সুলোচনা কাব্য/চতুর্থ অঙ্ক

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


চতুর্থ অঙ্ক।

 বসন্ত, শ্বশ্রূজন সন্নিধানে বিদায়গ্রহণপূর্ব্বক, সস্ত্রীক সবান্ধবে তরণীতে আরোহণ করিয়া নাবিকদিগের প্রতি নৌকা চালাইতে আদেশ দিলেন। বৃহৎ বৃহৎ তিন খানি নৌকায়, শ্রেষ্ঠিনন্দন বাণিজ্য দ্রব্যজাত বোঝাই দিয়া, আপনি একখানি অতি মনোহর মধ্যমাকারের তরণীতে আরোহণ করিলেন, সুতরাং চারি খানি নৌকাতেই জগদ্দুর্লভের সম্‌পোষ্য হইল। বসন্তের সমভিব্যাহারী লোকজন ও দ্রব্যসামগ্রী বহন জন্য দশ খানি বৃহহাকারের নৌকার প্রয়োজন হইয়াছে, আর তাঁহাদের স্ত্রী পুরুষের বাসের জন্য, নরেন্দ্রের উৎকৃষ্ট যে জলযান (বজরা) ছিল তাহাই প্রদত্ত হইয়াছিল। সমুদয় নৌকার মাজি মাল্লাদিগের কলরবে দিক সকল পরিপূর্ণ হইয়া চলিল; আরোহীরা কেহবা গীত গাইতে গাইতে কেহবা তাস বা পাশা খেলিতে খেলিতে, কেহবা নিদ্রা যাইতে যাইতে গমন করিতে আরম্ভ করিলেন। এরূপ দুই দিনের পথ অতিক্রম করিয়া; তৃতীয় দিবসে দিবাবসান সময়ে, জগদ্দুর্লভ বসন্তকে চতুর্থ অঙ্ক । )8○ সম্বোধন করিয়া কহিলেন। সখী ! নবপ্রণয়িনীর প্রণয়পাশে এরূপ আবদ্ধ হইয়াছ যে, আর এক পাও নড়িবার শক্তি নাই; যাহা হউক ভাই তব তুল্য স্ত্রৈণপুরুষ জগতে অতি বিরল। যদি একান্তই অপর তরণীতে আসিতে না পার, তবে না হয় অনুমতি কর আমিই তোমার নৌকায় যাইয়া ক্রীড়া কৌতুক করিয়া সময় ক্ষেপণ করি ; ভাই একাকী আর নিষ্কৰ্ম্ম হইয়া থাকা যায় না। বসন্ত ভাল মন্দ কিছুই জানেননা, স্থলোচনাও অতি সরল তিনিও অতসত বুঝিতেন না ; বন্ধুর চাতুৰ্য্যজালে উভয়েই পতিত হইলেন। জগদুৰ্লভের মন ঠিক বিপরীত ; তিনি কেবল আত্মস্বাৰ্থদিকে সতত অনুরক্ত, বন্ধুর অনিষ্টচেষ্টায় সৰ্ব্বদা বিবৃত ; বিশেষতঃ এই অলোকসামান্য লাবণ্যবতী রাজকন্যা পরিভোগ কি রূপে সুসম্পন্ন হইবে তচ্চিন্তাতেই মন অস্থির। ফলতঃ তিনি সৰ্ব্বদাই মনে করিতেন, আমি যেরূপেই হউক এই অস্থলভ কন্যারত্নকে হস্তগত করিব, তাহা না পারিলে আমার জীবন ধারণ করা বিফল। কুটিলবুদ্ধিচাতুর্য্য দ্বারা স্বাভীষ্ট সাধন মানসে বন্ধুকে কেবল ঐ সকল কথা বলিলেন, নচেৎ তাহার মনে অকপট মিত্রতা কি সরলতা Y88 মুলোচনা কাৰ্য । স্থান প্রাপ্ত হইত না । বসন্ত, বন্ধুর বাক্যযন্ত্রণা সহ্য করিতে না পারিয়া অগত্যা স্বীয় বাসের তরণীতে আসিতে বলিলেন। তদনুসারে জগদুর্লভ বসন্তের সেই বজরাতে আগমনপূর্বক দূতক্রীড়া আরম্ভ করি . লেন। (এই দ্যুতক্রীড়ায় যুধিষ্ঠিরের সর্বস্বান্ত হয় )। সেই বজরায় চারিটি বিভাগ ছিল, তাহার দ্বিতীয় বিভাগে প্রথমতঃ খেলা আরম্ভ হয় ; পরিশেষে, বন্ধুর প্রবর্তনায় বাহিরে আসিয়া উপবিষ্ট হইলেন ও ক্রীড়া আরম্ভ করিলেন। ক্রীড়ায় এরূপ নিবিষ্টচিত্ত হইয়া পড়িলেন যে, র্তাহার আর অন্য কিছু মনে রহিল না ; বন্ধুকে অন্যমনস্ক । দেখিয়া সময় বুঝিয়া জগদ্দুর্লভ, বসন্তকে এমন জোরে একটি ধাক্কা মারিল যে, বসন্ত নৌকা হইতে অনূ্যন চারি পাঁচ হাত অন্তরে গিয়া জলে নিমগ্ন হইলেন। জগদ্দুর্লভ মনের দুরভিসন্ধি গোপন রাখিয়া, হায় কি হইল, বন্ধু হঠাৎ জলে নিপতিত হইলেন ; বিধাতা আমায় এতদিনে বন্ধু বিহীন করিয়া অসহায় অবস্থায় ফেলিলেন অতঃপর আমি কি করি ? স্থলোচনা, বন্ধু কর্তৃক প্রিয়বল্লভের যে এই দুর্দশ ঘটিল তাহার অনুমাত্র বুঝিতে না পারিয়া একবারে চতুর্থ অঙ্ক । y?& দশদিক্‌ শূন্য হেরিয়া প্রত্যুৎপন্নমতিত্ববলে, নৌকার গবাক্ষ উদঘাটনপূর্বক, বায়ুপূর্ণ একটি বৃহৎ বালিস্ । নীরে নিক্ষেপ করিলেন। ঘটনাক্রমে বায়ুবেগ বশতঃ ঐ বালিস্ট বসন্তের সম্মুখে উপস্থিত হইল। বসন্ত প্রাণবিনাশশঙ্কায় নৌকা অথবা কুল প্রাপ্তির আশয়ে সাধ্যানুসারে যত্ন ও চেষ্টা করিতে লাগিলেন কিন্তু কিছুতেই সফলপ্রযত্ব হইতে পারিলেন না। অবশেষে অনেক কষ্টে প্রিয়াদত্ত বালিস্ আশ্রয় করিয়া নদীর লহরীমালায় ভাসমান থাকিয় ওষ্ঠাগতপ্রাণ হইয়া অতিদ্রুত চলিত তরণাশ্রেণীর প্রতি নেত্রপাত করিতে লাগিলেন । জগদুর্লভ, বন্ধু যেন বিমনা হইয়া নৌকার কিনারায় বসিয়া খেলিতে খেলিতে তথা হইতে স্থলিত ও নিপাতিত হইয়াছেন এরূপ ভাণ করুিয়া, তাহাকে জল হইতে উত্তোলন করিবার নিমিত্ত বিস্তর পরিশ্রম করিলেন । কিন্তু বাস্তবিক সে চেষ্টা কোন কাৰ্য্যেরই নহে, তাহাতে বসন্ত নিরাপদ হওয়া দূরে থাকুক বরং আরও আপদগ্ৰস্ত হইয়া পড়িলেন।

  • দমের তাকিয়া বালিস্ । y8ჯა মুলোচন। কাব্য।

নিদাঘকালের অপরাহ্ল সময়ে প্রায় প্রতিদিনই মেঘ, ঝড়, বৃষ্টি, করকাপাত, বজ্রনিনাদ প্রভৃতি নানাপ্রকার দুর্যোগ ও গোলযোগ উপস্থিত হইয়া থাকে। দৈব বিড়ম্বনায় সে দিন সেই সময়েও আকাশমণ্ডল নিবিড়ঘনাবলী দ্বারা আচ্ছন্ন হইয়া প্রবল ঝঞ্জাবাৎ উত্থিত হইল, নৌকা সকল দিকৃভম হইয়া বিপথগামী হইতে লাগিল, নাবিকগণ শশব্যস্তে নিরাপদ স্থানান্বেষণে বিকলচিত্ত হইয়া যদৃচ্ছ গমনে কুলের নিকটে আপন আপন তরণী লইয়া চলিল ; কেহই আর সুস্থির থাকিতে পারিলেন না, সকলেই আত্ম রক্ষার্থে ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িলেন। নৌকা সকল উচ্ছ,স্থলভাবে সঙ্গভ্রষ্ট হইয়া নানাস্থানী হইয়া পড়িল বোধ হয় স্থলোচনা উৎপন্ন বুদ্ধির প্রভাবে ঐ বালিস্টি প্রক্ষেপ না করিলে, এই গোলযোগেই বসন্তের জীবন শেষ হইত। জগদুর্লভ বন্ধুকে বিপন্মুক্ত করণাভিলাষে জলে ঝম্প প্রদান করত পুনরায় রাজকন্যার বজরায় উত্থিত হইলেন, এই দুর্যোগ উপস্থিত হওয়াতে আর বস্ত্র পরিত্যাগ করিতে অবসর পাইলেন না, তাহাকে আদ্রবস্ত্রেই থাকিতে হইয়াছিল, কপট মিত্রের ব্যবহার সন্দর্শনে কুপিত হইয়া যেন চতুর্থ অঙ্ক । Y84 পবনদেব তৎক্ষণাৎ প্রতিফল দিতে উদ্যত হইয়া আর যেন, পতিব্ৰতা সতীর জীবন বিনাশশঙ্কায় প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। স্থলোচনা, সাতিশয় বুদ্ধিমতি, তিনি কাহাকেও কিছু না বলিয়া অন্যে প্রবেশ প্রতিরোধপূর্বক আপন তরণীতে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। র্তাহার চিত্ত ঝড়ের পূর্ব