সুলোচনা কাব্য/তৃতীয় অঙ্ক

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


তৃতীয় অঙ্ক।

 এদিকে বসন্ত, দাদার প্রত্যাগমন প্রতীক্ষায় ভোজন দ্রব্য সমুদয় প্রস্তুত হইলেও কিয়ৎক্ষণপর্য্যন্ত আহার না করিয়া তদীয় আসাপথ চাহিয়া রহিলেন। ক্রমে রজনী প্রায় দ্বিতীয় প্রহর অতীত হইল, তথাপি তাঁহার সাক্ষাৎ নাই দেখিয়া, অগত্যা আহার করিতে বসিলেন, কিন্তু মনে উৎকণ্ঠা বলবতী থাকাতে সুচারুরূপে আহার হইল না। অধিক রাত্রি হইয়াছে এখন আর কোন উপায় হইবার সম্ভাবনা নাই, এখন শয়ন করি, এই ভাবিয়া শয়ন করিলেন, কিন্তু দাদা কোথায় রহিলেন, তিনি এ অবস্থায় নিশ্চিন্ত ভাবে অন্যস্থানে অবস্থান করিবেন এরূপ বোধ হয় না; দাদার কোন প্রকার নিশ্চিত সম্বাদ না পাইয়া নিতান্ত উদ্বিঘ্নমনে ভালরূপ নিদ্রা যাইতেও পারিলেন না। কেবল কখন রজনী প্রভাত হইবে, কখন দাদার সহিত সাক্ষাৎ হইবে, এই চিন্তাতেই যামিনী যাপন হইল। আহা! এত যে দুঃখের অবস্থা ঘটিয়াছে দাদার আশ্রয়ে থাকিয়া, এতদিন সে তৃতীয় অঙ্ক । b" সমস্ত দুঃখের বার্তা কিছুই জানিতে পারেন নাই। কোন রকম কষ্ট উপস্থিত হইলে, তখনই তাহ দাদাকে জানা ইতেন, দাদা অমনি শ্রবণমাত্র অতিমাত্র ব্যগ্র হইয়া তাহার প্রতিবিধান করিতেন । পরদিন প্রভাত হইবামাত্র, বসন্ত অনন্যমনা ও অনন্যকৰ্ম্ম হইয়া জ্যেষ্ঠের অন্বেষণে মনোনিবেশ করিলেন। যে যে স্থানে শ্বেতের অবস্থান সম্ভব, সেই সেই স্থানে বিশেষ করিয়া অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। কিন্তু কোন স্থানেই তাহার সাক্ষাৎ পাইলেন না ও র্তাহার কোনরূপ সম্বাদও পাইলেন না। শিকারপুরের সৰ্ব্বত্র তন্ন তন্ন করিয়া অনুসন্ধান করা হইলে, অবশেষে তৎপাশ্ববৰ্ত্তী নিকটস্থ পল্লীসকলেও বিশেষরূপে অনুসন্ধান করা হইল, কিন্তু কোন স্থানেই তাহার কোন সম্বাদ পাইলেন না। পরিশেষে হতাশমনে বাসায় প্রত্যাগত হইলেন, চিন্তিত অন্তরে নানাস্থান পর্য্যটন করাতে বসন্তের শরীর নিতান্ত দুর্বল ও একান্ত ক্লান্ত হইয়াছিল। বাসায় বসিয়া কিছুকাল বিশ্রাম করার পর, তবে স্নান, ভোজন ও পানাদি করিয়া শরীর কিঞ্চিৎ সবল ও সুস্থ করিয়া লইলেন ; কিন্তু মন পূৰ্ব্ববৎ উৎকণ্ঠা ** লুলোচন কাৰ্য । কুলই রহিল। এইরূপে মনঃস্থির না হওয়াতে কিছু কাল পর্য্যন্ত স্বতঃ পরতঃ অগ্রজের অনুসন্ধান করিতে ব্যাপৃত রছিলেন, অথচ কৃতকাৰ্য্য হইতে পারিলেন ना' কিছুকাল জ্যেষ্ঠের কোন অনুসন্ধান ও নিদর্শন না পাও" এমন বিষাদিত হইয়াছিলেন যে, এক স্থানে স্থির থাকিতে আর র্তার ইচ্ছা হইল না, ক্রমে র্তাহার মনে বিষয় বৈরাগ্যের উদয় হইল। না হইবে বা কেন ? পিতৃদেবের স্নেহ ও মমতা দেখিলেন। সমবেদী জ্যেষ্ঠ সহোদর, যিনি তিলেকমাত্র কাল কনিষ্ঠের আদর্শনে দুঃখানুভব করিতেন, তিনিও যখন এতদিন পর্য্যন্ত কোন সম্বাদ না লইয়া নিশ্চিন্তভাবে আছেন, তখন আর সংসারাশ্রম বৃথা ভিন্ন মনে অপর ভাবোদয় কি হইবে ? ইতিপূর্বেই রাজকুমারের আত্ম আত্ম অঙ্গাভরণ বিক্রয় দ্বারা বিস্তর অর্থ সংগ্ৰহ করিয়াছিলেন, সেই সংগৃহীত অর্থ এতদিন শ্বেতের কর্তৃত্বাধীনে ছিল, এক্ষণে তিনি নিরুদ্দেশ হওয়াতে সেই সমস্তধন বসন্তের হস্তগত হইল, তিনি বিবেচনা করিয়া দেখিলেন যে, এই অর্থে যাবজ্জীবন চলিবার সম্ভাবনা নাই, তবে কোন প্রকার তৃতীয় অঙ্ক । b Է ব্যবসাবাণিজ্য করিয়া চালাইলে মূলধন বৃদ্ধি পাইবে তখন চলিতে পারে । ফলতঃ এক্ষণে দাদার অন্বেষণেtপলক্ষে অনর্থ দেশপৰ্য্যটন না করিয়া কোন একটি ব্যবসাবলম্বনে দেশ বিদেশে যাওয়া মন্দ নহে। এইরূপ কল্পনা স্থির করিয়া দাস ও পরিচারক ব্রাহ্মণের সহিত শিকারপুর পরিত্যাগ করিলেন । বসন্তকে শিকারপুর পরিত্যাগ করিতে দেখিয়া, তথাকার সমস্ত ভদ্রসন্তানের মনে বিরহবেদন উপস্থিত হইয়াছিল, বিদায়কালে, বসন্ত মৃদুমধুর সান্তনাবাক্যে সকলকেই প্রবোধ দিয়া প্রস্থান করেন। শিকারপুরে তাহারা নূ্যনাধিক দুই বৎসর কাল অধিবাস করিয়াছিলেন ; এই স্বল্পকাল মধ্যেই সমস্ত ভদ্রলোকের প্রিয়পাত্র ও স্নেহভাজন হইয়াছিলেন। মনুষ্যেরই সদগুণই অন্যের মনে স্নেহ সঞ্চারের নিদান । বাস্তবিক কোন ভদ্রপল্লীতে, সৌজন্যশালী সচ্চরিত্র ভদ্রব্যক্তি বাস করিলে সে নিশ্চয়ই সকলের আদর ও শ্রদ্ধার পাত্র হইয় উঠে। বসন্ত যতদিন পর্য্যন্ত শিকারপুর গ্রামে অবস্থিতি করিয়াছিলেন, তাহার মধ্যে একদিন একক্ষণের জন্যেও কাহার সহিত কথান্তর কি বিবাদবিসংবাদ জন্য মনান্তর ঘটে নাই । ჯ`თ মুলোচনা কাব্য । তার এমন কারুণ্যস্বভাব ও সদয়চিত্ত ছিল যে তিনি পরোপকার ভিন্ন কাহার অনিষ্ট চেষ্টায় কদাচ প্রবৃত্ত হইতেন না। সতত লোকের হিতসাধন কাৰ্যেই হস্তী পর্ণ করিতে দেখা যাইত। এবন্দ্রকার সদগুণশালী ব্যক্তি কেনইবা তাবল্লোকের প্রিয়পাত্র না হইবেন। বস্তুতঃ বসন্তের সমাগমে যে, সকলেই প্রফুল্লতা প্রাপ্ত হইয়া থাকে, এইবাক্যের যাথার্থতা শিকারপুরের লোকই অবগত ছিল ; যেহেতু বসন্তবিচ্ছেদে নগর শ্ৰীভ্রষ্টা হইয়া উঠিল, বাস্তবিক বসন্ত বিগমে তাহাদের সকলকারই মন, বিষঃভাব ধারণ করিয়াছিল। মনঃস্থির না হওয়াতে বসন্ত, কতকদিন পর্য্যন্ত নানা স্থানে পরিভ্রমণ করিয়া, অবশেষে যে রাজ সিংহপ্রতাপের রাজধানীরত্বগঞ্জ, তাহার আটক্রোশ অন্তরে উদয়নাল নামক স্থানে উপনীত হইলেন, এই স্থান আপাততঃ যত অপরিচিত বোধ হইতেছে, বাস্তবিক তত নয়, কাৰ্য্যতঃ উদয়নাল বিশেষরূপে জানা হইবে । সুপ্রদ্ধি হাজিপুরের সহিত, উদয়নাল বহুকাল হইতে বাণিজ্যসূত্রে নিবদ্ধছিল । বসন্ত, উদয়নালায় উপস্থিত হইয়া তথাকার আবাসস্থলীর শুঙ্খলা শ্রেণীবদ্ধ, রাজপথের প্রশ তুতাষ অঙ্ক । >) স্ততা, আপণশ্রেণীর পারিপাট্য, জলাশয়ের নিৰ্ম্মলতা ও স্বচ্ছতা, লোকের বিনয় ও শিষ্টাচার এবং বাঙনিষ্ঠা, উপাদেয় খাদ্যদ্রব্যের স্থলভতা, বাণিজ্যের স্বচ্ছলতা লন্দর্শনে এককালে বিমুগ্ধ হইলেন, তৎকালে তিনি দাদার উদ্দেশ প্রাপ্তির বিষয়ে এক প্রকার হতাশ প্রায় হইয়াছিলেন, সুতরাং আর নিরর্থক নানাস্থান পৰ্য্যটন করা বিফল এই ভাবিয়া তথায় উপনিবেশ নিৰ্দ্ধারিত করিলেন। যদিও উদয়নালা একটি সুবিখ্যাত নগর নছে, তথাপি এখানে কি বাসী, কি উপনিবাসী কি পথিক সকলেরই বাসস্থানের বিলক্ষণ সুবিধা আছে, এত ব্যবসায়ী লোকের বাস, যে কি খাদ্য কি ব্যবহার্য্য তাবদ্ধ ব্যই এখানে সুন্দররপ পাওয়া যায়, এখানে আসে না এমন দ্রব্য সংসারে অতি বিরল। এখানে অধি বাসে শরীর অসুস্থ থাকে না, কারণ এখানকার জলবায়ু অতি স্বাস্থ্যকর ; নগরের ঠিক মধ্যস্থল দিয়া একটি ক্ষুদ্রতর গিরিতরঙ্গিনী নাতিখর স্রোতে প্রবাহিত, প্রবাহিনীর উভয় তীরে সমৃদ্ধিশালী ধনীবণিকগণের ইষ্টকনিৰ্ম্মিত স্থধাময় ধবলবৰ্ণ অট্টালিকা সকল শ্রেণীবদ্ধ থাকাতে অপূর্ব শোভায় শোভিত ; এই সকল দেখিয়া মুলোচনা কাব্য । לכן ও লোকের আচার ব্যবহারের কথা শ্রবণ করিয়া প্রোৎ সাহিত চিত্তে, মাসিক ভাটকদানে পণবদ্ধ হইয়া, একটি অত্যুকৃষ্ট ইষ্টকালয়ে অবস্থিতি করিবার নিমিত্ত স্বস্থির করিলেন । এখানে অন্যান্য জাতি অপেক্ষা বাণিজ্য ব্যবসায়ী শ্রেষ্ঠিদিগেরই অধিক বসতি ছিল । বসন্ত এইরূপে মনোরম স্থান ও আবাসস্থান প্রাপ্ত হইয়া জ্যেষ্ঠের বিয়োগদুঃখের অবসান করত অপেক্ষাকৃত সুখসচ্ছন্দে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন। প্রায় মাসাবধি কাল অতীত হইলে, জগদূর্লভ শ্রেণ্ঠিনামক একটি যুবকের সহিত তাহার সাক্ষাৎ হইল। প্রথম সন্দর্শনকাল হইতেই জগদুৰ্লভের প্রতি, বসন্তের আন্তরিক অনুরাগ ও শ্রদ্ধা জন্মিল। দিন কতকের মধ্যেই জগদূর্লভ, বসন্তের সদয় ব্যবহারে তাহার প্রণয়পাশে এরূপ আবদ্ধ হইয়া উঠিলেন যে, প্রচুর ধনবান বণিকের পুত্র হইয়াও পদব্রজে বসন্তের সহিত ভ্রমণে ও বাসস্থানে আগমনে সতত বাধ্য ছিলেন। কিন্তু বসন্তের আচরণ দেখিলে বোধ হইত, তিনি যেন জগদ্ধ লভকে অধিকতর প্রেমাস্পদ জ্ঞান করেন। বন্ধুত্বভাবে উভয়ের সুখে কাল কর্তিত হইতে হইতে দৈববিড়ম্বনায় তৃতীয় অঙ্ক । ৯৩ সহসা জগদ্ধ লভের পিতার