদর্শন স্বরূপ তোমাকে ইহা দেখাইতে বলিয়া দিয়াছিলে। সে দিন ইহাই তোমাকে দেখাইয়া ভাইয়ের প্রাণ ভিক্ষা পাইয়াছি।

  পৃ. ২৫, পংক্তি ৯, “ইহা তোমার অশেষ গুণ।” এই কথা কয়টির পর ছিল— কিন্তু আর কখন ইহাতে আমার প্রয়োজন হইবে না।

  পৃ. ২৫, পংক্তি ১৪, “ফিরিয়া না চাহিয়া,” এই কথা কয়টির পরিবর্ত্তে ছিল— সেই সুবর্ণাৰ্দ্ধ নদীসৈকতে নিক্ষিপ্ত করিয়া

  পৃ. ২৫, পংক্তি ১৬, এই “অষ্টম’ পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “দ্বাদশ” পরিচ্ছেদ।

  পংক্তি ২০-২৪, “তার পর সীতারাম...ভাসিয়া গেল।” এই অংশটি ছিল না।

  পংক্তি ২৪, এই পংক্তির শেষে ছিল—

একবার সে বড় দুঃখে পড়িয়াছে, লোকমুখে শুনিয়া সীতারাম তাহাকে কিছু অর্থ পাঠাইয়া দিলেন—আর চিহ্নিত করিয়া আধখানা মোহর পাঠাইয়া দিয়াছিলেন যে, “তোমার যখন কিছুর প্রয়োজন হইবে, এই আধখানা মোহর সঙ্গে দিয়া এক জন লোক আমার কাছে পাঠাইয়া দিও। সে যা চাবে, আমি তাই দিব।” শ্রী সে আধখানা মোহর কখনও কাজে লাগায় নাই—কখনও লোক পাঠায় নাই। কেবল ভাইয়ের প্রাণ রক্ষার্থ সে রাত্রে মোহর লইয়া আসিয়াছিল।

  পৃ. ২৬, পংক্তি ১৭, “পাপাচরণ করিতেছি।” এই কথা কয়টির পর ছিল— পরশুরামের কুঠার তাঁহার মনে পড়িয়াছিল।

  পৃ. ২৭, পংক্তি ১১, “জাগরূক হইতে লাগিল।” এই কথা কয়টির পর ছিল— যিনি সাম্রাজ্য সংস্থাপনের উচ্চ আশাকে মনে স্থান দিয়াছেন তাঁহার উপযুক্ত মহিষী কই? নন্দা কি রমা কি সিংহাসনের যোগ্যা? না

  পৃ. ২৭, পংক্তি ১২, “রণজয় করিয়াছিল,” এই কথা কয়টির পর ছিল— সেই সে সিংহাসনের যোগ্যা?

এবং ইহার পরেই “যদি” কথাটির পর “সেই” কথাটি ছিল না।

  পৃ. ২৭, পংক্তি ১৮, “আমি কি জানি।” এই কথা কয়টির পর ছিল— আপনি ত তাহাকে চন্দ্রচূড় ঠাকুরের জিন্মা করিয়া দিয়াছিলেন।

  পৃ. ২৭, পংক্তি ১৯, “সে এখানে আসে নাই?” এই কথা কয়টির স্থলে ছিল— সে ঠাকুরের সঙ্গ ছাড়া হইয়াছে। এখানে আসে নাই?

  পৃ. ২৮, পংক্তি ১, এই “নবম” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “চতুর্দ্দশ” পরিচ্ছেদ। এই পরিচ্ছেদের পূর্ব্বে প্রথম সংস্করণে আর একটি পরিচ্ছেদ ছিল। এই স্থলে তাহ মুদ্রিত হইল। —

ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ

 শ্যামপুরে সীতারাম একটু স্থির হইলে, লক্ষ্মীনারায়ণ জিউর দর্শনে সস্ত্রীক হইয়া চলিলেন।

 লক্ষ্মীনারায়ণ জিউর মন্দির নিকটস্থ এক জঙ্গলে ভূমিমধ্যে প্রোথিত ছিল। সীতারামের আজ্ঞাক্রমে ভূমি খননপূর্ব্বক, তাহার পুনর্বিকাশ সম্পন্ন হইয়াছিল। তন্মধ্যে প্রাচীন দেবদেবীমূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছিল। অন্য প্রথম সীতারাম তদ্দর্শনে চলিলেন। সঙ্গে শিবিকারোহণে নন্দা ও রমা চলিলেন।

 যে জঙ্গলের ভিতর মন্দির, তাহার সীমাদেশে উপস্থিত হইয়া তিন জনেই শিবিকা হইতে অবতরণ করিলেন, এবং এক জন মাত্র পথপ্রদর্শক সঙ্গে লইয়া তিন জনে জঙ্গলমধ্যে পদব্রজে প্রবেশ করিলেন। কাননের অপূর্ব্ব শোভা নিরীক্ষণ করিয়া তাঁহাদিগের চিত্ত প্রফুল্ল হইল। অতিশয় শ্যামলোজ্জল পত্ররাশিমধ্যে স্তবকে স্তবকে পুষ্প সকল প্রস্ফুটিত হইয়া রহিয়াছে। শ্বেত হরিং কপিল পিঙ্গল রক্তনীল প্রভৃতি নানা বর্ণের ফুল স্তরে স্তরে ফুটিয়া গন্ধে চারি দিক্ আমোদিত করিতেছে। তন্মধ্যে নানা বর্ণের পাখী সকল বসিয়া নানাস্বরে কৃজন করিতেছে। পথ অতি সঙ্কীর্ণ। গাছের ডালপালা ঠেলিতে হয়, কখন কাঁটায় নন্দারমার আঁচল বাঁধিয়া যায়, কখন ফুলের গোছা তাহাদিগের মুখে ঠেকে, কখন ডাল নাড়া পেয়ে ভোমরা ডাল ছেড়ে তাদের মুখের কাছে উড়িয়া বেড়ায়, কখন তাহাদেব মলের শব্দে ত্রস্তা হইয়া চকিতা হরিণী শয়ন ত্যাগ করিয়া বেগে পলায়ন করে। পাতা খসিয়া পড়ে, ফুল ঝরিয়া যায়, পাখী উড়িয়া যায়, খরা দৌড়িয়া যায়। যথাকালে তাঁহারা মন্দিরসমীপে উপস্থিত হইলেন। তখন তাঁহারা পথপ্রদর্শককে বিদায় দিলেন।

 দেখিলেন, মন্দির ভূগর্ভস্থ, বাহির হইতে কেবল চূড়া দেখা যায়। সীতারামের আজ্ঞাক্রমে মন্দিরদ্বারে অবতরণ করিবার সোপান প্রস্তুত হইয়াছিল; এবং অন্ধকার নিবারণের জন্য দীপ জ্বলিতেছিল। তাহাও সীতারামের আজ্ঞাক্রমে হইয়াছিল। কিন্তু সীতারামের আজ্ঞাক্রমে সেখানে ভৃত্যবর্গ কেহই ছিল না; কেন না, তিনি নির্জ্জনে ভার্য্যাদ্বয়সমভিব্যাহারে দেব দর্শনের ইচ্ছা করিয়াছিলেন।

 সোপান সাহায্যে তাঁহারা তিন জনে মন্দিরদ্বারে অবতরণ করিলে পর, সীতারাম সবিস্ময়ে দেখিলেন যে, মন্দিরদ্বারে দেবমূর্ত্তিসমীপে এক জন মুসলমান বসিয়া আছে। বিস্মিত হইয়া সীতারাম জিজ্ঞাসা করিলেন, “কে বাবা তুমি?”

 মুসলমান বলিল, “আমি ফকির।”

 সীতারাম। মুসলমান?

 ফকির। মুসলমান বটে।

 সীতা। আ সর্ব্বনাশ!

 ফকির। তুমি এত বড় জমীদার, হঠাৎ তোমার সর্ব্বনাশ কিসে হইল?