হইতেই আন্দোলিত ও আকুলিত হইতেছিল, এক্ষণে অনন্যমনে অনিমিষ নয়নে, যে দিকে বসন্তের দেহ বালিস্ আশ্রয় করিয়া ভাসমান ছিল, কেবল সেই দিকেই অলক্ষ দৃষ্টিতে দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন। রাজকন্যা অন্যকে কোন কথা না বলিয়া, মধ্যে মধ্যে মনকে সম্বোধন পূর্বক বলিতে লাগিলেন, মন! তুমি অত ব্যাকুল হইতেছ কেন, ক্ষান্ত হও ? পতিপরায়ণ নারীদিগের পতিবিয়োগ হওয়া নিতান্ত সহজ ব্যাপার নহে। প্রায় চারি ছয় দণ্ডকাল অবিশ্রান্ত ঝড় জল হইয়া আকাশমণ্ডল ও দিক্ সকল পরিষ্কার হইল। নাবিক সকল পরস্পর দূরবর্তী হইয়া পড়িয়াছিল, তাহারা উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করিয়া, পরস্পর নিকটবর্তী হইবার জন্য আহ্বান করিতে লাগিল ; এক এক খানি করিয়া তরণী Ꮌ8þ মুলোচনা কাব্য । সমুদয় একত্রীকৃত হইল; জগদ্দুর্লভ বজরার মাজি মাল্লাদিগকে বিশেষ সতর্ক করিয়া দিয়া স্বকীয় আবাস নৌকায় গমন করিলেন। সকলেরই মন স্বস্থির হইল, কেবল স্থলোচনা তাহার পরিচারিকাগণ সহ ব্যাকুলচিত্তে - কালক্ষেপ করিতে লাগিলেন । তটিনী যেন বিরহিণী স্থলোচনার দুঃখে দুঃখিত হইয়া আকুলভাবে কিয়ৎকাল হৃদয় আন্দোলিত করিয়া তরঙ্গ বিস্তার করিতে লাগিল । পক্ষিণীগণও যেন ব্যাকুলা হইয়া বীচিরবে স্ব স্ব নীড়াভিমুখে স্বনৃ স্বনু শব্দে গমন আরম্ভ করিল। নাবিকগণ, . কেহবা সঙ্গীত করিতে করিতে, কেহবা রসাভাষ করিতে করিতে, কেহবা দেবতাদিগের নামোচ্চারণ করিতে করিতে নৌকা চালাইতে আরম্ভ করিল। পথিকৃগণ দুৰ্যোগ অপগত হইল দেখিয়া, কেহবা আপন আবাসোদেশে, কেহবা নদীকুলের রাস্ত দিয়া পরস্পর আলাপ পরিচয় করিতে করিতে গমন করিতে লাগিল । বেলারও অবসান হইল, তমস্বিনী সময় বুঝিয়া স্বীয় কিরণজাল বিস্তার করিল। এই সময়ে সুস্পষ্ট দৃষ্টিসঞ্চার হওয়াতে স্থলোচনার আর সন্ধ্যাসমীরণসেবী নব্য বাবুদিগের মনঃক্লেশ উপস্থিত হইল। নব্য বাবুর আর প্রকৃতির চতুর্থ অঙ্ক । Y8:S শোভা সন্দর্শন করিতে না পাইয়া ক্ষুব্ধ হইলেন । স্থলোচনা এতক্ষণ অনিমিষনয়নে প্রিয়বল্লভপানে সতৃষ্টদৃষ্টিপাত করিতেছিলেন, অন্ধকার হওয়াতে তাহার ব্যাঘাৎ জন্মিল ; ইতিপূর্বে, সূৰ্য্যাস্ত সময়ে নীলনভস্তলে যেমন অভিনিবেশ দৃষ্টিসঞ্চারণ করিলে আভাসমাত্রে কখন কখন এক একটি নক্ষত্র টপ টপ করিতে দেখা যায় ; তদ্রুপ সেই নীলবর্ণ অম্বুরাশিতে অতি দূর হইতে বালিসাশ্রয়ী বসন্তকে এক একবার নয়নপথের পথিক করিতেছিলেন, অধুনা রজনী উপস্থিত হওয়ায় অন্ধকারে তাহ রহিত হইল। নৌকা ক্রমাগত চলিতে চলিতে রাত্রি প্রায় দশদণ্ড হইল দেখিয়া জগদলভ নদীতটে তরণী ংযোগপূর্বক নিশা যাপন করিতে আদেশ প্রদান করিলেন। স্থলোচনা, তথায় অবস্থান সময় হইতেই নয়নরঞ্জন হৃদয়রত্ন বসন্তকে দেখিতে পাইলেন না ; আর আর লোকজন এক এক করিয়া সকলেই নিদ্রাভিভূত হইল, বিষম চিন্তা ও অকুল দুঃখসমূদ্রে নিমগ্ন হইয়া অন্তঃকরণ এরূপ বিকল হইয়াছিল যে, কোনক্রমে তাহার নিদ্রাকর্ষণ হইল না ; তবে আলস্যের আবির্ভাব হওয়াতে মাঝে to o Y© o মুলোচনা কাব্য। মাঝে আবল্য উপস্থিত হইয়া নয়ন নিমীলিত করিতে লাগিল। যতবার তাহার নেত্রদ্বয় মুদিত হইয়াছিল, ততবারই যেন, কে একজন আসিয়া কর্ণকুহরে এই কথা বলিল, “প্রিয়ে ! তুমি একেবারে হতাশ হইওনা আমি । জীবিত আছি, পুনরায় আমার সহিত সাক্ষাৎ হইবে” । এই আশ্বাস বাক্যে বিশ্বাস করিয়া তিনি দৃঢ়ব্ৰতাবলম্বনপূর্বক তদগতচিত্তে কালহরণ করিতে লাগিলেন, রাত্রি প্রায় চারিদণ্ড আছে এরূপ সময়ে, বণিকৃপুত্রের আদেশানুসারে নাবিকগণ পুনরায় নৌকা পরিচালন আরম্ভ করিল। বায়ুর অনুকূলতায় পরদিন দিবা সাৰ্দ্ধ দ্বিতীয় । প্রহর সময়ে, তরণীসমুদয় উদয়নালার অদূরে আসিয়৷ পহছিল, জগদলভ অমনি সানন্দচিত্তে তীরে উত্তীর্ণ হইয়। স্বীয় আবাসে উপনীত হইয়া আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধবদিগের সহিত দেখা শুনা ও কথা বার্তায় দিনমান শেষ করিয়া ফেলিলেন ; রাজতনয়াকে হস্তগত করিয়াছি আর তিনি কোথায় যাইবেন, বসন্ত এতক্ষণ কি আর জীবিত আছে ? এই প্রকার মনে মনে আলোচনপূর্বক ভরসা বাধিয়া রহিলেন, একবার মন পরীক্ষার জন্য, সায়ংসময়ে একটি দূতীকে তরণীতে তরণীসন্নিধানে প্রেরণ করি ध्जूर्थ जाझ । Y&S লেন, দূতী স্থলোচনার সমীপস্থ হইয়া নিবেদন করিল, রাজকুমারি ! শ্রেষ্ঠিনন্দন জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইয়াছেন যে, আপনি তদীয় আবাসে উত্তীর্ণ হইবেন, না সমভিব্যাহারী লোকজনের সহিত পৃথকৃ আলয়ে অবস্থিতি করিবেন । কন্যা উত্তর করিলেন, তুমি শ্রেষ্ঠিনন্দনকে কহিবে, ভদ্রলোকে সপরিবারে অবস্থিতি করিতে পারে এরূপ একটি বাড়ী মাসিক ভাটক দান স্বীকার করিয়া স্থির করণানন্তর আমার নিকট সংবাদ প্রদান করেন । দূতীপ্রমুখাৎ এইরূপ উত্তর দান শ্রবণ করিয়া জগদ লভ মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন, রাজকন্যার যেরূপ মনভাব দেখিতেছি, তাহাতে যে তিনি সহজে হাতে আসিবেন এরূপ অনুভবে আসে না । তবে “যত্নে কৃতে যদি ন সিদ্ধতি কোইত্র দোষ?” । একবার যত্ন ও চেষ্টা করিয়া দেখি কি পৰ্য্যন্ত হইয়া উঠে । কিন্তু বল প্রকাশ করিতে গেলে হাতছাড়া হওনের সম্পূর্ণ সম্ভাবন ; দেখি, নৃপনন্দিনীর সঙ্গে যে সকল লোকজন আছে, যদি উহাদিগকে কৌশলক্রমে হস্তগত করিতে পারি। আর এক প্রকার উপায় উদ্ভাবন দ্বারা নুপতনয়ার মন নরম করিবার ও চেষ্টা দেখি ; এক একটা উপায়াব $(१२ মুলোচনা কাব্য । লম্বনে অভীষ্ট সিদ্ধি হইতে পারে। মনে মনে এইরূপ কল্পনা করিয়া দিন যাপন করিতে লাগিলেন। বাস্তবিক শ্রেষ্ঠিকুমারের বিষম চিন্তা উপস্থিত হইল, তিনি সতত এই চিন্তা করিতেন পাছে এই অস্থলভ অসমুদ্রসস্তুত । কন্যারত্ব ও এই অতুল ঐশ্বৰ্য্য হস্তবহির্ভূত হয়। জগদুর্লভ সাধ্যানুসারে নানা উপায় করিতে লাগিলেন, কিন্তু কিছুতেই কিছু করিয়া উঠিতে পারলেন না। পতিব্ৰতা সতী নারীদিগের সুরক্ষিত সতীত্বরত্ন কিছুতেই অপহৃত হইবার নহে। সমস্তভূবনপ্রকাশক সূৰ্য্য যাহার