সুলোচনা কাব্য/দ্বিতীয় অঙ্ক

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


দ্বিতীয় অঙ্ক।

 শ্বেতের একাদশবর্ষ বয়ঃক্রম হইল দেখিয়া, মহারাজ বীরজিৎসিংহ জ্যোতির্ব্বিদ্যাবিশারদ ও ধর্ম্মশাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতগণ দ্বারা দিনাবধারণ পূর্ব্বক মহাসমারোহে উপনয়ন সংস্কার সম্পন্ন করিলেন। ইতিপূর্ব্বে রাজমহিষী শ্বেতের উপনয়ন দিব ও উপনয়নের পর বিবাহ দিব বলিয়া যেরূপ আগ্রহ প্রকাশ করিয়াছিলেন, এক্ষণে কার্য্যকালে আর তাহার অনুমাত্রও দৃষ্ট হইল না। ইহাতে মহারাজের মনে বিষম সংশয় উপস্থিত হইল। কিন্তু শুভকর্ম্ম সম্পাদনে তৎপর ছিলেন বলিয়া, তৎকালে তাহার তথ্যানুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইতে পারেন নাই; অধুনা অবকাশ প্রাপ্ত হইয়া, সহসা এরূপ ভাবান্তর উপস্থিত হইবার কারণ কি, তাহার অন্তস্তত্ত্ব জানিতে প্রবৃত্ত হইলেন। দেখিলেন, রাজ্ঞীর আর সে ভাব নাই, তিনি শ্বেত ও বসন্তের প্রতি অতিশয় বিরক্ত হইয়াছেন; বিরক্তির কারণ জিজ্ঞাসা করিলে, রাজমহিষী নৃপতি গোচরে এই উত্তর প্রদান করিলেন যে, আমি ভাবিয়াছিলাম আমার সন্তান হইল না, তজ্জন্য আর আমি আক্ষেপ করিব না, শ্বেত ও বসন্তই আমার অপত্যাভাব দুঃখের অবসান করিবে। লোকে পোষ্যপুত্ত্র গ্রহণ পূর্ব্বক অপুত্ত্রক দুঃখ দূরীকরণ করে; আমি সপত্নী সন্তান দ্বারা কি তাহা নিবারণ করিতে পারিব না? অবশ্যই পারিব। উহারা ত আমার পর নয়, নিজসন্তান বলিলেই হয়; যাহারা কেবল বিদ্বেষবুদ্ধির বশবর্ত্তী, তাহারা সপত্নীসন্তান সহ অসদ্ব্যবহারে প্রবৃত্ত হইয়া নানাপ্রকার অনর্থোৎপাদন করে। আমি মনে করিয়াছিলাম সস্নেহ সাধুব্যবহার দ্বারা উহাদিগকে বশতাপন্ন রাখিয়া অন্যের মন হইতে সেই ভ্রমান্ধকার বিদূরিত করিব ও চিরবদ্ধমূল বিদ্বেষ অন্তর্হিত করিব। কিন্তু বিধাতার কেমন বিড়ম্বনা, সে আশা পূর্ণ করিতে পারিলাম না। আমি যত যত্ন করি ও আত্মা শ্রদ্ধা করি, কিছুতেই উহারা আমার বশতা স্বীকার করিতে চায়না। সর্ব্বদাই কেবল আমাকে মনঃপীড়া দেয় ও আমার অনিষ্ট চেষ্টা করে। মহারাজ! এ অভাগীর দুঃখের কথা আর কত শুনিবেন বলুন।

 বীরজিৎসিংহ, লাবণ্যময়ীর প্রমুখাৎ এই সকল আভ্যন্তরিক বৃত্তান্ত অবগত হইয়া, কিছুকাল নিবিষ্টচিত্তে চিন্তা করিয়া আর কোন উপায় না দেখিয়া অবশেষে মহিষীকে কহিলেন, প্রিয়ে! যতদিন পর্য্যন্ত উহারা বয়োধিক ও জ্ঞান প্রাপ্ত না হইতেছে ততদিন উহাদিগের আচার ব্যবহারের সদসৎ বিচার করা ও বিচার করিয়া দোষী স্বাব্যস্ত করা বিধিসঙ্গত কার্য্য নহে। এক্ষণে বালক বলিয়া উপেক্ষা করাই কর্ত্তব্য। যদি নিজ গর্ভজাত সন্তান হইত, তবে কি বালক বলিয়া উপেক্ষিত না হইয়া অশ্রদ্ধার পাত্র হইত, তাহা কখনই হইত না। মহারাজ এবম্বিধ নানাপ্রকার সান্ত্বনা বাক্যে রাণীকে প্রবোধ দিলেন; লাবণ্যময়ীও যেন মহীপতির কথায় বিকলান্তঃকরণের স্থৈর্য্য সম্পাদন করিলেন, এইরূপ ভাণ করিয়া রহিলেন। বীরজিৎসিংহ, মহিষীর তৎকালের অবস্থা দৃষ্টে মনে মনে স্থির করিলেন যে, যদি আর কোন প্রকার আকস্মিক উৎপাত উপস্থিত না হয় তবে আর অন্য কোন দুর্ঘটনা ঘটিবার আশঙ্কা থাকিল না। এবারে রাজ্ঞীর মনঃস্থির হইয়াছে তাহাতে আর সংশয় নাই। শ্বেত ও বসন্ত অতি বুদ্ধিমান ও সুচতুর এবং শান্তশিষ্ট বটে; তবে যদি বলি স্বভাববশতঃ কোন অন্যায় কার্য্য করিয়া থাকে, ইহার পরে বিদ্যাশিক্ষাপ্রভাবে নম্রতা ও সহিষ্ণুতাগুণোপেত হইলে আর কোন প্রকার অনিষ্টাচরণে প্রবৃত্ত হইবে না। পরস্তু শ্বেতের বিবাহ দিলেই মহিষী নববধূর সমাগমে সানন্দমনে সদ্ব্যবহার করিতে রত থাকিবেন। ক্রমান্বয়ে সাধুব্যবহার অভ্যস্ত হইলে অন্তঃকরণে আর বিদ্বেষ ভাবের আবির্ভাব হইতে পারিবে না, সুতরাং আর কুটিলপথে পদার্পণ করিতেও ইচ্ছা হইবে না; তাহা হইলেই আমার মনের উদ্বেগ দূর হইবে ও আমি সুখসচ্ছন্দে কালাতিপাত করিতে পারিব।

 নরপতি অন্তঃপুর হইতে প্রস্থান করিলে, লাবণ্যময়ী, তরঙ্গিনী ও রেবতীর মন্ত্রণা শুনিয়া কপটমায়া প্রকাশপূর্ব্বক পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর স্নেহে ও যত্নে কুমার দ্বয়কে পালন করিতে লাগিলেন। শ্বেত ও বসন্ত, একাল পর্য্যন্ত এই চক্রান্তের বিন্দু বিসর্গও জানিতে পারেন নাই; তাঁহারা লাবণ্যময়ীর সহিত পূর্ব্বাপর সরল ব্যবহারই করিয়া আসিতেছেন। তবে, যে মধ্যে মধ্যে বিমাতার মুখভঙ্গিতে বিরক্তিভাব প্রকাশ পাইত, তাহাতে মনে করিতেন যে, হয় ত, আমাদেরই কোন অন্যায়াচরণে কিম্বা অশিষ্ট ব্যবহারে, অথবা সাংসারিক কোন না কোন ঝঞ্ঝাটে এইরূপ বিরাগোৎপাদন হইয়া থাকিবে। তাঁহারা স্বপ্নেও জানিতেন না যে, বিমাতার ষড়যন্ত্রে সমস্ত সুখে জলাঞ্জলি দিয়া একেবারে অপার দুঃখার্ণবে পরিক্ষিপ্ত হইতে হইবে। মহারাজও মহিষীর বিদ্বেষানল সর্ব্বতোভাবে নির্ব্বাপিত হইয়াছে মনে করিয়া নিশ্চিন্ত ভাবে কালাতিপাত করিতে ছিলেন। তিনি জানিতেন না যে, দুর্দ্দমনীয় প্রবল বিদ্বেষানলে, তদীয় পুরী একেবারে ছার ক্ষার হইবার উপক্রম হইয়াছে। ঐ শ্বেত ও বসন্ত অভাগা বালকদ্বয়, লাবণ্যময়ীপ্রজ্জ্বলিত অগ্নিকাণ্ডের শুষ্ক ও অসার ইন্ধন এবং রেবতী ও তরঙ্গিনী, ঘৃত ও ধুনা স্বরূপা। ইহারা যে অন্তঃপুরের অন্তর দগ্ধ করিবার অভিলাষে সংযোজনায় প্রবৃত্ত হইয়াছে, তাহা তিনি কিরূপে জ্ঞাত হইবেন। যখন সমুদায় উপকরণ একত্রীকৃত হইয়া হুতাশন দুর্নিবার হইয়া প্রজ্জ্বলিত হইল, তৎকালে ভূপতির চৈতন্য হইল। তখন তিনি জানিতে পারিলেন যে, এই অগ্নিতে আমার রাজ্য, সুখ ও সম্পত্তি এককালে ভস্মসাৎ হইবে। বিপদকালে সকলেরই বুদ্ধিবিপর্য্যয় ঘটে, বুদ্ধি স্থির না হইলে কাহারও দ্বারা কোন প্রকার সদুপায় হইবার সম্ভাবনা থাকে না। সুতরাং বীরজীৎ সিংহ সে সময়ে মন্ত্রণা করিতে কি বুদ্ধিস্থির করিয়া বিবেচনা করিতে অবকাশ প্রাপ্ত হইলেন না; তাহাতে তাহার কোন প্রতিবিধান না হওয়াতে বিষম অনর্থ সংঘটন হইয়া উঠিল। পূর্ব্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, পালিত মার্জ্জার লাবণ্যময়ীর দুরভিসন্ধি সাধন সময়ে প্রধান উপকরণ হইয়া উঠিবে। এক্ষণে পাঠক মহাশয়েরা দেখুন, সত্যই তাহাই ঘটিল। শ্বেত ও বসন্ত, চিরদিনই বিমাতার সহিত এক শর্য্যায় শয়ন করিত, রাজ্ঞী স্বীয় পালিত মার্জ্জারটিকেও আপন সমীপে সেই শয্যাতেই শয়ন করাইতেন; রেবতীর পরামর্শ ক্রমে সে রাত্রিতে ঐ মার্জ্জারকে বক্ষঃস্থলে স্থাপনপূর্ব্বক রাজমহিষী কপট নিদ্রায় অবিভূত হইলেন। রাজকুমারদ্বয়, সপত্নীমাতার উভয় পার্শ্বে