বিষয়বস্তুতে চলুন

সীতার বনবাস (ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ১৮৯৭)/সপ্তম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

সপ্তম পরিচ্ছেদ

এক দিন, মহর্ষি বাল্মীকি, বিরলে বসিয়া, বিবেচনা করিতে লাগিলেন, আমি, যজ্ঞদর্শনে আসক্ত হইয়া, এত দিন বৃথা অতিবাহিত করিলাম; এ পর্য্যন্ত, অভিপ্রেতসাধনের কোনও উপায় অবলম্বন করিলাম না। যাহা হউক, এক্ষণে, কি প্রণালীতে, কুশ ও লবকে রামচন্দ্রের দর্শনপথে পাতিত করি। উহাদের দুই সহোদরকে, সমভিব্যাহারে করিয়া, রাজসভায় লইয়া যাই; অথবা, রামচন্দ্রকে কৌশলক্রমে এখানে আনাই; এবং, বিরলে সকল বিষয়ের সবিশেষ নির্দেশ করিয়া, এবং কুশ ও লবের পরিচয় দিয়া, সীতার পরিগ্রহপ্রার্থনা করি। মহর্ষি, মনে মনে এবংবিধ বিবিধ বিতর্ক করিয়া, পরিশেষে স্থির করিলেন, কুশ ও লবকে রামায়ণগান করিতে আদেশ করি। তাহারা স্থানে স্থানে গান করিয়া বেড়াইলে, ক্রমে রাজার গোচর হইবে; তখন তিনি অবশ্যই, স্বীয় চরিতের শ্রবণমানসে, উহাদিগকে স্বসমীপে নীত করিবেন, এবং তাহা হইলেই, বিনা প্রার্থনায়, আমার অভিপ্রেত সিদ্ধ হইবে।

 এই সিদ্ধান্ত করিয়া, মহর্ষি কুশ ও লবকে বলিলেন, বৎস কুশ, বৎস লব, তোমরা প্রতিদিন, সময়ে সময়ে, সমাহিত হইয়া, ঋষিগণের বাসকুটীরের সম্মুখে, নরপতিগণের পটমণ্ডপমণ্ডলীর পুরোভাগে, পৌরগণ ও জানপদবর্গের আবাসশ্রেণীর সমীপদেশে, এবং সভাভবনের অভিমুখভাগে, মনের অনুরাগে, বীণাসংযোগে রামায়ণের গান করিবে। যদি রাজা, কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া, তোমাদিগকে ডাকিয়া পাঠান, এবং তাঁহার সম্মুখে গান করিবার নিমিত্ত অনুরোধ করেন, তৎক্ষণাৎ গান করিতে আরম্ভ করিবে। আর, যত ক্ষণ তাঁহার নিকটে থাকিবে, কোনও প্রকারে ধৃষ্টতা প্রদর্শন বা অশিষ্ট ব্যবহার করিবে না। রাজা সকলের পিতৃস্থানীয়; অতএব, তোমরা তাঁহার প্রতি সম্পূর্ণ পিতৃভক্তিপ্রদর্শন করিবে। যদি, সঙ্গীত; শ্রবণে প্রীত হইয়া, রাজা পুরস্কারস্বরূপ অর্থপ্রদানে উদ্যত হন, লোভবশ হইয়া, কদাচ অর্থগ্রহণ করিবে না: বিনয় ও ভক্তিযোগ সহকারে নিস্পৃহতা দেখাইয়া, অর্থগ্রহণে অসম্মতিপ্রদর্শন করিবে; বলিবে, মহারাজ, আমরা বনবাসী, তপোবনে থাকিয়া, ফল মূল দ্বারা, প্রাণধারণ করি, আমাদর অর্থের প্রয়োজন নাই। আর, যদি রাজা তোমাদের পরিচয়জিজ্ঞাসা করেন, বলিবে, আমরা বাল্মীকির শিষ্য।

