বিষয়বস্তুতে চলুন

সীতা-হরণ-পাঁচালী

উইকিসংকলন থেকে

সীতা-হরণ-পাঁচালী

সীতা-হরণ-পাঁচালী।

৺কৃষ্ণেন্দ্র রায়।

প্রণীত।

পঞ্চম সংস্করণ।

বলিহার, রাজবাটী হইতে প্রকাশিত।

Printed by
Sarada Prasad Mandal
At the Sree Ram Press
CALCUTTA.


সন ১৩৩৪ সাল

শ্রীশ্রীরাজরাজেশ্বরী

জয়তি।

পঞ্চম সংস্করণের বিজ্ঞাপন।

 পরমপূজ্যপাদ, স্বর্গীয় পিতামহদেব, রাজা, ৺কৃষ্ণেন্দ্র রায় বাহাদুর প্রণীত সীতাহরণ পাঁচালীর পঞ্চম সংস্করণ কৃষ্ণেন্দ্র গ্রন্থাবলীর সহিত মুদ্রিত হইল। নিবেদন ইতি।—

মাঘী পূর্ণিমা
২২ মাঘ, সন ১৩৩৪ সাল।

   }

নিবেদক
শ্রীবিমলেন্দু রায়।

সীতা-হরণ-পাঁচালী।

⸺o⸺

রাগিণী— বাহার।
তাল—একতালা।

ধন্য আজি তার জীবন ।
রাম নাম সদা জপে যেইজন,
আঢ্য কিম্বা হউক, অতীব নিৰ্দ্ধন,
মহাত্মা মধ্যেতে গণ্য সেই জন॥
উচ্চকুলে জন্মিলে কি, হয় মহাজন,
অথবা অর্জ্জন, করুক বহুধন,
শ্রীরাম চরণ না চিন্তি কখন,
হয় না কাল ভয় নিবারণ;
রাম নাম গুণে, জলে ভাসে শিলা,
অহল্যা পাষাণী, মানবী হইলা,
মহর্ষি বাল্মীকি, যশঃ প্রকাশিলা,
শ্রীরামের গুণ করিয়ে বর্ণন॥১


প্রস্তাবনা।

পয়ার।

প্রণমিয়া কবিগুরু বাল্মীকের পায়।
রামগুণ গান আশে এলেম সভায়॥
কতদূর কৃতকার্য্য হইব না জানি।
শূর্পবৎ গুণজ্ঞেরা সর্ব্বদা এ শুনি॥
মাদৃশ জনের দোষ পদে পদে হবে।
দয়া করি মহাত্মারা অবশ্য ক্ষমিবে॥
শ্রীরাম চরিতামৃত যে করয়ে পান।
বিদূরিত হয় তার যত অকল্যাণ॥
সপ্তকাণ্ডে সবিস্তারে হয়েছে বিবৃত।
জগতে আছয়ে তাহা সমস্ত বিদিত॥
তত্তাবদ্বর্ণন নহে উদ্দেশ্য আমার।
সীতার চরিত্র মাত্র করিব প্রচার॥
সীতা লক্ষ্মণের সহ আসি রাম বনে।
ভ্ৰমেন অকুতোভয়ে কত স্থানে স্থানে॥
ক্ষণকাল জন্য চিত্ত বিষাদিত নয়।
অটল অক্ষুদ্ধ সদা শ্রীরাম হৃদয়॥
বর্ষাগম দেখি রাম পঞ্চবটী বনে।
কুটীর নির্ম্মাণতরে বলেন লক্ষ্মণে॥
রাম আজ্ঞা শিরে ধরি লক্ষ্মণ সত্বর।
নিৰ্ম্মিলা কুটীর এক অতি মনোহর॥
.সুসুস্থ শরীরে রাম তাহে বাস করি।

চিন্তেন স্ব-ইষ্টদেবে দিবা বিভাবরী॥
একদা মধ্যাহ্ণ কালে বসি কুটীরেতে।
সুপ্রসঙ্গে কাল রাম হরেন্ হৃষ্টচিতে॥
দৈবের নির্ব্বন্ধ বল কে করে খণ্ডন।
প্রাঙ্গণেতে স্বর্ণযুগ দিল দরশন॥
শ্রীরাম ভাবেন মনে একি অমঙ্গল।
রাক্ষস আসিল বুঝি পাতি কোন ছল॥
নানা চিন্তা রঘুনাথ করিতে লাগিল।
ক্ষণকালে মৃগ পুনঃ অদৃশ্য হইল॥
অচিরে আসিয়ে ছলে কুঢ়ীর বাহিরে।
নাচিতে নাচিতে পুনঃ যায় চলি দূরে॥
এইরূপে বারম্বার মৃগ আসে যায়।
সীতার হইল শ্রদ্ধা ধরিতে তাহায়॥
করযোড়ে বলে সীতা শুন রঘুমণি।
দাসীরে হরিণ শিশু ধরি দেও আনি॥
পালন করিব আমি অতি সুযতনে।
দেখাইব সকলেরে অযোধ্যা ভবনে॥
এমন সুদৃশ্য মৃগ হেরি নাই আর।
শীঘ্র ধরি আন ধরি, চরণে তোমার॥


রাগিণী—ভৈরবী।

তাল—রূপক।

আনহে শীঘ্র করি, সুবর্ণ মৃগধরি,
স্বযত্নে পালিব নাথ তাহারে।
বিলম্ব নাহি কর, ধরহে সুসত্বর,
নহিলে যাবে চলি সুদূরে॥

বনবাস অবসানে, গিয়ে নাথ স্বভবনে,
দেখাবে দাসী মৃগে সবারে;
এই সাধ বড় মনে, ধরি তব চরণে,
পূরাও নাথ বাঞ্ছা দাসীর অচিরে॥


পয়ার।

যে সীতার কণ্ঠস্বর মধুর সঙ্গীত।
ন্যক্কারি শ্রীরামে সদা করিত মোহিত॥
আজি তাহা বজ্র ধ্বনি সদৃশ হইয়া।
কাঁপাইছে যেন দেখ শ্রীরামের হিয়া॥
পূর্বাপর এইরূপ আছে জনরব ।
হয় মনে ভাবি দুঃখ অগ্রেতে উদ্ভব॥
ক্ষণকাল নিস্তব্ধেতে থাকি রঘুমণি।
সীতা সম্বোধিয়া কন্ যুক্তি যুক্তবাণী॥
অয়ি পদ্ম পলাশাক্ষি, জনক তনয়ে।
অন্যায় প্রার্থনা বল কর কি লাগিয়ে॥
নিরন্তর বনে বনে করিলে ভ্রমণ।
স্বর্ণ মৃগ কোথাও কি হেরেছ কখন?
এ নহে হরিণ, ছল করি কোন জন।
অনিষ্ট সাধিতে এল করিয়ে মনন॥
ক্ষান্ত হও বিধু মুখি, ও সাধ ক’র না।
বনে আসি ভুগিতেছ কত বিড়ম্বনা॥
আবার হরিণ ধরি ঘটাবে আপদ।
একমাত্র তুমি আজি শ্রীরাম সম্পদ॥
তব চন্দ্রানন হেরি সব দুঃখ হরি!
তোমাধনে হারাইব যেন, মৃগ ধরি॥

কি জন্য যে মন মোর, বলে হেন কথা।
হরিণ ধরিতে গেলে, পাবে মনে ব্যথা॥
কায নাই হরিণে প্রিয়ে, থাক নিশ্চিন্তেতে।
কত মনোহর দ্রব্য আছে অযোধ্যাতে॥
বনবাস কাল প্রায় হয়ে এল গত।
ঈশ্বর প্রসাদে সুখ ক'র্‌বে গিয়ে কত॥
নিবারণ করি প্রিয়ে শত শত বার।
হরিণ ধরিতে মোরে ব'লনা আবার॥