শয়ন করিয়া নিশ্চিন্ত ভাবে নিদ্রিত হইল। লাবণ্যময়ী কিছুকাল নিস্তব্ধ ভাবে থাকিয়া, অতি সতর্কতার সহিত শ্বেত ও বসন্তের সুষুপ্তির পরিচয় পাইয়া স্বীয় অভীষ্ট সাধনের উদ্যোগ আরম্ভ করিলেন। ঐ পোষিত মার্জ্জারটিও এতক্ষণ রাণীর হৃদয়স্থিত হইয়া সুখে নিদ্রা যাইতেছিল; সহসা সেই নিদ্রিত মার্জ্জারের পুচ্ছদেশ রাজ্ঞী সজোরে বিলক্ষণ বিক্রম প্রকাশপূর্ব্বক মর্দ্দন করিতে আরম্ভ করিলে, মার্জ্জার নিদ্রাবস্থায় মর্ম্মান্তিক যাতনাপ্রদ লেজমর্দ্দনে একবারে অধীর হইয়া উচ্ছৃঙ্খলভাবে মহিষীর বক্ষঃস্থল তীক্ষ্ণ নখরপ্রহারে স্থানে স্থানে ক্ষতবিক্ষত করিল। রাজ্ঞী তখন কৃতব্যাধির অসহ্য যন্ত্রণায় ব্যাকুল হইয়া আর্ত্তস্বরে রোদন করিয়া উঠিলেন। পরিচারিকাগণ পার্শ্ববর্ত্তী গৃহে নিদ্রা যাইতেছিল, অকস্মাৎ রাজমহিষীর ক্রন্দনধ্বনি শ্রবণ করিয়া, আস্তে ব্যাস্তে তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিল যে, শ্বেত ও বসন্ত রাজ্ঞীর উভয় পার্শ্বে গাঢ় নিদ্রায় বিচেতন আছেন, লাবণ্যময়ী অবিরল ধারায় অশ্রু বিসর্জ্জন ও যাতনায় অস্থির হইয়া ক্রমাগত পার্শ্ব পরিবর্ত্তন করিতেছেন, তাঁহার অঙ্গাবরণ বস্ত্রসমুদয় শোণিতসিক্ত হইয়া স্বাভাবিক বর্ণ পরিবর্ত্তনপূর্ব্বক লোহিতবর্ণ ধারণ করিয়াছে, অপূর্ব্ব মুখশ্রী যেন প্রদোষ কালীন শতদলের ন্যায় নিষ্প্রভ ও মলিন হইয়াছে। সেবিকাগণ, ঠাকুরাণীর সহসা ঈদৃশ শোচনীয় অবস্থা সন্দর্শনে চকিত ও বিস্মিত হইয়া রহিল; ক্ষণকাল তথায় সেই ভাবে দণ্ডায়মানা থাকিয়া রাজমহিষীর মুখ হইতে কেবল কাতরস্বরে এইমাত্র বাক্যস্ফুরণ হইতে লাগিল যে, শীঘ্র মহারাজকে ডাকিয়া আন, যাতনায় আমার প্রাণ প্রয়াণের উপক্রম হইয়াছে। পরিচারিকাগণ তাঁহার সেই কাতরোক্তিকেই আদেশ জ্ঞান করিয়া নরপতিসন্নিধানে গমন করতঃ উপস্থিত বিপৎপাতের কথা তাঁহার গোচর করিল। মহীপতি, মহিষীসংক্রান্ত অসম্ভব অবস্থার কথা শুনিয়া আর কোন ক্রমেই স্থির থাকিতে না পারিয়া সাতিশয় ব্যাস্ততার সহিত অন্তঃপুরে রাজ্ঞীর শয়নাগারে উপস্থিত হইলেন। তথায় সমাগত হইয়া প্রাণাধিক প্রিয়তমার অঙ্গাবরণ শোণিতাদ্র সন্দর্শনে একবারে জড়প্রায় নিশ্চল হইয়া চিত্রিত পুত্তলিকাবৎ নিস্তব্ধভাবে দণ্ডায়মান রহিলেন; কিন্তু জিজ্ঞাসা করিতে কি কোন কথা বলিতে পারিলেন না; ভয়ে ও দুঃখে তাঁহার সর্ব্বশরীর কাঁপিতে লাগিল, অঙ্গে স্বেদবিন্দু নির্গত হইতে লাগিল। সেই ভাবে কিয়ৎকাল অতীত হইলে, বীরজিৎ সিংহ, লাবণ্যময়ীর সমীপস্থ হইয়া মৃদুস্বরে কহিলেন, প্রিয়ে! কে তোমার এরূপ অবস্থা করিয়াছে শীঘ্র প্রকাশ করিয়া বল, আমি প্রতীজ্ঞা করিতেছি এখনই তাহার মস্তকচ্ছেদন পূর্ব্বক সমুচিত প্রতিফল প্রদান করিব। কে সাহসপূর্ব্বক ভুজঙ্গশিশুর মুখে হস্তাপর্ণ করিয়াছে, কে যে প্রজ্জ্বলিত হুতাশনে পতঙ্গবৎ আত্মসমর্পণ করিয়াছে, কার স্বন্ধে এত শোণিত বৃদ্ধি হইয়াছে, কোন দ্বিমস্তক পুরুষ এরূপ অসম সাহসিকের কার্য্য করিল তাহা শীঘ্র প্রকাশ করিয়া বল, আর যে বিলম্ব সহ্য হয় না; যে পর্য্যন্ত বৈরনির্যাতন করিতে না পারিতেছি, ততক্ষণ আমার মনের আবেগ দূর হইতেছে না। আর গৌণ কর না শীঘ্ৰ বল, ক্রোধানলে আমার হৃদয় দগ্ধ হইতেছে; কালবিলম্ব না করিয়া ব্যক্ত কর কে তোমার এ অবস্থা করিয়াছে।

 লাবণ্যময়ী, আপন সমীপে প্রাণবল্লভকে সমাগত দেখিয়া অভিমানভরে পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর কাতরতার সহিত রোদন আরম্ভ করিলেন। ভূপতি ও প্রেয়সীকে তদবস্থাপন্ন দেখিয়া একান্ত ব্যগ্রতায় বারম্বার জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। আত্মাভিপ্রায় সিদ্ধির উপযুক্ত সময় বিবেচনা করিয়া প্রকৃত অবস্থা সঙ্গোপনপূর্ব্বক একটি কাল্পনিক ঘটনা উত্থান করতঃ সেই মিথ্যা অবস্থা সাজাইয়া তদ্বিষয় বর্ণনে প্রবৃত্ত হইলেন। ক্রমাগত অশ্রুজল বিমোচন করিতে লাগিলেন মধ্যে মধ্যে হা হতঽস্মি! হা দগ্ধঽম্মি! বলিয়া রোদন, করিতে লাগিলেন ইহার মধ্যে অবকাশ কালে গদগদস্বরে বাক্য নিঃসরণপূর্ব্বক কষ্টে সৃষ্টে কহিতে লাগিলেন। লোকের দুরভিসন্ধি সাধনের উপকরণেরও কি অপ্রবল ঘটে না; পাপীয়সী স্মরহত্যাকারিণীদিগের অন্তঃকরণে কি দয়ারলেশমাত্র থাকেনা; এই নিরপরাধ কুসুম সুকুমার কুমারদুটীকে অনায়াসেই নির্ব্বাসিত করিল। ধিক, স্ত্রৈণপিতাকেও ধিক্‌! হৃদয়কান্ত! বলিতে কি, পাছে উহাদিগের অযত্ন হয় বলিয়া, আমি বালক দুটিকে অন্যের কাছে রাখিতে কি দাসীদিগের ও যত্নের উপর নির্ভর করিতে ভাল বাসিনা। সর্ব্বদা কেবল শ্বেত কি খাবে, বসন্ত কি খাবে, কিসে উহারা ভাল থাকিবে, ইহা লইয়াই ব্যস্ত ও বিবৃত থাকি। মহারাজ আমি সপথ্‌পূর্ব্বক কহিতেছি, আজিও আমি সেই প্রকার করিয়া উহাদিগের আহারাদি সমাপনের পর, কত যত্ন করিয়া উভয় ভ্রাতাকে উভয় পার্শ্বে শয়ন করাইয়া, শীঘ্র নিদ্রাবেশ হইবার আশয়ে নানাপ্রকার কথা বার্ত্তা কহিতে কহিতে আমি নিদ্রা গিয়াছিলাম; নিদ্রা যাইবার পূর্ব্বক্ষণে বোধ হইল যেন, উহারা দুটিভেয়ে নিদ্রিত হইল। আর আমি এর পর ভাল মন্দ কিছুই জানি না। অল্পক্ষণ পরে দেখি যে, এক ভাই আমার হস্ত পদাদি ধারণ করিয়া বসিয়া আছে; অপর ভ্রাতা আমার হৃদয়োপরি উপবিষ্ট হইয়া ছুরিকা দ্বারা গলদেশে আঘাত করিবার উপক্রম করিতেছে। এই নিদ্রাবস্থায় আকস্মিক বিপৎপাতে আমার নিদ্রা অন্তর্হিত হইয়া ভয় সঞ্চার হইল, তখন কি করি, আর কোন প্রতিবিধানের পথ না পাইয়া, বলপূর্ব্বক উহাদিগকে ধাক্কা মারিয়া দূরে নিঃক্ষেপ করিলাম। ছুরিকা খানি কোথায় যে নিক্ষেপ করিয়াছে তাহা অনুসন্ধান দ্বারা কিছুই স্থির করিতে পারিলাম না। হটাৎ নিদ্রা ভঙ্গ হওয়াতে ভয়বিহ্বলচিত্তে কে যে হস্ত পদ ধারণ করিয়াছিল, কে যে বক্ষঃস্থলে ছুরিকাঘাত করিল তাহা বিশেষ করিয়া জানিতে পারিলাম না। তবে এইমাত্র বলিতে পারি যে, হৃদয়স্থিত বালক, অবতীর্ণ হইবার সময়েও অঙ্গ বিদীর্ণ ও ক্ষত বিক্ষত করিয়া পরিশেষে অপসৃত হইয়াছে; মহারাজ আমি আপনকার অঙ্গ স্পর্শ পুরঃসর সপথ করিয়া বলিতে পারি যে, ভ্রমে ও কখন উহাদিগের অনিষ্ট চেষ্টা করি নাই; বরঞ্চ স্ব সন্তান নির্ব্বিশেষে একান্ত যত্ন ও আগ্রহের সহিত লালন পালন করিয়া আসিতেছি, এক দিন এক ক্ষণের জন্যেও বিদ্বেষ বা বিরক্তিভাব প্রকাশ করি নাই। যাহা হউক আমি যেমন তাশা করিয়া ছিলাম যে, অচিরাৎ শ্বেতের বিবাহ দিয়া নব বধূর সহিত সংসারসুখ ভোগে মজিব, তাহার উপযুক্ত প্রতি ফলই প্রাপ্ত হইলাম। আমার ইচ্ছা থাকিলে কি হয়, বিধাতার বিড়ম্বনা কে খণ্ডন করিবে?