 এইরূপ আদেশ ও উপদেশ দিয়া, মহর্ষি তুষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিলেন। অনন্তর, তাহারা দুই সহোদরে, তদীয় আদেশ ও উপদেশের অনুবর্ত্তী হইয়া, বীণাসহযোগে, মধুর স্বরে, স্থানে স্থানে রামায়ণগান করিতে আরম্ভ করিল। যে শুনিল, সেই, মোহিত ও নিস্পন্দ ভাবে অবস্থিত হইয়া; অবিশ্রান্ত অশ্রুপাত করিতে লাগিল—না হইবেই বা কেন! প্রথমতঃ,—রামের চরিত্র অতি বিচিত্র ও পরম পবিত্র; দ্বিতীয়তঃ,—বাল্মীকির রচনা অতি চমৎকারিণী ও যার পর নাই চিত্তহারিণী; তৃতীয়তঃ,—কুশ ও লবের রূপমাধুরী দৃষ্টিগোচর হইলে, সকলকেই মোহিত হইতে হয়; তাহাতে আবার তাহাদের স্বর এমন মধুর যে, উহার সহিত তুলনা করিলে, কোকিলের কলরব কর্কশ বোধ হয়; চতুর্থতঃ,—বীণাযন্ত্রে তাহাদের যেরূপ অলৌকিক নৈপুণ্য জন্মিয়াছিল; তাহা অদৃষ্টচর ও অশ্রুতপূর্ব্ব। যে সঙ্গীতে এ সমুদয়ের সমবায় থাকে, তাহা শুনিয়া, কাহার চিত্ত অনির্বচনীয় প্রীতিরসে পূর্ণ না হয়।

 কিঞ্চিৎ কাল পরেই, অনেকেই রামের নিকটে গিয়া বলিতে লাগিলেন, মহারাজ, দুই সুকুমার ঋষিকুমার, বীণাযন্ত্রসহযোগে, আপনকার চরিত্রগান করিতেছে; যে শুনিতেছে, সেই মোহিত হইতেছে। আমরা, জন্মাবচ্ছিন্নে, কখনও এমন অধুর সঙ্গীত শুনি নাই। তাহারা যমজ সহোদর। মহারাজ, মানবকলেবরে কেহ কখনও এমন রূপের মাধুরী দেখি নাই। স্বরের মাধুরীর কথা অধিক আর কি বলিব! কিন্নরেরাও শুনিলে পরাভবস্বীকার করিবে। আর, তাহারা যে কাব্যের গান করিতেছে, তাহা কাহার রচিত, বলিতে পারি না; কিন্তু এমন অভূতপূর্ব্ব ললিত রচনা কখনও শ্রবণগোচর করেন নাই। মহারাজ, আমাদের প্রার্থনা এই, তাহাদিগকে রাজসভায় আনাইয়া আপনকার সমক্ষে গান করিতে আদেশ করেন। আপনি তাহাদিগকে দেখিলে, ও তাহাদের গান শুনিলে, নিঃসন্দেহ, মোহিত হইবেন।

 শ্রবণমাত্র, রামের অন্তঃকরণে অতিপ্রভূত কৌতূহলরস সঞ্চারিত হইল। তখন তিনি, এক সভাসদ ব্রাহ্মণ দ্বারা, তাহাদের দুই সহোদরকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। তাহারা, রাজা আহ্বান করিয়াছেন শুনিয়া, ক্ষণবিলম্ব ব্যতিরেকে, অতি বিনীত ভাবে সভামণ্ডপে প্রবেশ করিল। তাহাদিগকে দৃষ্টিগোচর করিবামাত্র, রামের হৃদয়ে কেমন এক অনির্বচনীয় ভাবের আবির্ভাব হইল। প্রীতিরস; অথবা বিষাদবিষ, সহসা সর্ব্ব শরীরে সঞ্চারিত হইল, ইহার অবধারণ করিতে পারিলেন না; কিয়ৎক্ষণ বিভ্রান্তচিত্তের ন্যায়, সেই দুই কুমারের উপর দৃষ্টিবিন্যাস করিয়া রহিলেন; এবং, অকস্মাৎ এরূপ ভাবান্তর উপস্থিত হইল কেন, তাহার অনুধাবন করিতে না পারিয়া, চিত্রার্পিতের ন্যায় উপবিষ্ট রহিলেন।