রাগিণী—বাহার।

তাল একতালা।

কায নাই প্রিয়ে, হরিণ ধরিয়ে, ক্ষান্ত হও এখন ।
হইবে বিপদ বুঝি, বলে হেন মন॥
একবাণে আমি, বধি তাড়কারে
সসৈন্যে বিনাশি, খর দূষণেরে,
রাম হৃদে কভু ভয় না সঞ্চারে,
আজি ভয় কেন হয় এমন॥
রাজ্যধন সব বিসর্জ্জন করি,
বনে আছি মাত্র, তব মুখ হেরি,
কি জানি তাহাতে, হয় কোন্ অরি,
এই চিন্তা করি সর্ব্বক্ষণ॥৩


পয়ার।

বিপদে বিপদ ডাকি আনয়ে সবার।
নতুবা কুমতি কেন, হইবে সীতার॥
রাম উপদেশ বাক্যে, অনাস্থা, প্রকাশি ৷
অভিমানে বস্ত্রাঞ্চলে, ঢাকেন মুখশশী॥
সবিষাদে বলে সীতা, আমি দুর্ভাগিণী।
নহিলে পূরিত সাধ; নিশ্চয় এখনি॥
বিলাস সামগ্রী আর রত্ন অলঙ্কার।
সে সব প্রার্থনা নয়, দুঃখিনী সীতার॥
চাহিনা সম্মান আমি, সম্পদ বিভব।
সুখশয্যা, রত্নরাজী, অতুল গৌরব।
স্বর্ণবর্ণ মৃগ শিশু, ধরিবার তরে॥
কাঁদিলাম কত বলি, নাথের গোচরে।
কিন্তু হায়! বিধি যবে অপ্রসন্ন হয়।
পূরে না বাসনা তার, জানিনু নিশ্চয়॥
বড় সাধ ছিল মনে, কুরঙ্গ লইয়ে।
পালিতাম, স্নেহভরে উভয়ে মিলিয়ে॥
সর্ব্বদা সম্মুখে রাখি, অতি যত্ন করে।
কিসলয় দাম তুলি, দিতাম তাহারে॥
নির্ঝরিণী জল আনি, করাতে পান।
প্রাঙ্গণে নাচিত নিত্য, জুড়াইত প্ৰাণ॥
সামান্য বস্তুর জন্য, করিয়ে লালসা।
পাপিনী সীতার তাহে, পূরিল না আশা॥
হায় রে উন্মত্ত মন, কাজ নাই ভাবি।
বিশাল নিরাশা হ্রদে, থাক গিয়ে ডুবি॥
রাম পত্নী হ'য়ে মোর, না মিটিল সাধ।
এহ'তে সীতার আর, কি আছে বিষাদ॥

রাগিণী—মিশ্র ঝিঁঝিট।

তাল—একতালা।

মরণ ভাল, সে নারীর, যার না, পতি বশেরয়।
হ’ক্ সে রাজরাণী কিম্বা দুর্ভাগিণী,
কি দিবা যামিনী, জ্বলে তার হৃদয়।
পুতি সোহাগিনী যত নারীগণ;
পুণ্যবতী তাদের, সার্থক জীবন, (এ ভবেতে)
তারা, যে দ্রব্য যখন, চায় পায় তখন,
বাঞ্ছা পূর্ণ পতি, করে সমুদয়॥
না চাহিতে পতি নিজ প্রেয়সীরে,
দেয় কত বস্তু সন্তোষের তরে [এই দেখতে পাই]
আমি, থাকি বল্কল পরে, দগ্ধোদরতরে,
কত কষ্ট পাই, কে করে প্রত্যয়॥
সামন্য মৃগেরে করিতে ধারণ,
কহিনু নাথেরে করিয়ে রোদন (হায় বারম্বার)
তবু কল্লেন্‌না শ্রবণ, রাখ্‌ব না জীবন,
জীবনেতে ডুবি, মরিব নিশ্চয়॥৪


পয়ার।

সীতা অভিমান ক্রোধ হেরি রঘুবর।
ব্যথিত হইল তাঁর কোমল অন্তর॥
প্ৰণয় পাবক পুনঃ জ্বলিয়া উঠিল।
কৰ্ত্তব্যতা মনোমধ্যে বিলীন হইল॥
লক্ষ্মণেরে সম্বোধন করিয়ে তখন।
ভগ্নস্বরে ধীরে ধীরে কহেন বচন॥

সরলা রমণী চিতে ভাবি চিন্তা নাই।
স্বচক্ষে সীতার ভাব দেখিলেও ভাই॥
প্রিয়ার মলিন মুখ দেখিতে না পারি।
এখনি হরিণ শিশু আনিতেছি ধরি॥
সীতা মনস্তুষ্ট কাৰ্যে যদি প্রাণ যায়।
রাম কভু পরাঙ্মুখ না হইবে তাঁয়॥
যাবত হরিণ ধরি নাহি ফিরি আমি।
অতি সতর্কেতে সীতা রক্ষাক'র তুমি॥
অভ্যন্ত রাক্ষস ভয় আছে এ বনেতে।
কোন অত্যাচার যেন না পারে করিতে॥
বারম্বার সাবধান করিয়ে লক্ষ্মণে।
কুরঙ্গ ধরিতে রাম প্রবেশেন বনে॥
অগ্রে অগ্রে স্বর্ণমৃগ দ্রুতবেগে যায়।
শ্রীরাম অমনি তার পিছে পিছে ধায়॥
ধরে ধরে মৃগ রাম ধরিতে না পারে।
ক্ষণে দৃষ্ট, অগোচর হয় সে সত্বরে॥
ক্রমে ক্রমে মৃগ অতি দূর বনে গেল।
নির্ভয় অন্তর রাম, সঙ্গেতে চলিল॥
প্রখর রবির করে ক্লান্ত রঘুবীর।
রাক্ষস বলিয়া মনে করিলেন স্থির॥
সুশাণিত শর এক যুড়ি কোদণ্ডেতে।
নিক্ষেপ করেন রাম রাক্ষস বক্ষেতে॥
“কোথায় লক্ষ্মণ” বলি করিল চীৎকার।
কর্ণেতে প্রবিষ্ট হ'ল অমনি সীতার॥
“রাক্ষস হস্তেতে পড়ি হারাই জীবন।
শীঘ্র আসি মোরে রক্ষা করহ লক্ষ্মণ॥”
বলিতে বলিতে প্রাণ ত্যজিল রাক্ষস।
সহসা রামের অঙ্গ হইল অবশ॥

চতুর্দ্দিক শূন্যময় হেরিতে লাগিল।
মনে ভাবে এ আবার, কি বিপদ হ'ল॥
যদ্যপি শুনিতে পায় রাক্ষসের বাণী।
কি জানি লক্ষ্মণে সীতা পাঠায় অমনি॥
ইত্যাদি চিন্তায় গ্রাম, কুটীরে চলিল ।
কত দুর্ভাবনা মনে, জাগিয়া উঠিল।


রাগিণী—সুরট।

তাল—একতালা।

আমার কুমতি কেন হইল, বুঝি হইবে অমঙ্গল,
নৈলে কি জন্য লক্ষমণে,
ডাকি অকারণে,
রাক্ষস প্রাণ ত্যজিল॥
(হায়) মম সমস্বর হয়েছে ধ্বনিত,
হ'য়ে থাকে যদি সীতা কৰ্ণগত,
অন্বেষিতে মোরে’লক্ষ্মণে নিশ্চিত,
পাঠাবে হয়ে ব্যাকুল;
একাকিনী সীতা কুটীরে রহিবে,
বিপদ হইলে কে রক্ষা করিবে,
সিংহ ব্যাঘ্র কিম্বা রাক্ষসে বধিবে,
সব সাধ ফুরাইল॥ ৫


