স্বদেশী সমাজ/পরিশিষ্ট
পরিশিষ্ট
রবীন্দ্রনাথ-কর্তৃক
বর্জিত রচনাংশ
বঙ্গদর্শন (১৩১১) ও আত্মশক্তি (১৩১২) উভয় স্থলেই ‘স্বদেশী সমাজ’ ও ‘‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধের পরিশিষ্ট’ উভয়ের বিস্তৃততর পাঠ দেখা যায়। বঙ্গদর্শনের যে অংশগুলি সমূহ (১৩১৫) বা বর্তমান গ্রন্থ হইতে বর্জিত (অনেক সময় আত্মশক্তি হইতেও বর্জিত) সংখ্যার সংকেতে সেগুলির স্থান-নির্দেশ-পূর্বক অতঃপর সংকলিত হইল। প্রবন্ধের সূচনায় (বর্তমান গ্রন্থের পৃ ৫) বর্জিত—
১‘সুজলা সুফলা’ বঙ্গভূমি তৃষিত হইয়া উঠিয়াছে। কিন্তু সে চাতকপক্ষীর মতো উর্ধ্বের দিকে তাকাইয়া আছে, কর্তৃপক্ষীয়েরা জলবর্ষণের ব্যবস্থা না করিলে তাহার আর গতি নাই।
গুরু গুরু মেঘগর্জন শুরু হইয়াছে—গবর্মেণ্ট্ সাড়া দিয়াছেন— তৃষ্ণানিবারণের যা-হয়-একটা উপায় হয়তো হইবে— অতএব আপাতত আমরা সেজন্য উদ্বেগ প্রকাশ করিতে বসি নাই।
আমাদের চিন্তার বিষয় এই যে, পূর্বে আমাদের যে-একটি ব্যবস্থা ছিল, যাহাতে সমাজ অত্যন্ত সহজ নিয়মে আপনার সমস্ত অভাব আপনিই মিটাইয়া লইত, দেশে তাহার কি লেশমাত্র অবশিষ্ট থাকিবে না?
আমাদের যে-সকল অভাব বিদেশীরা গড়িয়া তুলিয়াছে ও তুলিতেছে, সেইগুলাই নাহয় বিদেশী পূরণ করুক। অন্নক্লিষ্ট ভারতবর্ষের চায়ের তৃষ্ণা জন্মাইয়া দিবার জন্য কর্জন্সাহেব উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছেন, আচ্ছা, নাহয় অ্যান্ণ্ড্রয়ূল-সম্প্রদায় আমাদের চায়ের বাটি ভরতি করিতে থাকুন; এবং এই চায়ের চেয়েও যে জ্বালাময় তরলরসের তৃষ্ণা, যাহা প্রলয়কালের সূর্যাস্তচ্ছটার ন্যায় বিচিত্র উজ্জ্বল দীপ্তিতে উত্তরোত্তর আমাদিগকে প্রলুব্ধ করিয়া তুলিতেছে, তাহা পশ্চিমের সামগ্রী এবং পশ্চিমদিগ্দেবী তাহার পরিবেশনের ভার লইলে অসংগত হয় না। কিন্তু জলের তৃষ্ণা তো স্বদেশের খাঁটি সনাতন জিনিস। ব্রিটিশ গবর্মেণ্ট্ আসিবার পূর্বে আমাদের জলপিপাসা ছিল এবং এতকাল তাহার নিবৃত্তির উপায় বেশ ভালোরূপেই হইয়া আসিয়াছে— এজন্য শাসনকর্তাদের রাজদণ্ডকে কোনোদিন তো চঞ্চল হইয়া উঠিতে হয় নাই।
পৃ ৫, প্রথম অনুচ্ছেদের পরে—
২দেশে এই যে-সমস্ত লোকহিতকর মঙ্গলকর্ম ও আনন্দ-উৎসব এতকাল অব্যাহতভাবে সমস্ত ধনী-দরিদ্রকে ধন্য করিয়া আসিয়াছে, এ জন্য কি চাঁদার খাতা কুক্ষিগত করিয়া উৎসাহী লোকদিগকে দ্বারে দ্বারে মাথা খুঁড়িয়া মরিতে হইয়াছে, না, রাজপুরুষদিগকে সুদীর্ঘমন্তব্য-সহ পরোয়ানা বাহির করিতে হইয়াছে! নিশ্বাস লইতে যেমন আমাদের কাহাকেও হাতে-পায়ে ধরিতে হয় না, রক্তচলাচলের জন্য যেমন টৌনহল-মীটিং অনাবশ্যক, সমাজের সমস্ত অত্যাবশক হিতকর ব্যাপার সমাজে তেমনি অত্যন্ত স্বাভাবিক নিয়মে ঘটিয়া আসিয়াছে।
পৃ ৯, প্রথম অনুচ্ছেদের শেষে বঙ্গদর্শনে ছিল—
৩সেই জন্যই আজও আমাদের মাথা একেবারে মাটিতে গিয়া ঠেকিতে পায় নাই।
পৃ ৯, দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে প্রথম বাক্যের পর—
৪এমন-কি, আমাদের সামাজিক প্রথাকেও ইংরাজের আইনের দ্বারাই আমরা অপরিবর্তনীয়রূপে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধিতে দিয়াছি—কোনো আপত্তি করি নাই।
পৃ ১০, ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ ছত্রের অন্তর্বর্তী অংশ—
৫সুস্থ অবস্থায় শারীরিক ক্রিয়ার প্রবর্তক অব্যবহিত উত্তেজনা শরীরের মধ্যেই থাকে—যখন মৃগনাভি, অ্যামোনিয়া, সাপের বিষ দিয়া শরীরকে সক্রিয় করিতে হয়, তখন অবস্থাটা নিতান্ত সংশয়াপন্ন। আজকাল আমাদের সমাজশরীরের আভ্যন্তরিক উত্তেজনা ইহাকে কোনো কাজেই প্রবৃত্ত করিতে পারিতেছে না, বৈদ্যমহাশয়ের বড়ি না হইলে একেবারে অচল।
পৃ ১০, ঊনবিংশ ও বিংশ ছত্রের মধ্যে বঙ্গদর্শনে ছিল—
৬কে বলে জলকষ্টনিবারণের সামর্থ্য আমাদের নাই? একদা দেশের যে অর্থ দেশের কল্যাণকর্ম সাধন করিয়া চরম সার্থকতা লাভ করিত, আজ সেই অর্থ অজস্রধারায় মিল্টনের আড়গড়া, ডাইকের গাড়িখানা, ল্যাজারসের আসবাবশালা, হার্মান কোম্পানির দরজির দোকানকে অভিষিক্ত করিয়া দিতেছে! স্বদেশের শুষ্কতালুতে জলবিন্দু দিবার বেলায় টানাটানি না পড়িবে কেন?
