বিষয়বস্তুতে চলুন

স্বদেশী সমাজ/পল্লীসমাজ: সংবিধান

উইকিসংকলন থেকে

পল্লীসমাজ

সংবিধান

প্রতি জেলার প্রধান প্রধান গ্রাম পল্লী বা পল্লীসমষ্টি লইয়া এক বা ততোধিক পল্লীসমাজ স্থাপন করিতে হইবে। শহর গ্রাম কি পল্লী-নিবাসী সকলেই স্ব স্ব পল্লীসমাজ-ভুক্ত হইবেন। গ্রাম কি পল্লী -বাসীর অভিপ্রায়মত অন্যন পাঁচজনের উপর প্রতি পল্লীসমাজের কার্যনির্বাহের ভার থাকিবে। তাঁহারা পল্লীবাসীদিগের মতামত ও সহায়তা লইয়া পল্লীসমাজের কার্য করিবেন। পল্লীসমাজের প্রধান প্রধান উদ্দেশ্যগুলি নিম্নে বিবৃত হইল। প্রতি পল্লীসমাজ সাধ্যমতে এই উদ্দেশ্যগুলি কার্যে পরিণত করিতে যত্নবান হইবেন।

উদ্দেশ্য

 ১। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্য ও সদ্ভাব-সংবর্ধন এবং দেশের ও সমাজের অহিতকর বিষয়গুলি নির্ধারণ করিয়া তাহার প্রতিকারের চেষ্টা।

 ২। সর্বপ্রকার গ্রাম্য বিবাদ-বিসম্বাদ সালিশের দ্বারা মীমাংসা।

 ৩। স্বদেশ-শিল্পজাত দ্রব্য প্রচলন এবং তাহা সুলভ ও সহজপ্রাপ্য করিবার জন্য ব্যবস্থা এবং সাধারণ ও স্থানীয় শিল্প-উন্নতির চেষ্টা।

 ৪। উপযুক্ত শিক্ষক নির্বাচন করিয়া পল্লীসমাজের অধীনে বিদ্যালয় ও আবশ্যকমত নৈশবিদ্যালয় স্থাপন করিয়া বালক-বালিকা-সাধারণের সুশিক্ষার ব্যবস্থা।

 ৫। বিজ্ঞান ইতিহাস বা মহাপুরুষদিগের জীবনী ব্যাখ্যা করিয়া সাধারণকে শিক্ষাপ্রদান ও সর্বধর্মের সারনীতি সংগ্রহ করিয়া সাধারণের মধ্যে প্রচার ও সর্বতোভাবে সাধারণের মধ্যে সুনীতি ধর্মভাব একতা স্বদেশানুরাগ বৃদ্ধি করিবার চেষ্টা।

 ৬। প্রতি পল্লীতে একটি চিকিৎসক ও ঔষধালয় স্থাপন করা এবং অপারগ অনাথ ও অসহায় ব্যক্তিগণের নিমিত্ত ঔষধ পথ্য সেবা ও সৎকারের ব্যবস্থা করা।

 ৭। পানীয় জল, নদী, নালা, পথ, ঘাট, সৎকারস্থান, ব্যয়ামশালা ও ক্রীড়াক্ষেত্র প্রভৃতির ব্যবস্থা করিয়া স্বাস্থ্যের উন্নতির চেষ্টা।

 ৮। আদর্শ কৃষিক্ষেত্র বা খামার-স্থাপন ও তথায় যুবক বা অন্য পল্লীবাসীদিগকে কৃষিকার্য বা গোমহিষাদির পালন-দ্বারা জীবিকাউপার্জনোপযোগী শিক্ষা প্রদান ও কৃষিকার্যের উন্নতিসাধনের চেষ্টা।

 ৯। দুর্ভিক্ষনিবারণার্থে ধর্মগোলা-স্থাপন।

 ১০। গৃহস্থ স্ত্রীলোকেরা যাহাতে আপন আপন সংসারের আয় বৃদ্ধি করিতে পারেন এবং অসহায় হইলে সংসারের ভার গ্রহণ করিতে পারেন, তদরূপ শিল্পাদি শিক্ষা দেওয়া ও তদুপযোগী উপকরণ সংগ্রহ করা।

 ১১। সুরাপান বা অন্যরূপ মাদকদ্রব্য ব্যবহার হইতে লোককে নিবৃত্ত করা।

 ১২। মিলনমন্দির ক্লাব-স্থাপন ও তথায় সমবেত হইয়া পল্লীর এবং স্বদেশের হিতার্থে সমস্ত বিষয়ের আলোচনা।

 ১৩। পল্লীর তত্ত্ব-সংগ্রহ: অর্থাৎ, জনসংখ্যা, স্ত্রী, পুরুষ, বালকবালিকার সংখ্যা, বিভিন্ন জাতির সংখ্যা, গৃহসংখ্যা, জন্ম-মৃত্যুর সংখ্যা, অধিবাসিগণের স্থানত্যাগ ও নূতন বসতি, বিভিন্ন ফসলের অবস্থা, কৃষির ও বিভিন্ন ব্যবসার উন্নতি অবনতি, বিদ্যালয় পাঠশালা ও ছাত্র ও ছাত্রী -সংখ্যা, ম্যালেরিয়া (জ্বর) ওলাউঠা বসন্ত ও অন্যান্য মহামারীতে আক্রান্ত রোগীর ও ঐসব রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ও পল্লীর পুরাবৃত্ত ও বর্তমান উন্নতি ও অবনতির বিবরণ ও কারণ ধারাবাহিকরূপে লিপিবদ্ধ করিয়া রাখা।

 ১৪। জেলায় জেলায়, পল্লীতে পল্লীতে, গ্রামে গ্রামে পরস্পরের মধ্যে সম্ভাব-সংস্থাপন ও ঐক্য-সংবর্ধন।

 ১৫। জেলা-সমিতি, প্রাদেশিক সমিতি ও জাতীয় মহাসমিতির উদ্দেশ্যের ও কার্যের সহায়তা করা।

অর্থের ব্যবস্থা

 পল্লীসমাজের কার্য স্বেচ্ছাদান ও ঈশ্বরবৃত্তি দ্বারা চলিবে। যাঁহাদের বিবাদ-বিসংবাদ সালিশিতে মেটানো হইবে তাঁহারা নিশ্চয়ই স্বেচ্ছাপূর্বক সমাজের মঙ্গলার্থ কিছু অর্থসাহায্য করিবেন। বিবাহাদি শুভকার্যেও সকলেই স্বেচ্ছাপূর্বক এইরূপ বৃত্তি দিবেন। পল্লীবাসীমাত্রেই সপ্তাহে সপ্তাহে কি মাসে মাসে কিছু কিছু করিয়া সমাজের কার্যনির্বাহের জন্য যথাসাধ্য দান করিবেন। পল্লীসমাজের অন্তর্গত সমস্ত হাট-বাজার হইতেও ঈশ্বরবৃত্তি সংগৃহীত হইতে পারিবে। প্রতি বৎসর গ্রামে গ্রামে বারোয়ারি পূজার নাচ-তামাসায় যে অর্থ বৃথা নষ্ট হয়, ঐ-সমস্ত অপব্যয় সংকোচ করিলে সেই অর্থ-দ্বারা পল্লীসমাজের কার্যের বিশেষ সহায়তা হইতে পারে। পল্লীসমাজ কার্যে প্রবৃত্ত হইলে অর্থের অভাব হইবে না।[]

  1. হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ মহাশয়ের ‘কংগ্রেস’ (দ্বিতীয় সংস্করণ পৃ ১৬৩-৬৬) হইতে।