পণ্ডিতমশায়, ঘটিরাম ও কেষ্টা: ছাত্র, পুলিস, দুলিরাম ও খেঁটুরাম: জমিদারের মোসাহেব, কেবলচাঁদ: ওস্তাদ, রামকানাই: জমিদারের ভৃত্য, কেদারকৃষ্ণ: জমিদারের মামা, জুড়ির দল
প্রথম দশ্য
পণ্ডিতমশায়ের বাড়ি
জুড়ির প্রবেশ ও গান
সখের প্রাণ গড়ের মাঠ
ছাত্র দুটি করে পাঠ
পড়ায় নাই রে মন
সবাই হচ্ছে জ্বালাতন!
অতি ডেঁপো দুকান কাটা
ছাত্র দুটি বেজায় জ্যাঠা
কাউকে নাহি মানে
সবাই ধরো ওদের কানে!
গুরুমশাই টিকিওয়ালা
নিত্যি যাবেন ঝিঙেটোলা
জমিদারের বাড়ি—
সেথা আড্ডা জমে ভারি!
[ জুড়ির প্রস্থান
পণ্ডিতের প্রবেশ
পণ্ডিত।(স্বগত) রোজ ভাবি জমিদারমশাইকে বলে কয়ে তার বাড়িতেই একটা টোল বসাব। তা একটু নিরিবিলি যে কথাটা পাড়ব, সে আর হয়ে উঠল না। যে-সব বাঁদর জুটেছে, দুটো বাজে কথা বলবার কি আর জো আছে? এই জন্যেই বলি, ন্যায়শাস্ত্র যে পড়ে নি সে মানুষই নয়—সে গোরু, মর্কট!
নেপথ্যে ওস্তাদী গানের আওয়াজ
এই আবার চলল! এ এখন সারাদিন চলতে থাকবে! গলা তো নয়, যেন ফাটা বাঁশ!
গানের তাড়ায় পাড়াসুন্ধ লোক ত্রাহি ত্রাহি কচ্ছে—কাগটা পর্যন্ত ছাতে বসতে ভরসা পায় না—অথচ ভাবখানা দেখায় এমনি, যেন গান শুনিয়ে আমাদের সাতচোদ্দং তিপান্ন পুরুষ উদ্ধার করে দিচ্ছে। আ মোলো যা—
ঘটিরামের প্রবেশ
এত দেরি হল কেন? এতক্ষণ কি কচ্ছিলি?
ঘটিরাম।আজকে শিগগির-শিগগির ছুটি দিতে হবে।
পণ্ডিত।বটে! অনেক দিন পিঠে কিছু পড়ে নি বুঝি! ছুটি কিসের?
ঘটিরাম।তাও জানেন না! ও-পাড়ায় গানের মজলিস হবে যে! বড়-বড় ওস্তাদ—
পণ্ডিত।না, না, ছুটি পাবি নে, যা! পড়ার সঙ্গে সম্পক্ক নেই, এসেই ছুটির খোঁজ।
ঘটিরাম।বাঃ ঝিঙেটোলার জমিদারবাবু আসবেন!
পণ্ডিত।লাটসাহেব এলেও যেতে পাবি নে। কেষ্টা কোথায়!
ঘটিরাম।জানি নে। ডেকে আনব?—ওরে কেষ্টা!
[ প্রস্থানোদ্যম
পণ্ডিত।থাক্ থাক্, ডাকতে হবে না। ওখেনে বসে পড়্।
ঘটিরাম।‘অল্ ওয়ার্ক্ অ্যান্ড্ নো প্লে মেক্স্ জ্যাক্ এ ডাল্ বয়’—বালকদিগকে খেলিবার সুযোগ দেওয়া উচিত, কেন না, কেবলই লেখাপড়া করিলে মনের স্ফূর্তি নষ্ট হয়। হ্যাঁ, হ্যাঁ, বালকদিগকে খেলিবার
সুযোগ দেওয়া উচিত, কেন না, কেবলই লেখাপড়া করিলে মনের স্ফূর্তি নষ্ট হয়—ফুর্তিটুর্তি সব মাটি। কেন না, কেবলই লেখাপড়া করিলে মনের স্ফূর্তি নষ্ট হয়—এই আমাদের যেমন হয়েছে। কেন না—
পণ্ডিত।ও-জায়গাটা পাঁচশোবার করে পড়তে হবে না। তোর অন্য পড়া নেই?—ঐ যে পুলিসটা যাচ্ছে! ওকে একটু ডাকা যাক। এই পাহারাওয়ালা, ইদিকে আও।
পুলিসের প্রবেশ
দেখো, হামারা পাশের বাড়িমে দিনরাত ভর এইসা ক্যাঁচক্যাঁচ করতা, নিদ্রার অত্যন্ত ব্যাঘাত হোতা হায়। ইস্কো কুছ প্রতিকার হয় না রে ব্যাটা?
পুলিস।কেয়া বোলতা বাবু?
পণ্ডিত।আহা, এটা দেখি একেবারে নিরক্ষর মূর্খ! আরে, পাশের বাড়িমে একঠো গানের ওস্তাদ হায় নেই? উস্কো একদম কাণ্ডাকাণ্ড জ্ঞান নেহি হায়, দিনরাত ভর্ কেবল সারে গামা ভাঁজতা হায়।
পণ্ডিত।‘আই’—‘আই’ কিনা চক্ষুঃ, ‘গো’—গয়ে ওকারে গো—গৌ গাবৌ গাবঃ, ইত্যমরঃ। ‘আপ’ কিনা আপঃ—সলিলং বারি অথাৎ জল। গোরুর চক্ষে জল, অর্থাৎ কিনা গোরু কাঁদিতেছে। কেন কান্দিতেছে? না ‘উই গো ডাউন’, কিনা ‘উই’ অর্থাৎ যাকে বলে উইপোকা—‘গো ডাউন’, অথাৎ গুদমখানা। গুদমঘরে উই ধরে আর কিছু
রাখলে না, তাই না দেখে, ‘আই গো আপ’—গোরু কেবলি কান্দিতেছে—
ঘটিরাম। (বিকট হাস্য)
পণ্ডিত। ঘটে!