 সীতা। ঠাকুরের মন্দিরের ভিতর মুসলমান!

 ফকির। দোষ কি বাবা! ঠাকুর কি তাতে অপবিত্র হইল?

 সীতা। হইল বৈ কি। তোমার এমন দুর্ব্ব দ্ধি কেন হুইল?

 ফকির। তোমাদের এ ঠাকুর, কি ঠাকুর? ইনি করেন কি?

 সীতা। ইনি নারায়ণ, জগতের সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় কর্ত্তা!

 ফকির। তোমাকে কে সৃষ্টি করিয়াছেন?

 সীতা। ইনিই।

 ফকির। আমাকে কে সৃষ্টি করিয়াছেন?

 সীতা। ইনিই—যিনি জগদীশ্বর, তিনি সকলকেই সৃষ্টি করিয়াছেন!

 ফকির। মুসলমানকে সৃষ্টি করিয়া ইনি অপবিত্র হন নাই—কেবল মুসলমান ইহার মন্দিরদ্বারে বসিলেই ইনি অপবিত্র হইবেন? এই বুদ্ধিতে বাবা তুমি হিন্দুরাজ্য স্থাপন করিতে আসিয়াছ? আর একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। ইনি থাকেন কোথা? এই মন্দিরের ভিতর থাকিয়াই কি ইনি সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় করেন? না, আর থাকিবার স্থান আছে?

 সীতা। ইনি সর্ব্বব্যাপী; সর্ব্বঘটে সর্ব্বভূতে আছেন।

 ফকির। তবে আমাতে ইনি আছেন?

 সীতা। অবশ্য—তোমরা মান না কেন?

 ফকির। বাবা! ইনি আমাতে অহরহ আছেন, তাহাতে ইনি অপবিত্র হইলেন না—আমি উহার মন্দিরের দ্বারে বসিলাম, ইহাতেই ইনি অপবিত্র হইলেন?

 একটি স্মৃতিব্যবসায়ী অধ্যাপক ব্রাহ্মণ থাকিলে ইহার যথাশাস্ত্র একটা উত্তর দিতে পারিত—কিন্তু সীতারাম স্মৃতিব্যবসায়ী অধ্যাপক নহেন, কথাটার কিছু উত্তর দিতে না পারিয়া অপ্রতিভ হইলেন। কেবল বলিলেন, “এইরূপ আমাদের দেশাচার।”

 ফকির বলিল, “বাবা! শুনিতে পাই, তুমি হিন্দুরাজ্য স্থাপন করিতে আসিয়াছ, কিন্তু অত দেশাচারের বশীভূত হইলে, তোমার হিন্দুরাজ্য সংস্থাপন করা হইবে না। তুমি যদি হিন্দু মুসলমান সমান না দেখ, তবে এই হিন্দু মুসলমানের দেশে তুমি রাজ্য রক্ষা করিতে পারিবে না। তোমার রাজ্যও ধর্ম্মরাজ্য না হইয়া পাপের রাজ্য হইবে। সেই এক জনই হিন্দু মুসলমানকে সৃষ্টি করিয়াছেন; যাহাকে হিন্দু করিয়াছেন, তিনিই করিয়াছেন, যাহাকে মুসলমান করিয়াছেন, সেও তিনিই করিয়াছেন। উভয়েই তাঁহার সন্তান; উভয়েই তোমার প্রজা হইবে। অতএব দেশাচারের বশীভূত হইয়া প্রভেদ করিও না। প্রজায় প্রজায় প্রভেদ পাপ। পাপের রাজ্য থাকে না।

 সীতা। মুসলমান রাজা প্রভেদ করিতেছে না কি?

 ফকির। করিতেছে। তাই মুসলমান রাজ্য ছারখারে যাইতেছে। সেই পাপে মুসলমান রাজ্য যাইবে; তুমি রাজ্য লইতে পার ভালই, নহিলে অন্যে লইবে। আর যখন তুমি বলিতেছ, ঈশ্বর হিন্দুতেও আছেন, মুসলমানেও আছেন, তখন তুমি কেন প্রভেদ করিবে? আমি মুসলমান হইয়াও হিন্দু মুসলমানে কোন প্রভেদ করি না। এক্ষণে তোমরা দেবতার পূজা কর, আমি অন্তরে যাইতেছি। যদি ইচ্ছা থাকে বল, যাইবার সময়ে আবার আসিয়া তোমাদিগকে আশীর্ব্বাদ করিয়া যাইব।

 “সীতা। দেখিতেছি, আপনি বিজ্ঞ। অবশ্য আসিবেন।

 ফকির তখন চলিয়া গেল। সীতারামের দর্শন ও পূজা ইত্যাদি সমাপন হইলে, সে আবার ফিরিয়া আসিল। সীতারাম তাহার সঙ্গে অনেক কথা বার্ত্তা কহিলেন। সীতারাম দেখিলেন, সে ব্যক্তি জ্ঞানী। ফারসী আরবী উত্তম জানে, তাহার উপর সংস্কৃতও উত্তম জানে, এবং হিন্দুধর্ম্মবিষয়ক অনেকগুলি গ্রন্থও পড়িয়াছে। দেখিলেন যে, যদিও তাহার বয়স এমন বেশী নয়, তথাপি সংসারে সে মমতাশূন্য বৈরাগী এবং সর্ব্বত্র সমদর্শী। তাহার এবম্বিধ চরিত্র দেখিয়া নন্দা রমাও লজ্জা ত্যাগ করিয়া, একটু দূরে বসিয়া তাহার জ্ঞানগর্ভ কথা সকল শুনিতে লাগিলেন।

 বিদায় কালে সীতারাম বলিলেন, “আপনি যে সকল উপদেশ দিলেন, তাহা অতি ন্যায্য। আমরা সাধ্যানুসারে তাহা পালন করিব। কিন্তু আমার ইচ্ছা যে, আমার নূতন রাজধানীতে আপনি বাস করেন। আমি এ উপদেশের বিপরীতাচরণ করিলে, আপনি নিকটে থাকিলে আমাকে সে সকল কথা আবার মনে করিয়া দিতে পারিবেন। আপনার ন্যায় জ্ঞানী ব্যক্তি আমার নিকট থাকিলে, আমার রাজ্যের বিশেষ মঙ্গল হইবে।”

 ফকির। তুমি একটি কথা আমার নিকট স্বীকৃত হইলে, আমিও তোমার কথায় স্বীকৃত হইতে পারি। তুমি রাজধানীর কি নাম দিবে?

 সীতা। শ্যামপুর নাম আছে—সেই নামই থাকিবে।

 ফকির। যদি উহার মহম্মদপুর নাম দিতে স্বীকৃত হও, তবে আমিও তোমার কথায় স্বীকৃত হই।

 সীতা। এ নাম কেন?

