স্বদেশী সমাজ/স্বদেশী সমাজ: সংবিধান
স্বদেশী সমাজ
সংবিধান
পাঠক দয়া করিয়া নিজের অভিপ্রায়-মত এই নিয়মাবলী পরিবর্তন পরিবর্ধন ও পরিবর্জন করিয়া জোড়াসাঁকোর ৬ নং দ্বারকানাথ ঠাকুরের গলিতে শ্রীযুক্ত বাবু গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিকট পাঠাইয়া দিবেন। ইহা সর্বসাধারণের নিকট প্রকাশ্য নহে। বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে যাঁহারা এই কার্যে যোগ দিতে ইচ্ছুক আছেন, তাঁহাদের নাম ও ঠিকানা এই সঙ্গে পাঠাইলে বাধিত হইব।
আমরা স্থির করিয়াছি আমরা কয়েক জনে মিলিয়া একটি সমাজ স্থাপন করিব।
আমাদের নিজের সম্মিলিত চেষ্টায় যথাসাধ্য আমাদের অভাব -মোচন ও কর্তব্য-সাধন আমরা নিজে করিব, আমাদের শাসনভার নিজে গ্রহণ করিব, যে-সকল কর্ম আমাদের স্বদেশীয়ের দ্বারা সাধ্য তাহার জন্য অন্যের সাহায্য লইব না। এই অভিপ্রায়ে আমাদের সমাজের বিধি আমাদের প্রত্যেককে একান্ত বাধ্যভাবে পালন করিতে হইবে। অন্যথা করিলে সমাজবিহিত দণ্ড স্বীকার করিব।
সমাজের অধিনায়ক ও তাঁহার সহায়কারী সচিবগণকে তাঁহাদের সমাজনির্দিষ্ট অধিকার অনুসারে নির্বিচারে যথাযোগ্য সম্মান করিব।
বাঙালী মাত্রেই এ সমাজে যোগ দিতে পারিবেন।
সাধারণত ২১ বৎসর বয়সের নীচে কাহাকেও গ্রহণ করা হইবে না।
এ সভার সভ্যগণের নিম্নলিখিত বিষয়ে সম্মতি থাকা আবশ্যক।—
১। আমাদের সমাজের ও সাধারণত ভারতবর্ষীয় সমাজের কোনো প্রকার সামাজিক বিধিব্যবস্থার জন্য আমরা গবর্মেণ্টের শরণাপন্ন হইক না।
২। ইচ্ছাপূর্বক আমরা বিলাতি পরিচ্ছদ ও বিলাতি দ্রব্যাদি ব্যবহার করিব না।
৩। কর্মের অনুরোধ ব্যতীত বাঙালীকে ইংরেজিতে পত্র লিখিব না।
৪। ক্রিয়াকর্মে ইংরেজি খানা, ইংরেজি সাজ, ইংরেজি বাদ্য, মদ্যসেবন এবং আড়ম্বরের উদ্দেশে ইংরেজ-নিমন্ত্রণ বন্ধ করিব। যদি বন্ধুত্ব বা অন্য বিশেষ কারণে ইংরেজ-নিমন্ত্রণ করি, তবে তাহাকে বাঙলা রীতিতে খাওয়াইব।
৫। যতদিন না আমরা নিজে স্বদেশী বিদ্যালয় স্থাপন করি ততদিন যথাসাধ্য স্বদেশীচালিত বিদ্যালয়ে সন্তানদিগকে পড়াইব।
৬। সমাজস্থ ব্যক্তিগণের মধ্যে যদি কোনো প্রকার বিরোধ উপস্থিত হয় তবে আদালতে না গিয়া সর্বাগ্রে সমাজনির্দিষ্ট বিচারব্যবস্থা গ্রহণ করিবার চেষ্টা করিব।
৭। স্বদেশী দোকান হইতে আমাদের ব্যবহার্য দ্রব্য ক্রয় করিব।
৮। পরস্পরের মধ্যে মতান্তর ঘটিলেও বাহিরের লোকের নিকট সমাজের বা সামাজিকের নিন্দাজনক কোনো কথা বলিব না।
নিম্নলিখিত কয়েকটি বিষয়ে সমাজের কর্তব্য আবদ্ধ থাকিবে—
সামাজিক ব্যবহার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কলাবিদ্যা, ব্যবসাবাণিজ্য, বিচার ও সাহিত্য।
সামাজিক ব্যবহার অর্থাৎ বেশভূষা, গৃহোপকরণ, আহার বিহার, এক কথায় চাল-চলন সম্বন্ধে সমাজ যে আদর্শ নির্দিষ্ট করিয়া দিবেন তাহা সকলকে পালন করিতে হইবে। সমাজের বিশেষ লক্ষ থাকিবে যাহাতে আমাদের জীবনযাত্রার আদর্শ আড়ম্বরশূন্য ও অল্পব্যয়সাধ্য হইতে পারে, যাহাতে আমাদের অধীনস্থ আত্মীয় বালকগণ কঠিন সংযমে দীক্ষিত হইয়া পৌরুষ ও চরিত্রবল লাভ করে।
সমাজবর্তিগণের জন্য একটি বালক ও বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করা হইবে। দেশে একটি স্বদেশী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করা সমাজের বিশেষ লক্ষ্য থাকিবে।