তেজস্বরূপ, এই প্রকাণ্ড অনন্ত ব্ৰহ্মাণ্ড র্যাহার । দেহস্বরূপ, র্যাহার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সমুদায় ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম, তিনিই অষ্টপ্রহরই তাহার প্রহরী থাকেন, স্থতরাং জগতে এমন দস্থ্য কে আছে যে তাহ অপহরণ করিবে ? এখানে দিবসত্রয় অম্বুরাশিতে ভাসমান থাকিয়া চতুর্থ দিবসে বেলাবসান সময়ে, বসন্ত স্বীয় অগ্রজ, অরুণবীৰ্য্য নামধারী শ্বেতের রাজধানী রত্নগঞ্জের নূ্যনাধিক একক্রোশ অন্তরে একটি স্থানে আসিয়া, সেই অবলম্বিত বালিসসহ তটিনীতটে সংলগ্ন হইলেন। তখন তাহার এতাদৃশ দুরবস্থা ঘটিয়াছিল যে, অঙ্গসঞ্চালন চতুর্থ অঙ্ক । y tט কি বাক্য স্ফুরণ করেন এরূপ শক্তি নাই ; কেবল জীবিতঅাশা বলবতী থাকাতে এক একবার নয়নোন্মীলন করত ইতস্ততঃ দৃষ্টিসঞ্চারণ করিতেছিলেন। বিধাতার অনুকূলতার ঘটনা ক্রমে একটি বিভবশালিনী বিধবা ব্রাহ্মণী উপযুক্ত পুত্ৰশোকে মনোদুঃখিনী সাশ্রুনয়নে সেই সময়ে তথায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন । তিনি মনের ব্যাকুলত প্রযুক্ত সৰ্ব্বদা এদিক্‌ ওদিকৃ অলক্ষ্য দৃষ্টিপাত করিয়া থাকেন, সহসা তাহার ঐ বালিসাশ্রয়ী মৃতকল্প দেবতা সদৃশ রূপরাশিতে নেত্রপাত হইল। সাক্ষাৎ কুমার সদৃশ যুবককে তদবস্থ জলে নিপতিত দেখিয়া, জীবিত কি মৃত তদ্বিষয়ে মনে মনে সন্দিহান হইয়া সেই দিকে গমন করিলেন। ক্রমশঃ বসন্তের সমীপবৰ্ত্তিনী হইয়া হৃদয়ে করুণাসঞ্চার হওয়াতে অনিমিষলোচনে তাহার দিকে দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন । বসন্তও সেই বৃদ্ধারমণীকে স্ব সমীপে আসিতে দেখিয়া, ত্রিয়মানাবস্থায় সতৃষ্ণনয়নে বারম্বার সেই দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। র্তাহার সেইরূপ নেত্রপাতে ইহাই প্রতিপন্ন হইতে লাগিল যে, আপনি কে ? বিধাতা বুঝি অনু Yፅ8 মুলোচন কাব্য। কুলত প্রদর্শনপূর্বক আপনাকে এস্থানে প্রেরণ করিয়া ছেন ; যদি আসিয়াছেন তবে অনুগ্রহপ্রকাশপূৰ্ব্বক শীঘ্ৰ আমায় জল হইতে তীরে উত্তীর্ণ করিয়া জীবনী দান করুন। বৃদ্ধ একেত উপযুক্ত পুত্ৰশোকে সতত রোরুদ্যমান, তাহাতে আবার সেই অনুপম রূপরাশি, যেন বিরল ঘনাবলী দ্বারা আচ্ছাদিত শশিকলার ন্যায়, নিম্প্রভ ও বিবর্ণ হইয়া গিয়াছে; এরূপ কুহুমহুকু মারকে ঈদৃশী দশাপন্ন দেখিলে, কাহার না অন্তরে দয়ার সঞ্চার হয় ? তাহাতে তিনি অচির মৃতপুত্ৰশোকাতুর সুতরাং তাহার স্থিরপ্রায় শোকসিন্ধু একবারে উদ্বেল হইয়া উঠিল। তখন তিনি আর স্বস্থির থাকিতে না পারিয়া, অপেক্ষাকৃত চঞ্চলপদে জলে ভাসমান মৃতকল্প যুবকের জীবনরক্ষার্থে তথায় উপস্থিত হইলেন। সমীপস্থ হইয়া জলে অবতরণপূর্বক বাহুদ্বয় প্রসারণ করিয়া র্তাহাকে হৃদয়ে ধারণ করত তীরে উত্তীর্ণ হইলেন । আমার বোধ হয়, যদি তৎকালে বসন্তের কথা কহিবার শক্তি থাকিত, তাহ হইলে তিনি অকপটভাবে ঐ দয়াবর্তী সাধুশাল বৃদ্ধাকে মৃদুমধুরস্বরে মাতৃ সম্বোধনপূর্বক, র্তাহার চিরসঞ্চিত শোকসন্তপ্তহৃদয়ের জ্বালা আং চতুর্থ অঙ্ক । Χά শিক নিবৃত্তির চেষ্টা করিতে পারিতেন। তথাপি কেমন মমতার কৰ্ম্ম, বসন্তকে ক্রোড়ে ধারণ করিবামাত্র বৃদ্ধ যেন আপন নয়নরঞ্জন সেই হারাণধন প্রাপ্তবৎ ক্ষণকালের জন্য সমুদয় বিগত দুঃখ বিস্মৃত হইলেন । বসন্ত মুমূর্ষ দশাগ্রস্ত, সুতরাং তাহার মনে মনে চেষ্টা থাকিলেও তৎকালে তিনি বাক্য দ্বারা কিছুই প্রকাশ করিতে ক্ষমবান হইলেন না । বৃদ্ধা, বসন্তকে নদীকূলে বালুক রাশির উপর সংস্থা পনপূর্বক নিজালয়ে লইয়। যাইবার নিমিত্ত আরও তিনজন সাহায্যকারিনী স্ত্রীলোক ডাকিয়া আনিলেন । চারিজনে অতি সাবধানতার সহিত ধীরে ধীরে পদ নিক্ষেপ করত প্রায় এক ঘণ্টাকাল যত্ন ও পরিশ্রম স্বীকার করিয়া বসন্তকে লইয়া স্বীয় আবাসে উপনীত হইলেন। নিকেতনে পহুছিয়া বসন্তের সজীবতা সম্পাদন জন্য, শরীরস্থ জল অচিরে নির্গত হইবার নানাবিধ উপায় উদ্ভাবন করিতে লাগিলেন। এই সকল ক্রিয়াতে বসন্তের শরীরস্থ জলভাগ নির্গত হইয়া কিঞ্চিৎ বলাধান উপলব্ধি হইল। কিন্তু অনবরত কম্পন হওয়াতে সে বল কোন কাৰ্য্যকারী হইবে বলিয়া বোধ Ꮌ&Ꮼ মুলোচনা কাবা । হইল না। তদর্শনে বৃদ্ধ অচিরে অগ্নি প্রজ্বালনপূর্বক র্তাহার সর্বাঙ্গে স্বেদ দিতে আরম্ভ করিলেন । কিয়ৎক্ষণ উত্তাপ প্রাপ্ত হওয়াতে বসন্তের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সমুদয় কৰ্ম্মক্ষম হইয়া উঠিল । বহুক্ষণ অসহ্য যন্ত্রণা পরি- , ভোগ হওয়াতে র্তাহার তালুদেশ এরূপ বিশুষ্কদশা প্রাপ্ত হইয়াছিল যে, বাক্যস্ফুরণের শক্তি রহিত হইয়া গিয়াছিল। কিয়ৎকাল মধ্যে মধ্যে অল্পমাত্রায় উষ্ণদুগ্ধ পান করাইলে পর মৃদুস্বরে দুই একটি কথা কহিতে আরম্ভ করিলেন । বৃদ্ধ অনন্যমনা ও অনন্যকৰ্ম্ম হইয়া কিয়ৎকালের নিমিত্ত বসন্তের সেবা । শুশ্রীষায় নিয়োজিত রহিলেন । সপ্তাহকাল দিবা রাত্রি শুশ্রুষ ও পুষ্টিকর অথচ লঘুপাক দ্রব্য আহার জনিত ইত্যাকার নানাবিধ উপায় বিধানে তাহাকে সবল ও প্রকৃতিস্থ করিয়া তুলিলেন। - বসন্ত এইরূপে স্বাস্থ্যলাভ করিয়া অনু্যন চারিবৎসর কাল সেই বৃদ্ধার বাটাতে অবস্থিতি করিয়াছিলেন। তিনি ঐ বৃদ্ধাকে স্বীয় জননী হইতে অভিন্নভাবে ভক্তি শ্রদ্ধা করিতেন। বৃদ্ধাও র্তাহাকে অপত্যনির্বিশেষে স্নেহ, দয়া ও মমতা এবং যত্বের সহিত রাখিয়াছিলেন । বাস্ত চতুর্থ অঙ্ক । Yፅ ጳ বিক তৎকালে সদ্যোজাতশিশুর ন্যায় বসন্ত নিতান্ত উপায়বিহীন হইয়া পড়িয়াছিলেন ; বৃদ্ধাও দুগ্ধপোষ্য বালকবৎ লালনপালন করিয়া বসন্তের জীবন দান করেন। বৃদ্ধ জাতিতে ব্রাহ্মণ, আর বসন্ত ক্ষত্ৰকুলোস্তব, ইহাতে আহারাদিরও কোন প্রকার অস্থবিধা ঘটে নাই । ফলতঃ এরূপ অবস্থায় পতিত হইলে জাতিভেদরূপ আত্মাভিমান মনে স্থান প্রাপ্ত হওয়া উচিত নহে । শুনিয়াছি ভাগবতের অধিনায়ক ভগবান বস্থদেবনন্দন, সদ্যোজাতাবস্থায় নন্দালয়ে আসিয়া একাদশ বর্ষে পুনরায় মথুরায় প্রত্যাগত হন, এই দীর্ঘ কালের মধ্যে গোকুলে গোপকুলের গৃহে একদিনও