সীতার বনবাস (ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ১৮৯৭)/ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
রাজা রামচন্দ্র, অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠানে কৃতসঙ্কল্প হইয়া, বশিষ্ঠ, জাবালি, কাশ্যপ, বামদেব প্রভৃতি মহর্ষিবর্গের নিকট স্বীয় অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলেন। বশিষ্ঠদেব, শ্রবণমাত্র, সাধুবাদপ্রদান পূর্ব্বক বলিলেন, মহারাজ, উত্তম সঙ্কল্প করিয়াছেন। আপনি সসাগরা সদ্বীপা পৃথিবীর অদ্বিতীয় অধিপতি; অখণ্ড ভূমণ্ডলে যেরূপ একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন, পূর্ব্বতন কোনও নরপতি সেরূপ করিতে পারেন নাই। রামরাজ্যে প্রজালোকে যেরূপ সুখে ও স্বচ্ছন্দে কালযাপন করিতেছে, তাহা অদৃষ্টচর ও অশ্রুতপূর্ব্ব। রাজ্যভার গ্রহণ করিয়া, যে বিষয়ের অনুষ্ঠান করিতে হয়, আপনি তাহার কিছুই অসম্পাদিত রাখেন নাই; রাজকর্ত্তব্যের মধ্যে অশ্বমেধ মাত্র অবশিষ্ট আছে; তাহা সম্পাদিত হইলেই, আপনকার রাজ্যাধিকার আর কোনও অংশে অঙ্গহীন থাকে না। আমরা ইতঃপূর্ব্বে ভাবিয়াছিলাম, এ বিষয়ে মহারাজের নিকট প্রস্তাব করিব। যাহা হউক, যখন মহারাজ স্বয়ং সেই অভিলষিত বিষয়ের অনুষ্ঠানে উদযুক্ত হইয়াছেন, তখন আর তদ্বিষয়ে বিলম্ব করা বিধেয় নহে; অবিলম্বে তদুপযোগী আয়োজনের আদেশ প্রদান করুন।
বশিষ্ঠদেব বিরত হইবামাত্র, রামচন্দ্র পার্শ্বোপবিষ্ট অনুজদিগের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া বলিলেন, ভ্রাতৃগণ, ইনি যাহা বলিলেন, শ্রবণ করিলে; এক্ষণে, তোমাদের অভিপ্রায় অবগত হইলেই, কর্ত্তব্যনিরূপণ করি। আজ্ঞানুবর্ত্তী অনুজেরা, তৎক্ষণাৎ, আন্তরিক অনুমোদন প্রদর্শন করিলেন। তখন রাম বশিষ্ঠদেরকে সম্বোধিয়া বলিলেন, ভগবন্, যখন আমার অভিলাষ আপনাদের অভিমত ও অনুজদিগের অনুমোদিত হইতেছে, তখন আর তদনুযায়ী অনুষ্ঠানের কর্ত্তব্যতাবিষয়ে কোনও সংশয় নাই। এক্ষণে আমার বাসনা এই, নৈমিষারণ্যে অভিপ্রেত মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান হয়। নৈমিষারণ্য পরম পবিত্র যজ্ঞক্ষেত্র। এ বিষয়ে আপনকার কি অনুমতি হয়। বশিষ্ঠদেব তৎক্ষণাৎ সম্মতি প্রদান করিলেন।