ঘটিরাম। অ্যাঁ—না, আজ্ঞে—
পণ্ডিত। ফের ওরকম বিটকেল শব্দ করবি তো পিটিয়ে সিধে করে দেব।
পণ্ডিতের নিদ্রাচেষ্টা
কেষ্টা। পণ্ডিতমশাই, ও পণ্ডিতমশাই—
ঘটিরাম। ঘুমুচ্ছে? (ঠেলিয়া) ও পণ্ডিত মশাই! কেষ্টা ডাকছে, কেষ্টা ডাকছে—
কেষ্টা।পণ্ডিতমশাই, এই জায়গাটা বুঝতে পাচ্ছি না।
পণ্ডিত।হ:, দেখি নিয়ে আয়, কোন জায়গাটা। সব বলে দিতে হবে! তোদের আর কিচ্ছু হবে না! ‘ওয়ান্স্ আই মেট্ এ লেম্ ম্যান্ ইন্ এ স্ট্রীট নিয়ার মাই হাউস্’। ‘ওয়ান্স্ আই মেট্ এ লেম্, ম্যান্’–কিনা একদা এক বাঘের গলায় হাড় ফুটিয়াছিল। ইন এ স্ট্রীট’—সে বিস্তর চেষ্টা করিল। ‘নিয়ার মাই হাউস’—কিন্তু সে হাড় বাহির হইল না। এই সোজা ইয়েটা বুঝতে পাল্লি না? (ঘটিরামের প্রতি) কি রে? পালাচ্ছিস যে!
ঘটিরাম।না, পালাচ্ছি না তো! কেষ্টা এমনি গোলমাল কচ্ছে, কিচ্ছু আঁক কষতে পাচ্ছি না।
পণ্ডিত।কি আঁক দেখি নিয়ে আয়।
ঘটিরাম।আজ্ঞে এই যে! এই—চার সের আলুর দাম যদি দশ আনা হয় তবে আধ মণ পটলের দাম কত?
পণ্ডিত।দেখি, চার সের আলু দশ আনা তো! তবে আধ মণ পটল—আহা, আবার পটল এল কোথেকে?
ঘটিরাম।তা তো জানি না। বোধ হয় পটলডাঙা থেকে!
পণ্ডিত।দূৎ! একি একটা আঁক হতে পারে? গাধা কোথাকার!
ঘটিরাম।—তাই বলুন! আমি কত যোগ করলাম, ভাগ করলাম, শেষটায় জি-সি-এম্ পর্যন্ত করলাম, কিছুতেই হচ্ছিল না। বড্ড শক্ত, না?
পণ্ডিত।মেলা বকিস নে, যাঃ!
ঘটিরাম।যাবো? ছুটি?
কেষ্টা।ছুটি—ছুটি—ছুটি—
পণ্ডিত।না, না, ছুটি-টুটি হবে না।
ঘটিরাম।হ্যাঁ ভাই, তুই সাক্ষী আছিস, বলেছেন যা!
কেষ্টা।হ্যাঁরে, আমাদের কিন্তু কোন দোষ নেই।
পণ্ডিত।দেখলে কাণ্ডটা! এই-সব হুজুকেই তো ছেলেগুলোকে মাটি করলে! আর জমিদারমশাইয়ের আক্কেলটা দেখ—এখানে এসে অবধি দশভূতে তাকে পেয়ে বসেছে—দেখ দেখি, টাকা ওড়াবার জন্য শেষটায় কিনা গানের মজলিস ছ্যা ছ্যা!
দুলিরামকি বললে? বক্কেশ্বর? তা বেশ বকদাদা, আজ তোমার গান শোনা যাবে!
কেবলতা বেশ, কি বলেন—গানটা আরম্ভ করলে হয় না?
খেঁটুরামনা, না! এখনই কি দরকার? সবাই আসুক আগে—
কেবলএই সুর-টুরগুলো একটু গুছিয়ে নিতে হবে।
দুলিরাম।আরে মশাই! আমাদের কাছে ‘গা’-ও যা, ‘ধা’-ও তাই—সবই সমান।
কেবল।হ্যাঁ—গানগুলোর কি মুশকিল জানেন? গুগুলো আমার স্বরচিত কিনা—তাই, গাইতে একটু সংকোচ বোধ কচ্ছি।
খেঁটুরাম।তা নাই-বা গাইলে—অন্য কিছু গাও না—
কেবল।আ মোলো যা! এরা আমায় গাইতে দেবে না দেখছি, আমার ভালো-ভালো গানগুলো—
কেষ্টা ও ঘটিরামের প্রবেশ
ঘটিরাম।আমরা গান শুনতে এলুম।
কেষ্টা।কই রে, লোকজন সব কই? গাইবে কে? আপনি বুঝি?
কেবল।হ্যাঁ হ্যাঁ, তা এঁরা যখন নেহাত পেড়াপীড়ি কচ্ছেন তখন না গাইলে সেটা ভয়ঙ্কর খারাপ দেখাবে।
কেবলচাঁদ গুন গুন করিতে-করিতে সহসা সপ্তমে চিৎকার
খেঁটুরাম।রক্ষে কর দাদা, এ অত্যাচার কেন?
দুলিরাম।মশাই, এটা ‘ডেফ্ অ্যাণ্ড ডাম্ব্’ ইস্কুল নয়—আমাদের কানগুলো বেশ তাজা আছে।
কেবল।আজ্ঞে, সুরটা ঠিক আন্দাজ পাইনি—একটু চড়ে গিয়েছিল—না?
দুলিরাম।একটু বলে একটু?
খেঁটুরাম।রীতিমত তেড়ে এসেছিল।
কেবল।আচ্ছা, একটু নামিয়ে ধরি—
কেবলচাঁদের গান
আহা, পড়িয়া কালের ফেরে মোরা কি হনু রে? কোথায় ভীষ্ম কোথা দ্রোণ কোথা কর্ণ ভীমার্জুন
কোথায় গেলেন যাজ্ঞবল্ক্য কোথায়-বা সে মনু রে? মাটির সঙ্গে মিশছে সবি কেঁচোর মতো খাচ্ছে খাবি।
কেবল আপিস খাটি কচ্ছে মাটি নধরপুষ্ট তনু রে— ব্রাহ্মণের সে তেজ নাই হ্যাঁ হ্যাঁ ব্রাহ্মণের সে—
কেবলচাঁদের মাথা চুলকানো
দুলিরাম।শিঙ নাই আর লেজ নাই—
কেবল।হ্যাঁ হ্যাঁ—
কেবলচাঁদের গান
ব্রাহ্মণের সে তেজ নাই খাদ্যাখাদ্য ভেদ নাই
মনের দুঃখ কারে বলি মোরা কি হনু রে—
আহা পড়িয়া কালের ফেরে মোরা কি হনু রে।
খেঁটুরাম। দাঁড়ান একটু সামলে নি—অতো করুণ রস করবেন না।
খেঁটু ও দুলি ক্রন্দনোম্মুখ। কেষ্টা ও ঘটিরামের উচ্চহাস্য
খেঁটুরাম।তবে রে ছোকরা! তোরা হাসছিস কেন?