 কুমারেরা, ক্রমে ক্রমে সন্নিহিত হইয়া, মহারাজের জয় হউক বলিয়া, রামচন্দ্রের সংবর্দ্ধনা করিল; এবং, তদীয় আদেশ অনুসারে, সমুচিত প্রদেশে উপবেশন করিয়া, যথোচিত বিনয় ও নিরতিশয় ভক্তিযোগ সহকারে, জিজ্ঞাসা করিল, মহারাজ, কি জন্য আমাদের আহ্বান করিয়াছেন? তাহারা সন্নিহিত হইলে, তদীয় কলেবরে নিজের ও জানকীর অবয়বের সম্পূর্ণ লক্ষণ প্রত্যক্ষ করিয়া, রাম একান্ত বিকলচিত্ত হইলেন; কিন্তু তৎকালে রাজসভায় বহু লোকের সমাগম হইয়াছিল; এজন্য, অতি কষ্টে চিত্তের চাঞ্চল্যসংবরণ করিয়া, সম্পূর্ণ সপ্রতিভের ন্যায়, তাহাদিগকে বলিলেন, শুনিলাম, তোমরা অপূর্ব্ব গান করিতে পার; যাঁহারা শুনিয়াছেন, তাঁহারা সকলেই মুক্ত কণ্ঠে তোমাদের প্রশংসা করিতেছেন। এজন্য, আমিও তোমাদের সঙ্গীত শুনিবার মানস করিয়াছি। যদি তোমাদের অভিমত হয়, কিয়ৎ ক্ষণ গান করিয়া, আমায় প্রীতিপ্রদান কর। তাহারা বলিল, মহারাজ, আমরা যে কাব্যের গান করিয়া থাকি, তাহা বহুবিস্তৃত; তাহাতে মহারাজের পবিত্র চরিত সবিস্তর বর্ণিত হইয়াছে। এক্ষণে আমরা, আপনকার সমক্ষে, ঐ কাব্যের কোন অংশের গান করিব, আদেশ করুন।

 সেই দুই কুমারকে নয়নগোচর করিয়া অবধি, রামের চিত্ত এত চঞ্চল এবং সীতানির্বাসনশোক এত প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল যে, লোকলজ্জার ভয়ে আর ধৈর্য্য অবলম্বন করা অসাধ্য ভাবিয়া, তিনি সহসা সভাভঙ্গ করিয়া, বিজনপ্রদেশসেবনের নিমিত্ত, নিরতিশয় উৎসুক হইয়াছিলেন; এজন্য বলিলেন, অদ্য তোমরা ইচ্ছামত যে কোনও অংশের গান কর; কল্য প্রভাত অবধি, প্রতিদিন কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ করিয়া, তোমাদের মুখে সমস্ত কাব্যের গান শুনিব। তাহারা, যে আজ্ঞা, মহারাজ, বলিয়া, সঙ্গীতের আরম্ভ করিল। সভাস্থ সমস্ত লোক, মোহিত হইয়া, মুক্ত কণ্ঠে সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন। রাম, কবির পাণ্ডিত্য ও রচনার লালিত্য দর্শনে নিরতিশয় চমৎকৃত হইয়া, জিজ্ঞাসা করিলেন, এই কাব্য কাহার রচিত, কাহার নিকটেই বা তোমরা সঙ্গীতশিক্ষা করিয়াছ? তাহারা বলিল, মহারাজ, এই কাব্য ভগবান্ বাল্মীকির রচিত; আমরা তাঁহার তপোবনে প্রতিপালিত হইয়াছি, এবং তাঁহার নিকটেই সমস্ত শিক্ষা করিয়াছি। তখন, রাম বলিলেন, ভগবান্ বাল্মীকি এই কাব্যে অদ্ভুত কবিত্বশক্তি প্রদর্শিত করিয়াছেন। অল্প শুনিয়া পরিতৃপ্ত হইতে পারা যায় না। আজ তোমাদের অনেক পরিশ্রম হইয়াছে; তোমাদিগকে আর অধিক কষ্ট দিতে আমার ইচ্ছা হইতেছে না; এখন তোমরা আবাসে গমন কর।