অনন্তর, রামচন্দ্র অনুজদিগকে বলিলেন, দেখ, যখন কর্ত্তব্য স্থির হইল, তখন আর অনর্থক কালহরণ করা বিধেয় নহে। তোমরা সত্বর সমস্ত আয়োজন কর। অনুগত, শরণাগত, ও মিত্রভাবাপন্ন নৃপতিদিগের নিমন্ত্রণ কর। সময়নির্দেশ পূর্ব্বক, সমস্ত নগরে ও জনপদে এ বিষয়ের ঘোষণা করিয়া দাও। লঙ্কাসমরসহায় সুহৃদ্বর্গের পরম সমাদরে আহ্বান কর; তাঁহারা আমাদের যথার্থ বন্ধু, আমাদের জন্য, অকাতরে কত ক্লেশ সহ্য করিয়াছেন; তাঁহারা আসিলে, আমি পরম সুখী হইব। এতদতিরিক্ত, যাবতীয় ঋষিদিগের নিমন্ত্রণ কর; তাঁহারা যজ্ঞক্ষেত্রে আগমন করিলে, আমি আপনাকে চরিতার্থ জ্ঞান করিব। ভরত, তুমি, অবিলম্বে নৈমিষক্ষেত্রে গিয়া, যজ্ঞভূমিনির্ম্মাণের উদ্যোগ কর। লক্ষ্মণ, তুমি, আবশ্যক সমস্ত দ্রব্যের যথোচিত আয়োজন করিয়া, তৎসমুদয় সত্ত্বর তথায় পাঠাইয়া দাও। দেখ, যজ্ঞ দেখিবার নিমিত্ত, নৈমিষে অসংখ্য লোকের সমাগম হইবে; অতএব, যত্নপূর্ব্বক, সমস্ত বিষয়ের এরূপ আয়োজন করিবে, যেন, কোনও বিষয়ের অসঙ্গতি নিবন্ধন, কাহারও কোনও অংশে ক্লেশ বা অসুবিধা না ঘটে। তুমি সকল বিষয়ে পারদর্শী; তোমায় অধিক উপদেশ দিবার প্রয়োজন নাই।
এই বলিয়া রাম বিরত হইলে, বশিষ্ঠদেব বলিলেন, মহারাজ, সকল বিষয়েরই উচিতাধিক আয়োজন হইবে, সন্দেহ নাই; কিন্তু, আমি এক বিষয়ের একান্ত অসঙ্গতি দেখিতেছি। তখন রাম বলিলেন, আপনি কোন বিষয়ে অসঙ্গতির আশঙ্কা করিতেছেন, বলুন। বশিষ্ঠ বলিলেন, মহারাজ, শাস্ত্রকারেরা বলেন, সস্ত্রীক হইয়া ধর্ম্মকার্য্যের অনুষ্ঠান করিতে হয়। অতএব, জিজ্ঞাসা করি; সে বিষয়ের কি ব্যবস্থা হইবে। শ্রবণমাত্র, রামের মুখকমল ম্লান ও নয়নযুগল অশ্রুজলে পরিপ্লুত হইয়া উঠিল। তিনি, কিয়ৎ ক্ষণ, অবনত বদনে, মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন; অনন্তর, দীর্ঘনিশ্বাসপরিত্যাগ পূর্ব্বক, নয়নের অশ্রুমার্জ্জন ও উচ্ছলিত শোকাবেগের সংবরণ করিয়া বলিলেন, ভগবন্, ইতঃপূর্বে এ বিষয়ে আমার উদ্বোধ মাত্র হয় নাই; এক্ষণে, কি কর্ত্তব্য, উপদেশ করুন। বশিষ্ঠদেব, অনেক ক্ষণ একাগ্র চিত্তে চিন্তা করিয়া, বলিলেন, মহারাজ, পুনরায় দারপরিগ্রহ ব্যতিরেকে, আর কোনও উপায় দেখিতেছি না।
বশিষ্ঠবাক্য শ্রবণগোচর করিয়া, সকলেই এককালে মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন। রাম নিতান্ত সীতাগতপ্রাণ; কেবল লোকবিরাগসংগ্রহভয়ে সীতাকে বনবাস দিয়া, জীবন্মৃত হইয়া ছিলেন। তাঁহার প্রতি রামের যে অবিচলিত স্নেহ ও ঐকান্তিক অনুরাগ ছিল; এ পর্য্যন্ত তাহার কিছুমাত্র ব্যতিক্রম হয় নাই। সীতার মোহিনী মূর্ত্তি অহোরাত্র তাঁহার অন্তঃকরণে জাগরূক ছিল। তিনি যে, উপস্থিত কার্য্যের অনুরোধে, পুনরার দারপরিগ্রহে সম্মত হইবেন, তাহার কোনও সম্ভাবনা