 ফকির। তাহা হইলে আমি খাতির জমা থাকিব যে, তুমি হিন্দু মুসলমানে সমান দেখিবে।

 সীতারাম কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া, তাহাতে স্বীকৃত হইলেন। ফকির তখন বলিল, “আমি ফকির, কোন গৃহে বাস করিব না। কিন্তু তোমার নিকটেই থাকিব। যখন যেখানে থাকি, তোমাকে জানাইব। তুমি খুঁজিলেই আমাকে পাইবে।”

 গমন কালে ফকির তিন জনকে আশীর্ব্বাদ করিল। সীতারামকে বলিল, “তোমার মনস্কাম সিদ্ধ হউক।” নন্দাকে বলিল, “তুমি মহিষীর উপযুক্ত; মহিষীর ধর্ম্ম পালন করিও। তোমাদের হিন্দু শাস্ত্রে স্বামীর প্রতি যেরূপ আচরণ করার হুকুম আছে, সেইরূপ করিও—তাহাতেই মঙ্গল হইবে।” রমাকে ফকির বলিল, “মা, তোমাকে কিছু ভীরু–স্বভাব বলিয়া বোধ হইতেছে। ফকিরের কথা মনে রাখিও; কোন বিপদে পড়িলে ভয় করিও না। ভয়ে বড় অমঙ্গল ঘটে; রাজার মহিষীকে ভয় করিতে নাই।”

 তার পর তিন জনে গৃহে গমন করিলেন।

 পৃ. ২৮, পংক্তি ৩-১৩, “ভূষণায় যে হাঙ্গামা·· স্থির করিলেন।” এই অংশের পরিবর্ত্তে ছিল— যাহারা তাঁহার সঙ্গে কারাগার হইতে পলায়ন করিয়াছিল, তাহারা সকলে ফৌজদারের কোপ দৃষ্টিতে পড়িবার আশঙ্কায়, ভূষণা এবং তাহার পার্শ্ববর্তী গ্রাম সকল পরিত্যাগ করিয়া, শ্যামপুরে তাঁহার নিকট আশ্রয় গ্রহণ করিল।

 পৃ. ২৯, পংক্তি ১২-১৩, “প্রকাশ্যে অস্ত্রধারী...উপস্থিত হয় নাই।” এই অংশের পরিবর্ত্তে ছিল— অস্ত্রধারী বা উৎসাহী ছিলেন না, ইহা ফৌজদার জানিত। কারাগার ভগ্ন করার নেতা যে তিনি, ইহা মুসলমান জানিতে পারে নাই। তিনি যে বন্দীর মধ্যে ছিলেন, তাহাও ফৌজদার অবগত হয়েন নাই

 পৃ. ২৯, পংক্তি ১৮, এই পংক্তির শেষে ছিল— আপাততঃ মুসলমানের সঙ্গে বিবাদ উপস্থিত হইলে, সকলই নষ্ট হইবে; অতএব যতদিন তিনি উপযুক্ত বলশালী না হয়েন, ততদিন কোন গোলযোগ না বাধে, ইহাই তাঁহার উদ্দেশ্য।

 পূ. ৩০, পংক্তি ১০-১৪, “এই সময়ে চাঁদ শাহ...“মহম্মদপুর”।” এই অংশ ছিল না।::::পংক্তি ১৭, এই “দশম” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “পঞ্চদশ” পরিচ্ছেদ।::::পংক্তি ২০-২২, “রমা বড় ছোট...ভয়ের বিষয়।” এই অংশ ছিল না।

 পৃ. ৩২, পংক্তি ২৩, “পতিপদসেবায় নিযুক্তা।” এই কথা কয়টির পর ছিল— লক্ষ্মীনারায়ণ জিউর মন্দিরে ফকির যে উপদেশ দিয়াছিলেন, নন্দা তাহা সম্পূর্ণরূপে রক্ষা করিতেছিলেন।

 পৃ. ৩৪, পংক্তি ১, এই “একাদশ” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “ষোড়শ” পরিচ্ছেদ।

 একাদশ, দ্বাদশ, ত্রয়োদশ ও চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদে “সন্ন্যাসিনী” কথাটির স্থলে প্রথম সংস্করণে “ভৈরবী” ছিল। কেবল ৪২ পৃষ্ঠার ৫ম পংক্তির “সন্ন্যাসিনী” কথাটি ঐরূপই ছিল।

 পৃ. ৩৪, পংক্তি ১৪, এই পংক্তির পাদটীকা-চিহ্নটি এবং নিম্নের পাদটীকাটি (পংক্তি ২৭) ছিল না।

 পৃ. ৩৬, পংক্তি ২৪, এই পংক্তির শেষে ছিল— শ্রী ভাবিল, “পুরুষ থাকিলে ভাবিত—এ ভৈরবীই বটে!”

 পৃ. ৩৬, পংক্তি ২৭, “আমি তাহা হইতে বলিতেছি না।” এই কথা কয়টির পর ছিল—আমিও যথার্থ ভৈরবী নই। আর

 পৃ. ৩৭, পংক্তি ১৮, “চন্দনের” কথাটির স্থলে “রক্ত চন্দনের” ছিল।:::পংক্তি ২১, এই “দ্বাদশ” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “সপ্তদশ” পরিচ্ছেদ।

  পৃ. ৩৯, পংক্তি ৮, এই “ত্রয়োদশ” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “অষ্টাদশ” পরিচ্ছেদ।

  পৃ. ৪১, পংক্তি ১৭, “ভবিষ্যৎ” কথাটির স্থলে “প্রারব্ধ” ছিল।

পংক্তি ২১, এই পংক্তিটি ছিল না।

  পৃ. ৪৩, পংক্তি ১, এই “চতুর্দ্দশ” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “উনবিংশ” পরিচ্ছেদ।

পংক্তি ১৯-২০, ১৯ পংক্তির শেষ হইতে, পর পংক্তির “আমার নাম জয়ন্তী” কথা কয়টির পূর্ব্ব পর্য্যন্ত নিম্নলিখিত অংশটি ছিল— তুমি সে দিন বলিয়াছিলে, তুমি প্রকৃত ভৈরবী নও। তুমি তবে কি?

  ভৈরবী! আমি বৈষ্ণবী। কিন্তু নেড়ার দলের বৈষ্ণবী নহি।

  শ্রী। আবার বৈষ্ণবী কেমনতর? বৈষ্ণবীর এ বেশ ত নয়।

  ভৈরবী। সে সকল রহস্য পরে জানিবে। এখন আমাকে বৈষ্ণবীই জানিও।

  পৃ. ৪৫, পংক্তি ২, “আকৌশল” কথাটির স্থলে “অকুশল” ছিল।

 এই পর্য্যন্ত পুস্তকের প্রথম খণ্ড।

  পৃ. ৪৬, পংক্তি ২, “জয়ন্তী” কথাটির স্থলে “ভৈরবী” ছিল।

  দ্বিতীয় খণ্ড—প্রথম পরিচ্ছেদের আরম্ভে প্রথম সংস্করণে নিম্নলিখিত অংশটি ছিল—

  সীতারামের হিন্দু সাম্রাজ্য সংস্থাপন করা হইল না; কেন না, তাহাতে তাঁহার আর মন নাই। মনের সমস্ত ভাগ হিন্দু সাম্রাজ্য যদি অধিকৃত করিত, তবে সীতারাম তাহা পারিতেন। কিন্তু শ্রী, প্রথমে হৃদয়ের তিলপরিমিত অংশ অধিকার করিয়া, এখন হৃদয়ের প্রায় সমস্ত ভাগই ব্যাপ্ত করিয়াছে। শ্রী যদি নিকটে থাকিত, অন্তঃপুরে রাজমহিষী হইয়া বাস করিত, রাজধর্ম্মের সহায়তা করিত, তবে প্রেয়সী মহিষীর যে স্থান প্রাপ্য, সীতারামের হৃদয়ে তাহার বেশী পাইবার সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু শ্রীর অদর্শনে বিপরীত ফল হইল। বিশেষ ঐ পরিত্যক্তা, উদাসীনী। বোধ হয় ভিক্ষা বৃত্তি অবলম্বন করিয়া দিনপাত করিতেছে, নয়ত কষ্টে মরিয়া গিয়াছে, এই সকল চিন্তায় সে হৃদয়ে শ্রীর প্রাপ্য স্থান বড় বাড়িয়া গিয়াছিল। ক্রমে ক্রমে তিল তিল করিয়া, শ্রী সীতারামের সমস্ত হৃদয় অধিকৃত করিল। হিন্দু সাম্রাজ্যের আর সেখানে স্থান নাই। সুতরাং হিন্দু সাম্রাজ্য সংস্থাপনের বড় গোলযোগ। শ্রীর অভাবে, সীতারামের মনে আর সুখ নাই, রাজ্যে সুখ নাই, হিন্দু সাম্রাজ্য সংস্থাপনেও আর সুখ নাই। কাজেই আর হিন্দু সাম্রাজ্য সংস্থাপন হয় না।

