বিষয়বস্তুতে চলুন

সীতার বনবাস (ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ১৮৯৭)/অষ্টম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

অষ্টম পরিচ্ছেদ।

মহর্ষি বাল্মীকি, রামচরিত অবলম্বন করিয়া, অতি অদ্ভুত কাব্যের রচনা করিয়াছেন; তাঁহার দুই কোকিলকণ্ঠ তরুণবয়স্ক শিষ্য, অতি মধুর স্বরে, সেই কাব্যের গান করে; কল্য প্রভাতে, তাহারা রাজসভায় গান করিবে; এই সংবাদ নৈমিষাগত ব্যক্তি মাত্রেই অবগত হইয়াছিলেন। রজনী অবসন্না হইবামাত্র, কি ঋষিগণ, কি নৃপতিগণ, কি অপরাপর নিমন্ত্রিতগণ, সকলেই, সঙ্গীতশ্রবণলালসার বশবর্ত্তী হইয়া, সাতিশয় ব্যগ্রচিত্তে, রাজসভায় উপস্থিত হইতে লাগিলেন। সে দিবসের সভায় সমারোহের সীমা ছিল না। রামচন্দ্র রাজসিংহাসনে উপবেশন করিলেন। ভরত, লক্ষ্মণ, শত্রুঘ্ন, এবং সুগ্রীব, বিভীষণ আদি সুহৃদ্বর্গ, তাঁহার বামে ও দক্ষিণে, যথাযোগ্য আসনে আসীন হইলেন। কৌশল্যা, কেকয়ী, সুমিত্রা, উর্ম্মিলা, মাণ্ডবী, শ্রুতকীর্ত্তি প্রভৃতি রাজপরিবার, অরুন্ধতী প্রভৃতি ঋষিপত্নীগণ সমভিব্যাহারে, পৃথক্ স্থানে অবস্থিত হইলেন।

 এই রূপে রাজসভায় সমবেত হইয়া, সমস্ত লোক অভিনব কাব্যের ও সুকুমার গায়কযুগলের কথা লইয়া আন্দোলন ও নিতান্ত উৎসুক চিত্তে তাহাদের আগমন প্রতীক্ষা করিতেছেন; এমন সময়ে, মহর্ষি বাল্মীকি, কুশ ও লব সমভিব্যাহারে, সভাদ্বারে উপস্থিত হইলেন। দেখিবামাত্র, সভামণ্ডলে মহান কোলাহল উত্থিত হইল। যাঁহারা, পূর্ব্ব দিন, কুশ ও লবকে দেখিয়াছিলেন, তাঁহারা, অঙ্গুলিনির্দেশ করিয়া, স্বসমীপে উপবিষ্ট ব্যক্তিদিগকে তাহাদের দুই সহোদরকে দেখাইতে লাগিলেন। বাল্মীকি সভামণ্ডপে প্রবেশ করিবামাত্র, সভাস্ত সমস্ত লোকে, এককালে গাত্রোত্থান করিয়া, তাঁহার সংবর্দ্ধনা করিলেন। মহর্ষি ও তাঁহার দুই শিষ্যের নিমিত্ত পৃথক স্থান স্থিরীকৃত ছিল; তাঁহারা তথায় উপবিষ্ট হইলেন। সকলেই, সঙ্গীত শ্রবণের নিমিত্ত নিতান্ত অধৈর্য্য হইয়া, একান্ত উৎসুক চিত্তে; কখন আরম্ভ হয়, এই প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন।

 কিয়ৎ ক্ষণ পরে, বাল্মীকি, সভার সর্ব্বাংশে নয়নসঞ্চারণ করিয়া, রামচন্দ্রকে বলিলেন, মহারাজ; সকলেই শ্রবণের নিমিত্ত উৎসুক হইয়াছেন; অতএব অনুমতি করুন, সঙ্গীতের আরম্ভ হউক। অনন্তর, তদীয় আদেশ অনুসারে, কুশ ও লব বীণাযন্ত্রসহযোগে সঙ্গীতের আরম্ভ করিল। বাল্মীকি পূর্ব্বেই কুশ ও লবকে শিখাইয়া রাখিয়াছিলেন, রামায়ণের যে সকল অংশে রামের ও সীতার পরপর স্নেহ ও অনুরাগ বর্ণিত আছে, তোমরা অদ্য ঐ সকল অংশেরই গান করিবে। তদনুসারে তাহারা কিয়ৎ ক্ষণ গান করিবামাত্র, রামের হৃদয় দ্রবীভূত হইল; তদীয় নয়নযুগল হইতে, প্রবল বেগে, বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল। তিনি তাহাদের দুই সহোদরকে যত দেখিতে লাগিলেন, ততই, তাহারা সীতার তনয় বলিয়া, তাঁহার হৃদয়ে দৃঢ় প্রতীতি জন্মিতে লাগিল। ভরত, লক্ষণ, শত্রুঘ্ন ইঁহারাও, তাহাদের কলেবরে রামের ও সীতার সৌসাদৃশ্য প্রত্যক্ষ করিয়া, মনে মনে নানা বিতর্ক করিতে লাগিলেন। ইহা ব্যতিরিক্ত, সভাস্থ সমস্ত লোক, একবাক্য হইয়া, বলিতে লাগিলেন, কি আশ্চর্য্য! এই দুই ঋষিকুমার যেন রামচন্দ্রের প্রতিকৃতিস্বরূপ; যদি বেশে ও বয়সে বৈষম্য না থাকিত, তাহা হইলে, রামে ও এই দুই ঋষিকুমারে কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য লক্ষিত হইত না। বোধ হয়, যেন রাম, কুমারবয়স অবলম্বন পূর্ব্বক দুই মূর্ত্তি ধরিয়া, ঋষিকুমারের বেশপরিগ্রহ করিয়াছেন। এই বয়সে, রামের যেরূপ আকৃতি ও রূপ লাবণ্যের যেরূপ মাধুরী ছিল, ইহাদের অবিকল সেইরূপ লক্ষিত হইতেছে। যাহা হউক, সভাস্থ সমস্ত লোক, মোহিত ও নিস্পন্দ ভাবে অবস্থিত হইয়া, একতান মনে সঙ্গীতশ্রবণ, ও অনিমিষ নয়নে তাহাদের রূপনিরীক্ষণ, করিতে লাগিলেন।