 বীরজিৎ সিংহ, নব প্রণয়িণীর কাপট্যজালে পতিত হইয়া, আর সম্ভব অসম্ভব বিবেচনা না করিয়া একেবারে ক্রোধে কম্পান্বিত কলেবর হইয়া কহিতে লাগিলেন; কি! এতবড় আস্পর্দ্ধা! এত বিদ্বেষ! এরূপ নির্দ্দয়তা, এত নিষ্ঠুর ব্যবহার। কি পাষণ্ড; এমন পামর যে, অকারণে জীবন বিনাশে উদ্যত? কি আশ্চর্য্য! আমি আর একুলাঙ্গারদিগের মায়ায় মুগ্ধ থাকিব না; আমি এখনই অপত্যস্নেহে জলাঞ্জলী দিয়া উহাদিগের মস্তক চ্ছেদন করিব। দাসি! আর এ রাগ সহ্য হয় না, শীঘ্র খড়্গ আনয়ন কর, আর বিলম্বের প্রয়োজন নাই; কি জানি কাল বিলম্বে যদি বৈরনির্য্যাতন সংঙ্কল্প বিদূরিত হইয়া স্নেহরস সঞ্চারিত হইয়া মূঢ় দিগের ধংসের ব্যাঘাৎ জন্মে। কি জানি যদি বিবেকশক্তির প্রভাবে আর এরূপ মতি না থাকে, কি জানি যদি বাৎসল্যভাবের আবির্ভাব হইয়া ভাবান্তর উপস্থিত করে, তাহা হইলে ত আর প্রতিজ্ঞানুরূপ কার্য্য করা হইবেক না। এই কুলাঙ্গার দিগের বিনাশ সাধন না হইলে আর আমি অন্য কোন কার্য্যে প্রবৃত্ত হইব না। এই নরহত্যাকারী পাপাত্মা দিগকে গৃহে রাখিয়া নিশ্চিন্ত থাকা সর্ব্বতোভাবে অকর্ত্তব্য। এপ্রকার দুরাচার সন্তানের পিতা হওয়াপেক্ষা নিঃসন্তান থাকা সহস্রগুণে শ্রেয়ঃ। আহা! বিধাতার কি আশ্চর্য্য মহিমা, তাঁহার লীলার ছলনা কে বুঝিতে পারে? তিনি কখন্‌ যে কাহার কি অবস্থা ঘটান তাহা সপ্নেরও অগোচর। শ্বেত ও বসন্ত তোমরা সুখে নিদ্রা যাইতেছ, ভাল মন্দ কিছুই জান না; এ দিকে যে, তোমাদের সর্ব্বনাশের উদ্যোগ হইতেছে, বিমাতার ষড়যন্ত্রে মহারাজ যে, তোমাদিগের জীবন নাশে কৃতসঙ্কল্প হইয়াছেন, আহা! যদি তোমাদের আর চৈতন্য না হয়, তাহাও এক প্রকার মঙ্গল বলিতে হইবে, তাহা হইলেত আর এরূপ স্ত্রৈণ পিতার নৃসংশ বিধিবহির্ভূত নির্দ্দয়াচারে মনস্তাপে তাপিত হইতে হয় না; তাহা হইলেত আর এই নিষ্ঠুর নরশোনিত প্রয়াসী রাক্ষসী বিমাতার কুটিল মন্ত্রণার অন্তঃস্তত্ব অবগত হইয়া মর্ম্মান্তিক যাতনা ভোগ করিতে হয় না; তাহা হইলেত আর মাতৃবিয়োগ দুঃখ অন্তরে আবির্ভূত হইয়া তোমাদিগকে অপার শোকার্ণবে পরিক্ষিপ্ত করিতে পারে না। হে নিদ্রে! আরত কাহাকেও অনুকুল বলিয়া অনুভূত হইতেছে না, এক্ষণে তুমিই যদি চিরসহচরী হইয়া শরীরকে অধিকার করিয়া থাক তবেত এই যন্ত্রণার হস্ত হইতে পরিত্রাণ হয়।

 লাবণ্যময়ী, মনে মনে স্বীয় অভীষ্ট সিদ্ধির নিঃসংশয়িত প্রমাণ প্রাপ্ত হইয়া, নিজ সন্নিধানে সপত্নী পুত্ত্রের মস্তকচ্ছেদন হইলে, পাছে লোকনিন্দার ভাজন হইতে হয়, এই শঙ্কা অন্তরে উদিত হওয়াতে, কৃত্রিম স্নেহ প্রকাশ পূর্ব্বক, সাশ্রুনয়নে কাতরবচনে কহিলেন, মহারাজ! এদাসীর এক অনুরোধ রক্ষা করিতে হইবে। যদি আমার সাক্ষাতে এই বালক দুটির জীবন বিনষ্ট হয়, তবে সেই সঙ্গে আমাকে বিনাশ করিবেন। নতুবা জীবন সত্ত্বে কদাচ উহাদিগের প্রাণবিয়োগ দেখিতে পারিব না। যদিও উহারা আমার গর্ভস্থ বালক নহে, তথাপি বহুদিন পর্য্যন্ত লালন পালন করিয়া এরূপ মমতাসূত্রে আবদ্ধ হইয়াছি যে, উহাদিগের কোন প্রকারে কষ্টে পতিত দেখিলেও হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া উঠে। একেত স্ত্রীজাতি, স্বভাবতঃ স্নেহপ্রবণ হৃদয়, তাহাতে আমার চিত্ত, উহাদের স্নেহে এরূপ আকৃষ্ট হইয়াছে যে, উহাদিগের মুখারবিন্দ মলিন দেখিলেও বিশেষ ক্লেশানুভব হয়। সুতরাং কোন্‌ প্রাণে স্বচক্ষে উহাদিগের মস্তকচ্ছেদন দেখিব তাহা বলুন। বলিতে কি কার্য্যের প্রতিবাদ ঘটিলে পাছে, আপনকার অন্তঃকরণে বিরাগোৎপাদন হয়, এই ভয়ে কোন জিদ্‌ করিতে সাহস হইতেছে না, নচেৎ উহাদের জীবন দণ্ড হওয়া কদাচ আমার অভিপ্রেত নহে। যদি নিতান্ত পক্ষে উহাদিগের নিঃশেষ করাই মনঃস্থ হইয়া থাকে, তবে কোন দূরতর প্রদেশে প্রেরণপূর্ব্বক, অপর কোন ঘাতকের দ্বারা অভীষ্ট সাধন করাই আমার অভিমত। এক্ষণে মহারাজের যেরূপ অভিরুচি।

 লাবণ্যময়ীর নির্ব্বন্ধাতিশয় দর্শনে, বীরজিৎ সিংহ, স্বহস্তে পুত্রদিগের শিরশ্ছেদনে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। কিন্তু শ্বেত ও বসন্তের প্রতি জাতক্রোধ নিঃশেষ হইল না। তিনি ক্ষণ বিলম্ব ব্যতিরেকে, প্রধান নগরপাল ভৈরবকে ৬০ দুলোচন। কাব্য। আহ্বান করিয়া আদেশ করিলেন, ওহে ভৈরব ! তুমি কল্য প্রভাত হইবামাত্র, আমার রাজ্যের প্রত্যন্ত সীমায় গমন করিয়া, শ্বেত ও বসন্তের, মস্তকচ্ছেদনপূর্বক শোণিত আনিয়া দেখাইলে, তবে আমি জলগ্ৰহণ করিব । মহারাজের নিদেশ বাক্য আকর্ণন করিয়া, ভৈরব একেবারে বিস্ময়সাগরে নিমগ্ন श्हेल, সে, করজোড়ে অতি, বিনীত ভাবে কহিতে লাগিল, মহারাজ ! আপনি প্রভু, আমি আপনকার দাস, আমি সকল সময়ে সৰ্ব্বপ্রযত্বে আপনকার আদেশ প্রতিপালনে প্রস্তুত আছি ; কখন কোন বিষয়ে পরাস্মুখ হইতে চাহিনী, কিন্তু এই কঠিন আদেশ শ্রবণে আমার অন্তরাত্মা একবারে কম্পিত হইয় উঠিল; তথাপি প্রভুর আজ্ঞা প্রতিপালন করিতে বিরত হইতে সাহসী হইতেছি না ; পাছে আপনি কৃতঘ্ন মনে করেন, যদি নিতান্ত পক্ষে অপত্যস্নেহে বিসর্জন দিয়া থাকেন, তবে নাহয় একটু ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্বক মনঃ স্থির করিয়া উপায়ান্তর অবলম্বনে অভীষ্ট সাধন করুণ, আমি অতি নীচ জাতি বিদ্যা বুদ্ধি বিহীন, মহারাজকে যে পরামর্শ দিতে পারি এরূপ যোগ্য নহি । তবে বিপৎ দ্বিতীয় অঙ্ক । や) সাহসী হইতেছি ; আপনি বিবেচনা পূর্বক, উহাদিগের অভীষ্ট সিদ্ধিরও ব্যাঘাৎ হইবেনা অথচ উহাদের জীবন রক্ষা হইবে। আর যদিও আমার নিষ্ঠুর চণ্ডাল জাতি, তথাচ এবম্বিধ পাপাচরণে প্রবৃত্ত হইতে কিম্বা নিতান্ত কৃতঘ্নত প্রকাশপূর্বক নরহত্যারূপ মহাপাতকে লিপ্ত হইতে ইচ্ছ কনহি। এক্ষণে মহারাজের