ঘটিরাম।বাঃ! হাসি পেলে হাসব না?
দুলিরাম।হাসি পাবে কেন? এখানে হাসবার কি হল?
খেঁটুরাম।ছ্যাবলামি পেয়েছিস? কথা নেই বার্তা নেই—হ্যাঃ-হ্যাঃ!
ঘটিরাম।কি রে কেষ্টা, হাসি পেলে হাসব না?
কেষ্টা।এই রে, পণ্ডিতমশাই আসছে—
ঘটিরাম ও কেষ্টা।এই রেঃ, এই রেঃ, এই রেঃ, পণ্ডিতমশাই আসছে—মাটিং চকার—তোর র্যাপারটা দে তো।
ঘটিরাম ও কেষ্টার র্যাপার মুড়ি হইয়া উপবেশন।
পণ্ডিতের প্রবেশ
পণ্ডিত।ভালো, ভালো! তোমরা মধ্যেমধ্যে বিশ্রাম নিতে পার না? নিত্যিনিত্যি জমিদারমশাইকে বিরক্ত করাটা কি ভালো দেখায়?—ইকী! ক্যাবলাটা এখানে এয়েছে কি করতে? (দুলিরাম ও খেঁটুরামের প্রতি) আমোলা যা! তোমাদের যত রাজ্যের ইয়ার-বকশী সব বুঝি জোটাচ্ছ একে-একে?
কেবল।দেখলেন মশায়? আমাকে অপমান কললে। আমায় ইয়ার-বকশী বললে, অমন কললে কিন্তু আমি গাইব না।
পণ্ডিত।তা নাই-বা গাইলে—কে তোমাকে মাথার দিব্যি দিচ্ছে? যা না গান! গানের ধমকে আমাদের পযন্ত পিলে চমকে ওঠে—তা, অন্যে পরে কা কথা!
ছাতা ও বিশাল পুঁটলি লইয়া রামকানাইয়ের প্রবেশ
রামকানাই।(ঘটিরাম ও কেষ্টার প্রতি) আপনাদের কি হয়েছে? অমন করে বসে আছেন যে? কাশি? জ্বর? ন্যাড়া মাথা? ঠাণ্ডা লাগবে বলে?
পণ্ডিত।(ঘটিরাম ও কেষ্টার প্রতি) কি হে, এখানে এসে হাজির হয়েছ? আচ্ছা বেরিয়ে নাও তারপর—
রামকানাই কর্তৃক পণ্ডিতস্কন্ধে পুঁটলি স্থাপন
তুমি কি রকম মানুষ হে?
রামকানাই।কেন? বেশ দিব্যি মানুষটি।
পণ্ডিত।বলি চোখ দিয়ে দেখতে পাও না কি?
রামকানাই।চোখ দিয়ে দেখতে পাই না তো কি কান দিয়ে দেখতে পাই?
পণ্ডিত।না হে, তুমি বড় বাচাল—শাস্ত্রে বলেছে—
রামকানাই।না—শাস্ত্রে আমার সম্বন্ধে কিছু বলে নি—
পণ্ডিত।আহা, বলি, তোমায় তো কেউ এখেনে ডাকে নি?
রামকানাই।ডাকবে আবার কি? এ কি নিলেমের মাল পেয়েছ যে ডাকাডাকি করবে?
পণ্ডিত।হ্যাঁ, তবে অমন করে বসে থাকলে তো ভালো দেখায় না।
রামকানাই।ভালো দেখায় না কি হে? তোমাকে যে অশথগাছের মামদো ভূতের মতো দেখা যায়, সে বেলা কি?
পণ্ডিত।আহা, বলি, যদি কিছু বলবার
থাকে, তা ঝটপট বলে বাড়ি যাও-না কেন?
রামকানাই।হ্যাঁ, তাহলে তুমিও আমার পুঁটলিটা সরাবার সুবিধা পাও।
পণ্ডিত।কি আপদ! বলি পুঁটলিটা রেখে যেতে বললে কে? নিয়েই যাও-না কেন?
রামকানাই।মুটের পয়সা দেবে কে?
পণ্ডিত।হাঃ—মুটের পয়সা দেবে কে? মুটের পয়সা দেবে!
রামকানাই।উঃ! দূৎ! তোমার ময়লা চাদরটা আমার নাকের কাছে নেড়ো না।
দুলিরাম।তা হবে না? এঁরই গান শুনে আমাদের নবাবসাহেব মুর্ছা গেছিলেন, এঁরই গান শুনবার জন্য কিষাণবাবু তেতাল্লিশ মাইল পথ হেঁটে গেছিলেন—
খেঁটুরাম।একে সভায় রাখতে কত রাজা বাদশা হদ্দ হল।
দুলিরাম।কত টাকাকড়ির শ্রাদ্ধ হল।
খেঁটুরাম।কত ওস্তাদ গাইয়ে জব্দ হল।
পণ্ডিত।ওহে, বেশি বাড়িয়ে কাজ কি? আমাদের ন্যায়শাস্ত্রে বলেছে—অলমতিবিস্তারেন—বেশি বাড়াতে নেই।
খেঁটুরাম।আমি অনেক হাঙ্গামা করে তবে ওঁকে এনেছি।
দুলিরাম।তুই এনেছিস? দেখলেন মশাইরা, কাজ করব আমি, আর বাহাদুরি নেবেন উনি!
খেঁটুরাম।খবরদার!
দুলিরাম।চোপরও!
খেঁটুরাম।ফের!