  পৃ. ৪৬, পংক্তি ১১-১৫, “শেষে সীতারাম···মন্দ উপস্থিত হইল।” এই অংশের পরিবর্ত্তে ছিল—

  তখন সীতারাম হিন্দু সাম্রাজ্যে জলাঞ্জলি দেওয়া স্থির করিলেন। একবার নিজে তীর্থে তীর্থে নগরে নগরে শ্রীর সন্ধান করিবেন। যদি শ্রীকে পান, ফিরিয়া আসিয়া রাজ্য করিবেন; না পান, সংসার পরিত্যাগ

পূর্ব্বক বৈরাগ্য আশ্রয় করিবেন। সীতারাম বিবেচনা করিলেন, “যে রাজধর্ম্ম আমি রীতিমত পালন করিতে, চিত্তের অস্থৈর্য্যবশতঃ সক্ষম হইয় উঠতেছি না, তাহাতে আর লিপ্ত থাকা লোকের পীড়ন মাত্র। নন্দার গর্তজ পুত্রকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়া, নন্দা ও চন্দ্রচূড়ের হাতে রাজ্য সমর্পণ করিয়া আমি স্বয়ং সংসার ত্যাগ করিব।”

 এ সকল কথা সীতারাম আপন মনেই রাখিলেন, মনের ভাব কাহারও কাছে ব্যক্ত করেন নাই। শ্রীর যে সন্ধান করিয়াছিলেন, তাহাও অতিশয় গোপনে এবং অপ্রকাশিত ভাবে। যাহারা শ্রীর সন্ধানে গিয়াছিল, তাহারা ভিন্ন আর কেহই জানিতে পারে নাই যে, শ্রীকে তাঁহার আজিও মনে আছে। -

 কেহ কিছু জানিতে না পারুক, তাঁহার মনের যে ভাবান্তর হইয়াছে, তাহা নন্দা ও রমা উভয়েই জানিতে পারিয়াছিল। নন্দা ভাব বুঝিয়া, কায়মনোবাক্যে ধর্ম্মতঃ মহিষীধর্ম্ম পালন করিয়া সীতারামের প্রফুল্লতা জন্মাইবার চেষ্টা করিত। অনেক সময়েই সফল হইত। কিন্তু রমা সকল সময়েই স্বামীর অনাস্থা ও অন্য মন দেখিয়া ক্ষুণ্ণ ও বিমর্ষ থাকিত; সীতারামের তাহা বিশেষ অপ্রতিকর হইত। রমা ভাবিত, “আর আমাকে ভাল বাসেন না কেন?” নন্দা ভাবিত, “তিনি ভাল বাসুন, না বাসুন, ঠাকুর করুন, আমার যেন কোন ক্রটি না হয়। তাহা হইলেই আমার সুখ।”

 শেষে সীতারাম, ভার্য্যাদ্বয় এবং চন্দ্রচূড় প্রভৃতি অমাত্যবর্গের নিকট প্রকাশ করিলেন যে, তিনি এ পর্য্যন্ত প্রকৃত রাজা হয়েন নাই; কেন না, দিল্লীর সম্রাটু তাঁহাকে সনদ দেন নাই। সনদ পাইবার অভিলাষ হইয়াছে। সেই অভিপ্রায়ে তিনি অচিরে দিল্লী যাত্রা করিবেন।

 সময়টা বড় অসময়। মহম্মদপুরে সীতারামের অধিকার নির্ব্বিঘ্নে সংস্থাপিত হইয়াছিল বটে। তোরাব খাঁ, রুষ্ট হইয়াও কোন বিরোধ উপস্থিত করে নাই। তাহার একটি বিশেষ কারণ ছিল। তখন বাঙ্গালার সুবেদার বিখ্যাত ব্রাহ্মণবংশজ পাপিষ্ঠ মুসলমান মুরশিদ কুলি খাঁ। তখনও বাঙ্গাল দিল্লীর অধীন। তোরাব খাঁ দিল্লীর প্রেরিত লোক, সেইখানে তাঁর মুরব্বীর জোর। সুবেদারের সঙ্গে তাঁহার বড় বনিবনাও ছিল না। এখন তিনি যদি বলে ছলে সীতারামকে ধ্বংস করেন, তবে সুবেদার কি বলিবেন? সুবেদার বলিতে পারেন, এ বেচারা নিরপরাধী, কিস্তি কিস্তি বিনা ওজর আপত্তি খাজানা দাখিল করে, বকেয়া বাকির ঝঙ্কাট রাখে না—ইহার উপর অত্যাচার কেন? তখন মুরশিদ কুলি খাঁ তাঁহাকে লইয়া একটা গোলযোগ বাধাইতে পারেন। তাই, সুবেদারের অভিপ্রায় কি, জানিবার জন্য তোরাব খাঁ, তাঁহার নিকট সীতারামের বৃত্তান্ত সবিশেষ লিখিয়া পাঠাইলেন। মুরশিদ কুলি খাঁ অতি শঠ। তিনি বিবেচনা করিলেন যে, এই উপলক্ষে তোরাব খাঁকে পদচ্যুত করিবেন। যদি তোরাব সীতারামকে দমন করেন, তাহা হইলে, মুরশিদ বলিবেন, নিরপরাধীকে নষ্ট করিলে কেন? যদি তোরাব তাহাকে দমন না করেন, তবে বলিবেন, বিদ্রোহী কাফেরকে দণ্ডিত করিলে না কেন? অতএব তোরাব যাহা হয় একটা করুক, তিনি কোন উত্তর দিবেন না। মুরশিদ কুলি কোন উত্তর দিলেন না, তোরাবও কিছু করিলেন না।

 কিন্তু বড় বেশী দিন এমন সুখে গেল না।

 পৃ. ৪৬, পংক্তি ২২, “অজ্ঞতা” কথাটির স্থলে “মূৰ্খতা” ছিল।

 পৃ. ৪৭, পংক্তি ২৬, এই পংক্তির শেষে ছিল—
সীতারামকেও জানাইলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে, এই সময়েই সীতারাম দিল্লী যাওয়ার প্রসঙ্গ উত্থাপন করিলেন।

 পৃ. ৪৭, পংক্তি ২৭-২৮, “ইহার সকল উদ্যোগ...যাত্রা করিলেন।” এই অংশের পরিবর্ত্তে ছিল—

 অসময় হইলেও তীক্ষবুদ্ধি চন্দ্রচূড় তাহাতে অসম্মত হইলেন না। তিনি বলিলেন, “যুদ্ধে জয় পরাজয় ঈশ্বরের হাত। প্রাণপাত করিয়া যুদ্ধ করিলে ফৌজদারকে পরাজয় করিতে পারিবেন, ইহা না হয় ধরিয়া লইলাম। কিন্তু ফৌজদারকে পরাজয় করিলেই কি লেঠা মিটিল! ফৌজদার পরাভূত হইলে সুবাদার আছে; সুবাদার পরাভূত হইলে দিল্লীর বাদশাহ আছে। অতএব যুদ্ধটা বাধাই ভাল নহে। এমন কোন ভরসা নাই যে, আমরা মুরশিদাবাদের নবাব বা দিল্লীর বাদশাহকে পরাভূত করিতে পারিব। অতএব দিল্লীর বাদশাহের সনন্দ ইহার ব্যবস্থা। যদি দিল্লীর বাদশাহ আপনাকে এই পরগণার রাজ্য প্রদান করেন, ফৌজদার কি সুবেদার, কেহই আপনার রাজ্য আক্রমণ করিবে না। হিন্দুরাজ্য স্থাপন, এক দিন বা এক পুরুষের কাজ নহে। মোগল রাজ্য এক দিনে বা এক পুরুষে স্থাপন হয় নাই। এই পত্তন মাত্র, বাঙ্গালার সুবেদার বা দিল্লীর বাদশাহের সঙ্গে বিবাদ হইলে, সব ধ্বংস হইয়া যাইবে। অতএব এখন অতি সাবধানে চলিতে হইবে। দিল্লীর সনন্দ ব্যতীত ইহার আর উপায় দেখি না, তুমি আজি দিল্লী যাত্রা কর। সেখানে কিছু খরচ পত্র করিলেই কার্য্য সিদ্ধ হইবে; কেন না, এখন দিল্লীর আমীর ওমরাহ, কি বাদশাহ স্বয়ং, কিনিবার বেচিবার সামগ্রী। তোমার মত চতুর লোক অনায়াসে এ কাজ সিদ্ধ করিতে পারিবে। যদি ইতিমধ্যে মুসলমান মহম্মদপুর আক্রমণ করে, তবে মৃন্ময় রক্ষা করিতে পারিবে, এমন ভরসা করি। মৃন্ময় যুদ্ধে অতিশয় দক্ষ, এবং সাহসী। আর কেবল তাহার বলবীর্য্যের উপর নির্ভর করিতে তোমাকে বলি না। আমার এমন ভরসা আছে যে, যত দিন না তুমি ফিরিয়া আস, তত দিন আমি ফৌজদারকে স্তোকবাক্যে ভুলাইয়া রাখিতে পারিব। তুমি দুই চারি মাসের জন্য আমার উপর নির্ভর করিয়া নিশ্চিন্ত থাকিতে পার। আমি অনেক কৌশল জানি।”

