সুরকার রবীন্দ্রনাথ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

 সুরকার (composer) হিসেবে রবীন্দ্রনাথের মহত্ত্ব আমরা ক্রমশই উপলব্ধি করতে শিখছি এবং যত দিন যাবে ততই আরো বেশী উপলব্ধি করতে পারবো। কিছুদিন আগেও ওস্তাদ মহলে রবীন্দ্র-সংগীত সম্বন্ধে ঈষৎ অবজ্ঞার ভাব ছিল। কিন্তু আজকাল ওস্তাদরাও মুখে অন্তত রবীন্দ্র-সংগীতের বৈশিষ্ট্য মানেন। রবীন্দ্রনাথের প্রথম পর্য্যায়ের গানগুলি হয় কোনো-না-কোনো বিখ্যাত হিন্দি গানের অনুকরণে, নয় প্রচলিত রাগ রাগিনীর অনুসরণে রচিত ; এই পর্য্যায়ের গানগুলো সম্বন্ধে আমি কিছু বলবো না কারণ তখন পর্য্যন্ত তাঁর সুরের বৈশিষ্ট্য কিছু ফোটেনি। কিন্তু প্রচলিত সুরের গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ না থেকে তিনি ক্রমে ক্রমে নতুন ও নিজস্ব সুর সৃষ্টি করতে লাগলেন, সেই সময় থেকে আজ পর্য্যন্ত তাঁর সুরের একটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। এই বৈশিষ্ট্য কি ? তিনি আমাদের রাগ-রাগিনীর বাঁধা পথ ছেড়ে নিজস্ব সৌন্দর্য্যানুভূতি থেকে নতুন নতুন মিশ্রণ ও ঢঙের প্রবর্ত্তন করেছেন। যে সময়ে তিনি এসব করতে আরম্ভ করেন সে সময়ে খাঁটি সাঙ্গীতিক মহলে এর সম্বন্ধে অবহেলা এবং বিরোধিতার ভাব ছিল, তার কারণ আমাদের প্রচলিত সুরের সঙ্গে এর যথেষ্ট ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছিল। তখন আমাদের অনভ্যস্থ কানে সে সব সুর ভালো লাগেনি। আজ কুড়ি পঁচিশ বছর পরে সে সব গান লোকের মুখে মুখে ফিরছে, এতে বোঝা যায় যে ভালো জিনিষ কখনো চাপা থাকে না, তার যোগ্য সমাদর শুধু সময়সাপেক্ষ। বাংলা দেশের বাউল ও উত্তর ভারতের ভজন গানের যে বিশেষত্ব রবীন্দ্রনাথের বিশেষত্বও সেই স্তরের। বাউল ভজন রচনা করেছেন যে সব সাধুসন্তরা তাঁরা ভাবাবেগে প্রচলিত সুর থেকে বিচ্যুত হলেও তাঁদের স্বাভাবিক সৌন্দর্য্যবোধের ফলে সেই বিচ্যুতিগুলোও শুধু যে মধুর হয়েছে তা নয়, জনসাধারণ সেগুলো সাগ্রহে মেনে নিয়েছে এবং সেগুলো স্থায়ীও হয়েছে। দাদুর একটি কথা আছে –

অনুভব জঁহাহৈ উপজৈ শবদকিয়া নিবাস।

 সঙ্গীতের উৎস অন্তরের অন্তঃস্থল, রবীন্দ্রনাথ অন্তরধনে এতই ধনী যে নিত্য নতুন সুরের উৎস তিনি তাঁর নিজের মনেই পেয়েছেন।