 কিয়ৎ ক্ষণ পরে, রামচন্দ্র লক্ষ্মণকে বলিলেন, বৎস, ইহাদিগকে সহস্র সুবর্ণ পুরস্কার দাও। তাহারা, শ্রবণমাত্র, বিনয়নম্র বচনে বলিল, মহারাজ, আমরা বনবাসী, বিলাসী বা ভোগাভিলাষী নহি; যদৃচ্ছালব্ধ ফল মূল মাত্র আহার ও বল্কল মাত্র পরিধান করিয়া কালযাপন করি, আমাদের সুবর্ণে প্রয়োজন কি। আমরা, অনেক যত্নে, অনেক পরিশ্রমে, আপনকার চরিত কণ্ঠস্থ করিয়াছিলাম; আজ আপনকার সমক্ষে তাহার পরিচয় দিয়া, আমাদের সেই যত্ন ও সেই পরিশ্রম সর্ব্বতোভাবে সার্থক হইল। আপনি শ্রবণ করিয়া যে প্রীত ও প্রসন্ন হইয়াছেন, তাহাতেই আমরা চরিতার্থ হইয়াছি। বালকদিগের এইরূপ প্রবীণতা ও বীতস্পৃহতা দর্শনে, সকলে এককালে চমৎকৃত হইলেন।

 কিয়ৎ ক্ষণ অবিচলিত নয়নে নিরীক্ষণ করিয়া, কুশ ও লব সীতার তনয় বলিয়া, কৌশল্যার অন্তঃকরণে দৃঢ় প্রতীতি জন্মিল। তখন তিনি, নিতান্ত অস্থিরচিত্ত হইয়া, দীর্ঘ নিশ্বাস সহকারে, হা বৎসে জানকি! ইহা বলিয়া, ভূতলে পতিত ও মূর্চ্ছিত হইলেন। সকলে, একান্ত বিকলান্তঃকরণ হইয়া, অশেষ যত্নে তাঁহার চৈতন্যসম্পাদন করিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ সঙ্গীত শ্রবণ করিয়া, সকলেরই হৃদয়ে সীতার শোক এত প্রবল ভাবে উদ্ভূত হইয়া উঠিল যে, সকলেই নিতান্ত অস্থির হইলেন, এবং অবিরল ধারায় বাষ্পবারিবিমোচন ও মুহুর্মুহুঃ দীর্ঘনিশ্বাসপরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। কৌশল্যা, নিরতিশয় অধীরা হইয়া, উন্মত্তার ন্যায় বলিতে লাগিলেন, ঐ দুই কুমারকে কেহ আমার নিকটে আনিয়া দাও; ক্রোড়ে লইয়া, এক বার আমি উহাদের মুখচুম্বন করিব; আমার জানকীর তনয়; উহাদিগকে দেখিয়া, আমার প্রাণ কেমন করিতেছে; হয় তোমরা উহাদিগকে আমার নিকটে আনিয়া দাও, নয় আমি উহাদের নিকটে যাই; ক্রোড়ে লইয়া, এক বার উহাদের মুখচুম্বন করিলে, আমার জানকীশোকের অনেক নিবারণ হইবে। ঐ দেখ না, উহাদের অবয়বে আমার রামের ও জানকীর সম্পূর্ণ লক্ষণ লক্ষিত হইতেছে। উহারা সভায় প্রবেশ করিবামাত্র, যেন কেহ আমায় বলিয়া দিল, ঐ তোমার রামের দুই বংশধর আসিতেছে; সেই অবধি উহাদের জন্য আমার প্রাণ কাঁদিয়া উঠিতেছে। আমি, বার বৎসরে, সীতাকে একপ্রকার ভুলিয়া গিয়াছিলাম; কিন্তু, উহাদিগকে দেখিয়া, আমার সীতাশোক পুনরায় নূতন হইয়া উঠিয়াছে। হা বৎসে জানকি! তুমি কোথায় রহিয়াছ, তোমার কি অবস্থা ঘটিয়াছে, অদ্যাপি জীবিত আছ, কি এই পাপিষ্ঠ নরলোক হইতে প্রস্থান করিয়াছ; কিছুই জানি না। এই বলিয়া, দীর্ঘনিশ্বাসপরিত্যাগ করিয়া, কৌশল্যা পুনরায় মূর্চ্ছিত হইলেন। সকলে, সযত্ন হইয়া, পুনরায় তাঁহার চৈতন্যসম্পাদন করিলেন। তখন, কৌশল্যা, নিরতিশয় অধৈর্য্য হইয়া, বলিতে লাগিলেন, এখনও তোমরা উহাদিগকে আমার নিকটে আনিয়া দিলে না; না হয় কেহ এক বার, লক্ষ্মণের নিকটে গিয়া, আমার নাম করিয়া বলুক; লক্ষ্মণ এখনই উহাদিগকে আনিয়া আমার ক্রোড়ে দিবে।