,

দীর্ঘ ত্রিপদী।

হেথা পঞ্চবটী বনে, রাম সম স্বর শুনে,
ধৈর্য্যচ্যুতা জনক নন্দিনী।
শিরে করাঘাত হানে, ব্যাকুলিও সে রোদনে
পশু পক্ষী যত ছিল প্ৰাণী॥
আলু থালু কেশ পাশ, সঘনে বহে নিশ্বাস;
মণিহারা যেন ভুজঙ্গিনী।
নেত্রজলে আর্দ্র বাস, কভু রুদ্ধ হয় শ্বাস;
যায় যায় রাম মম্মোহিনী॥
ক্ষণকাল এই রূপে, শ্রীরাম শোঁক সন্তাপে;
সংজ্ঞাশূন্য সীতা মৃতপ্ৰায়।
দগ্ধ হন্‌ সূৰ্য্য তাপে, ঘন ঘন অঙ্গ কাঁপে,
আছে মাত্ৰ প্ৰাণ বুঝা যায়॥
তদপর কথঞ্চিত্‌ মোহ হ'লে প্রশমিত,
কান্দি সীতা কহিতে লাগিল।
বুঝিনু এবে নিশ্চিত, মৃগরূপে সুসজ্জিত,
হয়ে বিধি আসি বাদ্‌ সাধিল॥
নতুবা কি সীতা কখন, পতির বাক্য লঙ্ঘন,
ক'র্‌তে পারে কণ্ঠায় প্রাণ থাকিতে?
কত যে করিলেন বারণ, কুরঙ্গ ধরিতে তখন
নিবৃত্ত না হলেন কিছুতে॥
অগত্যায় রঘুমণি, হরিণ ধরি এখনি,
আনি বলি অরণ্যেতে যান।
সীতা সম কে পাপিনী, আছে ভবে নাহি জানি,
সাধে পতির করে অকল্যাণ॥
কত যে দুৰ্গতি বনে, হইতেছে এতক্ষণে,
সঙ্গে নাহি দেবর লক্ষ্মণ।

থাকুক্‌ বাণ অসংখ্য তূণে, তথাপি একাকী রণে
শক্ত আর্‌ হবেন কতক্ষণ॥
অথবা কর্ব্বূরগণ, পেলে তাঁর দরশন,
প্রমাদ ঘটাবে অতিশয়।
নিশ্চয়ে করিবে ভক্ষণ, কিম্বা করিয়ে বন্ধন,
রাখিবেক আপন আলয়॥
এত যে বিপদ বনে, তাহা যখন জেনে শুনে,
পাঠাইল নাথে এ পাপিনী।
কি ফল হবে রোদনে, আর দেখা তাঁর সনে,
হবে না জানিছে দুর্ভাগিনী॥


রাগিণী—ললিত ঝিঁঝিট।

তাল—ঝাঁপতাল।

জানি কি কুরঙ্গ মোরে' কান্দাবে এমন করে।
ভাবিলাম অরণ্য মৃগ, এখনি আনিবেন ধরে॥
বুঝিমু এবে নিশ্চিত, হবে হরিণ কার পালিত,
করি তোর সনে রণ, হলেন নাথ পরাজি ;
তজ্জন্য লক্ষ্মণে সদা, ডাকেন উচ্চৈঃস্বরে॥
না না, তাহা ত হবে না কখন,
নাথ শক্তি অসাধারণ,
স্বচক্ষে দেখেছি আমি, ভার্গবের রণ;
তবে কি রাক্ষস গণে, করিল অতি পীড়িত,
কিম্বা অজাগর গ্রাসে হঠাৎ হলেন পতিত
যাই কেন না হ’ক দাসী আর, পাবে না
তাঁরে॥ ৬


দীর্ঘ ত্রিপদী।

ক্ষণে মূৰ্চ্ছা সচেতন, হ'ন বা সীতা কখন,
এইরূপে কিছুকাল গত।
তদন্তে লক্ষ্মণে কন, ব'সে রৈলে কি কারণ,
যাও দেবর! ডাক্‌লেন নাথ কত॥
তুমি ভিন্ন বনে আর, কে আছে সহায় তাঁর,
পড়েছেন ঘোর সঙ্কটেতে।
বলিতেছি বারম্বার, করেতে ধরি তোমার,
শীঘ্র নাথে আন কুটীরেতে॥
না চায় কুরঙ্গ দাসী, ব'ল নাথে শীঘ্র আসি,
মৃত্যুকালে দেন দরশন।
ইহাই হয়ে প্রত্যাশী, দুঃখ সাগরেতে ভাসি,
রাখিয়াছি মাত্র ছার জীবন॥
সুবর্ণ মৃগেরে হেরে, ভাবলেম মনে হতে পারে,
এরূপ যথেষ্ট আছে বনে।
অবশ্য তার একটী ধরে, অক্লেশে দিবেন দাসীরে,
তজ্জন্য সাধ জানাই শ্রীচরণে॥
তাহাতে যে হবে এমন, জানিলে দাসী কি কখন,
কুরঙ্গের নাম আর করিত।
মম ভাগ্যে বিড়ম্বন, আছে বলি দুর্ঘটন,
ঘটিল সামান্য কৰ্ম্মে এত॥
হীন বুদ্ধি আমি নারী, নিরন্তর দৃষ্টি করি,
বিভীষণ বন-বিভীষিকা।
সদা প্রাণ থর হরি, কান্দে দিবা বিভাবরী;
থাকি যেন হয়ে পুত্তলিকা॥
কেবল নাথের চরণ, হেরি ভয় হয় নিবারণ,
বন ক্লেশ ভুলে যাই সব।

বুঝি, তাহা বিসর্জ্জন, হইল পাপিনী কারণ,
মিটে গেল সমস্ত উৎসব॥


রাগিণী—সুরট।

তাল—ঝাঁপতাল।

জানে কি জানকী জন্তু, জঙ্গলে জনমে এত।
মুহূর্ত্তেক জন্য গৃহ, হত না যে বহিৰ্গত॥
অযোনিতে জন্ম মোর, তবু জননী নিরন্তর,
সর্ব্বাপেক্ষা স্বতন্তর, করিতেন সুযত্ন কত॥
জনক জীবন সমা, ছিল সীতা অনুপমা,
তিলেক নয়ন সীমা, করিতেন না বহির্ভূত;
কৈকেয়ী কুহক করি, করিল এত লাঞ্ছিত,
কত যে কষ্টেতে সীতায়, করিয়াছে নিপাতিত
কে করে প্রত্যয় কান্দি, শিরে করি করাঘাত॥


দীর্ঘ ত্রিপদী।

ক্রমে ক্রমে সীতা, হন ব্যাকুলিতা
শ্রীরাম দর্শন বিনে।
ধরা বিলুণ্ঠিতা, কভু উৎকণ্ঠিতা,
দৃষ্টিমাত্র পথপানে॥
বাহিরে কুটীরে, যাতায়াত করে,
উন্মাদ লক্ষণ প্রায়।
লক্ষ্মণ ধীরে ধীরে, কহেন সীতারে,
ধৈর্য্য,ধর ধরি মা পায়॥

শ্রীরাম কখন, বিপদে পতন,
হবেন্ না মা সুনিশ্চয়।
বিপদ ভঞ্জন, হন যেই জন,
তাঁর আবার বিপদ ভয়?