অন্ন গ্রহণ করেন নাই, কেবল মাত্র ক্ষীর, সর, নবনীত ভোজন করিয়াই এই দীর্ঘ কাল অতিবাহিত করিয়াছিলেন। বোধ হয় এই জনপ্রবাদটি কেবল শ্ৰীকৃষ্ণের অলৌকিকত্ব প্রতিপাদক মাত্র, নচেৎ সচরাচর এরূপ সম্ভবে না । বসন্ত যে সময়ে কোন স্থানে একাকী শয়ন কি উপবেশন করিয়া থাকিতেন, সে সময়ে কেবল আত্মদুর্ভাগ্য পৰ্য্যালোচন করত অনর্গল অশ্রুজল বিসর্জন করিতেন। যখন তাহার মনে, স্থলোচনার সেই লোকাতীত রূপ ミ> Ꮌ☾Ꮟ> মুলেfচনা কবি। লাবণ্যসম্পন্ন মোহিনীমূৰ্ত্তি, অমায়িক শান্ত স্বভাব, সারল্য ব্যবহার ও মধুরসম্ভাষণের কথা উদিত হইত, তখন তিনি এককালে সংজ্ঞাশূন্য হইয়া নিতান্ত বিভ্রান্তচিত্তের ন্যায়, শূন্যনয়নে অন্ততঃ অলক্ষিত দৃষ্টিসঞ্চারণ করিতেন, সে সময়ে কেহ তাহাকে আহবান করিলে সহসা উত্তর প্রাপ্তির আশা থাকিত না । যে সময়ে তাহার অন্তঃকরণে কপট বন্ধুর কুটিল ব্যবহার এবং অপাত্রে প্রণয় সংস্থাপনের ফলভোগ প্রভৃতি আবির্ভূত श्ऊ, তখন তাহার নয়নদ্বয় বাস্পবারি পরিপূর্ণ হইয়া একেবারে অন্ধবৎ দৃষ্টিহীন হইয়া পড়িত তৎকালে আর্ভস্বরে দীর্ঘনিশ্বাস সহকারে কেবল এই মাত্ৰ কহিতেন ; হ৷ জগৎপিতঃ ! হা বিধাতঃ ! হা সৰ্ব্বশক্তিমন ! হা সৰ্ব্বজীবহিতকারিণ, । পরিণামে কি আমার এই দশ৷ হইল। আমার ভাগ্যে কি শেষটা এই ছিল ? অার কি আমার প্রিয়সংযোগ সংঘটন হইবে না । কোন কোন সময়ে পূর্বোক্ত বিষয় সমুদয়ের চিন্তাতে একান্ত নিবিষ্টমনা ও রোমাঞ্চিত হইয়া একেবারে মুচ্ছৰ্গপন্ন হইতেন । কোন কোন দিন নির্জনে বসিয়া মনে মনে আন্দোলন করিতেন । এই সংসারে অকপট নিঃস্বার্থ চতুর্থ অঙ্ক । Δ& ώ বন্ধুত্ব অতি দুষ্প্রাপণীয়, সচরাচর যে অবস্থার মিত্রতা দেখিতে পাওয়া যায়, তৎসমুদয় হয় কুক্রিয়াসক্তিতে, মা হয় দুরভিসন্ধিতে পরিপূর্ণ। অধৰ্ম্মাচারী কুক্রিয়াসক্ত ব্যক্তিগণ শুদ্ধ স্বাভীষ্ট সিদ্ধির উদ্দেশে অন্যের সহিত মিত্রতা করিয়া থাকেন। তাহার প্রকৃত প্রস্তাবে বন্ধুত্ব মাহাত্ম্য পরিজ্ঞাত নহে। কখন কখন দেখিতে পাওয়া যায় যে, মদ্যপায়ী মাতালের মধুবণিজ বিপ ণিতে অথবা কোন প্রকার রঙ্গভূমিতে অনেকে একত্র উপবেশনপূর্বক পরস্পর অকপটভাবে মিত্রতা প্রকাশ করণানন্তর নানামতে আমোদ প্রমোদ করিয়া থাকে ; পরিশেষে সুরাদেবীর মোহিনী শক্তিতে প্ৰমত্তচিত্ত হইলে, তখন আর সে পূৰ্ব্বভাব দেখিতে পাওয়া যায় না ; সে সময়ে এক এক করিয়া সকলে আপনাপন অভীষ্ট স্থানে গমন করে, অবশেষে আর তদ্রুপ সম্প র্কের কোন লক্ষণই লক্ষিত হয় না ; ঐ বন্ধুত্ব পৰ্য্যবসানে স্বপ্নকল্পিতঘটনাবৎ প্রতীয়মান হয়। দস্থ্য কি তস্করদিগের বন্ধুত্ব ও এই ভাবে পরিদৃশ্যমান হয়। তাহারা স্ব স্ব বৃত্তিসাধক কার্য্যে প্ররক্ত হইবার সময়ে সাতিশয় তা গ্রহ প্রকাশ ჯჯ,თ মুলোচনা কাবা । পূৰ্ব্বক অন্যের সহিত বন্ধুত্বসূত্রে নিবদ্ধ হয় ; কিন্তু তৎকার্য্য সমাধান্তে আর সে বন্ধুত্ব দৃষ্ট হয় না ; এমন কি হয় ত সেই অপহৃত বস্তুর বিভাগ সময়েই মিত্রতা শক্ৰতায় পৰ্য্যবসিত হইয়া পড়ে। অম্মদেশীয় ধনবান ব্যক্তিদিগের স্বার্থসিদ্ধিলালসায়, একান্ত অর্থাপচাশ পাপাসক্ত নীচাশয়ী পামরদিগের সহিত বন্ধুত্বভাব প্রকাশ পাইয়া থাকে, যদুদেশে আত্মীয়তা করা হইয়াছিল, সেই কাৰ্য্য সাধন হইলে আর সে ভাব থাকে না। পূর্বে বিশেষরূপে স্বভাবের পরিচয় পরিজ্ঞাত না হইয়৷ অপাত্রে কিংবা অনুপযুক্ত পাত্রে বিশ্বাস সংস্থাপন পূর্বক বন্ধুত্ব করিলে যেরূপ ফল ভোগ করিতে হয় আমারও তদ্রুপ অমৃতবৃক্ষে বিষ ফলোৎপত্তি হইয়াছে। বন্ধু নিতান্ত নির্দয় পামর না হইলেইবা কেন অকারণে নানাপ্রকার চাতুৰ্য্যজাল বিস্তার পূর্বক বিনা অপরাধে অভিন্নহৃদয় পরমোপকারী বন্ধুর জীবনবিনাশে উদ্যত হইবেন ? এরূপ নৃশংসাচরণ ভদ্রচেতা সাধুশীল ব্যক্তি কর্তৃক কি কখন সম্ভবে ? বিধাতার কি আশ্চর্য্য মহিমা ! এইমাত্র জীবন সংশয় হইয়া এককালে জীবিতাশায় জলাঞ্জলি দিতেছিলাম, কত করে জগদীশ্বরের চতুর্থ অঙ্ক । ჯა,Y কৃপায় অন্তত উপায়ে করাল কালের হস্ত হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিলাম ; যেই একটু সুস্থ ও কিঞ্চিৎ সবল ইইয়াছি, অমনি কি হৃদয়গ্রাহিণী সৰ্ব্বসন্তাপনাশিনী অনুপম সুখপ্রদায়িনী প্রণয়িনীকে অন্তরাকাশে উদিত করিয়া প্রলুব্ধচিত্ত হইলাম ; হা মন ! তোমার বিচিত্র গতি! তোমায় ধিক ! তুমি কি পুনর্বার প্রত্যাশাপন্ন হইতেছ ? কি আশ্চর্য্য ! ! আশার আশ্বাসনী শক্তির কি ইয়ত্ত নাই । আহা ! কেমন বিধাতার কার্য্যপ্রণালী, ংসারের কোন কাৰ্য্যই অসম্ভব বলিয়া বোধ হয় না । যখন দুস্তর বিপদার্ণব হইতে উদ্ধার হইয়াছি, তখন প্রেয়সী সহ পূনর্মিলনেরই বা বিচিত্র কি ? বসন্ত এইরূপ দুঃখের অবস্থায় কাল যাপন করিতেছিলেন, এমন সময়ে হটাৎ একদিন যদৃচ্ছ গমন করিতে করিতে পথিমধ্যে শ্রবণ করিলেন যে, “মহারাজ অরুণবীৰ্য্য, লোকপরম্পরায় অসম্ভব রূপলাবণ্যের কথা শ্রুতিগোচর করিয়া, উদয়নালার জগদ্দলভ শ্রেষ্ঠর হস্ত হইতে একটি কন্যারত্ব বলপূর্বক অপহরণ করিয়া স্বকীয় রাজধানীতে আনয়ন করিয়াছেন ; শুনিলাম, ঐ কন্য। এরূপ অসাধারণ ধৰ্ম্মভূষণে ভূমিত যে, কি রূপ গুণ, মুলেfচন। কাব। جيم لا কি সুখ ঐশ্বর্য্য, কি শৌর্য্য বীর্য্য, কোন প্রকার প্রলো ভনেই তাহার অন্তঃকরণ বিচলিত হইবার নহে। তিনি রত্নগঞ্জে নীত হইলে, মহারাজ অরুণবীর্য্য, তাহাকে স্বীয় আবাসে লইয়া যাইবার নিমিত্ত যৎপরোনাস্তি যত্বও চেষ্টা করিলেন, কিন্তু কোন ক্রমেই সফলপ্রযত্ন হইতে পরিলেন না। রাজতনয় রাজভবন গমনে সম্পূর্ণ অস্বীকৃত হইলেন ; নৃপতি অগত্য র্তাহার নিমিভ পৃথক বাসস্থান নিৰ্দ্ধারিত করিলেন । সেই কন্যারত্ব, অরুণবীর্য্যের সংস্পর্শ পৰ্য্যন্ত বিরহিত থাকিয়া স্ব সমভিব্যাহারী দ্রব্য সামগ্রী ও লোকজনের সহিত স্বাধীনভাবে কালাতিপাত করিতেছেন। শুনিয়াছি তাহার সেই বাসস্থানে পঞ্চমবর্ষীয় বালকেরও প্রবেশাধিকার নাই ।” বসন্ত, এই জনপ্রবাদ মধ্যে জগদুৰ্লভ শ্রেষ্ঠির নাম, ও অলৌকিক রূপলাবণ্যসম্পন্না কামিনীর কথা আকর্ণন করিয়া মনে