 এই বলিয়া, তাহাদের দুই সহোদরকে বিদায় দিয়া, রাম সে দিবস সত্ত্বর সভাভঙ্গ করিলেন; এবং, বিশ্রামভবনে প্রবেশ করিয়া; একাকী চিন্তা করিতে লাগিলেন, এই দুই কুমারকে নয়নগোচর করিয়া, আমার অন্তঃকরণ এত আকুল হইল কেন, কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না! আপন সন্তান দেখিলে, লোকের চিত্তে যেরূপ স্নেহের ও বাৎসল্যরসের সঞ্চার হয় বলিয়া শুনিতে পাই; আমারও, ইহাদিগকে দেখিয়া, ঠিক সেইরূপ হইতেছে। কিন্তু, এরূপ হইবার কোনও কারণই দেখিতেছি না। ইহারা ঋষিকুমার; আর, যদিই বা ঋষিকুমার না হয়, তাহা হইলেই বা আমার সে আশা করিবার সম্ভাবনা কি! আমি যে অবস্থায় যেরূপে প্রিয়ারে বনবাস দিয়াছি, তাহাতে তিনি দুঃসহ শোকে ও অসহনীয় অপমানভরে প্রাণত্যাগ করিয়াছেন, তাহার সন্দেহ নাই। লক্ষ্মণ পরিত্যাগ করিয়া আসিলে, হয় তিনি আত্মঘাতিনী হইয়াছেন, নয় কোনও দুরস্ত হিংস্র জন্তু তাঁহার প্রাণসংহার করিয়াছে। তিনি যে, তেমন অবস্থায়, প্রাণধারণে সমর্থ হইয়া, নির্বিঘ্নে সন্তানপ্রসব করিয়াছেন; এবং তাহাদের লালন পালন করিতে পারিয়াছেন, এরূপ আশা নিতান্ত দুরাশা মাত্র। আমি যেরূপ হতভাগ্য, তাহাতে এত সৌভাগ্য কোনও ক্রমে সম্ভবিতে পারে না।

 এই বলিয়া, একান্ত বিকলচিত্ত হইয়া, রাম কিয়ৎ ক্ষণ অশ্রুবিসর্জন করিলেন; অনন্তর, শোকাবেগসংবরণ করিয়া, বলিতে লাগিলেন, কিন্তু উহাদের আকার প্রকার দেখিলে, ক্ষত্ত্রিয়কুমার বলিয়া স্পষ্ট প্রতীতি জন্মে। অধিকন্তু, উহাদের কলেবরে আমার অবয়বের সম্পূর্ণ লক্ষণ লক্ষিত হইতেছে। আর, অভিনিবেশ পূর্ব্বক অবলোকন করিলে, সীতার অবয়ব সৌসাদৃশ্য নিঃসংশয়িত রূপে প্রতীয়মান হইতে থাকে; ভ্রূ, নয়ন, নাসিকা, কর, চিবুক, ওষ্ঠ, ও দন্তপংক্তিতে কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য লক্ষিত হয় না। এত সৌসাদৃশ্য কি আকস্মিক ঘটনা মাত্রে পর্য্যবসিত হইবে? আর, ইহারা বলিল, বাল্মীকির তপোবনে প্রতিপালিত হইয়াছে; আমিও লক্ষ্মণকে বলিয়াছিলাম, সীতারে বাল্মীকির তপোবনে রাখিয়া আসিবে। হয় ত, মহর্ষি, কারুণ্য বশতঃ, সীতাকে আপন আশ্রমে লইয়া গিয়াছিলেন; তথায় তিনি এই যমজ সন্তান প্রসব করিয়াছেন। লক্ষণ দেখিয়া, সকলে এরূপ বোধ করিতেন, জানকী গর্ভযুগলধারণ করিয়াছেন। এ সকলের আলোচনা করিলে, আমার আশা নিতান্ত দুরাশা বলিয়াও বোধ হয় না। অথবা, আমি, মৃগতৃষ্ণিকায় ভ্রান্ত হইয়া, অনর্থক আপনাকে ক্লেশ দিতে উদ্যত হইয়াছি। যখন আমি, নৃশংস রাক্ষসের ন্যায়, নিতান্ত নির্দয় ও নিতান্ত নির্মম হইয়া, তাদৃশী পতিপ্রাণা কামিনীরে, সম্পূর্ণ নিরপরাধে, বনবাস দিয়াছি, তখন আর সে সব আশা করা নিতান্ত মুঢ়ের কর্ম্ম। হা প্রিয়ে! তুমি, তেমন সুশীলা ও সরলহৃদয়া হইয়া, কেন এমন দুঃশীলের ও কুটিলহৃদয়ের হস্তে পড়িয়াছিলে। আমি যখন, তোমায় নিতান্ত পতিপ্রাণা ও একান্ত শুদ্ধচারিণী জানিয়াও, অনায়াসে বনবাস দিতে, এবং বনবাস দিয়া এ পর্য্যন্ত প্রাণধারণ করিতে পারিয়াছি, তখন, আমা অপেক্ষা নৃশংস ও পাষাণহৃদয় আর কে আছে?