পণ্ডিত।সমাশ্বসীহি, সমাশ্বসীহি, জমিদারমশায়ের সামনে এমন গর্হিত আচরণ করতে নেই! আহা! সঙ্গীতশাস্ত্র-রসানভিজ্ঞ, সঙ্গীত আর ন্যায়শাস্ত্র বুঝলেন কিনা—অতি উপাদেয় জিনিস! আমাদের ন্যায়-শাস্ত্রে বলেছে—অদ্ভুত-তদ্ভাবে চ্বী সে এক অত্যদ্ভুদ্, ব্যাপার—
জমিদার।তাহলে গান আরম্ভ হোক। ওস্তাদজি আপনি মাঝে-মাঝে আমাদের গান-টান শোনাবেন—
কেবল।হ্যাঁ, তা, শোনাব বৈকি অবিশ্যি এর দরুন আমার সব কাজকর্মের বড্ড ভয়ঙ্কর ক্ষেতি হবে, কিন্তু তা হোক—
পণ্ডিত।আরে ছো, ছো! তুমি তো ভারি ছোটলোক হে। এই সামান্য কাজটুকু করতেও তোমাদের যত রাজ্যের আপত্তি! আজ যদি জমিদারমশাই আদেশ করেন, এখেনে একটা টোল খুলতে হবে—আমার একশো কাজ থাক, হাজার কাজ থাক, আমি অমনি টোল খুলেতে লেগে যাব। কেন? না, এটা আমাদের কর্তব্য। আমাদের উচিত যে ওঁর খাতিরে কিছু ত্যাগ স্বীকার করি, হোকগে ক্ষেতি, তাতে কি? বিশ্বাস হচ্ছে না? রামা! যাও তো, এখনি একটা লোক পাঠিয়ে আমার জিনিসগুলো ধাঁ করে আনিয়ে দাও তো—চণ্ডী জমিদারমশায়ের সম্মান রাখতেই হবে।
জমিদার।কিন্তু এখেনে জায়গার যে বড় অসুবিধে—
পণ্ডিত।কিচ্ছু না, কিচ্ছু না—ওর মধ্যেই সুবিধা করে নেব। বুঝলেন চণ্ডীবাবু, আপনি আমার জন্যে চিন্তিত হবেন না। রামা!
রামকানাই।আবার কেন?
পণ্ডিত।ঐ বাইরের বড় ঘরটায় আমার বন্দোবস্ত করে দাও তো।
রামকানাই।সেখেনে দেখলুম দুটি বাবু বসে আছেন।
দুলিরাম।হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার গাঁয়ের লোক। আপনার বাগানটা দেখলাম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে—তাই ওদের বলে কয়ে এনেছি; ওরা এ বিষয়ে একেবারে এক্স্পার্ট। মাইনের জন্য ভাববেন না—পঞ্চাশ টাকা দিলেই হবে।
দুলিরাম।সিকী! আমার গাঁয়ের লোক! হবু গ্রামের অপমান!
পণ্ডিত।আরে না, না—রামা, দেখিস যেন বাবুদের ধমক-ধামক করিস নে—জমিদার মশায়ের যাতে অখ্যাতি না হয়—মিষ্টি করে বলবি। আর দেখ্ (গলা নামাইয়া) নেহাত যদি না শোনে ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে দিস।
খেঁটুরাম।শোন্—ঘর-টর দিয়ে কাজ নেই—জিনিসপত্রগুলো এনে উঠোনে ফেলে রাখিস—
পণ্ডিত।আর দেখ্—ঐ শব্দকল্পদ্রুমখানা আনতে ভুল হয় না যেন—আর কয়েকখানা মূল্যবান বই আছে—
দুলিরাম।যেমন কথামালা ধারাপাত—
পণ্ডিত।সেগুলো হারায় না যেন—
কেবল।হ্যাঁ—সেই গানের কথাটা চাপা পড়ে গেল—
রামকানাই।হ্যাঁ, হ্যাঁ, গানটা হয়ে যাক—তারপর যাব এখন।
কেবল।এখানে বাজিয়ে কেউ নেই?
রামকানাই। আমি বাজাতে পারি—দাও তো পাখওয়াজটা—ধত্তেরে কেটে তাগ ঘ্ড়ান্ ঘ্ড়ান্ নাগে নাগে নাগে নাগে—নাগে দেৎ ঘেঘে তেটে ঘেঘে তেটে ঘেঘে তেটে কই! গান আসছে না বুঝি?
পণ্ডিত। ইকী! চাকরটা এরকম করে কেন?
জমিদার। পুরোনো লোক কিনা! রামা তুই এখন চুপ কর—বাবুদের বাধা দিস নে।
রামকানাই। যে আজ্ঞে!
কেবলচাঁদের গান
তানানা তাইরে নারে—তারে না তাইরে
নারে—তারে না তাইরে নাইরে—না-তানা-
ন্না—
জমিদার। রামা, তুই একটু কাজে যা দেখি—তুই আমার নাম ডোবাবি দেখছি।
[ রামকানাইয়ের প্রস্থান
কেবলচাঁদের আবার গান আরম্ভ
কেবল।
হায় রে সোনার ভারত দুর্দশাগ্রস্ত হইল
অবসাদ হিমে ডুবিয়ে ডুবিয়ে ধুলোয় পতিত রইল
যে দেশের শ্রেষ্ঠতার এত সব ভূরি ভূরি প্রমাণ বর্তমান
আজকাল তাকেই কিনা—সব অবজ্ঞা করিতেছে— এবং দেখাচ্ছে সবাই মর্তমান
কোথা সেই তিরিশ কোটি আটানব্বই লক্ষ
সাড়ে চোদ্দ হাজার মাতৃভক্ত ভারত সন্তান
সহ্য হবে না হবে না তাদের হৃদয়ে
সবাই জাগো জাগো উঠে পড়ে লাগো দেশোদ্ধারে ব্রতী হও হে!
দুলিরাম।এই! সিডিশাস্!
পণ্ডিত।অ্যাঁ, কি বললে? রাজদ্রোহসূচক? অ্যাাঁ?
খেঁটুরাম।তবে রে! সিডিশাস্ গান কচ্ছিস কেন রে?
দুলিরাম।জানিস, আমার মামাতো ভাই গবর্মেণ্টের চাকরি করে।
পণ্ডিত।যা না গাইলেন! গলা শুনলে ছত্রিশ রাগিণী ছাটে পালায়।
দুলিরাম।ওর পেটের মধ্যে ডুবুরি নামালে, গানের ‘গ’টা মেলে কিনা সন্দেহ!
