রাম। কাল রাত্তিরে আমি একটা চমৎকার স্বপ্ন দেখেছি। দেখলাম কি, রাবণ ব্যাটা একটা লম্বা তালগাছে চড়ছে। চড়তে-চড়তে হঠাৎ পা পিছলে একেবারে—পপাত চ, মমার চ!
জাম্বুবান। তবে হয়তো রাবণ ব্যাটা সত্যিই-সত্যিই মরেছে—রাজস্বপ্ন মিথ্যা হয় না।
সকলে। হয় না, হবে না—হতে পারে না।
রাম। আমি হনুমানকে বললুম, যা, ব্যাটাকে সমুদ্রে ফেলে দিয়ে আয়। হনুমান এসে বললে কি, ফেলবারও দরকার হল না সে এক্কেবারে মরে গেছে।
সকলে। বাঃ বাঃ।—একদম মরে গেছে—ব্যাস। আর চাই কি, খুব ফুর্তি কর!
বাহিরে গোলমাল
ঐ দেখ রাবণের রথ দেখ। যাচ্ছে দেখেছিস? ঐটা রাবণ, ঐ যে লাঠি কাঁধে—
সকলে। সে কি! রাবণ ব্যাটা তবু মরে নি ব্যাটার জান তো খুব কড়া!
জাম্বুবান। এই হনুমান ব্যাটাই তো সব মাটি কললে—তখন রাবণকে সমুদ্রে ফেলে দিলেই গোল চুকে যেত—না, ব্যাটা আবার বিদ্যে জাহির করতে গিয়েছে—‘এক্কেবারে মরে গেছে’—
বিভীষণ। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে—
দূতের প্রবেশ
সকলে। কি হে, খবর কি?
দূত। আজ্ঞে, আমি এইমাত্র আসছি—
লক্ষ্মণ। ব্যস! মস্ত খবর দিয়েছ আর কি!
জাম্বুবান। এইমাত্র আসছ? তোপ ফেলতে হবে?
রাম। আজ কি ঘটল না ঘটল সব ভালো করে গুছিয়ে বল।
দূত। আজ্ঞে, আমি ছান-টান করেই পুঁইশাক চচ্চড়ি আর কুমড়ো ছেঁচকি দিয়ে চাট্টি ভাই খেয়েই অমনি বেরিয়েছি—অবিশ্যি আজকে পাঁজিতে কুষ্মাণ্ড ভক্ষণ নিষেধ লিখেছিল, কিন্তু কি হল জানেন আমার কুমড়োটা পচে যাচ্ছিল কিনা।
সকলে। বাজে বকিস নে কাজের কথা বল।
দূত। হ্যাঁ হ্যাঁ খেয়ে উঠেই ঘণ্টা দু’তিন জিরিয়ে সেখানে গিয়ে দেখি খুব ঢাক ঢোল বাজছে ধ্যা র্যা র্যা র্যা র্যা র্যা ধ্যা রা রা রা ধ্যারা
আজকে মন্ত্রী জাম্ববানের বুদ্ধি কেন
খুলছে না?
সঙ্কটকালে চটপট কেন মুক্তির কথা বলছে
না?
সর্ব কর্মে অষ্টরম্ভা হর্দম পড়ে নাক
ডাকছে—
উল্টে কিছু, বলতে গেলে বিটকেল বিটকেল
গাল পাড়ছে।
মরছে লক্ষ্মণ জানছে তব, দেখছে চেয়ে
নিশ্চিন্তে
এম্নি প্রভাব ছিল না তার থাকতাম যখন
কিষ্কিন্ধে!
হাঙ্গাম দেখে হটলে পরে নিন্দুক লোকে
বলবে কি?
ভেবেই দেখ এম্নি করলে রাজ্যের কার্য
চলবে কি?
মুখ্যু মোরা আক্কেল-শূন্য এক্কেবারেই
বুদ্ধি নেই—
সূক্ষ্মযুক্তি বলতে কারো ঠাকুদ্দাদার
সাধ্যি নেই।
বলছি মোরা কিচ্ছু নেইকো চটবার কথা
এর মধ্যে
উঠে একবার ব্যবস্থা দেও প্রণাম করি ঠ্যাং
পদ্মে॥
হনুমান।(স্বগত) হ্যাঁরে, আমার লেজে পাড়িয়ে দিলি?
রাম।বুঝলে হে জাম্ববান, তুমি কিনা হচ্ছ প্রবীণ লোক—এ সম্বন্ধে নিশ্চয়ই তোমার খুব অভিজ্ঞতা আছে—
জাম্বুবান।আজ্ঞে হ্যাঁ—সে কথা আগে বললেই হত—তা না ব্যাটারা খালি ধাক্কাই মারছে—‘মন্ত্রীমশাই, আরে ও মন্ত্রীমশাই’
—আমি বলি বুঝি ডাকাত পড়ল নাকি?