 এইরূপ আক্ষেপ করিতে করিতে; দুর্দ্ধর শোকভরে অভিভূত হইয়া, রাম বিচেতন প্রায় হইলেন, এবং অবিরল ধারায় বাষ্পবারিবিমোচন ও মুহুর্মুহুঃ দীর্ঘনিশ্বাসপরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে, কিঞ্চিৎ শান্তচিত্ত হইয়া, তিনি বলিতে লাগিলেন, বাল্মীকি সীতারে আপন আশ্রমে লইয়া গিয়াছিলেন, এবং সীতা তথায় এই দুই যমল তনয় প্রসব করিয়াছেন, তাহার সন্দেহ নাই। ইহারা যে প্রকৃত ঋষিকুমার নহে, তাহার এক দৃঢ় প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে। আকার দেখিয়া স্পষ্ট বোধ হয়, ইহারা অল্প দিন মাত্র উপনীত হইয়াছে। এক্ষণে ইহাদের বয়ঃক্রম দ্বাদশ বৎসরের ন্যূন নহে। বোধ হয়, একাদশ বর্ষে উপনয়নসংস্কার সম্পন্ন হইয়াছে। ক্ষত্রিয়কুমার না হইলে, এ বয়সে উপনয়ন হইবে কেন? প্রকৃত ঋষিকুমার হইলে, মহর্ষি অবশ্যই অষ্টম বর্ষে ইহাদের সংস্কারসম্পাদন করিতেন। ইহা ভিন্ন, উপনীত ঋষিকুমারদিগের যেরূপ বেশ হয়, ইহাদের বেশ সর্ব্বাংশে সেরূপ লক্ষিত হইতেছে না। যদি ইহারা ক্ষত্রিয়কুমার হয়, তাহা হইলে, ইহাদের সীতার সন্তান হওয়া যত সম্ভব, অন্যের সন্তান হওয়া তত সম্ভব বোধ হয় না; কারণ, অন্য ক্ষত্রিয়সন্তানের তপোবনে প্রতিপালিত ও উপনীত হওয়ার সম্ভাবনা কি? আমার মত হতভাগ্য লোকের সন্তান না হইলে, ইহাদের কদাচ এ অবস্থা ঘটিত না।