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে, লেডি ডফ্রিন ফন্ডে, ম্যাজিস্ট্রেটসাহেবের ঘোড়দৌড়ে, লাট সাহেবের অভ্যর্থনায় টাকা ঝরিয়া পড়িতেছে কখন? যখন, সেই-টাকা-জোগান-কারী প্রজার দল দীপ্ত মধ্যাহ্নে পানীয় জলের জন্য হাহাকার করিতেছে, যখন ম্যালেরিয়ায় তাহারা উৎসন্ন হইয়া গেল, যখন তাহাদের গোরু বাছুর চরিবার এক ছটাক জমি নাই, যখন তাহাদের নিম্নভূমির উপর হইতে বর্ষার পর তিন-চার মাস ধরিয়া জলনিকাশের কোনো উপায় থাকে না!
আর যাঁহারা পল্লী হইতে বাহির হইয়া সামান্য অবস্থা হইতে ধনী-অবস্থায় উত্তীর্ণ হইয়াছেন, তাঁহাদেরও ধনের আড়ম্বর করিবার স্থান সদরে এবং আড়ম্বরের উপায়ও বারো আনা বিলাতী। ইহাতে যে টাকাগুলাই কেবল বাহিরে চলিয়া যায় তাহা নহে, হৃদয়ও দেশে থাকে না। রুচির দ্বারা, অভ্যাসের দ্বারা, আচরণের দ্বারা প্রতি মুহূর্তে যাহাকে অবজ্ঞা করি, তাহাকে সাহায্য করিবার জন্য যে কেবল আর্থিক শক্তির অভাব ঘটে তাহা নহে—চিত্তশক্তিও থাকে না। সুতরাং তখন দেশহিতৈষিতার সর্বপ্রধান বুলি এই হইয়া দাঁড়ায় যে, ‘আমরা নিজে কিছুই করিতে পারিব না, কারণ আমরা গাড়িজুড়ি কোট্ বুট্ লইয়া অত্যন্ত ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি। হে সরকার, আমরা ‘লয়াল’, অতএব তুমিই সমস্ত করিয়া দাও—যদি না করো তবে গালি দিব।’
পৃ ১১, উদ্ধৃতির পরে বঙ্গদর্শনে ছাপা হয়—
৭এইজন্য কবিকথিত ‘স্রোতের সেঁওলি’র মতো ভাসিয়াই চলিয়াছি।
এরূপ অবস্থা কোনোমতেই চিরকাল থাকিতে পারে না। এইজন্য আপাতত স্রোতের অত্যন্ত প্রাবল্য দেখিলেও মনকে হতাশ হইতে দিই না। ইহাও তো দেখা গেছে এক সময় ইংরাজি-রচনার চর্চা দেশে অত্যন্ত প্রবল ছিল, তখনকার শিক্ষিত যুবকেরা বাংলাভাষাকে একান্তমনে ঘৃণা করিতেন। তখন কি কেহ কল্পনাও করিতে পারিত যে, মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলাভাষায় আধুনিক কাব্যসাহিত্যের প্রথম অবতারণা করিবেন এবং রিচার্ড্সনের প্রিয় ছাত্র বাংলাভাষায় বাংলাসাহিত্যের ইতিহাস ও সমালোচনা লিখিতে অগৌরব বোধ করিবেন না?
যেমন সাহিত্যে, তেমনি সকল দিকেই স্রোত ফিরিবে—ঘরে আসিতেই হইবে। চারি দিকে তাহার লক্ষণ দেখা দিতেছে।
বাঙালীর সাহিত্যপ্রিয়তা একবার বাহিরে ফিরিয়া আসিবার ফলে, আমরা দেখিতেছি বঙ্গসাহিত্য আজ তাহার পৈতৃক সীমানা অনেক দূর পর্যন্ত ছাড়াইয়া গেছে। তাহার বিচিত্রশক্তি আজ নানা দিকে নানা আকারে আপনাকে নানা পথে ধাবিত করিয়াছে। তেমনি যাহাদের হৃদয় একবার বাহিরে ঘুরিয়া অবশেষে ঘরে ফিরিয়া আসিয়াছে, তাহারা ঘরকে বড়ো করিয়া তুলিবে।
বিধাতা এই জন্যই আমাদিগকে এমন করিয়া সকল দিক দিয়া ঘর হইতে খেদাইতেছেন—বাহিরটাকে এমন জবরদস্তি করিয়া বারংবার আমাদের রুদ্ধদ্বারের উপর সবলে নিক্ষেপ করিয়াছেন। তিনি ভারতবর্ষে ঘর-বাহিরের একটা বৃহৎ সামঞ্জস্য করিবেন। যেখানে পল্লীজীবনযাত্রার আয়োজন ছিল, সেখানে পরিপূর্ণ মনুষ্যত্বের বিচিত্র উপকরণ আহরণ ও সঞ্চয় করিবার জন্য তিনি আমাদিগকে আহ্বান করিয়াছেন; যেখানে অমরা ক্ষুদ্রভাবে আপনাদের স্বাধীনতা রক্ষা করিয়া আসিয়াছি, সেখানে বৃহত্তরভাবে আমরা স্বাধীন হইব। এখন আমাদের সমাজ নির্জীবভাবে সকলের সহিত বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িয়া থাকিবে না, সজীব হইয়া সকলের সহিত যোগস্থাপন করিবে—পল্লীর সহিত পল্লী, সম্প্রদায়ের সহিত সম্প্রদায়, দেশের সহিত দেশ, গাঁথিয়া এক হইয়া যাইবে। বিচ্ছেদে প্রেমকে প্রবল, মিলনকে ঘনিষ্ঠ করিয়া তোলে—এ কথা পুরাতন। একবার হারানোর ভিতর দিয়া পাওয়া প্রকৃষ্টরূপে পাইবার উপায়। আমরা যে মাঝে একবার আপনাকে হারাইয়াছিলাম, সে কেবল আপনাকে প্রবলভাব বৃহৎভাবে ফিরিয়া পাইবার জন্য। আধুনিক ভারতবর্ষ আপনার পল্লীর প্রান্তে ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল—এক কালে যাহা বৃহৎ ছিল তাহা সংকীর্ণ, যাহা সমগ্র ছিল তাহা খণ্ডিত, যাহা সজীব ছিল তাহা জড়, যাহা জ্ঞানগত ছিল তাহা প্রথাগত অভ্যাসগত হইয়া আসিয়াছিল। এইবার পশ্চিমের আঘাতে জাগিয়া উঠিয়া ভারতবর্ষ কি একটা সম্পূর্ণ পৃথক ধার-করা জীবন আরম্ভ করিবে? তাহা নহে। সে আপনাকে উজ্জ্বলভাবে প্রবলভাবে ফিরিয়া পাইবে—যাহা বদ্ধ ছিল তাহাই মুক্তি পাইবে, যাহা স্তব্ধ ছিল তাহাই চারি দিকে আপন কাজে প্রবৃত্ত হইবে।