পণ্ডিত।তোমরা কোত্থেকে এ-সব আপদ জোটাও হে? জমিদারমশায়ের খ্যাতি প্রতিপত্তির দিকে কি তোমাদের একটু ও দৃষ্টি নেই?
খেঁটুরাম।এই দুলিরামটাই তো যত নষ্টের গোড়া, যত রাজ্যের অঘামারা রোথো লোক
ডেকে আনবে!
দুলিরাম।বিলক্ষণ। আমি ডেকে আনলাম? আমার সাতজন্মে ওর সঙ্গে আলাপ নেই।
খেঁটুরাম।এত করে বারণ কল্লুম, তবু ডেকে আনলে!
দুলিরাম।না, মশাই! ও নিজে ডেকে এনেছে আমি আদবে কিছু জানি নে!
পণ্ডিত।জানো না তো জানো না—তা অত গরম হবার দরকার কি? আমাদের ন্যায়শাস্ত্রে বলেছে—উষ্ণত্বমগ্ন্যাতপসং-প্রয়োগাৎ—
জমিদার।এবারে গরমটা কেমন টের পাচ্ছ বল দেখি—
খেঁটুরাম।আঃ! গরম বলে গরম! আগুন লাগে কোথা! উঃ!
দুলিরাম।আমাদের বেড়ালটা সর্দি-গর্মি হয়ে মারা গেছে—
জমিদার।এ-সব বোধ হয় সেই ধূমকেতুর জন্যে—
পণ্ডিত।হ্যাঁ, সিদিন আমাদের ওখেনে ধূমকেতুর ন্যাজ দেখা গিছিল—
দুলিরাম।কার ন্যাজ কে জানে?
খেঁটুরাম।ওঁরই ন্যাজ হয়তো।
জমিদার।ধমকেতুটা এসে কি কাণ্ডই কল্ল? ঝড়, বৃষ্টি, ভূমিকম্প—
খেঁটুরাম।প্লেগ, দুর্ভিক্ষ, বেরিবেরি—
দুলিরাম।পানের পোকা, এলাহাবাদ একজিবিশান!
পণ্ডিত।আমি শুনেছি ঐ পানের পোকার খবরটা নাকি সত্যি নয়!
খেঁটুরাম।আলবাৎ সত্যি! নন্দলাল ডাক্তার স্বচক্ষে দেখেছে লোকে পান খাচ্ছে আর মরছে!
জমিদার।ঈস্! বল কি হে? তাহলে তো কাথাটা সত্যি বলতে হবে।
পণ্ডিত।হ্যাঁ—দূরবীন দিয়ে সে পোকা দেখা গেছে—
খেঁটুরাম।কলকেতার সায়েব ডাক্তার বলেছে তার ভয়ঙ্কর তেজাল বিষ।
দুলিরাম।হ্যাঁ—আমি দেখিছি, সাদা মতন আবার ন্যাজ আছে। কার ন্যাজ কে জানে?
রামকানাইয়ের দ্রুত প্রবেশ
রামকানাই।এই রে সেই দাড়িওয়ালা! সেই দাড়িওয়ালা বাবুটা আমায় তেড়ে এসেছিল! উঃ!
সকলে।কি হয়েছে! কি হয়েছে?
রামকানাই।সেই বাইরের ঘরের বাবুরা—উঃ—আমায় বেদম মারপিট করেছে! একজন ছাগলদাড়ি বাবু আছে, সে আমায় দেখেই হঠাৎ ছাতের সমান লাফ দিয়ে তেড়ে এসেছিল—উঃ!
পণ্ডিত।সিকী রে! তুই করেছিলি কি?
রামকানাই।আমি তো কিচ্ছু করি নি—আমি বললাম, এখেনে ঢোল বসবে, বাবুরা যদি একটু, অন্যত্তর যান, নেহাত যদি না যান, আপনাদের ঘাড়ে ধাক্কা দেওয়া হবে।
দুলিরাম।কি! ভদ্রলোককে এমনি করে ইনসাল্ট্!
খেঁটুরাম।যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা! রামকানাই।আমি তো মিষ্টি করে বলেছিলুম—
খেঁটুরাম।ব্যাটা, তোমায় মিষ্টি জুতো না দিলে তুমি সিধে হবে না—
পণ্ডিত।আমার জিনিসপত্রগুলো কি কল্লি?
রামকানাই।ঐ যে, বাইরের উঠোনে ফেলে রেখেছি!
পণ্ডিত।দেখলেন মশাই, কাণ্ডটা দেখলেন?
রামকানাই।এই বাবুটি যে বললেন!
পণ্ডিত।যা, যা, যেখানে হয় শিগগির বন্দোবস্ত করে দে! আমাদের ন্যায়শাস্ত্রে এক জায়গায় এমনি লিখেছে—
রামকানাই।বলি ন্যায়শাস্ত্র শুনলে তো আর পেট ভরবে না! তোমরা কি এইখেনে বসেই রাত কাবার করবে নাকি? জমিদারমশায়ের কি আর খাওয়া-দাওয়া নেই?
জমিদার।ওরে রামা অমন করে বলতে নেই—বাবুদের মান্য করে কথা বলিস—আর পণ্ডিতমশাইকে কি চোখ রাঙায়?
রামাকানাই।যে আজ্ঞে, প্রাতঃ প্রণাম পণ্ডিতমশাই!
পণ্ডিত।রামা, নেতাইবাবুর বাড়ি আমার দুই পোড়ো থাকে, তাদের খবর দিস তো।
[ পণ্ডিত, খেঁটুরাম ও দুলিরামের প্রস্থান
জমিদার।রামা, দেখছিস তো কাণ্ডটা?
রামকানাই।আজ্ঞে হ্যাঁ—
জমিদার।উৎপাত যে বেড়ে চলল—কি করা যায়?
রামকানাই।আজ্ঞে, হুকুম পেলেই সব সাফ করে দি।
জমিদার।না, না, ওরা আপনা থেকে উঠে যায়, এমন কিছু, করা যায় না? অথচ আমার নিন্দেটা না হয়!
রামকানাই।তাহলে ওদের ঘরে লঙ্কার ধোঁয়া দিলে হয় না?