 মনে মনে এইরূপ বিতর্ক ও আক্ষেপ করিয়া, রাম বলিতে লাগিলেন, যদি প্রিয়া এ পর্য্যন্ত জীবিত থাকেন, এবং এই দুই কুমার আমার তনয় হয়, তাহা হইলে কি আহ্লাদের বিষয় হয়। প্রিয়া পুনরায় আমার নয়নের ও হৃদয়ের আনন্দদায়িনী হইবেন, ইহা ভাবিলেও, আমার সব শরীর অমৃতরসে অভিষিক্ত হয়। এই বলিয়া, যেন সীতার সহিত সমাগম অবধারিত হইয়াছে, ইহা স্থির করিয়া, রাম বলিতে লাগিলেন, এই দীর্ঘ বিয়োগের পর, যখন প্রথম সমাগম হইবে, তখন, বোধ হয়, আমি আহ্লাদে অধৈর্য্য হইব; প্রিয়ারও আহ্লাদের একশেষ হইবে, তাহার সন্দেহ নাই। প্রথমসমাগমসময়ে, উভয়েরই আনন্দাশ্রুপ্রবাহ প্রবল বেগে বাহিত হইতে থাকিবে। কিয়ৎ ক্ষণ, এইরূপ চিন্তায় মগ্ন হইয়া, তিনি হর্ষবাষ্পবিসর্জন করিলেন। পর ক্ষণেই, এই চিন্তা উপস্থিত হইল, আমি যেরূপ নৃশংস আচরণ করিয়াছি, তাহাতে, প্রিয়ার সহিত সমাগম হইলে, কেমন করিয়া তাঁহারে এ মুখ দেখাইব! অথবা, তিনি যেরূপ সাধুশীলা ও সরলহৃদয়া, তাহাতে অনায়াসেই আমার অপরাধমার্জ্জনা করিবেন। আমি দেখিবামাত্র, তাঁহার চরণে ধরিয়া, বিনীত বচনে ক্ষমাপ্রার্থনা করিব। কিয়ৎ ক্ষণ পরেই, আবার এই চিন্তা উপস্থিত হইল, পাছে প্রজালোকে বিরাগপ্রদর্শন করে, এই আশঙ্কায় আমি প্রিয়ারে বনবাসে পাঠাইয়াছি; এক্ষণে, যদি তাঁহারে গৃহে লই, তাহা হইলে, পুনরায় সেই আশঙ্কা উপস্থিত হইতেছে। এত কাল, আপনাকে ও প্রিয়াকে দুঃসহ বিরহযাতনায় যে দগ্ধ করিলাম, সে সকলই বিফল হইয়া যায়।

 এই বলিয়া, নিতান্ত নিরুপায় ভাবিয়া, রাম কিয়ৎ ক্ষণ অপ্রসন্ন মনে অবস্থিত রহিলেন; অনন্তর, সহসা উদ্ভুত রোষাবেশ সহকারে বলিতে লাগিলেন, আর আমি অমূলক লোকাপবাদে আস্থা প্রদর্শন করিব না। অতঃপর প্রিয়ারে গৃহে লইলে, যদি প্রজালোকে অসন্তুষ্ট হয়, হউক; আর আমি তাহাদের ছন্দানুবৃত্তি করিতে পারিব না। আমি যথেষ্ট করিয়াছি। রাজপদে প্রতিষ্ঠিত হইয়া, কে কখন, আমার ন্যায়, আত্মবঞ্চন করিয়াছে? প্রথমেই প্রিয়ারে বনবাস দেওয়া নিতান্ত নির্বোধের কর্ম্ম হইয়াছে। এক্ষণে আমি অবশ্যই তাঁহারে গৃহে লইব। নিতান্ত না হয়, ভরতের হস্তে রাজ্যভার সমর্পিত করিয়া, প্রিয়াসমভিব্যাহারে বানপ্রস্থধর্ম্ম অবলম্বন করিব। প্রিয়াবিরহিত হইয়া রাজ্যভোগ অপেক্ষা, তাঁহার সমভিব্যাহারে বনবাস, আমার পক্ষে, সহস্র গুণে শ্রেয়স্কর, তাহার সন্দেহ নাই।

 রাম, আহার ও নিদ্রার পরিহার পূর্ব্বক, এইরূপ বহুবিধ চিন্তায় মগ্ন হইয়া, রজনীযাপন করিলেন।