 কৌশল্যার এইরূপ অস্থিরতা ও কাতরতা দেখিয়া, অরুদ্ধতীর আদেশ অনুসারে, সমীপবর্ত্তিনী প্রতিহারী, লক্ষ্মণের নিকটে গিয়া, সবিশেষ সমস্ত বলিয়া, কৌশল্যার অভিপ্রায় তাঁহার গোচর করিল। লক্ষ্মণ, কৌশলক্রমে, সে দিবস সেই পর্য্যন্ত সঙ্গীতক্রিয়া রহিত করিয়া, সভাভঙ্গ করিলেন; এবং, কুশ ও লবকে সমভিব্যাহারে লইয়া, কৌশল্যার নিকটে উপস্থিত হইলেন। কৌশল্যা, তাহাদের দুই সহোদরকে ক্রোড়ে লইয়া, স্নেহভরে, বারংবার উভয়ের মুখচুম্বন করিলেন, এবং হা বৎসে জানকি! তুমি কোথায় রহিয়াছ; এই বলিয়া, নিতান্ত কাতর হইয়া, উচ্চৈঃ স্বরে রোদন করিতে লাগিলেন। তদ্দর্শনে, সুমিত্রা, উর্ম্মিলা প্রভৃতি সকলেই, সাতিশয় শোকাভিভূত হইয়া, অবিশ্রান্ত অশ্রুপাত, বিলাপ, ও পরিতাপ করিতে আরম্ভ করিলেন। কুশ ও লব, এই সমস্ত দেখিয়া শুনিয়া, অবাক্ হইয়া রহিল।

 কিয়ৎ ক্ষণ পরে, কৌশল্যা, কিঞ্চিৎ অংশে শোকসংবরণ করিয়া, সন্দেহভঞ্জনমানসে, তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের ও তোমাদের জনক জননীর নাম কি? তাহারা, অতি বিনীত ভাবে, স্বস্বনামকীর্ত্তন করিয়া, বলিল, আমাদের পিতা কে, তাহা আমরা জানি না; এ পর্য্যন্ত আমরা তাঁহাকে দেখি নাই; আমাদের জননী আছেন, তিনি তপস্বিনী; কিন্তু, এক দিনও, আমরা তাঁহার নাম শুনি নাই, কেহ আমাদিগকে বলিয়া দেয় নাই; আমরাও তাঁহাকে বা অন্য কাহাকেও কখনও জিজ্ঞাসা করি নাই। আমরা মহর্ষি বাল্মীকির শিষ্য; তাঁহার তপোবনে প্রতিপালিত হইয়াছি, এবং তাঁহারই নিকট বিদ্যাশিক্ষা করিয়াছি; আকুল চিত্তে এই সকল কথা শুনিয়া, অনেক অংশে, কৌশল্যার সংশয়াপনোদন হইল। কিন্তু, সম্পূর্ণ পরিতৃপ্ত না হইয়া, তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের জননীর আকৃতি কিরূপ? কুশ ও লব তদীয় আকৃতির যথাযথ বর্ণনা করিল। তখন, তাহারা সীতার তনয় বলিয়া, এককালে সকলের দৃঢ় নিশ্চয় হইল; এবং কৌশল্যা প্রভৃতি সমস্ত রাজপরিবারের শোকসিন্ধু, অনিবার্য্য বেগে, উথলিয়া উঠিল। কিয়ৎ ক্ষণ পরে, কৌশল্যা কুশ ও লবকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের জননী কেমন আছেন? তাহারা বলিল, তাঁহাকে সর্ব্বদাই জীবন্মৃতপ্রায় দেখিতে পাই; বিশেষতঃ, তিনি দিন দিন যেরূপ ক্ষীণ হইতেছেন, তাহাতে বোধ হয়, অধিক দিন বাঁচিবেন না। এই কথা বলিতে বলিতে, তাহাদের দুই সহোদরের নয়নযুগল অশ্রুজলে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল।