রাম।হ্যাঁ, এইবার একটা কিছু, ব্যবস্থা দিয়ে ফেল।
জাম্বুবান।(হনুমানের প্রতি) এই কাগজে যা প্রেশক্রিপশন লিখে দিচ্ছি, এই ওষুধগুলো চট করে নিয়ে আসতে হবে।
হনুমান।আচ্ছা, কাল ভোর না হতে উঠে নিয়ে আসব।
জাম্বুবান।না, না, এত দেরি করতে হবে না—এখুনি যা।
হনুমান।আবার এত রাত্তিরে কোথায় যাব? সাপে কাটবে না বাঘে ধরবে।
সগ্রীব।ব্যাটা, সখের প্রাণ গড়ের মাঠ।
জাম্বুবান।না, ওষুধগুলো এখনি দরকার।
হনমান।আঃ! হোমিওপ্যাথি লাগাও না।
জাম্বুবান।যা বলছি শোন্। এই যা গাছের কথা লিখলাম—বিশল্যকরণী মৃতসঞ্জীবনী—এই-সব গাছের শেকড় আনতে হবে।
হনুমান।আমি ডাক্তারখানা চিনি নে।
জাম্বুবান।আ মরণ আর কি! একি কলকাতার শহর পেয়েছিস নাকি যে বাথগেট কোম্পানি তোর জন্যে দোকান খুলে বসবে? কৈলাস পাহাড়ের কাছে গন্ধমাদন পাহাড় আছে জানিস তো?
আমার বচন শুন বিভীষণ
করহ গ্রহণ সেনাপতি পদ
(আহা) সাজ সজ্জা কর, দিব্য অস্ত্র ধর
সমরে সম্বর এ মহা বিপদ
(তুমি) বিপদে নির্ভীক বীর্যে অলৌকিক
তোমার অধিক কেবা আছে
আর
(আহা) জলেতে পাষাণ যায় গো ভাসান
মুশকিলে আসান প্রসাদে
তোমার—
সকলে।ঠিক কথা—উত্তম কথা।
বিভীষণ।তাই তো। মুশকিলে ফেললে দেখছি।
সুগ্রীব।
শুন সর্বজনে আজিকে এক্ষণে
বীর বিভীষণে কর সেনাপতি
(আহা) শ্রীরামের তরে সম্মুখ সমরে
যদি যায় মরে কিবা তাহে ক্ষতি?
সকলে।তা তো বটেই—কিচ্ছু ক্ষতি নেই।
জাম্বুবান।বেশ তো! তাহলে তাই ঠিক হল—খবরদার। দেখ, ভালো করে পাহারা দিও। কোন ব্যাটাকে পথ ছাড়বে না—স্বয়ং যম এলেও নয়। আর দেখো যেন ঘুমিও না।
তোমার তুল্য খাঁটি বন্ধু, আর কাহারে
পাই গো?
তুমি ভরসা নাহি দিলে অন্য কোথা যাই
গো!
এ সময়ে তোমা ভিন্ন কে আছে সহায়
গো—
কার্যোদ্ধার না হলে তো না দেখি উপায়
গো।
পথ ছেড়ে দাও মুক্ত কণ্ঠে তোমার গুণ
গাই গো
দয়াবান গুণবান ভাগ্যবান মশাই গো॥
বিভীষণ।ভাগ ব্যাটারা, নইলে একেবারে প্রহারেন ধনঞ্জয় করে দেব।
উভয় দূতর পলায়ন ও পুনঃপ্রবেশ
প্রথম দূত।হ্যাঁরে, পালাচ্ছিস কোথা? খালি হাতে গেলে যমরাজা কাউকে আস্ত রাখবেন না!
দ্বিতীয় দূত।তাই তো! তাই তো! এ তো ভারি মুশকিল হল—কি করা যায় বল্ দেখি?
প্রথম দূত।আয় না, আমরা ও ব্যাটার সঙ্গে লড়াই করি গিয়ে।
দূতদ্বয়ের গান
দ্বিতীয় দূত।যখন পরাজয় খলু অনিবার্য
তখন যুদ্ধ কি বুদ্ধির
কার্য?
প্রথম দত্ত।তবে তো মুশকিল উপায়
কি হবে?
সাধ করে কেবল প্রাণটা
হারাবে?
দ্বিতীয় দূত।আমিও তাই বলি লড়ায়ে
কাজ নাই—
কাজেতে ইস্তফা এখনি দাও
ভাই!
প্রথম ও দ্বিতীয় দূত।হায় কি ঘটিল হায়
কি ঘটিল
এমন সাধের চাকুরি ঘুচিল!
বিভীষণ।ব্যাটারা রাত দুপুরে গান জুড়েছিস—চাবকিয়ে রোগা করে দেব।
দূতদ্বয় প্রস্থানোদ্যত ও দ্বারদেশে যমসহ সাক্ষাৎ
প্রথম ও দ্বিতীয় দূত। দোহাই মহারাজ, দোহাই যমরাজা, আমাদের কিছু দোষ নেই—ঐ এক ব্যাটা আমাদের পথ ছাড়ছে না
[ যমের প্রবেশ
বিভীষণ। এই মাটি করেছে—এখন উপায়? আটকাতে গেলে যম মারবে, না আটকালে রাম মারবে। উভয় সঙ্কট! যা থাকে কপালে, ব্যাটাকে পথ ছাড়ব না। (সদর্পে) তবে রে ব্যাটা—আমায় চিনিস নে? আমি থাকতে তুই ঢুকবি?