পূর্বেই বলিয়াছি—বাঙালির চিত্ত ঘরের মুখ লইয়াছে নানা দিক হইতে তাহার প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে। কেবল যে স্বদেশের শাস্ত্র আমাদের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিতেছে এবং স্বদেশী ভাষা স্বদেশী সাহিত্যের দ্বারা অলংকৃত হইয়া উঠিতেছে তাহা নহে—স্বদেশের শিল্পদ্রব্য আমাদের কাছে আদর পাইতেছে, স্বদেশের ইতিহাস আমাদের গবেষণাবৃত্তিকে জাগ্রত করিতেছে, রাজদ্বারে ভিক্ষাযাত্রার জন্য যে পাথেয় সংগ্রহ করিয়াছিলাম তাহা প্রত্যহই একটু একটু করিয়া আমাদিগকে গৃহদ্বারে পৌঁছাইয়া দিবারই সহায়তা করিতেছে। দেশে বিজ্ঞানশিক্ষাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য আমরা স্বদেশী লোকের কাছেই প্রার্থী হইয়া দাঁড়াইয়াছি এবং সম্প্রতি বর্ধমান প্রোভিন্শ্যাল্ কন্ফারেন্সের সভাপতি আমাদের সুদীর্ঘকালের পোলিটিক্যাল উদ্যমকে জাতীয় আত্মনির্ভরতাচর্চায় খাটাইবার জন্য শ্রোতাদিগকে উৎসাহিত করিয়াছেন।
*এমন অবস্থায় দেশের কাজ প্রকৃতভাবে আরম্ভ হইয়াছে বলিতে হইবে। এখন কতকগুলি অদ্ভুত অসংগতি আমাদের চোখে ঠেকিবে এবং তাহা সংশোধন করিয়া লইতে হইবে।*[১]
পৃ ১১, দ্বাবিংশ ও ত্রয়োবিংশ ছত্রের যোগসাধক ছিল—
৮তাই আমাদের হাবভাববিলাসের চর্চা সমস্তই পূরা রকমে বিলাতি ধরণের হইয়াছে। কিন্তু বিলাতের মন তো ভুলাইতে পারিলাম না, বারংবার তো মাথা হেঁট করিয়া ফিরিতে হইল। এখন এ-সমস্ত মিথ্যা ছলাকলা ফেলিয়া দিয়া একবার দেশের মনকে পাইবার জন্য দেশী প্রণালীতে চেষ্টা করিয়া দেখিব না কি? কারণ
পৃ ১১, শেষ ছত্রে ‘কিন্তু’র পরে—
৯দেশের হৃদয়ের প্রতি দৃক্পাতমাত্র না করিয়া,
পৃ ১৫, ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ ছত্রের অন্তর্বর্তী—
১০এ কথা শুনিবামাত্র যেন আমাদের মধ্যে হঠাৎ একদল লোক অত্যন্ত উত্তেজিত হইয়া না ওঠেন—এ কথা না বলিয়া বসেন যে, এই মেলাগুলির প্রতি গবর্মেণ্টের অত্যন্ত ঔদাসীন্য দেখা যাইতেছে, অতএব আমরা সভা করিয়া কাগজে লিখিয়া প্রবলবেগে গবর্মেণ্টের সাঁকো নাড়াইতে শুরু করিয়া দিই, মেলাগুলার মাথার উপরে দলবল-আইন-কানুন-সমেত পুলিশ কমিশনার ভাঙিয়া পড়ুক, সমস্ত এক দমে পরিষ্কার হইয়া যাক। ধৈর্য ধরিতে হইবে—বিলম্ব হয়, বাধা পাই, সেও স্বীকার, কিন্তু এ-সমস্ত আমাদের নিজের কাজ। চিরকাল ঘরের লক্ষ্মী আমাদের ঘর নিকাইয়া আসিয়াছেন, ম্যুনিসিপালিটির মজুর নয়। ম্যুনিসিপালিটির সরকারি ঝাঁটায় পরিষ্কার করিয়া দিতে পারে বটে, কিন্তু লক্ষ্মীর সম্মার্জনীতে পবিত্র করিয়া তোলে এ কথা আমরা যেন না ভুলি।
পৃ ১৫, অষ্টাদশ ও উনবিংশ ছত্রের মধ্যে—
১১এইখানে সবিনয়ে একটি কথা বলিতে ইচ্ছা করি। আমি যে একটা-নূতন-পন্থা-উদ্ভাবনকারী দলের মধ্যে একজন এরূপ স্পর্ধার লেশমাত্র আমার মনে নাই। জাহ্নবী অনেকটা পথ পূর্বমুখে চলিয়া অবশেষে এক সময়ে দক্ষিণগামিনী হইয়া সমুদ্রলাভ করিয়াছেন, এজন্য দক্ষিণের পথ অহংকার করিবার অধিকারী নহে, বস্তুত তাহা পূর্বপথেরই অনুবৃত্তি মাত্র। দেশ যখন একদা জাগ্রত হইয়া ‘কন্ষ্টিট্যুশনাল অ্যাজিটেশনে’র রেখা ধরিয়া রাজ্যেশ্বরের দ্বারের মুখে ছুটিয়াছিল, তখন সমস্ত শিক্ষিতসমাজের বুদ্ধিবেগ তাহার মধ্যে ছিল। আজ স্পষ্ট দেখা যাইতেছে সেই স্রোতের পথ বাঁক লইবার উপক্রম করিতেছে। আশা করি এজন্য যেন কোনো ব্যক্তিবিশেষ বা দলবিশেষ বাহাদুরি লইবার চেষ্টা না করেন। যাঁহারা সাধনাদ্বারা, তপস্যাদ্বারা, ধীশক্তিদ্বারা