স্বদেশী সমাজ/অহেতুক জলকষ্ট
অহেতুক জলকষ্ট
শ্রীমতী মধ্যমা
জলকষ্ট সম্বন্ধে আমাদের ভগিনী শ্রীমতী কনিষ্ঠা দেশের ধনী বিধবাদের নামে যে অভিযোগ আনিয়াছেন তাহা সমস্তই মানিয়া লওয়া গেল। দেশে ধনী বিধবা কয়জনই বা আছেন? তাঁহারা সকলেই যদি তৃষার্তকে দয়া করিতে আরম্ভ করেন, তাহা হইলেও কতটুকুই বা সুবিধা হইবে?
কিন্তু দয়া হয় না কেন? সেইটেই ভাবিবার কথা।
শ্রীমতী কনিষ্ঠাকে আমি একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করি। যেখানে জলের অভাব নাই সেখানেও যে দেশের লোক জোর করিয়া অকারণে জলকষ্ট সৃজন করে, তৃষ্ণা কাহাকে বলে সে দেশের লোককে কি ঈশ্বর জানাইবেন না? পাপ না থাকিলে কি মানুষ এত দুঃখ পায়?
যাঁহারা দেশের লোক-তালিকা আলোচনা করিয়াছেন, তাঁহারা বলিতে পারেন বাংলাদেশে বিধবার সংখ্যা কত? নিশ্চয়ই বড়ো কম নয়। ইহাদের মধ্যে নিতান্ত শিশু বালবিধবাও অনেক আছে। দুটি-একটি বিধবা নাই এমন হিন্দুঘর বোধ হয় বাংলাদেশে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না।
শ্রীমতী কনিষ্ঠা একবার একাদশীর কথাটা ভাবিয়া দেখুন দেখি দেশের এক সীমা হইতে আর-এক সীমা পর্যন্ত প্রত্যেক হিন্দুর ঘরে সে কী দুঃখ! রোগী-বিধবা জল না পাইয়া মরিতেছে, শিশু-বিধবা পাছে লুকাইয়া জল খায় বলিয়া তাহাকে ঘরে দরজা বন্ধ করিয়া রাখা হইতেছে এবং আচারবর্তী বিধবা শুষ্কতালু লইয়া মনে মনে একাদশীর প্রত্যেক দণ্ড গণনা করিতেছে।
বাংলাদেশের ভগবান্ যদি এমন নিষ্ঠুর হন যে, এই-সকল হতভাগিনী অবলাদের পক্ষে বিনা কারণে অসহ্য জলতৃষ্ণাকেই তিনি পুণ্যের উপায় করিয়া থাকেন, তবে এ দেশের মানুষের মনে দয়া হইবে কেমন করিয়া? বাপ মা যেখানে মেয়েকে, ছেলে মেয়ে যেখানে মাকে, মরিয়া গেলেও মুখে জল দিতেছে না, সেখানে দেশের জলকষ্টের জন্যে দুটো-চারটে ধনী বিধবার মনে দয়া জন্মাইবার চেষ্টা করিয়া ফল কী হইবে?
অথচ শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতকে যখন জিজ্ঞাসা করি তাঁহারা সকলেই বলেন, এরূপ নিরম্বু উপবাস কোনো প্রামাণ্য শাস্ত্রের বিধান নহে। তবে তাঁহারা এই অশাস্ত্রীয় বর্বরতার বিরুদ্ধে কথা কহেন না কেন? তাঁহাদের সাহস হয় না। যে দেশের শাস্ত্রজ্ঞানীরা এত বড়ো অধর্ম করিতে পারেন, সে দেশ জলের কষ্ট কাহাকে নিবেদন করিবে?
বিশেষ কোনো তিথিতে মানুষ জল না খাইলে দয়াময় ভগবান তাহার ’পরে বিশেষভাবে প্রসন্ন হন এ কথা বিশ্বাস করেন না এমন লোক নিশ্চয়ই এ দেশে অনেক আছেন, তবু তাঁহারা যদি তাঁহাদের কন্যা ভগিনী মাতাকে জানিয়া শুনিয়া নিষ্ফল পীড়া দিতে পারেন, তবে এমন পাপিষ্ঠ দেশকে দয়া করিবে কে?
এমনও শুনিয়াছি— একাদশীর দিনে বিধবার নিরম্বু-উপবাস বাংলাদেশের বাহিরে কোথাও প্রচলিত নাই। যে প্রথা কোনো শ্রদ্ধেয় শাস্ত্রে উপদিষ্ট বা অধিকাংশ হিন্দুসমাজেই অনুষ্ঠিত হয় না, সেই প্রথাকে দেশের পণ্ডিত লোকেরা যদি উঠাইয়া দিতে না পারেন— যে-সকল অন্যায় তাঁহাদের স্বকৃত এবং যাহার প্রতিকার তাঁহাদের সাধ্যায়ত্ত তাহাদের সম্বন্ধেও যদি তাঁহারা উদাসীন থাকেন— তবে জলকষ্টের কথা যে আমরা লজ্জায় মুখে আনিতে পারিব না।
আমাদের অনেক দুঃখকষ্টের প্রতিকারের জন্য দেশের শিক্ষিত লোকে গবর্মেণ্টের কাছে দাবি করিয়া থাকেন। তখন তাঁহাদের মনের উত্তেজনা ও ভাষার অসংযম দেখিয়া আশ্চর্য হইতে হয়। দেশের দুঃখে বাস্তবিকই যদি তাঁহারা এত অধিক ব্যথা পান, তবে যে-সকল দুঃখ নিজেরা দূর করিতে পারেন সাহস করিয়া তাহা দূর করিতে চেষ্টা করুন। আর শ্রীমতী কনিষ্ঠার প্রতি আমার নিবেদন এই যে, তাঁহার ঘরের মধ্যে যে অনাবশ্যক অন্যায় জলকষ্ট আছে তাহা নিবারণ করিবার জন্য তাঁহার যতটুকু শক্তি আছে তাহা যদি প্রয়োগ করিতে পারেন, তবে দেশের জলাভাবের কথা উত্থাপন করিবার অধিকার তাঁহার জন্মিবে এবং কর্তব্যবিমুখ নরনারীকেও সবলে তিরস্কার করিতে পারিবেন।
আষাঢ় ১৩১২