ছিল না। যাহা হউক, বশিষ্ঠদেব দারপরিগ্রহ বিষয়ে বারংবার অনুরোধ করিতে লাগিলেন। কিন্তু রামচন্দ্র, সে বিষয়ে ঐকান্তিকী অনিচ্ছা প্রদর্শিত করিয়া, মৌন ভাবে, অবনত বদনে, অবস্থিত রহিলেন। অনন্তর, বহুবিধ বাদানুবাদের পর, সীতার হিরণ্ময়ী প্রতিকৃতি সমভিব্যাহারে যজ্ঞ সম্পন্ন করাই সর্ব্বাংশে শ্রেয়ঃকল্প বলিয়া মীমাংসিত হইল।
এই রূপে সমুদয় স্থিরীকৃত হইলে, ভরত সর্ব্বাগ্রে নৈমিষক্ষেত্রে প্রস্থান করিলেন; এবং, সমুচিত স্থানে যজ্ঞ ভূমির নিরূপণ করিয়া, অনুরূপ অন্তরে, পৃথক্ পৃথক্ প্রদেশে, এক এক শ্রেণীর লোকের জন্য, তাহাদের অবস্থোচিত অবস্থিতিস্থান নির্ম্মিত করাইলেন। লক্ষ্মণও, অনতিবিলম্বে, অশেষবিধ অপর্য্যাপ্ত আহারসামগ্রী ও শয্যা বান প্রভৃতির সমবধান করিয়া, যজ্ঞক্ষেত্রে পাঠাইয়া দিলেন। অনন্তর, রামচন্দ্র লক্ষ্মণকে রক্ষক নিযুক্ত করিয়া, যথাবিধানে যজ্ঞীয় অশ্বের মোচন পূর্ব্বক, মাতৃগণ ও অপরাপর পরিবারবর্গ সমভিব্যাহারে সসৈন্যে নৈমিষারণ্য প্রস্থান করিলেন।
কিয়ৎ দিন পরেই, নিমন্ত্রিতগণের সমাগম হইতে লাগিল। শত শত নৃপতি, বহুবিধ মহামুল্য উপহার লইয়া, অনুচরগণ ও পরিচারকবর্গ সমভিব্যাহারে, উপস্থিত হইতে আরম্ভ করিলেন; সহস্র সহস্র ঋষি, যজ্ঞদর্শনমানসে, ক্রমে ক্রমে, নৈমিষে আগমন করিতে লাগিলেন; অসংখ্য নগরবাসী ও জনপদবাসীরাও সমাগত হইলেন। ভরত ও শত্রুঘ্ন নরপতিগণের পরিচর্য্যার ভার গ্রহণ করিলেন; বিভীষণ ঋষিগণের কিঙ্করকার্য্যে নিযুক্ত হইলেন; সুগ্রীর অপরাপর নিমন্ত্রিত বর্গের তত্ত্বাবধানে ব্যাপৃত রহিলেন।
এ দিকে মহর্ষি বাল্মীকি, সীতার অবস্থা প্রত্যক্ষ করিয়া, এবং কুশ ও লবের বয়ঃক্রম দ্বাদশবৎসরপূর্ণ দেখিয়া, মনে মনে সর্ব্বদা এই আন্দোলন করেন যে, সীতার যেরূপ অবস্থা দেখিতেছি, তাহাতে তিনি অধিক দিন জীবিত থাকিবেন, এরূপ বোধ হয় না; আর, কুশ ও লব, রাজাধিরাজতনয় হইয়া, যাবজ্জীবন তপোবনে কালযাপন করিবে, ইহাও কোনও মতে উচিত নহে; তাহাদের ধনুর্বেদ ও রাজধর্ম্ম, এ উভয়ের শিক্ষার সময় বহিয়া যাইতেছে। অতএব, যাহাতে সপুত্ত্রা সীতা পুনরায় পরিগৃহীতা হন, আশু তাহার কোনও উপায় উদ্ভাবিত করা আবশ্যক। অথবা, অন্য উপায় উদ্ভাবিত করিবার প্রয়োজন কি? শিষ্য দ্বারা সংবাদ দিয়া রামচন্দ্রকে আমার আশ্রমে আনাইয়া, অথবা স্বয়ং রাজধানীতে গিয়া তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া, সপুত্ত্রা সীতার পরিগ্রহপ্রার্থনা করি। রামচন্দ্র অবশ্যই আমার অনুরোধরক্ষা