স্বদেশী সমাজ/জলকষ্ট
জলকষ্ট
শ্রীমতী কনিষ্ঠা
গতবৎসর জলকষ্ট লইয়া আমাদের দেশে একটা আন্দোলন হইয়া গেছে। সুতরাং এ আন্দোলন আর যে শীঘ্র উঠিবে, এমন আশা নাই— কেননা, কথা কহিয়া কাগজে লিখিয়া আমাদের মনটা বেশ খোলসা হইয়া গেছে।
আমাদের ঘরের কাছে জলের কল আছে, অতএব পাড়াগাঁয়ের জলের কষ্ট লইয়া আমরা যেটুকু মাথা বকাইয়াছিলাম, তাহাতে আমাদের বিশুদ্ধ দেশানুরাগ প্রকাশ পাইয়াছে।
কেবল দুঃখ এই— এ দেশানুরাগে জলের তৃষ্ণা মেটে না, জ্যৈষ্ঠের পর জ্যৈষ্ঠমাস ফিরিয়া আসে। দেশের তালু শুকাইয়া যায়, মধ্যাহ্নে অতিথি আসিয়া জল চাহিলে এক গণ্ডূষ জল দিতে গৃহীর হাত সরে না, প্রখর রৌদ্রে ভিজা বালি খুঁড়িয়া তুলিয়া সেই বালি মাথায় দিয়া স্নানের কাজ সারিতে হয় এবং একটি ঘড়া জল আনিতে মেয়েরা দেড় ক্রোশ তপ্তপথ হাটিয়া যায় এবং ফিরিতে আর দেড়টি ক্রোশ লাগে। ইহা আমার জানা কথা।
এই দেশানুরাগীদের পূর্বপুরুষেরাই গ্রামে গ্রামে পুকুর দিয়াছিলেন, পথের ধারে জলসত্র খুলিয়াছিলেন, জ্যৈষ্ঠমাসে বরফমিশ্রিত লেমনেড খাইবার সময় এই কথাটা চিন্তা করিয়া দেখা আবশ্যক।
পুরুষের দেশানুরাগ, বোধ করি, লোকের ক্ষুধা-মিটানো, তৃষ্ণামিটানো, রোগের তাপ-নিবারণ করার কথা তেমন করিয়া ভাবিতে পারে না। মন্ত্রিসভার সভ্য হওয়া, মোটা মাহিনার চাকরি পাওয়া, এইগুলাই তাহারা বেশি করিয়া বোঝে।
কিন্তু ক্ষুধিতের অন্ন জুটিতেছে না এবং তৃষিত জল পাইতেছে না ইহাতে আমাদের স্ত্রীলোকের প্রাণ যদি না কাঁদে, তবে দেশের মর্মস্থান পর্যন্ত বিকৃত হইয়া গেছে এ কথা মানিতে হইবে।
স্ত্রীলোকের হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা নাই, পুরুষেই কর্তা, এই একটা বলিবার কথা আছে বটে। কথাটা সম্পূর্ণ সত্য কি না সে আলোচনা আপাতত করিতে চাই না। কিন্তু দেশে বিধবা-স্ত্রীলোকের হাতে জমিদারি পড়িয়াছে, দেশে এমন ঘটনা বিরল নহে। কাগজে যখন দেখিতে পাই তাঁহারা সদর স্টেশনে গবর্মেণ্টের সদর-আপিস-নির্মাণের জন্য জমি ছাড়িয়া দিতেছেন, তখন আমি বাঙালি স্ত্রীলোক, স্বদেশী মেয়েদের উপর আমার ধিক্কার জন্মে।