আয়ুসকাল পূর্ণ হইল। পিতৃবিয়োগের পর, শ্রেষ্ঠিনন্দন, অতুল ঐশ্বৰ্য্যের একাধিপতি হইলেন। বণিকতনয়, অনৰ্থ কালহরণাপেক্ষা অর্থপ্রয়োগ দ্বারা অর্থলাভের উপায় দেখা শ্ৰেয়ঃ, মনে মনে এই কল্পনা স্থির করিয়া প্রিয়সখার সহিত মন্ত্রণা করিলেন; উভয়ের মতেই বাণিজ্য শ্রেষ্ঠ উপায় বলিয়া নিৰ্দ্ধারিত হইল। ক্রমে ক্রমে আয়োজন আরম্ভ হইল, উভয়েই স্ব স্ব সংস্থাননুসারে পণ্য সংগ্ৰহ ও তরণী যোজনায় প্রবৃত্ত হইলেন । দেশে কি বিদেশে যত উত্তম সামগ্রী প্রাপ্ত হইলেন সমস্তই সংগ্ৰহ করিতে লাগিলেন। বাণিজ্য যাত্রার একটি দিনাবধারণ করিয়া উভয়েই নৌকা সংগ্ৰহ করিলেন। উদয়নালার ঘাটে তরণী সমুদয় উপস্থিত হইলে, উভয় বন্ধুতেই আপন আপন অবধারিত নৌকায় দ্রব্যজাত বোঝাই দিতে আরম্ভ করিলেন । সপ্তাহকাল এইরূপে অতিবাহিত হইলে অষ্টম দিবসে, শুভ দিনে শুভক্ষণে উভয় বন্ধুতে আত্মীয় স্বজনের নিকটে বিদায় লইয়া স্ব স্ব অধিবাস জন্য যে পৃথকৃ অতি রমণীয় নৌকা নিৰ্দ্ধারিত ছিল, সেই নির্দিষ্ট তরণীতে আরোহণপূর্বক, ক্রমে নানা স্থান অতিক্রম পূৰ্ব্বক ృ3) సా8 মুলোচনা কাব্য । হাজিপুরে পৌছছিলেন । বসন্ত নিতান্ত উদারচিত্ত ও সরল স্বভাব ছিলেন। শ্রেষ্ঠিনন্দন, সুকৌশল সম্পন্ন অতি চতুর লোক ছিলেন। হাজিপুরে উপনীত হইয়া তথায় ও তৎসমীপবৰ্ত্তী ধনাঢ্য স্থান সমুদয়ে আপন আপন সংগৃ হীত সামগ্ৰী সমুদয় বিক্রয় আরম্ভ করিলেন। হাজিপু রের পাচক্রোশ উত্তরে, চন্দ্রপ্রভ নাম্নী নগরী, এই নগরী নরকেশরী নামক রাজার রাজধানী, তথায় নব বণিকদ্বয় উপস্থিত হইলেন। পূৰ্ব্বে উক্ত হইয়াছে, ধূৰ্ত্ততায় শ্রেষ্ঠিনন্দন অতি পটু, তিনি নগরে উত্তীর্ণ হইয়াই কিঞ্চিৎ রত্ন সঙ্গে লইয়া ভূপেন্দ্র সমীপে উপনীত হই লেন। জগদ্ধ লভের স্বভাবসিদ্ধ বুদ্ধি চাতুৰ্য্য, শীলতা, বুদ্ধিমত্তা ও সভ্যতাগুণে সৰ্ব্বত্রই আদর প্রাপ্ত হইতেন। তিনি এখানে আসিয়াও রীতিমত উপহারাদি দানে নরপতি সন্নিধানে পরিচিত, সম্মানিত ও আদৃত হইয়া, স্বীয় পণ্য মধ্য হইতে রাজভোগ্য দ্রব্য সমূহ অভিলষিত মূল্যে বিক্রয় করিলেন ; নিজের সংগৃহীত দ্রব্যে সমুদয় সঙ্কলান না হওয়াতে বসন্তের পণ্য দ্রব্যের অধিকাংশ সামগ্ৰী নৃপ সমীপে বিক্রীত হইল ; যে অল্পাংশ দ্রব্য অবশিষ্ট রহিল, তাহা অনধিককাল মধ্যে নাগরিকলোক তৃতীয় অঙ্ক । ನಿ& দ্বারা নিঃশেষিত হইল। এই ব্যবসায়ে উভয় বন্ধুতে প্রচুর লাভবান হইয়া মনের মুখে সেই নগরের শোভাও আঁচার ব্যবহার পরিদর্শন জন্য কিছুকাল তথায় অবস্থিতি করিবার অভিলাষ করিলেন । শ্রেষ্ঠিনন্দন, তথা হইতে আবশ্যকমত পণ্য সংগ্ৰহ করণাভিলাষে প্রিয় সখা বসন্তের গোচর করিলেন। বসন্ত বন্ধুর প্রস্তাবে অনুমোদন করিয়া তথায় কিঞ্চিৎ অধিককাল অবস্থানের মত স্থায়ী বন্দোবস্ত করিলেন ; জগদলভ যে, মধ্যে মধ্যে নগর ভ্রমণে গমন করিতেন, তত্ৰত্য জনগণের প্রিয়পাত্র হইবার মানসে তাহাদের কখন কখন ক্রীড়া কৌতুক ও আমোদ প্রমদে প্রবৃত্ত হইতেন। বসন্ত, বন্ধুর সহিত নগর ভ্রমণে বহির্গত হইয়া তাহার স্বাভাবিকী শোভা দৃষ্ট করিতেন, শ্রেষ্ঠিনন্দন কিরূপে স্বার্থসিদ্ধি হইবে সেই চেষ্টায়, পণ্যদ্রব্য স্থলভমূল্যে সুবিধামত হস্তগত করিবার অভিপ্রায়ে পরিভ্রমণ করিতেন । যাহার যে অবস্থা হউক না কেন, জাতীয় ধৰ্ম্ম অন্তৰ্হিত হইবার নহে। এক দিবস উভয় বন্ধুতে মিলিত হইয়া নগরের পারিপাট্য সন্দর্শনে কৌতুহলচিত্তে আবাসস্থলী পরিত্যাগপূর্বক নিস্ক্রান্ত হই ৯৩ মুলোচন। কাব্য। লেন ; অপূৰ্ব্ব শৃঙ্খলা দেখিতে দেখিতে তথাকার প্রধান আপণশ্রেণীতে সমুপস্থিত হইলেন। তথায় একটি স্থানে কতকগুলি ব্যবসায়ী লোক একত্রীকৃত হইয়া পাশক্রীড়া করিতেছে দেখিয়া, জগদূর্লভ সেই • স্থানেই উপবিষ্ট হইলেন এবং উহাদিগের সহিত ব্যসনাসক্ত হইয়া উঠিলেন, আর রহস্য ও কৌতুক করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। বসন্ত তদ্রুপ নীচাশয়ী লোক ছিলেন না; যদিও তিনি হীনাবস্থায় পতিত হইয়াছিলেন, তথাপি স্বীয় বংশমর্য্যাদা বিস্মৃত হইতে পারেন নাই ; তিনি সমস্ত কাৰ্য্যই বংশমর্য্যাদার প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া করিতেন, এই ব্যাপারটিতেও তাহ প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। শ্রেষ্ঠিনন্দন অবিকৃত মনে তাহাদের সহিত পাশক্রীড়ায় রত হইলেন ; রাজকুমার তথা হইতে প্রস্থান করিলেন, তিনি যেখানে সেখানে সাধারণ লোকের সহিত আলাপ কি উপবিষ্ট হওয়া কিম্বা ক্রীড়াসক্ত হওয়া ভাল বাসিতেন না। এই ক্রীড়াকালে, প্রসঙ্গাধীন জগদূর্লভ বলিয়া উঠিলেন যে, আমার প্রিয়মিত্র বসন্ত, পাশত্ৰীড়াতে যেরূপ পটু, সেরূপ পটুতা অতি অল্প লোকের দেখা যায়; তাহ শুনিয়া ব্যসনাসক্ত ব্যক্তিগণের মধ্যে তৃতীয় অঙ্ক । ፭ጳ একজন বলিয়া উঠিল যে, তাহা এ নগরীতে বলিবার সাধ্য নাই। দূতক্রীড়াতে আমাদের রাজতনয় স্থলোচনার তুল্য আর ত দেখিতে পাই না ; কত দেশের কত বিখ্যাত পাশক্রীড়ায় সুনিপুণ ব্যক্তি আসিয়া ঐ বিষয়ে পরাভব স্বীকার করিয়াছেন তাহ বলিয়া শেষ করা যায় না । তাহারা ভ্রম বশতঃ পরাজিত ব্যক্তিদিগের কারারোধের কথা উল্লেখ করিল না। এরূপ কথা বার্তা চলিতেছে এমন সময়ে আর এক ব্যক্তি কহিল, আহা ! আমাদের নৃপনন্দিনীর কি অপূৰ্বরূপ। তাহাকে দেখিলে দেবকন্যা বলিয়া ভ্রান্তি জন্মে। মহারাজ র্তাহাকে কি কাল লেখা পড়া শিক্ষা দিয়াছিলেন, তাহারই ফলে এত বয়ঃক্রম হইল তথাচ বিবাহ হইল না। নৃপতিও কি তনয়ার কথায় প্রত্যয় করিয়া পাশক্রীড়ায় পরাভবকারী ভিন্ন কন্যাপণ করিবেন না বলিয়া অমনি পণবদ্ধ হইলেন । প্রায় তিন চারি বৎসর হইল, প্রতিজ্ঞারূঢ় হইয়াছেন ও কত দেশ দেশান্তরের রাজা এবং রাজপুত্রগণ আসিয়া খেলা করিতেছেন, কৈ আজিও ত পরিণয় হইল না। যদিচ রাজকুমারীর দৃতিক্রীড়ায় নৈপুণ্যের কথা শ্রবণে মনে মনে করিয়াছিলেন, তথাপি পণ જેbr মুলোচনা কাব্য । বদ্ধ হইয়া অদূরদর্শীতার কার্য্য করিয়াছেন, ইহা, কেনা স্বীকার করিবে ? আহা ! মহারাজের আর সন্তান নাই, কোন ব্যক্তির স্বপ্রসন্ন অদৃষ্ট এবং কে, যে, এই অসামান্য রূপ নিধান কন্যা নিধান লাভ করিয়া এই অতুল ঐশ্বর্য্যের অধিকারী হইবেন, তাহ বলা যায় না। যাহা হউক এখন আর কিছু প্রার্থনা নাই, কন্যার উপযুক্ত পাত্র জুটিলেই ভাল হয় ; হয়ত কোন এক নীচজাতি পাশক্রীড়ায় বিশেষ নৈপুণ্য দেখাইয়া রাজকুমারীকে পরাভব করিয়া পাণিগ্রহণ ও রাজ্যাধিকার করিবে এই আশঙ্কা মাত্র। এই কথা শ্রবণ করিয়া জগদ লভ কহিলেন, আমার নিতান্ত অভিলাষ যে, নৃপনন্দিনীর সহিত একবার দূতক্রীড়ায় রত হই, কিন্তু তাহা কিরূপে সম্পাদিত হইবে বলিতে পার ? বক্তা কহিলেন কেন ? তাহ অনায়াসেই সম্পন্ন হইতে পারে। ক্রীড়াভবনের দ্বারদেশে উপস্থিত হইয়া তথায় যে বাদ্যযন্ত্র আছে, তাহাতে আঘাত করিয়া শব্দ করিবামাত্র অমনি দূত আসিয়া ক্রীড়াস্থানে লইয়া যাইবে । সওদাগরকুমার, এই কথা শ্রবণে মনে মনে আশ্বাসিত হইয়া, সে দিন বাসায় গিয়৷ আর বন্ধুর সহিত পূর্বের ন্যায় আমোদ প্রমোদে রত না তৃতীয অঙ্ক । ఏసి হইয়া আহারাদির পর অমনি শয়ন করিলেন । কিন্তু নিশার অধিক ভাগই নৃপনন্দিনীর সহিত ক্রীড়া করিব, তাহাকে পরাভব করিয়া রাজ্য লাভ করিব, এইরূপ • চিন্তাতেই অতিবাহিত হইল। পরদিন প্রভাত হইবামাত্ৰ শয্যা হইতে গাত্রোথান করিয়া কিঞ্চিৎ সত্বরতার ও ব্যস্ততার সহিত প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিয়া পরিচারকের প্রতি, আহারীয় দ্রব্য সামগ্ৰী শীঘ্র প্রস্তুত করিবার নিমিত্ত আদেশ দিলেন । বসন্ত গত রাত্রি হইতে সখাকে একান্ত ব্যগ্র ও নিতান্ত উন্মন। দেখিয়া কারণ জিজ্ঞাসা করিলে, শ্রেষ্ঠিতনয়, মনের ভাব সঙ্গোপন করিয়া কাপট্য প্রকাশপূর্বক এই মাত্র উত্তর প্রদান করিলেন, রাজবাটতে দূতক্রীড়া করিতে যাইব । বসন্ত নিতান্ত উদার চিত্ত ও সরলান্তঃকরণের লোক ছিলেন, তিনি বন্ধুর ঐ রূপ উত্তর দানেই সন্তুষ্ট হইলেন । বেলা এক প্রহর অতীত হইতে না