করিবেন। এই স্থির করিয়া, ক্ষণকাল মৌন ভাবে থাকিয়া, মহর্ষি বিবেচনা করিতে লাগিলেন, কিন্তু তিনি অত্যন্ত লোকানুরাগপ্রিয়; কেবল লোকবিরাগসংগ্রহের ভয়ে, পূর্ণগর্ভা অবস্থায়, নিতান্ত নিরপরাধে, জানকীরে নির্বাসিত করিয়াছেন এখন, আমার কথায়, তাঁহারে সহজে গৃহে লইবেন, তাহাও সম্পূর্ণ সন্দেহস্থল। যাহা হউক, কোনও সংবাদ না দিয়া নিশ্চিন্ত থাকা, কোনও মতে, উচিত কল্প হইতেছে না। এই দুই বালক, উত্তর কালে, অবশ্যই কোশলসিংহাসনে অধিরোহণ করিবে; এই সময়ে, পিতৃসমীপে নীত হইয়া, রাজনীতি বিষয়ে বিধিপূর্ব্বক উপদিষ্ট না হইলে, রাজকার্য্যনির্বাহে একান্ত অপটু ও রাজমর্য্যাদারক্ষণে নিতান্ত অক্ষম হইবে। বিশেষতঃ, রাজা রামচন্দ্র, আমায় কোশলরাজ্যের হিতসাধনে যত্নবিহীন বলিয়া, অনুযোগ করিতে পারেন। অতএব, এ বিষয়ে আর উপেক্ষা বা কালক্ষেপ করা বিধেয় নহে। রামচন্দ্রের নিকট সকল বিষয়ের সবিশেষ সংবাদ পাঠান উচিত। অথবা, একবারেই তাঁহার নিকটে সংবাদ না পাঠাইয়া, বশিষ্ঠ বা লক্ষ্মণের সহিত পরামর্শ করা কর্ত্তব্য; তাঁহারাই বা কিরূপ বলেন, দেখা আবশ্যক।
এক দিন, মহর্ষি, সায়ংসন্ধ্যা ও সন্ধ্যাকালীন হোমবিধির সমাধান করিয়া, আসনে উপবেশন পূর্ব্বক, একাকী এই চিন্তায় মগ্ন আছেন; এমন সময়ে, এক রাজভৃত্য আসিয়া রামনামাঙ্কিত নিমন্ত্রণপত্র তদীয় হস্তে সমর্পিত করিল। মহর্ষি, পত্রপাঠ করিয়া, পরমপ্রীতি প্রদর্শন পূর্ব্বক, সেই লোককে বিশ্রাম করিবার নিমিত্ত বিদায় দিলেন; এবং এক শিষ্যের উপর তাহার আহারাদিসমাধানের ভার প্রদান করিয়া, মনে মনে বলিতে লাগিলেন, আমি যে বিষয়ের নিমিত্ত উৎকণ্ঠিত হইয়াছি, দৈব অনুকূল হইয়া তাহার সিদ্ধির বিলক্ষণ উপায় করিয়া দিলেন। এক্ষণে, বিনা প্রার্থনায় কার্য্যসাধন করিতে পারিব। কুশ ও লবকে শিষ্যভাবে সমভিব্যাহারে লইয়া যাই। রামের ও উহাদের দুই সহোদরের আকৃতিগত যেরূপ সৌসাদৃশ্য, দেখিলেই, সকলে উহাদিগকে তাঁহার তনয় বলিয়া অনায়াসে বুঝিতে পারিবে; আর, অবলোকনমাত্র, রামেরও হৃদয় নিঃসন্দেহ দ্রবীভূত হইবে; এবং, তাহা হইলেই, আমার অভিপ্রেতসিদ্ধির পথ স্বতঃ পরিষ্কৃত হইয়া আসিবে।