আমাদের দেশের পুরুষেরা অনেক দিন হইতে গোলামি করিয়া আসিতেছে— গবর্মেণ্টের নাড়া না খাইলে, উপাধির লোভ না পাইলে, তাহাদের যদি সাড়া না পাওয়া যায়, তবে নাহয় তাহাদিগকে মাপ করা যাইবে। কিন্তু আমরা মেয়েমানুষ, আমাদের একটা গর্ব ছিল যে, দেশের ধর্ম দেশের অন্তঃপুরেই শেষ আশ্রয় লইয়াছে। আমাদের এই গর্ব ছিল যে, যখন দেশের পুরুষেরা অনেক দিন ধরিয়া যে চরণের আঘাত খাইতেছে সেই চরণে লুটাইয়াই জন্ম কাটাইল, তখন মেয়েরা যে চরণকে ভক্তি করে সেই চরণেরই সেবা করিয়া আসিয়াছে। মেয়েরা ভয়ের তাড়না বা লোভের উত্তেজনায় নয়, কিন্তু প্রাণের টানেই ক্ষুধিতের ক্ষুধা, তৃষ্ণার্তের তৃষ্ণা মিটাইয়া আসিয়াছে, রোগের সেবা ও শোকের সান্ত্বনা তাহাদের স্নেহেরই কাজ, অতএব ধর্মই তাহাদের পক্ষে যথেষ্ট— রাজদণ্ডের প্রয়োজন নাই।
দেশের কপালক্রমে এখন কি তাহার উল্টা দেখিতে হইবে? দেশে যখন অন্নজলের টানাটানি তখন যে স্ত্রীলোকের হাতে ভগবান সামর্থ্য দিয়াছেন, সেও তেলামাথায় তেল ঢালিয়া গেজেটে নাম লিখাইতে যাইবে? আমরা মেয়েমানুষ, আমাদের আবার নাম কিসের? আমাদের স্বামীর নাম হোক, আমাদের ছেলের নাম হোক—নাম আমাদের বাপের আমাদের শ্বশুরের হোক্, ধর্ম আমাদের থাক্!
আমি কোনোমতেই বিশ্বাস করিতে পারিব না যে, আমাদের মেয়েদের প্রাণ কঠিন হইয়া গেছে। তাহা হইলে সংসার চলিত না। যে মেয়েরা ঈশ্বরের কৃপায় অন্নদান জলদান করিবার ক্ষমতা পাইয়াছেন, তাঁহারা নিশ্চয়ই ভালো করিয়া জানেন না কোথায় ক্ষুধা— কোথায় তৃষ্ণা।
আজ কাঠফাটা রৌদ্রের দিনে বাংলাদেশের তৃষ্ণা যে কতখানি, তাহা নিশ্চয়ই তাহাদের কানে পৌঁছায় না। যাহারা জানে তাহারা বলিবে— এত অসহ্য দুঃখ, মহাপাপ নহিলে দেশে ঘটিতে পারে না। সে পাপের বিচার ভগবান করুন— কিন্তু যে মেয়েমানুষ সে যেন তাহার পোষ্যপুত্রটির উদ্দেশে কেবল কোম্পানির কাগজের সুদ না গোণে; তৃষ্ণাতুর দেশ যখন তাহার প্রাসাদের দ্বারে দাঁড়াইয়া ডাকিতে থাকে ‘মা আমাকে একটু জল দাও’, তখন যেন মোটা দেওয়ানবাবু তাড়া করিয়া আসিয়া এই হতভাগ্য অতিথিকে চোখের জলে বিদায় করিয়া না দেয়।
জেলার ম্যাজিস্ট্রেটের চাঁদার খাতায় যদি বড়ো বড়ো অঙ্কপাত করিতে হয়, তবে এমন করিয়া কি করা যায় না যাহাতে দেশের মুখে কলঙ্কপাত না হয়, যাহাতে গেজেটেও নাম ওঠে আর পিপাসার জল পাইয়া পীড়িত ভগবানও প্রসন্ন হন? ম্যাজিস্ট্রেটের চেয়েও তিনি কি ছোটো?
জ্যৈষ্ঠ ১৩১২