আজ্ঞাই বলবতী, যেরূপ আদেশ করিবেন, তাহ নিতান্ত অনভিমত কাৰ্য্য হইলেও প্রবৃত্ত হইতে হইবে। বলিতে কি আপনকার আদেশে স্বপুত্রের মস্তকচ্ছেদনেও বিমুখ নহি, কিন্তু শ্বেত ও বসন্তের শিরশেছদনের কথা মনে উদিত হইলে বক্ষঃস্থল শতধা বিদীর্ণ হইবার উপক্রম হইয়া উঠে। বীরজিৎসিংহ স্ত্রৈণতানিবন্ধন এরূপ ক্রোধপরবশ হইয়াছিলেন যে, নগরপালের এবশুপ্রকার ন্যায়ানুগত বাক্যেও কোপাবিষ্ট হইয়া, আরক্তনেত্ৰে কহিলেন, দেখ ভৈরব। যদি তুমি বহুকালের অনুগত, বিশ্বাসী এবং কৃতজ্ঞ ভৃত্য না হইতে, তাহা হইলে এই দণ্ডেই তোমার প্রাণবধের আদেশ করিতাম, যদি তুমি আমার আদেশ প্রতিপালনে পরাস্মুখ হও তবে আর এসংসারে চাকরির సి ૭ ર মুলোচনা কাব্য। প্রত্যাশা করিও না, আর বুঝিলাম যে, বিপদ সময়ে তোমার দ্বারা উপকার প্রাপ্তির আশা নাই। দেখ ভৈরব উহারা আমার সন্তান, আমার অপেক্ষা তোমার অধিকতর স্নেহ কিরূপে সম্ভবে ? যখন আমিই নির্মম হইয়৷ অপত্যস্নেহে বিসর্জন দিয়া উহাদিগের জীবনদণ্ডের আদেশ করিতেছি, তখন তোমার তদ্বিষয়ে আপত্তি উত্থাপন করা কোন রূপেই শ্রেয়ঃ নহে । অতএব তোমায় পুনঃ পুনঃ অনুমতি করিতেছি যে, তুমি রজনী প্রভাত হইবামাত্র, জ্বরাচারপাষণ্ডদিগকে দূরতর প্রদেশে লইয়া গিয়া শিরশেছদনপূর্বক শোণিত আনয়ন করিলে আমি পান ভোজনাদি করিব । ভৈরব বীরজিৎসিংহের অনুগত ভৃত্য, প্রভুর ক্রোধের আতিশয্যদর্শনে ভীত হইয়া নিতান্ত অনিচ্ছাপূর্বক আদেশ পালনে সম্মত হইল । আহা ! শ্বেত ও বসন্ত এই ব্যাপারের অনুমাত্র জানে না। তাহারা প্রতিদিন যেরূপ করিয়া থাকে, নিদ্রা ভঙ্গের পর, সেইরূপ জননীকে অভিবাদন পূর্বক বিদায় গ্রহণ করিয়া নিয়মিত অধ্যয়নাভিলাষে বহির্ভাগে গমন করিল। এতদূর যে হইয়াছে তাহ কে জানে ? দ্বিতীয় অঙ্ক । US এক্ষণে তাহারা বহিস্থ প্রাঙ্গনে উপস্থিত হইলে, অমনি প্রধান নগরপাল কহিল, জ্যেষ্ঠ রাজকুমার ! আপনাদিগের জীবন বিনাশ করিবার নিমিত্ত, মহারাজের আদেশ হইয়াছে ; অতএব আর অনর্থক কাল হরণ করিবেন না, আপনার উভয় ভ্রাতা আমার সঙ্গে আগমন করুন, আমি আপনাদিগকে রাজ্যের প্রান্তঃভাগে লইয়া গিয়া নরাধিপের আদেশানুযায়ী কার্য্যে ব্ৰতী হইব । নগরপালের বাক্য শ্রবণমাত্র শ্বেত একবারে বিষাদসমুদ্রে নিপতিত হইলেন, কিয়ৎকাল অবিরল ধারায় অশ্রু বিসর্জন ও নানামতে আক্ষেপ করিতে লাগিলেন। বসন্ত তখন অষ্টম বর্ষীয় বালক বই নয়, তিনি আপন অবস্থার ভাল মন্দ বিবেচনা করিতে অক্ষম, কেবল দাদাকে রোরুদ্যমান দেখিয়া ব্যাকুল ভাবে রোদন করিতে লাগিলেন। শ্বেতের বয়ঃক্রম নূ্যনাধিক ত্রয়োদশ বর্ষ হইয়াছিল, তিনি অকস্মাৎ জীবনদণ্ডের কারণ জানিতে না পারিয়া, আকুল হৃদয়ে বারম্বার নগরপালকে কহিতে লাগিলেন, নগরপাল! কি জন্য যে মহারাজ আমাদের প্রতি কুপিত হইয়া প্রাণ দণ্ডের আদেশ করিয়াছেন, তাহা তুমি বলিতে পার ? আমরা Ꮼ8 মুলোচনা কাব্য। জন্মাবচ্ছিন্নে এমন কোন অপরাধ করি নাই যে, আমাদের জীবন বিনষ্ট হইতে পারে ? তবে কি একবার পিতৃদেবের নিকটে গমন করিয়া এরূপ বিষম দণ্ডাজ্ঞার নিদান জ্ঞাত হইয়া আসিব ? তুমি কি বল ? না, তিনি যখন নিতান্ত নির্মম হইয়া নির্দয় রাক্ষসের ন্যায় অপত্যস্নেহে বিসর্জন দিয়া এপ্রকার নিদারুণ আদেশ প্রদান করিয়াছেন, তখন আর র্তাহার সমীপদেশে উপনীত হওযায় কি ফল দর্শিবে ? বোধ হয় বিমাতা কোন প্রকার কুমন্ত্রণা করিয়া আমাদিগের এই বিষম অনর্থোৎপাদন করিয়া থাকিবেন ; নতুবা অকস্মাৎ মস্তকোপরি অশনি পতন হইবে কেন ? যাহা হউক এক রকম মঙ্গলই হইয়াছে বলিতে হইবে, নচেৎ সসপ গৃহবাসের ন্যায় সতত সশঙ্কচিত্তে কাল ক্ষেপ করা বড় সহজ ব্যাপার নহে । কখন কোন কার্য্যে বিমাতার কোপাগ্নিতে পতিত হইতে হয়, তচ্চিন্তাতেই অহরহ চিন্তিত থাকিতে হইত। যদি বিমাতার চক্রান্তে এই আকস্মিক বিপৎপাত সংঘটন হইয়া থাকে, তাহাতে আমরা দুঃখিত নহি। কিন্তু পিতার তাদৃশ নিৰ্ম্মল অন্তঃকরণ যে, কিরূপে এরূপ বিরূপ হইয়া, অসম্ভাবিত পরুষ আচারে বিচলিত बिजैौझ छाझ । ৬৫ হইল,তাহাইমনে মনেআন্দোলন করিয়া অতিশয় রিস্মিতও বিষাদিত হইতেছি । হা মাতঃ ! তুমি কোথায় আছ ? আঁজি তোমার সাধের শ্বেতের নিরপরাধে প্রাণ বিনষ্ট হইতেছে। হা তাত ! তুমি কি স্ত্ৰৈণতানিবন্ধন সেই অপরিসীম স্নেহ, দয়া, ও মমতায় বিসর্জন দিয়াছ । আহা ! এই পুরীতে কি আমাদের আর কেহই নাই, আমরা কি নিতান্ত অসহায় হইয়া পড়িয়াছি ; আহা ! আমরা কি হতভাগ্য, আমাদের পিতা ভিন্ন সংসারে আর কেহই নাই, সেই পিতা আজি একেবারে নির্দয় পিশাচের ন্যায় হইয়া স্বীয় কুমারদ্বয়ের শোণিতপানে লোলুপ হইয়াছেন। তবে আর আমাদের কে আছে, আমরা মনে করিয়াছিলাম যদিও বিমাতার বিষদৃষ্টিতে পতিত হই, তথাপি পিতৃদেবের মেহের ও অনুগ্রহের কখনই ক্রটি হইবে না, অদ্যকার ব্যবহার দৃষ্টে অনুমান হইতেছে যে, আমরা এত দিন কেবল ভ্রান্তিজালে পতিত ছিলাম। হে মাতঃ! একবার আসিয়া দেখিয়া যাও ; র্যাহার হস্তে পুত্রদুটিকে বিন্যস্ত করিয়া বিশ্বাসপাত্ৰ ভাবিয়া নিশ্চিন্তভাবে অবস্থিতি করিতেছ, সেই মহারাজই অদ্য তোমার স্থাপিতধনের নিঃশেষ করিতে উদ্যত হইয়াছেন ; ৩৩ মুলোচনা কাব্য । । এই বেল্লা আসিয়া উপস্থিত হও, নতুবা কালের হস্তে নিপতিত হইলে আর উদ্ধার নাই। আহা ! পিতার দয়া দেখিয়া মনে মনে আশা করিয়াছিলাম যে, ভবি ষ্যতে রাজ্যভোগে অশেষবিধ সুখসম্ভোগে কাল যাপন করিব ; আমাদের সেই সঞ্চিত আশার এরূপে নিঃশেষিত হইবে তাহা সপ্নেও জানিতাম না। হা পিতঃ ! তোমার সেই অকৃত্রিম স্নেহ, অসীম মমতা, অনন্ত দয়া ও একান্ত যত্বের কি শেষে এইরূপ ফল হইল। কেন যে তুমি সে সকল বিস্তৃত হইলে, কেন যে তুমি আর আমাদের এজন্মে