(যাঁর নাম স্মরণ কল্পে সমস্ত ভব ভয়
বিদূরিত হয়, তাঁর ভয় আশঙ্কা কেমন)
যেমন, সিংহের ভয় জম্বুকে, আর অহির ভয়
ভেকে,
তেমন, গরুড়ের ভয় কাকে, আর বিড়ালের
মূষিকে,
শাৰ্দ্দূলের ভয় যেমন, ছাগ আর গাঁড়লে,
কৃষিজীবির ভয় তেমন অসম্ভব লাঙ্গলে॥
মাতঙ্গের ভয় যেমন, হয় না কুরঙ্গে,
শ্যেনপক্ষী ভয় তেমন, করে না পতঙ্গে॥
বীরের যেমন ভয়, হয় না কভু রণে।
মৃত্যুঞ্জয় ভয় তেমন, করেন না শমনে॥
তদ্রূপ শ্রীরাম চন্দ্রের বিপদ অনুমানি।
ধৈর্য্যধর ধরাসুতে, রাম মন্মোহিনি॥


রাগিণী—আলিয়া।

তাল একতালা।

রামের ভয় কি সম্ভব হয়॥
তিনি ভূভার হরণ, করিতে যখন,
এসেছেন ত্যজি বৈকুণ্ঠ ভুবন,
বিস্মৃত কি হ'লে, সে সব বিবরণ;
ত্যজচিন্তা সমুদয়॥ (ওমা)

সৃষ্টি স্থিতি যাঁর ইচ্ছার অধীন,
ভ্রূক্ষেপেতে হয়, প্রলয় সাধন,
তাঁর অমঙ্গল, হ’বে না কখন;
জেন ইহা সুনিশ্চয়॥ (ওমা) । ৮


লঘু ত্রিপদী।

রামগুণ গান, শ্রবণ করিয়া,
সীতা লক্ষ্মণেরে কন।
জানে সে সন্ধান, জনক তনয়া,
শ্রীরাম মনিব নন॥
তা হ'লে কি হবে, দুর্ভাগিনী মূল,
সমস্ত দুঃখের তাঁর।
কে না ইহা ক'বে, হৃদে বন্ধ শূল,
রহিল যাবে না আর॥
আমি বুদ্ধিহীনা, নতুবা কুরঙ্গ,
ধরিতে কেন পাঠব।
এবে যে বাঁচি না, হ'ল অবশাঙ্গ,
আর কি নাথেরে পাব?
বিশেষ বিপদে, না পড়িলে তিনি,
ডাকিতেন কি কখন।
অবশ্য শ্বাপদে, কিম্বা কোন প্রাণী,
করিতেছে উৎপীড়ন॥
যাও শীঘ্র করি, নাথ যথা আছে,
বিলম্ব উচিত নয়।
অন্য কোন অরি, না আসিতে কাছে,
হওগে তাঁর সহায়॥

কালগত আর, না করি লক্ষ্মণ,
এইমাত্র যাও বনে।
না জানি আবার, কত দুর্ঘটন,
হইতেছে এতক্ষণে॥
যে অবধি তাঁর; আৰ্ত্তনাদ ধ্বনি,
পশিল মম শ্রবণে।
দেহেতে সীতার, নাহিরে পরাণী,
নিশ্চয় ভেবরে মনে॥
মধ্যাকাশ হতে; পশ্চিম গগনে,
যায় ঐ দিনমণি।
দেখিতে দেখিতে এঘোর বিপিনে,
অন্ধকার হবে এখনি!
একে ভয়ঙ্কর, বস সমুদয়,
বন্ধুর পথ তাহাতে।
না কাঁপে অন্তর, বল সে সময়,
হেন বীর কে জুগতে?
অতএব লক্ষ্মণ, থাকিতে থাকিতে,
দিবাকর করোজ্জ্বল।
সীতার জীবন, আনি কুটীরেতে
কররে প্রাণ শীতল॥


রাগিণী—আড়না বাহার।

তাল—কাওয়ালী।

যাও ক'রনা কাল গত আর
বারম্বার কান্দে প্রাণ আমার,
বনে করিছে নৃশংস কেহ,
নাথে অতি অত্যাচার
কি কুক্ষণে আসিল কুরঙ্গ,

বুঝি এজনমে সীতার, করি গেল সুখসাঙ্গ,
আমি, জানিকি মৃগেতে এত,
করিবেরে প্রতীকার॥ ৯


পয়ার।

শ্রীরাম বিরহানল যেরূপ প্রবল ৷
লক্ষ্মণ উপদেশামৃতে না হ'ল শীতল॥
বরং তাহে প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠিল ৷
দেখি লক্ষ্মণের মুখ মলিন হইল॥
গললগ্নী কৃতাবাসে বসি সীতা পাশে॥
যুক্তিযুক্ত বাক্য লক্ষ্মণ কহে মৃদুভাষে॥
অকারণে কেন মা' গো শোক কর এত।
শ্রীরাম ক্ষমতা দাস আছয়ে বিদিত॥
ত্রিভুবনে হেন শক্তি নাহিক কাহার।
আর্য্যসহ প্রতিবাদ করিতে তাহার॥
ভূচর খেচর নিশাচর জলচরে।
শ্রীরাম কেশাগ্র কেহ স্পর্শিতে না পারে॥
স্বয়ং বিষ্ণু অবতার শ্রীরাম যখন।
তাঁহার বিপদাশঙ্কা ক'র না কখন॥
অপর্যাপ্ত নিশাচর বনে বাস করে।
ছল করি তাহারাই ডাকিল আমারে॥
তোমায় ত্যজিয়া আমি করিলে গমন।
নিশ্চয় আসিয়ে তারা করিবে ভক্ষণ॥
অতীব মায়াবী রাক্ষস্ নানা রূপ ধরে।
আহার নিমিত্ত বনে সর্ব্বদা বিচরে।

পশুপক্ষী মানবাদি যাহা দেখতে পায়।
অমনি নৃশংসগণ ধরি ধরি খায়॥
তদ্ভিন্ন যে ভয়ঙ্কর কত জন্তু আছে।
বাণের ভয়েতে তারা নাহি আসে কাছে॥
সতত সতর্কে তোমায় রক্ষা করে দাস।
নতুবা মুহূর্ত্তে বিপদ ঘটয়ে নিৰ্য্যাশ॥
বিশেষ আর্য্যের আছে নিষেধ আবার।
তিলার্দ্ধ তোমারে ত্যজি যাইতে আমার॥
প্রাণান্তে আর্য্যের বাক্য লঙ্ঘিতে নাপারি।
ক'র না অন্যায় আজ্ঞা চরণেতে ধরি॥
নিশ্চিন্ত মনেতে থাক কিছু নাহি ভয়।
সুসুস্থ শরীরে আর্য্য আছেন নিশ্চয়॥
মৃগসনে দূরবনে গিয়েছেন তিনি।
অবিলম্বে কুটীরেতে আসিবেন্ এখনি॥


রাগিণী—ভঁয়র।

তাল—একতালা।

ধর ধৈর্য্য রাম প্রিয়ে।
আনি, কুরঙ্গ তোমারে দিবেন, এখনি আসিয়ে॥
বুঝি দূরবনে, কুরঙ্গের সনে, গমন করিয়ে,
হ'ল বিলম্ব আসিতে,হ’ওনা ত্রাসিতে,
থাক মা নিৰ্ভয়ে॥
অকারণে কেন মা গো শোকাৰ্ত্তা হইলে,
মনে, সামান্য মানব, রামে জ্ঞান কি করিলে;
লক্ষ্মী জনার্দ্দন, তোমরা দুজন, বৈকুণ্ঠ ত্যজিয়ে,
এলে লীলার কারণ, হ'লে বিস্মরণ,
বল কি লাগিয়ে॥ ১০