 এই সকল বাক্যে সীতারাম সন্তুষ্ট হইয়। সেই দিনই কিছু অর্থ এবং রক্ষকবর্গ সঙ্গে লইয়া দিল্লী যাত্রা করিলেন। নামে দিল্লী যাত্রা, কিন্তু কোথায় যাইবেন, তাহা সীতারাম ভিন্ন আর কেহই জানিত না।

 পৃ. ৫৩ পংক্তি ৬, এই পংক্তির শেষে ছিল—
ছাদের উপর হইতে লাফাইয়া পড়িতে হইবে? না আগুন খাইতে হইবে?

 পৃ. ৫৩ পংক্তি ৭, “স্ত্রীলোক।” কথাটির পর ছিল—
তার অপেক্ষাও কঠিন কাজ।

 পৃ. ৫৪, পংক্তি ১১, “রাখিয়েসে। এ কোন্?” এই কথা কয়টির স্থলে ছিল— রাখিয়াছি। এ কে?

 পৃ. ৫৪, পংক্তি ১৪, “মরদ্ যাতে পার্‌বে না। হুকুম নেহি।” এই কথা কয়টির স্থলে ছিল—
পুরুষ মানুষের যাইবার হুকুম নাই।

 পৃ. ৬০, পংক্তি ৩-৪, “এই গ্রন্থে তাহার প্রমাণ আছে।” এই কথাগুলি ছিল না।

 পৃ. ৬১, পংক্তি ২৩-২৪, “যে অপবিত্র,··· মুরলার কথা শুনিয়া” এই কথাগুলি ছিল না।

 পৃ. ৬৩ পংক্তি ৭, “অনেক দিন বাপ মা দেখি নাই।” এই কথাগুলির স্থলে ছিল— আমি জেতে কৈবর্ত্ত, বিবাহ আড়াইটা হইয়াছে, তাতে যদি তোমার আপত্তি না থাকে, তবে আমারও সাড়ে তিনটায় আপত্তি নাই।

 পৃ. ৬৪, পংক্তি ২৩, “না যাইব কেন?” এই কথাগুলির পূর্ব্বে ছিল—
এখানে ওখানে ঘুরিয়া বেড়ানই আমার কাজ—আমার অন্য কাজ নাই;

 পৃ.৬৪, পংক্তি ২৫, “প্রিয়প্রাণহন্ত্রী” কথাটির স্থলে “পতিপ্রাণহন্ত্রী” ছিল।

 পৃ. ৬৫, পংক্তি ১০, “জয়ন্তী মনে মনে বড় খুসী হইল।” এই কথাগুলির পর ছিল—
কথাগুলি শিষ্যার নিকট গুরুদক্ষিণার ন্যায় সাদরে গ্রহণ করিল। কিন্তু এখনও জয়ন্তীর কথা ফুরায় নাই।

 পৃ. ৬৬, পংক্তি ২, “সন্ন্যাসিনী” কথাটির স্থলে “ভৈরবী বা বৈষ্ণবীর শিষ্যা” ছিল।:::পংক্তি ৮-১১, “যতক্ষণ এই কথোপকথন···ত্রিশূল মন্ত্রপূত।*” এই অংশটি ছিল না। ফলে নিম্নের পাদটীকাটিও ছিল না।

 পৃ.৬৬, পংক্তি ১২,“দুই জনে ভৈরবীবেশ গ্রহণ করিল এবং” এই কথা কয়টি ছিল না।:::পংক্তি ২০, এই “নবম” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “দশম” পরিচ্ছেদ। এই পরিচ্ছেদের পুর্ব্বে নিম্নলিখিত পরিচ্ছেদটি ছিল—

নবম পরিচ্ছেদ

 রমা বাঁচিযা গেল, কিন্তু গঙ্গারাম বাঁচিল না। তখন গঙ্গারাম শয্যা লইল। রাজকার্য্য সকল বন্ধ করিল। সেও রমার মত স্থির করিল, বিষ খাইয়া মরিবে। কিন্তু রমাও বিষ খায় নাই, গঙ্গারামও বিষ খাইল না।

 চন্দ্রচূড় ঠাকুর জানিতে পারিলেন, নগর রক্ষার কাজ এ দুঃসময়ে, ভাল হইতেছে না, নগররক্ষক আদৌ দেখেন না। শুনিলেন, নগররক্ষক পীড়িত—শয্যাগত। তিনি নগররক্ষককে দেখিতে গেলেন। গঙ্গারাম বলিল, “দশ পাঁচ দিন আমায় অবসর দিন। আমার শরীর ভাল নহে—আমি এখন পারিব না।”

 চন্দ্রচূড়। শরীর ও উত্তম দেখিতেছি। বোধ হয় মন ভাল নহে। সেইরূপ দেখিতেছি।

 গঙ্গারাম বিছানায় পড়িয়া রহিল। বিছানায় পড়িয়া অন্তর্দাহ আরও বাড়িল— নিষ্কর্ম্মারই বড় অন্তর্দাহ। কাজ কর্ম্মই, অন্তরের রোগের সর্ব্বোৎকৃষ্ট ঔষধ।

 বিছানায় পড়িয়া শেষ গঙ্গারাম যাহা ভাবিয়া স্থির করিল, তাহা এই।

 “ধর্ম্মে হৌক, অধর্ম্মে হৌক, আমার রমাকে পাইতে হইবে। নহিলে মরিতে হইবে।

 তা, মরি, তাতে আপত্তি নাই, কিন্তু রমাকে না পাইয়া মরাও কষ্ট। কাজেই মরা হইবে না, রমাকে পাইতে হইবে।

 ধর্ম্মপথে, পাইবার উপায় নাই। কাজেই অধর্ম্মপথে পাইতে হইবে। ধর্ম্ম যে পারে, সে করুক, যে পারিল না, সে কি প্রকারে করিবে?”