যমের অগ্রসর হওয়া
দ্বিতীয় দূত। ওরে এবার লড়াই বাধবে—
প্রথম দূত। হ্যাঁরে ভারি মজা দেখা যাবে—
দ্বিতীয় দূত। (বিভীষণের প্রতি) পালা, পালা—এই বেলা পালা—
প্রথম দূত। হ্যাঁ, ঐ যে অস্তর দেখছ ওর একটি ঘা খেলেই সদ্য কেষ্ট প্রাপ্তি হবে।
বিভীষণ। তুই কে রে ব্যাটা মরতে এসেছিস?
যমের আবৃত্তি
কালরূপী মৃত্যু আমি যম নাম ধরি—
সর্বগ্রাসী সর্বভুক সকল সংহারি॥
সর্বকালে সমভাব সকলের প্রতি,
ত্রিভুবনে সর্বস্থানে অব্যাহত গতি॥
অন্তিমেতে দেখা দেই কৃতান্তের বেশে—
মোর সাথে পরিচয় জীবনের শেষে॥
সংসারের মহাযাত্রা ফুরায় যেমন—
শ্রান্তজনে শান্তি দেই আমিই শমন॥
পাহাড় লইয়া হনুমানের প্রবেশ
হনুমান।জয় রামের জয়!
যমের মাথায় হনুমানের পাহাড় স্থাপন। যমের পতন
প্রথম দূত।ও কি রে!
দ্বিতীয় দূত।ঐ যা! চাপা পড়ে গেল!
প্রথম দূত।তাই তো রে, চাপা পড়ল যে!
দ্বিতীয় দূত।(সকাতরে) হ্যাঁরে আমার মাইনে কে দেবে?
প্রথম দূত।তাই তো। আমারও যে পাওনা আছে।
প্রথম ও দ্বিতীয় দূত।ওগো, আমাদের কি হলো গো—ওগো, আমরা যে ধনে-প্রাণে মলুম গো—(হনুমানের প্রতি) পালোয়ান মশাই গো—সর্বনাশ কললেন গো—হায়, আমাদের কি হল গো—
দূতদ্বয়ের গান
প্রথম দূত।ওরে যম ব্যাটা যে দিল
ফাঁকি
দ্বিতীয় দূত।মোদের তেরো আনা মাইনে
বাকি
প্রথম দূত।আহা দেখ না ব্যাটা হল
নাকি?
দ্বিতীয় দূত।ওর চুল ধরে দে না ঝাঁকি।
প্রথম দূত।এই বিপদকালে কারে ডাকি
হায় হায় যম ব্যাটা যে দিল
ফাঁকি।—অ্যাঁক্
হনুমান কর্তৃক দূতদ্বয়ের গলা পাকড়ানো
হনুমান। ভাগ! ভাগ!—ব্যাটারা গান ধরেছে যেন কুকুরের লড়াই বেধেছে।
[ দূতদ্বয়ের প্রস্থান
বিভীষণ। এবার সকলকে ডেকে নিয়ে আয়
[ হনুমানের প্রস্থান
লক্ষ্মণকে ধরাধরি করিয়া হনুমানের সহিত সকলের প্রবেশ
সকলে। ওটা কিরে? ওটা কিরে?
হনুমান। আজ্ঞে, উপরেরটা গন্ধমাদন পাহাড়।
জাম্বুবান। ব্যাটা গোমুখ্যু কোথাকার, পাহাড়সুদ্ধ নিয়ে এসেছিস?
হনুমান। আজ্ঞে, গাছ চিনি নে। আর ঐ নীচেরটা—যমরাজা।
সকলে। আরে, আরে করেছিস কিরে ব্যাটা? করেছিস কি?
জাম্বুবান। থাক, ওমনি থাক। আগে লক্ষ্মণের একটা কিছু, গতিক করে নিই, তারপর দেখা যাবে—
ঔষধাম্বেষণ-ঔষধ প্রয়োগে লক্ষ্মণের চেতনা লাভ
সকলে। বা, বা! কেয়াবাৎ! কেয়াবাৎ! কি সাফাই ওষুধ রে!
হনুমান। হাজার হোক—স্বদেশী ওষুধ তো!
সকলে। তাই বল। স্বদেশী না হলে কি এমন হয়।
জাম্বুবান। হ্যাঁ, এইবার যমকে ছেড়ে দাও।
পাহাড় সরাইয়া হন মানের যমকে মুক্তিদান
যম। (চোখ রগড়াইয়া লক্ষ্মণের প্রতি) সেকি! আপনি তবে বেঁচে আছেন?
লক্ষ্মণ। তা না তো কি? তুমি জ্যান্ত মানুষে নিয়ে কারবার আরম্ভ করলে কবে থেকে?
যম। আজ্ঞে, চিত্রগুপ্ত ব্যাটা আমায় ভুল বুঝিয়ে দিয়েছিল। আমি এখনি গিয়ে ব্যাটার চাকরি ঘুচোচ্ছি—