মনে কিঞ্চিৎ আশ্বাসিত হইলেন । সেই দিন হইতে কথিত অসামান্য রূপনিধান কন্যানিধান নিশ্চয়ই র্তাহার সেই মনমোহনকারিণী স্থলোচনা কি না তদ্বিষয়ে সংশয়ারূঢ় হইয়া তাহারই তথ্যানুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইলেন । নানাবিধ উপায় চিন্তনের পরে স্থিরীকৃত চতুর্থ অঙ্ক । ) とい○ হইল যে, দুগ্ধবিক্রেতা গোপজাতীয় যে স্ত্রীলোকটি প্রতিদিন নিয়মিতরূপে তাহাদের বাটতে দুগ্ধ বিক্রয় করিত, তদ্বারা সংবাদ আদান প্রদান হইলে, অতি সঙ্গোপণে অভীষ্টসিদ্ধি হইতে পারে। তদনুসারে বসন্ত, প্রথমে অন্যান্য বিষয়ক আলাপ করিয়া গোপ কামিনীর স্বভাব ও মনের ভাব পরিজ্ঞাত হইলেন। পরি শেষে আত্মাভিপ্রায় ব্যক্ত করিয়া কহিলেন, তুমি কৌশলক্রমে অগ্ৰে সেই কন্যার পরিচয় গ্রহণ করিয়া দেখিবে যদি আমার বাক্যের সহিত ঐক্য বলিয়৷ হৃদ্বোধ হয় তাহা হইলে আমার পরিচয় প্রদান করিবে । নচেৎ কিছুই ব্যক্ত করিবে না। গোপকামিনীগণ দুগ্ধ বিক্রয়চ্ছলে সৰ্ব্বত্র গতিবিধি করিতে পারে, তাহদের নিকট রাজভবন কি দুঃখীভবন বলিয়৷কিছুই বিশেষ থাকে না। বসন্তের পরামর্শানুসারে এই গোয়ালিনী সেই রাজনন্দিনীর ভবনে প্রতিদিন যাতায়াত আরম্ভ করিল। দুই চারি দিবস যাওয়া আসা হওয়াতে এক রকম জানা শুনাও হইল, ব্যবসায়ী রমণীগণ প্রায়ই সুচতুরা হইয়া থাকে; গোপকামিনী একদিন সময় বুঝিয়। কৌশলক্রমে নৃপছহিতার পরিচয় গ্রহণ করিয়া এবং ) が8 মুলোচনা কাব্য । মনের ভাব জানিয়া বিশেষরূপে হৃৎপ্রত্যয় জন্মিলে, বসন্তের পরিচয় প্রদান করিল। স্থলোচনা, প্রিয়তমের জীবিত সংবাদ প্রাপ্ত হইয়৷ ক্ষণকাল হর্ষবারি বিসর্জন করিয়া পরিশেষে মনেরভাব গোপন রাখিয়া গোপকামিনীকে সম্বোধনপূর্বক কহিলেন, তুমি যাহার কথা বলিতেছ, তিনি কে, তাহা আমি বিশেষরূপে বুঝিতে পারিলাম না। যদি তাহার আর কিছু অধিক জানাইবার অভিলাষ থাকে, তাহা হইলে তিনি যেন তোমার দ্বারা পত্র প্রেরণ করেন, পত্র প্রাপ্ত হইলেই আমি সবিশেষ অবগত হইতে পারিব, গোপকামিনী রাজনন্দিনীর নিকট বিদায় হইয়া বসন্ত সমীপে আসিয়া স্থলোচনার নিদেশবার্তা বিজ্ঞাপন করিলেন এবং যে কথা যে ভাবে বলিয়াছিলেন অবিকল সেইরূপ বর্ণন করিলেন। বসন্ত, দূতীপ্রমুখাৎ প্রণয়িনীর সংবাদ প্রাপ্ত হইয়৷ প্রোৎসাহিতচিত্তে লিপিপ্রণয়নপূর্বক আত্মপরিচয় প্রদান করিলেন ; হৃদয়কান্তের পত্র প্রাপ্তিতে, স্থলোচনা বিশ্বস্তচিত্তে পত্রদ্বারা জলে নিপতিত হওনদিবসাবধি আমূল তাবদ্ধৃত্তান্ত বল্লভের গোচর করিলেন। যে ছলাবলম্বনে অদ্যাপিও দুরন্ত নরপতি চতুর্থ অঙ্ক । yჯა(' হস্ত হইতে নিলেপস্ রহিয়াছেন ও পরিত্রাণ পাইয়াছেন সে সকল কথা পত্রিকার শেষভাগে লিখিয়া দিলেন। বসন্ত, দূতী দ্বারা পত্রিক প্রাপ্ত হইয়া সমস্ত সংবাদ অবগত হওয়ার পর শেষ কথার এই উত্তর লিখিলেন যে, ব্রতেরভাণ করিয়া মহারাজ অরুণবীর্যের প্রলুব্ধ চিত্তের আপাততঃ স্থৈৰ্য্য সম্পাদন করা উত্তম কল্পই হইয়াছে ; তিনি ব্রতের প্রতীক্ষায় আর কতকাল আশার ছলনে প্রতারিতাবস্থায় কালহরণ করিবেন ; কোন বিশ্বস্ত ব্যক্তি দ্বারা উজ্জাপন আয়োজন করিতে তৎসন্নিধানে বার্তা প্রদান কর। কিন্তু উজ্জাপনোপলক্ষে যেন, তাহার সন্তু মোপযুক্ত সমৃদ্ধি সংঘটন হয়। স্থলোচনা, প্রাণবল্লভের ক্রমান্বয়ে চারি পাচখানি পত্রিক প্রাপ্ত হইয়া নিঃসঙ্কচিত্তে পতির অনুমতিক্রমে অরুণবীর্য্যের সমীপে দূতীদ্বারা সংবাদ দিলেন যে, আগামী কার্তিকীপূর্ণিমার দিবস আমার সঙ্কল্পিত ব্রতোজ্জাপন হইবে, সেই উপলক্ষে মহারাজের সম্পত্তির পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যাইবে ; আমার প্রতি র্তাহার যত দূর আগ্রহ দেখিতেছি তাহাতে নানাস্থানীয় রাজা ও রাজন্যবর্গের এবং ঋষি ও ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণের সমাগম रै २ 〉ややゆ মুলোচনা কাব্য। হইবে। দান দ্রব্যের আয়োজন হইলেই বুঝিতে পারিব যে মহারাজের আন্তরিক শ্রদ্ধা আছে কি না। যাহাদিগকে সমাপন কার্য্যে নিয়োজিত করিবেন, তাহার। শাস্ত্রজ্ঞ ও বেদবিধিজ্ঞ হওয়া নিতান্ত আবশ্যক। যেরূপ ধনপ্রবাদ আমার শ্রুতিগোচর হইয়াছে তাহ প্রারব্ধ কার্য্যের অনুষ্ঠানেই হৃদয়ঙ্গম হইবে। স্থলোচনা এই ভাবের কতকগুলি কথা বলিতে আদেশ দিয়া দূতীকে রাজভবনে প্রেরণ করিলেন। মহারাজ দূতীদ্বারা ভাবী প্রণয়িনীর সহিত অচিরে সন্মিলন সংবাদ প্রাপ্ত হইয়া । হৰ্ষসলিলে ভাসমান হইলেন। তিনি দূতীর নিকট এই ৷ উত্তর প্রদান করিলেন, আমি নৃপতনয়াকে ঘে পাণাপেক্ষ। অধিক স্নেহ ও যত্ন করি, তাহা এই উজ্জাপন উপলক্ষেই প্রমাণ সিদ্ধ হইবে। স্থলোচনা, অরুণবীৰ্য্যের উত্তর পাইয়া সানন্দ মনে । বসন্তসন্নিধানে শুভসম্বাদ প্রদানে তৎপর হইলেন। বসন্ত, প্রেয়সীর পত্ৰ পাইয়৷ তদুত্তরে অর্থাৎ শেষ পত্রে এই কথা লিখিলেন যে, আমার জীবনবৃত্তান্তই ঐ ব্রতের ফলশ্রুতি কথা হইবেক । ইহা অনন্য সাধারণ গোচর আমি ও তুমি ভিন্ন অন্যে আর তাহা বলিতে পরিবে झङ्कर्थ अझ । ১৩৭ না ; অতএব তুমি আমার জীবনবৃত্তান্তটি যথাশ্ৰুত আমূল স্মৃতিপথে উদিত করিয়া রাখিবে। স্থলোচনা, সেই দিন হইতে প্রাণবল্লভের জীবনচরিত এক একবার মনে মনে আলোচনা করিতেন। তিনি যদি ও জানিতেন যে উহা কোন অংশেই অন্যের জানিবার উপায় নাই, তথাপি অভাগিনীর ভাগ্যে কি ঘটিবে বলা যায় না ; এই আশঙ্কাক্রমে উহা অভ্রান্তরূপে স্মরণপথে রাখিতে যত্নবর্তী হইলেন। রাজকুমারী মনের ব্যাকুলতায়, হৃদয়নাথের নিকটে লিখিলেন যে, “প্রাণনাথ! তুমি কোনরূপে দাসীকে বিস্মৃত হইও না, ছদ্মবেশে আসিয়া অধিনীর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ, করিও । আমি ওচরণ ভিন্ন আর কিছুই জানি না।” এইরূপে উভয়ের মনের ভাব, পত্রদ্বারা উভয়ের নিকট ব্যক্ত হইলে, র্যাহার যাহা কৰ্ত্তব্য তাহা পূর্বেই স্থিরীকৃত হইল। মহারাজ অরুণবীৰ্য্য, সংসার ললামভূত স্থলো চনাকে অচিরে প্রাপ্ত হইবেন মনে মনে এই আশা মৃগতৃষ্ণিকায় প্রতারিত হইয়া ঐশ্বৰ্য্যের প্রাচুর্য্য দেখাইবার জন্য এবম্বিধ সমৃদ্ধি সহকারে