 কুশ ও লবের এই সকল কথা শুনিয়া, সকলেই যৎপরোনাস্তি বিলাপ ও পরিতাপ করিতে লাগিলেন। কৌশল্যা, কিঞ্চিৎ ধৈর্য্য অবলম্বন করিয়া, সম্পূর্ণ রূপে সন্দেহভঞ্জন করিবার নিমিত্ত, লক্ষ্মণকে বলিলেন, বৎস, তুমি এক বার মহর্ষি বাল্মীকিকে এই স্থানে আন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে, মহর্ষি বাল্মীকি, লক্ষ্মণ সমভিব্যাহারে, তথায় উপস্থিত হইলে, সকলে, যথোচিত ভক্তিযোগ সহকারে প্রণাম করিয়া, পরম সমাদরে আসনে উপরেশন করাইলেন। অনন্তর, কৌশল্যা কৃতাঞ্জলিপুটে জিজ্ঞাসা করিলেন, ভগবন্, আপনকার এই দুই শিষ্য কে, কৃপা করিয়া সবিশেষ বলুন। বাল্মীকি, যে দিন লক্ষ্মণ সীতাকে বিসর্জন দিয়া আইসেন, সেই অবধি আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত নির্দিষ্ট করিয়া, রামের বিরহে সীতার যাদৃশী অবস্থা ঘটিয়াছে, তাহার যথাযথ বর্ণনা করিলেন। সমুদয় শ্রবণগোচর করিয়া, সকলেরই চক্ষের জলে বক্ষঃস্থল ভাসিয়া যাইতে লাগিল। কৌশল্যা, শোকে একান্ত অভিভূত হইয়া, হা বৎসে জানকি! বিধাতা তোমার কপালে এত দুঃখ লিখিয়াছিলেন, এই বলিয়া বিলাপ করিতে লাগিলেন। যাহা হউক, সীতা অদ্যাপি জীবিত আছেন, এবং কুশ ও লব তাঁহার তনয়, এ বিষয়ে আর অণুমাত্র সংশয় রহিল না।

 এত দিনের পর আত্মপরিচয় পাইয়া, কুশ ও লবের অন্তঃকরণে নানা অনির্বচনীয় ভাবের উদয় হইতে লাগিল। বাল্মীকি তাহাদিগকে বলিলেন, বৎস কুশ বৎস লব, পিতামহীদের ও পিতৃব্যপত্নীদিগের চরণবন্দনা কর। তাহারা তৎক্ষণাৎ কৌশল্যা, কেকয়ী, ও সুমিত্রার, এবং ঊর্মিলা, মাণ্ডবী ও শ্রুতকীর্ত্তির চরণে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিল। অনন্তর, মহর্ষি বলিলেন, তোমরা রামায়ণে লক্ষ্মণ নামে যে মহাপুরুষের গুণকীর্ত্তনপাঠ করিয়াছ, তিনি এই; ইনি তোমাদের তৃতীয় পিতৃব্য; এই বলিয়া, লক্ষ্মণকে দেখাইয়া দিলেন। তাহারা, লক্ষ্মণ এই শব্দ কর্ণগোচর হইবামাত্র, বিস্ময়বিস্ফারিত নয়নে, পদ অবধি মস্তক পর্য্যন্ত নিরীক্ষণ করিয়া, দৃঢ়তর ভক্তিযোগ সহকারে, তাঁহার চরণে প্রণাম করিল।

 এই রূপে কিয়ৎ ক্ষণ অতীত হইলে, কৌশল্যা লক্ষ্মণকে বলিলেন, বৎস, তুমি ত্বরায় রামকে ও বশিষ্ঠদেবকে এখানে আন। তদনুসারে, লক্ষ্মণ, অল্প ক্ষণ মধ্যে, রাম ও বশিষ্ঠদেবকে সমভিব্যাহারে লইয়া, তথায় উপস্থিত হইলেন। কৌশল্যা, বাষ্পাকুল লোচনে, শোকাকুল বচনে, তাঁহাদের নিকট, কুশ ও লবের প্রকৃত পরিচয় দিলেন, এবং সীতা যে তৎকাল পর্য্যন্ত জীবিত আছেন, তাহাও বলিলেন। কুশ ও লবের বিষয়ে রামচন্দ্রের অন্তঃকরণে যে সংশয় ছিল, তাহা সম্পূর্ণ রূপে অপসারিত হইল। চক্ষের জলে তাঁহার বক্ষঃস্থল ভাসিয়া গেল। তিনি, অপ্রমেয় বাৎসল্যভরে, নিস্পন্দ নয়নে, কুশ ও লবের মুখনিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। অনন্তর, কৌশল্যা সপুত্ত্রী সীতার পরিগ্রহের প্রস্তাব করিলেন। রামচন্দ্র মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন। কৌশল্যা তদীয় মৌনাবস্থানকে সম্মতিদান স্থির করিয়া, সীতার আনয়নের নিমিত্ত বাল্মীকির নিকটে প্রার্থনা করিলেন। বাল্মীকি, অবিলম্বে বাসকুটীরে গমন করিয়া, কৌশল্যার প্রেরিত শিবিকাধান সমভিব্যাহারে, আপন এক শিষ্যকে পাঠাইলেন; বলিয়া দিলেন, তুমি জানকীরে এই যানে আরোহণ করাইয়া, আমার বাসকুটীরে লইয়া আসিবে।

 ক্রমে ক্রমে, সমবেত নিমন্ত্রিতগণ অবগত হইলেন, রামায়ণগায়ক বাল্মীকিশিষ্যেরা রাজতনয়; সীতা, পরিত্যাগের পর, বাল্মীকির আশ্রমে তাহাদিগকে প্রসব করিয়াছেন; তিনি অদ্যাপি জীবিত আছেন; রাজা তাঁহারে গৃহে লইবেন; তাঁহার আনয়নের নিমিত্ত লোক প্রেরিত হইয়াছে। এই সংবাদে অনেকেই প্রীতিপ্রাপ্ত হইলেন। কিন্তু কেহ কেহ বলিতে লাগিলেন, আমাদের রাজা অতি অব্যবস্থিতচিত্ত; যদি জানকীরে পুনরায় গৃহে লইবেন, তবে পরিত্যাগ করিবার কি আবশ্যকতা ছিল? তখনও যে জানকী, এখনও সেই জানকী; তখনও যে কারণে পরিত্যাগ করিয়াছিলেন, এখনও সে কারণ বিদ্যমান রহিয়াছে; বড় লোকের রীতি চরিত্র বুঝা ভার।