ইংরাজিশিক্ষিত সমাজের চিত্তকে স্বদেশের কার্যে চালিত করিয়াছেন, স্বদেশের কার্যে একাগ্র করিবার আয়োজন করিয়াছেন, তাঁহাদিগকে আমি ভক্তির সহিত নমস্কার করি। তাঁহারা যে পথে গিয়াছিলেন সে পথে যাত্রা যে ব্যর্থ হইয়াছে, এ আমি কখনোই বলিব না। তখন সমস্ত দেশের ঐক্যের মুখ রাজদ্বারেই ছিল। কিন্তু যখন আমাদের হৃদয় নিজের মধ্যে সেই উপায়ে একটা বিপুল ঐক্যের আভাস উপলব্ধি করিতে পারিয়াছে, যাহা বিচ্ছিন্ন ছিল তাহা ঐক্যের অমৃতকণার আস্বাদে যখন আপনার মধ্যে আপনার যথার্থ বল অনুভব করিতে পারিতেছে, তখন সে আপনার সমস্ত শক্তিকে রাজপুরদ্বারে ভিক্ষাকুণ্ডের মধ্যে নিঃশেষিত করিয়া পরিতৃপ্ত হইতে পারে না। এখন সে চিরন্তন সমুদ্রের আহ্বান শুনিয়াছে—এখন সে আত্মশক্তি আত্মচেষ্টার পথে সার্থকতালাভের দিকে অনিবার্যবেগে চলিবে, কোনো-একটা বিশেষ মুষ্টিভিক্ষা বা প্রসাদলাভের দিকে নহে। এই-যে পথের দিক্-পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা দিতেছে ইহা কোনো ব্যক্তিবিশেষের কৃতকর্ম নহে—যে চিত্তস্রোত প্রথমে এক দিকে পথ লইয়াছিল ইহা তাহারই কাজ, ইহা নূতন স্রোত নহে। যে অঙ্কুর প্রথম মৃত্তিকা ভেদ করিয়া অজ্ঞাত আলোকের দিকে মাথা তুলিয়াছিল, পরবর্তী শাখা প্রশাখা যেন নিজেকে ‘ওরিজিন্যাল’ জ্ঞান করিয়া সেই অঙ্কুরকে সেকেলে বলিয়া উপহাস না করে।
গতবারে এ প্রবন্ধ যখন আমি পাঠ করিয়াছিলাম, তখন আমার উক্ত কথাটি সকলের কাছে সুস্পষ্ট হয় নাই। প্রতিবাদে এই কথা উঠিয়াছিল যে, দেশে নানা শক্তি নানা লোককে নানা দলকে আশ্রয় করিয়া কাজ করিবে, ইহাই দেশের স্বাস্থ্যের ও উন্নতির লক্ষণ। অতএব কেবলমাত্র সমাজের দিকে দৃষ্টি রাখিলে চলিবে না।
প্রবন্ধপাঠের শেষে এমন কথা যখন উঠিল তখন বুঝিলাম— আমার সমস্ত প্রবন্ধই ব্যর্থ হইয়াছে। আমি এই কথাই বিশেষ করিয়া বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াছি যে, বিলাতে যেমনই হউক, আমাদের দেশে সমাজ একটা ক্ষুদ্র ব্যাপার নহে—যুদ্ধবিগ্রহ, কিয়ৎপরিমাণে পাহারার কাজ ও কিঞ্চিৎ পরিমাণে বিচারের কাজ ছাড়া দেশের আর-সমস্ত মঙ্গলকার্যই আমাদের সমাজ নিজের হাতে রাখিয়াছিল। ইহাই আমাদের বিশেষত্ব। এইজন্য এই সমাজব্যবস্থার উপরেই আমাদের মনুষ্যত্ব, আমাদের সভ্যতা স্থাপিত এবং এইজন্য এই সমাজকে আমরা চিরদিন সর্বতোভাবে স্বাধীন ও সক্রিয় রাখিতে একান্ত সচেষ্ট ছিলাম। অতএব কে বলিল সমাজের কাজ বলিতে কেবল একটিমাত্র কাজ বুঝাইতেছে?
আমি যদি বলি শরীরের সমস্ত কাজ শরীরেরই করা উচিত, তবে কি কেহ এই বলিবেন আমি তাহার কর্মক্ষেত্রকে সংকীর্ণ করিয়া আনিতে বলিতেছি? শরীরের কাজ বিবিধ, শরীরের কর্মস্থানও বিপুল, সে সম্বন্ধে কাহারও সন্দেহ নাই—কিন্তু শারীরিক ক্রিয়া শরীরের নিজের জিনিস এ কথা চিরদিন ভুলিয়া থাকিলে চলিবে না। আমি যদি পরকে বলি তুমি আমার হইয়া হজম করিয়া দাও এবং সেরূপ হজম করা যদি পরের দ্বারা সম্ভবপর হয়, তবে তাহাতে মঙ্গল নাই। ব্যবহারের অভাবে নিজের পাকস্থলীটিকে সম্পূর্ণ খোয়াইয়া পরাশ্রিতশ্রেণীয় জীবের ন্যায় চিরকাল পরের গাত্রে সংলগ্ন হইয়া দিব্য পরিপুষ্টভাবে চোখ বুজিয়া থাকাকে গৌরবের বিষয় বলা চলে না। ইংরাজের পাকস্থলী তাহার স্টেটের মধ্যে থাকিতে পারে, কিন্তু স্টেট তাহার সমাজের বহির্ভুক্ত নহে। ইংরাজ সর্বদাই রাজনৈতিক আন্দোলন লইয়া ব্যাপৃত থাকে, কারণ রাজনীতি তাহার স্বকীয় কলেবরের মধ্যেই। আমরা তাহার নকল করিয়া পরের পাকস্থলীতে নিয়তই যদি আন্দোলন উপস্থিত করিতে যাই, তাহাতে কি আমাদের হজমের কোনো সহায়তা করিবে? যাহারা জাবর কাটে তাহাদের হজম করিবার বিধি একরূপ, যাহারা জাবর কাটে না তাহাদের হজম করিবার বিধি অন্যরূপ। জাবর কাটা হজম করিবার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় বলিয়া যদি প্রমাণিত হয়, তথাপি তাহা সকলের পক্ষে সুসাধ্য নহে এ কথা স্বীকার করিতে হইবে।
