বিষয়বস্তুতে চলুন

সীতার বনবাস (ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ১৮৯৭)/চতুর্থ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।



পর দিন, প্রভাত হইবামাত্র, লক্ষ্মণ সুমন্ত্রকে বলিলেন, সারথে, অবিলম্বে রথ প্রস্তুত করিয়া আন; আর্য্যা জানকী তপোবনদর্শনে গমন করিবেন। সুমন্ত্র, আদেশপ্রাপ্তিমাত্র, রথ প্রস্তুত করিবার নিমিত্ত, প্রস্থান করিলেন। অনন্তর, লক্ষ্মণ জানকীর বাসভবনে গমন করিয়া দেখিলেন, তিনি, তপোবনগমনের উপযোগী সমস্ত আয়োজন করিয়া, প্রস্তুত হইয়া, রথের প্রতীক্ষা করিতেছেন। লক্ষ্মণ, সন্নিহিত হইয়া, আর্য্যে, অভিবাদন করি, এই বলিয়া প্রণাম করিলেন। সীতা, বৎস, চিরজীবী ও চিরসুখী হও; এই বলিয়া, অকৃত্রিম স্নেহ সহকারে, আশীর্বাদ করিলেন। লক্ষ্মণ বলিলেন, আর্য্যে, রথ প্রস্তুতপ্রায়, প্রস্থানের অধিক বিলম্ব নাই। সীতা, পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইয়া, প্রফুল্ল বদনে বলিলেন, বৎস, অদ্য প্রভাতে তপোবনদর্শনে যাইব, এই আনন্দে আমি রাত্রিতে নিদ্রা যাই নাই; সমস্ত আয়োজন করিয়া, প্রস্তুত হইয়া আছি; রথ উপস্থিত হইলেই আয়োহণ করি। আমি মনে করিয়াছিলাম, আর্য্যপুত্র, এমন সময়ে, আমার তপোবনগমনে আপত্তি করিবেন; তাহা না করিয়া, প্রসন্ন মনে অনুমোদন করাতে, আমি কত প্রীতিলাভ করিয়াছি, বলিতে পারি। বোধ হয়, আমি জন্মান্তরে অনেক তপস্যা করিয়াছিলাম; সেই তপস্যার বলে, এমন অনুকূল পতি পাইয়াছি; আর্য্যপুত্রের মত অনুকূল পতি কখনও কাহারও ভাগ্যে ঘটে মাই আর্য্যপুত্রের স্নেহ, দয়া, ও মমতার কথা মনে হইলে, আমার সৌভাগ্যগর্ব্ব হইয়া থাকে। আমি দেবতাদের নিকট, কায়মনোবাক্যে, নিয়ত এই প্রার্থনা করিয়া থাকি, যদি পুনরায় নারীজন্ম হয়, যেন আর্য্যপুত্রকে পতি পাই। এই বলিয়া, সীতা প্রীতিপ্রফুল্ল ‘নয়নে বলিলেন, বৎস, বনবাসকালে, মুনিপত্নীদের সহিত আমার নিরতিশয়, প্রণয় হইয়াছিল; তাঁহাদিগকে দিবার নিমিত্ত, এই সমস্ত বিচিত্র বসন ও মহামূল্য আভরণ লইয়াছি।

 এই বলিয়া, সীতা সেই সমুদয় লক্ষ্মণকে দেখাইতেছেন; এমন সময়ে, প্রতিহারী আসিয়া সংবাদ দিল, সুমন্ত্র রথ প্রস্তুত করিয়া দ্বারদেশে আনিয়াছেন। সীতা, তপোবনদর্শনে যাইবার নিমিত্ত, এত উৎসুক হইয়াছিলেন যে, শ্রবণমাত্র, অতিমাত্র ব্যগ্র হইয়া, সমুদয় দ্রব্যসামগ্রী লইয়া, লক্ষ্মণ সমভিব্যাহারে, রথে আরোহণ করিলেন। অনধিক সময়েই, রথ, অযোধ্যা হইতে বিনির্গত হইয়া, জনপদে প্রবিষ্ট হইল। সীতা, নয়নের ও মনের প্রতিপদ প্রদেশ সকল প্রত্যক্ষ করিয়া, প্রীত মনে বলিতে লাগিলেন, বৎস লক্ষ্মণ, আমি যে এই সকল মনোহর প্রদেশ, দেখিতেছি, ইহা কেবল আর্য্যপুত্রের প্রসাদের ফল; তিনি প্রসন্ন মনে অনুমোদন করিলে, আমার ভাগ্যে এ প্রীতিলাভ ঘটিয়া উঠিত না। আমি যেমন আহ্লাদ করিয়া প্রার্থনা করিয়াছিলাম, তিনিও তেমনই অনুকূলতাপ্রদর্শন করিয়াছেন। লক্ষ্মণ, মুগ্ধভাবা সীতার এইরূপ হর্ষাতিশয় দেখিয়া, এবং, অবশেষে রামচন্দ্র কিরূপ অনুকূলতাপ্রদর্শন করিয়াছেন, তাহা ভাবিয়া, মনে মনে ম্রিয়মাণ হইলেন; অতি কষ্টে উচ্ছলিত, শোকাবেগের সংবরণ করিলেন; এবং, অনেক যত্নে, ভাবগোপন করিয়া, সীতার ন্যায় হর্ষপ্রদর্শন করিতে লাগিলেন।