 সীতার পরিগ্রহ বিষয়ে রাম একপ্রকার স্থিরনিশ্চয় হইয়াছিলেন; কিন্তু, এই সকল কথা কর্ণপরম্পরায় তাঁহার কর্ণগোচর হইলে, পুনরায় চলচিত্ত হইলেন। তিনি মনে করিয়াছিলেন, এক্ষণে জানকীরে গৃহে লইলে, প্রজালোকে আর আপত্তির উত্থাপন করিবে না। কিন্তু, অদ্যাপি তাহাদের হৃদয় হইতে সীতার চরিত্রসংক্রান্ত সংশয় অপনীত হয় নাই দেখিয়া, তিনি বিষাদসাগরে মগ্ন হইলেন; এবং, কিংকর্ত্তব্য বিমূঢ় হইয়া, লক্ষ্মণের সহিত পরামর্শ করিতে লাগিলেন। অনেক বাদানুবাদের পর, ইহাই নির্দ্ধারিত হইল যে, সমবেত সমস্ত লোকের সমক্ষে, সীতা স্বীয় শুদ্ধচারিতা প্রমাণসিদ্ধ করিলে, রাম তাঁহাকে গৃহে লইবেন। রামের আদেশ অনুসারে, লক্ষ্মণ এই কথা বাল্মীকির গোচর করিলেন।

 লক্ষ্মণের মুখে সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়া, বাল্মীকি, অবিলম্বে, রামচন্দ্রের নিকট উপস্থিত হইলেন; এবং, সীতা যে সম্যক্‌ শুদ্ধচারিণী, সে বিষয়ে তাঁহাকে অশেষ প্রকারে বুঝাইতে আরম্ভ করিলেন। রামচন্দ্র বলিলেন, ভগবন্, সীতার শুদ্ধচারিতা বিষয়ে আমার অণুমাত্র সংশয় নাই। কিন্তু আমি, রাজ্যের ভার গ্রহণ করিয়া, নিতান্ত পরায়ত্ত হইয়াছি। আপনারাই উপদেশ দিয়া থাকেন, প্রাণপণে প্রজারঞ্জন করাই রাজার পরম ধর্ম্ম; কোনও কারণে তাহাতে অণুমাত্র উপেক্ষা প্রদর্শন করিলে, ইহ লোকে অকীর্ত্তিভাজন ও পরলোকে নিরয়গামী হইতে হয়। প্রজালোকের অন্তঃকরণে সীতার চরিত্র বিষয়ে বিষম সংশয় জন্মিয়া আছে; সে সংশয় অপসারিত না হইলে, আমি কি রূপে গ্রহণ করি, বলুন। আমি, সীতার পরিত্যাগদিবস অবধি, সকল সুখে জলাঞ্জলি দিয়াছি; কি রূপে এত দিন জীবিত রহিয়াছি, বলিতে পারি না। নিতান্ত অনায়ত্ত হওয়াতেই, আমায় সীতারে নির্বাসিত করিতে হইয়াছে। এক বার মনে করিয়াছিলাম, প্রজালোকে অসন্তুষ্ট হয়, হউক, আমি আর তাহাদের অনুরোধে সীতা গ্রহণে পরাঙ্মুখ হইব না। কিন্তু তাহাতে রাজধর্ম্মের প্রতিপালন হয় না; সুতরাং, সে বিষয়ে সাহস করিতে পারিলাম না। আর বার ভাবিয়াছিলাম, না হয়, ভরতের হস্তে রাজ্যভার সমর্পিত করিয়া, রাজকার্য্য হইতে অবসৃত হইব; তাহা হইলে, আর আমার জানকীপরিগ্রহের কোনও প্রতিবন্ধক থাকিবে না। অবশেষে, অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া সে উপায় অবলম্বন করাও শ্রেয়ঃকল্প বলিয়া বোধ হইল না। আমি জানকীর প্রতি যেরূপ নৃশংস আচরণ করিয়াছি, তাহাতে নিঃসন্দেহ ঘোরতর অধর্ম্মগ্রস্ত হইয়াছি; এ যাত্রা, আমি নিরবচ্ছিন্ন দুঃখভোগে জীবনযাপন করিবার নিমিত্তই জন্মগ্রহণ করিয়াছিলাম। আমি এক্ষণে যে বিষম মানসিক কষ্টে কালহরণ করিতেছি, তাহা আমার অন্তরাত্মাই জানেন। যদি এই মুহূর্ত্তে আমার প্রাণবিয়োগ হয়, তাহা হইলে, আমি পরিত্রাণ বোধ করি।