পৃ ২২, দশম ও একাদশ ছত্রের মধ্যে ছিল—
১২তর্ক এই উঠিতে পারে যে, ব্যক্তিগত হৃদয়ের সম্বন্ধ-দ্বারা খুব বড়ো জায়গা ব্যাপ্ত করা সম্ভবপর হইতে পারে না। একটা ছোটো পল্লীকেই আমরা প্রত্যক্ষভাবে আপনার করিয়া লইয়া তাহার সমস্ত দায়িত্ব স্বীকার করিতে পারি, কিন্তু পরিধি বিস্তীর্ণ করিলেই কলের দরকার হয়—দেশকে আমরা কখনোই পল্লীর মতো করিয়া দেখিতে পারি না, এই জন্য অব্যবহিতভাবে দেশের কাজ করা যায় না, কলের সাহায্যে করিতে হয়। এই কল-জিনিসটা আমাদের ছিল না, সুতরাং ইহা বিদেশ হইতে আনাইতে হইবে এবং কারখানাঘরের সমস্ত সাজ-সরঞ্জাম আইন-কানুন গ্রহণ না করিলে কল চলিবে না।
কথাটা অসংগত নহে। কল পাতিতেই হইবে। এবং কলের নিয়ম যে-দেশীই হউক-না কেন, তাহা মানিয়া না লইলে সমস্তই ব্যর্থ হইবে। এ কথা সম্পূর্ণ স্বীকার করিয়াও বলিতে হইবে—শুধু কলে ভারতবর্ষ চলিবে না, যেখানে আমাদের ব্যক্তিগত হৃদয়ের সম্বন্ধ আমরা প্রত্যক্ষভাবে অনুভব না করিব সেখানে আমাদের সমস্ত প্রকৃতিকে আকর্ষণ করিতে পারিবে না। ইহাকে ভালোই বলো আর মন্দই বলো, গালিই দাও আর প্রশংসাই করো, ইহা সত্য। অতএব আমরা যে-কোনো কাজে সফলতালাভ করিতে চাই, এই কথাটি আমাদিগকে স্মরণ করিতেই হইবে।
স্বদেশকে একটি বিশেষ ব্যক্তির মধ্যে আমরা উপলব্ধি করিতে চাই। এমন একটি লোক চাই যিনি আমাদের সমস্ত সমাজের প্রতিমাস্বরূপ হইবেন। তাঁহাকে অবলম্বন করিয়াই আমরা আমাদের বৃহৎ স্বদেশীয় সমাজকে ভক্তি করিব, সেবা করিব। তাঁহার সঙ্গে যোগ রাখিলেই সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে আমাদের যোগ রক্ষিত হইবে।
পূর্বে যখন রাষ্ট্র সমাজের সহিত অবিচ্ছিন্ন ছিল, তখন রাজারই এই পদ ছিল। এখন রাজা সমাজের বাহিরে যাওয়াতে সমাজ শীর্ষহীন হইয়াছে। সুতরাং দীর্ঘকাল হইতে বাধ্য হইয়া পল্লীসমাজই খণ্ড-খণ্ড-ভাবে আপনার কাজ আপনি সম্পন্ন করিয়াছে, স্বদেশী সমাজ তেমন ঘনিষ্ঠভাবে গড়িয়া বাড়িয়া উঠিতে পারে নাই। আমাদের কর্তব্য পালিত হইয়াছে বটে এবং হইয়াছে বলিয়াই আজও আমাদের মনুষ্যত্ব আছে, কিন্তু আমাদের কর্তব্য ক্ষুদ্র হইয়াছে এবং ক্ষুদ্র হওয়াতে আমাদের চরিত্রে সংকীর্ণতা প্রবেশ করিয়াছে। সংকীর্ণ সম্পূর্ণতার মধ্যে চিরদিন বদ্ধ হইয়া থাকা স্বাস্থ্যকর নহে, এই জন্য যাহা ভাঙিয়াছে তাহার জন্য আমরা শোক করিব না—যাহা গড়িতে হইবে তাহার প্রতি আমাদের সমস্ত চিত্তকে প্রয়োগ করিব। আজকাল জড়ভাবে, যথেচ্ছাক্রমে, দায়ে পড়িয়া, যাহা ঘটিয়া উঠিতেছে তাহাই ঘটিতে দেওয়া কখনোই আমাদের শ্রেয়স্কর হইতে পারে না।
এক্ষণে, আমাদের সমাজপতি চাই। তাঁহার সঙ্গে তাঁহার পার্ষদসভা থাকিবে, কিন্তু তিনিই প্রত্যক্ষভাবে আমাদের সমাজের অধিপতি হইবেন।
আমাদের প্রত্যেকের নিকটে তাঁহারই মধ্যে সমাজের একতা সপ্রমাণ হইবে।
পৃ ২৪, শেষ অনুচ্ছেদের পূর্ববর্তী অতিরিক্ত অনুচ্ছেদ—
১৩কী করিয়া কলের সহিত হৃদয়ের সামঞ্জস্যবিধান করিতে হয়, কী করিয়া রাজার সহিত স্বদেশের সংযোগসাধন করিতে হয়, জাপান তাহার দৃষ্টাস্ত দেখাইতেছে। সেই দৃষ্টান্ত মনে রাখিলে আমাদের স্বদেশী সমাজের গঠন ও চালনের জন্য একই কালে আমরা সমাজপতি ও সমাজতন্ত্রের কর্তৃত্ব-সমন্বয় করিতে পারিব—আমরা স্বদেশকে একটি মানুষের মধ্যে প্রত্যক্ষ করিতে পারিব এবং তাঁহার শাসন স্বীকার করিয়া স্বদেশী সমাজের যথার্থ সেবা করিতে পারিব।
পৃ ২৫, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ ছত্রের মধ্যে ছিল—
১৪অতএব একটি লোককে আশ্রয় করিয়া আমাদের সমাজকে এক জায়গায় আপন হৃদয়স্থাপন, আপন ঐক্যপ্রতিষ্ঠা করিতেই হইবে, নহিলে শৈথিল্য ও বিনাশের হাত হইতে আত্মরক্ষার কোনো উপায় দেখি না।
অনেকে হয়তো সাধারণভাবে আমার এ কথা স্বীকার করিবেন, কিন্তু ব্যাপারখানা ঘটাইয়া তোলা তাঁহারা অসাধ্য বলিয়া মনে করিতে পারেন। তাঁহারা বলিবেন—নির্বাচন করিব কী করিয়া, সবাই নির্বাচিতকে মানিবে কেন, আগে সমস্ত ব্যবস্থাতন্ত্র স্থাপন করিয়া তবে তো সমাজপতির প্রতিষ্ঠা সম্ভবপর হইবে, ইত্যাদি।
