বিষয়বস্তুতে চলুন

সীতার বনবাস (ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ১৮৯৭)/পঞ্চম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

সীতাকে বনবাস দিয়া, রাম যার পর নাই অধৈর্য্য ও শোকাভিভূত হইলেন; এবং, আহার, বিহার, রাজকার্য্যপর্য্যালোচনা প্রভৃতি সমস্ত ব্যাপার একবারে বিসর্জন দিয়া, অন্যের প্রবেশপ্রতিষেধ পূর্ব্বক, একাকী, আপন বাসভবনে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। তিনি সীতাকে নিতান্ত পতিপ্রাণা ও একান্ত শুদ্ধচারিণী বলিয়া জানিতেন; এবং, পৃথিবীতে যত প্রিয় পদার্থ আছে, সর্ব্বাপেক্ষা তাঁহাকে অধিক ভাল বাসিতেন। বস্তুতঃ, উভয়ের এক মন, এক প্রাণ; কেবল, শরীর মাত্র বিভিন্ন ছিল। সীতা যেরূপ সাধুশীলা ও সরলান্তঃকরণা, রামও সর্ব্বাংশে তদনুরূপ ছিলেন; সীতা যেরূপ পতিপ্রাণা,; পতিহিতৈষিণী, পতিসুখে সুখিনী; রামও সেইরূপ সীতাগতপ্রাণ, সীতাহিতাকাঙ্ক্ষী ও সীতাসুখে সুখী ছিলেন। গৃহে রাজভোগে থাকিলে, তাঁহাদের যেরূপ সুখে সময় অতিবাহিত হইত; বনবাসে, পরস্পর সন্নিধান বশতঃ, বরং তদপেক্ষা অধিক সুখে কালযাপন হইয়াছিল। বনবাস হইতে বিনিবৃত্ত হইলে, তাঁহাদের পরস্পর প্রণয় ও অনুরাগ শত গুণে প্রগাঢ় হইয়া উঠে। উভয়েই উভয়কে, এক মুহূর্ত্তের নিমিত্ত, নয়নের অন্তরাল করিতে পারিতেন না। রাম, কেবল লোকবিরাগসংগ্রহের ভয়ে সীতাকে নির্বাসিত করিয়াছিলেন; সুতরাং, সীতানির্বাসনশোক তাঁহার একান্ত অসহ্য হইয়া উঠিল।

 রামের আন্তরিক অসুখের সীমা ছিল না। কেনই আমি রাজবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলাম; কেনই আমি বনবাস হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইলাম; কেনই আমি পুনরায় রাজ্যের ভারগ্রহণ করিলাম; কেনই আমি দুর্মুখকে, পৌরগণের ও জানপদবর্গের অভিপ্রায়পরিজ্ঞানের নিমিত্ত, নিয়োজিত করিলাম; কেনই আমি লক্ষ্মণের উপদেশ অনুসারে না চলিলাম; কেনই আমি, নিতান্ত নৃশংস হইয়া, সীতারে বনবাস দিলাম; কেনই আমি, নিরতিশয় ক্লেশকর অকিঞ্চিৎকর রাজ্যভারবিসর্জন দিয়া, সীতার সমভিব্যাহারী না হইলাম; কি বলিয়া মনকে প্রবোধ দিব; কেমন করিয়া প্রাণধারণ করিব; প্রিয়ারে বনবাস দেওয়া অপেক্ষা, আমার আত্মঘাতী হওয়া সহস্র গুণে শ্রেয়ঃকল্প ছিল; ইত্যাদি প্রকারে, তিনি, অহোরাত্র, বিলাপ ও পরিতাপ করিতে লাগিলেন। দুঃসহ শোকানলে নিরন্তর জ্বলিত হইয়া, তাঁহার শরীর, অল্প দিনের মধ্যেই, অর্দ্ধাবশিষ্ট হইল।