মুখাবলোকন করিবে না, তাহার কারণ আমরা বুঝিতে পারিতেছি না । হা বিধাতঃ ! তুমি কি আমাদের ললাটে এরূপ লিথিয়া ছিলে যে, এই শৈশবাবস্থা অপার দুঃখার্ণবে পরিক্ষিপ্ত করিয়া জীবন শেষ করিবে। আহ ! আমরা কি আজন্ম দুঃখভোগ করিব বলিয়াই ভূমিষ্ট হইয়াছিলাম, প্রথমে মাতৃ বিয়োগ, কিছুদিন পরেই বিমাতার বাক্য বাণে জ্বজুরিতাঙ্গ, অবশেষে পিতার অকারণ কোপ উদ্দীপনে জীবন বিনাশ হইল। হাদগ্ধ বিধে ! একদিনের জন্যেও কি আমাদের ভাগ্যে সুখ লিথ নাই । ভৈরব, শ্বেতের এবহুপ্রকার দ্বিতীয় অঙ্ক । Øዓ আক্ষেপোক্তি শুনিয়া, সন্তপ্ত হইয়া, অশ্রুবিসর্জন করিতে করিতে কহিল, এখানে আর এ অবস্থায় কাল ক্ষেপ করায় ফল কি ? চলুন আমরা গমন করি। মহারাজ জানিতে পারিয়া, আবার আমায় আজ্ঞা প্রতিপালনে পরাভূখ বলিয়া তিরস্কার করিবেন। রাজকুমার তখন আর কি করিবেন, কেইবা তাহার দুঃখে দুঃখিত হইয়া সদুপায় করিবে, তিনি নিতান্ত অনুপায় ভাবিয়া প্রধান নগরপাল ভৈরবের অনুগামী হইলেন । ভৈরব চণ্ডালজাতি হইলেও তাহাদের দুঃখে আদ্রচিত্ত হইয়া নয়নজলে অভিষিক্ত হইতে লাগিল। শ্বেত ও বসন্ত ভ্রাতৃদ্বয়, স্থখসম্পদ পরিত্যাগ পূর্বক রোদন করিতে করিতে তৎসমভিব্যাহারে গমন করিতে লাগিলেন । নগরপাল, রাজকুমার দুটিকে সঙ্গে করিয়া নগরের প্রান্তভাগে অতি বিস্তীর্ণ প্রান্তর মধ্যে উপনীত হইয়া কহিল, যদিও মহারাজ তোমাদের শিরশেছদন করিবার আজ্ঞা করিয়াছেন, তথাপি আমি নিতান্ত নির্দয় হইয়া এই কমলাঙ্গের প্রতি ওরূপ কঠিন ব্যবহার করিতে পারিব না। আমি একটা কুকুরের মাথা কাটিয়৷ তদীয় শোণিত দেখাইয়া মহারাজের মনের আবেগ বিদূরিত সুলোচন। কাব্য । - "ל9א করিব। আপনার এই পাপ রাজধানী ভিন্ন অন্য যে স্থানে ইচ্ছা সেই স্থানে গমন করুন। আমি চণ্ডালজাতি অতি পাষণ্ড, নরহত্যাকারি বটে, তথাপি মহারাজের ন্যায় निर्शनं নহি । আমি যথাসাধ্য আপনাদের উপকার করিলাম; আমার কোন দোষ গ্রহণ করিবেন না, এই কথা বলিয়া অভিবাদন পূর্বক নগরপাল বিদায় লইল । শ্বেত, বসন্তের হস্তধারণ পূর্বক বাষ্পবারি বিসর্জন করিতে করিতে সেই বিজন প্রান্তর দিয়া ক্রমাগত উত্তরপশ্চিমাভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন। কিয়দর গমন করিতে না করিতেই শরীরে স্বেদবিন্দু সকল নির্গত হইতে লাগিল, কণ্ঠও তালু শুষ্ক হইয়া আসিল, মুখশ্ৰী নিম্প্রভ ও মলিন হইয়া উঠিল। বেলাও প্রায় দশদণ্ড হইল, র্তাহাদিগের পান ভোজনের কাল উপস্থিত, তাহাতে আবার পথশ্রান্তি, একেত সুকুমার রাজকুমার, তাহাতে আবার অংশুমালী গগণের প্রায় মধ্যভাগে উপনীত হইয়। অগ্নিস্ফলিঙ্গেরন্যায় কিরণ বিকীর্ণ করিয়া পথিকদিগকে ক্লিষ্ট করিতেছেন। ইহঁরা কখন পথ পর্য্যটন করেন নাই, প্রচণ্ড রৌদ্র, আতপত্র সঙ্গে নাই যে, আতপ নিবারণ করিবেন। ক্ষুৎপিপাসায় যুগপৎ আক্রান্ত ও পথশ্রমে কাতর হইয়া, দ্বিতীয় অঙ্ক । ৬৯ রাজকুমারদ্বয়ের একবারে চলচ্ছক্তি রহিত হইয়া পড়িল। কিন্তু সে অতি কদৰ্য্যস্থান, অতি বিস্তীর্ণ প্রান্তর, মনুষ্যনিবাস কি বৃক্ষাদি অতি বিরল, এই সকল কারণে উভয় ভ্ৰাতাই নিতান্ত অবসন্ন হইয়া পড়িলেন। বিশেষতঃ ভ্রাতৃবৎসল শ্বেত, বসন্তের সেই তাম্রবর্ণমুখ,ছল ছল নয়ন ও শুষ্ক ওষ্ঠস্বয় সন্দর্শন করিয়া অধিকতর ক্লেশানুভব করিতে লাগিলেন। নিকটে কোন বৃক্ষ নাই যে, তাহার ছায়াতে উপবেশন পূর্বক কিঞ্চিৎ স্থস্থ হইয়া পুনর্বার যাইতে আরম্ভ করিবেন। শীঘ্ৰ যে কোন উপায় হইবে তাহারও কোন উপায় নাই। নগরপাল, কিয়ৎকাল দণ্ডায়মান থাকিয় তাহাদিগের সেই অবস্থাদৃষ্টে আর থাকিতে না পারিয়া বিষঃমনে সাশ্রু নয়নে রাজপুরীর অভিমুখে প্রস্থান করিল। শ্বেত, পিতার নিষ্ঠুরাচরণে স্বখে জলাঞ্জলি দিয়া একবারে দুঃখসাগরে ভাসিতে লাগিলেন, তার এছুঃখ সহ্য । হইয়াছিল ; বসন্ত নিতান্ত বালক, এপর্য্যন্ত আপনাদের ষে অবস্থা ঘঠিয়াছে, তাহা হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হন নাই ; স্থতরাং পথশ্রাস্তিতে ও প্রখর রবিকরে সন্তপ্ত ও ব্যাকুল হইয়া কহিতে লাগিলেন। দাদা, ృం দুলোচন। কাব্য। ه به আমরা কোথায় যাইতেছি, আমাদের বাড়ী ও দাস দাসী সকল কোথায় । দাদা, আমার পিপাসা পাইতেছে ও ক্ষুধার উদ্রেক হইতেছে ; আপাততঃ এরূপ ছায়৷ পাই না যে, একটু বসি ; একটু জল না পাইলে ত আর চলিতে পারি না, পিপাসা যে ক্রমে বৃদ্ধি হইতেছে; দাদা, এখন কি করি আর যে চলিতে পারি না,ক্ৰমে কণ্ঠশোষ হইল, আর কথা কহিতেও যে পারিতেছি না। দাদা, এ কোথায় এসেছ, কৈ এক প্রাণীর সহিত ত সাক্ষাৎ নাই ; আমার প্রাণ যে যায়, আর যে পা চলে । না। শ্বেত, কনিষ্ঠের হৃদয়বিদারক কাতরধ্বনিতে একান্ত বিকলান্তঃকরণ হইয়া, কোথায় যাইবেন, কে আশ্রয় দিবে, আশু কি রূপেই বা ক্ষুৎপিপাসার শান্তি করিবেন, তাহার কোন উপায়ই দেখিতে পাইলেন না। শ্বেত মনে করিতে লাগিলেন,ইহ। অপেক্ষ। যদি নগরপাল আমাদিগের মস্তকচ্ছেদন করিত সেওত ভাল ছিল ; তাহাহইলে আর এদুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করিতে হইত না। হা বিধাতঃ ! এখন কি তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইতেছে না। শ্বেত, বসন্তের সহিত অবিরল ধারায় অশ্রুজল ফেলিতে ফেলিতে, দুঃখে ও কষ্টে নিতান্ত দ্বিতীয় অঙ্ক । Ay অপাৰ্য্যমানে প্রায় তিন ক্রোশ পথ পর্য্যটন করিলেন। দিবসের প্রথম্যাম অতীত হইয়াছে এরূপ সময়ে আজিম গঞ্জের সন্নিকটে গঙ্গার অপর পারে, ভাগীরথীর অদূরবর্তী একটি বৃহদাকার অটবী দূর হইতে র্তাহাদের নেত্রপথে পতিত হইল । সেই অটবী সন্দর্শনে কুমারযুগলের হতাশ অন্তঃকরণে কথঞ্চিৎ আশার সঞ্চার হইল, অপেক্ষাকৃত দ্রুতপদে কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া দেখেন যে, উহা অটবী নহে, কতকগুলি অশ্বর্থ ও বটবৃক্ষ শ্রেণীবদ্ধ হইয়া তথায় অবস্থিতি করিতেছে ; তখন ক্ষুৎপিপাসার ক্লেশ বিস্তৃত হইয়া, সেই দিক লক্ষ্য করিয়া উৰ্দ্ধশ্বাসে ক্রমাগত চলিতে আরম্ভ করিলেন । যেমন পথিকদিগের জীবন নাশের আশঙ্কা উপস্থিত হইলে তাহারা পথ কি কুপথ কিছুই না মানিয়া দিগ্বিদিক জ্ঞান পরিশূন্য হইয়৷ উৰ্দ্ধশ্বাসে গমন করে, তদ্রুপ শ্বেত ও বসন্ত গমন করিতে লাগিলেন। কিছুকাল দ্রুতপদে গমন করিয়া সেই বৃক্ষ শ্রেণির সমীপদেশে উপনীত হইলেন, তথায় ঘনসন্নিবিষ্ট বৃক্ষবল্লী নিবিড় পল্লবাবৃত থাকাতে যেন গৃহের ছাদ স্বরূপ আতপতাপ নিবারণে সক্ষম হইয়াছে, তাহার সুশীতল ছায়ায় উপবেশন পূর্ব্বক গন্ধবহের মন্দ মন্দ হিল্লোলে তাঁহাদিগের পরি তাপিত শরীর ক্রমে স্নিগ্ধ হইয়া উঠিল। আহা! অবস্থার গতিকে মনুষ্যের সকলই সহ্য হয়, তখনকার সেই গাছতলা, সুধাধবলিত রাজপ্রাসাদ অপেক্ষাও গৌরবান্বিত ও সুখকর জ্ঞান হইল। সেই প্রচণ্ডমার্ত্তণ্ডকিরণসন্তাপিত স্বেদসিক্ত কলেবর, কিয়ৎক্ষণ ঐ বটবৃক্ষের তলায় অবস্থিতি করায় কিঞ্চিৎ সুস্থ ও সবল হইল। কিন্তু তখনও বসন্তের পিপাসা সমভাবে যাতনা প্রদান করিতেছে, তিনি জ্যেষ্ঠের নিকট বারম্বার বারি প্রার্থনা করিতে লাগিলেন। শ্বেত, যদিও পথশ্রান্তিতে সাতিশয় ক্লান্ত হইয়া পড়িয়া ছিলেন, তথাপি বসন্তের কাতরোক্তিতে ব্যাকুলচিত্ত হইয়া কহিলেন, ভ্রাতঃ! তুমি কিঞ্চিৎ কাল শান্তভাবে এখানে অবস্থিতি কর, আমি জলান্বেষণে নির্গত হইয়া অচিরাৎ জল আনয়ন করিতেছি। বসন্ত, দাদার কথায় আশ্বাসিত হইয়া তাঁহার প্রত্যাগমন প্রতিক্ষায়, গতক্লম হইবার প্রত্যাশায় শয়ন করিলেন। পথশ্রান্তিতে বিশেষ কষ্ট হইয়াছিল তজ্জন্য সেই অবস্থাতেই নিদ্রাগত হইলেন।

দ্বিতীয় অঙ্ক । טף এদিকে শ্বেত, নানাস্থান অনুসন্ধানের পর ভাগীরথীকুলের সমীপস্থ হইলেন। কয়েকটি স্ত্রীলোক, নিৰ্ম্মল জাদুবীসলিলে অবগাহন পূর্বক বিশুদ্ধচিত্তে মৃন্ময় কলসীতে গঙ্গোদক পরিপূর্ণ করিয়া, তদুপরি ফুলের সাজি সংস্থাপন পূর্বক, বামহস্তে স্ব স্ব আদ্রবস্ত্র লইয়৷ বামকক্ষে কলসী গ্রহণ করতঃ, নানাকথার প্রসঙ্গে সঙ্গিনী সঙ্গে অঙ্গ ভঙ্গীর সহিত মন্থরগতিতে আগমন করিতেছেন ; পথিমধ্যে শ্বেতের সেই অমানুষোচিত সাক্ষাৎ কুমার সদৃশ অসামান্য রূপলাবণ্য সন্দর্শন করিয়া বামাকুলের হৃদয়ে স্নেহরস সঞ্চারিত হইল। তন্মধ্যে একটি রমণী শ্বেতকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বৎস! তুমি একাকী এদিকে কোথায় যাইতেছ? শ্বেত, সেই স্নেহপূর্ণ মধুরসম্ভাষণ শ্রবণ করিয়া অতি বিনীতভাবে কাতরস্বরে কহিলেন, মাতঃ! আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা, আমার সমভিব্যাহারে আসিতেছিলেন, ক্ষুৎপিপাসায় কাতর হইয়া ঐ বৃক্ষশ্রেণীর মূলদেশে তিনি অবস্থিতি করিতেছেন, আমি তাহার নিমিত্ত জল আনয়নার্থ জাদুবী কুলে যাইতেছি। শ্বেতের বাক্যাবসানে, রামাগণ অকৃত্রিম মমতার সহিত কহিলেন, বৎস! তোমাকে আর 48 মুলোচন। কাৰ্য । জল আনয়নের ক্লেশ স্বীকার করিতে হইবে না, আমরা এই কুম্ভ হইতে বারি প্রদান করিয়া ত্বদীয় কনিষ্ঠের পিপাসার শান্তি করিব। শ্বেত, তাহাদিগের সানুকুলবাক্যে বিশেষ উপকৃত হইলেন । কারণ র্তাহার সঙ্গে এমন কোন পাত্র ছিল না যে তাহাতে করিয়া জল আনয়ন করিবেন; দূর হইতে জল আনয়ন করিতে হইলে সকলেরই জলপাত্রের প্রয়োজন হইয়া থাকে, শ্বেত এতক্ষণ পর্য্যন্ত কিরূপে জল লইয়া গিয়া কনিষ্ঠের পিপাসার শান্তি করিবেন তাহার কিছুই স্থির করিতে পারেন নাই; চিন্তাকুলচিত্তে গমন করিতেছিলেন, এক্ষণে র্তাহাদিগের এই বাক্যে সে চিন্তা দূর হইল। বামাকুলের স্বাভাবিকী শক্তি অভ্যাসানুসারে শ্বেতের পরিচয় গ্রহণ করিতে আরম্ভ করিলেন । প্রথমতঃ একটি রামা বলিল, আহা! কোন দুরদৃষ্টভাগিনী কামিনী রাজকুমার সদৃশ কুমারদুটিকে বিদায় দিয়া প্রাণ ধরিয়া নিশ্চিন্তভাবে গৃহে অবস্থিতি করিতেছে? দ্বিতীয়া কহিল, বুঝি ইহাদিগের জননী নাই, মাতৃহীন বালক ব্যতিত কি এরূপ দুর্দশাগ্রস্থ হইতে পারে? একান্তই সংশয়উচ্ছেদাভিলাষে তৃতীয়া কহিল, দ্বিতীয় অঙ্ক । १{ বৎস! তোমাদের পিতা মাত আছেন কি? চতুর্থ বলিল, বৎস! তোমার নামটি কি ? এই সকল প্রশ্ন শ্রবণগোচর করিয়৷ জ্যেষ্ঠ রাজকুমার সজলনয়নে গদগদবচনে ক্রমশঃ উত্তর প্রদানে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি কহিলেন, মাতঃ! এ অভাগার নাম শ্বেত। বালকটির নাম শুনিয়া বামাকুল হর্ষবিষাদিত চিত্তে কহিতে লাগিল, আহা ! যেমন কন্দপের ন্যায় দৰ্পহারী রূপ, কোকিলের ন্যায় স্বমধুর কণ্ঠস্বর, আবার নামটিও তাহার অনুরূপ। আমরা শুনিয়াছি মহারাজ বীরজিৎসিংহের জ্যেষ্ঠপুত্রের নাম শ্বেত। বাক্যশেষ হইতে না হইতে শ্বেতের মুখচন্দ্রিম আরও মলিন ও নিম্প্রভ হইয়া উঠিল, নয়নযুগল হইতে অনর্গল অশ্রুজল নির্গত হইতে লাগিল। আহ ! কি সুন্দর নামটি গা ? এমন নাম ত আর কোথাও শুনি নাই। বৎস শ্বেত ! তোমার মাতা পিতা আছেন ত! নাই, পিতৃদেব বর্তমান আছেন। শ্বেতের ক্ৰন্দন দেখিয়া লজ্জিত হইয়া, রমণীগণ, কহিল, বৎস! আর কিছু বলিতে হইবে না, তোমার রোদনের কারণ কি ? শ্বেত বলিল, মাতঃ ! আমার জননীর স্নেহ, মমতা, দয়াপ্রভৃতি স্মৃতি মুলোচনা কাব্য। טאר পথে উদিত হওয়াতে আমার শোকসিন্ধু অনিবাৰ্য্যবেগে উচ্ছলিত হইয়াউঠিল,অমনিচক্ষেরজলে বক্ষঃস্থলভানিয়া যাইতে লাগিল। শ্বেতের শোকমিশ্রিত মৃদুমধুর বাক্যাবলী শুনিয়া নারীগণের অন্তঃকরণে কারণ্যরসের সঞ্চার হইল। একটি কামিনী নিতান্ত ব্যাকুলভাবে কহিলেন, বৎস! তোমার পিতা কি পুনৰ্বার