চৌপদী।

শ্রীরাম বিরহানল, হয়েছে এত প্রবল,
সীতার চক্ষের জল, বিরাম বিহনে।
পড়িতেছে,অনর্গল তবু নাহি হয় শীতল;
নিশ্চয় ইহা অমঙ্গল, হেন লয় মনে॥
লক্ষ্মণ উপদেশ যত, হল ঘৃতাহুতি মত,
বরং তাহে প্রজ্জ্বলিত, অধিক হইল।
ক্রোধে সীতা অভিভূত, ঘন অঙ্গ প্রকম্পিত
বাহ্য জ্ঞান যেন তত, আর না রহিল॥
মৃগ জন্য কি লাঞ্ছনা, মৃগনেত্রে অগ্নিকণা,
বিনা বিধি বিড়ম্বনা, নিৰ্গত কি হ'ত।
সে সীতা যায়না জানা, বিশ্বেশ্বরীর ইচ্ছা, নানা,
বুঝি গ্রাসিতে বাসনা বিশ্ব অসুমিত॥
যে সীতার কণ্ঠস্বর ছিল চির মনোহর,
আজি তাহা বিষধর, সম যে গৰ্জ্জিল।
বলেন্ সীতা হে দেবর, এত দিনে তোর অন্তর,
জানিতে আমার আর, বাকী না রহিল॥
বিপদে পড়িয়া নাথ, ডাকিলেন তোরে কত,
তৎপ্রতি যে কর্ণপাত, কিছু না করিলি।
বুঝিনু এবে নিশ্চিত, করিতে স্বার্থ সাধিত,
হয়ে রামের অনুগত, সঙ্গেতে আসিলি॥
বড় সাধ ছিল মনে, লক্ষ্মণ-রয়েছে সনে
কি জানি বিপদে বনে, পড়িলে কখন।
উদ্ধারিবে প্রাণপণে, আর্য্যে পিতৃতুল্য জ্ঞানে,
বন দুঃখ নিবারণে, করিবে যতন॥
আজি তোর ব্যবহারে, সে আশা গিয়েছে দূরে,
শঠের শঠতা কিরে, থাকয়ে গোপন।

যত সততা দেখাক সে-রে কাল ফণী অন্তস্তরে,
অন্যের সর্ব্বনাশ তরে, করয়ে গর্জ্জন॥
সুযোগ প্রতীক্ষা মাত্র, নহে সে কাহার মিত্র,
বাহ্য মূৰ্ত্তি সুপবিত্র, করি তারে জ্ঞান।
না বুঝি পাপী চরিত্র, করি বিশ্বাসের পাত্র,
ইচ্ছায় আপন যোত্র, হারায় সে জন॥
সীতা নয় তেমন নারী, বুঝেছি সব চাতুরী,
ভরত সঙ্গে যোগ করি, বনেতে আসিলি॥
কিন্তু তাহে নাহি ডরি, শ্রীরামের নামস্মরি,
তোর মত সহস্র অরি, পদতলে দিলি॥
একাকিনী পেয়ে মোরে, সতীত্ব ধন লবে হ’রে
ইহা বুঝি মনে করে, রয়েছিস্ বসিয়ে?
মণ্ডুকের সাধ্য কিরে, করী মস্তক বিদারে,
পড়ুক সে বিপদ-ঘোরে, যূথভ্রষ্ট হয়ে॥
কত বল ধরে সতী, জানিস্ নারে দুষ্টমতি,
বিশেষ রঘুপতি পতি, সীতার যখন।
করিবি তার দুর্গতি, ওরেরে ও পাপমতি,
এমন তোর শকতি, আছে কি দুৰ্জ্জয়?
জম্বুকে সিংহ আহার, - গ্রাসিবে বিশ্বাস যার,
তার সম মূর্খ আর, কে আছে জগতে?
সীতা প্রতি অত্যাচার, তদ্রূপ রে কুলাঙ্গার,
করে হেন শক্তিকার, ভেবে দেখ, মনেতে॥
দূর ‘হ’ নিকট হতে, আর্য্য দুঃখ নিবারিতে,
জানকী এজীবনেতে, কবে না কখন।
একাকিনী কুটীরেতে, বসি একান্ত মনেতে,
পতির পদ ধ্যানেতে, ত্যজিবে জীবন॥


রাগিণী—মুলতান।

তাল—কাওয়ালী।

ভরত লইল রাজ্য, তোর বুঝি অন্তর,
সীতার সতীত্ব হ’র্‌তে হ'য়েছে বর্ব্বর,
পারবিনা তা, কি যোগ্যতা,
ওরেরে নির্লজ্জ্ব পামর।
শ্রীরাম মহিষী কভু নহে হীন বল,
ইচ্ছামাত্রে দিতে পারে বিশ্ব রসাতল,
তুই কোন প্রবল, দেখ্‌বিরে ফল;
সত্য সকল ক্ষণকাল পর। ১০


দীর্ঘ ত্রিপদী।

অকথ্য অশ্রাব্য বাণী, সীতা মুখে লক্ষ্মণ শুনি,
ক্রোধে বিস্ফারিত নেতৃদ্বয় ।
পড়িলে শিরে অশনি, কিম্বা দংশিলে ফণিনী,
হেন জ্বালা বুঝি নাহি হয়॥
প্রকম্পিত কলেবর, তীব্র দৃষ্টি সীতাপর,
কথা কন বিজড়িত স্বরে॥
মনোবুদ্ধি অগোচর, এরূপ বাক্য কঠোর,
প্রয়োগিলা কেন মমোপরে।
ভিন্ন ভাব যদি চিতে, থাকে সুমিত্রা তোমাতে,
স্বর্গ পথ হয় যেন রোধ।
কুবাক্য কুঠারাঘাতে, না বধি স্বয়ং অসিতে,
বিনাশিতে হত সুখ বোধ॥
তোমার হিতের তরে, যা' বলেছি বিনয় ক'রে,
কর্ণপাত না করিয়ে তায়।

অযথা কান্দালে মোরে, না ভাবি, ভাবি অন্তরে
সর্ব্বনাশ করিলে ইচ্ছায়॥
সহিলাম আমি ব'লে অন্য হ'লে কোন কালে,
যমালয় পাঠাত তোমায়।
কায্ নাই আর সে সকলে, ভাস তুমি চক্ষের জলে,
আমি এখন হ'লেম বিদায়॥
একটা কথা বলি শেষে, যেতেছি আৰ্য উদ্দেশে,
মনে রেখো ভুলনা কখন।
হিংস্রক্ কিম্বা ছদ্মবেশে, কেহ না আসিবে পাশে,
লঙ্ঘি মম ধনুর অঙ্কন॥
রাক্ষসেরা মায়াচারী, কৌশল্যার রূপ ধরি,
কিম্বা আসে জনক সাজিয়া।
কদাচ বিশ্বাস করি, যেওনা শত নিবারি,
কুটীর হ'তে বাহির হইয়া॥
গঙ্গাধর কি গদাধর, পুরন্দর মেঘ পুষ্কর,
দিবাকর কিম্বা শশধর॥
ভূত প্রেত নিশাচর, গন্ধর্বব অপ্সর নর,
বিদ্যাধর কিন্নর খেচর্।
ইত্যাদি কাহারে ভয়, নাহি তব সুনিশ্চয়,
গণ্ডীভেদ করিতে নারিবে॥
বলিলাম সমুদায়, কর ইচ্ছা যাহা হয়,
চলিলাম্‌ আমি এখন তবে।