 তৃতীয় দিবস, মধ্যাহ্ন সময়ে, লক্ষ্মণ, নিতান্ত দীনভাবাপন্ন মনে, অযোধ্যায় প্রবেশ করিলেন; এবং, সর্ব্বাগ্রে রামচন্দ্রের বাসভবনে গমন করিয়া, কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁহার সম্মুখদেশে দণ্ডায়মান হইয়া, গলদশ্রু লোচনে, গদ্গদ বচনে নিবেদন করিলেন, আর্য্য, দুরাত্মা লক্ষ্মণ আপনকার আজ্ঞাপ্রতিপালন করিয়া আসিল। রাম, অবলোকন ও আকর্ণনমাত্র, হা প্রেয়সি! বলিয়া, মূর্চ্ছিত ও ভূতলে পতিত হইলেন। লক্ষ্মণ, একান্ত শোকভারাক্রান্ত হইয়াও, বহু যত্নে, তাঁহার চৈতন্যসম্পাদন করিলেন। তখন তিনি, কিয়ৎ ক্ষণ শূন্য নয়নে লক্ষ্মণের মুখনিরীক্ষণ করিয়া, হাহাকার ও অতিদীর্ঘনিশ্বাসভারপরিত্যাগ পূর্ব্বক, ভাই লক্ষ্মণ! তুমি জানকীরে কোথায় রাখিয়া আসিলে; আমি, তাঁহার বিরহে, কেমন করিয়া প্রাণধারণ করিব; আর যে যাতনা সহ্য হয় না; এই বলিয়া, লক্ষ্মণের গলায় ধরিয়া, উচ্চৈঃ স্বরে রোদন করিতে লাগিলেন। উভয়েই, অধৈর্য্য হইয়া, কিয়ৎ ক্ষণ বাষ্পবিসর্জন করিলেন। অনন্তর লক্ষ্মণ, অতি কষ্টে, স্বীয় শোকাবেগের সংবরণ করিয়া, রামের সান্ত্বনার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। রাম, কিঞ্চিৎ শান্তচিত্ত হইয়া, লক্ষ্মণের মুখে সীতাবিলাপান্ত’ সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইলেন। নয়নজলে বক্ষঃস্থল ভাসিয়া গেল; ঘন ঘন নিশ্বাস বহিতে লাগিল; কণ্ঠরোধ হইয়া, তিনি বাক্‌শক্তিরহিত হইয়া রহিলেন; এবং, পূর্ব্বাপর সমস্ত ব্যাপারের আলোচনা করিতে করিতে, দুঃসহ শোকভার আর সহ্য করিতে না পারিয়া, পুনরায় মূর্চ্ছিত হইলেন।