 এই ভাবে কিয়ৎ দূর গমন করিলে পর, সীতা সহসা ম্লানবদনা হইয়া লক্ষণকে বলিলেন, বৎস, এত ক্ষণ আমি মনের আনন্দে আসিতেছিলাম; কিন্তু সহসা আমার ভাবান্তর উপস্থিত হইল। দক্ষিণ নয়ন অনবরত স্পন্দিত হইতেছে; সর্ব্ব শরীর কম্পিত হইতেছে; অন্তঃকরণ, যার পর নাই, ব্যাকুল হইতেছে; পৃথিবী শূন্যময় দেখিতেছি। অকস্মাৎ এরূপ চিত্তচাঞ্চল্য ও অসুখের আবির্ভাব হইল কেন! কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। না জানি, আর্য্যপুত্র কেমন আছেন। হয় তাঁহার কোনও অশুভঘটনা হইয়াছে, নয় প্রাণাধিক ভরত ও শত্রুঘ্নের কোনও অনিষ্ট ঘটিয়াছে; কিংবা ভগবান্‌ ঋষ্যশৃঙ্গের আশ্রম হইতেই কোনও অশুভ সংবাদ আসিয়াছে; তথায় গুরুজন কে কেমন আছেন, কিছুই বুঝিতে পারিতেছি। যাহা হউক, কোনও প্রকার সর্ব্বনাশ ঘটিয়াছে, তাহার সন্দেহ নাই; নতুবা, এমন আনন্দের সময়, এরূপ চিত্তচাঞ্চল্য ও অসুখসঞ্চার উপস্থিত হইবে কেন? যৎস, কি নিমিত্ত এরূপ হইতেছে ফল; আমার প্রাণ কেমন করিতেছে, আর আমার তপোবনদর্শনে অভিলাষ হইতেছে না; আমার ইচ্ছা হইতেছে, এখনই অযোধ্যায় ফিরিয়া যাই। ভাল, তোমায় জিজ্ঞাসা করি, আর্য্যপুত্র সঙ্গে আসিবেন বলিয়াছিলেন; তাঁহার আসা হইল না কেন? রথে উঠিবার সময়, আহ্লাদে তোমায় সে কথা জিজ্ঞাসিতে ভুলিয়াছিলাম। তাঁহার না আসাতে, আমার মনে নানা সন্দেহ উপস্থিত হইতেছে। বৎস, কি করি বল; আমার চিত্তচাঞ্চল্য ক্রমেই প্রবল হইতেছে। রাবণ হরণ করিয়া লইয়া যাইবার পূর্ব্ব ক্ষণে, ঠিক এইরূপ চিত্তচাঞ্চল্য ঘটিয়াছিল; আবার কি সেইরূপ কোনও উৎপাত উপস্থিত হইবে? না জানি, কি সর্ব্বনাশই ঘটিবে। এক বার মনে হইতেছে, তপোবন দর্শনে না আসিলে ভাল হইত; আর্য্যপুত্রের নিকটে থাকিলে, কখনও এরূপ অসুখ উপস্থিত হইত না। এক এক বার মনে হইতেছে, আর আমি এ জন্মে আর্য্যপুত্রকে দেখিতে পাইব না।

 সীতার এইরূপ চিত্তচাঞ্চল্য দেখিয়া ও কাতরোক্তি শুনিয়া, লক্ষ্মণ যৎপরোনাস্তি বিষণ্ণ ও শোকাকুল হইলেন; কিন্তু, অতি কষ্টে ভাবগোপন করিয়া, শুষ্ক মুখে, বিকৃত স্বরে বলিলেন, আর্য্যে, আপনি কাতর হইবেন না; রঘুকুলদেবতারা আমাদের মঙ্গল করিবেন। বোধ হয়,, সকলকে ছাড়িয়া আসিয়াছেন, কেহ নিকটে নাই; এজন্যই, আপনকার এই চিত্তচাঞ্চল্য ঘটিয়াছে। আপনি অস্থির হইবেন; কিয়ৎ ক্ষণ পরেই, উহার নিবৃত্তি হইবে। মধ্যে মধ্যে, সকলেরই চিত্তবৈকল্য ঘটিয়া থাকে। মন স্বভাবতঃ চঞ্চল, সকল সময়ে এক ভাবে থাকে না। আপনি অত উৎকণ্ঠিত হইবেন না।

 সীতা, লক্ষ্মণের মুখশোষ ও স্বরবৈলক্ষণ্য দর্শনে, অধিকতর কাতর হইয়া, জিজ্ঞাসা করিলেন, বৎস, তোমার ভাব দেখিয়া, আমার অন্তঃকরণে বিষম সন্দেহ উপস্থিত হইতেছে। আমি, কখনও, তোমার মুখ এরূপ ম্লান দেখি নাই। যদি কোনও অনিষ্ট ঘটিয়া থাকে, স্পষ্ট করিয়া বল। বলি, আর্য্যপুত্র ভাল আছেন ত? কল্য অপরাহ্লোর পর, আর তাঁহার সঙ্গে দেখা হয় নাই। বোধ হয়, তাঁহাকে দেখিতে পাইলে, এত ক্ষণ এত অসুখ থাকিত না। তখন লক্ষ্মণ বলিলেন, আর্য্যে, আপনি ব্যাকুল হইবে না; আপনার উৎকণ্ঠা ও অসুখ দেখিয়া, আমিও উৎকণ্ঠিত হইয়াছিলাম ও অসুখবোধ করিয়াছিলাম; তাহাতেই আপনি আমার মুখশোষ ও স্বরবৈলক্ষণ্য লক্ষিত করিয়াছেন; নতুবা বাস্তবিক তাহা নহে; উহা মনে করিয়া, আপনি বিরুদ্ধ ভাবনা উপস্থিত করিবেন না। যত ভাবিবেন, যত আন্দোলন করিবেন, ততই উৎকণ্ঠা ও অসুখ বাড়িবে।

 কিয়ৎ ক্ষণ পরেই, তাঁহাদের রথ গোমতীতীরে উপস্থিত হইল। সেই সময়ে, সকলভুবনপ্রকাশক ভগবান কমলিনীনায়ক অস্তগিরিশিখরে অধিরোহণ করিলেন। সায়ংসময়ে, গোমতীতীর পরম রমণীয় হইয়া উঠে। তৎকালে, তথায়, অতি অসুস্থচিত্ত ব্যক্তিও সুচিত্ত ও অনির্বচনীয় প্রীতি প্রাপ্ত হয়। সৌভাগ্যক্রমে, সীতারও উপস্থিত আন্তরিক অসুখের সম্পূর্ণ অপসারণ হইল। লক্ষ্মণ দেখিয়া সাতিশয় প্রীত ও প্রসন্ন হইলেন। তাহারা, সে রাত্রি, সেই স্থানে অবস্থিতি করিলেন। জানকী পথশ্রমে, বিশেষতঃ মনের উৎকণ্ঠায়, সাতিশয় ক্লান্ত হইয়াছিলেন। সুতরাং, ত্বরায় তাঁহার নিদ্রাকর্ষণ হইল। তিনি যত ক্ষণ জাগরিত ছিলেন। লক্ষ্মণ, সতর্ক হইয়া, তাঁহাকে নানা মনোহর কথায় এরূপ ব্যাপৃত রাখিয়াছিলেন যে, তিনি অন্য কোনও দিকে মনঃসংযোগ করিবার অবকাশ পান নাই। ফলতঃ, দিবাভাগে জানকীর যেরূপ অসুখসঞ্চার হইয়াছিল, রজনীতে তাহার আর কোনও লক্ষণ ছিল না।