রাগিণী—মিশ্র খট্‌।

তাল—রূপক।

ভবভয় বিনাশিতে, ভক্‌তে অভয় দিতে
এসেছেন্‌ যে ভবেতে, তার করিয়ে ভয়।

ভাসিয়ে চক্ষের জলে, ভয়ঙ্কর বাক্য শূলে,
লক্ষ্মণের বিদারিলে, কঠিন এ হৃদয়॥
ভবিষ্যৎ না ভাবিয়ে, শ্রীরাম অন্বেষণে,
অযথা পাঠাইলে; কি করি যাই বনে,
না আসি যতক্ষণ, থাকিও সাবধানে,
অন্যথায় বিপদেতে পড়িবে সুনিশ্চয়॥
রহিল সীমাবদ্ধ ধনুর অঙ্কন,
তন্মধ্যে ব্যতীত ক'র না ভ্রমণ,
ত্রিলোকে কোনজন, নাহি আর এমন,
করিতে গণ্ডীভেদ, কাহার সাধ্য নয়? ১২


দীর্ঘ ত্রিপদী।

শ্রীরামের অন্বেষণে, লক্ষ্মণে পাঠায়ে বনে;
সীতা ভাবেস্ করি কি এখন।
একাকিনী আছি জেনে, যদ্যপি শ্বাপদগণে,
বধে জীবন কে করে বারণ॥
অতীব শঙ্কট স্থল, আর্য্য ও দেবর বল—
ছিল বলি, না হইত ভয়।
নতুবা জন্তু সকল, যেরূপ বনে প্রবল,
কোন দিন যেতাম্ যমালয়॥
কিন্তু তাহে নাহি ডরি, বরং,মৃত্যু ইচ্ছা করি,
দুঃখের জীবনে কিবা ফল।
মাগে বর এ কিঙ্করী, সুকাণে শুন ঈশ্বরী,
নাথ অরি বিনাশ সকল॥
আর্য্যের কুশল করি, সত্বর অযোধ্যাপুরী
লয়ে যাও দেবরের সনে।

আত্মহত্যা ক'রে মরি, অথবা শ্বাপদে ধরি,
ভক্ষণ করুক মোরে বনে॥
ইত্যাদি মনেতে কত, উদিতেছে অবিরত,
কে বুঝিতে পারে সে সন্ধান।
বৃক্ষপত্র হলে চ্যুত, অমনি হয়ে চকিত,
রাম এলেন্ করেন অনুমান,
পুনঃ ভয়ে অচেতন, কভু বা হন চেতন,
এই ভাবে কিছু কাল গত।
দুষ্টমতি দশানন, সময় বুঝি তখন,
সন্ন্যাসীর বেসে উপস্থিত॥
লোক লজ্জা ধৰ্ম্মভয়, কামুকের নাহি হয়,
লঘু গুরু ভেদ নাহি করে।
নহিলে যে দিগ্বিজয়, করিয়ে প্রতিষ্ঠালয়
সে আজি সন্ন্যাসী নারীতরে॥
স্বয়ং লক্ষ্মী যে জানকী, তাহার সতীত্ব নাকি,
হরিতে বাসনা যার মনে।
তার সম কে পাতকী, ত্রিলোকেতে আছে যে কি,
বিশ্বাস না করে বিজ্ঞজনে॥
রিপুবশে সর্ব্বনাশ, করিতে যেন নির্যাশ
সীতা প্রতি কহিল রাবণ।
করিয়াছি উপবাস, পারণ করিতে আশ—
করি আসি তোমার সদন॥
তুমি অতি গুণ্যবতী, সৎকার কর অতিথি,
শুনিতে পাইনু লোক মুখে।
যেরূপ তব আকৃতি, দেখিয়া হয় ভকতি,
ঈশ্বর প্রসাদে থাক সুখে॥
ক্ষুধাতে জ্বলিছে প্রাণ, খুজিলাম কত স্থান,
না জুটিল এক মুষ্টি অন্ন ৷

জানিয়া তব সন্ধান, আসিলাম বিদ্যমান,
অন্ন দাও হইয়া প্রসন্ন॥


রাগিণী—কালেঙড়া।

তাল—আড়খেমটা।

ক্ষুদিতে অন্ন প্রদানি, রাখ কীৰ্ত্তি ববাননে ।
তুমি সতী পুণ্যবতী, বিদিত আছে ভুবনে ।
অতিথি সৎকার ব্রত, করে, যে নারী প্রতি নিয়ত
ভর্ত্তার দুষ্কৃতি যত, বিদূরিত হয় ললনে।
ভগ্নমনোরথ হ'ল অভ্যাগত জন,
গৃহীর সমস্ত পুণ্যের ভাগ, করিয়া হরণ
স্বীয় পাপরাশি শিরে,
দাতায়, অর্পি যায় সে, স্থানান্তরে,
অধোন্নতি হয় সংসারে,
নিশ্চয় ইহা জেন মনে॥


পয়ার।

অদৃষ্ট যাহার যবে অপ্রসন্ন হয়।
বিবিধ বিপদ আসি ঘেরি তারে লয়।
সূৰ্য্য কুলবধূ সতী জনকনন্দিনী ।
সাক্ষাৎ বিষ্ণু অবতার শ্রীরাম গৃহিণী॥
বিপুল বিক্রমশালী দেবর লক্ষ্মণ।
রথ রথী গজবাজী ছিল অগণন।
তাঁর সম ভাগ্যবতী কে তখন ছিল।
বিধির বিপাকে দেখ কি দশা ঘটিল।
সহায় সম্পদ আদি থাকুক যত বল ৷
কৰ্ম্ম দোষে কিছুতেই নাহি হয় ফল॥

সহস্র সঙ্গিনী সঙ্গে রম্য হর্ম্ম্যোপরে।
থাকিতেন সদা যিনি অতীব আদরে॥
কালের কুটিল চক্রে পড়ি আজি তিনি।
জন শূন্য ঘোর বনে আছেন একাকিনী॥
ভয়েতে,ব্যাকুল প্রাণ হ'য়েছে এমন ৷
এক বিন্দু অশ্ৰু নাহি হতেছে পতন॥
শুষ্ক কণ্ঠ শুষ্ক মুখ শুষ্ক কলেবর।
কাষ্ঠ পুত্তলিকা সম বিশুষ্ক অন্তর॥
একে রাম বিচ্ছেদেতে নাহি বাহ্যজ্ঞান ৷
সন্ন্যাসী দেখিয়া পুনঃ উড়িল পরাণ॥
জীর্ণ বস্ত্রখানি দিয়া অঙ্গ আচ্ছাদিয়া।
কুটীরের কোণে গিয়া ব’ন লুকাইয়া॥
মনে মনে কত চিন্তা উদিল তখন।
প্রকাশিতে সাধ্য নাহি অন্যের কখন॥
এরূপ বিপদাপন্না অন্য নারী হ'লে।
কোন কালে প্রাণ পাখী যে'ত তার চলে॥
লক্ষ্মী অংশে আবির্ভূতা হয়েছেন সীতা।
তজ্জন্য বিপদর্ণবে আছেন জীবিতা॥
ছদ্মবেশী রাবণ সন্ন্যাসী বারম্বার।
ভিক্ষাং দেহি বলি দ্বারে করিছে চীৎকার॥
অন্যোপায় নাহি সীতা ভাবে মনে মনে।
হইল কহিতে কথা সন্ন্যাসীর সনে॥
নতুবা কদাচ আর নিবৃত্ত না হবে।
বরং আক্রমিয়ে বল বিপদ ঘটাবে॥
দুর্ব্বলা রমণীগণ কোন সাধ্য নাই।
সময় বুঝিয়া তাই এলেন গোঁসাই॥
এতদিন করিতেছি বাস এই বনে।
একটি সন্ন্যাসী কভু হেরি নাই নয়নে॥