মনে মনে এইরূপ সিদ্ধান্ত করিয়া, মহর্ষি জানকীর কুটীরে উপস্থিত হইলেন; এবং বলিলেন, বৎসে, রাজা রামচন্দ্র অশ্বমেধ মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়া, নিমন্ত্রণপত্র পাঠাইয়াছেন; কল্য প্রত্যূষে প্রস্থান করিব; মানস করিয়াছি, অপরাপর শিষ্যের ন্যায়, তোমার পুত্ত্রদিগকেও যজ্ঞদর্শনে লইয়া যাইব। সীতা তৎক্ষণাৎ সম্মতি প্রদান করিলেন। মহর্ষি, স্বীয় কুটীরে প্রতিগমন করিয়া, শিষ্যদিগকে প্রস্তুত হইয়া থাকিতে বলিয়া দিলেন; এবং কুশ ও লবকে বলিলেন, দেখ, এ পর্য্যন্ত জনপদের কোনও ব্যাপার তোমাদের নয়নগোচর হয় নাই। রামায়ণনায়ক রাজা রামচন্দ্র অশ্বমেধের অনুষ্ঠান করিয়াছেন। ইচ্ছা করিয়াছি তোমাদিগকে যজ্ঞদর্শনে লইয়া যাইব। তোমাদের, যজ্ঞদর্শন ও আনুষঙ্গিক রাজদর্শন সম্পন্ন হইবে; এবং, তথায় যে অসংখ্য জনপদবাসী লোক সমবেত হইবে, তাহাদিগকে দেখিয়া, তোমরা, অনেক অংশে, লৌকিক বৃত্তান্ত অবগত হইতে পারিবে। তাহারা দুই সহোদরে, রামায়ণে রামের অলৌকিক গুণপরম্পরার প্রকৃষ্ট ও প্রচুর পরিচয় পাইয়া, তাঁহাকে, সর্ব্বাংশে অদ্বিতীয় পুরুষ বলিয়া স্থির করিয়া রাখিয়াছিল; তাঁহাকে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিব, এই ভাবিয়া, তাহাদের আহ্লাদের সীমা রহিল না। এতদ্ব্যতিরিক্ত, যজ্ঞসংক্রান্ত মহাসমারোহ ও নানাদেশীয় বিভিন্নপ্রকার অসংখ্য লোকের একত্র সমাগম নয়নগোচর করিব; এই কৌতূহলও বিলক্ষণ প্রবল হইয়া উঠিল।
বাল্মীকির মুখে রামের নাম শুনিয়া, সীতার শোকানল প্রবল বেগে প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল; নয়নযুগল হইতে অনর্গল অশ্রুজল নির্গলিত হইতে লাগিল। কিয়ৎ ক্ষণ পরেই, তাঁহার অন্তঃকরণে সহসা ভাবান্তর উপস্থিত হইল। এ পর্য্যন্ত, রাম সীতাগতপ্রাণ বলিয়া, তাঁহার মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল; আর, তিনি ইহাও স্থির করিয়া রাখিয়াছিলেন যে, নিতান্ত অনায়ত্ত হওয়াতেই, রাম তাঁহাকে নির্বাসিত করিয়াছেন। কিন্তু যজ্ঞের অনুষ্ঠানবার্ত্তা শ্রবণবিবরে প্রবিষ্ট হইবামাত্র, রাম আবার বিবাহ করিয়াছেন, এই ভাবিয়া, তিনি একবারে ম্রিয়মাণ হইলেন। যে সীতা অকাতরে পরিত্যাগদুঃখ সহ্য করিয়াছিলেন; রাম পুনরায় দারপরিগ্রহ করিয়াছেন, এই ক্ষোভ, সেই সীতার পক্ষে, একান্ত অসহ্য হইয়া উঠিল। পূর্ব্বে তিনি মনে ভাবিতেন, যদিও নিতান্ত নিরপরাধে নির্বাসিত হইয়াছি, কিন্তু আমার উপর তাঁহার যেরূপ অবিচলিত স্নেহ ও ঐকান্তিক অনুরাগ ছিল, কোনও অংশে তাহার কিছুমাত্র ব্যতিক্রম হয় নাই; এক্ষণে স্থির করিলেন, যখন পুনরায় দারপরিগ্রহ করিয়াছেন, তখন অবশ্যই স্নেহের ও অনুরাগের অন্যথাভাব ঘটিয়াছে।