 গঙ্গারামের যে ভুল হইল, অধার্ম্মিক লোক মাত্রেরই সেইটি ঘটিয়া থাকে। তাহারা মনে করে, ধর্ম্মাচরণ পারিয়া উঠিলাম না, তাই অধর্ম্ম করিতেছি। তাহা নহে; ধর্ম্ম যে চেষ্টা করে, সেই করিতে পারে। অধার্ম্মিকেরা চেষ্টা করে না, কাজেই পারে না।

 গঙ্গারাম তার পর ভাবিয়া ঠিক করিতে লাগিল—

 “অধর্ম্মের পথে যাইতে হইবে—কিন্তু তাই বা পথ কই? রমাকে হস্তগত করা কঠিন নহে। আমি যদি আজ বলিয়া পাঠাই যে, কাল মুসলমান আসিবে, আজ বাপের বাড়ী যাইতে হইবে, তাহা হইলে সে এখনই চলিয়া আসিতে পারে। তার পর যেখানে লইয়া যাইব, কাজেই সেইখানে যাইতে হইবে। কিন্তু নিয়া যাই কোথায়? সীতারামের এলাকায় ত একদিনও কাটিবে না। সীতারাম ফিরিয়া আসিবার অপেক্ষা সহিবে না। এখনই চন্দ্রচূড় আমার মাথা কাটিতে হুকুম দিবে, আর মৃণ্ময় আমার মাথা কাটিয়া ফেলিবে। কাজেই সীতারামের এলাকার বাহিরে, যেখানে সীতারাম নাগাল না পায়, সেইখানে যাইতে হইবে। সে সবই মুসলমানের এলাকা। মুসলমানের ত আমি ফেরারি আসামী—যেখানে যাইব, সম্বাদ পাইলে আমাকে সেইখান হইতে ধরিয়া লইয়া গিয়া শূলে দিবে। ইহার কেবল এক উপায় আছে—যদি তোরাব খাঁর সঙ্গে ভাব করিতে পারি। তোরাব খাঁ অনুগ্রহ করিলে, জীবনও পাইব, রমাও পাইব। ইহার উপায় আছে।”

 পৃ. ৬৬, পংক্তি ২২, “খসম” কথাটির স্থলে “পতি” ছিল।:::পংক্তি ২৩, “দোস্ত” কথাটির স্থলে “উপপতি” ছিল।

 পৃ. ৬৭, পংক্তি ১১-১৪, “গঙ্গারামের সৌভাগ্যক্রমে···তোরাব্” এই অংশের পরিবর্ত্তে ছিল—

 বন্দেআলি সেখকে এই সকল কথা বলিতে বলিয়া দিয়া, গঙ্গারাম বলিলেন, “লিখিত উত্তর লইয়া আইস।”

 বন্দেআলি বলিল, “আমার কথায় ফৌজদার সাহেব বিশ্বাস করিয়া খত দিবেন কেন?”

 গঙ্গারাম বলিল, “পত্র লিখিতে আমার সাহস হয় না। আমার এই মোহর লইয়া যাও। আমার মোহর তোমার হাতে দেখিলে তিনি অবশ্য বিশ্বাস করিবেন।”

 বন্দেআলি মোহর লইয়া ভূষণায় গেল। ফৌজদারিতে তার চেনা লোক ছিল। ফৌজদারী সরকারে, কারকুন দপ্তরের বখশী চেরাগ আলির সঙ্গে তাহার দোস্তী ছিল। বন্দেআলি চেরাগ আলিকে ধরিল যে, ফৌজদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়া দাও, আমার বিশেষ জরুরী কথা আছে। বখশী গিয়া কারকুনকে ধরিল, কারকুন পেস্কারকে ধরিল, পেস্কার সাক্ষাৎ করাইয়া দিল।

 গঙ্গারাম যেমন যেমন বলিয়া দিয়াছিলেন, বন্দেআলি অবিকল সেই রকম বলিল। লিখিত উত্তর চাহিল। তোরাব খাঁ কিছুক্ষণ চিন্তা করিলেন। বুঝিলেন যে, গঙ্গারাম ত হাতছাড়া হইয়াইছে—এখন তাহাকে মাফ করায় কোন ক্ষতি হইতে পারে না। অতএব

 পৃ. ৬৭, পংক্তি ১৭, “সেও পার হইতেছিল।” এই কথা কয়টির পূর্ব্বে ছিল—
যাহার সঙ্গে পাঠকের মন্দিরে পরিচয় হইয়াছিল,—

 পৃ. ৬৭, পংক্তি ২৪, এই “দশম” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “একাদশ” পরিচ্ছেদ।

 পৃ. ৬৮,পংক্তি ২৫-২৭, “গঙ্গারাম অভীষ্ট··· অনুবর্ত্তী হইয়াছিল।” এই অংশের পরিবর্ত্তে ছিল—

 গঙ্গা। নলদী পরগণা আমাকে দিবেন।

 ফৌজদার। মহম্মদপুর আর হিন্দুর হাতে রাখিব না। কিন্তু তুমি যদি চাও, তবে তোমাকে এখানে শিপাহশালার করিতে পারি। আর টাকা ও গ্রাম দিতে পারি।

 গঙ্গারাম। তাহাই যথেষ্ট। কিন্তু আর এক ভিক্ষা আছে। সীতারামের দুই মহিষী আছে।

 ফৌজ। তাহারা নবাবের জন্য। তাহাদের পাইবে না।

 গঙ্গা। জ্যেষ্ঠাকে মুরশিদাবাদে পাঠাইবেন। কনিষ্ঠাকে নফরকে বখশিষ করিবেন।

 ফৌজদার তামাসা করিয়া বলিলেন, “তুমি সীতারামের স্ত্রী নিয়া কি করিবে? সীতারাম যেন মরিল, কিন্তু তবু ত হিন্দুর মাঝে বিধবার বিবাহ নাই। যদি মুসলমান হইতে, তবে বুঝিতাম যে, তুমি রাণীকে নেকা করিতে পারিতে।”

 গঙ্গারাম ভাবিল, এ পরামর্শ মন্দ নহে। যদি নিজে মুসলমান হইয়া, রমাকে ফৌজদারের সাহায্যে মুসলমান করিয়া নেকা করিতে পারে, তবে সীতারাম জীবিত থাকিলে, আর কোন দাবী দাওয়া করিতে পারিবে না। গঙ্গারাম নির্ব্বিঘ্নে রমাকে ভোগ দখল করিতে পারিবে। অতএব ফৌজদারকে বলিল, “মুসলমান ধর্ম্মই সত্য ধর্ম্ম, এইরূপ আমি ক্রমে বুঝিতেছি। মুসলমান হইব, আমি এখন স্থির করিয়াছি। কিন্তু রমাকে না পাইলে মুসলমান হইব না।”

 ফৌজদার হাসিয়া বলিলেন, “রমা কে? সাঁতারামের কনিষ্ঠ ভার্য্যা? সে নহিলে, যদি তোমার পরকালের গতি না হয়, তবে অবশ্য তুমি যাহাতে তাহাকে পাও, তাহা আমি করিব। সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাক। কিন্তু আর একটা কথা, সীতারামের অনেক ধনদৌলত পোতা আছে না?”

 গঙ্গা। শুনিয়াছি, আছে।

 তোরাব খাঁ। তাহা তুমি দেখাইয়া দিবে?

 গঙ্গা। কোথায় আছে, তাই আমি জানি না।

 তোরাব খাঁ। সন্ধান করিতে পারিবে?

 গঙ্গা। এখন করিতে গেলে লোকে আমায় অবিশ্বাস করিবে।

 তোরাব খাঁ আর কিছুই বলিলেন না।

 তখন সন্তুষ্ট হইয়া গঙ্গারাম বিদায় হইল। এবং সেই রাত্রেই মহম্মদপুর ফিরিয়া আসিল।

 গঙ্গারাম জানিত না যে, চাঁদশাহ ফকির তাহার অনুবর্ত্তী হইয়াছিল। চাঁদশাহ ফকির পরদিন নিভৃতে চন্দ্রচূড়ের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া বলিল, “আহ্লাদের সম্বাদ আপনাকে দিতে আসিয়াছি। ইসলামের জয় হইবে।”

 চন্দ্রচূড় জানিতেন, চাঁদশাহের কাছে হিন্দু মুসলমান এক—সে কোন পক্ষে নহে—ধর্ম্মের পক্ষ এবং সীতারামের পক্ষ। অতএব এ কথার কিছু মর্ম্ম বুঝিতে না পারিয়া, জিজ্ঞাসা করিলেন, “ব্যাপার কি?”

 চাঁদশাহ। হিন্দুরাও ইসলামের পক্ষ।

 চন্দ্রচুড়। কোন কোন হিন্দু বটে।

 চাঁদ। আপনারাও।

 চন্দ্র। সে কি?