প্রকৃত সন্ন্যাসী কিনা কপট এবেশ ।
নারীতে কিরূপে পারে করিতে নির্দ্দেশ।
জনপ্রাণী কেহ নাই জিজ্ঞাসিব কায়।
পারি না দুলিতে আর চিন্তার দোলায়?
ভাগ্যে যাঁহা আছে কভু হবে না খণ্ডন।
বৃথা কালবিলম্বেতে নাহি প্ৰয়োজন॥
ইত্যাদি চিন্তিয়া সীতা কহেন যোগীরে।
আপেক্ষা করুন স্বামী নাই মোর ঘরে॥
কুটীরের বাহিরে যাইতে নাহি পারি।
স্বামী আজ্ঞা কিরূপে লঙ্ঘিতে পারে নারী?
কোন কারণেতে তিনি গিয়াছেন বনে।
এখনি আসিবেন প্রভু বসুন,প্ৰাঙ্গণে।
অতিথি সৎকার তাঁর বড় প্রিয়তর।
তুষিবেন আঁপনারে আসিয়ে সত্বর॥


রাগিণী—মিশ্র ভৈরবী।

তাল—একতালা।

থাকুন্ অল্পক্ষণ অপেক্ষা করি।
আসি আর্য্য আপনারে,
অতি সমাদরে, পূজা করবেন,
তিনি, সজ্জনের দাস, দুর্জ্জনের অরি॥
অতিথি সৎকার, প্রিয় কার্য্য তাঁর,
সে কার্য্যে অন্যেরে নাহি দেন ভাঁর,
স্বয়ং সম্পাদিয়ে, করেন আহার,
চিরব্রত নাথের ইহা ;
তিনি, যোগীর আরাধ্য, যোগী তাঁর আরাধ্য,
কিবা মোর, সাধ্য, শ্রীরামগুণ প্রচারী॥১৪


দীর্ঘ ত্রিপদী।

সীতার সুকুণ্ঠ ধ্বনি, শুনি চমকি অমনি,
লঙ্কেশ্বর চতুৰ্দ্দিকে চায়।
ভাবে মনে বাগ্বাদিনী, অথবা হর মোহিনী,
ছলিবারে এসেছেন্ আমায়॥
নতুবা আমার মন, স্বর শুনি উচাটন,
কেন হ'ল না পারি বুঝিতে।
অসংখ্য সুন্দরীগণ, যারে সেবে অনুক্ষণ,
সহজে তায় কে পারে ভুলাতে॥
কত গন্ধর্ব্ব কুমারী, শত শত বিদ্যাধরী,
কিন্নরী কি অপ্‌সরাদি যত।
ত্রিলোকে যত সুন্দরী, আছে মম লঙ্কাপুরী,
মনস্তুষ্টি করিছে নিয়ত॥
কিন্তু এ যে কি সুস্বর, কন্দর্পের পঞ্চশর,
নহে খরতর এ প্রকার।
দশঙ্কন্ধের অন্তর, ভেদি করে জর জর,
ইতোধিক আশ্চর্য্য কি আর॥
শূর্পণখা যা কহিল কিছুমাত্র নাহি ভুল,
বরং অতিরিক্ত দেখতে পাই ৷
স্বরে যখন মন ভুলিল, তার যেরূপ অতুল,
ইহাতে সন্দেহ কিছু নাই ৷
করিয়াছি দিগ্বিজয়, সে সব যে কিছু নয়,
নিশ্চয় জানিনু এত দিনে।
এ ললনার সুহৃদয়, যেতক নাহিক হয়,
অধিকার, ভ্রমিব বনে বনে॥
সন্ন্যাসী এ সাজিয়াছি, মুখেতে ভস্ম মেখেছি,
ইহাতেও না হলে ঘটন।

অন্য বেশে রাজি আছি, কত যে কাৰ্য্য সেধেছি,
বহুরূপ করিয়ে ধারণ॥
স্থির প্রতিজ্ঞা আমার, না করি কার্য্য উদ্ধার,
কদাচ না যবি লঙ্কা ধামে।
সাধ্যমত সাধি আাবার, করিব বল প্রচার,
না করিব ত্রুটী কোন ক্ৰমে॥
ইত্যাদি চিন্তিয়া মনে, পুনঃ সুমিষ্ট বচনে,
দশানন সীতা প্রতি কয়।
অয়ি ভদ্রে! কি কারণে, প্রতার ক্ষুধিত জনে,
ধর্ম্মেতে কি নাহি তব ভয়?
গৃহে না থাকিলে পতি, আইসে যদি অতিথি,
পত্নী তার উপেক্ষা না করে।
যে হয় তার শকতি, অভ্যাগতে করি প্রীতি,
বিদায় করয়ে সমাদরে॥
ইহা কি নাহি শুনিলে, অতিথি বিমুখ হ’লে
কি দুর্দ্দশা হয় সংঘটন।
পতিপত্নী উভয়েতে, দহিয়ে পাপ বহ্ণিতে,
নিরয়েতে করয়ে গমন॥
তুমি অতি বুদ্ধিমতী,অটল পতি ভকতি,
আছে হেন পাইনু বুঝিতে।
ইচ্ছা করি অধোগতি, কদাচ ক’রনা সতি,
ধৰ্ম্ম হ'তে কি আছে জগতে?
ধর্ম্মভয় করি চিতে, আইলে পতি সহিতে,
বন কষ্ট তুচ্ছ করি মনে।
তবে কেন অভ্যাগতে, বিলম্বিছ অন্ন দিতে,
ক্ষুধাতে বাঁচি না আর প্রাণে॥
এইরূপে লঙ্কেশ্বর, স্বার্থ সাধিতে বিস্তর,
মিথ্যা কথা কহিতে লাগিল। .

কিন্তু সীতার উত্তর, একটী কর্ণ গোচর,
তথাপিও আর না হইল॥
ইহা দেখি লঙ্কাপতি, ভাক্ত ক্রোধ সীতা প্ৰতি
কহি পুনঃ কহে উচ্চৈঃস্বরে।
বুঝিলাম পাপমতি, হ'য়েছে নাহি নিষ্কৃতি,
শাপে ভস্ম করিব তোমারে॥
আমি যোগী কি প্রকার, ভাবিলে না একবার,
অহঙ্কারে কথা না কহিলে।
করিতেছি প্রতীকার, নাহিক আর নিস্তার,
ব্রহ্মতেজঃ দেখ চক্ষু মেলে॥
পতি সহ আজি তোরে, ক্রোধানলে দগ্ধ ক'রে,
তবে আমি করিব গমন।
কার সাধ্য রক্ষা করে, দেখির আজি তাহারে,
ত্রিলোকেতে হেন কোনজন?