বিবাহ করিয়াছেন ? এই পৰ্য্যন্ত উচ্চারিত হইবামাত্র, তৎক্ষণাৎ মনের আবেগ সংবরণ পূর্বক, আর পূর্ব বাক্যের শেষ না করিয়া, কহিলেন, হুঁ, পিতৃদেব পুনর্বার দ্বারপরিগ্রহ করিয়াছেন বটে, কিন্তু বিমাতার সন্তান সন্ততি কিছুই হয় নাই। এই ভাবে কথা বার্তা হইতে হইতে মৃদুমন্দ গতিতে, শ্বেত ও সমভিব্যাহারিণী কামিনীগণ, যেস্থানে বসন্ত ক্ষুৎপিপাসায় প্ৰপীড়িত হইয়া উত্তরীয় বস্ত্র বিস্তৃত করিয়া নিদ্রা যাইতে ছিলেন তথায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। কামিনীকুল বৃক্ষতলে উপনীত হইয়া, শ্বেত অপেক্ষা বসন্তের বয়সাল্পতা ও উজ্জ্বল মুখশ্ৰী সন্দর্শন করিয়া এককালে স্নেহ, দয়া ও মমতায় আকৃষ্ট হইলেন। বসন্ত, ক্ষুধাতৃষ্ণায় ও পথশ্রান্তিতে নিতান্ত ক্লিষ্ট দ্বিতীয় অঙ্ক । ዓቄ হইয়া অচৈতন্যাবস্থায় গাঢ় নিদ্রায় অভিভূত রহিয়াছেন। তিনি জ্যেষ্ঠের প্রত্যাগমন কি নারীগণের অসম্ভাবী দয়া মায়া সম্বন্ধে কিছুই জানেন না। শ্বেত, তদীয় সমীপস্থ হইয়া উচ্চৈস্বরে বারংবার আহবান করিলে, তাহার চেতনার সঞ্চার হইল। বসন্ত, নিদ্রাভঙ্গের পর,কহিলেন, দাদা, জল আনিয়াছ, কৈ, শীঘ্ৰ আমায় জল দাও, পিপাসাতে আমার তালুদেশ ও কণ্ঠ শুষ্ক হইয়াছে, আর বিলম্ব করিও না, শীঘ্র জল দিয়া আমার দুঃসহ পিপাসার শান্তি কর, নতুবা আমার প্রাণ যায়। আগন্তক রামাগণ, সেই স্থধাংশুবদনে এবস্তুত কাতরধ্বনি শ্রবণ করিয়া আর সুস্থির থাকিতে পারিলেন না। র্তাহাদের সঙ্গে সাজির ভিতরে ঘাটে তৈল লইয়া যাইবার যে বাট ছিল, সেই বাট করিয়া জল, ও আপন আপন ইষ্টদেবতার নিবেদিত নৈবিদ্যোপকরণ সামগ্ৰী আহারার্থ অৰ্পণ করিয়া উভয় ভ্রাতার ক্ষুৎপিপাসার শান্তি করিলেন। আহা! বিধাতার বিড়ম্বনায় নরগণের যে কখন কি অবস্থা ঘটে তাহা কে বলিতে পারে ? যে শ্বেত বসন্তের, ক্ষীর, শর, নবনী, মাখন প্রভৃতি অতি উত্তমোত্তম উপাদেয় খাদ্য সামগ্ৰী স্বারা মনের সন্তোষ ও তৃপ্তি জন্মিত না, আজি সেই >> Ay মুলোচল কাৰ্য । শ্বেত বসন্ত, সামান্য সশা কলা, ছোলা মূলা প্রভৃতি অতি জঘন্য আহার সামগ্রীতে পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইলেন। বামাকুলের মধ্যে অনেকেরই মনে মনে এরূপইচ্ছা হইল যে, তাহাদিগকে সমভিব্যাহারে করিয়া গৃহে লইয়া যায়। ' ফলতঃ শ্বেত বসন্তের অবস্থাবলোকনে তাহারা সকলেই গৃহধৰ্ম্ম বিস্তৃত হইয়া চিত্রিত পুত্তলিকাবৎ তথায় দণ্ডায় । মানা রহিলেন। একটি কামিনী অার মনেরভাব গোপন রাখিতে না পারিয়া, ব্যগ্রতার সহিত কহিলেন, বৎসগণ! তোমরা এই বিজন বিস্তীর্ণ প্রান্তর মধ্যে নিঃসহায় ভাবে অবস্থিতি কর, অামার এরূপ ইচ্ছা নহে ; আমাদের বাটীতে চল, আমি তোমাদিগকে সন্তান নির্বিশেষে লালন পালন করিব, তোমরা কখন কোন বিষয়ে কষ্ট পাইবে না। সেই রমণীদিগের সদ্ব্যবহার সন্দর্শনে শ্বেতের অন্তঃকরণে সাতিশয় সন্তোষ উপস্থিত হইল ; তখন তিনি কহিলেন, মাতঃ ! আমাদের এই অবস্থায় কোথা যাওয়া কি অবস্থিতি করা কর্তব্য নহে। এই দুরবস্থার সময়ে আমাদিগের যে উপকার করিলেন, তাহা কস্মিনকালেও বিস্মৃত হইবার নহে। অধিক আর কি বলিব হয়ত ক্ষুৎপিপাসায় আমাদের জীবন শেষ দ্বিতীয় অঙ্ক । *> হইত, তোমাদের প্রদত্ত পানীয় ও ভোজন দ্রব্য প্রাপ্ত ন হইলে জীবন রক্ষার সম্ভাবনা ছিল না; তোমরা আমাদিগের জননীর কার্য্য করিয়াছ, তোমাদিগের অনুরোধ রক্ষা করা আমাদের সর্বতোভাবে কর্তব্য ; অবস্থার দোষে তাহা ঘটিল না ; এক্ষণে আমাদিগের বাক্যে অনুমোদনপূর্বক সকলেই স্ব স্ব ভবনে গমন করুন ? আমাদিগের ধৃষ্টত মনে করিয়া, মনে মনে দুঃখ প্রকাশ করিবেন না। শ্বেতের এবম্বিধ বিনয়পূর্ণ নীতিগর্ভ মৃদুমধুর বচন পরম্পর কর্ণগোচর করিয়া সীমন্তিনীগণ অসিদ্ধকাম হইয়াও প্রশস্ত চিত্তে গৃহে প্রতিগমন করি লেন । বামাকুল আর থাকিয়া কি করিবেন, ব্যাকুল মনে স্ব স্ব বাসস্থানে গমন করিলেন। শ্বেত, বসন্ত উভয় ভ্রাতা, তথা হইতে গাত্ৰোখানপূর্বক, ভাগীরথী পার হইয়া ক্রমাগত যাইতে আরম্ভ করিলেন। বেলা অবসানপ্রায় দেখিয়া একটি গ্রাম লক্ষ্য করিয়া দ্রুতপদে তথায় উপস্থিত হওনানন্তর এক গৃহস্থের বাটতে উপনীত হইলেন ; তথায় সে রাত্রি যাপন করিয়া, পরদিন প্রভাত হইবামাত্র, পুনর্বার পূর্বমত গমনে রত হইলেন। মুলোচনা কাব্য। هنو তিন চারি দিন এইরূপ অবস্থায় অতীত হইলে, পরিশেষে ভগবানগোলায় উপনীত হইলেন। সে সময়ে তাহা দের শরীর শীর্ণ মলিন, মুখশ্ৰী প্রভাশূন্য, দেখিলে আর রাজকুমার বলিয়া বোধ হয় না। অঙ্গের ভূষণ সমস্ত উন্মোচন করিয়া তাহার অল্পাংশ বিক্রয় দ্বারা কিছু অর্থ সংগ্ৰহ করিলেন। ভগবানগোলা প্রকাশ্য স্থান তথায় অবস্থান করিলে পাছে লোক পরম্পরায় মহারাজের কর্ণগোচর হয়, অতএব এখানে অবস্থিতি করা যুক্তিসঙ্গত বলিয়া বোধ হয় না। মনে মনে এই কল্পনা করিয়া, তাহারা তথা হইতে কিঞ্চিৎদৃরে, প্রায় ছয়ক্রোশ উত্তর পশ্চিমে শিকারপুর নামক স্থানে গমন করিলেন। শিকারপুর অতি রম্য স্থান, দিল্লীর সম্রাট আকবরসহ, এই নগর সংস্থাপন করেন ; তিনি মধ্যে মধ্যে শিকার করিতে আসিয়া রাজধানী পরিত্যাগপূর্বক এই স্থানে সুখে অবস্থান করিতেন। বোধ হয়, সেই জন্যই এই নগরের নাম শিকারপুর হইয়া থাকিবে। শ্বেত বসন্ত, শিকারপুরের অপূৰ্ব্ব শোভাসন্দর্শনে বিমোহিতচিত্তে তথায়ই অবস্থান স্থান নির্দেশ করিলেন। এখানে দীর্ঘকাল বাসোপযোগী একটি উৎকৃষ্ট আলয় দ্বিতীয় অঙ্ক । b) ভাড়া করিয়া লইলেন ; একজন পাচক ব্রাহ্মণ ও একটি স্বাক্ষ বিবেচক এবং ধৈর্য্যশীল কিঞ্চিৎ বয়োধিক পরিচারক নিযুক্ত করিলেন। প্রায় দুই বৎসরকাল শিকার“পুরে সচ্ছন্দচিত্তে কালযাপন হইলে, পরিশেষে