হইতে আহারাদি সম্পাদনপূর্বক আস্তে ব্যস্তে নরকেশরীরাজদুহি তার ক্রীড়াভবনের দ্বারদেশে উপস্থিত হইলেন, বহিদ্বণ রস্থ বাদ্যযন্ত্রে আঘাত করিবামাত্র, তাহার নিনাদে পুরাভ্যন্তর হইতে দূত আসিয়া সমাদরপূর্বক শ্রেষ্ঠিকুমারকে У о о মুলোচনা কবি। সমভিব্যাহারে করিয়া ক্রীড়াস্থানে লইয়া চলিল, তথায় উপস্থিত হইয়া গৃহসজ্জা ও অন্যান্য উপকরণ এবং শোভা সন্দর্শনে মনের আনন্দে নয়নের চরিতার্থতা সম্পাদন করিলেন । যে সময়ে জগদ লভ ক্রীড়াভবনে উপনীত হইয়াছিলেন, তৎকালে নৃপনন্দিনী স্থলোচনা তথায় উপনীত ছিলেন না । সে সময়ে তিনি আহারার্থ পুরীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়াছিলেন ; একটি পরিচারিকা তদীয় সমীপদেশে উপনীত হইয়া বণিকপুত্রের আগমন বার্তা বিজ্ঞাপন করিল । রাজকুমারী সম্বাদ শুনিবামাত্র অতিমাত্র ব্যগ্রতার সহিত ক্রীড়াস্থানে আগমন করিলেন। প্রথমতঃ বণিকপুত্রের সন্নিধানে প্রতিজ্ঞ বাক্য পাঠ করিলেন। যদি দূতক্রীড়াতে আমায় পরাস্ত করিতে পারেন, তাহা হইলে পিতৃদেবের পণে আমাকেও সমস্ত রাজ্যাধিকার প্রাপ্ত হইবেন ; আর যদি পরাভব হন, তবে আপনাকে যাবজ্জীবন কারাযন্ত্রণ স্বীকার করিতে হইবে, এই প্রতিজ্ঞা বাক্য আপনার অনুমোদিত হইলে, তবে খেলায় প্রবৃত্ত হইবেন, নতুবা গৃহপ্রতিগমন করুন। জগদলভ, নৃপনন্দিনীর অলোকসামান্য রূপলাবণ্য দেখিয়া এরূপ বিভ্রান্তচিত্ত হইয়াছিলেন যে, তৃতীয় অঙ্ক । y oy কারাবাসের আশঙ্কা তাহার অন্তঃকরণে স্থান প্রাপ্ত হইল না । পাঠকবর্গের মনে স্থলোচনার সেই মনোহর রূপের কথা জানিবার নিমিত্ত অবশ্যই কৌতুহল হইতে পারে, এই বিবেচনায় এখানে নৃপনন্দিনীর রূপের স্বরূপ বর্ণনে প্রবৃত্ত হইলাম। প্রথমে স্থলোচনার লোচন দুটির কথা এই, উহার আকৃতি শতদলেরন্যায়, বর্ণও প্রায় সেইরূপ, অতিশয় তেজস্ব ও আকর্ণ বিস্তৃত ; দেখিলেই বোধ হয় যেন, তাহার মুখমণ্ডলে অরুণোদয় হইয়াছে। গগণমণ্ডলে একটিমাত্র অরুণের উদয় দেখিতে পাওয়া যায়,স্থলোচনার মুখমণ্ডলে অরুণযুগল উদিত, উছ কিরূপে সম্ভবপর হইবে ? বাস্তবিক নয়নের আকৃতি ত আর ভানুর ন্যায় নহে, উহার জ্যোতির সহিতই কেবল সাদৃশ্য মাত্র। নয়নের উপরিভাগে অর্থাৎ প্রশস্ত ললাটের নিম্ন দেশে বৃত্তের এক চতুর্থাংশ রেখার আকারের ন্যায়, উভয় দিকে শ্রুতিমূল পৰ্য্যন্ত ধাবিত যুগ্ম ক্র, কিন্তু তাহার শ্রবণ সংযোগ অংশ অবলোকন করিলে ধনুকের শেষ ভাগ বলিয়া প্রতীয়মান হয়। কৰ্ণ দৃষ্টিগোচর নহে, তাহ হুবর্ণ নিৰ্ম্মিত কর্ণে ও তাহারই আভরণে আবৃত, সুতরাং তাহার আর কি বর্ণন Ꮌ8 yoశి মুলোচনা কাব্য। করিব, সোণার কানের কাছে কি আর সোণার কানের বর্ণন ভাল লাগে। নাসিকার গঠন স্থডোল, নাতি দীর্ঘ নাতি হ্রস্ব ; ওষ্ঠাধরের বর্ণ যেন গোলাপ ফুলের ন্যায় গোলাপী, তাহাতে আবার তাম্বুল চর্বণে চৰ্ব্বিত হও” য়াতে অপূর্ব শোভায় শোভিত, দেখিলেই বোধ হয় যেন, কোন সুনিপুণ চিত্রকর অতি সাবধানে মিনা দিয়া শেঠ, করিয়া সংযোগ স্থলের উভয় পাশ্ব কতকদূর ব্যাপিয়া গাঢ়তর লোহিত রঙে রঞ্জিত করিয়াছে ; দন্ত গুলি কিঞ্চিৎ বৃহদাকারের বটে, কিন্তু অত্যুচ্চ নহে, কেবল স্বভাবেতে ঢাকা পড়ে না, তা না পড়ক উহাতে অতি আশ্চৰ্য্য শোভা, সৰ্ব্বদাই যেন হাস্য করিতেছেন এরূপ অনুভূত হয়। পাঠকগণের মধ্যে কি কেহ হাসি হাসি মুখ ভাল বাসেন না ? গণ্ডস্থল উজ্জ্বল গৌরবর্ণের উপরে কিঞ্চিৎ লোহিতের আভা বিশিষ্ট । গ্রীবাদেশ উন্নত ও মাংসল ; পশ্চাদ্ভাগ হইতে আলোকিত হইলে বোধ হয় যেন, স্কন্ধদেশ হইতে মস্তক পৰ্য্যন্ত ক্রমে সূক্ষভাবে মাংসেরই স্তর সাজান রহিয়াছে, তাহাতে অস্থির সম্পর্ক আছে এরূপ উপলব্ধি হয় না। একে ত বিস্তুত বক্ষঃস্থলই অনুপম শোভার আধার, তাহাতে তৃতীয় অঙ্ক । yთvb আবার যৌবনের প্রত্যক্ষ ফল স্বরূপ, ফলযুগলের অব স্থানে রসজ্ঞ ব্যক্তিমাত্রেরই মনোহারিণী হইয়াছেন। ঐ ফল যুগলের নিৰ্ম্মাণ পরিপাটী অতি চমৎকার, তাহ -প্রণয়ী ব্যক্তির করকোষের নিরাপদ রত্ন। উদরটি হৃদয়াপেক্ষা নত কি উন্নত নহে ; সমভাবেই অবস্থিত। মধ্যদেশ অতীব ক্ষীণ, বাস্তবিক প্রকৃত প্রস্তাবে অত ক্ষীণ হওয়া সম্ভব নহে; বোধ হয় কেবল যৌবন প্রভাবে নিতম্বের গুরুতা নিবন্ধন কটিদেশের ওরূপ ক্ষীণত প্রতীয়মান হইতেছে। বাহুযুগল, বাহুমূল হইতে ক্রমশঃ সূক্ষ হইয়া করপদ্ম পৰ্য্যন্ত লম্বমান ও সংলগ্ন হওয়াতে, উহ! ঐ কমল যুগলেরই মৃণাল বলিয়া বোধ হইতেছে, কিন্তু উহাকে নিষ্কণ্টক বলিয়া স্বীকার করিতে হইবে । উরুযুগল ও নিতম্বের সংযোজিত স্থানটি এরূপ ললিত ও নধর যে মৃদুমন্দ গমনেও চাঞ্চল্য প্রতীত হয়, উহ করীকর হইতেও সুগঠিত, যেখানে মৃত্তিক সংযোগ, অর্থাৎ পাদপদ্ম, তাহার অবয়ব সাদৃশ্য পক্ষীবিশেষে পুচ্ছের সহিত হইতে পারে, কিন্তু কষ্টে স্বষ্টে । এবম্প কার স্বগঠিত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তাহাতে আবার চঞ্চর চিকুরগুচ্ছ আলুলায়িতাবস্থায় পাদদেশ স্পর্শ করে। yog মুলোচনা কাব্য। যৎকালে স্থলোচনা মুক্তকেশী হইয়া দণ্ডায়মান থাকেন, ' সে সময়ে তাহার সেই কাচা হরিদ্রার ন্যায় বর্ণতে যেন মেঘের কোলে সৌদামিনী সদৃশ শোভমান হইয় থাকেন। শ্রেণ্ঠিনন্দন, স্বরসিক বটেন, তিনি কেবল । রূপসাগরে নিমগ্ন হইয়া দূতক্রীড়ায় পরাজিত হইয়া কারাবাসে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন । কিয়ৎকালান্তে মোহ নিরাকৃত হইল, তখন জগদ্দুল্লভ হায়! আমি কি করিলাম, হ ! আমার জীবনে ধিক্‌, আমি বৃথা দেহু ধারণ করিয়া এই অবনিমণ্ডলে আসিয়াছিলাম। আমি না পিতা মাতার কার্য্য করিলাম, না স্বদেশের হিতসাধন করিতে পারিলাম, না আত্মীয়স্বজনেরমনান্দ বৰ্দ্ধন করিতে পারিলাম। আহা ! আমার ন্যায় হতভাগ্য আর কে আছে আমাকে যাবজ্জীবনের নিমিত্ত এই কারাবাসের ক্লেশ সহ্য করিয়া থাকিতে হইবে ? বাস্তবিক তৎকালে র্তাহার চৈতন্যোদয় হওয়াতে, তিনি একবারে অধৈৰ্য্য হইয়া নানা প্রকার বিলাপ ও পরিতাপ করত রোদন করিতে লাগিলেন। র্তাহার সেই হৃদয়বিদারক রোদন ধ্বনি শ্রবণে, নির্দয় কারারক্ষকগণের অন্তঃকরণে করুণা সঞ্চার হইল না ; তাহারা তাহার ङ्घउँौझ डाक । ১০৫ অশ্রুপাতে শ্রতিপাত না করিয়া দৃঢ়রূপে নিগড়বদ্ধ কৃণানন্তর কারাগৃহে অবরুদ্ধ করিয়া রাখিল । জগদ্দু লভ, সে সময়ে এরূপ নিরুপায় হইয়াছিলেন যে, বন্ধুর নিকটে সম্বাদ প্রদান করিবার নিমিত্ত একটি লোক কি একটু অবকাশও প্রাপ্ত হইলেন না । এদিকে চারি পাঁচ দিন অতীত হইল তথাচ বন্ধু বাসায় প্রত্যাগত হইলেন না দেখিয়া, বসন্ত বিকলচিত্তে তদীয় অন্বেষণে প্রবৃত্ত হইলেন। নানাস্থানে অনুসন্ধান করিয়া বন্ধুর সহিত সাক্ষাৎ না হওয়াতে নিতান্ত চিন্তিত হইয়া মনে মনে আক্ষেপ করিয়া বিধাতার প্রতি এইরূপ কহিতে লাগিলেন। হা দগ্ধবিধে ! তোমার কি কিছু তেই মনের অাশা মিটে না ; এত যে দুঃখ দিতেছ তথাপি মনের অভিলাষ পূর্ণ হইতেছেন ; ইতিপূর্বে জ্যেষ্ঠের নিরুদ্দেশ করিয়া কিয়ৎকাল দুঃখসলিলে নিমগ্ন করিয়া রাখিলে ? পরে কত কষ্টে ও কত যত্নে একটি বন্ধু প্রাপ্ত হইয় তাহার সহিত মিলিত হইয়া বিগতদুঃখে জলাঞ্জলি দিয়া একপ্রকার কষ্টকল্পনায় কালতিপাত করিতেছিলাম, তাহাও কি তোমার অসহ্য বোধ হয় ? এততেও কি তোমার মনস্তুষ্টি জন্মে নাই ? এই মুলোচন। কাব্য । نه (s কি তোমার বিধান যে আমায় কেবল দুঃখ পরম্পরা ভোগ করিয়া জীবন শেষ করিতে হইবে ? আমার এত যে দুঃখের অবস্থ, ইহাও কি তদীয় সমীপে হুখের অবস্থা বলিয়া পরিগণিত ? এবারে যে একেবারে অপরিণ হরণীয় দুঃখসলিলে নিপতিত করিলে ? যাহাহক্‌ বুঝিলাম যে, আমার শরীরপরিগ্রহ সৰ্ব্বথা দুঃখভোগের নিমিত্তই হইয়াছে; যদি তাহাই না ঘটিবে তবে আমি বৃক্ষ অবলম্বন করি, তাহাই কেন ভগ্নশাখ হইয় উঠে ? অামার কোন কাৰ্য্যই পরিণামে দুঃখ ভিন্ন স্থথোৎপত্তি হইতেছে না ইহারই বা কারণ কি ? ফলতঃ আমি নিতান্ত হতভাগ্য, আমার এই দুর্ঘটনার কথা লোকে শুনিয়াইব আমাকে কি বলিবে ? বন্ধুকে হারাইয়া উদয়নালায় কোন মুখে গমন