রাগিণী—আলিয়া।

তাল—ঠেশ কাওয়ালী।

(আজি) দেখি তোরে কে রক্ষা করে।
জাননা আমারে, (আমার) তপের এমন বল,
স্বর্গ মর্ত্য রসাতল, বিনাশিয়া করি সৃষ্টি অচিরে,
ভিক্ষার্থী হয়েছি বলে, করিলে অবজ্ঞা যত,
বিধিমত প্রতীকার করি হইব বিরত;
সবংশেতে ক্রোধানলে, করিতেছি ভস্মীভূত,
কার সাধ্য মম ক্রোধ নিবারে।


দীঘ ত্রিপদী।

ভাক্ত যোগীর ভণ্ডামিতে, সীতার চক্ষু বারিতে
বক্ষঃস্থল প্লাবিত হইল।
ভাবে মনে কুক্ষুণেতে সোণার মৃগ ধরিতে,
আর্য্য গিয়ে প্রমাদ ঘটিল॥
নিকটেতে কেহ নাই, জিজ্ঞাসিব কার ঠাঁই,
একাকিনী আছি কুটীরেতে।
যেরূপ ক্রোধী গোঁসাই, ভিক্ষা দিতে নাহি যাই,
শাপে পারে সর্ব্বনাশ করিতে
দেখাইছে যত ভয়, একটিও মিথ্যা নয়,
অতিথি বিমুখ মহাপাপ।
আমার এ দুঃসময়, কি করিতে কি যে, হয়,
এ হতে বা পাই মনস্তাপ॥
বিশেষ আর্য্যের বারণ, কিরূপে করি লঙ্ঘন,
যাই আমি কুটীর বাহিরে।
এদিকেতে তপোধন, যেরূপ করিছে গর্জ্জন,
দুইদিক রাখি কি প্রকারে?
হ'ক মোর দুঃখ, যত, ক্ষতি নাই তাহে তত,
আর্য্যের কষ্ট না হয় কোন মতে।
সতীর পতি ব্যতীত, কি আছে তা জানি না ত,
ভালবাসা বস্তু ত্রিজগতে॥
ধন জন তুচ্ছ করি, পতি পদ সদা হেরি,
বন কষ্ট আছি সহ্য করে।
তাহে বুঝি হয়ে অরি, বিধি যোগী রূপ ধরি,
আসিলেন বাদ সাধিবারে।
সামান্য এ যোগী নয়, পারে করিবারে লয়,
বিশ্ব হেন বলিছে আপনি।

হইতেছে শুনি ভয়, যদি ইহা সত্য হয়,
তবে ত দূষিবেন্ রঘুমণি॥
ধর্ম্মে তাঁর দৃঢ়মতি, তজ্জন্য এত দুর্গতি,
নিরন্তর করিছেন সহ্য।
নতুবা কৈকেয়ী প্রতি,অসন্তুষ্ট এক রতি,
না হ'য়ে কি ত্যজিতেন্ রাজ্য?
ধৰ্ম্মচ্যুত যেই জন, তার মুখ দরশন,
নাথ নাহি করেন যখন।
হয় হবে বিড়ম্বন, অতিথি বিমুখ কখন,
করিব না করিলাম পণ॥
ভাগ্য দোষে যা ঘটিবে, কদাচ নাহি খণ্ডিবে,
অবশ্যই হলে সংঘটন।
মিছে কেন ভেবে ভেবে, মরি আর আমি তবে,
হ’ক্‌ যাহা ললাট লিখন॥
ইহা মনে বিচারিয়ে, যোগীবরে সম্বোধিয়ে
কহিলেন সুমধুর স্বরে।
আপনারে কি যে দিয়ে, তুষিব এ দুঃসময়ে,
এতক্ষণ ভাবিনু অন্তরে॥
বিধি আজি বাম মোরে, নতুবা অন্নের তরে,
এতই কি বলিতে হইত?
রয়েছি ভগ্ন কুটীরে, অঙ্গাচ্ছাদি আছি চিরে,
কি রূপেতে হই বহির্গত॥
হারায়েছি রাজ্যধন, সতীত্ব লজ্জা-রতন,
রাখিয়াছি মাত্র যত্ন ক'রে।
থাকিতে দেহে জীবন, করিব না বিসর্জ্জন,
আসুন প্রভু কুটীরের দ্বারে॥
ফল মূল ভিন্ন আর, নাহিক কিছু আমার
অতিথির ভোজনের যোগ্য।

ইচ্ছা হ'লে আপনার লয়ে করুন আহার,
কি করিব আমি মন্দ ভাগ্য॥
ইহা শুনি দশানন, হস্ত পদ সঞ্চালন,
করি ভাক্ত ক্রোধ প্রকাশিয়া।
বলে আমি এতক্ষণ, বুঝিলাম তব মন,
চাইনা ভিক্ষা যাই শাপ দিয়া॥
কার্য্য কি আমার এত, ভিক্ষা জন্য ধৰ্ম্মচ্যুত,
হব এই সামান্য কারণে।
করি ব্রহ্মচর্য্য ব্রত, গৃহ হতে বহির্গত,
হয়েছি, না যাব এ জীবনে॥
সন্ন্যাসীর আচরণ, জান না তুমি কখন,
নৈলে কেনে ডাকিবে নিকটে।
রক্ষা নাই কদাচন, গণ্ডুষে জল গ্রহণ,
করিলাম পড়িলে সঙ্কটে॥
এইরূপে ছদ্ম বেশী, দুর্ব্বৃত্ত রাবণ সন্ন্যাসী,
লম্ফ ঝম্ফ করিতে লাগিল।
দেখি সীতা মুখ-শশী, ভয়রূপ রাহু আসি,
গ্রাসি অম্‌নি মলিন করিল।
অটল অচল প্রায়, ক্ষণেক এরূপে যায়,
কর্ত্তব্যতা মনে বিচারিল॥
আসিয়া কুটীর দ্বারে, ভিক্ষা নিতে বারে বারে
ব'লে যখন হ'লনা সুসার।
কিহেতু বিলম্ব করে, সূর্য্য বংশ একেবারে,
ব্রহ্ম শাপে করি ছার খার॥
মনে ইহা চিন্তা করি, ফল মূল করে পূরি,
কুটীরের বাহিরে আসিল
অমনি সাপটি ধরি, ছদ্মবেশ পরিহরি,
লঙ্কেশ্বর রথেতে উঠিল॥
ভাগ্যলক্ষ্মী পদে দলি, সীতায় রথেতে তুলি,
সারথিরে বলিল রাবণ।
অতি শীঘ্র যাও চলি, যেন লঙ্কা পথ ভুলি,
অন্যত্র না করহ গমন॥

সাধ্য মোর যে পর্য্যন্ত,সীতা হরণ বৃত্তান্ত,
বিরচিনু অতি যত্ন করি।
ভরসা আছে একান্ত,শ্রোতাগণ আদ্যোপান্ত,
শুনিবেন দোষ পরিহরি।


রাগিণী—বাহার।

তাল—আড়া।

ভাই! সময় প্রতীক্ষা নাহি কর ক্ষণকাল।
কে জানে কখন গৃহে প্রবেশিবে কাল॥
যাবত আছে হে জ্ঞান, চিন্ত শ্রীরাম চরণ,
নতুবা আসি শমন, ঘটাবে জঞ্জাল;
কৃষ্ণ ইন্দ্র বলে মৃত্যুর, নাহি কালাকাল॥ ১৬


রাগিণী—আলিয়া

তাল—একতালা।

কিবা সুমধুর রাম নাম।
শুনে জীবন জুড়ায়, পাপ তাপ যায়,
সার্থক জন্ম তাহার ধরায়,
যে সর্ব্বদা রাম মন্ত্র জপে পায়,
ধৰ্ম্ম অৰ্থ মোক্ষ কাম॥
হও হে পাতকী, কিম্বা হও নারকী,
জানকী নাথেরে, ভাবলে ভাবনা কি,
একান্ত অন্তরে ডেকে কালে ফাঁকি,
দিয়ে চল মোক্ষ ধাম।
কৃষ্ণইন্দ্র বলে, থাকিতে সময়,
চেষ্টাকর সুফল ফলিবে নিশ্চয়, '
নৈলে অনুতাপে দহিবে হৃদয়,
না পূরিবে মনস্কাম॥ ১৭


সমাপ্ত।

এই লেখাটি ১ জানুয়ারি ১৯৩১ সালের পূর্বে প্রকাশিত এবং বিশ্বব্যাপী পাবলিক ডোমেইনের অন্তর্ভুক্ত, কারণ উক্ত লেখকের মৃত্যুর পর কমপক্ষে ১০০ বছর অতিবাহিত হয়েছে অথবা লেখাটি ১০০ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছে ।