সোনার তরী/ঝুলন

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


 
আমি পরানের সাথে খেলিব আজিকে
                 মরণখেলা
                 নিশীথবেলা ।
            সঘন বরষা , গগন আঁধার ,
            হেরো বারিধারে কাঁদে চারি ধার ,
            ভীষণ রঙ্গে ভবতরঙ্গে
                 ভাসাই ভেলা ;
            বাহির হয়েছি স্বপ্ন-শয়ন
                 করিয়া হেলা
                 রাত্রিবেলা ।
  
  
ওগো , পবনে গগনে সাগরে আজিকে
                 কী কল্লোল ,
                 দে দোল্‌ দোল্‌ ।
            পশ্চাৎ হতে হা হা ক ' রে হাসি
            মত্ত ঝটিকা ঠেলা দেয় আসি ,
            যেন এ লক্ষ যক্ষশিশুর
                 অট্টরোল ।
            আকাশে পাতালে পাগলে মাতালে
                 হট্টগোল ।
                 দে দোল্‌ দোল্‌ ।
  
  
আজি জাগিয়া উঠিয়া পরান আমার
                 বসিয়া আছে
                  বুকের কাছে ।
            থাকিয়া থাকিয়া উঠিছে কাঁপিয়া ,
            ধরিছে আমার বক্ষ চাপিয়া ,
            নিঠুর নিবিড় বন্ধনসুখে
                 হৃদয় নাচে ;
            ত্রাসে উল্লাসে পরান আমার
                 ব্যাকুলিয়াছে
                 বুকের কাছে ।
  
  
হায় , এতকাল আমি রেখেছিনু তারে
                 যতনভরে
                 শয়ন ' -পরে ।
            ব্যথা পাছে লাগে — দুখ পাছে জাগে
            নিশিদিন তাই বহু অনুরাগে
            বাসরশয়ন করেছি রচন
                 কুসুম-থরে ;
             দুয়ার রুধিয়া রেখেছিনু তারে
                 গোপন ঘরে
                 যতনভরে ।
  
  
কত সোহাগ করেছি চুম্বন করি
                 নয়নপাতে
                 স্নেহের সাথে ।
            শুনায়েছি তারে মাথা রাখি পাশে
            কত প্রিয় নাম মৃদু মধুভাষে ,
            গুঞ্জরতান করিয়াছি গান
                 জ্যোৎস্নারাতে ।
            যা-কিছু মধুর দিয়েছিনু তার
                 দুখানি হাতে
                 স্নেহের সাথে ।
  
  
শেষে সুখের শয়নে শ্রান্ত পরান
                 আলস-রসে
                 আবেশবশে ।
            পরশ করিলে জাগে না সে আর ,
            কুসুমের হার লাগে গুরুভার ,
            ঘুমে জাগরণে মিশি একাকার
                 নিশিদিবসে ।
            বেদনাবিহীন অসাড় বিরাগ
                 মরমে পশে
                 আবেশবশে ।
  
  
ঢালি মধুরে মধুর বধূরে আমার
                 হারাই বুঝি ,
                 পাই নে খুঁজি ।
             বাসরের দীপ নিবে নিবে আসে —
            ব্যাকুল নয়নে হেরি চারি পাশে
            শুধু রাশি রাশি শুষ্ক কুসুম
                 হয়েছে পুঁজি ।
            অতল স্বপ্নসাগরে ডুবিয়া
                 মরি যে যুঝি
                 কাহারে খুঁজি ।
  
  
তাই ভেবেছি আজিকে খেলিতে হইবে
                 নূতন খেলা
                 রাত্রিবেলা ।
            মরণদোলায় ধরি রশিগাছি
            বসিব দুজনে বড়ো কাছাকাছি ,
            ঝঞ্ঝা আসিয়া অট্ট হাসিয়া
                 মারিবে ঠেলা
            আমাতে প্রাণেতে খেলিব দুজনে
                 ঝুলনখেলা
                 নিশীথবেলা ।
  
                 দে দোল্‌ দোল্‌ ।
                 দে দোল্‌ দোল্‌ ।
            এ মহাসাগরে তুফান তোল্‌ ।
            বধূরে আমার পেয়েছি আবার —
                 ভরেছে কোল ।
            প্রিয়ারে আমার তুলেছে জাগায়ে
                 প্রলয়রোল ।
            বক্ষ-শোণিতে উঠেছে আবার
                 কী হিল্লোল!
            ভিতরে বাহিরে জেগেছে আমার
                 কী কল্লোল!
             উড়ে কুন্তল , উড়ে অঞ্চল ,
            উড়ে বনমালা বায়ুচঞ্চল ,
            বাজে কঙ্কণ বাজে কিঙ্কিণী
                 মত্ত-বোল ।
                 দে দোল্‌ দোল্‌ ।
            আয় রে ঝঞ্ঝা , পরান-বধূর
            আবরণরাশি করিয়া দে দূর ,
            করি লুণ্ঠন অবগুণ্ঠন-
                 বসন খোল্‌ ।
                 দে দোল্‌ দোল্‌ ।
             প্রাণেতে আমাতে মুখোমুখি আজ
            চিনি লব দোঁহে ছাড়ি ভয়-লাজ ,
            বক্ষে বক্ষে পরশিব দোঁহে
                 ভাবে বিভোল ।
                 দে দোল্‌ দোল্‌ ।
            স্বপ্ন টুটিয়া বাহিরেছে আজ
                 দুটো পাগল ।
                 দে দোল্‌ দোল্‌ ।