করিব ? এইরূপ নানাকথার আলোচন ও চিন্তনের পর লোক পরম্পরায় শ্রীতিগোচর হইল যে, রাজনন্দিনী স্থলোচনার সহিত দৃতিক্রীড়া করিতে গিয়া, শ্রেষ্ঠিনন্দন পরাজিত ও যাবজ্জীবনের নিমিত্ত কারাবরুদ্ধ হইয়াছেন। এই বাক্য শুনিয়া বসন্তের হতাশপ্রায় অন্তঃকরণে কথঞ্চিৎ আশার সঞ্চার হইল ; তিনি তৎকালে অনন্যমন ও অনন্যকৰ্ম্ম হইয়া ड्रउँौश श्रक । Σ ο Α বন্ধুর কারামোচনের উপায় উদ্ভাবনে তৎপর হইলেন। যাহার নিকটে প্রস্তাব করেন সেই বলে যে, পাশক্রীড়া ভিন্ন অন্য উপলক্ষে নৃপছুহিতার সহিত সাক্ষাৎ হইবার সম্ভাবনা নাই ; কিন্তু তদুপলক্ষে তথায় গমন করিলে আর মুক্তিলাভ করা কঠিন। বলিতে কি কতদেশের কতশত রাজকুমার, কতশত শ্রেষ্ঠিনন্দন, কতশত ধনী লোকের জীবন সৰ্ব্বস্বধন, কন্যার রূপলাবণ্যের কথা শুনিয়া বিমুগ্ধ হইয়া যাবজ্জীবনের জন্যে বন্ধন দশায় কালক্ষেপণ করিতেছেন। আহা ! তাহদের দুরবস্থার বর্ণন করিয়া শেষ করা যায় না। তবে যদি কেহ দৃতিক্রীড়ায় বিশেষ পারদর্শী থাকেন তবে তাহারই তথায় গমন করা কর্তব্য ; নতুবা সাধে সাধে কারাবাসে জীবনশেষ প্রয়োজন কি ? যিনি রাজকুমারীকে খেলায় পরাস্ত করিবেন, তিনি এই অসামান্য অতুল ঐশ্বৰ্য্যের সহিত রাজ্যাধিকার ও সেই লোকাতীত রূপলাবণ্য সম্পন্ন৷ অসূৰ্য্যম্পশ্যরূপ কন্যারত্নকে লাভ করিয়া জীবনের সার্থ কতা সম্পাদন করিতে পারেন । বসন্ত, এইরূপে লোক পরম্পরায় মিত্রের কারাবাসেরও বীর কেশরীতনয়ার দূতক্রীড়ার এবং অলৌকিক দুলোচনা কাব্য । بر o (د রূপলাবণ্যের কথা শ্রবণ করিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন ; কি আশ্চৰ্য্য ! বন্ধু আমাকে গোপন করিয়া রাজ্যাধিকার আর স্ত্রীরত্বলাভে লোলুপ হইয়া দৈব বিড়ম্বনায় অবশেষে বিদেশে বিপন্ন হইয়াছেন ; বিধাতার বিচিত্র লীলা ! লোভের কি অপরিসীম ক্ষমতা ! সংসারসাগরের তরঙ্গমালায় কে কখন পতিত হয় তাহা কে বলিতে পারে ? অাশার আশ্বাসনী শক্তির ইয়ত্বা নাই । বন্ধু বুঝি মনে মনে এই আশঙ্কা করিয়া থাকিবেন, যে, বঞ্চিত হইতে হয়। আমি কি এমনই পাষণ্ড ! আমি কি এমন মূঢ় ! আমি কি এমন কাণ্ডজ্ঞান বিহীন যে, মিত্রের পরিভোগের বস্তুতে তাছাকে হতাশ করিয়া আপন স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করিব ; যাহাহক্‌ মনুষ্যের মনের গতি অতি বিচিত্র। এক্ষণে আমার কর্তব্য কি ? বন্ধুর অযথাচরণে অন্তঃকরণে বিরক্ত হইয়া কারা বিমোচনের চেষ্টায় বিরত থাকি, না যথা সাধ্য যত্ন ও চেষ্টা করি। নিতান্ত পুরুষাৰ্থ বিহীন হইয়া বন্ধুকে হারাইয়৷ প্রত্যাগত হওয়াপেক্ষা, উদ্যোগী হইয়া কৃতকাৰ্য্য হইতে পারি ভালই, নচেৎ উভয়েরই এক দশ ঘটিবে। যদি আমি তৃতীয় অঙ্ক । פסל বন্ধুকে বিদেশে কারাবাসে রাখিয়া উদয়নালায় প্রতিগমন কুরি, তাহা হইলে লোকের নিকট কলঙ্কিত ও অপদস্থ হইতে হইবে। আমার এই অমানুষোচিত অসদাচারে অসার ও অপদার্থ জ্ঞান করিয়া মনে মনে অশ্রদ্ধা করিবে তাহার আর কোন সংশয় নাই । অতএব বন্ধুর কারামুক্তির জন্য সবিশেষ যত্ন ও চেষ্টা করা সৰ্ব্বতোভাবে কর্তব্য। যদি তাহাতে অকৃতকাৰ্য্য হই তাহাও শ্রেয়ঃ ; কারণ তাহাতেত আর লোকসমাজে অযশঃ সম্ভাবনা থাকিবে না, দূতক্রীড়ায় পরাজিত হইলে বন্ধুসহবাসে কারাবাসে জীবন শেষকরাও মনুষ্যত্বের কার্য্য। মনে মনে এইরূপ প্রতিজ্ঞারূঢ় হইয়া, যথাকালে স্নান ভোজনাদি পরিসমাপনের পর, ভূপেন্দ্রকুমারীর সহিত দৃতিক্রীড়া করণভিলাষে বাসস্থান পরিত্যাগপূর্বক ক্রীড়ালয়ের বহিঃদ্বারস্থ বাদ্যযন্ত্রের সন্নিহিত হইয়া, সজোরে তাহাতে আঘাত করিলে, ঠন ঠন শব্দে তাহ বাজিয়া উঠিল । ঘণ্টার গভীর নিনাদে রাজকুমারীর আদেশে, একটি অন্তঃপুরচারি সহসা তথায় উপনীত হইয়া কহিল, মহাশয়! আপনি কে ? কি নিমিত্তইবা বাদ্যযন্ত্রে আঘাত করিতেছেন, অভিপ্রায় ব্যক্ত হইলে উপযুক্ত বিধান হইবে। Ꮌ☾ ソソo মুলোচন। কাৰ্য । বসন্ত ভূত্যের বাক্যের শেষ হইতে না হইতেই কহিলেন, ওহে চর ! তোমাদের রাজকুমারী এক্ষণে কোথায়ু আছেন, আমি তাহার সহিত দূতক্রীড়া করিব বলিয়া আগমূন করিয়াছি; যদি অগোঁণে অভীষ্ট সিদ্ধি হয় তবেই এই ক্রীড়াভবনে প্রবেশ করি, নতুবা স্বস্থানে গমন করি । ভূত্য কহিল না মহাশয়! আপনাকে আর ফিরে যাইতে হইবে না। কুমারী, হয়ত এতক্ষণ ক্রীড়াস্থানে উপস্থিত হইয়া আপনকার আগমন প্রতীক্ষা করিতেছেন, আপনি অবিলম্বে আমার সঙ্গে আসুন। ভূত্যের কথায় বসন্ত তদীয় অনুবর্তী হইয়া, স্থলোচনার লোচনপথে উদিত হইলেন। স্থলোচনা ও বসন্তের নয়ন মিলনে একটি অনিৰ্ব্বচনীয় ভাবোদয় হইল, যেমন গ্রীষ্মের সময়ে চাতকগণ নব ঘন সন্দর্শনে, পতিব্রত রাম পতি দর্শনে, দরিদ্রব্যক্তি প্রচুর ধনে, উল্লাসিত হয় ; তদ্রুপ উভয়ের মনে আনন্দ জন্মিয়াছিল, কিন্তু তাহ পাছে প্রকাশ পায়, সেই ভয়েই অতি সাবধানে ভাব গোপন করিয়া রাখিয়াছিলেন । সুলোচনা মনে করিলেন, কি আশ্চৰ্য্য ! এত দিন ত আমার মন এমন বিচল হয় নাই। একাল পর্য্যন্ত কত তৃতীয় অঙ্ক | yyy রাজকুমার, কত শ্রেষ্ঠিকুমার, কত ধনী মানী সভ্রান্তলোকের সন্তান আমার সহিত পাশক্রীড়া করণাভিলাষে আসিয়াছিল, তাহাদের মধ্যেও ত রূপবান ও গুণবান • পুরুষ ছিল ; কেহই আমার মন হরণ করিতে সমর্থ হয় নাই। অদ্য কি কারণে আগন্তকের দৃষ্টিশরে বিদ্ধ হইলাম বলিতে পারি না । ইহঁর অসামান্য রূপলাবণ্য দর্শন করিয়া অবধি আমার বোধ হইতেছে বুঝি সংসারে এরূপ রূপ নিধান আর নাই। বিধাতা বুঝি, আমার প্রতিজ্ঞাভার বিমোচনের আর উপায় দেখিতে না পাইয়া অনঙ্গদেবকে অঙ্গবিশিষ্ট করিয়া আমার সহিত দ্যুতক্রীড়া করিতে প্রেরণ করিয়াছেন; নতুবা নরদেহে এরূপ রূপ মাধুরী কি সম্ভবে ? যাহা হউক এক্ষণে পরিচয় জিজ্ঞাসার প্রয়োজন নাই, ক্রীড়ায় প্রবৃত্ত হইলেই সকল সংশয় আপনীত হইবে । এইরূপে মনে মনে পরস্পর রূপের প্রশংসা করিয়া কিয়ৎকাল পর্য্যন্ত উভয়েই উভয়ের সৌন্দর্য্য সন্দর্শন করিলেন । অনন্তর প্রকৃতকাৰ্য্যারম্ভ হইল, একাদিক্রমে সপ্তাহকাল ক্রীড়া চলিল ; কেবল নিতান্ত আবশ্যকীয় স্নান ভোজন প্রভৃতি নিত্য কৰ্ম্মে কএক ঘণ্টাকাল অতিবাহিত ΣΥ & মুলোচনা কার্য । হইল, অবশিষ্ট সময় কেবল ব্যসনাসক্তিতেই যাপিত হইত। কেমন বিধাতার নির্বন্ধ কেহ কাহাকে উপযু পরি তিনবার পরাস্ত করিতে পারিলেন না । পরিশেষে • সপ্তম দিবসে সায়ংকাল উপস্থিত, দক্ষিণপথ হইতে মৃদুমন্দ সমীরণ প্রবাহিত হইতে লাগিল, অংশুমালী তিমির রাশিতে প্রবেশ করিবার উপক্রম করিতেছেন, এমন সময় কুমার কহিলেন, রাজনন্দিনি ! দেখ, তুমি দুবার পরাজিত হইয়াছ এবারেও বুঝি পরাজয় হও, এই কথা বলিতে না বলিতে স্থলোচনা পরাভূত হইয়া লজ্জাবনত বদনে কহিলেন, প্রাণনাথ! এতদিনে আমার দৃতিক্রীড়ার ও প্রতিজ্ঞার সার্থক হইল। পাশ্ববর্তিনী পরিচারিকার অমনি সানন্দ মনে রাজমহিষী সন্নিধানে এই শুভ সম্বাদ প্রদান করিলেন। রাজ্ঞী আবার এই সম্বাদ নৃপতির গোচর করিলেন ; রাজা রাণী উভয়ের মনই সন্দেহ দোলায় দুলিতে লাগিল । তাহাদের মনে কত আশঙ্কাই উপস্থিত হইতে লাগিল, একবার মনে করিলেন, হয়ত কোন নীচবংশীয় অতি কুরূপ নিগুণব্যক্তি কর্তৃক পরাজিত হইয়া, কুমারী লজ্জায় আর আমাদের তৃতীয় অঙ্ক । Σ Σ Φ নিকটে আসিতে পারিতেছেন না। কখন বা মনে করি তেছেন যে, কোন অপূর্ব মাধুরীসম্ভার কুমারীর প্রতিজ্ঞাভার উন্মোচন করিয়াছেন এইরূপ চিন্তাতে সে দিন গত হইল, পরদিন দুহিতার নিকট জিত ব্যক্তির পরিচয় গ্রহণেচ্ছ হইয়া পরিচারিকা দ্বারা তাহাকে আহ্বান করিলেন । স্থলোচনা বসন্তের রূপে মোহিত হইয়া ও মনোবৃত্তি পরীক্ষার জন্য একান্তমনে তাহার সহিত আলাপ পরিচয় আরম্ভ করিলেন। বসন্তও কৌশলে রাজকন্যার মনোগত ভাব জানিতে লাগিলেন । ফলতঃ সৰ্ব্বদা সদালাপ ও সৎকথার প্রসঙ্গ করিয়া মনের সুখে কালহরণ করিতে লাগিলেন । সুলোচনা বসন্তের সমীপে বসিয়া দাম্পত্যপ্রণয়ের আলোচনা করিতেছেন এমন সময়ে একটি পরিচারিকা আসিয়া রাজকুমারীকে সম্বোধন করিয়া কহিল, ও মা স্থলোচনা ! রাজমহিষী তোমাকে একবার