আমার বক্তব্য এই যে, এই-সমস্ত তর্ক লইয়া আমরা যদি একেবারে নিঃশেষপূর্বক বিচার-বিবেচনা করিয়া লইতে বসি, তবে কোনোকালে কাজে নাবা সম্ভব হইবে না। এমন লোকের নাম করাই শক্ত, দেশের কোনো লোক বা কোনো দল যাঁহার সম্বন্ধে কোনো আপত্তি না করিবেন। দেশের সমস্ত লোকের সঙ্গে পরামর্শ মিটাইয়া লইয়া লোককে নির্বাচন করা সাধ্য হইবে না।
আমাদের প্রথম কাজ হইবে—যেমন করিয়া হউক একটি লোক স্থির করা এবং তাঁহার নিকটে বাধ্যতা স্বীকার করিয়া ধীরে ধীরে ক্রমে ক্রমে তাঁহার চারি দিকে একটি ব্যবস্থাতন্ত্র গড়িয়া তোলা। যদি সমাজপতি-নিয়োগের প্রস্তাব সময়োচিত হয়, যদি রাজা সমাজের অন্তর্গত না হওয়াতে সমাজে অধিনায়কের যথার্থ অভাব ঘটিয়া থাকে, যদি পরজাতির সংঘর্ষে আমরা প্রত্যহ অধিকারচ্যুত হইতেছি বলিয়া সমাজ নিজেকে বাঁধিয়া-তুলিয়া উঠিয়া দাঁড়াইবার জন্য ইচ্ছুক হয়, তবে কোনো-একটি যোগ্য লোককে দাঁড় করাইয়া তাঁহার অধীনে একদল লোক যথার্থভাবে কাজে প্রবৃত্ত হইলে এই সমাজরাজতন্ত্র দেখিতে দেখিতে প্রস্তুত হইয়া উঠিবে—পূর্বে হইতে হিসাব করিয়া, কল্পনা করিয়া, আমরা যাহা আশা করিতে না পারিব তাহাও লাভ করিব—সমাজের অন্তর্নিহিত বুদ্ধি এই ব্যাপারের চালনাভার আপনিই গ্রহণ করিবে।
সমাজে অবিচ্ছিন্নভাবে সকল সময়েই শক্তিমান ব্যক্তি থাকেন না, কিন্তু দেশের শক্তি বিশেষ বিশেষ স্থানে পুঞ্জীভূত হইয়া তাঁহাদের জন্য অপেক্ষা করে। যে শক্তি আপাতত যোগ্য লোকের অভাবে কাজে লাগিল না, সে শক্তি যদি সমাজে কোথাও রক্ষিত হইবার স্থানও না পায়, তবে সে সমাজ ফুটা কলসের মতো শূন্য হইয়া যায়। আমি যে সমাজপতির কথা বলিতেছি তিনি সকল সময়ে যোগ্য লোক না হইলেও, সমাজের শক্তি, সমাজের আত্মচেতনা তাঁহাকে অবলম্বন করিয়া বিধৃত হইয়া থাকিবে। অবশেষে বিধাতার আশীর্বাদে এই শক্তিসঞ্চয়ের সঙ্গে যখন যোগ্যতার যোগ হইবে, তখন দেশের মঙ্গল দেখিতে দেখিতে আশ্চর্যবলে আপনাকে সর্বত্র বিস্তীর্ণ করিবে। আমরা ক্ষুদ্র দোকানির মতো সমস্ত লাভ-লোকসানের হিসাব হাতে হাতে দেখিতে চাই, কিন্তু বড়ো ব্যাপারের হিসাব তেমন করিয়া মেলে না। দেশে এক-একটা বড়োদিন আসে, সেইদিন বড়োলোকের তলবে দেশের সমস্ত সালতামামি নিকাশ বড়োখাতায় প্রস্তুত হইয়া দেখা দেয়। রাজচক্রবর্তী অশোকের সময়ে একবার বৌদ্ধসমাজের হিসাব তৈরি হইয়াছিল। আপাতত আমাদের কাজ—দপ্তর তৈরি রাখা, কাজ চালাইতে থাকা, যেদিন মহাপুরুষ হিসাব তলব করিবেন সেদিন অপ্রস্তুত হইয়া শির নত করিব না—দেখাইতে পারিব, জমার ঘরে একেবারে শূন্য নাই।
সমাজের সকলের চেয়ে যাঁহাকে বড়ো করিব, এত বড়ো লোক চাহিলেই পাওয়া যায় না। বস্তুত রাজা তাঁহার সকল প্রজারই চেয়ে যে স্বভাবত বড়ো তাহা নহে। কিন্তু রাজ্যই রাজাকে বড়ো করে। জাপানের মিকাডো জাপানের সমস্ত সুধী, সমস্ত সাধক, সমস্ত শূরবীরদের দ্বারাই বড়ো। আমাদের সমাজপতিও সমাজের মহত্ত্বেই মহৎ হইতে থাকিবেন। সমাজের সমস্ত বড়ো লোকই তাঁহাকে বড়ো করিয়া তুলিবে। মন্দিরের মাথায় যে স্বর্ণকলস থাকে, তাহা নিজে উচ্চ নহে—মন্দিরের উচ্চতাই তাহাকে উচ্চ করে।
আমি ইহা বেশ বুঝিতেছি—আমার এই প্রস্তাব যদিবা অনেকে অনুকূলভাবেও গ্রহণ করেন, তথাপি ইহা অবাধে কার্যে পরিণত হইতে পারিবে না। এমন-কি, প্রস্তাবকারীর অযোগ্যতা ও অন্যান্য বহুবিধ প্রাসঙ্গিক ও অপ্রাসঙ্গিক দোষ ত্রুটি ও স্খলন সম্বন্ধে অনেক স্পষ্ট স্পষ্ট কথা এবং অনেক অস্পষ্ট আভাস আজ হইতে প্রচার হইতে থাকা আশ্চর্য নহে। আমার বিনীত নিবেদন এই যে, আমাকে আপনারা ক্ষমা করিবেন। অদ্যকার সভামধ্যে আমি আত্মপ্রচার করিতে আসি নাই এ কথা বলিলেও পাছে অহংকার প্রকাশ করা হয়, এজন্য আমি কুণ্ঠিত আছি। আমি অদ্য যাহা বলিতেছি, আমার সমস্ত দেশ আমাকে তাহা বলাইতে উদ্যত করিয়াছে। তাহা