 চাঁদ। মনে করুন, নগরপাল গঙ্গারাম দাস।

 চন্দ্র। গঙ্গারাম খাটি হিন্দু—রাজার বড় বিশ্বাসী।

 চাঁদ। তাই কাল রাত্রে ভূষণায় গিয়া তোরাব খাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়া আসিয়াছে।

 চন্দ্র। আঁ? না, মিছে কথা।

 চাঁদ। আমি সঙ্গে সঙ্গে গিয়াছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে ফিরিয়া আসিয়াছি।

 এই বলিয়া চাঁদশাহ সেখান হইতে চলিয়া গেল। চন্দ্রচূড় স্তম্ভিত হইয়া বসিয়া রহিলেন–তাঁহার তেজস্বিনী বুদ্ধি যেন হঠাৎ নিবিয়া গেল।

 পৃ. ৬৯, পংক্তি ১, এই “একাদশ" পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “দ্বাদশ” পরিচ্ছেদ।

 পংক্তি ২, “সন্ধ্যার পর গুপ্তচর” এই কথাগুলির পূর্ব্বে ছিল—

 কালে বুদ্ধি ফিরিয়া আসিলে চন্দ্রচূড় ভাবিতে লাগিলেন, “ইহার বিহিত কি কর্ত্তব্য? এখন গঙ্গারামকে পদচ্যুত করিয়া আবদ্ধ করা ভিন্ন উপায় নাই। কিন্তু তাহাকে পদচ্যুত বা কারাবদ্ধ করিব কি প্রকারে? সে যদি না মানে? নগর সিপাহী সবই ত তার হাতে। সে আমারে উলটিয়া কারাবদ্ধ করিতে পারে। মৃণ্ময়ের সাহায্য ভিন্ন তাহাকে আবদ্ধ করিতে পারিব না-কিন্তু যদি গঙ্গারাম অবিশ্বাসী, তবে মৃণ্ময়কেই বা বিশ্বাস কি? তবে সাবধানের মার নাই-সতর্ক থাকাই ভাল। বিপদ্ ঘটে, তখন নারায়ণ সহায় হইবেন। এখন প্রথমতঃ গঙ্গারামের মন বুঝিয়া দেখিতে হইবে।” এইরূপ ভাবিয়া চন্দ্রচূড় তখন আর কাহারও সাক্ষাতে কোন কথা প্রকাশ করিলেন না। পরে

 পৃ. ৬৯, পংক্তি ৬, এই পংক্তির পর নিম্নলিখিত অংশটি ছিল—

 চন্দ্রচূড় বলিলেন, “আমার বিবেচনায়, গঙ্গারামও দ্বিতীয় সেনাপতি হইয়া মৃণ্ময়ের সাহায্যার্থ যাওয়া ভাল।”

 গঙ্গারাম চুপ করিয়া রহিল—দেখিতেছে, মৃন্ময় কি বলে।

 মৃন্ময়ের একটু রাগ হইয়াছে—আমি কি এক লড়াই পারি না যে—আমার সঙ্গে আবার গঙ্গারাম! অতএব মৃন্ময় রুষ্টভাবে বলিল, “তা চলুন না—বেশ ত!”

 গঙ্গারাম তখন বলিল, “আমি যাব ত নগর রক্ষা করিবে কে?”

 চন্দ্র। মৃন্ময় না হয় সে জন্য এক জন ভাল লোক রাখিয়া যাইবেন।

 গঙ্গা। নগর রক্ষার জন্য রাজার কাছে জবাবদিহি আমাকে করিতে হইবে। অতএব আমি নগর ছাড়িয়া কোথাও যাইব না।

 চন্দ্র। আমি নগর রক্ষা করিব।

 গঙ্গা। করিবেন। কিন্তু আমার উপর যে কাজের ভার আছে, তাহা আমি করিব।

 তখন চন্দ্রচূড় মনে মনে বড় সন্ধিগ্ধ হইলেন। প্রকাশ্যে বলিলেন, “যাহা তোমরা ভাল বুঝ— তাই করিও।”

 পৃ. ৬৯, পংক্তি ২৫, “জগতের বন্ধু” কথা দুইটির স্থলে “জগৎপিতা” ছিল।

 পৃ. ৭১, পংক্তি ১, এই “দ্বাদশ” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “ত্রয়োদশ” পরিচ্ছেদ।

পংক্তি ৪, “তখন তিনি” কথা দুইটির পরই ছিল—

কোন কৌশলে গঙ্গারামকে আবদ্ধ না করিয়া এই সর্ব্বনাশ উপস্থিত করিয়াছেন, নিশ্চয় বুঝিয়া,

 পৃ. ৭১, পংক্তি ৫-৭, “এমন সময়ে···শিহরিয়া উঠিলেন।” এই অংশটি ছিল না।

পংক্তি ১৭, “ও” কথাটির স্থলে “শ্রী।” ছিল।  পৃ ৭২, পংক্তি ৯, এই “ত্রয়োদশ” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “চতুর্দশ" পরিচ্ছেদ।

 পংক্তি ১৮, এই পংক্তির পর ছিল—

 মুরলার সঙ্গে কথা কহিয়াছিল শ্রী। গঙ্গারামের কাছে আসিয়াছে, জয়ন্তী একা। কি জানি, যদি গঙ্গারাম চিনিতে পারে, এজন্য ঐ গৃহমধ্যে প্রবেশ করে নাই।

 পৃ. ৭৩, পংক্তি ২৪, এই পংক্তির পর ছিল—

 পুরুষ। কোথা পাইব? আপনাকে ত কোন দেবীর মত বোধ হইতেছে। ৰলি কি, কোথায় তা পাইব? এই পুরীমধ্যে কি পাইৰ?

 জয়ন্তী। তাই পাইবেন।

 পু। কবে পাইব?

 জয়ন্তী। তাহার কিছু বিলম্ব আছে।

 পৃ. ৭৪, পংক্তি ১, এই “চতুর্দশ” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “পঞ্চদশ” পরিচ্ছেদ।

 পৃ. ৭৫, পংক্তি ৮, “এখন সর্ব্বনাশ হইল।” এই কথা কয়টির পূর্ব্বে ছিল— কেন ফকিরের কথায় সতর্ক হইলাম না!


 পৃ. ৭৭, পংক্তি ১২, এই “পঞ্চদশ” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “ষোড়শ" পরিচ্ছেদ।

 পৃ ৮০, পংক্তি ৭, এই “ষোড়শ" পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “সপ্তদশ পরিচ্ছেদ।


 পৃ. ৮২, পংক্তি ১, এই “সপ্তদশ” পরিচ্ছেদটি প্রথম সংস্করণের “অষ্টাদশ" পরিচ্ছেদ।

 পংক্তি ৪, “জয়ন্তী।” কথাটির পর ছিল—

তোমাকে পাইলে তিনি যতদূর সুখী হইবেন, এত আর কিছুতেই না। তবে তাঁহাকে তুমি সুখী না করিবে কেন?

 শ্রী! তুমি ত আমাকে শিখাইয়াছ যে, চিত্তবৃত্তির নিরোধই যোগ।

 জয়ন্তী। মনোবৃত্তি সকলের আত্মবশ্যতাই ৰোগ। তাহাৰি তুমি লাভ করিতে পার নাই?