তদীয় সন্নিধানে যাইবার নিমিত্ত আহবান করিয়াছেন, একটু সত্বরতায় অন্তঃপুরে যাইতে হইবে; স্থলোচনা ঐকথা শুনিয়া মনে মনে বিরক্ত হইয়া, অগত্য ঘাইতে স্বীকার করিয়া দাসীকে বিদায় দিলেন ; কিন্তু তিনি উভয় সঙ্কটে পতিত ᎼᏱ8 মুলোচন। কাব্য । হইয়াছিলেন, একদিকে মাতৃ আজ্ঞা অলঙ্ঘনীয়, অন্যদিকে প্রাণাধিক প্রিয়তম বসন্তকে পরিত্যাগ করিয়া স্থানান্তরে গমন করা ; কি করিবেন, দুই দিকই বজায় রাখা আবশ্যক, সুতরাং অনেক ভাবনাচিন্তার পরে মাতৃসন্নিধানে গমন করিলেন ; ফলতঃ র্তাহার মন বসন্তের নিকটেই রহিল। - নরাধিপদুহিতা সৃহিত স্থলোচনা, জননী সন্নিধানে উপনীত হইয়া, অভিবাদনপূর্বক কহিলেন, মাতঃ! আমায় কিজন্য আহবান করিয়াছেন ; আদেশ করুন । রাজমহিষী কুমুদিনী, কএক দিনের পরে প্রিয়তম৷ কন্যাকে দেখিতে পাইয়া, তৃষিত নেত্রে আপাদমস্তকের প্রতি বারম্বার দৃষ্টিপাত করত কহিলেন ; হা মা স্থলোচনা ! এই অবধি কি আমাদের স্নেহ, দয়া, ও মমতা বিস্তৃত হইলে ? স্থলোচনা মাতৃ মুখবিনিঃস্থত রসাভাষ শ্রবণে লজ্জাবনত বদনে এই উত্তর করিলেন, জননি । আমি ত আবহমানকাল প্রচলিত প্রথারই অনুবর্তিনী হইয়া চলিতেছি; ইহাতে কি আপনার অযথাচরণ মনে করিয়া, আমায় দোষী সাব্যস্ত করিয়াছেন ? নৃপগেহিনী কহিলেন, না মা ! তুমি মনে মনে তৃতীয় অঙ্ক । y",& ক্ষুণ্ণ হইওনা, কৈ কিছু অন্যায় ব্যবহার কর নাই তবে কি ত জান, তুমিই একমাত্র কন্যা, আর দ্বিতীয় সন্তান নাই, সেই জন্য স্নেহপ্রবণ হৃদয়ে সৰ্ব্বদা তোমায় নিকটে রাখিতে অভিলাষ, সন্দর্শন লালসা বলবতী থাকাতেই এই বাক্য কহিলাম, বাস্তবিক তুমি কোন প্রকার ধৃষ্টত। কি অশিষ্টতা প্রকাশ করিয়া আমাদিগের বিরাগ ভাজন হও নাই। হ্যা গো মা স্থলোচনা ! যিনি তোমায় দৃতিক্রীড়ায় পরাভব করিয়াছেন, তুমি কি তাহার স্বভাব ও পরিচয় জানিতে পারিয়াছ ? আজি তোমায় নিতান্ত বিমনা ও উৎকণ্ঠাকুল বোধ হইতেছে কেন ? তোমার অবস্থা দৃষ্টে কত প্রকার আশঙ্কা মনে উদিত হইতেছে বলিয়া, এই সমুদয় কথা জিজ্ঞাসা করিতেছি। জননীর মনোগত অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া, স্থলোচনা জননীকে বলিলেন মাতঃ ! সে বিষয়ে কোন চিন্তা করিতে হইবে না, আচার ব্যবহার রীতি নীতি দ্বারা যত দূর পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে তাহাতে ত বিধাতার প্রতিকূলতা প্রকাশ পায় নাই। তবে জাতি কি কুলশীলের কথায় আমি বিশেষজ্ঞ নই বলিয়া তৎ প্রসঙ্গ করি নাই। তদ্বিষয় কোন অভিজ্ঞ কুলজ্ঞ ব্যক্তি ১১৬ মুলোচনা কাব্য । দ্বারা সবিশেষ জানিতে পারিবেন । বসন্ত সম্বন্ধীয় এবম্বিধ কথোপথন হইতেছে ইতিমধ্যে রাজ্ঞী রাজকুমারীকে কহিলেন, স্থলোচনা আমি সেই জেতা পুরুষকে একবার দেখিবার অভিলাষ করি, কিরূপে তাহ নিৰ্বাহ হইবে বলিতে পার ? সুলোচনা কহিলেন কেন ? তিনি ত আপনাদের সন্তান তুল্য, ইচ্ছা করিলেই দেখিতে পারেন। কুমুদিনী স্বীয় পতিপরায়ণতাগুণে বশবর্ভিনী হইয়া, মহারাজের নিকট এই প্রস্তাব করিলেন, তিনি তাহাতে সম্মতি দান করিলেন, তদনুসারে ভাবী জামাতা ও তনয়াকে নিমন্ত্ৰণ করিয়া অন্তঃপুরে আনয়ন করিবার মনস্থ করিলেন; রীতিমত অত্যুৎকৃষ্ট উপাদেয় দেবদুর্লভ খাদ্য সামগ্ৰী সমুদয় সংগ্ৰহ করিয়া, কন্যা ও বসন্তকে আহবান করিলেন। বসন্ত যথাকালে রাজমহিষীর বাসস্থানে উপস্থিত হইয়া, তাহাকে মাতৃ সম্বোধনপূর্বক গুরুজনযোগ্য সম্ভাষণ প্রণামাদি শীলতা ও শিষ্টত। ব্যবহারে পরিতুষ্ট এবং ভোজন পানাদি পরিসমাপণ করিয়া বিদায় গ্রহণপূর্বক পূৰ্ব্বস্থানে প্রত্যাগত হইলেন। রাজগৃহিণী কুমুদিনী, বসন্তের অমর বিনিন্দিত রূপলাবণ্য দর্শনে ও বিনয়পূর্ণ সুমধুর বাক্য শ্রবণে অতীব তৃতীয় অঙ্ক । ר נג প্রীতি প্রাপ্ত হইলেন, আর উপযুক্ত পাত্রের সমবেশ হওয়াতে বিধাতাকে শত শত ধন্যবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন। মহারাজ নরকেশরী, বিগত বিবরণ স্বীয় ‘প্রণয়িণীর প্রমুখাৎ শ্রবণ করিয়া মনে মনে আন্দোলন করিতে লাগিলেন যে, পাত্রের যেরূপ রূপগুণের ও স্বজনতার কথা শুনিলাম, ইহাতে নিশ্চয়ই কোন সদ্বংশজাত বলিয়া অনুভূত হইতেছে। যাহা হউক একটি শুভক্ষণ স্থির করিয়ার্তাহাকে রাজসভায় আনাইয়া বংশের পরিচয় জানিয়া মনের আকুলতা নষ্ট করিয়া জ্যোতির্বিদ পণ্ডিত দ্বারা বৈবাহিক লগ্ন স্থির করিয়া শুভদিনে শুভলগ্নে শুভকৰ্ম্ম সম্পাদন পূর্বক প্রতিজ্ঞাভার হইতে মুক্তিলাভ করিব । এইরূপ কল্পনার পরে মহারাজ নরকেশরী, শুভক্ষণে দূত দ্বারা রাজকুমারকে রাজসভায় আনাইয় তাহার জাতি ও কুলশীলের পরিচয় গ্রহণ করিলেন। বসন্ত স্বকীয় পরিচয় প্রদানে উদ্যত হইয়া বিগত দুঃখকাহিনী স্মৃতিপথে উদিত হওয়াতে অবিরলধারায় অশ্রু বিসর্জন করিতে লাগিলেন। রাজা নরকেশরী, বসন্তের এই শোচনীয় অবস্থা সন্দর্শনে চমৎকৃত ও বিস্মৃত হইয়া >や ᎼᎼᏏ মুলোচমা কাব্য। শোকের কারণ জানিবার নিমিত্ত পূৰ্ব্বাপেক্ষা অধিকতর অধৈৰ্য্য হইয়া ব্যগ্রতা প্রকাশ করিতে লাগিলেন। বসন্ত, ভূপতির আগ্রহাতিশয় ও নিৰ্ব্বন্ধাতিশয় দর্শনে নিতান্ত অনায়ত্ব হইলেও কষ্টেস্বষ্টে মনের আবেগ সংবরণ• • পূর্বক গদগদ বচনে আত্মবৃত্তান্ত বর্ণনে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি স্বয়ং যতদূর জানিতেন ও লোকমুখে পূৰ্ব্বকথা যাহা কিছু শ্রুতিগোচর করিয়াছিলেন, আমূল সমুদয় কথা বলিতে লাগিলেন। সেই হৃদয়বিদারক বিবরণ শ্রবণ করিয়া নরপতি নরকেশরী যুগপৎ হর্ষ ও বিষাদে আক্রান্ত হইলেন, মনে মনে আপনাকে সৌভাগ্যশালী বলিয়া ধন্য । বোধ করিতে লাগিলেন। মহারাজের চিত্তে অপূর্ব আনন্দরস সঞ্চারিত হইয়াছিল, যেমন চির রুগ্নব্যক্তি সহাস অমৃতপানে আরোগ্যলাভ করিয়া অনিৰ্ব্বচনীয় আনন্দরসে আপ্নত হয় মহারাজের তাহাই ঘটিয়াছিল ; কারণ র্তাহার মনে এরূপ সংস্কার জন্মিয় ছিল যে, হয়ত এই পণবদ্ধ হওয়াতে যথাযোগ্য পাত্র সঙ্ঘটন হইবে না। এইরূপে আকাঙ্ক্ষার অতিরিক্ত ফল লাভ হওয়াতে অপার আনন্দনীরে নিক্ষিপ্ত হইলেন। তিনি শুভ সম্বাদ বীরজিৎসিংহের নিকটে প্রেরণে উদ্যত হইলে क्लजैौष्ठ ठाझ । SXసి বসন্ত কহিলেন, আমি যে জীবিত আছি, এ সংবাদ পিতা কি ভ্ৰাতৃ সন্নিধানে জানাইতেও কুষ্ঠিত, সুতরাং আমার বিবাহ সম্বাদ আমার আত্মীয় স্বজনকে দেওয়া উচিত • নহে। নরকেশরী প্রথমতঃ বীরজিৎসিংহের স্ত্ৰৈণত নিবন্ধন যথোচিত ভৎসনা করিয়া পরিশেষে কহিলেন, পাছে তোমার মনঃপীড়া উপস্থিত হয়, এই মনে করিয়া নসীপুরে সংবাদ প্রেরণ করিতে অভিলাষী হইয়াছিলাম, নতুবা যে পিতা স্ত্রীর বাধ্য হইয়া সন্তানের শিরশ্চেদনে আদেশ করেন, তাহার কি মুখাবলোকন করিতে আছে ? না র্তাহার নামোচ্চারণ করিতে আছে ? বসন্তের বাক্যে, সমাচার প্রদানে বিরত হইয়া নরকেশরী বিবাহোদ্যোগে রত হইলেন। সেই সময়ে বসন্ত অতি বিনীতভাবে কহিলেন মহারাজ ! আমার একটি অভিলাষ আছে তাহা আপনাকে পরিপূরণ করিতে হইবে। নরপতি হাস্যাননে উত্তর করিলেন, আর আমায় অনুরোধ করিতেছ কেন ? এই সমুদয় ঐশ্বৰ্য্য ও রাজকাৰ্য্য, সকলি ত তোমার অধীন, আমি সমস্তই তোমাতে অপর্ণ করিয়াছি। এক্ষণে যে বিষয়ে যাহা কর্তব্য বলিয়া বিবেচনা করিবে তাহাতেই অকুষ্ঠিত চিত্তে ১২০ মুলোচনা কাব্য । সম্পাদন করিতে পারিবে। তবে ইচ্ছা হইলে, যেমন অমাত্যবর্গের সহিত মন্ত্রণা করিবে, তদ্রুপ আমাকে পরামর্শ জিজ্ঞাসা করিতে পারিবে। রাজকুমার, নরে: ন্দ্রের কথায় নিতান্ত ক্ষুঃমনে কৃতাঞ্জলী হইয়া নীতিগর্ভ. . বচনে এই উত্তর দান করিলেন, মহারাজ ! আপনার এই গুরুভার কি মাদৃশ চপলবুদ্ধি যুবকের বহন করা সাধ্য ? আমি আপনকার অনুগ্রহের ও স্নেহের পাত্র, সন্তান সদৃশ আজ্ঞানুবর্তী, যখন যাহা আদেশ করিবেন, সাধ্যানুসারে তৎক্ষণাৎ তাহ প্রতিপালনে যত্নবান হইব। নরকেশরী বসন্তের বিনয়পূর্ণ মৃদুমধুর বাক্য পরম্পরা : শ্ৰুতিগোচর করিয়া প্রীতিপ্রফুল্লচিত্তে কহিলেন, বৎস! তোমার কি অভিলাষ হইয়াছে তাহা বল, অবশ্যই তোমার অভীষ্ট সিদ্ধ হইবে । বসন্ত কহিলেন মহারাজ ! এই মহোৎসব ক্রিয়োপলক্ষে