ব্রতোজ্জাপন কার্য্যের ১৩৮ মুলোচনা কাব্য । অনুষ্ঠান আরম্ভ করিলেন যে, তদর্শনে অনেকেরই মনে এই ভ্রান্তি উপস্থিত হইল যে, মহারাজ বুঝি এই কার্যোপলক্ষে সৰ্ব্বস্থান্ত হইবেন। ব্রতপ্রতিষ্ঠা ও তদুপ, লক্ষে বহুতর আগন্তকের সমাবেশ জন্য, একটি স্থদীর্ঘ সুরম্য হৰ্ম্মাবলী পরিশোভিত অপূৰ্ব্ব পুরী নিৰ্ম্মাণ হইল। সেই পুরীর মধ্যস্থলে সভাস্থান, তাহার এক ' দিকে সেই সৰ্ব্বজন মন কমনীয় কামিনীরত্বের বসিবার স্থান, উহার অবিদূরে নৃপতিদিগের উপবেশন স্থান, কিয়দূরে অধ্যাপকবর্গের ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য দর্শকদিগের আসন, অপর দিকে সাধারণ নিমন্ত্রিতবর্গের ও অন্যান্য আহুতদিগের নির্দিষ্ট স্থান, এইরূপ স্থান নির্দিষ্ট হইলে সকলেই আপনাপন স্থানে উপবিষ্ট হইলেন। পুরীর আরও শোভ হইল, দানের নিমিত্ত শাল, বনাৎ, পটু, লুই প্রভৃতি গাত্রবস্ত্র, ঘড়ী, গাড়, থাল, বাটা প্রভৃতি তৈজস, সূত্র ও পট্টবস্ত্র প্রভৃতি দ্রব্য সামগ্রীর প্রচুর পরিমাণে স্তুপাকার করিয়া রাখিল। নরেন্দ্র ७झे ধূমধামে ও আমোদ প্রমোদে প্রসক্ত হৃদয় হইয়া মনের সুখে সম্মিলনের পর যেরূপ ব্যবহার করিতে হইবেক স্বপ্নবৎ তদ্বিষয় মনোমধ্যে উদিত চতুর্থ অঙ্ক । \ \,ჯ করিয়া কল্পিত কল্পনায় কালাতিপাত করিতে লাগিলেন । এদিকে স্থলোচনা, প্রিয়বল্লভের সাক্ষাৎ না পাইয়া কেবল পত্রিকাদ্বারা মনস্তুষ্টি না হওয়ায় আশাপথ নিরীক্ষণে, তৃষিত চাতকিনী যেমন নবঘনের ঘননটায় পরিতৃপ্ত না হইয়া ব্যাকূলতা ও ব্যগ্রতা প্রকাশপূৰ্ব্বক বারিদসন্নিধানে বারম্বার বারি যাচঞা করিয়া থাকে তার ন্যায় কাতরতা ও দীনতার সহিত সম্মিলন প্রার্থন করিতে লাগিলেন। বসন্তও প্রেয়সীর ব্যাকূলতায় আর ধৈর্য্যাবলম্বনে অশক্ত হইয়া অবিলম্বে মানস পরিপূরণ করিবার নিমিত্ত ঐকান্তিকতা দেখাইতে লাগিলেন। ক্রমশঃ দুঃখের অবসান হইল। স্থলোচনা যথাযোগ্য যানারোহণে সভাস্থলে পটমণ্ডপে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন নানাদেশের নরপতিগণ, রাজন্যবর্গ, ধনী, মানী, সন্তান্তব্যক্তি, সমস্ত লোক স্ব স্ব নির্দিষ্ট স্থানে উপবিষ্ট হইয়া বৈষয়িক আলাপ করিতেছেন ; ঋষিগণ ও ছাত্র পরিবেষ্টিত অধ্যাপকবর্গ, নানাশাস্ত্রীয় কথা প্রসঙ্গে কালযাপন করিতেছেন। রাজপুরোহিতগণ র্তাহার প্রতীক্ষায় অাশাপথ নিরীক্ষণে কালহরণ করিতেছেন । yዳe দুলোচন। কাব্য। রাজকুমারী উপস্থিত হইলে যথাবিধি সঙ্কল্প করণানন্তর ব্ৰতেৰ্বতি হইলেন। স্থলোচনা, রাজপুরহিতদিগকে বরণ করিয়া কার্য্যেবৃতি করিয়া দিয়া ; কতক্ষণে প্রাণকান্তের সন্দর্শন পাইবেন এই চিন্তায় নিবিষ্টচিত্তে অব স্থিতি করিতে লাগিলেন। অরুণবীর্য্যের মনে আর আহলাদ ধরে না, তিনি, কতক্ষণে কাৰ্য্য শেষ হইবে, কতক্ষণে চিরতৃষিত মন পরিতৃপ্ত হইবে, কতক্ষণে অন্তরের আকাঙ্ক্ষা নিবৃত্ত হইবে ;এইরূপ চিন্তা করিতে লাগিলেন। কাহার অবস্থা চিরদিন সমান থাকে না। সংসার সমুদ্রের অবিরল লহরী লীলায় কখন, স্থখ, কখন বা দুঃখ, পৰ্য্যায় ক্রমে উদিত ও অস্তমিত হইতে দেখিতে পাওয়া যায় । আজন্ম সুখে কালক্ষেপ করিয়া আয়ুসকাল পূর্ণ করিয়াছেন সংসারে এরূপ লোক অতি বিরল। আবার বসন্তের ন্যায় ভূমিষ্ঠকালাবধি দুঃখ পরম্পরা ভোগ করিতে দেখাও, দুষ্কর। প্রথমাবস্থায় সুখ সম্ভোগ করিয়া শেষ দশায় দুঃখের কঠোর হস্তে নিপতিত হইলে যতদূর ক্লেশকর হয়, আদিতে দুঃখ পরিণামে সুখভোগ ততদূর ক্লেশাবহ নহে। যেমন চতুর্থ অঙ্ক । yዋy অসিতপক্ষীয় তামসীরজনী প্রভাতে সূর্যোদয় হইলে জীবলোক যাদৃশ আনন্দপূর্ণ হয়, যেরূপ সপ্তাহকাল অনবরত বর্ষণের পর বারিদজাল বিদূরিত হইয়া অরুণোদয় হইলে লোকসমাজ উৎসবপূর্ণ হয়, স্থলোচনাও বসন্তবিগত দুঃখে তদ্রুপ অবস্থাপন্ন হইয়াছিলেন তাহ কে না স্বীকার করিবে । রাজপুরোহিতগণ, ব্রতের প্রতিষ্ঠাকাৰ্য্য সম্পাদন করণানন্তর স্থলোচনাকে ফলশ্রুতি বাক্যাবলী শ্রবণ করাইবার নিমিত্ত পটদ্রোহের সন্নিকর্ষে উপনীত হইয়৷ কথারম্ভ করিলেন ; কিন্তু পূৰ্ব্ব প্রতিজ্ঞানুসারে কথা রাজকন্যার অনুমোনিত হইতেছে কি না তাহা জিজ্ঞাসা করিলেন, স্থলোচনা ঐ কন্যার আংশিক গ্রাহ্যযোগ্য বলিয়াও স্বীকার করিলেন না । সভাস্থলে কথোপলক্ষে মহান গোলযোগ হইতে লাগিল। যত ঋষি, অধ্যাপক, আচাৰ্য্য প্রভৃতি বৈদিক্কৰ্ম্মঠ লোক ছিলেন, এক এক করিয়া সকলেই পরাস্ত হইলেন। ইনি সামান্যা কন্যা নহেন। একবার দূতক্রীড়া উপলক্ষে কত রাজকুমার ও . কত সওদাগরকুমারকে পরাভব করিয়া কারাগারে পরি ক্ষিপ্ত করিয়াছিলেন ; এবারে বুঝি ব্রাহ্মণদিগের ললাটে y १२ মুলোচনা কাব্য । বজ্রপাত হয়। ই হার কোন কার্য্যে কাহার অভীষ্ট পূর্ণ করা কঠিন ব্যাপার! স্থলোচনা, ইতিপূর্বে রাজাকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন যে, ব্রতের কথা আমার মন্মত না হইলে উজ্জাপন কাৰ্য্য সমাধা হইবে না । মহারাজ পরিণাম না জানিয়া সরলান্তঃকরণে তাহাতে সম্মতি দান করিয়াছিলেন; ভবিষ্যতে যে এরূপ বিষম বিভ্ৰাট ঘটিবে তাহা তাহার মনে একবারও উদয় হয় নাই ; যখন দেখিলেন যে, সভাস্থ ঋষি ও অধ্যাপক এবং আচাৰ্য্য প্রভৃতি শাস্ত্রবেত্তা ব্যক্তি মাত্রেই ক্ষুদ্ধচিত্তে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন, তৎকালে র্তাহার মনে আর পূর্বের ভাব রহিল না। ইতিপূৰ্ব্বে তিনি মনে মনে আন্দোলন করিতেছিলেন যে, আজি আমার রজনী স্থপ্রভাত, আজি আমার কি আনন্দের দিন, আজি আমার অদৃষ্ট স্থপ্রসন্ন, আজি আমার জন্ম সার্থক, আজি আমি সেই শ্রবণসুখকর চিরাকাঙ্খিত অলৌকিক রূপনিধান কন্যানিধানকে নয়নের ও মনের আনন্দদায়িনী করিয়া হৃদয়স্থিত অাশালতাকে ফলবতী দেখিয়া কৃতার্থ হইব । আজি আমি নানা শঙ্কাকুলচিত্তের স্থৈৰ্য্য সম্পাদন পূর্বক, চিত্তপ্রসাদনকারিণী সংসারললামভূত কন্যা চতুর্থ অঙ্ক । Yom রত্নকে প্রাপ্ত হইয়া তৎসহ সহবাসে অপার আনন্দনীরে পরিক্ষিপ্ত হইব । বর্তমান অবস্থায় পূৰ্ব্বভাব অন্তর হইতে অন্তর হইল। মহারাজ উপস্থিত ব্যাপারে একেবারে ভগ্নোৎসাহ হইয়া পড়িলেন। তৎকালে