জমিদার।দূৎ! এটাকে কিছু জিগগেস করাই ঝকমারি! যা, তুই এক কাজ কর—আমার মামার বাড়ি যা। সেখেন থেকে কেদারমামাকে ডেকে আনবি—তাকে সব বলে কয়ে আনিস!
রামকানাই।যে আজ্ঞে—
জমিদার।মামা এলেই সব সিধে করে দেবে—উকিলে বুদ্ধি কিনা!
গান
নাছোড়বান্দা নড়েন না! উড়ে আসেন, জড়ে বসেন, মাথায় কেন চড়েন না!
নাছোড়বান্দা নড়েন না! যাবার নামটি করেন না, ধাক্কা দিলে সরেন না!
নাছোড়বান্দা নড়েন না!
কচ্ছে সবাই যা’চ্ছা তাই! চাকর ব্যাটা দিচ্ছে গালি, হাঁ করে সব খাচ্ছে তাই!
কচ্ছে সবাই যা’চ্ছা তাই আসছে যে-কেউ পাচ্ছে ঠাঁই, ইকিরকম হচ্ছে ভাই?
কচ্ছে সবাই যা’চ্ছা তাই!
তৃতীয় দৃশ্য
জমিদার বাড়ি
কেদারকৃষ্ণ, জমিদার ও রামকানাই
কেদার।ডোণ্ট্ পরওয়ার ভাগ্নে। আমি সব ঠিক করে দিচ্ছি। তুমি বড় জোর দুটো দিন গা ঢাকা দিয়ে থাক। রামা!
রামকানাই।আজ্ঞে-
কেদার।তুই মেলা বুদ্ধি খরচ করিস নে যা বলব তাই করে যাবি। আগে আমার বইগুলো আর খাতা পেনসিলটে বার করে রাখ।
[ রামকানাইয়ের প্রস্থান
ভাগ্নে, ভূমি নাকে সরষের তেল দিয়ে ঘুমোও গিয়ে, আমি সব সাবাড় করে দিচ্ছি—কিছু গোল-টোল বাধলে সব দোষ আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিও আমায় গাল দিয়ে একেবারে ভূত ছাড়িয়ে দিও।
[ উভয়ের প্রস্থান
পণ্ডিত ও দুলিরামের প্রবেশ
পণ্ডিত।হ্যাঁ দেখ, কাল জমিদারমশাই বড় আপসোস কচ্ছিলেন—বলছিলেন, এই খেঁটুরামের উৎপাতে তাঁর আর সোয়াস্তি নেই—ওকে যত শিগগির পার অর্ধচন্দ্র দিয়ে বিদায় করে দাও—আমাদের ন্যায়শাস্ত্রে বলেছে, প্রহারেণ ধনঞ্জয়ঃ—বুঝলে কি না?
দুলিরাম।হ্যাঁ, এ আর একটা মুশকিল কি? এক্ষুণি ঘাড় ধরে—
খেঁটুরামের প্রবেশ
দাঁড়ান আমার গাঁয়ের লোক দুটোকে ডেকে আনি।
[ দুলিরামের প্রস্থান
পণ্ডিত।হ্যাঁ দেখ, কাল জমিদারমশাই যা চটেছেন দুলিরামের ওপর—কী বলব! দেখ, শেষটায় ওর জন্যেই তোমাদের সক্কলের অন্ন মারা যাবে। ওকে যদি তাড়াতে পার, আঃ—জমিদার মশাই যা খুশি হবেন!
খেঁটুরাম।ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? সব কয়টাকে ভাগিয়ে দিচ্ছি, (স্বগত) তোমাকে সুদ্ধু।
পণ্ডিত।আর তোমার নিন্দেটা যা করে, কী বলব—এইমাত্র তোমার নামে যা নয় তা বলে গেল।
দুলিরামের প্রবেশ
রামা! ওরে রামারে! ঝট করে দুটো পান দিয়ে যা তো—রামাটা গেল কোথায়? ওহে, রামাকে একটু ডেকে দাও তো।
পণ্ডিত।তোমরা হয়তো-হয়তো করেই সব সারলে দেখছি! রামারে!
বামকানাইয়ের প্রবেশ
রামা, জমিদারমশাই নীচে নামলে একটু খবর দিস তো, আমার একটু নিরিবিলি কথা আছে।
খেঁটুরাম।আ মোলো যা! আমারও নিরিবিলি কথা আছে।
দুলিরাম।আমারও আছে—
রামকানাই।তোমরা বসে-বসে ভেরেণ্ডা ভাজো, তিনি আজ নীচে নামছেন না তাঁর মামা এসেছেন যে! তাঁকে কিন্তু তোমরা চটিও না, ভারি বদমেজাজ আর রগচটা—এই যে তিনি আসছেন—আসন, আসুন—ইনিই কেদারকেষ্টবাবু, জমিদারমশায়ের মামা!
সকলের অভিবাদন
পণ্ডিত। আসুন, আসুন—আমাদের ন্যায়—শাস্ত্রে বলেছে নরানাং মাতুলক্রমঃ। আপনার ভাগ্নেটি—আহা! অতি চমৎকার লোক। আমাদের ন্যায়শাস্ত্রে বলেছে—
দুলিরাম। নাঃ! আবার ন্যায়শাস্ত্র শুরু করল!
খেঁটুরাম। চল আমরা একটু ঘুরে আসিগে।
কেদার। এই লোক দুটোর চেহারা তো বড় সুবিধের নয়—
পণ্ডিত। তা সুবিধের হবে কোত্থেকে—হাজার হোক ছোটলোক। আমাদের ন্যায়শাস্ত্রে বলেছে—মিষ্টান্নমিতরে জনাঃ। আপনার ভাগ্নে তো কাউকে কিছ, বলেন না— তাই ওরা আস্কারা পেয়ে গেছে। এমনি বেয়াদবী করে—কি বলব!
কেদার। বটে! তা আপনারা প্রতিকার করেন না কেন?