 বিখ্যাত ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ কতগুলো নতুন রাগ রচনা করেছেন। তার মধ্যে হেমন্তরাগ খুব প্রসিদ্ধ। এই রাগের জাতি ওড়ব-সম্পূর্ণ, আরোহাবরোহস্বরূপ স গ ম ধ ন র্স, র্স ন ধ প ম গ র স ; রাগ পরিচয়াত্মক স্বরবিন্যাস স গ র স, ম ধ ন র্স ন ধ প ম, গ প ম, গ র স। এটি অতি শান্তরসাত্মক রাগ। আমাদের দেশে প্রচলিত পুরোনো ধ্রুপদাঙ্গের সোহিনী রাগের সহিত রিখাব ও পঞ্চম (অবরোহণে) যোগ ক’রে এই রাগের সৃষ্টি করেছেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। এবং এই রিখাব ও পঞ্চমের ব্যবহার অতি স্বাভাবিক ও সুন্দর হয়েছে, এজন্যে এই নতুন রাগের সৃষ্টি সার্থক। যাঁরা রবীন্দ্রনাথের ‘আধেক ঘুমে নয়ন চুমে’ গানটি শুনেছেন তাঁরা সুরটি বিশ্লেষণ করলে দেখবেন এতে সেই হেমন্ত রাগই রবীন্দ্রনাথের অতুলনীয় নিজস্ব ভঙ্গীতে প্রকাশ পেয়েছে। ওস্তাদ আলাউদ্দিন রাগ, রাগিনী, মেল, জাতি, আরোহ, অবরোহ, বাদী, সম্বাদী বিচার করে যা সৃষ্টি করেছেন রবীন্দ্রনাথ শুধু সহজ সৌন্দর্য্যানুভূতি থেকে তাই সৃষ্টি করেছেন। ইওরোপীয় সংগীতে D Major Keyতে দু’টি sharp ব্যবহার হয়। আমাদের ভারতীয় সংগীতে কল্যাণ ঠাটে একটি কড়ি (sharp) ব্যবহার হয়। একাধিক কড়ির ব্যবহার নেই। রবীন্দ্রনাথের ‘আমার একটি কথা’ এই গানটিতে তিনি পাশাপাশি দুই রিখাব লাগিয়েছেন। এই দুই রিখাবের কোমল রিখাবটি আর কিছু নয়, D Major Key-র C sharp (কড়ি স)। ইওরোপীয় সংগীতপদ্ধতির এই প্রয়োগ এখানে খুবই নিপুণ। রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত বাউল ঢংয়ের সুর ‘কবে তুমি আসবে ব’লে’ এবং বিখ্যাত ভাটিয়ালি সুরের গান ‘গ্রাম-ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ’ এই দুটি গানেই আ-আ-আ ব’লে যে টান আছে তাতে স্বরোচ্চারণ সম্পূর্ণ ইওরোপীয় পদ্ধতি অনুযায়ী। অনেকে বলতে পারেন বাউল ভাটিয়ালির সঙ্গে ইওরোপীয় ঢংয়ের সংমিশ্রণ হাস্যকর, কিন্তু গান দু’টি মন দিয়ে শুনলে বোঝা যাবে যে এক্ষেত্রে তা তো হয়ইনি, বরং এই মিশ্রণের ফল অতি সুন্দর হয়েছে। এতে বোঝা যায় যে বড় প্রতিভার নিপুণ হাতে বিভিন্ন আপাতবিরোধী জিনিষেরও মিশ্রণের ফলে নতুন সৌন্দর্য্য জন্ম নেয়।

 উপরের উদাহরণগুলো থেকে বোঝা যাবে যে রবীন্দ্রনাথ দেশী ও বিদেশী প্রভাব নিজের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ ক’রে সেগুলির সমন্বয় সাধন করেছেন, এবং তাঁর সুরের অভিনবত্বের এই হচ্ছে মূল কথা। ছেলেবেলা থেকে নিজের বাড়িতে তিনি দিশি বড় বড় ওস্তাদ সকলের গানই শুনেছেন, তারপর তাঁদের পরিবারের সংস্কৃতি এতই উন্নত ছিল যে ইওরোপীয় সংগীতেও তিনি বাল্যকাল থেকেই অভ্যস্থ, তাছাড়া বাউল ভাটিয়ালি ইত্যাদি বাংলার নিজস্ব সুরগুলির সঙ্গে খুব অন্তরঙ্গভাবে পরিচিত হবার সুযোগও তাঁর হয়েছে। এই ত্রিস্রোত গিয়ে মিশেছে রবীন্দ্রনাথের কবিচিত্তে, তাঁর মনের রসায়নে মিশে রূপান্তরিত হয়ে সৃষ্টি করেছে আজকাল যাকে আমরা রবীন্দ্রসংগীত বলি। রবীন্দ্রসংগীতে এই তিনধারার কোনো ধারাই স্পষ্ট হয়ে ফুটে নেই, অথচ প্রচ্ছন্নভাবে এই তিনটি ধারাই আছে। এদেরই সমন্বয়ের ফলে যে অভিনব সৃষ্টি হয়েছে সংগীতের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার এখানেই পরিচয়। বিভিন্ন উৎস থেকে প্রেরণা পেয়েছেন ব’লেই তাঁর সুরের বৈচিত্র্য এত বেশী। অবশ্য একটা কথা প্রায়ই শোনা যায় যে রবীন্দ্রনাথের গান একঘেয়ে। এর মত ভুল কথা আর নেই। সাধারণ লোকের এরকম ধারণা হবার কারণ রবীন্দ্রনাথের গানের অফুরন্ত সংখ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। যিনি প্রায় দু’হাজার গান লিখেছেন তাঁর কিছু-কিছু গান এক ঢংয়ের হতে বাধ্য ; গায়ক-গায়িকারা অনেক সময় পর-পর অনুরূপ ঢংয়ের গান করেন ব’লে শ্রোতাদের মনে এই রকম ভ্রান্ত ধারণা জন্মায় যে রবীন্দ্রনাথের গান একঘেয়ে। আসলে তাঁর গানে সুরের বৈচিত্র্য যত বেশী কোনো ভারতীয় সুরকারের রচনায় আজ পর্য্যন্ত ততটা দেখা যায়নি ; তাঁর বিভিন্ন গানগুলোর সুর বিশ্লেষণ ক’রে দেখলেই একথা স্পষ্ট হবে।