 শ্রী। আমার কথা হইতেছে না।

 জয়ন্তী। যাঁহার কথা হইতেছে, তাঁহাকে তুমি এই পথে জানিতে পরিবে। সেই জন্যই সাক্ষাতের বিশেষ প্রয়োজন।

 পৃ. ৮২, পংক্তি ১৬, এই পংক্তির পর ছিল—

 জয়ন্তী। আমি ষে রাজার কাছে প্রতিশ্রুভ আছি যে, তোমাকে দেখাইব।

 শ্রী। কিছু দিন এইখানে থাকিয়া বিচার করিয়া দেখা যাক্, দুই দিক্‌ বজায় রাখা যায় কি না।

 এই পর্যন্ত দ্বিতীয় খণ্ড।

 পৃ: ৮৬, পংক্তি ২৮, এই পংক্তির শেষে ছিল —
তাই দরবারে আরও অনিচ্ছুক ছিলেন। তবে রাজা রাজপুরুষেরা সকল কথা ভাঙ্গিয়া বলেন না—এই জন্য তিনি নন্দাকে কেবল আব্রু পরদার কথা বলিয়া ভুলাইয়াছিলেন।

 পৃ. ৮৭, পংক্তি ১০, “শ্বেতমর্ম্মরনির্ম্মিত” কথাটি ছিল না।

 পৃ. ৯১, পংক্তি ১০, “কিছুই ছাড়িল না” কথা কয়টির পর ছিল—
—আড়াইটা বিবাহের ব্যঙ্গটাও ছাড়িল না। শুনিয়া বাহিরের দর্শকমণ্ডলী মধ্যে অস্ফুট স্বরে কেহ কেহ বলিল, “আয়ি, আমি রাজি।” কেহ বা বলিল, “মাসী, আমার খুড়ো রাজি।”

 পৃ. ৯৪, পংক্তি ১৪, “খণ্ড খণ্ড করিয়া” কথা কয়টির স্থলে “মারিয়া” ছিল।

 পৃ: ৯৫, পংক্তি ১২, “মন্ত্রপূত” কথাটি ছিল না।

 পৃ. ৯৬, পংক্তি ৭, এই পংক্তির শেষে ছিল—
অনেকেই মুরলাকে জিজ্ঞাসা করিল, “আয়ি, আড়াইটার উপর সাড়ে তিনটা হয় না?” মুরলারও লজ্জা নাই—সে উত্তর দিল, “হয়—তোর বাবাকে ডেকে আন্‌গে যা—”

 পৃ. ৯৭, পংক্তি ১১, “একটা” কথাটির স্থলে “প্রধান” ছিল।

পংক্তি ১৩, “এত লোক... ফুরাইল না।” এই অংশের পরিবর্তে ছিল—

অসংখ্য দীন, বিপন্ন, এবং লোভী লোক আসিয়া দুর্গ পরিপূর্ণ করিল—তাহাদিগের জয় জয় শব্দে উচ্চ প্রাসাদ সকল চারিদিক্‌ হইতে প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। রাজপুরুষেরা একে একে ভিক্ষুকদিগকে সীতারামের সিংহাসন সন্নিধানে আনিল, তিনি তাহাদিগকে উপযুক্ত দান করিতে বা করাইতে লাগিলেন— তখন রাজপুরুষেরা দ্বারান্তর দিয়া তাহাদিগকে বিদায় করিয়া দিল। যে টাকা চাহিল, সে টাকা পাইল, যে সোণা চাহিল, সে সোণা পাইল, যে তৈজস চাহিল, সে তৈজস পাইল, যে বনাত চাহিল, সে বনাত পাইল, যে শাল চাহিল, সে শাল পাইল, যে ভূমি চাহিল, সে ভূমি পাইল।

 পৃ. ৯৮, পংক্তি ২৪-২৫, “আমি যাহা খুঁজি,...আমাকে দিন” এই কথাগুলির পরিবর্ত্তে ছিল—
আমার জীবন একদিন আমায় দান করিবেন। যে অমূল্য সামগ্রী আমাকে দিবেন বলিয়াছিলেন

 পৃ. ৯৮, পংক্তি ২৭-২৮, এই দুই পংক্তি ছিল না।

 পৃ. ১৯, পংক্তি ১-৪, এই চারি পংক্তি ছিল না।

পংক্তি ৬-৭, “কাণা কড়ির বিনিময়ে রত্নাকর?” এই কথা কয়টির পরিবর্ত্তে ছিল—

কাণা কড়ি লইয়া কি রত্নাকর বেচিব?  পৃ. ১০১, পংক্তি ৫, “জিজ্ঞাসা করিল” এই কথা দুইটির পূর্ব্বে ছিল—
যখন বেড়ী প্রায় খোলা হইয়াছে—তখন গঙ্গারাম জয়ন্তীকে

 পৃ. ১০৭, পংক্তি ৭, “মূর্ত্তিমতী শোভা” কথা দুইটির স্থলে “সৌন্দর্য মূর্ত্তিমতী” ছিল।::::পংক্তি ১৪-১৫, “শ্রী হইতে সীতারামের সর্ব্বনাশ হইল।” এই কথা কয়টি ছিল না।

 পৃ. ১০৯, পংক্তি ৭, “মুসলমানের” এই কথাটির স্থলে “নেড়ের” ছিল।

 পৃ. ১১৬, পংক্তি ১৬, “বাসিতেন” কথাটির পর ছিল—
তা বলিয়াছি

 পৃ. ১১৮, পংক্তি ২৩, “টাকার অভাবে তেমনই রোমক সাম্রাজ্য” এই কথা কয়টির পূর্ব্বে ছিল—
টাকার অভাবে যেমন নফরা হাড়ি না খাইয়া মরিল,

 পৃ. ১২২, পংক্তি ১৮-২০, “পাঁচ বৎসর ধরিয়া···ইহাতেই সীতারামের” এই কথাগুলির পরিবর্ত্তে ছিল—
এতেই ত

 পৃ. ১২৬, পংক্তি ৫-৬, “রাজার এমন কোন··· করিতে পারে?” এই কথাগুলির পরিবর্ত্তে ছিল—
এমন সম্বাদ পাইয়াছ কি যে, রাজাদিগের এমন কোন ক্ষমতা আছে যে, আমার অনিষ্ট করিতে পারে?

 পৃ. ১২৮, পংক্তি ২৩, “সন্ধান পেলে না” কথা কয়টির স্থলে “পারলে না” ছিল।

 পৃ. ১৩০, পংক্তি ২৪, “সিংহব্যাস্ত্রবিমর্দ্দিত” কথাটির স্থলে “সিংহব্যাঘ্র বিক্রান্ত” ছিল।
এই অষ্টাদশ পরিচ্ছেদে “চণ্ডাল” কথাটির স্থলে সর্বত্র “চাণ্ডাল” ছিল।

 পৃ. ১৩২, পংক্তি ২, “প্রবাহিত” কথাটির স্থলে “প্রতিহত” ছিল।::::পংক্তি ১৬, “রাজার নাম” কথা দুইটির স্থলে “রাজা নাম” ছিল।

 পৃ. ১৪৯, পংক্তি ২৩, “দেবীমূর্ত্তি” কথাটির স্থলে “দৈবী মূর্ত্তি” ছিল।

 পৃ. ১৫১, পংক্তি ১১, “বৈরিশূন্য” কথাটির স্থলে “আপদ্‌শূন্য” ছিল।

 পৃ. ১৫২, পংক্তি ২৫, “গোলন্দাজ হইয়া আসিয়াছিল” এই কথা কয়টির পর ছিল—
সন্দেহ নাই  পৃ. ১৫২, পংক্তি ২৬ “যাইবে না মনে করিয়া থাকিবে” এই কথা কয়টির স্থলে ছিল— যাইত না

 পৃ. ১৫৪, পংক্তি ২১, এই পংক্তির শেষে ছিল—

এবং সর্ব্বফলদাতার নিকট প্রার্থনা করি যে, পাঠকেরা সীতারামের দুষ্কর্ম এবং শ্রীর অকর্ম্ম হইতে বিরত হইয়া জয়ন্তীর কর্ম্মানুকারী হউন।

 এখন, যাও জয়ন্তী! প্রফুল্লের পাশে গিয়া দাঁড়াও। প্রফুল্ল গৃহিণী, তুমি সন্ন্যাসিনী। দুই জনে একত্রিত হইয়া সনাতন ধর্ম্ম সম্পূর্ণ কর।

  1. হিন্দিতে স্থানবিশেষে য y মত ও ব w মত উচ্চারিত হইবে।