 এই বলিয়া, একান্ত বিকলচিত্ত হইয়া, রাম অনিবার্য্য বেগে বাষ্পবারিবিসর্জন করিতে লাগিলেন; কিয়ৎ ক্ষণ পরে, কিঞ্চিৎ শান্তচিত্ত হইয়া, অঞ্জলিবন্ধ পূর্ব্বক, বিনয়বাক্যে সম্ভাষণ করিয়া, বাল্মীকিকে বলিলেন, ভগবন্, আপনকার নিকটে আমার প্রার্থনা এই, সীতা উপস্থিত হইলে, আপনি তাঁহারে আপন সমভিব্যাহারে সভামণ্ডপে লইয়া যাইবেন, এবং অনুগ্রহ করিয়া, তাঁহার পরিগ্রহ বিষয়ে সকলের সম্মতি জিজ্ঞাসিবেন। যদি তাঁহার পরিগ্রহ সর্বসম্মত হয়, তৎক্ষণাৎ গ্রহণ করিব। সর্বসম্মত না হইলে, তাঁহাকে, কোনও অসন্দিগ্ধ প্রমাণ দ্বারা, প্রজাবর্গের সন্দেহনিরাকরণ করিতে হইবে। বাল্মীকি, অগত্যা সম্মত হইয়া, বিষণ্ণ বদনে বাসসদনে প্রতিগমন করিলেন।

 এ দিকে, সীতা, কৌশল্যার প্রেরিত শিবিকাযান উপস্থিত দেখিয়া, এবং মহর্ষির প্রেরিত শিষ্যের মুখে তদীয় আদেশ শুনিয়া, মনে মনে বলিতে লাগিলেন, বুঝি বিধি, সদয় হইয়া, এত দিনের পর, আমার দুঃখের অবসান করিলেন। যখন ঠাকুরাণী শিবিকা পাঠাইয়াছেন, তখন আমি পুনরায় পরিগৃহীতা হইব, সন্দেহ নাই। বোধ হয়, এই জন্যই আজ আমার বাম নয়ন অনবরত স্পন্দিত হইতেছে। আমি আর্য্যপুত্রের স্নেহ, দয়া, ও মমতা জানি; নিতান্ত অনায়ত্ত হওয়াতেই, তিনি আমায় নির্বাসিত করিয়াছিলেন। আমি তাঁহার বিরহে যেমন কাতর, তিনিও আমার বিরহে সেইরূপ কাতর, তাহার কোনও সন্দেহ নাই। যদি আমার প্রতি স্নেহের কোনও অংশে খর্ব্বতা ঘটিত, তাহা হইলে তিনি কখনই পুনরায় দারপরিগ্রহে বিমুখ হইতেন না। তিনি, সহধর্ম্মিণীস্থলে আমার প্রতিকৃতি স্থাপিত করিয়া, স্নেহের পরা কাষ্ঠা দেখাইয়াছেন, এবং আমার সকল শোকের ও সকল ক্ষোভের নিবারণ করিয়াছেন। পুনরায় যে আমার অদৃষ্টে আর্য্যপুত্ত্রের সহবাসসুখ ঘটিবে, তাহা স্বপ্নেও ভাবি নাই।

 এইরূপ বলিতে বলিতে, আহ্লাদভরে, জানকীর নয়নযুগল হইতে প্রবল বেগে বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল। তাঁহার শরীরে শতগুণ বলাধান ও চিত্তে অপরিমিত স্ফুর্ত্তির ও উৎসাহের সঞ্চার হইল। পুনরায় পরিগৃহীতা হইলাম ভাবিয়া, তাঁহার হৃদয়কন্দর অভূতপূর্ব্ব আনন্দপ্রবাহে উচ্ছলিত হইয়া উঠিল। আশার আশ্বাসনী শক্তির ইয়ত্তা নাই। তিনি, আশার উপর নির্ভর করিয়া, মনে মনে কতই কল্পনা করিতে লাগিলেন। রামের সহিত সমাগম হইলে, যে সকল ব্যাপার ঘটিতে পারে, তিনি তৎসমুদয় আপন চিত্তপটে চিত্রিত করিতে আরম্ভ করিলেন। তিনি এক বার বোধ করিলেন, যেন তিনি রামের সম্মুখে নীত হইয়াছেন; রাম লজ্জায় মুখ তুলিয়া তাঁহার সহিত কথা কহিতে পারিতেছেন না; আর বার বোধ করিতে লাগিলেন, যেন রাম, অশ্রুপূর্ণ নয়নে, স্নেহভরে প্রিয় সম্ভাষণ করিতেছেন, তিনি কথা কহিতেছেন না, অভিমানভরে বদন বিরস করিয়া দাঁড়াইয়া আছেন; এক বার বোধ করিলেন, যেন প্রথমসমাগমক্ষণে, উভয়েই জড়প্রায় হইয়া, স্থির নয়নে উভয়ের বদননিরীক্ষণ করিতেছেন, এবং উভয়েরই চক্ষের জলে বক্ষঃস্থল ভাসিয়া যাইতেছে; আর বার বোধ করিতে লাগিলেন, যেন উভয়ে একাসনে উপবেশন করিয়া, পরস্পর দীর্ঘবিরহকালীন দুঃখের বর্ণনা করিতে করিতে, অপরিজ্ঞাত রূপে রজনীর অবসান হইয়া গেল; এক বার বোধ করিলেন, যেন তিনি শ্বশ্রূদিগের সম্মুখে নীত হইয়া তাঁহাদের চরণবন্দনা করিলে, তাঁহারা বাষ্পপূর্ণ নয়নে তাঁহার মুখচুম্বন করিলেন, এবং তাঁহাকে কঙ্কালমাত্র অবশিষ্ট দেখিয়া, শোকভরে কতই পরিতাপ করিতে লাগিলেন; আর বার বোধ করিতে লাগিলেন, যেন তিনি, শ্বশ্রূদিগের নিকটে উপবিষ্ট হইয়া, তাঁহাদের জিজ্ঞাসার উত্তর দিতেছেন, এমন সময়ে তাঁহার দেবরেরা তথায় উপস্থিত হইলেন, এবং বাষ্পাকুল লোচনে গদ্গদ বচনে, আর্য্যে, প্রণাম করি, ইহা বলিয়া অভিবাদন করিলেন; এক বার বোধ করিলেন, যেন তাঁহার ভগিনীরা আসিয়া প্রণাম আসিয়া করিলেন; এবং, দীর্ঘবিয়োগের পর, পরস্পরসন্দর্শনে শোক প্রবাহ উচ্ছলিত হওয়াতে, সকলে মিলিয়া, গলদশ্রু লোচনে বিলাপ ও পরিতাপ করিতে লাগিলেন; আর বার বোধ করিতে লাগিলেন, যেন হিরণ্ময়ী প্রতিকৃতি অপসারিত হইয়াছে; তিনি, রামের বামে বসিয়া, যজ্ঞক্ষেত্রে সহধর্ম্মিণীকার্য্য সম্পন্ন করিতেছেন।