সীতা, নিতান্ত আকুল চিত্তে, এই চিন্তা করিতেছেন এমন সময়ে, কুশ ও লব তদীয় কুটীরে প্রবিষ্ট হইয়া বলিল, মা, মহর্ষি বলিলেন, কল্য আমাদিগকে রাজা রামচন্দ্রের যজ্ঞদর্শনার্থে লইয়া যাইবেন। যে লোক নিমন্ত্রণপত্র আনিয়াছিল, আমরা কৌতূহলাবিষ্ট হইয়া, তাহার নিকটে গিয়া, রাজা রামচন্দ্রের বিষয়ে কত কথা জিজ্ঞাসা করিলাম। দেখিলাম, রাজা রামচন্দ্রের সকলই অলৌকিক কাণ্ড। কিন্তু মা, এক বিষয়ে আমরা, যার পর নাই, মোহিত ও চমৎকৃত হইয়াছি। রামায়ণ পড়িয়া, তাঁহার উপর আমাদের যে প্রগাঢ় ভক্তি জন্মিয়াছিল, এক্ষণে সেই ভক্তি সহস্র গুণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইল। কথায় কথায় শুনিলাম, রাজা, প্রজারঞ্জনের অনুরোধে, নিজ প্রেয়সী মহিষীকে নির্বাসিত করিয়াছেন। তখন, আমরা জিজ্ঞাসা করিলাম, তবে বুঝি রাজা পুনরায় দারপরিগ্রহ করিয়াছেন, নতুবা যজ্ঞের অনুষ্ঠানকালে সহধর্ম্মিণী কে হইবে? সে বলিল, যজ্ঞসমাধানের জন্য বশিষ্ঠদেব পুনরায় দারপরিগ্রহের নিমিত্ত অনেক অনুরোধ করিরাছিলেন। কিন্তু রাজা তাহাতে কোনও ক্রমে সম্মত হন নাই; সীতার হিরণ্ময়ী প্রতিকৃতি নির্ম্মিত হইয়াছে; সেই প্রতিকৃতি সহধর্ম্মিণীর কার্য্যনির্বাহ করিবে। দেখ মা, এমন মহাপুরুষ কোনও কালে ভূমণ্ডলে জন্মগ্রহণ করেন নাই। রামচন্দ্র রাজধর্ম্মপ্রতিপালনে যেমন যত্নশীল, দাম্পত্যধর্ম্মপ্রতিপালনেও তদনুরূপ যত্নশীল। আমরা, ইতিহাসগ্রন্থে, অনেক অনেক রাজার ও অনেক অনেক মহাপুরুষের বৃত্তান্ত অবগত হইয়াছি; কিন্তু কেহই, কোনও অংশে, রাজা রামচন্দ্রের সমকক্ষ নহেন। প্রজারঞ্জনের অনুরোধে প্রেয়সীর পরিত্যাগ, ও সেই প্রেয়সীর স্নেহের অনুরোধে, যাবজ্জীবন, দারপরিগ্রহে বিমুখ হইয়া কালহরণ করা, এ উভয়ই অভূতপূর্ব্ব ব্যাপার। যাহা হউক, মা, রামায়ণ পড়িয়া অবধি আমাদের নিতান্ত বাসনা ছিল, এক বার রাজা রামচন্দ্রের মূর্ত্তি প্রত্যক্ষ করিব; এক্ষণে, সেই বাসনা পূর্ণ হইবার এই বিলক্ষণ সুযোগ ঘটিয়াছে; অনুমতি কর, আমরা মহর্ষির সহিত রামদর্শনে যাই। সীতা অনুমতি প্রদান করিলেন; তাহারাও দুই সহোদরে, সাতিশয় হর্ষিত হইয়া, মহর্ষিসমীপে গমন করিল।
রামচন্দ্র পুনরায় দারপরিগ্রহ করিয়াছেন, এই আশঙ্কা জন্মিয়া, যে অতিবিষম বিষাদবিধে সীতার সর্ব্ব শরীর আচ্ছন্ন হইয়াছিল, হিরণ্ময়ী প্রতিকৃতির কথা শ্রবণগোচর করিয়া, তাহা সম্পূর্ণ রূপে অপসারিত, এবং তদীয় চিরপ্রদীপ্ত শোকানল অনেক অংশে নির্বাপিত হইল। তখন, তাঁহার নয়নযুগল হইতে আনন্দবাষ্প বিগলিত হইতে লাগিল; এবং, নির্বাসনের ক্ষোভ তিরোহিত হইয়া, তদীর হৃদয়ে অভূতপূর্ব্ব সৌভাগ্যগর্ব্ব আবির্ভূত হইল।
