বিষয়বস্তুতে চলুন

স্বদেশিনী/আত্মদ্রোহিতা

উইকিসংকলন থেকে

আত্মদ্রোহিতা।

কোথা গেল সেই স্বর্ণলঙ্কাপুরী
বীর-মণি-খনি রক্ষেন্দ্র নগরী
আপনি প্রচেত তুলিয়া লহরী
ধোয়াইত যার চরণ তল।

দোর্দণ্ড-প্রতাপ কোথা সে রাবণ
কোথা ইন্দ্রজিত রক্ষেন্দ্র নন্দন
কোথা ভীমকায় সে কুম্ভকরণ
লক্ষ লক্ষ রক্ষ বীর সকল।


জগতে অতুল রক্ষ সভাস্থান
দ্বিতীয় সমুদ্র পরিধি সমান
দেব-শিল্পী বিশ্বকর্ম্মার নির্ম্মাণ
যে সভা গৌরবে ছিল অতুল।


বিরাজিত যাহে রাজেন্দ্র রাবণ
মন্ত্রণা-কুশল সচিব সারণ
লক্ষ লক্ষ রক্ষ বুধ অতুলন
সংগ্রামে ভীষণ বীরেন্দ্র কুল।


যেই সভাস্থলে সভয়ে পবন
আপনি বহিত মন্দ সমীরণ
ত্রিদিবের গর্ব্ব পারিজাত ধন
সুরভি চৌদিকে করি বিস্তার।


করাল কৃতান্ত যার অশ্বালয়ে
উপস্থিত থাকি সভয় হৃদয়ে
যোগাত আহার তৃণরাশি লয়ে
ত্যজিয়া আপন কর্ম্মের ভার

সেই বীর দর্প বিভব বিপুল
সে জ্বলন্ত গ্রহ সম বীরকুল
সহসা কিসে সে মার্ত্তণ্ড অতুল
খসি সে সাম্রাজ্য নিভিয়ে গেল।


হরেছিল বটে জনক নন্দিনী;
সতী শাপে রক্ষ-কম-দিনমণি
বীর-বৃন্দ-দীপ-সজ্জিত বিপনি
শুধু কি সতীর শ্বাসে নিভিল?


দুষ্কৃতের ফল দূরে কি নিকটে
ঘটে থাকে সত্য মনুজ ললাটে
তা বলে কি কভু দীপাগ্নি নিকটে
শুখায় অর্ণব অতল জল?


শুধু কি সতীর সন্তাপে রাবণ―
―মধ্যাহ্নে কি সেই জলন্ত তপন
খসিয়া পড়িত সহ গ্রহণণ
না থাকিত যদি ক্রুর সে খল?


যদি সে বিধর্ম্মী ক্রুর বিভীষণ
আত্মোদ্রোহী হয়ে শত্রুর স্মরণ
না লইত;―কহি গুপ্ত বিবরণ
যদি না রাঘবে যন্ত্রণা দিত?

সে সাহস-শৌর্য্য-সজ্জিত তরণী
সহ কি তবে সে রক্ষ নৃপ মণি
নর-কপী-রপ-সাগরে অমনি
ডুবি রসাতলে অদৃষ্ট হত?


যখন কাতরে বীরেন্দ্র রাবণি
কহে খুল্লতাতে সবিনয় বাণী:
―ছাড় তাত পথ আনিব এখনি
অস্ত্রাগারে পশি ভীষণ অসি।


করিলাম তাত অগ্নি উপাসনা
কর আশীর্ব্বাদ পূরুক রাষন।
বিনাশি রিপুরে পিতার ভাবনা
ঘুচাইব রণ-তরঙ্গে পশি।―


কি উত্তর দিল তখন পামর,
কি রূপে সৌমিত্রি করিল সমর;
কেমনে লঙ্কার গৌরব-ভাস্কর
স্বজাতি-বিদ্রোহ-নীরে ডুবিল?