দূতক্রীড়ায় পরাজিত নৃপ কি সম্ভ ম্ভ সন্তানগণ কারাবরুদ্ধ আছেন, তাহাদিগকে মুক্তিদান করিতে হইবে ; এই পরোপকারী মহদ্বাক্য আকর্ণন করিয়া ভূপতি সানন্দমনে উৎসাহের সহিত তদীয় প্রস্তাবে অনুমোদন করিলেন। রাজকুমার, নৃপের আদেশ প্রাপ্ত হইয়া স্বাভীষ্ট তৃতীয় অঙ্ক । YS 3 সাধনোদেশে, পাশক্রীড়াপরাভূত কারাবরুদ্ধ ব্যক্তিগণে মুক্তিদানে ব্ৰতী হইলেন । পৰ্য্যায়ক্রমে এক এক জন করিয়া নৃপনন্দনের সম্মুখে নীত হইতে লাগিল, -তিনি সকলকারই পরিচয় লইতে আরম্ভ করিলেন, দেখিলেন এক ব্যক্তিও দরিদ্র কি অনার্য্য সন্তান নহেন, সকলেই হয় রাজা অথবা শ্রেষ্ঠি, কিম্বা অত্যন্ত সম্ভান্ত ধনীলোকের সন্তান । এই ব্যাপার উপলক্ষে নানাদেশীয় রাজকুমারের সহিত আলাপ পরিচয় হইল। কিন্তু প্রিয় স্বহৃদ জগদলভের সহিত সাক্ষাৎ না হওয়াতে একান্ত বিকলান্তঃ হইতে লাগিলেন। জগদলভ যেরূপ সৰ্ব্ব শেষে অবরুদ্ধ হইয়াছিলেন, সেইরূপ সমুদয় লোক মুক্তিলাভ করিলে, তবে তাহার পালা উপস্থিত হইল । শ্রেষ্ঠিনন্দন, প্রহরীগণ পরিবেষ্টিত হইয়া রাজনন্দনের সম্মুখভাগে নীত হইলে, কিয়ৎকাল পরস্পর মুখ নিরীক্ষণের পরে শ্রেষ্ঠিকুমার, রাজকুমারকে চিনিতে পারিলেন। কিন্তু জগদ্দুর্লভ কারাবাসের অসহ্য রেশে এরূপ বিকৃত আকৃতি হইয়াছিলেন যে, সহসা তাহাকে চেনা দুষ্কর । অধিককাল অভিনিবেশ দৃষ্টিপাত হইলে তবে চিরপরিচিত ব্যক্তি জানিতে পারেন যে, তিনি সেই S२३ দুলোচন। কাব্য। উদয়নালাবাসী জগদুর্লভ শ্রেষ্ঠ। বহুদিনের পর বন্ধুকে প্রাপ্ত হইয়া তিনি অপার আনন্দনীরে ভাসিতে লাগিলেন ; কিন্তু জগদ্ধ লভের মনের ভাব বসন্তের ন্যায় নহে, তিনি বন্ধুকে গোপন করিয়া আসিয়া বিপদে, পতিত ও দুর্দশাগ্রস্ত হইলেন ; পরিশেষে সেই বন্ধু হইতে নিস্কৃতি লাভ করিয়া সম্মুখে তাহাকে দেখিতে পাইয়া অপ্রতিভ ও লজ্জিত হইলেন। বসন্ত, বন্ধুকে তদবস্থ দেখিয়া, কহিলেন সখী ! গতকার্য্যে ক্ষুব্ধ হইবার প্রয়োজন নাই; যেহেতু শাস্ত্ৰকৰ্ত্তারা নির্দেশ করিয়াছেন “ গতস্য সূচনা নাস্তি ” অর্থাৎ গত কৰ্ম্মের অনুশোচনা বিফল। এক্ষণে রাজকন্যা সুলোচনার পাণিগ্রহণ করিয়া অনন্য সাধারণ যশঃ ও খ্যাতি লাভ করা যাউক ; বহুকাল কষ্ট পরম্পরায় কালাতিপাত হইয়াছে, অধুনা কিছুকাল স্থখসচ্ছন্দে কালযাপন করা যাউক। ফলতঃ তোমার কারাবরোধের সম্বাদ প্রাপ্তমাত্র আমি এককালে দশদিক শূন্য ও জনশূন্য অরণ্যবাসের ন্যায় জ্ঞান করিয়াছিলাম ; বাস্তবিক তুমি ভিন্ন অন্য অবলম্বন ছিলনা, সুতরাং আমায় আশ্রয়চু্যত উপায়বিহীন বালকবৎ কিছু কাল চিন্তার্ণবে নিমগ্ন থাকিতে হইয়াছিল। বলিতে কি তৃতীয় অঙ্ক । }:0 অন্ধগণ অবলম্বিত যষ্টি বিহীন হইলে যাদৃশী দশা প্রাপ্ত হয় আমি তদ্রুপ মৃতকল্প হইয়া কালযাপন করিতে ছিলাম। অদ্য তোমায় কারামুক্ত দেখিয়া আমার মৃত •দেহে জীবসঞ্চার হইল, আমার বিগত দুঃখের অবসান হইল। আর চিন্তা নাই, এখন দুজনে মন্ত্রণা করিয়া অবস্থার উন্নতি করিতে পারিব। বিশেষতঃ এই রাজার ঐ এক কন্যা ভিন্ন অন্য সন্তান নাই, তাহাতে আমার প্রতি স্নেহাকৃষ্ট হইতে হইবেই হইবে। তবে আমার যে অবস্থা তাহাতে কস্মিনকালেও ভাগ্যের প্রতি বিশ্বাস করিতে পারি না। উভয় বন্ধুতে এইরূপ কথোপকথন চলিতেছে, এমন সময়ে সহসা একজন পরিচারিকা আসিয়া রাজকুমারকে কহিল, মহাভাগ! আমাদের রাজনন্দিনী, কি কথা জিজ্ঞাসা করিবার নিমিত্ত আপ নাকে তৎসন্নিধানে যাইতে অনুরোধ করিয়াছেন, কি অনুমতি হয় ? বসন্ত, আমি ক্ষণবিলম্ব ব্যতিরেকে রাজ কুমারীর সমীপে উপনীত হইতেছি, এই উত্তর প্রদানে পরিচারিকাকে বিদায় করিয়া দিলেন । তদর্শনে জগদুর্লভ কহিলেন, সখা! তবে প্রণয়িণী সন্নিধানে গমন কর, আমি এক্ষণে বাসস্থানে যাই; সময়ান্তরে পুনরায় Σ) 28 মুলেচন। কাব্য । সাক্ষাৎ ও কথাবাৰ্ত্ত হইবে, এইকথা বলিয়া পরম্পর বিদায় গ্রহণ পূর্বক আপন আপন অভীষ্ট প্রদেশে গমন করিলেন । o বসন্ত, স্থলোচনার সমীপে উপস্থিত হইয়া বলিলেন, অয়ি সরলে ! আমায় কি জন্যে আহবান করিয়াছেন, আদেশ করিলে চরিতার্থ হই। নৃপছুহিতা প্রিয়বল্লভের উত্তর শ্রবণে মনে মনে কুষ্ঠিত হইয়া কহিলেন, আপনি এতদূর সৌজন্য প্রকাশ করিলে এ অধিনী বড় লজ্জিত হয়। প্রাণকান্ত ! তোমায় নয়নপথের পথিক করিয়া পৰ্য্যন্ত আমার মন যে, কেমন বিচল হইয়াছে, আর ক্ষণকালের জন্যেও নয়নান্তরালে রাখিতে ইচ্ছা যায় না; এমন কি এক মুহূৰ্ত্তকালও যেন যুগ পরিমাণ বলিয়া বোধ হয়। এই যে তুমি অল্পকাল আমায় পরিত্যাগ করিয়া পিতৃদেবের সন্নিকটে গমন করিয়াছিলে, ইহাতেও যে আমার কত প্রকার অসহ্য যন্ত্রণ ও দুঃসহ ক্লেশ উপস্থিত হইয়াছিল, তাহ বলিতে পারি না। পিতৃদেব কি জন্যে আহবান করিয়াছিলেন, তাহা জানিবার নিমিত্ত আমার অত্যন্ত কৌতুহল উপস্থিত হইয়াছে, যদি কৃপা করিয়া তাহ বর্ণন করেন, তবে কৃতাৰ্থ হই । বসন্ত তৃতীয় অঙ্ক । ՖՀն কহিলেন প্রিয়ে । সে বিবরণ শ্রবণে শ্রুতিস্থখ হইবে এরূপ বোধ হয় না, স্থলোচনা কহিলেন হৃদয়নাথ । আমার কষ্ট হইবে না, যদি আপনকার মনোবেদনা উপস্থিত না হয় তবে দাসীর অনুরোধ রক্ষা করিতে হইবে । বসন্ত, স্থলোচনার নিকট আদ্যেপান্ত আত্মজীবনবৃত্তান্ত বর্ণনে প্রবৃত্ত হইলেন, মধ্যে মধ্যে উভয়েই শোকে অধৈৰ্য্য হইয়া দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ ও অশ্রু বিসর্জন করেন, আবার শোকাবেগ সংবরণ করিয়া বলিতে ও শুনিতে আরম্ভ করিলেন। বলা শেষ হইলে কোমলহৃদয়৷ স্থলোচনা প্রাণকান্তের হৃদয়বিদারক দুঃখাবহ বিবরণ শ্রবণে শোকসিন্ধু একবারে উদ্বেল হইয়া উঠিল। বসন্তের ঈদৃশ ক্লেশ পরম্পরার কথা শুনিয়া পূৰ্ব্বাপেক্ষা অধিকতর যত্নের সহিত সেবা শুশ্রীষ৷ করিতে লাগিলেন । পিতা কি মাতা যদি কোন কার্য্য গতিকে নিকটে যাইবার নিমিত্ত আহবান করেন, তাহ হইলে মণিহারা ফণিনীর ন্যায় চঞ্চলচিত্তে গমন করিয়া কার্য্য শেষ হইবামাত্র প্রিয়বিরহে ব্যস্ত হইয়া আসিতেন । স্থলোচনা কথায় কথায় প্রায় সৰ্ব্বদাই এই কথা ףכי ソー&S মুলোচনা কাব্য। বলিতেন, প্রাণনাথ ! আমার পিতা মাতার আর দ্বিতীয় অবলম্বন নাই, কেবল আমরাই মাত্র সম্বল ; সুতরাং আমরাই যাবদীয় ঐশ্বৰ্য্যের অধিপতি হইয়া, চিরজীবন স্থখসচ্ছন্দে কাটাইতে পারিব তাহাতে আর অনুমাত্র ংশয় নাই। অতএব তুমি অন্যমন করিতে পারিবে না, স্থানান্তরে যাইতে পারিবে না। পিতার রাজ্য ও ঐশ্বৰ্য্য সমস্তই ত তুমি প্রাপ্ত হইয়াছ, রাজ্য পরিত্যাগ করিয়৷ অন্যত্র গমন করা রাজার ধৰ্ম্ম নহে। তুমি এক্ষণে রাজসিংহাসনে উপবিষ্ট হইয়া দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন প্রভৃতি কাৰ্য্য করিয়া রাজনীতির অনুবর্তী হইয়৷ চল, প্রকৃতিপুঞ্জের শাসনভার স্বহস্তে গ্রহণপূর্বক রাজ ধৰ্ম্ম প্রতিপালন কর । সময়ে সময়ে কৌশলক্রমে স্বীয় পিতা ও ভ্রাতার সম্বাদ প্রাপ্তির জন্য যত্ন ও চেষ্টা করিবে। ইহা হইলে আর তোমার মনে কোন উদ্বেগ রহিবে না, নিরুদ্বেগে এখানে থাকিতে পারিবে । মন স্থির কর, আর স্থানান্তরে গমনের অভিলাষ করিও না । তোমার মুখে যে সকল কথা শুনিয়াছি তাহা স্মৃতিপথে উদিত হইলে হৃৎকম্প উপস্থিত হয়। বিগত দুঃখের কথা শ্রবণে আমার মনে এরূপ বিশ্বাস জন্মিয়াছে যে, তুমি তৃতীয় অঙ্ক । S२१ বিদেশে গমন করিলেই অপার দুঃখার্ণবে নিপতিত হইবে, এইজন্য তোমায় অন্য স্থানে যাইতে দিতে শঙ্কা উপস্থিত হয়। আমার কথা শুনুন, চাপল্য পরিত্যাগ •করুন, আর এস্থান পরিত্যাগ করিয়া ক্লেশ পরম্পরা ভোগের প্রয়োজন নাই । বসন্ত প্রেয়সীর কাতরতা দেখিয়া ও যুক্তিযুক্ত মমতাপূর্ণ বচনাবলী শ্রবণগোচর করিয়া মনে মনে আন্দোলন করিতে লাগিলেন; রাজকুমারী যে সকল কথা বলিলেন, তাহাতে হানি কি ? মহারাজের আর ত সন্তান সন্ততি নাই ; আমরা একমাত্র অবলম্বন, এই রাজ্যৈশ্বৰ্য্য সমুদায়ই আমাদের অশিবে, এমন কি বলিলে সমস্তই এখনই অর্পণ করিতে প্রস্তুত আছেন। তবে একবার প্রিয়বন্ধু শ্রেষ্ঠিনন্দনের সহিত পরামর্শ করিয়া যাহা কর্তব্য বলিয়া স্থিরীকৃত হইবে