পর দিন, প্রভাত হইবামাত্র, মহর্ষি বাল্মীকি, কুশ, সব, ও শিষ্যবর্গ সমভিব্যাহারে, নৈমিষপ্রস্থান করিলেন। দ্বিতীয় দিবস, অপরাহ্ণ সময়ে, তথায় উপস্থিত হইলে, বশিষ্ঠদেব, সাতিশয় সমাদরপ্রদর্শন পূর্ব্বক, তাঁহাকে ও তাঁহার শিষ্যদিগকে নির্দিষ্ট বাসস্থানে লইয়া গেলেন। কুশ ও লব, দূর হইতে রামচন্দ্রকে লোচনগোচর করিয়া, চমৎকৃত ও পুলকিত হইল, এবং পরস্পর বলিতে লাগিল, দেখ ভাই, রামায়ণে রাজা রামচন্দ্রের যে সমস্ত অলৌকিক গুণ কীর্ত্তিত হইয়াছে, তৎসমুদয় ইঁহার আকারে স্পষ্টাক্ষরে লিখিত আছে; দেখিলেই, অলৌকিক গুণসমুদয়ের অসাধারণ আধার বলিয়া, স্পষ্ট প্রতীতি জন্মে। ইনি যেমন সৌম্যমূর্ত্তি, তেমনই গম্ভীরাকৃতি। আমাদের গুরুদেব যেমন অলৌকিককবিত্বশক্তিসম্পন্ন, রাজা রামচন্দ্র তেমনই অলৌকিক গুণসমূদয়ে পূর্ণ। বলিতে কি, এরূপ মহাপুরুষ নায়কস্থলে পরিগৃহীত না হইলে, মহর্ষির প্রণীত মহাকাব্যের এত গৌরব হইত না। রাজা রামচন্দ্রের অলৌকিক গুণের পরিকীর্ত্তনে নিয়োজিত হওয়াতে তদীয় অলৌকিক কবিত্বশক্তির সম্পূর্ণ সার্থকতা জন্মিয়াছে। যাহা হউক, এত দিনে আমরা নয়নের চরিতার্থতালাভ করিলাম।
ক্রমে ক্রমে যাবতীয় নিমন্ত্রিতগণ সমবেত হইলে, নিরূপিত দিবসে, মহাসমারোহে, সঙ্কল্পিত মহাযজ্ঞের আরম্ভ হইল। অসংখ্য দীন, দরিদ্র, ও অনাথ, পৃথক পৃথক প্রার্থনায়, যজ্ঞক্ষেত্রে উপস্থিত হইতে লাগিল। অন্নার্থী অপর্যাপ্ত অন্ন, অর্থাভিলাষী প্রার্থনাধিক অর্থ, ভূমিকাঙ্ক্ষী আকাঙ্ক্ষাতিরিক্ত ভূমি, প্রাপ্ত হইতে লাগিল। ফলতঃ, যে ব্যক্তি যে অভিলাষে আগমন করিতে লাগিল, আগমনমাত্র তাহার সে অভিলাষ পূর্ণ হইতে লাগিল। অনবরত, চতুর্দিকে নৃত্য, গীত, বাদ্য হইতে লাগিল। সকলেই মনোহর বেশ ভূষায় সুশোভিত। সকলেরই মুখে আমোদের ও আহ্লাদের সম্পূর্ণ লক্ষণ সুস্পষ্ট লক্ষিত হইতে লাগিল; কাহারও অন্তঃকরণে দুঃখের বা ক্ষোভের সঞ্চার আছে, এরূপ বোধ হইল না। যে সকল দীর্ঘজীবী রাজা, ঋষি, বা অন্যাদৃশ লোক যজ্ঞদর্শনে আসিয়া ছিলেন, তাঁহারা মুক্ত কণ্ঠে বলিতে লাগিলেন, আমরা কখনও এরূপ যজ্ঞ দেখি নাই। অতীতবেদী ব্যক্তিরাও বলিতে লাগিলেন, কোনও কালে, কোনও রাজা, ঈদৃশ সমৃদ্ধি ও সমারোহ সহকারে, যজ্ঞ করিতে পারেন নাই; রাজা রামচন্দ্রের সকলই অদ্ভুত কাণ্ড।
এই রূপে, প্রত্যহ, মহাসমারোহে, যজ্ঞক্রিয়া হইতে লাগিল; এবং যাবতীয় নিমন্ত্রিতগণ, সভায় সমবেত হইয়া, যজ্ঞসংক্রান্ত সমৃদ্ধি ও সমারোহের আতিশয্যদর্শনে নিরতিশয় বিস্ময়াপন্ন হইতে লাগিলেন।