 প্রভাত হইবামাত্র, তাঁহারা গোমতীতীর হইতে প্রস্থান করিলেন। সীতা, বামে ও দক্ষিণে, পরম রমণীয় প্রদেশ সকল নয়নগোচর করিয়া, যার পর নাই প্রীতিলাভ করিতে লাগিলেন। পূর্ব্ব দিন, তাঁহার যেরূপ উৎকণ্ঠা ও অসুখসঞ্চার হইয়াছিল, তাহার কোনও লক্ষণ লক্ষিত হইল না।

 অবশেষে, রথ ভাগীরথীতীরে উপস্থিত হইল। ভাগীরথীর অপর পারে লইয়া গিয়া, সীতাকে, এ জন্মের মত, বিসর্জন দিয়া আসিতে হইবে, এই ভাবিয়া, লক্ষ্মণের শোকসাগর অনিবার্য্য বেগে উচ্ছলিত হইয়া উঠিল। আর তিনি ভাবগোপন বা অশ্রুবেগ সংবরণ করিতে পারিলেন না। সীতা, দেখিয়া, সাতিশয় বিষন্ন হইয়া, জিজ্ঞাসিলেন, বৎস, কি কারণে তোমার, এরূপ ভাব উপস্থিত হইল, বল। তখন লক্ষ্মণ নয়নের অশ্রুমার্জ্জন করিয়া বলিলেন, আর্য্যে, আপনি ব্যাকুল হইবেন না; বহু কালের পর, ভাগীরথীর দর্শনলাভ করিয়া, আমার অন্তঃকরণে কেমন এক অনির্বচনীয় ভাবের উদয় হইয়াছে; তাহাতেই অকস্মাৎ আমার নয়নযুগল হইতে বাষ্পবারি বিগলিত হইল। আমাদের পূর্ব্বপুরুষেরা কপিলশাপে ভস্মাবশেষ হইয়াছিলেন; ভগীরথ কত কষ্টে, গঙ্গা দেবীকে ভূমণ্ডলে আনিয়া, তাঁহাদের উদ্ধারসাধন করেন। বোধ হয়, তাহাই ভাগীরথীদর্শনে স্মৃতিপথে আরূঢ় হওয়াতে, এরূপ চিত্তবৈকল্য উপস্থিত হইয়াছিল। সীতা একান্ত মুগ্ধস্বভাব ও নিতান্ত সরলহৃদয়া; লক্ষ্মণের এই তাৎপর্য্যব্যাখ্যাতেই সন্তুষ্ট হইলেন; এবং গঙ্গা পার হইবার নিমিত্ত, নিতান্ত উৎসুক হইয়া, লক্ষ্মণকে বারংবায় তাহার উদেঘাগ করিতে বলিতে লাগিলেন; কিন্তু, গঙ্গা পার হইলেই যে, দুস্তর শোকসাগরে পরিক্ষিপ্ত হইবেন, তখন পর্য্যন্ত কিছুমাত্র বুঝিতে পারিলেন না।

 কিয়ৎ ক্ষণ পরেই, তরণীর সংযোগ হইল। লক্ষ্মণ, সুমন্ত্রকে সেই স্থানে রথ রাখিতে বলিয়া, সীতাকে তরণীতে আরোহণ করাইলেন, এবং, কিয়ৎ ক্ষণ মধ্যেই, তাঁহারে ভাগীরথীর অপর পারে উত্তীর্ণ করিলেন। সীতা, তপোবন দেখিবার নিমিত্ত নিতান্ত উৎসুক হইয়া, তদভিমুখে প্রস্থান করিবার উপক্রম করিলেন। তখন লক্ষ্মণ, বলিলেন, আর্য্যে, কিঞ্চিৎ অপেক্ষা করুন। আমার কিছু বক্তব্য আছে, এই স্থানে নিবেদন করিব। এই বলিয়া, তিনি অপোবদনে অশ্রুবিসর্জন করিতে লাগিলেন। সীতা চকিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, বৎস, কিছু বলিবে বলিয়া, এত ব্যাকুল হইলে কেন? কি বলিবে ত্বরায় বল; তোমার ভাবান্তর দেখিয়া, আমার প্রাণ নিতান্ত ব্যাকুল হইতেছে। তুমি কি, আসিবার সময়, আর্য্যপুত্রের কোনও অশুভঘটনা শুনিয়াছ, অন্য কোনও সর্ব্বনাশ ঘটিয়াছে? কি হইয়াছে, শীঘ্র বল। তখন লক্ষ্মণ বলিলেন, দেবি, বলিব কি, আমার বাক্যনিঃসরণ হইতেছে না; আর্য্যের আজ্ঞাবহ হইয়া, আমার অদৃষ্টে যে এরূপ ঘটিবে, তাহা আমি স্বপ্নেও জানিতাম না। যে দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে, তাহা মনে করিয়া, আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যাইতেছে। ইতঃপূর্ব্বে আমার মৃত্যু হইলে, আমি সৌভাগ্যজ্ঞান করিতাম। যদি মৃত্যু অপেক্ষা, কোনও অধিকতর দুর্ঘটনা থাকে, তাহাও আমার পক্ষে শ্রেয়স্কর ছিল; তাহা হইলে, আজ আমায় এরূপ নিষ্ঠুর কাণ্ডের ভারগ্রহণ করিতে হইত না। হা বিধাতঃ! তোমার মনে কি এই ছিল! এই বলিয়া, উন্মূলিত তরুর ন্যায়, ভূতলে পতিত হইয়া, লক্ষণ হাহাকার করিতে লাগিলেন।

 সীতা, লক্ষণের ঈদৃশ অভাবিত ভাবান্তর উপস্থিত দেখিয়া, কিয়ৎ ক্ষণ, স্তব্ধ ও হতবুদ্ধি হইয়া, দণ্ডায়মান রহিলেন; অনন্তর, হস্তধারণ পূর্ব্বক, তাঁহাকে ভূতল হইতে উঠাইয়া, অঞ্চল দ্বারা তদীয় নয়নের অশ্রুমার্জ্জন করিয়া দিলেন; এবং, তিনি কিঞ্চিৎ শান্ত হইলে, কাতর বচনে জিজ্ঞাসা করিলেন, বৎস, কি কারণে, তুমি এত ব্যাকুল হইলে? কি জন্যই বা, তুমি মৃত্যুকামনা করিলে? তোমায় একান্ত বিকলচিত্ত দেখিতেছি; অল্প কারণে, তুমি কখনই এত আকুল ও এত অস্থির হও নাই। বলি, আর্য্যপুত্রের ত কোনও অমঙ্গল ঘটে নাই? তুমি তদগতপ্রাণ; তোমার ভাব দেখিয়া বোধ হইতেছে, তাঁহারই অমঙ্গল ঘটিয়াছে। আমি এখন বুঝিতে পারিতেছি, এই জন্যই, কল্য অপরাহ্নে আমার তাদৃশ চিত্তবৈকল্য ঘটিয়াছিল। যাহা হয়, ত্বরায় বলিয়া, আমায় জীবনদান কর; আমার যাতনার একশেষ হইতেছে। ত্বরায় বল, আর বিলম্ব করিও না। আমি স্পষ্ট বুঝিতেছি, আমারই সর্ব্বনাশ ঘটিয়াছে; না হইলে, এমন সময়ে, তুমি এত ব্যাকুল হইতে না।