তাহাই করা কর্তব্য, এরূপ কল্পনা করিয়া সে দিন আর কোন উত্তর প্রদান না করিয়া সন্দিহানচিত্তে কালযাপন করিতে লাগিলেন। স্থলোচনা, প্রিয়বল্লভের নিকট কোন উত্তর প্রাপ্ত না হইয়াও মনে মনে বিবেচনা করিলেন যে, ইহাতে নাথের অসম্মতি অাছে এরূপ বোধ হয় না । )Rb মুলোচনা কাব্য । অবধারিত দিবসে মহীপতি নরকেশরী মহাসমারোহে, সেই সৰ্ব্বাঙ্গস্থদের ত্রিভুবন মনমোহিনী কন্যারত্ব, বসন্তের হস্তে অপর্ণ ও তৎসঙ্গে আপনার যাহা কিছু ঐশ্বৰ্য্য ছিল, সমবেত নরপতিগণ, সাক্ষাৎ ঋষি তুল্য তেজস্ব আচাৰ্য্যগণ, নিমন্ত্রিত সম্ভান্ত ধনীগণ, স্বাধিকারস্থ প্রধান প্রধান প্রজা ও রাজন্যগণ, আহুত ও অনাহুত অপরাপর জনগণ সমক্ষে প্রতীজ্ঞাপূর্বক তৎসমুদয় দান করিলেন । আর কহিলেন যতদিন পর্য্যন্ত বসন্ত রাজসিংহাসনে উপবেশনপূর্বক প্রকৃতিপুঞ্জের পরিপালন ও শাসনভার গ্রহণ না করিতেছেন, আমি ততদিন মাত্র এই রাজকাৰ্য্য স্বহস্তে রাখিয়াছি, উনি গ্রহণেচ্ছ হইলেই আমি তৎক্ষণাৎ ইহা হইতে অবস্থত হইব। এই উদ্ধাহসভায় বসন্তের প্রিয়স্থছদ জগদূর্লভ শ্রেষ্ঠি উপস্থিত ছিলেন, তিনি মহারাজের এই প্রতিজ্ঞাবাক্য শুনিয়া মনে মনে ঈর্ষান্বিত হইয়া কহিতে লাগিলেন, তবে ত বসন্তের ভাগ্যে এই আলোকসামান্য অদৃষ্টচর অশ্রুতপূৰ্ব্ব রূপনিধান কন্যানিধান পরিভোগ এবং রাজ্যাধিকার প্রাপ্তি উভয়বিধ স্থখই ঘটিল। ভগবান কাহার অদৃষ্টে কখন কি ঘটনা করেন তাহার তৃতীয় অঙ্ক । \ ૨૪ কিছুই বলা যায় না। আহ ! আমিই অগ্ৰে দূতক্রীড়া করিতে আসিয়াছিলাম, সে সময়ে বসন্ত ইহার বিন্দু বিসর্গ কিছুই জানিতে পারেন নাই ; আমার দুরদৃষ্টজন্য কারাবাস ফলভোগ হইল, আর বসন্ত আমার অনুসন্ধানে আসিয়া অনুপম সুখসম্ভোগে প্রবৃত্ত হইল, কি চমৎকার! জগদীশ্বরের লীলাই বিচিত্র ! ! এই ঘটনা দেখিয়াই বুঝি “ এক যাত্রার পৃথক্ ফল ” এই প্রবাদের স্বষ্টি হইয়াছে ? যাহা হউক, এক্ষণে যেরূপে পারি এই অভাবনীয় সুখসম্ভোগের ব্যাঘাৎ জন্মাইবার চেষ্টা দেখিতে হইবে । বসন্ত নিতান্ত উদারচিত্ত ও একান্ত সরল স্বভাব, আমার উৎপন্ন জটিল বুদ্ধির মৰ্ম্মোন্তেদ করা কোনরূপেই তাহার সাধ্যায়াত্ত হইবে না, জগদ্দুর্লভ এইরূপে অনন্যমনে সৰ্ব্বদা সেই চেষ্টাতেই রহিলেন । বিবাহোৎসব শেষ হইল, নিমন্ত্রিত লোকজন সকল স্ব স্ব আলয়ে প্রতিগমন করিল। বসন্ত রাজকুমারীর পাণিগ্রহণ করিয়া এবং অতুল ঐশ্বর্য্যের অধিপতি হইয়া রাজভোগে পরমহুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন । বিবাহের পূর্বে প্রণয়ীযুগলের মনে মনে যে সকল নল y ტო মুলোচন। কাব্য। নব ভাবের আবির্ভাব হইত, তখন মনে করিতেন পরি ণয়ের পর অকপটভাবে নিঃশঙ্কচিত্তে পরস্পর পরস্পরের নিকট ব্যক্ত করিবেন ; কিন্তু এক্ষণে পরিণিত হইয়া সে সকল আর মনে নাই, আমোদ আহলাদে কোথা দিয়া . . দিন গত হইতে লাগিল তাহ অনুভবেই আসিত না । ফলতঃ প্রণয়ীগণের মিলনের পূর্বে যে সমস্ত কথা বলিব বলিয়া মনে বাসনা হয়, সম্মিলন হইলে আর তাহ স্মরণ থাকে না, একথা পাঠক মহাশয়েরা মনের সহিত ঐক্য করিয়া দেখিতে পারিবেন, সুখ প্রায়ই স্থায়ী হয় না, কোথা হতে উৎপাত আসিয়া বাধা দেয় তাহ পূর্বে লক্ষিত হয় না । একদিন অপরাহ্ল সময়ে বসন্ত, পরমবন্ধু জগদ্দুলভের সহিত নানা বিষয়িণী কথা হইতে হইতে এইকথা বলিলেন, সখী ! মহারাজ ত কএক দিন হইতে রাজ্যাধিকার গ্রহণ জন্য উপরোধ, অনুরোধ করিতেছে, এক্ষণে আমার কি করা কর্তব্য ? শ্রেষ্ঠিনন্দন কহিলেন, ভূপাল যেরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন তাহ প্রতিপালন করিতে যত্নবান হওয়া তাহার অবশ্য কর্তব্য কৰ্ম্ম বলিতে হইবে। কিন্তু তুমি যে সহসা তাহার রাজ্যাধিকার ও যথাসৰ্ব্বস্ব গ্রহণ তৃতীয় অঙ্ক । \ ტy করিবে ইহা নীতিবিরুদ্ধ বলিয়া বোধ হইতেছে। যে সময়ে নরপতি, বাৰ্দ্ধক্য নিবন্ধন রাজ্যশাসন ও প্রজাপালন করিতে অক্ষম হইবেন, তৎকালে এই সমস্ত - স্বকরে আনা উচিত। যে দেও রাজ্যের ভাবী উত্তরাধিকারী তুমি ভিন্ন অন্য কেহই নাই, রাজ্য ও ঐশ্বৰ্য্য সমস্তই তোমাকে অশিবে ; তখন আর তদ্বিষয়ে ব্যগ্রত দেখাইবার প্রয়োজন কি ? আমার বিবেচনায়, অধুনা রাজ্যাধিকার প্রাপ্তির অভিলাষ জানাইলে, যেন নিতান্ত লুব্ধপ্রকৃতি ও নিচাশয়ী বলিয়া প্রতীয়মান হয়। আরও এক কথা এই যে, বিবাহ করিয়া পত্নীআলয়ে অধিবাস করিলে, পৌরুষের হানি হইতে পারে। বাস্তবিক শ্বশ্ৰজন সন্নিধানে, তাহাদিগের গলগ্ৰহ হইয়া নিতান্ত অন্নদানের ন্যায় থাকা সেটা কেবল কাপুরুষের কার্য্য, ভদ্রসমাজে তাদৃশ ব্যক্তি আদর প্রাপ্ত হন না। যদি আমার পরামর্শক্রমে চলিবার মানস করিয়া থাক, তবে বলি শুন ; এখন একবার আমরা উদয়নালায় যাই চল ; আর যদি তোমার স্ত্রীকে সঙ্গে লইতে পার তাহা হইলে ত পৌরুষ ও গৌরবের সহিত যাওয়া হইবে। তথায় কিছুকাল মুখসচ্ছন্দে যাপন করিয়া সময়বিশেষে এখানে ১৩২ মুলোচনা কাল । আগমন করিয়া রাজ্যাধিকার গ্রহণ করিলেই হইবে। জগদলভের বাক্য শেষ হইলে,বসন্ত তাহার কৌটিল্যের অন্তর্দেশ প্রবেশে অক্ষম হইয়া বাক্যের তাৎপৰ্য্য গ্রহণ না করিয়া, তদীয় সরলতা জ্ঞান করিয়া উত্তর করিলেন, • আমি স্থলোচনাকে পরিত্যাগ ভিন্ন অন্য সমুদয় বিষয়ে অনুমোদন করিতে পারি। পাষাণ্ড শ্রেষ্ঠিনন্দন যখন দেখিলেন যে রাজকুমার স্থলোচনাকে পরিত্যাগ করিয়া এক পাও যাইতে স্বীকার নহেন, তখন আর দুরভিসন্ধিসাধনে কোন বাধা থাকিল না ভাবিয়া তৎপক্ষে যত্ন করিতে লাগিলেন। জগদূর্লভ বললেন, সখা! বিবাহের $ পর স্ত্রী লইয়া যাওয়ামনুষ্যত্বের কৰ্ম্ম, ইহাতে যে অক্ষম সে কুকুরবৎ পরাধীন ; পরনীত হইয়া প্রণয়িণী সমভিব্যাহারে বাসস্থানে গমন করা সৰ্ব্বদেশ প্রচলিত পদ্ধতি বলিতে হইবে । বসন্ত, গুহ্য তাৎপৰ্য্য বোধে অপারগ হইয়া, রাজকুমারীকে সমভিব্যাহারে লইয়। যাইতে পরিবেন এই আমোদে উৎসাহ সহকারে বন্ধুর পরামর্শনুসারে কার্য্য করিতে উদ্যুক্ত হইলেন। পরস্পর আয়োজন করিবার নিমিত্ত বিদায় গ্রহণপূর্বক নিজ নিজ স্থানে গমন করিলেন । রাজকুমার, অন্তঃপুরে প্রবেশান্তর স্বীয় সহধৰ্ম্মিণীসহ মন্ত্রণাপুরসের কর্তব্য স্থিরীকরণার্থ মিত্রের সহিত যেরূপ | কথোপকথন হইয়াছিল, আমুল তাবদ্বিবরণ বর্ণন করি --লেন। স্থলোচনা প্রাণবল্লভের ঈদৃশ অসম্ভাবিত, অভাবনীয় প্রস্তাব শ্রবণে একবারে বিস্ময়সমুদ্রে নিমগ্ন হইলেন। রাজকুমারকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, যদি আপনি পিতৃ কি ভ্ৰাতৃ সন্নিধানে গমন করিবার মানস করিয়া থাকেন, তাহা হইলে উত্তম কল্পই করিয়াছেন, আত্মীয় স্বজন বিরহিত অজ্ঞাত কুলশীল জনগণে অধিবাসিত ভূভাগে গিয়া অবস্থান করাপেক্ষ, শ্বশ্ৰজন সন্নিধানে অবস্থিতি করা সহস্ৰগুণে শ্রেয়ঃ ; তাহার আর সংশয় নাই। বসন্ত বলিলেন, প্রিয়ে । সে জন্য চিন্তিত হইও না ; একবার তথায় যাইয়া লোকের আচার ব্যবহার দেখি, যদি মন্মত না হয় তবে পুনরায় আবার এই খানেই প্রত্যাগত হইব ; ইহাতে আর বিশেষ কোন ক্ষতির সম্ভাবনা দেখিতেছিনা। স্থলোচনা প্রথমতঃ নানাবিধ দৃষ্টান্ত দৰ্শাইয়া বহু বিপদের আশঙ্কা দেখাইতে আরম্ভ করিলেন ; কিন্তু বসন্তের মন, বন্ধুর বাক্যে এরূপ আকৃষ্ট হইয়াছিল যে তাহা অার ফিরিল >br ు মুলোচনা কাৰ্য। না, যতবার রাজকুমারী বাধা দিবার চেষ্টা করেন, ততবারই বলেন, সে জন্য চিন্তা করিও না, অন্যায়াচরণ দেখিতে পাই, অচিরাৎ প্রত্যাবর্তন করা যাইবে। স্থলোচনা আর কি করিবেন, স্বামীর নির্বন্ধাতিশয় সন্দর্শনে, মনে মনে বিরাগোৎপাদনশঙ্কা করিয়া কহিলেন; পতিই নারীদিগের একমাত্র আশ্রয়, পতিই কামিনীকুলের গতি, পতিই কুলবালার পরমধন, পতিই রমণীর উপাস্যরত্ন, পতিই স্ত্রীর জীবন, অতএব আপনি যেখানে যাইবেন আমিও তথায় যাইব ; প্রাণান্তেও আপনার সঙ্গ ছাড়া হইব না; আপনার যে দশা ঘটিবে আমারও সেই অবস্থা ' হইবে, কদাচ এ অধিনীকে পরিত্যাগ করিয়া যাইতে পরিবেন না। বসন্ত, প্রণয়িণীর প্রণয় পরীক্ষার নিমিত্ত নানামতে আপত্তি উথাপন করত সমভিব্যাহারে লইয়৷ যাইতে