আমার কথা নহে, তাহা আমার সৃষ্টি নহে, তাহা আমা-কর্তৃক উচ্চারিতমাত্র। আপনারা এ শঙ্কামাত্র করিবেন না আমি আমার অধিকার ও যোগ্যতার সীমা বিস্তৃত হইয়া স্বদেশীসমাজগঠন-কার্যে নিজেকে অত্যুগ্রভাবে খাড়া করিয়া তুলিব। আমি কেবল এইটুকুমাত্র বলিব—আসুন, আমরা মনকে প্রস্তুত করি—ক্ষুদ্র দলাদলি, কুতর্ক, পরনিন্দা, সংশয় ও অতিবুদ্ধি হইতে হৃদয়কে সম্পূর্ণভাবে ক্ষালন করিয়া অদ্য মাতৃভূমির বিশেষ প্রয়োজনের দিনে, জননীর বিশেষ আহ্বানের দিনে, চিত্তকে উদার করিয়া, কর্মের প্রতি অনুকূল করিয়া, সর্বপ্রকার লক্ষ্যবিহীন অতিসূক্ষ্ম যুক্তিবাদের ভণ্ডুলতাকে সবেগে আবর্জনাস্তূপের মধ্যে নিক্ষেপ করিয়া এবং নিগূঢ় আত্মাভিমানকে তাহার শতসহস্র রক্ততৃষার্ত শিকড়-সমেত হৃদয়ের অন্ধকার গুহাতল হইতে সবলে উৎপাটিত করিয়া সমাজের শূন্য আসনে বিনম্রবিনীতভাবে আমাদের সমাজপতির অভিষেক করি—আশ্রয়চ্যুত সমাজকে সনাথ করি—শুভক্ষণে আমাদের দেশের মাতৃগৃহকক্ষে মঙ্গলপ্রদীপটিকে উজ্জ্বল করিয়া তুলি—শঙ্খ বাজিয়া উঠুক, ধূপের পবিত্র গন্ধ উদ্গত হইতে থাক্—দেবতার অনিমেষ কল্যাণদৃষ্টির দ্বারা সমস্ত দেশ আপনাকে সর্বতোভাবে সার্থক বলিয়া একবার অনুভব করুক।
এই অভিষেকের পরে সমাজপতি কাহাকে তাঁহার চারি দিকে আকর্ষণ করিয়া লইবেন, কিভাবে সমাজের কার্যে সমাজকে প্রবৃত্ত করিবেন, তাহা আমার বলিবার বিষয় নহে। নিঃসন্দেহ, যেরূপ ব্যবস্থা আমাদের চিরন্তন সমাজপ্রকৃতির অনুগত তাহাই তাঁহাকে অবলম্বন করিতে হইবে, স্বদেশের পুরাতন প্রকৃতিকেই আশ্রয় করিয়া তিনি নূতনকে যথাস্থানে যথাযোগ্য আসনদান করিবেন। আমাদের দেশে তিনি লোকবিশেষ ও দলবিশেষের হাত হইতে সর্বদাই বিরুদ্ধবাদ ও অপবাদ সহ্য করিবেন, ইহাতে সন্দেহমাত্র নাই। কিন্তু মহৎ পদ আরামের স্থান নহে—সমস্ত কলরব কোলাহলের মধ্যে আপনার গৌরবে তাঁহাকে দৃঢ়গভীরভাবে অবিচলিত থাকিতে হইবে। কাল যদি তাঁহার অভিষেক হয়, তবে তাহার পরদিন হইতেই আমরা অনেকেই অবোধ বাচালের ন্যায় ক্রমাগত প্রশ্ন তুলিতে থাকিব—কী করা হইল, এ কাজগুলা শেষ হইল না কেন, এবার বৈশাখে বারো আনা আম ঝড়ে পড়িয়া গেল কেন, আমার প্রতিবেশীর ভাগিনেয় ‘গুণনিধি’ উপাধি পাইল আর আমার ভ্রাতুষ্পুত্র কী অপরাধ করিয়াছে? কোনো অনাবশ্যক কৈফিয়তের চেষ্টা না করিয়া এই-সমস্ত প্রশ্নবৃষ্টি তাঁহাকে নীরবে সহ্য করিতে হইবে।
অতএব যাঁহাকে আমরা সমাজের সর্বোচ্চ সম্মানের দ্বারা বরণ করিব, তাঁহাকে এক দিনের জন্যও আমরা সুখস্বচ্ছন্দতার আশা দিতে পারিব না। আমাদের যে উদ্ধত নব্যসমাজ কাহাকেও হৃদয়ের সহিত শ্রদ্ধা করিতে সম্মত না হইয়া নিজেকে প্রতিদিন অশ্রদ্ধেয় করিয়া তুলিতেছে, সেই সমাজের সূচিমুখকণ্টকখচিত ঈর্ষাসন্তপ্ত আসনে যাঁহাকে আসীন হইতে হইবে, বিধাতা যেন তাঁহাকে প্রচুর পরিমাণে বল ও সহিষ্ণুতা প্রদান করেন—তিনি যেন নিজের অন্তঃকরণের মধ্যেই শান্তি ও কর্মের মধ্যেই পুরস্কার লাভ করিতে পারেন।
এই স্থলে, বর্তমানে কে আমাদের সমাজপতি হইবার উপযুক্ত, তাঁহাদের একজনেরও নাম যদি না করি, তবে আমার পক্ষে অত্যন্ত ভীরুতা প্রকাশ পাইবে। শুদ্ধ তাহাই নহে, নাম করিলে আমার প্রস্তাবটি আরো সকলের কাছে সুপরিস্ফুট হইয়া উঠিবে। অতএব এই ক্ষণে এই স্থানেই তাঁহার নামোল্লেখ করিবার জন্যও আমি প্রস্তুত হইতেছি।
যিনি এক দিকে আচার ও নিষ্ঠা দ্বারা হিন্দুসমাজের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিয়াছেন, অপর দিকে আধুনিক বিদ্যালয়ের শিক্ষায় যিনি মহৎ গৌরবের অধিকারী; এক দিকে কঠোর দারিদ্র্য যাঁহার অপরিচিত নহে, অন্য দিকে আত্মশক্তির দ্বারা যিনি সমৃদ্ধির মধ্যে উত্তীর্ণ; যাঁহাকে দেশের লোক যেমন সম্মান করে, বিদেশী রাজপুরুষেরা তেমনি শ্রদ্ধা করিয়া থাকে; যিনি কর্তৃপক্ষের বিশ্বাসভাজন, অথচ যিনি আত্মমতের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করেন নাই; নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার যাঁহার প্রকৃতিগত ও অভ্যাসগত; নানা বিরোধীপক্ষের বিরোধ-সমন্বয় যাঁহার পক্ষে স্বাভাবিক; যিনি সুযোগ্যতার সহিত রাজার ও প্রকৃতিসাধারণের সম্মাননীয় কর্মভার সমাধা করিয়া বিচিত্র অভিজ্ঞতার দ্বারা ঐশ্বর্যবান অক্ষুব্ধ অবসর লাভ করিয়াছেন; সেই স্বদেশ-বিদেশের-শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত, সেই ধনসম্পদের মধ্যেও অবিচলিত, তপোনিষ্ট, ভগবৎপরায়ণ ব্রাহ্মণ শ্রীযুক্ত গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম যদি এইখানে আমি উচ্চারণ করি, তবে অনেক পল্লবিত বর্ণনার অপেক্ষাও সহজে আপনারা বুঝিবেন কিরূপ সমাজকে আমি প্রার্থনীয় ও সম্ভবপর জ্ঞান করিতেছি। বুঝিতে পারিবেন নিজের ব্যক্তিগত সংস্কার, মতামত, আচার-বিচার লইয়া আমি লেশমাত্র আপত্তি তুলিতে চাহি না—আমি আমার সমস্ত দেশের অভাব, দেশের প্রার্থনা অন্তরের মধ্যে একান্তভাবে উপলব্ধি করিয়া নম্রভাবে নমস্কারের সহিত সমাজের শূন্য রাজভবনে এই দ্বিজোত্তমকে মুক্তকণ্ঠে আহ্বান করিতেছি। আপনারা সকলেও সমস্ত ক্ষুদ্রতর্ক ও কর্মহানিকর দ্বিধা, সমস্ত ব্যক্তিগত সংস্কারগত পক্ষপাতিত্ব, পরিহার করিয়া অদ্য সমস্বরে আমার সমর্থন করুন; অধিনায়ককে স্বেচ্ছাক্রমে বরণ করিয়া তাঁহার অধীনতা -স্বীকারপূর্বক আপনাকে স্বাধীন করুন এবং অদ্য হইতে ভিক্ষার ঝুলি-কাঁথা সমস্ত ছাই করিয়া পুড়াইয়া দেশের কার্যে দেশকে যথার্থভাবে প্রবৃত্ত করুন।
পৃ ৩২, অষ্টাদশ ও উনবিংশ ছত্রের মধ্যে—
১৫আমাদের ভারতের মনীষী ডাক্তার শ্রীযুক্ত জগদীশচন্দ্র বস্তুতত্ত্ব উদ্ভিদ্তত্ত্ব ও জন্তুতত্ত্বের ক্ষেত্রকে এক সীমানার মধ্যে আনিবার পক্ষে সহায়তা করিয়াছেন—মনস্তত্ত্বকেও যে তিনি কোনো একদিন ইহাদের এক কোঠায় আনিয়া দাঁড় করাইবেন না, তাহা বলিতে পারি না।
পৃ ৩৪, বর্জিত শেষাংশ—
১৬একবার স্বীকার করো মাতার সেবা স্বহস্তে করিবার জন্য অদ্য আমরা প্রস্তুত হইলাম; একবার স্বীকার করো যে, দেশের উদ্দেশে প্রত্যহ আমরা পূজার নৈবেদ্য উৎসর্গ করিব; একবার প্রতিজ্ঞা করো জন্মভূমির সমস্ত মঙ্গল আমরা পরের কাছে নিঃশেষে বিকাইয়া দিয়া নিজেরা অত্যন্ত নিশ্চিন্তচিত্তে পদাহত অকালকুষ্মাণ্ডের ন্যায় অধঃপাতের সোপান হইতে সোপানান্তরে গড়াইতে গড়াইতে চরম লাঞ্ছনার তলদেশে আসিয়া উত্তীর্ণ হইব না।
পৃ ৩৫, বঙ্গদর্শন ও আত্মশক্তি গ্রন্থে ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধের পরিশিষ্ট’ এই শিরোনামে * চিহ্ন দিয়া একটি পাদটীকায় বলা হয়: ইহা ইতিপূর্বে বঙ্গবাসীতে বাহির হইয়া গেছে। ইত্যাদি। এই প্রবন্ধের বর্জিত রচনাংশ নিম্নে সংকলিত—
১৭‘স্বদেশী সমাজ’-শীর্ষক যে প্রবন্ধ আমি প্রথমে মিনার্ভা ও পরে কর্জন রঙ্গমঞ্চে পাঠ করি,[২] তৎসম্বন্ধে আমার শ্রদ্ধেয় সুহৃদ্ শ্রীযুক্ত বলাইচাদ গোস্বামী মহাশয় কয়েকটি প্রশ্ন উত্থাপন করিয়াছেন। নিজের ব্যক্তিগত কৌতূহলনিবৃত্তির জন্য এ প্রশ্নগুলি তিনি আমার কাছে পাঠান নাই, হিন্দুসমাজনিষ্ঠ ব্যক্তিমাত্রেরই যে যে স্থানে লেশমাত্র সংশয় উপস্থিত হইতে পারে, সেই সেই স্থানে তিনি আমার মনোযোগ আকর্ষণ করিয়া আন্তরিক কৃতজ্ঞতাভাজন হইয়াছেন।
কিন্তু প্রশ্নোত্তরের মতো লিখিতে গেলে লেখা নিতান্তই আদালতের সওয়াল জবাবের মতো হইয়া দাঁড়ায়। সেরূপ খাপছাড়া লেখায় সকল কথা সুস্পষ্ট হয় না, এইজন্য সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ আকারে আমার কথাটা পরিস্ফুট করিবার চেষ্টা করি।
পৃ ৪০-৪৩, †† চিহ্নের অন্তর্বর্তী অংশ বঙ্গদর্শনে বা আত্মশক্তিতে ছিল না। আত্মশক্তির প্রবন্ধান্তর হইতে গৃহীত।
পৃ ৪৪, একবিংশ ছত্রে ‘প্রশ্ন উঠিয়াছে’র পূর্বপাঠ—
১৮গোস্বামিমহাশয় আমাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছেন
পৃ ৪৬ ‘ধুইয়া ফেলো, তোমার মণিমাণিকের’ ইহার বঙ্গদর্শনে মুদ্রিত পাঠ—
১৯ধৌত করো, তোমার হীরামুক্তার