শ্বেতের বয়ঃক্রম যখন ষোড়শবর্ষ, তৎকালীন একদিবস দিবাবসান সময়ে, পদব্রজে ভ্রমণ করিতে করিতে, শ্বেত নগর উপস্থিত হইয়া পড়িলেন । এমন সময়ে রবি অস্তাচলের শিখরদেশে আরোহণ করত স্বীয় মন্দীভূত কিরণ বিকীর্ণ দ্বারা পশ্চিম আকাশকে নানাবর্ণে সুচিত্রিত করিয়া নানা প্রকার প্রতিমূৰ্ত্তি কল্পনা পথে উদ্ভাবিত করণানন্তর স্বপ্লবৎ দর্শকদিগের নয়ন ও মনের আনন্দ বৰ্দ্ধন করিয়া কি অত্যাশ্চর্য্য অনিৰ্ব্বচনীয় বিস্ময়রসে অভিষিক্ত করিলেন । শ্বেতও গগনালম্বিত ঘনাবলীস্থিত সেই অত্যদ্ভুত ঘটনা বিভ্রান্তচিত্তে কাল ক্ষেপণ করিতেছেন ; ইত্যবসরে একটি শ্বেতহস্তী, প্রমত্তভাবে ষদৃচ্ছাগতিতে সহসা তথায় উপনীত হইয়া, ক্রমশঃশ্বেতের সমীপে আসিয়া স্বকীয় কর দ্বারা অতর্কিতরূপে র্তাহার কটিদেশে ধারণ পূৰ্ব্বক b.R মুলোচনা কাব্য । করী পৃষ্ঠস্থ আমার ঘরের উপরে সংস্থাপন পূর্বক মৃদুমন্দ সানন্দগমনে স্বাভলষিত প্রদেশে লইয়া চলিল। শ্বেত বহুদিনের ও বহুবিধ কষ্টের পরে যথোপযুক্ত যানারোহণে মনে অপার আনন্দ প্রাপ্ত হইয়া পরমসুখে নিদ্রা যাইতে লাগিলেন। তৎকালে পিতা কর্তৃক নিগৃহীত ও নির্বাসিত ক্লেশ তাহার অন্তর হইতে অন্তহিত হইয়াছিল ; সে সময়ে প্রাণাধিক প্রিয়তম কনিষ্ঠ সহোদরের স্নেহ তাহার স্বযুপ্তির অন্তরায় হইতে পারে নাই। সূৰ্য্যাস্তের সময়ে নিদ্রিত হন, পরদিবস সূর্য্যোদয়কালেই নিদ্রা ভঙ্গ হইল। তখন ভাতৃ স্নেহায়ত্ত্ব হৃদয়ে ব্যাকুলভাবে চিন্তা করিতে লাগিলেন, হা বিধাতঃ ! এ আবার কি বিড়ম্বনা, আবার আমায় কোথায় লইয়া চলিলে, আমার সমদুঃখভাগী জীবিতাধিক প্রিয়পাত্র বসন্তকে কোথায় রাখিলে ? সে সময়ে হস্তীর বেগ এরূপ প্রবল হইয়াছিল যে, গুরুতর বলপ্রয়োগ কি গুরুতর প্রহার ব্যতীত তাহাকে ক্ষান্ত করা দুষ্কর। নয়নোন্মীলন করিয়া দেখেন যে, পরম স্থদৃশ্য একটি নগরের অভ্যন্তরে প্রবিষ্ট হইয়াছেন, তাহার বসতির শৃঙ্খলা, প্রশস্ত ও পরিপাটী রাজপথ, অতি সুশোভিত সংখ্যাতীত আপণ দ্বিতীয় অঙ্ক । bペ) শ্রেণী, সুধাধবলিত পৰ্ব্বত সদৃশ উচ্চ সৈধশেখর বিশিষ্ট রাজপুরী এই সকল নয়নগোচর করিয়া আপাতত স্বপ্ন সন্দর্শনবৎ প্রতীয়মান হইল, পরে কিঞ্চিৎকালশান্তচিত্তে পূৰ্ব্বাপর অবলোকন করিয়া রাজপুরী ও রাজধানী বলিয়৷ স্থিরীকৃত হইল। শ্বেত তৎকালে জানিতেন না যে, তিনি কোথায় আসিয়াছেন, এই নিতান্ত অপরিচিত স্থানের সহিত যে তাহার চির পরিচিতের ন্যায় ব্যবহার করিতে হইবে, ইহা তিনি পূৰ্ব্বে কিছুই জানিতেন না। এই স্থানটি অন্য স্থান নয় এটি মহারাজ সিংহপ্রতাপের রাজধানী; এক্ষণে শ্বেতের রাজধানী হইল। নিন্দিত অতি স্বৰ্দ্দশ্য অপূর্ব রূপলাবণ্য সম্পন্ন একবিগ্ৰহ

  • পারস্যভাষার ইতিহাস লেখক এই কথা লিথিয়াছেন যে, পূৰ্ব্বতন নরপতিদিগের এক একটি শ্বেতছত্তী থাকত, উহ। রাজ্যের প্রধান অঙ্গ, ঐ ছত্তী রাজার স্থিতচিন্তায় সতত রত থাকিত । কোন মহীপতি নিঃসন্তানবস্থায় উপরত হইলে, ঐ পোষিত শ্বেতহস্তী দ্বারা রাজনিৰ্ব্বাচন হইত। এখানেও ঐ অবস্থা ঘটিয়াছিল, সিংস্থপ্রতাপ নিঃসন্তান ছিলেন তাহার মৃত্যু হইলে তদীয় শ্বেতহস্তী কিয়ৎকাল অবিরল ধারায় অশ্রপাত করিয়া নিতান্ত বিমর্ষাবস্থায় কয়েকদিবস পর্যন্ত ইতস্ততঃ পরিভ্রমণ করত পরিশেষে শিকারপুর এামের প্রভান্তদেশে প্রান্তর মধ্যে উপস্থিত হইয়া স্বীয বুদ্ধিবলে b8 মুলোচনা কাব্য।

রহিয়াছেন, তাহার সন্দর্শনে অন্তঃকরণে ভক্তিসহ স্নেহ রসের ও ভয়ের সঞ্চার হইয়া থাকে, এই কথা নগর মধ্যে প্রচারিত হইলে আবাল বৃদ্ধ বনিতা সকলেই রাজদর্শন মানসে, স্বীয় স্বীয় সঙ্গতি অনুসারে কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ উপহার সংগ্ৰহ করিয়া আগমন করিতে লাগিলেন । সিংহপ্রতাপের মহিষী শূেতকে করাখৃষ্ঠ হইতে অবতরণ করাইয়া, লক্ষণবিৎ পণ্ডিতদিগের দ্বারা আঙ্গিক লক্ষণ পরিজ্ঞাত হইয়া, রাজহস্তীর বিধিমতে প্রশংসা করিতে লাগিলেন । অনন্তর সভাসদবগ ও মন্ত্রিগণের সহিত মন্ত্রণা পূর্বক শুভদিনে শুভক্ষণে পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করিয়া শূেতকে রাজ্যাভিষিক্ত করিলেন। শৃেতের ব্যবহারে দিন দিন তাহার প্রতি অপত্য নির্বিশেষে স্নেহ, দয়া ও মমতা প্রকাশ আরম্ভ করিলেন । এইরূপে কিয়দিবস অতীত হইতে না হইতেই রাজ্ঞীর মন হইতে নিরপত্য ক্লেশ বিদূরিত হইল। তিনি শূেতকেই গর্ভজাত সন্তান জ্ঞান করিতেন । শ্বেতের আপাদমস্তকের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া রাজচিন্তু সকল শরীরে লক্ষিত হওয়াতে সিংহাসনের যথার্থ উপযুক্ত পত্র বোধে স্বীয় অভীষ্টসাধন মানসে শ্বেতকে আনয়ন করিয়াছিল। শ্বেতহস্তীকে রাজহস্তী কহিত, রাজা ভিন্ন অন্য কেহ তদীয় পৃষ্ঠদেশে আরোঙ্কণ করিতে পারিতেন না । শ্বেত অতুল ঐশ্বর্য্যের অধিপতি হইয়া ও সমুদায় সুখের অধিকারী হইয়াও দুঃখের হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাইতে পারিলেন না। বসন্তের বিয়োগদুঃখ অহরহ তাঁহার হৃদয় দগ্ধ করিতে লাগিল। তিনি রাজকার্য্য হইতে অবসৃত হইয়া যৎকালে আমোদ প্রমোদে রত হইতেন, তৎকালে কনিষ্ঠের অবস্থা স্মৃতিপথে উদিত হইয়া মর্ম্মবেদনা প্রদান করিত। সে সময়ের হৃদয়বাহী অশ্রুজল ও সায়ংকালীন কমল অপেক্ষা নিষ্প্রভ মুখকমল সন্দর্শনে সকলেই তাঁহার মর্ম্মান্তিক যাতনার পরিচয় প্রাপ্ত হইত। যাহা হউক, কি শোক কি দুঃখ কিছুই চিরকাল লোকের মন অধিকার করিয়া থাকিতে পারেনা, ক্রমে সকলই মন্দীভূত হইয়া পরিশেষে এককালে অন্তর্হিত হয়। শ্বেতের তাহাই ঘটিল, কিয়দ্দিন শোকতাপ করিয়া অবশেষে ক্লেশ পরিশূন্য হইয়া বিষয় সুখসম্ভোগে কাল কর্ত্তন করিতে লাগিলেন।