 এইরূপ অনেকরূপ অনুভব করিতে করিতে, আহ্লাদভরে পুলকিতকলেবরা হইয়া, জানকী শিবিকায় আরোহণ করিলেন; এবং, পর দিবস সায়ং সময়ে, নৈমিষে উপনীতা হইলেন। বাল্মীকি বলিলেন, বৎসে, রাজা রামচন্দ্র তোমার পুনর্গ্রহণে সন্মত হইয়াছেন। কল্য, যৎকালে, তিনি সভামণ্ডপে অবস্থিতি করিবেন, সেই সময়ে, সর্ব্ব সমক্ষে, আমি তোমায় তাঁহার হস্তে সমর্পিত করিব। বাল্মীকির মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, আমি সীতার পরিগ্রহ প্রার্থনা করিলে, কোনও ব্যক্তি, সাহস করিয়া, সভামধ্যে অসম্মতিপ্রদর্শন করিতে পারিবে না। এজন্য, তিনি, শুদ্ধচারিতার প্রমাণ প্রদর্শন আবশ্যক হইলেও হইতে পারে, এ কথার উল্লেখ মাত্র করিলেন না। অনন্তর, জানকী, বিরলে বসিয়া, কুশ ও লবের মুখে সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়া, স্বীয় পরিগ্রহ বিষয়ে সম্পূর্ণ রূপে মুক্তসংশয়া হইলেন; এবং আহ্লাদে অধৈর্য্য হইয়া, প্রতি ক্ষণে প্রভাত প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন; সমস্ত রাত্রি, এক বারও, নয়ন মুদ্রিত করিতে পারিলেন না।

 রজনী অবসন্না হইল। মহর্ষি বাল্মীকি, স্নান, আহ্নিক সমাপিত করিয়া, সীতা, কুশ, লব, ও শিষ্যবর্গ সমভিব্যাহারে, সভামণ্ডপে উপস্থিত হইলেন। সীতাকে কঙ্কাল মাত্রে পর্য্যবসিত দেখিয়া, রামের হৃদয় বিদীর্ণ হইবার উপক্রম হইল। অতিকষ্টে তিনি উচ্ছলিত শোকাবেগের সংবরণে সমর্থ হইলেন; এবং, না জানি, আজ প্রজালোকে কিরূপ আচরণ করে, এই চিন্তায় আক্রান্ত হইয়া, একান্ত আকুল হৃদয়ে কালযাপন করিতে লাগিলেন। সীতার অবস্থা দর্শনে অনেকেরই অন্তঃকরণে কারুণ্যরসের সঞ্চার হইল। বাল্মীকি, আসনপরিগ্রহ না করিয়াই, উচ্চৈঃ স্বরে বলিতে লাগিলেন, এই সভায় নানাদেশীয় নরপতিগণ, কোশল রাজ্যের প্রধান প্রধান প্রজাগণ, এবং অপরাপর সহস্র সহস্র পৌরবর্গ ও জানপদগণ সমবেত হইয়াছ; তোমরা সকলেই অবগত আছ, রাজা রামচন্দ্র, অমূলকলোকাপবাদশ্রবণে চলচিত্ত হইয়া, নিতান্ত নিরপরাধে, জানকীরে নির্বাসিত করিয়াছিলেন; এক্ষণে তোমাদের সকলের নিকট আমার অনুরোধ এই, তাঁহার পরিগ্রহ বিষয়ে তোমরা প্রশস্ত মনে অনুমোদন প্রদর্শন কর; জানকী যে সম্পূর্ণ শুদ্ধচারিণী, সে বিষয়ে মনুষ্যমাত্রের অন্তঃকরণে অণুমাত্র সংশয় হইতে পারে না।

 ইহা বলিয়া, বাল্মীকি বিরত হইলে, সভামণ্ডপে অতিমহান্ কোলাহল উত্থিত হইল। কিয়ৎ ক্ষণ পরে, নরপতিগণ ও প্রধান প্রধান প্রজাগণ, দণ্ডায়মান হইয়া, কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন, আমরা অকপট হৃদয়ে বলিতেছি, রাজা রামচন্দ্র সীতা দেবীর পুনরায় গ্রহণ করিলে, আমরা যার পর নাই পরিতোষলাভ করিব। কিন্তু, তদ্ব্যতিরিক্ত সমস্ত লোক, অবনত বদনে, মৌনাবলম্বন করিয়া রহিল। রাম, এত ক্ষণ, বিষম সংশয়ে কালযাপন করিতেছিলেন; এক্ষণে স্পষ্ট বুঝিতে পারিলেন, সীতার পরিগ্রহ বিষয়ে সর্ব্বসাধারণের সম্মতি নাই। এজন্য তিনি, নিতান্ত ম্লানবদন ও ম্রিয়মাণপ্রায় হইয়া, হতবুদ্ধির ন্যায়, স্থির নয়নে বাল্মিকীর, মুখনিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। বাল্মিকী, অতিমাত্র হতোৎসাহ হইয়া, উপায়ান্তর দেখিতে না পাইয়া, সীতাকে বলিলেন, বৎসে জানকি, তোমার চরিত্র বিষয়ে প্রজালোকের মনে যে সংশয় জন্মিয়া আছে, অদ্যাপি তাহা অপনীত হয় নাই; অতএব তুমি, কোনও বিশিষ্ট প্রমাণ দর্শাইয়া, সকলের অন্তঃকরণ হইতে সেই সংশয়ের অপসারণ কর। সীতা, বাল্মীকির দক্ষিণ পার্শ্বে দণ্ডায়মানা থাকিয়া, নিতান্ত আকুল হৃদয়ে, প্রতি ক্ষণেই পরিগ্রহপ্রতীক্ষা করিতেছিলেন, শ্রবণমাত্র বজ্রাহতার প্রায় গতচেতনা হইয়া, বাতাহতা লতার ন্যায়, ভূতলে পতিতা হইলেন।

 জননীর তাদৃশী দশা দেখিয়া, অতিমাত্র কাতর হইয়া, কুশ ও লব উচ্চৈঃ স্বরে রোদন করিয়া উঠিল। রাম, অতিমহতী লোকানুরাগপ্রিয়তার সহায়তায়, এ পর্য্যন্ত ধৈর্য্য অবলম্বন করিয়া ছিলেন; কিন্তু সীতাকে ভূতলশায়িনী দেখিয়া, কুশ ও লবের আর্ত্তনাদ শ্রবণগোচর করিয়া, অতিদীর্ঘনিশ্বাসভারপরিত্যাগ পূর্ব্বক, হা প্রেয়সি! বলিয়া, মূর্চ্ছিত ও সিংহাসন হইতে ধরাতলে পতিত হইলেন। কৌশল্যা, শোকে নিতান্ত বিহ্বল হইয়া, হা বৎসে জানকি? এই বলিয়া মূর্চ্ছিত হইলেন। সীতার ভগিনীরাও, দুঃসহ শোকভরে অভিভূত হইয়া, হায়! কি হইল বলিয়া, উচ্চৈঃ স্বরে রোদন করিতে আরম্ভ করিলেন। এই সকল ব্যাপার প্রত্যক্ষ করিয়া, সভাস্থ সমস্ত লোক, স্তব্ধ ও হতবুদ্ধি হইয়া, চিত্রার্পিতপ্রায় উপবিষ্ট রহিলেন। ভরত, লক্ষ্মণ, ও শত্রুঘ্ন, শোকে একান্ত অভিভূত হইয়াও, ধৈর্য্য অবলম্বন পূর্ব্বক, রামচন্দ্রের চৈতন্যসম্পাদনে তৎপর হইলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে, তাঁহার চৈতন্যলাভ হইল। বাল্মীকিও, সীতার চৈতন্যসম্পাদনের নিমিত্ত, অশেষপ্রকারে প্রয়াস পাইলেন। কিন্তু তাঁহার সমস্ত প্রয়াস বিফল হইল। তিনি, কিয়ৎ ক্ষণ পরেই, বুঝিতে পারিলেন, সীতা মানবলীলার সংবরণ করিয়াছেন।

 সীতা নিতান্ত সুশীলা ও একান্ত সরলহৃদয়া ছিলেন; তাঁহার তুল্য পতিপরায়ণা রমণী কখনও কাহারও দৃষ্টিবিষয়ে বা শ্রুতিগোচরে পতিত হয় নাই। তিনি স্বীয় বিশুদ্ধ চরিতে পতিপরায়ণতা গুণের এরূপ পরা কাষ্ঠা প্রদর্শিত করিয়া গিয়াছেন যে, বোধ হয়, বিধাতা, মানবজাতিকে পতিব্রতাধর্ম্মে উপদেশ দিবার নিমিত্ত, সীতার সৃষ্টি করিয়াছিলেন। তাঁহার তুল্য সর্ব্বগুণসম্পন্না কামিনী কোনও কালে ভূমণ্ডলে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, অথবা তাঁহার ন্যায় সর্ব্বগুণসম্পন্ন পতি পাইয়া, কখনও কোনও কামিনী তাঁহার মত দুঃখভাগিনী হইয়াছেন; এরূপ বোধ হয় না।

সম্পূর্ণ।

PRINTED BY KSHETRANATH HALDAR,
THE ANDAMATHA PRESS,
No. 25, Sukeas’ Street, Calcutta,
1898.