অস্বীকার করিলেন। তিনি কহিলেন, রাজনন্দিনি । তোমার পিতা মাতার আর দ্বিতীয় সন্তান নাই, তুমি আমার সহগামিনী হইলে, তাহারা অপার দুঃখার্ণবে পরিক্ষিপ্ত হইবেন। আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি, যদিও উদয়নালায় দীর্ঘকাল অবস্থিতি করা আমার অভিপ্রেত হয়, তথাপি অন্ততঃ একবার আসিয়া তোমায় সমভি তীয় অঙ্ক । ১৩৫ ব্যাহারে করিয়া লইয়া যাইব । স্বামীর মুখে এইরূপ নিদারুণ পরিত্যাগবাক্য শ্রবণ করিয়া, পতিপ্রাণী পতি| বিয়োগবিধুরা স্থলোচনা একবারে অধীর হইয়া গলদশ্র • - লোচনে বিষণ্ণবদনে পতিমুখপানে চাহিতে লাগিলেন । ক্ষণকাল নিস্তব্ধভাবে অবস্থিতির পর, রাজকুমারী বসন্তের চরণ ধারণ করিয়া ছল ছল নয়নে গদগদ বচনে কহিতে লাগিলেন, প্রাণনাথ! পিতা মাতা আমার অদশনে মনে মনে ক্ষুণ্ণ হইবেন সে কথা সত্য বটে ; কিন্তু পুনৰ্ব্বার আমার আশায় থাকিবে, যদি তুমি পরিত্যাগ করিয়া যাও, তাহা হইলে যে তোমার আদর্শনে আমার জীবন শেষ হইবে; তখন আমার শোকে তাহাদিগের কি দশা ঘটিবে, তাহা একবার মনে করিয়া দেখুন। আমার যেরূপ মনের অবস্থা তাহাতে যে তদীয় বিচ্ছেদযন্ত্রণ সহ্য করিতে পারিব এরূপ আশা করা যায় না। আমি সকল কথাই বলিলাম, এক্ষণে যাহা উচিত বলিয়া বোধ হয়, সেইরূপ ব্যবস্থা করুন। প্রেয়সীর বাক্য শেষ হইতে না হইতে র্তাহার ভাবভঙ্গী ও ব্যবহার দর্শনে আর স্থির থাকিতে না পারিয়া কহিলেন, যদি তুমি নিতান্তই জিদ কর তবে কি করিব, }SNు মুলোচনা কাৰ্য । অগত্য তোমায় সঙ্গে লইতে হইবে। কিন্তু পিত মাতার কাছে বিদায় লইবার ভার তোমাতেই অপিত রহিল। স্থলোচনা, স্বামী সমভিব্যাহারে যাইতে পাইবেন বলিয়া একবারে আনন্দসলিলে অভিষিক্ত হইয়া. হর্ষবারি বিসর্জন করিতে লাগিলেন। বসন্ত বলিলেন, অয়ি মুগ্ধে! আমি কি সত্যই তোমায় পরিত্যাগ করিয়া যাইতাম, তাহা কখন পারিতাম না; আমার প্রতি তদীয় মন যতদূর আকৃষ্ট আমার মন তোমার প্রতি তদপেক্ষ কোন অংশেই নূ্যন নহে। শুদ্ধ তোমার মন বুঝিবার জন্য এতক্ষণ বাকচাতুরী করিতেছিলাম। তুমি ইহা । নিশ্চয় জানিবে আমার আদর্শনে তুমি যেরূপ ব্যাকুল হও, আমি তদীয় অদর্শনজনিত দুঃখে তদপেক্ষা অধিক কাতর হই। এই প্রকার কথা বার্তায় প্রণয়ীযুগল পরস্পর প্রণয় পরীক্ষা করণানন্তর, পৃথক পৃথক হইয়া মহারাজ নরকেশরীও তদীয় মহিষীর সমীপদেশে বিদায় লইতে গমন করিলেন। স্থলোচনা অগ্ৰে জনকজননী সন্নিধানে গমন না করিয়া বিদেশগমনোপযোগী নানাপ্রকার দ্রব্য সামগ্রীর আয়োজন করিতে লাগিলেন, রাজভাণ্ডারে কোন জিনিসের ত অপ্রতুল নাই; বস্ত্ৰ অলঙ্কার মণি তৃতীয় অঙ্ক । yO4 মাণিক্য প্রভৃতি বহুমূল্য দ্রব্যজাত সংগ্ৰহ করিতে লাগিলেন, এত দ্রব্য সংগ্ৰহ করিলেন যে, কিছুকাল স্থখসচ্ছন্দে চলিতে পারে । বসন্ত, নরপতি সমীপে উপনীত হইয়া উদয়নালায় গমনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলেন । অকস্মাৎ জামাতার ঈদৃশ মনেরভাব হওনের কারণ জানিতে না পারিয়া, মহারাজ বিষম উদ্বিঘ্ন হইলেন। তিনি মনে করিলেন, পাছে আমাদের কৃত কোন অসৌজন্য ব্যবহার দেখিয়া, ছেন ; না জানি কোন দাস দাসীতে বা অনাদর প্রকাশ করিয়াছে; তাহারা ত বিশেষ জানে না, সামান্য জামাতা জ্ঞানে যেরূপ প্রচলিত ব্যবহার আছে তাহাই করিয়া থাকিবে, নচেৎ হটাৎ এরূপ মনেরভাব হইল কেন ? এবম্বিধ নানা শঙ্কা উপস্থিত হওয়াতে বিশেষ অনুসন্ধান আরম্ভ হইল। কিন্তু যখন তন্ন তন্ন করিয়া তথ্য জানিয়া দেখিলেন, অন্য কাহার কোন অপরাধ নাই ; বসন্ত আপন বন্ধুর পরামর্শক্রমে দেশভ্রমণোদেশে একবার যাইতেছেন, তখন কহিলেন, বৎস! আমাদিগের পুত্ৰ নাই, তোমায় প্রাপ্ত হইয়া সে দুঃখে জলাঞ্জলি দিয়াছি, মুলোচন। কাব্য। שלy \O যদি তুমি একান্তই আমাদিগের মমতা পরিত্যাগ করিয়া বিদেশগমন কর কি করিব, আমাদের দূরদৃষ্টজন্য এ সকল ঘটনা উপস্থিত হয়। যদি নিতান্তই যাও, তবে তোমার রাজ্য ও ঐশ্বৰ্য্য কাহার হস্তে ন্যস্ত করিয়া যাইবে তাহা বল ; আমি আর কত দিন তোমার প্রতিনিধি হইয়া একাৰ্য্য চালাইব । যাহার কার্য্য তাহার তাহা করা কর্তব্য। বসন্ত, অতি নম্রতার সহিত কহিলেন, মহারাজ ! আপনি ক্ষুণ্ণ হইবেন না, আমি অগোঁণে প্রত্যাগত হইব, কেবল একবার বন্ধুকে স্বদেশে রাখিয়া আসামাত্র উদ্দেশ্য ; একত্রে আসিয়া সুখসম্ভোগে । প্রমভচিত্ত হইয়া বন্ধুকে একাকী বিদায় করিয়া দেওয়া, সেটা নিতান্ত অসঙ্গত কাৰ্য্য বলিয়া বোধ হয়, সুতরাং অনুগমনে বাধ্য হইলাম। আর আপনি বারম্বার রাজ্যভার গ্রহণ করিতে অনুরোধ করিলে, আমি সাতিশয় ক্ষুন্ধচিত্ত ও লজ্জিত হই। যদিও অনুগ্রহ করিয়া স্নেহ প্রকাশের প্রত্যক্ষ ফল স্বরূপ আমাকে সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করিয়াছেন, তথাচ যতদিন আপনি কৰ্ম্মক্ষম আছেন তত দিন আমি স্বহস্তে রাজ্যভার গ্রহণ করিতে কোন রূপেই সম্মত তৃতীয় অঙ্ক । }9న নহি । যে সময়ে দেখিব আপনি জরার প্রভাবে ইন্দ্রিয়শিথিল হইয়া রাজকাৰ্য্য পৰ্য্যালোচনায় একবারে অক্ষম হইয়া পড়িয়াছেন, তৎকালে অগত্যা উহা গ্রহণ করিতে হইবে। অন্ততঃ একবংসর কালের জন্য অন্যত্র গমনে প্রসন্নমনে অনুমতি প্রদান করুন। মহারাজ ! জামাতৃ অনুরোধ অবহেলনে অক্ষম হইয়। অগত্যা সম্মতি দান করিলেন । বসন্তকে একান্ত ব্যগ্র দেখিয়া, নরপতি নরকেশরী, স্বীয় পরিচারক ও অপরাপর কৰ্ম্মকারকদিগকে আদেশ করিলেন, তোমরা যত সত্বর পার, বসন্তের গমনোপযোগী যানাদির সংগ্রহ কর, আর দুই তিন বৎসর কাল চলিতে পারে এরূপ অশন বসন সমভিব্যাহারে দাও ; স্থলোচনা আর বসন্ত যে সমুদয় দ্রব্য ব্যবহার করিতেন তৎসমুদায় তাহাদের সঙ্গে দিতে হইবেক । রাজাজ্ঞাক্ৰমে ভৃত্যগণ তদনুযায়ী কাৰ্য্য করিতে ব্রতী হইল । বসন্ত, ভূপতির নিকটে বিদায়গ্রহণপূর্বক, তথা হইতে নিস্ক্রান্ত হইয়া অন্তঃপুরে রাজমহিষী সন্নিধানে গমন করিলেন। রাজ্ঞী জামাতৃপ্রমুখাৎ স্থানান্তরে যাইবার কথাই শ্রবণে একেবারে বিষাদসমুদ্রে নিমগ্ন y80 মুলোচনা কালা । হইলেন। তিনি সজলনয়নে বলিতে লাগিলেন ; বৎস! তোমায় প্রাপ্ত হইয়া আমি অপুত্ৰক নিবন্ধন দুঃখ অন্তর হইতে অন্তৰ্হিত করিয়া, মনে মনে পুত্রবতীর ন্যায় ভাগ্যবতী হইয়াছিলাম, এক্ষণে বিধাতা যে, আবার - আমায় সেই নিদারুণ শোকসিন্ধুনীরে নিক্ষেপ করিবেন তাহা আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই; যাহা হউক তোমাদের উভয়কে এক সময়ে বিদায় দেওয়া আমাদের পক্ষে বিশেষ ক্লেশকর হইবে। যদি নিতান্ত পক্ষে তোমাদিগের গমন করা শ্রেয়ঃ হইয়া থাকে, তাহা হইলে, আমার সাক্ষাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়া যাও যে, যত শীঘ্ৰ । পার প্রত্যাগমন করিবে। বসন্ত, নানাবিধ সান্তুনাবাক্যে প্রবোধ দিয়৷ তদীয় মনস্তুষ্টি করিয়া বিদায়গ্রহণপূর্বক নিজ বাসস্থানে আগমন করিলেন । নিয়মিত দিনে বসন্ত, স্থলোচনাকে সমভিব্যাহারে লইয়া, শুভক্ষণ দেখিয়া যাত্রা করিয়া পুরীর বহির্ভাগে আগমন করিলেন। রাজজামাতা আর রাজনন্দিনী পুরী পরিত্যাগ করিয়া যাওয়াতে, রাজা, রাণী ও পুরবাসী আর সকলেই বিষণ্ণ মনে কালযাপন করিতে লাগিলেন। সংসারের কিছুই চিরস্থায়ী নহে, ক্রমে সকলই লয় প্রাপ্ত হইয়া থাকে। কিয়ৎকাল সকলে তাঁহাদের বিরহে বিলাপ ও পরিতাপ করিয়া পরিশেষে স্ব স্ব কার্য্যে ব্যাপৃত হইলেন। অদর্শনজনিত শোক ও দুঃখ ক্রমশঃ মন্দীভূত হইয়া আসিল। বিধাতার কি বিচিত্র মহিমা! তিনি সকলই সহ্য করাইতে পারেন; যে, তনয়াকে নয়নান্তরালে রাখিয়া রাজমহিষী একক্ষণও নিশ্চিন্তভাবে সুস্থচিত্তে অবস্থিতি করিতে পারিতেন না; অদ্য সেই রাজ্ঞী, অজ্ঞাতকুলশীল নিতান্ত অপরিচিত এক ব্যক্তির হস্তে, প্রাণাধিক প্রিয়তমা কন্যাকে ন্যস্ত করিয়া অতি দূরতর প্রদেশে প্রেরণপূর্ব্বক মনের আবেগ সংবরণ করত সুস্থচিত্তে কালযাপন করিতে লাগিলেন। ইহা অপেক্ষা আশ্চর্য্য আর কি আছে? পূর্ব্বে যাহা নিতান্ত অসঙ্গত ও অসহ্য বলিয়া বোধ হয়, পরে সেই কঠিন কার্য্যও লোকের ক্রমশঃ অভ্যস্ত হইয়া আইসে।