তাহার প্রফুল্ল বদন নিম্প্রভ হইল, তিনি, কিরূপে মান রক্ষা হইবে, কেমন করিয়া লজ্জা নিবারণ হইবে তদুপায় চিন্তনে প্রবৃত্ত হইলেন। নানাপ্রকার লোক আসিয়া নানা শাস্ত্র সম্মত ব্রতাঙ্গ ফলশ্রুতি কহিতে আরম্ভ করিলেন, কিন্তু স্থলোচনার পতিব্রতের কথা কেহই বলিতে পারিলেন না। অরুণবীৰ্য্য ক্রমেই হতাশ ও নিরুদ্যম হইতে লাগিলেন । পরিশেষে দেশ বিদেশে প্রচার করিয়া দিলেন, যিনি এই ব্রতের ফলশ্রুতি কথা বলিয়া রাজকুমারীর মনস্তুষ্টি করিতে পারিবেন তাহাকে সহস্ৰ সুবর্ণমুদ্রা পারিতোষিক প্রদান করিব । এই ঘোষণার দিন হইতে সপ্তাহকাল নানাস্থানের অধ্যাপক ও ঋষি আসিয়া যথাজান বলিতে আরম্ভ করিলেন, কিন্তু এক ব্যক্তিও কৃতকাৰ্য্য হইয়া যাইতে পারিলেন না। মহারাজের স্থখের সিংহাসন দুঃখ আসিয়া অধিকার করিল। বিষম সঙ্কটে পড়িলেন, ર૭ ›ፃ8 মুলোচনা কাব্য। যদি প্রারব্ধ কাৰ্য্য স্থসম্পন্ন না হয় তাহা হইলে দেশ বিদেশে অযশ, কলঙ্ক ও অখ্যাতি ঘোষণা হইবে । রাজকুমারীও মনে করিবেন, এরাজ্যে শাস্ত্রজ্ঞ লোক নাই এবং রাজারও এমন ক্ষমতা নাই যে একটা ব্রত সমাপন সম্পাদন করিতে পারেন। যাহা হোক্‌ কিছুতেই পরাস্তু খ হওয়া হইবে না, সৰ্ব্বস্বান্ত হইতে হয় কি জীবন দিতে হয় সেও স্বীকার । এইরূপ ঘটনাকেই “লজ্জারচড় গালপেতে লওয়া বলে”। বিধাতা অনুকুল হইলেন, অষ্টমদিবসে নিতান্ত অজ্ঞাত কুলশীলের ন্যায়, শীর্ণকলেবর, বক্ষঃ প্রলম্বিত শুশ্ৰুধারী, তরুণ অরুণ সদৃশ বৰ্ণভাতি, প্রস্ফুটিত শতদল তুল্য মুখকমল, একটি নবীন যুবাপুরুষ, কুক্ষিদেশে এক খানি পুস্তক সংস্থাপন পূর্বক মৃদুমন্দ গতিতে দ্বারদেশে উপনীত হইলেন। মহারাজ দ্বারবানদিগের প্রতি এই আদেশ দিয়াছিলেন, যিনি ব্রতের কথা বলিতে আসিয়াছি বলিবেন তৎক্ষণাৎ তাহাকে দ্বার ত্যাগ করিবে। সুতরাং বসন্ত দ্বারদেশে উপস্থিত হইয়৷ আগমনাভিপ্রায় জানাইলেই তাহারা দ্বার ত্যাগ করিল। বসন্ত সভাস্থলে প্রবেশ করিলে কি পিতা, কি झङ्घर्थ अरू । 34位 ভ্রাতা, কি স্ত্রী, কেহই সহসা তাহাকে চিনিতে পারিলেন না। র্তাহার বয়স ও বেশ দেখিয়া পরস্পর তর্ক বিতর্ক আরম্ভ হওয়াতে সভায় মহান গোলযোগ উপস্থিত হইল। কেহবা উপহাস করিয়া কহিল, অর্থলোভে আত্ম ক্ষমতার প্রতি দৃষ্টিপাত না করিয়া গুরুতর কার্য্যে অগ্রসর হওয়া নিতান্ত নিৰ্ব্বোধের কৰ্ম্ম । কেহবা অপূৰ্ব্বকান্তি দর্শনে বৃহস্পতিদেব আসিয়া উপস্থিত হইলেন কি ! কেহবা আকার দর্শনে মহানতেজস্বী ঋষিকুমার জ্ঞান করিতে লাগিলেন। কেহব। আচাৰ্য্য গুরুকুল পুরোহিত বামদেব, কেহবা সন্নাসী বেশধারী কামদেব বলিয়া মনে করিতে লাগিলেন । বসন্ত সভামধ্যে দণ্ডায়মান হইয়া অতি বিনীতভাবে মৃদুমধুর স্বরে কহিলেন, আমি লোকপরম্পরায় শ্রুত হইলাম যে, এই স্থসমৃদ্ধিসম্পন্ন পতিত্ৰতের ফলশ্রুতি কথা বলিয়া এক ব্যক্তিও রাজতনয়ার মনে সন্তোষ জন্মাইতে পারেন নাই। যদি মহারাজের ও সভাস্থ মান্যগণ্য ব্যক্তিবর্গের অনুমতি হয়, তবে আমি সতীত্ব ব্রতের ফলশ্রুতি যাহা কিছু পরিজ্ঞাত আছি, যথাসাধ্য তাহা বর্ণনে প্রবৃত্ত হই। বসন্তের কথা শুনিয়া মহা ১৭৬ মুলোচনা কাব্য । রাজ অরুণবীৰ্য্য সম্পূহনয়নে সভাসীন ব্যক্তিগণের দিকে বারম্বার নেত্রপাত করিতে লাগিলেন। তৎকালে তিনি এরূপ চলচিত্ত হইয়াছিলেন যে, বিবেকশক্তি এককালে রহিত হইয়া গিয়াছিল। এই নিমিত্ত স্বয়ং উত্তরদানে অগ্রসর না হইয়া, সভ্যদিগের দ্বারা তদুত্তর প্রাপ্তির আশয়ে একবার বসন্তের প্রতি আর একবার সভাস্থ ব্যক্তিদিগের প্রতি দৃষ্টিনিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। সভাস্থ বিচক্ষণ ব্যক্তি মাত্রেই, বসন্তের প্রশান্ত প্রকৃতি, মাধুর্য্য ভাব, ও গম্ভীরস্বভাব অবলোকনে এবং বিনয়নম্র বচনে ইতিপূর্বেই স্থির করিয়া রাখিয়াছিলেন যে, ইনি নিশ্চয়ই সুপণ্ডিত হইবেন । অধুনা মহারাজের ঐরূপ নিরুত্তরাবস্থানে, আর অনিমিস নয়নে দীনতার সহিত সতৃষ্ণ নেত্রপাতে, তাহাদের অন্তঃকরণে ইহাই উদিত হইল যে, মহারাজের অভিলাষ যে, তাহদের কর্তৃক উত্তর প্রদান তুসম্পন্ন হউক। কিন্তু সেই সভাস্থিত কয়েকজন ঈর্ষ্যাপরবশ যাজকের ও কয়েকটি আত্মাভিমানী দাম্ভিক অধ্যাপকের বিরক্তিভাব প্রকাশ পাইতে লাগিল । সভার আর আর সকলে একবাক্যে কৌতুহলচিত্তে আগস্তুক ব্যক্তিকে ব্রতের কথা বলিবার নিমিত্ত অনুরোধ চতুর্থ অঙ্ক । y ११ করিলেন। পূর্বোক্ত ব্যক্তি কয়েকজন বিরসবদনে অবস্থিত রছিলেন । কি কথা বলেন ইহাই শ্রবণ মানসে সকলেই বসন্তের মুখের দিকে দৃষ্টি করিতে লাগিলেন । বসন্ত, সকলের অনুমতি গ্রহণপূর্বক পটগৃহের নিকটবর্তী হইলে, অবগুণ্ঠনবতী স্থলোচনা সেই বস্ত্রাবৃত গৃহ হইতে র্তাহার আপাদমস্তকের প্রতি বারম্বার দৃষ্টিপাত করত মনকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, মন ! স্থির হও আর ব্যাকুলতার প্রয়োজন নাই ; বিধাতা বুঝি এতদিনে স্থপ্রসন্ন হইয়াছেন, একবার স্থিরভাবে অনিমিষ নয়নে চেয়ে দেখ দেখি, এবারে কে কথা শুনাইতে আসিয়াছেন ; ইহঁাকে দেখিয়া কি তোমার আশার সঞ্চার হইতেছেন ? একবার ভালরূপে চেয়ে দেখ, আগন্তক ব্যক্তি কে ? ইনি কি পরিচিত নহেন । আমার কথা শুন, ইছার আকার প্রকারের প্রতি একবার অভিনিবেশ পূর্বক দৃষ্টিপাত কর, তোমার উদ্বেগ দূর হইবে । কি জানি যদি ইনিই তোমার সেই নয়ন রঞ্জন হারাণধন বসন্ত হয়েন । আহা ! ইহঁার এই হৃদয় বিদারক অবস্থা দৃস্টে, এখনও তুমি ধৈর্য্যাবলম্বন করিয়া রহিয়াছ ? y Ab দুলোচনা কাব্য। ইহাতে কি প্রিয়তমের নিকটে তোমার নিষ্ঠুরতা প্রকাশ পাইতেছে না ? দেখ যেন তোমায় পাষাণ হৃদয় মনে না করেন। হা পরমেশ্বর ! তোমার কি এই বিবেচনা ? হা নিদারুণ বিধি ! প্রাণকান্তকে, কি এরূপ দুরবস্থায় রাখিতে হয় ? আহা ! প্রাণবল্লভের এদুর্দশা দেখিয়া যে, হৃদয় বিদীর্ণ হইবার উপক্রম হইয়াছে, আহা ! সে কমল কান্তিইবা কোথায় ? সেই অনুপম রূপলাবণ্যইবা কোথায় ? অবস্থা দেখিয়া যে, আর চিনিবার সম্ভাবনা নাই । ইনি যে এক্ষণে সাক্ষাৎ কুমার তুল্য রাজকুমার বেশ পরিত্যাগ পূর্বক ঋষিকুমারের বেশ পরিগ্রহ করিয়া আসিয়াছেন । ইনি এখন কাহার উপাসনায় এই নবীন বয়সে কঠোর তাপসব্রতে ব্ৰতী হইয়াছেন, তাহার কিছু বলিতে পার? একটু নিবিষ্টচিত্তে চিন্তা কর, এখনই হৃদয়ঙ্গম হইবে। পাঠক মহাশয়ের অনায়াসেই বুঝিতে পারিয়াছেন, বোধ হয় তুমি ও মনে মনে জানিতে পারি য়াছ, কেবল লোক লজ্জা ভয়ে মনের আবেগ সংবরণ পূর্বক অগত্য স্থস্থির ভাবে অবস্থিতি করিতেছ ; কিম্বা পাছে ভ্রান্তি জন্মিয়া থাকে মনে করিয়া এখনও সংশয়িত চিত্তে কালক্ষেপ করিতেছ ; যাহা হউক আর অধিককাল চতুর্থ অঙ্ক । y כף এভাবে থাকিতে হইবে না, ব্রতের কথার শেষ হইলেই সংশয় শেষ ও দুঃখ শেষ হইবে।