পণ্ডিত। কি করি বলুন? আপনারা থাকতে আমার তো কিছু বলা উচিত হয় না।
কেদার। এক কাজ করনে, এর পর যদি কিছ বাড়াবাড়ি করে, ঘাড়টি ধরে বার করে দেবেন।
পণ্ডিত। হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই তো করা উচিত। আমাদের ন্যায়শাস্ত্রে বলেছে—যা শত্রু, পরে পরে।
কেদার। আহা আপনার সঙ্গে কথা কয়েও
সুখ আছে—কি পাণ্ডিতা! আবার কি মিষ্ট স্বভাব! আমার এই ক’টা লেখা আছে, এগুলো আপনাকে একটা শোনাই—এমন সমজদার লোক তো আর সচরাচর জোটে না!
কেদারকৃষ্ণের পাঠ
অমানিশার গভীর তমসাজাল ভেদ করিয়া ঐ পূর্ব দিকে তরুণ তপন ধীরে-ধীরে উকি মারছে। বিহঙ্গের কলকল্লোলে, শিশিরসিক্ত বায়ুর হিল্লোলে দিগদিগন্ত আমোদিত মুখরিত উচ্ছ্বসিত হইয়া, আহা, স্বভাবের সেই শোভা ভারি চমৎকার হয়েছে! হে নিদ্রিত
মানব সকল! ঐ শুনো বাছুরগগুলি ল্যাজ তুলিয়া হাম্বা-হাম্বা রবে ছুটিতেছে, তোমরা উত্তিষ্ঠত জাগ্রত। আহা, কবিরা তো সত্যই বলিয়াছেন, ‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল—’
পণ্ডিত। চমৎকার হয়েছে! আমার একটু কাজ আছে—এক্ষুনি যেতে হবে।
কেদার। একটু দাঁড়ান, এই জায়গাটা ভারি ইণ্টারেস্টিং :
কেদারকৃষ্ণের পুনরায় পাঠ
দিন নেই, রাত নেই, সকাল নেই, বিকাল নেই, রোদ নেই, বৃষ্টি নেই, শীত নেই, গ্রীষ্ম নেই—কেবল সেই এক কথা, সেই এক চিন্তা, সেই এক কল্পনা, এক জল্পনা, এক তন্ত্র, এক মন্ত্র।—কেমন?—সমুদ্রের ফেনিলাম্বরাশি নীলাম্বরাভিমুখে নৃত্য করিতে করিতে নিত্য-নবোৎসাহে—কেমন? ভাষার কেমন একটা সহজ ভঙ্গি আছে সেইটা লক্ষ্য করেছেন?—সমুদ্রের ফেনিলাম্বুরাশি নীলাম্বরাভিমুখে নৃত্য করিতে করিতে নিত্য নবোৎসাহে সেই একই সুর, সেই একই ছন্দ, সেই একই সঙ্গীতকে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত করিয়া তুলিতেছে—তাহার শেষ নাই, অন্ত নাই, বিরাম নাই, বিশ্রাম নাই, ক্ষান্তি নাই, বিচ্ছেদ নাই—
পণ্ডিত। দাঁড়ান, আমার বড় তাড়াতাড়ি—ধাঁ করে এক্ষুনি আসব।
খেঁটুরাম। কী! এত বড় কথা! এক্ষুনি আমি রাগ করে বাড়ি চলে যাব। তোকে অপমান করেছে—কক্ষনো এখেনে থাকিস না—আচ্ছা থাক, এবার মাপ করা গেল। আর একবার করলে টের পাইয়ে দেব। আমার গাঁয়ের লোক দুটোকে খবর দিচ্ছি।
[ খেঁটুরাম ও দুলিরামের গম্ভীর-
ভাবে প্রস্থান, রামকানাইয়েরও প্রস্থান
পণ্ডিত। দেখলেন তো! এর উপর তো আর ওষুধ চলে না!
কেদার। হ্যাঁ—তা আসেন একটু কাব্যালাপ করা যাক।
পণ্ডিত। এই মাটি করেছে—আচ্ছা—আজ রাত্রে বেশ করে শোনা যাবে।
কেদার। না, রাত্রে তো সুবিধে হবে না—আমার চোখ খারাপ কিনা! শুনুন—ছেলেবেলায়, তখন আমার বয়স খুব কম ছিল—সাত বছর কি আট বছর হবে, কি বড় জোর নয় কি দশ কি এগারো। সেই সময় আমি একখানা বই পড়েছিলাম—আঃ, সে একখানা বইয়ের মতো বই বটে! এখনো যখন তার কথা মাঝে-মাঝে স্মৃতিপথে উদিত হয়, মন যেন একেবারে উৎসাহে আপ্লূত হয়ে যায়। শুনুন—চমৎকার বই, বোধোদয়—শ্রীঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রণীতপণ্ডিত। ও আমি পাঁচশোবার পড়েছি।
কেদার। পড়েছেন? কেমন! স্বীকার করুন, ভালো বই না? শুনুন—
কেদার।আহা! এইটে শুনে নিন—আমি ছেলেবেলায় একটা পোয়েট্রি লিখেছিলাম—তখন বয়েস অল্প। কিন্তু সে হিসেবে লেখাটা কেমন দেখুন—
কেদারকৃষ্ণের কবিতা পাঠ
একদা সকালে আমি খাইতেছিলাম ভাত
হেন কালে ধেয়ে আসে প্রকাণ্ড এক ব্যাঘ্র
ভয় পেয়ে সকলে তো থরহরি কম্পমান
চিৎকারিল কেহ সুকরুণ আর্ত রবে অথবা যেমতি
লট্খটে গোরুর গাড়ি চলিবার কালে
প্রকাশে দারিদ্র্য নিজ বিচিত্র বিলাপে—
কেহ জপে রাম নাম—আমি হয়ে ক্রুদ্ধ
ডাকিলাম ভৃত্যকে ‘হরে, ধেয়ে যাও দ্রুত
রাস্তার দরজাটা করে দাও বন্ধ—
আর নিয়ে এস ঝট করে তিনতলা হতে
আমার সে দু-নলা বন্দুক’–এইরূপে
বাখানিল সবে মোর উপস্থিত বুদ্ধি
কহিল সকলে, ‘আজি মরিতাম নির্ঘাত
যদি না থাকিত ব্যাঘ্র পিঞ্জরের মধ্যে—’
কেদার।মেরেছে! বাঃ! এই তো চাই। দাঁড়া এইসা চাল চালব, একেবারে বাজি মাত্। তুই এক কাজ কর, সেই দাড়িটা আর লাল পাগড়িটা ঠিক করে রাখ। আর ঐ উঠোনটায় বসে বসে আর্তনাদ করতে থাক, যখন ‘কোন হ্যায় রে’ বলে ডাক দেব অমনি এসে হাজির হবি—একেবারে রামসিং দারোগা, বুঝলি তো? তুই খালি চেহারাটা দেখিয়ে যাবি-বোল-চাল সব আমি দেব। বাঃ
আপনা থেকে দিব্যি কাজ এগিয়ে গেল, তারপর ও দুটোকে সরাতে কতক্ষণ?