 সীতার এইরূপ ব্যাকুলতা ও কাতরতা দর্শনে, লক্ষ্মণের শোকানল শতগুণ প্রবল হইয়া উঠিল; নয়নযুগল হইতে অনর্গল অশ্রুজল নির্গত হইতে লাগিল; কণ্ঠরোধ হইয়া, বাক্যনিঃসরণ রহিত হইয়া গেল। যত নিষ্ঠুর হউক না কেন, অবশেষে অবশ্যই বলিতে হইবে, এই ভাবিয়া, লক্ষ্মণ বলিবার নিমিত্ত বারংবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন; কিন্তু, কোনও ক্রমে, তাঁহার মুখ হইতে তাদৃশ নিষ্ঠুর বাক্য নির্গত হইল না। তাঁহাকে এতাদৃশ অবস্থাপন্ন দেখিয়া, সীতা তাঁহার হস্তে ধরিয়া, ব্যাকুল চিত্তে, কাতর বচনে, বারংবার এই অনুরোধ করিতে লাগিলেন, বৎস, আর বিলম্ব করিও না; আর্য্যপুত্র যে আদেশ করিয়াছেন, তাহা, যত নিষ্ঠুর হউক না কেন, ত্বরায় বল; তুমি কিছুমাত্র সঙ্কুচিত হইও না; আমি অনুমতি দিতেছি, তুমি নিঃশঙ্ক চিত্তে বল। তোমার কথা শুনিয়া ও ভাব দেখিয়া, স্পষ্ট বোধ হইতেছে, আমারই কপাল ভাঙিয়াছে। কি হইয়াছে, করায় বল, আর বিলম্ব করিও না; আমি, আর এক মুহূর্ত্ত এরূপ সংশয়িত অবস্থায় থাকিতে পারিব না; যাহা হয় বলিয়া, আমার প্রাণরক্ষা কর। বলি, আর্য্যপুত্রের কোনও অমঙ্গল ঘটে নাই? যদি তিনি কুশলে থাকেন,আমার আর যে সর্ব্বনাশ ঘটুক না কেন, আমি তাহাতে তত কাতর হইব না। আমার মাথা খাও, তোমায় আর্য্যপুত্রের দোহাই, শীঘ্র বল; আর বিলম্ব করিলে, তুমি অধিক ক্ষণ আমায় জীবিত দেখিতে পাইবে না। যদি,যাতনা দিয়া, আমার প্রাণবধ করা তোমার অভিপ্রেত না হয়, তবে ত্বরায় বল, আর বিলম্ব করিও না।

 সীতার এইরূপ অবস্থা প্রত্যক্ষ করিয়া, লক্ষ্মণ ভাবিলেন, আর বিলম্ব করা বিধেয় নহে। তখন, অনেক যত্নে, চিত্তের অপেক্ষাকৃত স্থৈর্য্যসম্পাদন করিয়া, অতি কষ্টে বাক্যনিঃসরণ করিলেন; বলিলেন, আর্য্যে, বলিব কি, বলিতে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যাইতেছে। আপনি একাকিনী রাবণ-গৃহে ছিলেন; সেই কারণে, পৌরগণ ও জানপদবর্গ, আপনকার চরিত্র বিষয়ে সন্দিহান হইয়া, অপবাদকীর্ত্তন করিয়া থাকে। আর্য্য ইহা অবগত হইয়া, একবারে স্নেহ, দয়া, ও মমতার বিসর্জন দিয়া, অপবাদবিমোচনের নিমিত্ত, আপনকার মায়াপরিত্যাগ করিয়াছেন; আমায় এই আদেশ দিয়াছেন, “তুমি, তপোবনদর্শনের ছলে লইয়া গিয়া, বাল্মীকির আশ্রমে রাখিয়া আসিবে।” এই সেই বাল্মীকির আশ্রম।

 এই বলিয়া, লক্ষ্মণ ভূতলে পতিত ও মূর্চ্ছিত হইলেন। সীতাও, শ্রবণমাত্র হতচেতনা হইয়া, বাতাভিহতা কদলীর ন্যায়, ভূতলশায়িনী হইলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে, লক্ষ্মণের সংজ্ঞালাভ হইলে, তিনি, অনেক যত্নে, জানকীর চৈতন্যসম্পাদন করিলেন। জানকী চেতনালাভ করিয়া, উন্মত্তার ন্যায়, স্থির নয়নে, লক্ষ্মণের মুখনিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। লক্ষ্মণ, হতবুদ্ধির ন্যায়, চিত্রার্পিতের প্রায়, অধোবদনে, গলদশ্রু নয়নে, দণ্ডায়মান রহিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে, সীতার নয়নযুগল হইতে, প্রবল বেগে, বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল; ঘন ঘন নিশ্বাস বহিতে লাগিল; সর্ব্ব শরীর কম্পিত হইতে লাগিল। তদ্দর্শনে লক্ষ্মণ, যৎপরোনাস্তি ব্যাকুল হইয়া, সীতাকে প্রবোধ দিবার নিমিত্ত চেষ্টা পাইলেন; কিন্তু, কি বলিয়া প্রবোধ দিবেন, তাহার কিছু দেখিতে না পাইয়া, হতবুদ্ধি হইয়া, কেবল অবিশ্রান্ত অশ্রুবিসর্জন করিতে লাগিলেন।

 এই ভাবে কিয়ৎ ক্ষণ অতীত হইলে পর, সীতা চিত্তের অপেক্ষাকৃত স্থৈর্য্যসম্পাদন করিয়া বলিলেন, লক্ষ্মণ, কার দোষ দিব, সকলই আমার অদৃষ্টের দোষ; নতুবা, রাজার কন্যা, রাজার বধূ, রাজার মহিষী হইয়া, কে কখন্ আমার মত চিরদুঃখিনী হইয়াছে, বল? বুঝিলাম, যাবজ্জীবন দুঃখভোগের নিমিত্তই, আমার নারীজন্ম হইয়াছিল। বৎস, অবশেষে আমার যে এ অবস্থা ঘটিবে, তাহা কাহার মনে ছিল। বহু কালের পর আর্য্যপুত্ত্রের সহিত সমাগম হইলে, ভাবিয়াছিলাম, বুঝি এই অবধি দুঃখের অবসান হইল। কিন্তু, বিধাতা যে আমার কপালে সহস্রগুণ অধিক দুঃখ লিখিয়া রাখিয়াছিলেন, তাহা স্বপ্নেও জানিতাম না। হায় রে বিধাতা! তোর মনে কি এতই ছিল?

 এই বলিতে বলিতে, জানকীর কণ্ঠরোধ হইয়া গেল। তিনি কিয়ৎ ক্ষণ বাক্যনিঃসরণ করিতে পারিলেন না; অনন্তর, দীর্ঘনিশ্বাসপরিত্যাগ পূর্ব্বক বলিলেন, লক্ষ্মণ, নিষ্ঠুর বিধাতা আমার কপালে এত দুঃখভোগ লিখিলেন কেন, বুঝিতে পারিতেছি না। অথবা, বিধাতার অপরাধ কি; সকলেই আপন আপন কর্ম্মের ফলভোগ করে। আমি জন্মান্তরে যেরূপ কর্ম্ম করিয়াছিলাম, এ জন্মে সেইরূপ ফলভোগ করিতেছি। বোধ করি, পূর্ব্ব জন্মে, কোনও পতিপ্রাণা কামিনীকে পতিবিয়োজিতা করিয়াছিলাম; সেই মহাপাপেই আজ আমার এই দুরবস্থা ঘটিল; নতুবা আর্য্যপুত্ত্রের হৃদয় স্নেহ, দয়া, ও মমতায় পরিপূর্ণ; আমিও যে একান্ত পতিপ্রাণা ও শুদ্ধচারিণী, তাহাও তিনি বিলক্ষণ জানেন; তথাপি যে এমন সময়ে আমায় গৃহ হইতে বহিষ্কৃত করিলেন, সে কেবল আমার পূর্ব্বজন্মার্জ্জিত কর্ম্মের ফলভোগ। বৎস, আমি বনবাসে কাতর নহি। আর্য্যপুত্ত্রের সহবাসে, বহু কাল, বনবাসে ছিলাম; তাহাতে এক দিন, এক মুহূর্ত্তের নিমিত্ত; আমার অন্তঃকরণে দুঃখের লেশমাত্র ছিল না। আর্য্যপুত্ত্রসহবাসে যাবজ্জীবন বনবাসে থাকিলেও, আমার কিছুমাত্র দুঃখ হইত না। সে যাহা হউক, আমার অন্তঃকরণে এই দুঃখ হইতেছে, আর্য্যপুত্ত্র কি অপরাধে পরিত্যাগ করিয়াছেন, মুনিপত্নীরা জিজ্ঞাসা করিলে, আমি কি উত্তর দিব! তাঁহারা আর্য্যপুত্ত্রকে করুণাসাগর বলিয়া জানেন; আমি প্রকৃত কারণ বলিলে, তাঁহারা কখনই বিশ্বাস করিবেন না। তাঁহারা ভাবিবেন, আমি কোনও গুরুতর অপরাধ করিয়াছিলাম, তাহাতেই তিনি আমায় গৃহ হইতে বহিষ্কৃত করিয়াছেন। বৎস, বলিতে কি, যদি অন্তঃসত্ত্বা না হইতাম, এই মুহূর্ত্তে, তোমার সমক্ষে, জাহ্নবীজলে প্রবেশ করিয়া, প্রাণত্যাগ করিতাম। আর আমার জীবনধারণের ফল কি বল? এমন অবস্থাতেও কি প্রাণ রাখিতে হয়? আমি আশ্চর্য্যবোধ করিতেছি, আর্য্যপুত্ত্র পরিত্যাগ করিয়াছেন শুনিয়াও আমার প্রাণবিয়োগ ঘটিতেছে না। বোধ করি, আমার মত কঠিন প্রাণ আর কারও নাই; নতুবা, এখনও নির্গত হইতেছে না কেন? অথবা, বিধাতা আমায় চিরদুঃখিনী করিবার সঙ্কল্প করিয়াছেন; প্রাণত্যাগ হইলে, তাঁহার সে সঙ্কল্প বিফল হইয়া যায়; এজন্যই জীবিত রহিয়াছি।

 এইরূপ আক্ষেপ ও বিলাপ করিতে করিতে, সীতা দীর্ঘ নিশ্বাস সহকারে, হায়! কি হইল বলিয়া, পুনরায় মূর্চ্ছিত ও ভূতলে পতিত হইলেন। সুশীল লক্ষ্মণ, দেখিয়া শুনিয়া, নিতান্ত কাতর ও শোকে একান্ত অভিভূত হইয়া, অবিরল ধারায় বাষ্পবারি বিমোচন করিতে লাগিলেন; এবং, রামচন্দ্রের অদৃষ্টচর অশ্রুতপূর্ব্ব লোকানুরাগপ্রিয়তাই এই অভূতপূর্ব্ব ভয়ানক অনর্থের মূল, এই ভাবিয়া, যৎপরোনাস্তি বিষণ্ণ ম্রিয়মাণ হইয়া, বলিতে লাগিলেন, যদি ইতঃপূর্ব্বে আমার মৃত্যু হইত, তাহা হইলে, এই লোকবিগর্হিত ধর্ম্মবিবর্জ্জিত বিষম কাণ্ড দেখিতে হইত না। আমি আর্য্যের আজ্ঞাপ্রতিপালনে সম্মত হইয়া, অতি অসৎ কর্ম্মই করিয়াছি। আমার মত পাষণ্ড ও পাষাণহৃদয় আর নাই; নতুবা, এরূপ নিষ্ঠুর কাণ্ডের ভারগ্রহণ করিব কেন? কেমন করিয়া, এমন সরলহৃদয়া, শুদ্ধচারিণী, পতিপ্রাণা কামিনীকে এরূপ সর্ব্বনাশের কথা শুনাইলাম? যদি আর্য্যের আদেশপ্রতিপালনে পরাঙ্মুখ হইয়া, আমায় এ জন্মের মত তাঁহার বিরাগভাজন ও জন্মান্তরে নিরয়গামী হইতে হইত, তাহাও আমার পক্ষে সহস্র গুণে শ্রেয়স্কর ছিল। সর্ব্বথা আমি অতি অসৎ কর্ম্ম করিয়াছি। হা বিধাতঃ! কেন তুমি আমায় এরূপ নিষ্ঠুর কাণ্ডের ভার গ্রহণে প্রবৃত্তি দিয়াছিলে? হা কঠিন হৃদয়! তুমি এখনও বিদীর্ণ হইতেছ না কেন? হা কঠিন প্রাণ! তুমি এখনও প্রস্থান করিতেছ না কেন? হা দগ্ধ কলেবর! তুমি এখনও সর্ব্ব অবয়বে বিশীর্ণ হইতেছ না কেন? আর আমি আর্য্যার এ অবস্থা দেখিতে পারি না। হা আর্য্য! তুমি যে এমন কঠিনহৃদয়, তাহা স্বপ্নেও জানিতাম না। যদি তোমার মনে এতই ছিল, তবে আর্য্যার উদ্ধারসাধনে তত সচেষ্ট হইবার কি প্রয়োজন ছিল? দশানন হরণ করিয়া লইয়া গেলে পর, উন্মত্ত ও হতচেতন হইয়া, হাহাকার করিয়া বেড়াইবারই বা কি আবশ্যকতা ছিল? তুমি অবশেষে এই করিবে বলিয়া, কি আমরা লঙ্কাসমরের দুঃসহ ক্লেশপরম্পরা সহ্য করিয়াছিলাম? যাহা হউক, তোমার মত নির্দয় ও নৃশংস ভূমণ্ডলে নাই।

 কিয়ৎ ক্ষণ এইরূপ আক্ষেপ ও রামচন্দ্রের ভর্ৎসনা করিয়া, লক্ষ্মণ, উচ্ছলিত শোকাবেগের সংবরণ পূর্ব্বক, সীতার চৈতন্যসম্পাদনে সযত্ন হইলেন। চেতনাসঞ্চার হইলে, সীতা, কিয়ৎ ক্ষণ স্তব্ধ ভাবে থাকিয়া, স্নেহভরে সম্ভাষণ করিয়া, লক্ষ্মণকে বলিলেন, বৎস, ধৈর্য্য অবলম্বন কর; আর বিলাপ ও পরিতাপ করিও না। সকলই অদৃষ্টাধীন; আমার অদৃষ্টে যাহা ছিল, তাহাই ঘটিয়াছে; তুমি আর সে জন্য কাতর হইও না; শোকসংবরণ কর। আমার ভাবনা ছাড়িয়া দিয়া, ত্বরায় তুমি আর্য্যপুত্ত্রের নিকটে যাও। তিনি, আমায় বনবাস দিয়া, কাতর ও অস্থির হইয়াছেন, সন্দেহ নাই; যাহাতে তাঁহার শোকের নিবারণ ও চিত্তের স্থিরতা হয়, সে বিষয়ে যত্নবান হইবে; তাঁহাকে বলিবে, আমার পরিত্যাগ করিয়াছেন বলিয়া, ক্ষোভ করিবার আবশ্যকতা নাই; তিনি সদ্বিবেচনার কার্য্যই করিয়াছেন। প্রাণপণে প্রজারঞ্জন করা রাজার প্রধান ধর্ম্ম; আমায় পরিত্যাগ করিয়া, তিনি রাজধর্ম্মপ্রতিপালন করিয়াছেন। আমি তাঁহার মন জানি; তিনি যে কেবল লোকাপবাদের ভয়ে এই করিয়াছেন, তাহাতে আমার সন্দেহ নাই। তিনি যেন, শোকশূন্য ও ক্ষোভশূন্য হইয়া, প্রশস্ত মনে, প্রজাপালনে নিয়ত ব্যাপৃত থাকেন। তাঁহার চরণে আমার প্রণাম জানাইয়া বলিবে, যদিও আমি, লোকাপবাদভয়ে, অযোধ্যা হইতে নির্বাসিত হইলাম, যেন তাঁহার অন্তঃকরণ হইতে এক বারে অপসারিত না হই। আমি, তপোবনে থাকিয়া, এই উদ্দেশে, ঐকান্তিক চিত্তে তপস্যা করিব, যেন জন্মান্তরেও তিনি আমার পতি হন। আর, তাঁহাকে বিশেষ করিয়া বলিবে, যদিও ভার্য্যাভাবে আমায় নির্বাসিত করিয়াছেন, কিন্তু যেন সামান্য প্রজা বলিয়া গণ্য করেন। তিনি সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর; যেখানে থাকি, তাঁহার অধিকারবহির্ভূত নই।

 এই বলিয়া, একান্ত শোকাকুল হইয়া, সীতা কিয়ৎ ক্ষণ মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন; অনন্তর, নিতান্ত কাতর স্বরে বলিতে লাগিলেন, লক্ষ্মণ, আমার ভাগ্যে যাহা ঘটিয়াছে, আমি সে জন্য তত কাতর নহি; পাছে আর্য্যপুত্ত্রের মনে ক্লেশ হয়, সেই ভাবনাতেই আমি অস্থির হইতেছি। তাঁহাকে বিনয় করিয়া বলিবে, তিনি যেন শোকসংবরণ করিয়া ত্বরার সুস্থচিত্ত হন। আমার ক্লেশের একশেষ হইয়াছে, যথার্থ বটে; কিন্তু, সে জন্য, আমি তাঁহাকে অণুমাত্র দোষ দিব না; আমার যেমন অদৃষ্ট, তেমনই ঘটিয়াছে; তজ্জন্য তিনি যেন ক্ষোভ না করেন। বৎস, তোমায় আমার অনুরোধ এই, তুমি সর্ব্বদা তাঁহার নিকটে থাকিবে, ক্ষণকালের নিমিত্তও, তাঁহারে একাকী থাকিতে দিবে না; একাকী থাকিলেই, তাঁহার উৎকণ্ঠা ও অসুখ বাড়িবে। তিনি ভাল থাকিলেই আমার ভাল। যাহাতে তিনি সুখে থাকেন, সে বিষয়ে সর্ব্বদা যত্ন করিবে। এই বলিয়া, লক্ষ্মণের হস্তে ধরিয়া, সীতা বাষ্পপরিপ্লুত লোচনে, করুণ বচনে বলিলেন, তুমি আমার নিকট শপথ করিয়া বল, এ বিষয়ে কদাচ ঔদাস্য করিবে না? তপোবনে থাকিয়া, যদি লোকমুখে শুনিতে পাই, আর্য্যপুত্ত্র কুশলে আছেন, তাহা হইলেই, আমার সকল দুঃখ দূর হইবে।

 এই বলিতে বলিতে, সীতার নয়নযুগল হইতে, অবিরল ধারায়, বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল। তদীয় পতিপরায়ণতার সম্পূর্ণপ্রমাণপূর্ণ বচনপরম্পরা শ্রবণগোচর করিয়া, লক্ষ্মণের শোক প্রবাহ প্রবল বেগে প্রোচ্ছলিত হইয়া উঠিল; নয়নজলে বক্ষঃস্থল ভাসিয়া যাইতে লাগিল। সীতা সান্ত্বনাবাক্যে লক্ষ্মণকে বলিলেন, বৎস, শোকাবেগসংবরণ করিয়া, ত্বরায় তুমি আর্য্যপুত্ত্রের নিকটে যাও, আর বিলম্ব করিও না। বারংবার, এইরূপ বলিয়া, তিনি লক্ষ্মণকে বিদায় দিবার নিমিত্ত নিরতিশয় ব্যস্ত হইলেন। লক্ষ্মণ, প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করিয়া, কৃতাঞ্জলিপুটে সম্মুখে দণ্ডায়মান হইলেন; এবং গলদশ্রু লোচনে, কাতর বচনে বলিতে লাগিলেন, আর্য্যে, আপনি পূর্ব্বাপর দেখিয়া আসিতেছেন, আমি আর্য্যের একান্ত আজ্ঞাবহ; যখন যে আদেশ করেন, দ্বিরুক্তি না করিয়া, তৎক্ষণাৎ তৎপ্রতিপালনে প্রবৃত্ত হই। প্রাণান্তস্বীকার করিয়াও, অগ্রজের আজ্ঞা প্রতিপালন করা অনুজের সর্ব্বপ্রধান ধর্ম্ম। আমি, সেই অনুজধর্ম্মের অনুবর্ত্তী হইয়া, আর্য্যের এই বিষম আজ্ঞার প্রতিপালনে প্রবৃত্ত হইয়াছিলাম। আমি যে পাষাণহৃদয়ের কর্ম্ম করিবার ভারগ্রহণ করিয়াছিলাম, তাহা সম্পন্ন করিলাম। প্রার্থনা এই, আমার উপর আপনকার যে অপরিসীম স্নেহ ও বাৎসল্য আছে, তাহার যেন বৈলক্ষণ্য না হয়। আর, আর্য্যের আদেশ অনুসারে, এরূপ নৃশংস আচরণ করিয়া, আমি যে বিষম অপরাধ করিলাম, কৃপা করিয়া, আমার সেই অপরাধের মার্জ্জনা করিবেন।

 লক্ষ্মণকে এইরূপ শোকাভিভূত দেখিয়া, সীতা বলিলেন, বৎস, তোমার অপরাধ কি? তুমি কেন অকারণে এত কাতর হইতেছ ও পরিতাপ করিতেছ? তোমার উপর রুষ্ট বা অসন্তুষ্ট হইবার কথা দূরে থাকুক, আমি কায়মনোবাক্যে, দেবতাদের নিকট, নিয়ত এই প্রার্থনা করিব, যেন জন্মান্তরে তোমার মত গুণের দেবর পাই; তুমি চিরজীবী হও। তুমি, অযোধ্যায় গিয়া, আর্য্যপুত্ত্রের চরণে আমার প্রণাম জানাইবে। ভরত, শত্রুঘ্ন, ও আমার ভগিনীদিগকে স্নেহসম্ভাষণ বলিবে; শ্বশ্রূদেবীরা ভগবান ঋষ্যশৃঙ্গের আশ্রম হইতে প্রত্যাগমন করিলে, তাঁহাদের চরণে আমার সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত নিবেদিত করিবে। বৎস, তোমায় আর একটি কথা বলিয়া দি। আমি চিরদুঃখিনী, বিধাতা আমার অদৃষ্টে সুখ লিখেন নাই; সুতরাং, আমার যে সর্ব্বনাশ ঘটিল, তাহাতে আমি দুঃখিত নহি। কিন্তু এই করিও, যেন আমার ভগিনীগুলি কষ্ট না পায়। তাহারা আমার নিমিত্ত অত্যন্ত শোকাকুল হইবে; যাহাতে ত্বরায় তাহাদের শোকনিবৃত্তি হয়, সে বিষয়ে তোমরা তিন জনে সতত যত্ন করিও; তাহারা সুখে থাকিলেও অনেক অংশে আমার দুঃখনিবারণ হইবে। তাহাদিগকে বলিবে, আমি আপন অদৃষ্টের ফলভোগ করিতেছি; আমার জন্য, শোকাকুল হইবার ও ক্লেশভোগ করিবার প্রয়োজন নাই।

 এই বলিয়া, স্নেহভরে বারংবার আশীর্বাদ করিয়া, সীতা লক্ষ্মণকে প্রস্থান করিতে বলিলেন। লক্ষ্মণ, বাষ্পাকুল লোচনে ও শোকাকুল বচনে, আর্য্যে, আমার অপরাধমার্জ্জনা করিবেন, অঞ্জলিবদ্ধ পূর্ব্বক এই কথা বলিয়া, পুনরায় প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করিয়া, নৌকায় আরোহণ করিলেন। সীতা অবিচলিত নয়নে নিরীক্ষণ করিয়া রহিলেন। নৌকা, অল্প ক্ষণেই, ভাগীরথীর অপর পারে সংলগ্ন হইল। লক্ষ্মণ তীরে উত্তীর্ণ হইলেন; এবং কিয়ৎ ক্ষণ, নিস্পন্দ নয়নে, জানকীরে নিরীক্ষণ করিয়া, অশ্রুবিসর্জন করিতে করিতে, রথে আরোহণ করিলেন। রথ চলিতে আরম্ভ করিল। যত ক্ষণ সীতাকে দেখিতে পাওয়া গেল, লক্ষ্মণ অনিমিষ নয়নে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন; সীতাও, চিত্রার্পিত প্রায়, রথে দৃষ্টিযোজনা করিয়া রহিলেন। রথ ক্রমে ক্রমে দূরবর্ত্তী হইল। তখন লক্ষ্মণ, আর সীতাকে লক্ষিত করিতে না পারিয়া, হাহাকার ও শিরে করাঘাত করিয়া, রোদন করিতে লাগিলেন। সীতাও, রথ নয়নপথবহির্ভূত হইবামাত্র, যূথবিরহিত কুররীর ন্যায়, উচ্চৈঃ স্বরে ক্রন্দন করিতে আরম্ভ করিলেন।

 সীতার ক্রন্দনশব্দ শ্রবণগোচর করিয়া, সন্নিহিত ঋষিকুমারেরা, শব্দ অনুসারে, ক্রন্দনস্থানে উপস্থিত হইলেন; দেখিলেন, এক অসূর্য্যম্পশ্যরূপা কামিনী, হাহাকার ও শিরে করাঘাত করিয়া, অশেষবিধ বিলাপ ও পরিতাপ করিতেছেন। দেখিয়া, তাঁহাদের কোমল হৃদয়ে, যার পর নাই, কারুণ্যরস আবির্ভূত হইল। তাঁহারা, ত্বরিত গমনে বাল্মীকিসমীপে উপস্থিত হইয়া, বিনয়নম্র বচনে নিবেদন করিলেন, ভগবন্, আমরা, ফল কুসুম কুশ সমিধ আহরণের নিমিত্ত, ভাগীরথী সন্নিহিত অটবীবিভাগে পর্য্যটন করিতেছিলাম; অকস্মাৎ স্ত্রীলোকের আর্ত্তনাদ শুনিতে পাইলাম; এবং ইতস্ততঃ অনুসন্ধান করিয়া, কিয়ৎ ক্ষণ পরে দেখিতে পাইলাম, এক অলৌকিক রূপলাবণ্যে পরিপূর্ণা কামিনী, নিতান্ত অনাথার ন্যায়, একান্ত কাতর হইয়া, উচ্চৈঃ স্বরে রোদন করিতেছেন। তাঁহাকে দেখিলে বোধ হয়, যেন কমলা দেবী ভূমণ্ডলে অবতীর্ণা হইয়াছেন। তিনি কে, কি কারণে রোদন করিতেছেন, কিছুই জানিতে পারিলাম না; কিন্তু, তাঁহার কাতরভাবের অবলোকন ও বিলাপবাক্যের আকর্ণন দ্বারা, আমাদের হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া গেল। আমরা, সাহস করিয়া, তাঁহাকে কোনও কথা জিজ্ঞাসা করিতে পারিলাম না। অবশেষে, আপনাকে সংবাদ দেওয়া উচিত বিবেচনায়, ক্ষণ মাত্র বিলম্ব না করিয়া, আপনকার নিকটে আসিয়াছি। এক্ষণে, যাহা বিহিত বোধ হয়, করুন।

 মহর্ষি, ঋষিকুমারদিগের মুখে এই বৃত্তান্ত শুনিয়া, তৎক্ষণাৎ ভাগীরথীতীরে উপস্থিত হইলেন; এবং, সীতার সম্মুখবর্ত্তী হইয়া, সস্নেহ সম্ভাষণ পুরঃসর, প্রশান্ত স্বরে বলিতে লাগিলেন, বৎসে, বিলাপ করিও না; কি কারণে তুমি আমার তপোবনে আসিয়াছ, তোমার আসিবার পূর্ব্বেই, আমি তাহার সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়াছি। তুমি মিথিলাধিপতি রাজা জনকের দুহিতা; কোশলাধিপতি মহারাজ দশরথের পুত্রবধূ; এবং রাজাধিরাজ রামচন্দ্রের মহিষী। রামচন্দ্র, অমূলক লোকাপবাদ শ্রবণে, চলচিত্ত ও সদসৎপরিবেদনাবিহীন হইয়া নিতান্ত নিরপরাধে, তোমায় নির্বাসিত করিয়াছেন। সীতা, সান্ত্বনাবাদ শ্রবণে, নয়নের অশ্রুমার্জ্জন করিলেন; এবং, সৌম্যমূর্ত্তি মহর্ষিকে সম্মুখবর্ত্তী দেখিয়া, গললগ্ন বসনে, তদীয় চরণে প্রণাম করিলেন। বাল্মীকি, রঘুকুলতিলক তনয় প্রসব কর, এই আশীর্বাদ করিয়া, বলিলেন, বৎসে, আর এখানে থাকিবার প্রয়োজন নাই, আমার আশ্রমে চল; আমি, আপন তনয়ার ন্যায়, তোমার রক্ষণাবেক্ষণ করিব। তথায় থাকিয়া, তুমি কোনও বিষয়ে কোনও ক্লেশ পাইবে না। জনপদবাসীরা, বন, এই শব্দ শুনিলে ভয়াকুল হয়; কিন্তু তপোবনে ভয়ের কোনও সম্ভাবনা নাই। ঋষিদের তপস্যার প্রভাবে, হিংস্র জন্তুরাও, স্বভাবসিদ্ধ হিংসাপ্রবৃত্তি দূরীভূত করিয়া, পরস্পর সৌহৃদ্য ভাবে কালহরণ করে। তপোবনের এরূপ মহিমা যে, স্বল্প কাল অবস্থিতি করিলেই, চিত্তের স্থৈর্য্যসম্পাদন হয়। তোমায় আসন্নপ্রসবা দেখিতেছি। প্রসবের পর, অপত্যসংস্কারবিধি যথাবিধি সমাহিত হইবে, কোনও অংশে অঙ্গহীন হইবে না। সমবয়স্কা মুনিকন্যারা তোমার সহচরী হইবেন; তাঁহাদের সহবাসে তোমার বিলক্ষণ চিত্তবিনোদন হইবে। বিশেষতঃ, তোমার পিতা আমার পরম বন্ধু; সুতরাং, আমার তপোবনে থাকিয়া, তোমার পিতৃগৃহবাসের সকল সুখ সম্পন্ন হইবে; আমি, অপত্যনির্বিশেষে, তোমার রক্ষণাবেক্ষণ করিব। অতএব, বৎসে, আর বিলম্ব করিও না, আমার অনুগামিনী হও।

 এই বলিয়া, সীতারে সমভিব্যাহারে লইয়া, মহর্ষি তপোবনে প্রবেশ করিলেন; এবং, সকল বিষয়ের সবিশেষ বলিয়া দিয়া, সমবয়স্কা মুনিকাদের হস্তে সীতার ভারার্পণ করিলেন। মুনিকন্যারা, তদীয়সমাগমলাভে, পরম প্রীতি ও পরিতোষ প্রাপ্ত হইলেন; এবং, যাহাতে ত্বরায় তাঁহার চিত্তের স্থৈর্য্যসম্পাদন হয়, সে বিষয়ে অশেষবিধ যত্ন করিতে লাগিলেন।