যেই কুম্ভকর্ণ রাক্ষস অতুল
মানব বানর ভক্ষ্য সমতুল;
কিসে হল সেই বীরের নির্মূল?—
বিদ্রোহী সোদর মন্ত্রণা দিল।

রাবণের গৃহে আছে মৃত্যুবাণ
কেমনে জানিবে বৈরী সে সন্ধান?
রক্ষ কুলাঙ্গার কুমন্ত্রণা দান
করিয়া অগ্রজে হায় বহিল।


এরূপে স্বজাতি-বিদ্রোহ-অনলে
রক্ষ বংশ ধ্বংস হইল অকালে
রাক্ষস সাম্রাজ্য গেল রসাতলে
কিছু চিহ্ন তার নাহিক আর।


নাহি আর সেই স্বর্ণলঙ্কাপুরী,
এখন সে দেশ সামান্য নগরী;
ভীম পারাবার তুলিয়া লহরী
জানাইছে শুধু অস্তিত্ব তার।


স্বজাতি-বিদ্রোহ—ঈর্ষার অনলে
কৌরব সাম্রাজ্য গেল রসাতলে—
আর্য্য-শৌর্য্য-রবি চির অস্তাচলে
ডুলি ভারত করি আঁধার।


দেখ চেয়ে ঐ হস্তিনা নগরী
ইন্দ্রালয় জিনি ইন্দ্রপ্রস্থপুরী,
বিভবশালিনী সম ধনেশ্বরী;
বীর-মাতা বীর-জনম-স্থান।

দিল্লী নামে এবে আর্য্যের হস্তিনা
বিজাতি-পদাঙ্ক-হৃদয়-মলিনা,
কর-পদ-ভগ্ন রূপসী অঙ্গনা;
অন্নাভাবে দীনা―কাতর প্রাণ।


কোথায় সে সব কোথা আর্য্যকুল,
কোথা কর্ণবীর সংগ্রামে অতুল,
রবির তনয় রবি সমতুল;―
বিক্রমে যাহার কম্পিত ধরা?


কোথা সব্যসাচী গাণ্ডিবী অর্জ্জুন,
কোথা দ্রোণাচার্য্য সমরে নিপুণ,
ভীম-কর্ম্মা ভীম অরি নিসূদন;―
যে ভাবিত ধরা সমाন শরা?


এ বিপুল পাণ্ডু-কৌরব সাম্রাজ্য
নিঃক্ষত্রিয় রণে হল আর্য্য-রাজা;
কারণের যোগ্য হয় সদা কার্য্য,
দেখ মুলে আত্মদ্রোহিতানল।


দৈব অনিবার্য্য দৈবজ্ঞেতে বলে।
শুধু দৈবে নাহি সমুদ্র উথলে,
দৈবে গ্রহ নাহি খসে ধরাতলে;―
―দৈব নহে শুধু করম ফল।

অতুল ক্ষমতা রাজ সিংহাসন
দেখি ইন্দ্রপ্রস্থ ক্রুর দুর্য্যোধন
প্রলয়ের বীজ করিলা বপন―
জ্বালিল হৃদয়ে অসূয়ানল।


দহিল যে অগ্নি সোনার ভারত
বহ্নি-মুখ-বীক্ষ্য পতঙ্গের বৎ;
যে অগ্নি নিক্ষত্র করিনা ভারত―
জ্বলিল-নিভৃতে শিখাগ্নি তার!