[ রামকানাইয়ের প্রস্থান
পণ্ডিত।রামার কি হয়েছে? বেশি কিছু হয় নি তো?
কেদার।না, না, বেশি কিছু, হয় নি। খান চার-পাঁচ পাঁজর ভেঙে গেছে আর ডিজেসচান অফ্ দি লান্গ্স—সাংঘাতিক! তা আপনি কিছু ব্যস্ত হবেন না। ও ব্যাটা আবার পুলিসে খবর না দেয়! সেবারে একটা এরকম কেস হয়েছিল—পুলিসে টের পেয়ে—পাঁচ বছরের মতো চালান করে দিয়েছিল।
পণ্ডিত।অ্যাঁ! অ্যাঁ! পাঁচ বছর!!
কেদার।আপনি ব্যস্ত হবেন না! উঃ—সেবারে একটা লোক মারামারি করেছিল তাকে দিয়েছিল ঘানি ঠেলতে। বলব কি মশাই, দেড় মাসে অর্ধেক রোগা!
পণ্ডিত।অ্যাঁ—অ্যাঁ একেবারে অর্ধেক! অ্যাঁ!
কেদার।তা আপনি বেশি ভাববেন না—ঐ পুলিস ব্যাটারা কোনরকমে টের না পেলেই হল—কিন্তু আজকাল যেরকম গোয়েন্দা টিকটিকির আমদানি হয়েছে—কোন কথা লুকোবার জো নেই—আপনি কবার হাই তুললেন, তুড়ি দিলেন—সব খাতায় লেখা! সেবার এক ব্যাটা বামুন মারামারি করে লুকিয়েছিল। লুকোলে হবে কি! পুলিসে টের পেয়ে ধরে এনে পচিশ দফা জুতো!
পণ্ডিত।অ্যাঁ! অ্যাঁ! বামুন? জুতো!!
কেদার।বাইরে কে? কোন্ হ্যায় রে? তা আপনি বেশি ব্যস্ত হবেন না! আমি থাকতে ভয় কি? কিরকম ভাবে মেরেছিলেন বলুন তো?
পণ্ডিত।খুব আস্তে পিঠের এইখেনে—
কেদার।পিঠে! এইখেনে! সর্বনাশ! ৭৯৪ ধারা! এর উপর তো আমার হাত নেই—তা আপনি বেশি চিন্তিত হবেন না। আমি
দারোগাবাবুকে বলে-কয়ে আপনার মেয়াদ কমিয়ে দেব।
খেঁটুরাম ও দুলিরামের শশব্যস্তে প্রবেশ
খেঁটুরাম। এক ব্যাটা পুলিস ইদিকে আসছে!
দুলিরাম। আমায় দেখে রুল উঁচিয়ে আসছিল। আপনার বাক্সের মধ্যে একটা সোনার চেন ছিল—আমি কিন্তু সেটা চুরি করি নি!
খেঁটুরাম। চুরি হবে কোত্থেকে—যেখানে যা থাকে আমরা সব যত্ন করে তুলে রাখি।
খেটুরাম ট্যাঁক দেখাইল। পুলিসের বেশে রামকানাইয়ের প্রবেশ
খেঁটুরাম। এইরে! এইরে!
দুলিরাম। এই যে সিদিন নিতাইবাবুর একটা ঘড়ি চুরি হয়েছিল আমি কিন্তু তার কিছুই জানি না!
খেঁটুরাম। আর, সেদিন যে চৌরাস্তার মোড়ে একটা লোক বেদম ঠেঙা খেয়েছিল—আমি কিন্তু তার গায়ে হাতও দিই নি।
দুলিরাম। আমার পুঁটলির মধ্যে সোনার চেন, নক্সা কাটা রূপোর ঘড়ি, দুটো আংটি এ-সব কিচ্ছু নেই।
পণ্ডিত। হাম্, পুজোর সময় তোম্কো বহুত মিষ্টান্ন আউর পুলিপিঠে খাওয়ায়গা।
কেদার। দারোগাবাবু আতা হ্যায়?
পুলিস। হাঁ বাবু—
কেদার। হাত কাড়া লেকার?
পুলিস। হাঁ বাবু—
কেদার। বাড়ি সারচ্ হোগা?
পুলিস। হাঁ বাবু—
কেদার। সব মাটি কললে—আচ্ছা, আমি ও ব্যাটাকে একটু ফাঁক তাল্লায় সরিয়ে নিচ্ছি, আপনি এই সুযোগে সরে পড়ুন আর এ-মুখো হবেন না—বছর দুই বাড়ি
থেকে বেরোবেন না! তোমরা পালিও না কিন্তু। (পুলিসের প্রতি) আচ্ছা চল—
[ কেদারকৃষ্ণ ও পুলিসের প্রস্থান
পণ্ডিত। আর থামাথামি নেই—এক্কেবারে সেই বদ্যি পাড়ায় মামার বাড়ি গিয়ে উঠব—ওরে ঘটে, ওরে কেষ্টা, দৌড়ে আয়—ও ঘর থেকে আমার বিছানাটা আর শব্দকল্পদ্রুমখানা নিয়ে আয় তো। শিগ্গির বাড়ি চল।
[ পণ্ডিতের প্রস্থান
দুলিরাম। আর কেন দাদা? পৈত্রিক প্রাণটি নিয়ে সরে পড়া যাক-না!
খেঁটুরাম। হ্যাঁ—পুলিসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় কাজ কি দাদা?
দুলিরাম। জমিদার ব্যাটার কাণ্ডটা দেখ আমাদের কি নাস্তানাবুদটাই কললে—চাকর দিয়ে ঘাড়ে ধাক্কা তার উপরে পুলিস!
খেঁটুরাম। আমরা বেচারারা যে দুটি করে খাচ্ছিলাম, সে আর তার সহ্য হল না।