 লক্ষ্মণ, পুনরায় পরম যত্নে, রামচন্দ্রের চৈতন্যসম্পাদন করিলেন; এবং, তাঁহার তাদৃশী দশা দেখিয়া, মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিলেন, আর্য্য যে দুস্তর শোকসাগরে পরিক্ষিপ্ত হইলেন, তাহাতে এ জন্মে আর সুস্থচিত্ত হইতে পারিবেন না। শোকাপনোদনের কোনও উপায় দেখিতেছি না। যাহা হউক, সান্ত্বনার চেষ্টা করা আবশ্যক। তিনি, এইরূপ আলোচনা করিয়া, বিনয়পূর্ণ প্রণয়গর্ভ বচনে বলিলেন, আর্য্য, শোকে ও মোহে এরূপ অভিভূত হওয়া, ভবাদৃশ মহানুভাবের পক্ষে, কদাচ উচিত নহে। আপনি সকলই বুঝিতে পারেন। যাদৃশ বিধিনির্বন্ধ ছিল, ঘটিয়াছে; নতুবা আপনি, অকারণে, অথবা সামান্য কারণে, আর্য্যাকে বিসর্জন দিবেন, ইহা কাহার মনে ছিল! বিবেচনা করিয়া দেখুন, সংসারে কিছুই চির দিনের জন্য নহে। বৃদ্ধি হইলেই ক্ষয় আছে; উন্নতি হইলেই পতন হয়; সংযোগ হইলেই বিয়োগ ঘটে; জীবন হইলেই মরণ হইয়া থাকে। এই চিরপরিচিত সাংসারিক নিয়মের, কোনও কালে, অন্যভাব দেখিতে পাওয়া যায় না। এই সমুদয়ের আলোচনা করিয়া, আপনকার শোকসংবরণ করা উচিত, বিশেষতঃ, আপনি সকল লোকের হিতানুশাসন কার্য্যের ভার গ্রহণ করিয়াছেন; সে জন্যও আপনকার শোকাভিভূত হওয়া বিধেয় নহে। প্রিয়বিয়োগ ও অপ্রিয়সংযোগ শোকের কারণ, তাহার সন্দেহ নাই; কিন্তু ভবাদৃশ মহানুভাবদিগের একান্ত শোকাভিভূত হওয়া কদাচ উচিত হয় না। প্রাকৃত লোকেই শোকে ও মোহে বিচেতন হইয়া থাকে। অতএব, ধৈর্য্য অবলম্বন করুন; এবং, অন্তঃকরণ হইতে অকিঞ্চিৎকর শোককে নিষ্কাশিত করিয়া, রাজকার্য্যে মনোনিবেশ করুন। আর, আপনকার ইহারও অনুধাবন করা আবশ্যক, আপনি, কেবল লোকবিরাগসংগ্রহের ভয়ে, আর্য্যারে নির্বাসিত করিয়াছেন। আর্য্যাকে গৃহে রাখিলে, প্রজালোকে বিরাগ প্রদর্শন করিবে, কেবল এই আশঙ্কায়, আপনি তাঁহাকে বনবাস দিয়াছেন। এক্ষণে, তাঁহার নিমিত্ত শোকাকুল হইলে, সে আশঙ্কার নিরাস হইতেছে না। সুতরাং, যে দোষের পরিহারমানসে, আপনি ঈদৃশ দুষ্কর কর্ম্ম করিলেন, সেই দোষ পূর্ব্ববৎ প্রবল রহিতেছে; আর্য্যার পরিত্যাগে কোনও ফলোদয় হইতেছে না। আর, ইহারও অনুধাবন করা আবশ্যক, আপনি যত দিন শোকাভিভূত থাকিবেন, রাজকার্য্যে মনোনিবেশ করিতে পারিবেন না। প্রজাপালনকার্য্য উপেক্ষিত হইলে, রাজধর্ম্মপ্রতিপালন হয় না। অতএব, সকল বিষয়ের সবিশেষ পর্য্যালোচনা করিয়া, ধৈর্য্য অবলম্বন করুন; আর অধিক শোক ও মনস্তাপ করা কোনও ক্রমেই শ্রেয়স্কর নহে। অতীত বিষয়ের অনুশোচনায় কালহরণ করা সদ্বিবেচনার কার্য্য নয়।

 লক্ষ্মণ এই বলিয়া বিরত হইলে, রাম কিয়ৎ ক্ষণ মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন; অনন্তর, সস্নেহ সম্ভাষণ পূর্ব্বক বলিলেন, বৎস, তোমার উপদেশবাক্য শুনিয়া, আমার জ্ঞানোদয় হইল। তুমি যথার্থ বলিয়াছ, আমি, যে উদ্দেশে, জানকীরে বনবাস দিয়া, রাক্ষসের ন্যায়, নিরতিশয় নৃশংস আচরণ করিলাম; এক্ষণে তাঁহার জন্য শোকাকুল হইলে, তাহা বিফল হইয়া যায়। বিশেষতঃ, শোকের ধর্ম্মই এই, তাহাতে অভিভূত হইলে, উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই প্রাপ্ত হইতে থাকে। শোকাভিভূত ব্যক্তি অভীষ্টলাভ করিতে পারে না, কেবল কর্ত্তব্য কর্ম্মে উপেক্ষা বশতঃ প্রত্যবায়গ্রস্ত হয়। অতএব, এই মুহূর্ত্ত অবধি, আমি শোকসংবরণে যত্নবান্ হইলাম। প্রতিজ্ঞা করিতেছি, আর আমি শোকে অভিভূত হইব না। প্রজালোকে, কোনও ক্রমে, আমায় শোকাভিভূত বোধ করিতে পারিবে না। অমাত্যদিগকে বল, কল্য অবধি, রীতিমত রাজকার্য্যপর্য্যালোচনায় প্রবৃত্ত হইব; তাঁহারা যেন, যথাকালে সমস্ত আয়োজন করিয়া, কার্য্যালয়ে উপস্থিত থাকেন।

 এই বলিয়া, রামচন্দ্র, অবনত বদনে, কিয়ৎ ক্ষণ মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন; অনন্তর, অশ্রুপূর্ণ লোচনে, আকুল বচনে বলিতে লাগিলেন, হায়! রাজত্ব কি বিষম অসুখের ও বিপদের আস্পদ! লোকে, কি সুখভোগের লোভে, রাজ্যাধিকারলাভের কামনা করে, কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। রাজ্যের ভার গ্রহণ করিয়া, আমায়, এ জন্মের মত, সকল সুখে জলাঞ্জলি দিতে হইল। যার পর নাই, নৃশংস হইয়া, নিতান্ত নিরপরাধে, প্রিয়ারে বনবাস দিলাম। এক্ষণে, তাঁহার জন্য যে অশ্রুপাত করিব, তাহারও পথ নাই। রাজত্বলাভে এই ফল দর্শিয়াছে যে, আমাকে স্নেহ, দয়া, মমতা, ও ভদ্রতার বিসর্জ্জন দিতে হইল। উত্তরকালীন লোকেরা, নিতান্ত নৃশংস অথবা নিতান্ত অপদার্থ বলিয়া, আমায় গণনা ও কলঙ্কঘোষণা করিবে।

 এইরূপ আক্ষেপ করিয়া, রাম, কিয়ৎ ক্ষণ পরে, লক্ষ্মণকে বিদায় দিলেন; এবং, ধৈর্য্যাবলম্বন ও শোকাবেগসংবরণ পূর্ব্বক, পর দিন প্রভাত অবধি, যথানিয়মে রাজকার্য্যপর্য্যালোচনায় প্রবৃত্ত হইলেন। এই রূপে, তিনি রাজকার্য্যপর্যবেক্ষণে মনোনিবেশ করিলেন বটে; এবং লোকেও, বাহ্য আকার দর্শনে, বোধ করিতে লাগিল, রামচন্দ্র বড় ধৈর্য্যশীল, অনায়াসেই দুঃসহ শোকের সংবরণ করিলেন। কিন্তু, তাঁহার কোমল অন্তঃকরণ নিরন্তর দুর্বিষহ শোকদহনে দগ্ধ হইতে লাগিল। নিতান্ত নিরপরাধে প্রিয়ারে বনবাস দিয়াছি, এই শোক ও ক্ষোভ, বিষদিগ্ধ শল্যের ন্যায়, তাঁহাকে সতত মর্ম্মবেদনা প্রদান করিতে লাগিল। কেবল লোকবিরাগসংগ্রহের ভয়ে, তিনি জানকীরে নির্বাসিত করেন; এক্ষণেও, কেবল সেই লোকবিরাগসংগ্রহের ভয়েই, বাহ্য আকারে শোকসংবরণ করিলেন। যৎকালে, তিনি, নৃপাসনে আসীন হইয়া, মুর্ত্তিমান্ ধর্ম্মের ন্যায়, স্থির চিত্তে রাজকার্য্যপর্য্যালোচনা করিতেন, তখন তাঁহাকে দেখিয়া লোকে রোধ করিত, ভূমণ্ডলে তাঁহার তুল্য ধৈর্য্যশীল পুরুষ আর নাই। কিন্তু, রাজকার্য্য হইতে অবসৃত হইয়া, বিশ্রামভবনে প্রবেশ করিলেই, তিনি যৎপরোনাস্তি বিকলচিত্ত হইতেন। লক্ষ্মণ সদা সন্নিহিত থাকিতেন, এবং সান্ত্বনা করিবার নিমিত্ত অশেষবিধ প্রয়াস পাইতেন। কিন্তু, লক্ষ্মণের সান্ত্বনাবাক্যে, তাঁহার শোকানল প্রবল বেগে প্রজ্বলিত হইয়া উঠিত। ফলতঃ, তিনি, কেবল হাহাকার, বাষ্পমোচন, আত্মভর্ৎসন, ও সীতার গুণকীর্ত্তন করিয়া, বিশ্রামসময় অতিবাহিত করিতেন। এই রূপে দুর্নিবার সীতাবিবাসনশোকে একান্ত আক্রান্ত হইয়া, তিনি দিন দিন কৃশ, মলিন, দুর্বল, ও সর্ব্ব বিষয়ে নিতান্ত নিরুৎসাহ হইতে লাগিলেন। বস্তুতঃ, রাজকার্য্য ব্যতীত, আর কোনও বিষয়েই তাঁহার প্রবৃত্তি ও উৎসাহ রহিল না।

 এ দিকে, কিয়ৎ দিন পরে, জানকী দুই যমল কুমার প্রসব করিলেন। মহর্ষি বাল্মীকি, যথাবিধানে জাতকর্ম্মপ্রভৃতি ক্রিয়াকলাপ সম্পন্ন করিয়া, জ্যেষ্ঠের নাম কুশ ও কনিষ্ঠের নাম নাম লব রাখিলেন। মুনিতনয়ারা, সীতার সন্তান প্রসব দর্শনে, যার পর নাই, হর্ষ প্রদর্শন করিতে লাগিলেন। সমস্ত আশ্রমে অতি মহান্ আনন্দকোলাহল হইতে লাগিল। সীতা, দুঃসহ প্রসববেদনায় অভিভূত হইয়া, কিয়ৎ ক্ষণ অচেতনপ্রায় ছিলেন। তিনি অপেক্ষাকৃত সাচ্ছন্দ্যলাভ করিলে, মুনিতনয়ারা, উল্লসিত মনে, প্রীতিপূর্ণ বচনে বলিলেন, জানকি, আজ বড় আনন্দের দিন; সৌভাগ্যক্রমে, তুমি পরম সুন্দর কুমারযুগল প্রসব করিয়াছ। সীতা, শ্রবণমাত্র, অতিমাত্র প্রফুল্ল ও আহ্লাদসাগরে মগ্ন হইলেন; কিন্তু, কিয়ৎ ক্ষণ পরে, শোকভরে নিতান্ত অভিভূত হইয়া, অবিরল ধারায় অশ্রুবিসর্জন করিতে লাগিলেন। তদ্দর্শনে মুনিকন্যারা, সস্নেহ সম্ভাষণ সহকারে, জিজ্ঞাসা করিলেন, অয়ি জানকি, এমন আনন্দের সময় শোকাকুল হইলে কেন? বাষ্পভরে জানকীর কণ্ঠরোধ হইয়াছিল; এজন্য, তিনি কিয়ৎ ক্ষণ কোনও উত্তর করিতে পারিলেন না; অনন্তর, উচ্ছলিত শোকাবেগের কিঞ্চিৎ সংবরণ করিয়া, বলিলেন, অয়ি প্রিয়সখিগণ, তোমরা কি কিছুই জান না, যে আমি, এমন আনন্দের সময়, কি জন্য শোকাকুল হইলাম, জিজ্ঞাসা করিতেছ? পুত্ত্রপ্রসব করিলে, স্ত্রীলোকের আহ্লাদের একশেষ হয়, যথার্থ বটে; কিন্তু, কেমন অবস্থায়, আমার সেই আহ্লাদের সময় উপস্থিত হইয়াছে। আমার যে, এ জন্মের মত, সকল সুখ, সকল সাধ, সকল আহ্লাদ ফুরাইয়া গিয়াছে। যদি এই হতভাগ্যেরা আমার গর্ভে না থাকিত, তাহা হইলে, যে মুহূর্ত্তে লক্ষ্মণ পরিত্যাগবাক্য শুনাইলেন, সেই মুহূর্ত্তে আমি, জাহ্নবীজলে প্রবেশ করিয়া, প্রাণত্যাগ করিতাম; অথবা, অন্য কোনও প্রকারে, আত্মঘাতিনী হইতাম। আমায় কি আবার প্রাণ রাখিতে হয়, না লোকালয়ে মুখ দেখাইতে হয়।

 এই রলিয়া, একান্ত শোকভারাক্রান্ত হইয়া, জানকী, অনিবার্য্য বেগে, বাষ্পবারি বিসর্জন করিতে লাগিলেন। মুনিকন্যারা, সীতার ঈদৃশ হৃদয়বিদারণ বিলাপবাক্য শ্রবণগোচর করিয়া, নিরতিশয় দুঃখিত হইলেন, এবং প্রণয়পূর্ণ বচনে বলিতে লাগিলেন, প্রিয়সখি, শোকাবেগের সংবরণ কর; যাহা বলিতেছ, যথার্থ বটে; কিন্তু, অধিক দিন, তোমায় এ অবস্থায় কালযাপন করিতে হইবে না। রাজা রামচন্দ্রের বুদ্ধিবিপর্য্যয় ঘটিয়াছিল; তাহাতেই তিনি, কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় হইয়া, ঈদৃশ অদৃষ্টচর অশ্রুতপূর্ব্ব নৃশংস আচরণ করিয়াছেন। আমরা পিতার মুখে শুনিয়াছি, তুমি অচিরে পরিগৃহীতা হইবে; অতএব শোকসংবরণ কর। মুনিতনয়াদিগের সান্ত্বনাবাদ শ্রবণে, সীতার নয়নযুগল হইতে, প্রবল বেগে, বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল। তদ্দর্শনে মুনিতনয়াদিগের কোমল হৃদয় দ্রবীভূত হইল; তাঁহারাও, শোকাভিভূত হইয়া, প্রভূত বাষ্পবারি বিমোচন করিতে লাগিলেন।

 এই সময়ে, সদ্যঃপ্রসূত বালকেরা রোদন করিয়া উঠিল। স্নেহের এমনই মহিমা ও মোহিনী শক্তি যে, তাহাদের ক্রন্দনশব্দ কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইবামাত্র, জানকী এককালে সকল শোক বিস্মৃত হইলেন, এবং স্নেহভরে তাহাদের সান্ত্বনা করিতে লাগিলেন।

 কুমারেরা, শুক্লপক্ষীয় শশধরের ন্যায়, দিন দিন বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া, জানকীর নয়নের ও মনের অনির্বচনীয় আনন্দসম্পাদন করিতে লাগিল। যখন তাহারা, আধ আধ কথায়, মা মা বলিয়া আহ্বান করিত; যখন তাহাদের সন্নিবেশিতমুক্তাকলাপসদৃশ দন্তগুলি দৃষ্টিগোচর হইত; যখন তাহাদের অর্দ্ধোচ্চারিত মৃদু মধুর বচনপরম্পরা তাঁহার কর্ণকুহরে প্রবেশ করিত; যখন তিনি, তাহাদিগকে ক্রোড়ে লইয়া, স্নেহভরে তাহাদের মুখচুম্বন করিতেন; তখন তিনি সকল শোক বিস্মৃত হইতেন; তাঁহার সর্ব্ব শরীর, অমৃতাভিষিক্তের ন্যায়, শীতল, ও নয়নযুগল আনন্দাশ্রুসলিলে পরিপ্লুত হইত।

 কুশ ও লব পঞ্চমবর্ষীয় হইলে, মহর্ষি বাল্মীকি, তাহাদের চূড়াকর্ম্মসম্পাদন করিয়া, বিদ্যারম্ভ করাইলেন। বালকেরা, অসাধারণ বুদ্ধি, মেধা, ও প্রতিভার প্রভাবে, অল্প কাল মধ্যেই, বিবিধ বিদ্যায় বিলক্ষণ ব্যুৎপন্ন হইয়া উঠিল। ইতঃপূর্বে বাল্মীকি, রাবণবধ পর্য্যন্ত লোকোত্তর রামচরিত অবলম্বন করিয়া, রামায়ণ নামে বহুবিস্তৃত মহাকাব্যের রচনা করিয়াছিলেন। সর্ব্বপ্রথম, তিনি সেই অমৃতরসবর্ষী অপূর্ব্ব মহাকাব্য, রামচন্দ্রের পুত্রদিগকে অধ্যয়ন করাইলেন। তাহারা, স্বল্প সময়েই, সেই বিচিত্র গ্রন্থ আদ্যন্ত কণ্ঠস্থ করিল; এবং, সীতার সমক্ষে মধুর স্বরে আবৃত্তি করিয়া, তাঁহার শোকনিবৃত্তি করিতে লাগিল। একাদশ বর্ষে, মহর্ষি, তাহাদের উপনয়নসংস্কার সম্পন্ন করিয়া, বেদ পড়াইতে আরম্ভ করিলেন। বালকেরা সংবৎসর কালেই, সমগ্র বেদশাস্ত্রে সম্পূর্ণ অধিকারলাভ করিল।

 কুশ ও লবের বয়ঃক্রম পূর্ণ দ্বাদশ বৎসর হইল; কিন্তু তাহারা, কে, এ পর্য্যন্ত তাহারা তাহার কিছুমাত্র জানিতে পারিল না। তাহারা ঋষিকুমার ও তাহাদের জননী ঋষিপত্নী, তাহাদের এই সংস্কার জন্মিয়াছিল। ফলতঃ, জানকী যে ভাবে তপোবনে কালযাপন করিতেন; তাঁহাকে দেখিলে, কেহ ঋষিপত্নী ব্যতীত আর কিছুই বোধ করিতে পারিত না; এবং তাহাদেরও দুই সহোদরের আচার ও অনুষ্ঠান নয়নগোচর করিলে, ঋষিকুমার ব্যতিরিক্ত অন্যবিধ বোধ জন্মিবার সম্ভাবনা ছিল না। তাহারা জানকীকে জননী বলিয়া জানিত; কিন্তু তিনি যে মিথিলাধিপতির তনয়া, অথবা কোশলাধিপতির মহিষী, তাহা জানিতে পারে নাই। বাল্মীকি, যত্নপূর্ব্বক, এই বিষয় তাহাদের বোধবিষয় হইতে সঙ্গোপিত করিয়া রাখিয়াছিলেন; এবং তপোবনবাসীদিগকে এরূপ সাবধান করিয়া দিয়াছিলেন যে, কেহ, ভ্রমক্রমেও, তাহাদের সমক্ষে, এ বিষয়ের প্রসঙ্গ করিত না; আর, সীতাকেও বিশেষ করিয়া বলিয়া দিয়াছিলেন যে, তিনিও যেন, কোনও ক্রমে, তনয়দিগের নিকট আত্মপরিচয়প্রদান না করেন; তদনুসারে, সীতাও, তাহাদের নিকট, কখনও স্বসংক্রান্ত কোনও কথার উল্লেখ করেন নাই। তাহারা রামায়ণে রামের ও সীতার সবিশেষ বৃত্তান্ত অবগত হইয়াছিল; কিন্তু তাহাদের জননী যে জনকনন্দিনী, অথবা রামের সহধর্ম্মিণী, তাহা জানিতে পারে নাই; সুতরাং, ঐ মহাকাব্যে নিজ জনক জননীর বৃত্তান্ত বর্ণিত হইয়াছে, তাহা বুঝিতে পারে নাই। এই রূপে, এতাবৎ কাল পর্য্যন্ত কুশ ও লব আত্মস্বরূপপরিজ্ঞানে সম্পূর্ণরূপ অনধিকারী ছিল।

 জননীর অনির্বচনীয়স্নেহসহকৃত প্রযত্ন ব্যতিরেকে, যত দিন পর্য্যন্ত, সন্তানের জীবনরক্ষা সম্ভাবিত নয়; তাবৎ কাল জানকী, সর্ব্বশোকবিস্মরণ পূর্ব্বক, অনন্যমনা ও অনন্যকর্ম্মা হইয়া, কুশ ও লবের লালন পালনে ব্যাপৃত ছিলেন। তাহাদের শৈশবকাল অতিক্রান্ত হইলে, মাতৃত্বের তাদৃশী অপেক্ষা রহিল না। তখন তিনি, তাহাদের বিষয়ে এক প্রকারে নিশ্চিন্ত হইয়া, ঋষিপত্নীদিগের ন্যায়, তপস্যায় মনোনিবেশ করিলেন। রামচন্দ্রের সর্ব্বাঙ্গীণমঙ্গলকামনাই তদীয় তপস্যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল। যদিও রাম নিতান্ত নিরপরাধে পরিত্যাগ করিয়াছিলেন; তথাপি, এক ক্ষণের জন্য, সীতার অন্তঃকরণে তাঁহার প্রতি রোষ বা বিরাগের উদয় হয় নাই। তিনি যে দুস্তর শোকসাগরে পরিক্ষিপ্ত হইয়াছিলেন, তাহা কেবল তাঁহার নিজের ভাগ্যদোষেই ঘটিয়াছে, এই বিবেচনা করিতেন; ভ্রমক্রমেও ভাবিতেন না যে, সে বিষয়ে রামচন্দ্রের কোনও অংশে কিছুমাত্র দোষ আছে। বস্তুতঃ, রামচন্দ্রের প্রতি তাঁহার যেরূপ অবিচলিত ভক্তি ও ঐকান্তিক অনুরক্তি ছিল, তাহার কিঞ্চিন্মাত্র ব্যতিক্রম ঘটে নাই। তিনি দেবতাদিগের নিকট, কায়মনোবাক্যে, নিয়ত এই প্রার্থনা করিতেন, যেন রামচন্দ্র কুশলে থাকেন; এবং জন্মান্তরে, তিনি যেন রামচন্দ্রেরই সহধর্ম্মিণী হয়েন। তিনি, দিবাভাগে, তপস্যাকার্য্যে ব্যাপৃত ও সখীভাবাপন্ন ঋষিকন্যাগণে পরিবৃত থাকিয়া, কথঞ্চিৎ কালযাপন করিতেন। কিন্তু, যামিনীযোগে একাকিনী হইলেই, তাঁহার দুর্নিবার শোকসিন্ধু উথলিয়া উঠিত। তিনি, কেবল রামচন্দ্রের চিন্তায় মগ্ন হইয়া, ও অবিশ্রান্ত অশ্রুপাত করিয়া, যামিনীযাপন করিতেন। ফলকথা এই, সীতা যেরূপ পতিপ্রাণা ছিলেন, তাহাতে অকাতরে বিরহযাতনা সহ্য করিতে পারিবেন, ইহা কোনও ক্রমে সম্ভাবিত নহে। কালসহকারে, সকলেরই শোক শিথিল হইয়া যায়; কিন্তু জানকীর শোক সর্ব্ব ক্ষণ নবীভাবাপন্ন ছিল। এই রূপে, ক্রমাগত দ্বাদশ বৎসর, দুর্বিষহ শোকদহনে নিরন্তর অন্তর্দাহ হওয়াতে, জানকীর অলৌকিক রূপ ও লাবণ্য এককালে অন্তর্হিত, এবং কলেবর চর্ম্মাবৃত কঙ্কাল মাত্রে পর্য্যবসিত হইল।