  • বসন্ত, রাজনন্দিনীর পটমণ্ডপের সমীপস্থ বেদীর উপরিভাগে উপবিষ্ট হইয়া আচমন করণানন্তর নাতি উচ্চ, নাতি মৃদুস্বরে ব্রতের কথারম্ভ করিলেন, এই কথা আর কিছুই নহে কেবল বসন্তের জীবনচরিত মাত্র। পাঠক মহাশয়েরা তাহার সমস্তই জানিয়াছেন সুতরাং আর পুনর্বার উল্লেখের প্রয়োজন বোধ হইল না। সেই জীবন বৃত্তান্ত শ্রবণে সভাসীন ব্যক্তিগণের মধ্যে অনেকেই উপন্যাস মনে করিয়া উপহাস আরম্ভ করিলেন । কিন্তু সেই বসন্তের পিতা, মহারাজ বীরজিৎ সিংহ উপস্থিত ছিলেন, তাহার ও অধুনা অরুণবীর্য্য নামধেয় শ্বেতের মুখ স্নান, নয়নদ্বয় ছল ছল হইয়া ক্রমশ শোকসিন্ধু উদ্বেল হইয়া উঠিল। যে সময়ে বসন্তের মুখ হইতে বিমাতৃ ষড়যন্ত্রে পিতাকর্তৃক জীবন দণ্ডের কথা বিনিগত হইল, তৎকালে বীরজিৎসিংহ একবারে অধৈর্য্য হইয়া উচ্ছলিত শোকাবেগ সংবরণে অসমর্থ হইয়া প্রবলবেগে বাষ্পবারি বিসর্জন করিতে লাগিলেন । যে সময়ে শ্বেত, শ্বেতহস্তী আক্রান্ত ও b o মুলোচনা কাব্য ।له

তাহাতে আরোহিত হইয়া, অভিন্নহৃদয়, চিরসহায় সহোদর স্নেহে জলাঞ্জলি দিয়া রাজভোগের পরিভো নিবিষ্টমনা হইয়া, সেই অসহায় ভ্রাতৃপরায়ণ উপায়” বিহীন অকৃত্রিম প্রণয়াম্পদকে এককালে বিস্মৃত হওনের কথার উল্লেখ হইল, তখন শ্বেত, আর স্থির থাকিতে ন৷ পারিয়া বিহালচিত্তে অনর্গল অশ্রুজলে অভিষিক্ত হইতে লাগিলেন । বীরজিৎসিংহ, অরুণবীৰ্য্যকেই যখন স্বীয় জ্যেষ্ঠপুত্র বলিয়া নিশ্চয় জানিতে পারিলেন, তখন সতৃষ্ণনয়নে বারম্বার শ্বেতের মুখপানে দৃষ্টি করিয়া মনে মনে অনিৰ্ব্বচনীয় স্থখানুভব করিতে লাগিলেন। বসন্তের বলার আর বিরাম নাই, মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, কথার শেষ না হইলে স্বয়ং প্রকাশ হইব না ; সুতরাং পিতার ও ভ্রাতার আচরণ বিশেষরূপে বর্ণন করিতে আরম্ভ করিলেন । এমন কি সেই কথিত কথায় অনেকেরই অন্তরে অরুণবীর্য্যের প্রতি বিরাগ উৎপাদন করিল। বসন্তের শেষাবস্থার বিবরণ শ্রবণে প্রায় সকলেরই মনে দুঃখের সঞ্চার হইয়াছিল, বাস্তবিক ঐ অংশটি সাধারণের পক্ষেই মৰ্ম্মান্তিক যাতনাপ্রদ ও শোকাবহু, ইহাতে যে তদীয় পিতা ও ভ্রাতার মনে চতুর্থ অঙ্ক । ᎼᏏ Ꮌ অধিকতর ক্লেশ উপস্থিত হইয়াছিল তাহা বলা বাহুল্য মাত্র । বসন্তের জীবন বৃত্তান্ত শ্রবণে লোকের মনে কখন ভয়, কখন বিস্ময়, কখন শোক, কখন দুঃখ, কখন বিদ্বেষ, কখন জীবনাশা পরিত্যাগের আক্ষেপ ইত্যাদি নানাপ্রকার ভাবোদয় হইয়াছিল। যে সময়ে শ্বেত সাধারণ সমীক্ষে পরিচয় পরিজ্ঞাত হইলেন যে, অলোক সামান্য রূপলাবণ্যবতী নৃপছহিত তাহার ভ্রাতৃবধু, তখন তিনি একান্ত ক্ষুব্ধচিত্তে পরমেশ্বরকে অগণ্য ধন্যবাদ দিয়া কহিলেন ভগবান আমায় রক্ষা করিয়াছেন ; নচেৎ আমি নিশ্চয়ই দূরপনেয় পাপপঙ্কে নিপতিত হইতাম। আমি ইতিপূর্বে ইহার বিন্দু বিসর্গও জানিতে পারি নাই। অবশেষে অনুতপ্ত হৃদয়ে জগদ্দুলভ শ্রেষ্ঠির কৰ্ম্মানুরূপ প্রতিফল প্রদানে কৃতসঙ্কল্প হইলেন। কথার শেষভাগে, যখন সেই শ্মশ্রীধারী কৃশাঙ্গ নবীন পুরুষ বসন্ত বলিয়া স্থিরীকৃত হইল, সেই সময়ে আর কোন ব্যাপারই কাহার অগোচর রহিল না । অরুণবীৰ্য্য আর মহারাজ বীরজিৎ উভয়ে আসিয়া যুগপৎ বসন্তকে আলিঙ্গন করিলেন। পরে বহুকালের পর পুত্রদ্বয়কে প্রাপ্ত হইয়া মহারাজ বীরজিৎ সিংহ २8 )bra মুলোচন। কাব্য । স্বীয় অঙ্কদেশে কুমার দুটিকে রাখিয়া বারম্বার মস্তক আত্রাণ, মুখ চুম্বন ও হর্ষবারি বিসর্জন করিতে লাগিলেন। আহা ! তাহার সেই হারাণনিধি হস্তগত হওঁ য়াতে যে কি পৰ্য্যন্ত আহলাদ জন্মিয়াছিল তাহা বলিয়৷ শেষ করা যায় না। সভাস্থ সমস্ত লোকই এই অশ্রুত অভূতপূর্ব ব্যাপার দর্শনে একবারে বিস্ময়সাগরে নিমগ্ন হইলেন। অনন্তর মহারাজ অরুণবীৰ্য্যের আদেশানুসারে সভাভঙ্গ হইল। সকলেই আপনাপন বাসস্থানে গমন করিলেন, বীরজিৎসিংহ পুত্রদ্বয়ের সহিত স্বতন্ত্রস্থানে মনের দুঃখ কহিবার নিমিত্ত গমন করিলেন । স্থলোচনা বসন্তের অনুমতিক্রমে পূৰ্ব্ব নির্দিষ্ট বাসস্থানে গমন করিলেন । সে দিন আর কান্তের সহিত কথাবাৰ্ত্ত হইল না। এই কাৰ্য্য সুসম্পন্ন হইয়া নিমন্ত্রিতগণ বিদায় হইলে মহারাজ বীরজিৎ পুত্রদ্ধয় সহ রাজধানীগমনের অভিলাষ করিলেন। কিন্তু অরুণবীর্য্যের রাজধানী পরিত্যাগ করিয়া পিতৃভবনে গমন করা সুকঠিন, এই জন্য আরও কএকদিবস তথায় চারিজনে একত্রে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন।  অরুণবীর্য্য, ভ্রাতার প্রতি হৃদয়বিদারক পরুষ আচারে জগদ্দুর্লভের প্রতি কোপাবিষ্ট ছিলেন, তিনি এক্ষণে অবকাশ প্রাপ্ত হইয়া সমুচিত প্রতিফল দিবার জন্য তাহাকে পদাতিক দ্বারা আনাইলেন, কিন্তু বসন্ত এই সম্বাদ জানিতে পারিয়া জ্যেষ্ঠের নিকট অনুরোধ করিয়া কৃতঘ্ন বন্ধুর বিপদুদ্ধার করিলেন। পাছে ভবিষ্যতে কোন প্রকার বিপদে পতিত হন এই শঙ্কায় তাহাকে পুনর্ব্বার সমভিব্যাহারে করিয়া নসীপুরে আনিলেন। সেই অবধি জগদ্দুর্লভ শ্রেষ্ঠির মুরসিদাবাদে অধিবাস হইল।

 মহারাজ, বসন্তকে রাজ্যভার দিয়া নারকী রাজ্ঞীর সহবাসে পাপাসক্ত হইবার শঙ্কায় বাণপ্রস্তধন্মের আশ্রয় গ্রহণপূর্ব্বক দেশে দেশে ভ্রমণ আরম্ভ করিলেন। লাবণ্যময়ী পৃথক্‌ বাসস্থানে থাকিয়া মাসিক বৃত্তি গ্রহণ পূর্ব্বক জীবনশেষ করিলেন। মহারাজ বীরজিৎ আর একবার রাজধানী আগমন করিয়াছিলেন, কিন্তু আত্ম পরিচয় দেন নাই।