 একথা বলা যায় যে রবীন্দ্রনাথই প্রথম ভারতীয় composer। সদারঙ প্রভৃতি প্রাচীন সুরকারদের ইওরোপীয় আদর্শে ঠিক composer বলবার উপায় নেই, কারণ তাঁরা তাঁদের সৃষ্টিগুলোকে নির্দ্দিষ্টভাবে বেঁধে যেতে পারেন নি। এখন আমাদের হাতে যা প্রমাণ আছে তা থেকে তার যথার্থ মূল্য নির্দ্ধারণ করা অসম্ভব। তাঁদের রচিত সুরগুলি এত বিভিন্ন ও বিকৃতভাবে পাও যে তা থেকে তাদের মূল রূপ সম্বন্ধে কোনো ধারণাই করা যায় না, এবং এই বিকৃতির জন্য দায়ী আমাদের দেশের ‘গায়কী’ পদ্ধতি। রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই ‘গায়কী’ পদ্ধতির পরিবর্ত্তন করেন – আমাদের দেশে তিনিই প্রথম জোর দিয়ে বলেন যে সুরকারের সৃষ্টি নির্দ্দিষ্ট ও অপরিবর্ত্তনীয়, তার উপর একচুল অদল-বদল করবার অধিকার কোনো গায়কের নেই। সুরের এই নির্দ্দিষ্ট রূপের উপর জোর দেয়াটাই composer-এর প্রথম লক্ষণ। কবির রচিত কবিতা যেমন একটি সম্পূর্ণ ও অপরিবর্ত্তনীয় জিনিস, অতি বড় ভক্ত পাঠকেরও অধিকার নেই নিজের পছন্দমত কবিতার কথা বদ্‌লে নেবার, তেমনি গানের সুরও যে সুরকারের নির্দ্দিষ্ট একটি সৃষ্টি তাতে কোনো অদল-বদলই চলে না এ ধারণা আমাদের দেশে একেবারেই ছিল না, রবীন্দ্রনাথই প্রথম আমাদের মাথায় একথা ঢুকিয়েছেন। দশ পনেরো বছর আগে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত গান ‘আমার মাথা নত ক’রে দাও হে তোমার’ ইমনকল্যাণ থেকে ভৈরবীতে পরিবর্ত্তিত হয়ে রেকর্ডে প্রকাশিত হয় এবং ‘একদা তুমি প্রিয়ে’র ঝাঁপতাল থেকে দাদরায় পরিবর্ত্তন ঘটে – সেও রেকর্ডে। কিন্তু আজ রেকর্ড-কোম্পানীগুলো রবীন্দ্রনাথের নিজের অনুমোদন ব্যতীত তাঁর কোনো সুর প্রকাশ করতে সাহস পায় না ; সুরকারকে এতখানি স্বীকার করা রবীন্দ্রনাথের বিরাট ব্যক্তিত্বের ফলেই সম্ভব হয়েছে, এবং এ বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই যে ভবিষ্যতের সুরকারদের পথ তিনিই সুগম করেছেন।

 রবীন্দ্রনাথের গানের ভাষা যতটা সমাদৃত হয়েছে তাঁর সুর এখন পর্য্যন্ত ততটা হয়নি তার কারণ সাহিত্যের দিক থেকে বাংলাদেশ যতটা অগ্রণী সংগীতের দিকে এখনো ততটা নয়। তবে এ-কথাও সত্য যে গত পনেরো কুড়ি বছরের মধ্যে রবীন্দ্র-সংগীতের আদর আমাদের দেশে অনেকটা বেড়েছে তার কারণ সংগীত রসবোধ বাঙালীদের মধ্যে বাড়ছে। এমন আশা করা অন্যায় হয় না যে কবিতা হিসেবে রবীন্দ্রনাথের গান যতখানি সম্মান পেয়েছে, তাঁর সুরও একদিন ততখানি সম্মানই পাবে।