এই স্থানে হল আর্য্যের পতন;
নিভিল ভারত গৌরব তপন―
আপনা আপনি করি ঘোর রণ;
করি আর্য্যাবর্ত্ত চির আঁধার।


বৈরী ভাবে যবে কুরু-পাণ্ডুগণে
সম্মুখীন হয়ে সমর অঙ্গনে
হানিলা কৃপাণ আর্য্য আর্য্যগণে
ঘোর সিংহনাদে করি চীৎকার।—


আর্য্য রাজ লক্ষ্মী তখনি চঞ্চলা;
চমকে বিজাতি-সৌভাগ্য-চপলা;
হিন্দুর ভবিষ্য ছায়া দেখা দিলা
বিপুল গগন করি আঁধার।

জাতীয় বিদ্রোহ ঈর্ষার অনলে
কৌরব সাম্রাজ্য ধ্বংসিল অকালে;
লক্ষ বীর শির লুণ্ঠিত ভূতলে;
কুরুক্ষেত্র রাঙা রুধিরে তার।


পুনঃ জন্মেছিল হিন্দুরাজগণ;
করেছিল গর্ব্বে শির উত্তোলন;
উজলিয়া ছিল পুরুর কিরণ
মলিন এ ভারত বটে আবার।


পুনঃ জাতীয় বিদ্রোহ ঝটিকা বহিল,
একে একে সব প্রদীপ নিভিল;
দুষ্ট তক্ষশীল বিদ্রোহী হুইল―
লইল শত্রুর পদে স্মরণ।


বিজাতির সহ সম্বন্ধ স্থাপন
করি মানসিংহ লঙ্ঘিলা নিয়ম;―
প্রতাপের সহ করি ঘোর রণ
বহাল স্বজাতি রুধির ধার।


মানসিংহ যদি বিপক্ষ না হত
তবে কি প্রতাপ-সূর্য্য অস্ত যেত,
উজ্জ্বল করিত নাকি এ ভারত;
যশো-রশ্মি ছটা করি বিস্তার?

দেখি রাজ-শ্রী নব সিংহাসন
ঈর্ষামদে লুব্ধ জয়চাঁদ মন;
গোপনে শত্রুরে লিখিয়া লিখন
বিনাশিলা পৃথ্বীরাজ মহান্।


স্বজাতি-বৈরিতা যে করিতে পারে
কেমনেতে বৈরী বিশ্বাসিবে তাৱে?
বিধি তার বদ্ধ থাকা কারাগারে
রাখিতে অযোগ্য ঘূণিত প্রাণ।


অই দেখ চেয়ে যবন শিবিরে
মহারাষ্ট্রপতি শিবাজী কাতরে
জয়সিংহ রায় ক্ষত্রকুলেশ্বরে
বুঝাইছে কত মিনতি করি।―


কার সনে ক্ষত্র ধর্ম্মের পালন
কর মহারাজ; বিধর্ম্মী যবন;
ত্যজহ যবনে ক্ষত্রিয় রাজন্;
কি ভয় মরণে রণে না ডরি।


মীরজাফর মিশি ক্লাইবের মনে
মোগল সাম্রাজ্য ধ্বংসিল কেমনে;
স্বজাতি-বৈরিতা করিয়া গোপনে
আপনারও ছাই পাড়িলা পাতে।

হায় এ ভীষণ ঈর্ষা, জাতীয় বিবাদ
দূর হবে যবে অন্তর হতে
তবেই সে দেশ উঠিবে ফুটিয়া
চির-স্বাধীনতা-রবি-বিভাতে।


কাল ভিন্ন সেই সাম্রাজ্য ধ্বংসিতে
না পারিবে শত্রু বলে কি ছলে;
কি সাধ্য বৈরীর জাতীয় বিবাদ
ভিন্ন সিংহাসন লইতে বলে।


কখন কি হার জাতীয় একতা
বঙ্গবাসী হৃদে উদয় হবে;
কখন কি ওগো দীন বঙ্গবাসী
এ-রত্ন লভিতে যতন পাবে?


জাতীয়-একতা-দুর্ভেদ্য তোরণ
যদি কভু বঙ্গে স্থাপিত হয়
অব ঘুচিবে দুদিন তখন—
সেই দিন হবে ভারতে জয়।


জাতীয় বিবাদ জাতীয় একতা
উন্নতি ও অধঃপতন হেতু;
প্রবল-বিদ্রোহ-অকূল-সাগরে
জাতীর একতা সুদৃঢ় সেতু।