সমাজের অধীনে সাধারণ পাঠাগার ব্যায়ামশালা ক্রীড়াস্থল ব্যাঙ্ক্ মিলনগৃহ-স্থাপনের চেষ্টা করা হইবে।
দেশের স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যবসাবাণিজ্য কলাবিদ্যা ও সাহিত্যের উন্নতিকল্পে যে-সকল উপায় অবলম্বন করা কর্তব্য, সমাজ তৎপ্রতি আপনার যথাসাধ্য শক্তি প্রয়োগ করিবেন।
সমাজের একজন অধিনায়ক থাকিবেন।
সমাজে যে-কোনো প্রস্তাব উত্থাপিত হইবে, আলোচনান্তে অধিনায়ক তৎসম্বন্ধে যেরূপ অভিপ্রায় স্থির করিবেন, অবিসম্বাদে তাহাই গ্রাহ্য হইবে।
তাঁহার স্বাক্ষরিত আদেশ সমাজের আদেশ বলিয়া গণ্য হইবে।
অধিনায়ক যে-কোনো সামাজিককে কারণ-নির্দেশ-ব্যতিরেকেও সমাজ হইতে অপসারিত করিতে পারিবেন।
অধিনায়কের সহায়তার জন্য একটি মন্ত্রিসভা থাকিবে। মন্ত্রিগণ অধিনায়কের অনুমতি অনুসারে উপযুক্ত লোককে যথাযোগ্য কর্মে নিযুক্ত করিবেন; তাঁহাদের কর্ম পরিদর্শন করিবেন; তাঁহাদের নিকট হইতে কর্মবিবরণী গ্রহণ করিবেন ও তাহা অধিনায়কের নিকটে উপস্থিত করিয়া আলোচনা করিবেন।
মন্ত্রিগণ বয়োজ্যেষ্ঠতা-অনুসারে অধিনায়কের অনুপস্থিতিতে তাঁহার কর্মভার গ্রহণ করিবেন। পরন্তু অধিনায়কের পূর্বকৃত কোনো অভিপ্রায়ের পরিবর্তন করিতে পারিবেন না।
মন্ত্রিসভার সঙ্গে একটি কর্মিসভা থাকিবে। কর্মিগণ সমন্ত্রিক অধিনায়কের আদেশে বিশেষ বিশেষ কর্মভার গ্রহণ করিবেন।
কর্মিসভার ভিন্ন ভিন্ন বিভাগের এক-একজন সভ্য মন্ত্রিসভায় স্থান পাইবেন।
সাধারণ সামাজিকগণ সমাজকে কর দিয়া ইহার বিধান মানিয়া চলিবেন ও তাঁহাদের কাহারও প্রতি কোনো বিশেষ আদেশ বা ভার পড়িলে তাহা পালন করিবেন।
অভিভাবকদের সম্মতিক্রমে একুশের অপেক্ষা অল্পবয়স্ক ছাত্রদের জন্য এই সমাজে স্বতন্ত্র একটি বিভাগ থাকিবে।
যে-সকল ব্যক্তি বিশেষ কারণে সমাজের সম্পূর্ণ বাধ্যতা স্বীকার করিবেন না অথচ সমাজের প্রতি যাঁহাদের অনুরাগ থাকিবে, যাঁহারা সমাজকে অর্থদান ও অন্য উপায়ে সাহায্য করিবেন, যাঁহারা সমাজ-কর্তৃক অনুষ্ঠিত কোনো বিশেষ কর্মে বিশেষভাবে যোগদান করিতে ইচ্ছা করিবেন, যাঁহারা কেবলমাত্র সমাজের একটি বা দুইটি বিভাগেরই সহিত যোগ রক্ষা করিবেন, তাঁহারা সমাজের বন্ধুমণ্ডলীরূপে গণ্য হইবেন।
যাঁহারা সমাজভুক্ত নহেন, আবশ্যকবোধে বা সম্মানার্থ অধিনায়ক তাঁহাদিগকে আমন্ত্রণ ও তাঁহাদের পরামর্শ ও সাহায্য গ্রহণ করিতে পারিবেন।
দুই বৎসর অন্তর অধিনায়ক মন্ত্রিসভা ও কর্মিসভার পরিবর্তন হইবে।
তখন সামাজিকগণের মধ্যে যাঁহারা সম্মানস্বরূপ বিশেষ অধিকার প্রাপ্ত হইয়াছেন, তাঁহাদের অধিকাংশের সম্মতিক্রমে মন্ত্রিসভা ও কর্মিসভা নির্বাচিত হইবে এবং সেই মন্ত্রী ও কর্মী-গণ অধিনায়ক নির্বাচন করিবেন।
নির্বাচনের মত-দান পরস্পরের অগোচরে সমাধা হইবে।
নির্বাচনের অধিকার ছাত্র-সামাজিকগণ প্রাপ্ত হইবেন না।
সমাজের মধ্যে পঞ্চবিংশতির অধিক ব্যক্তি এই নির্বাচনের অধিকার প্রাপ্ত হইবেন না।
সমাজের অধিকাংশের সম্মতিক্রমে এই পঞ্চবিংশতিজন নির্বাচনের অধিকার লাভ করিবেন।
যে-কোনো সামাজিককে অধিনায়ক এই অধিকার হইতে বঞ্চিত করিতে পারিবেন।
পাচজনের অধিক মন্ত্রী ও দশের অধিক কর্মী থাকিবে না। মাসে অন্তত একবার ও দুই মাস অন্তর সাধারণ সভার অধিবেশন হইবে।
কর্মিসভার বিশেষ বিশেষ সমিতি কর্মানুসারে আবশ্যকমত তাঁহাদের সভা আহ্বান করিবেন।
সামাজিকগণ অথবা অন্য কেহ নিজের বা সমাজের কর্তব্য সম্বন্ধে কোনো প্রশ্ন বা প্রস্তাব উত্থাপিত করিলে অধিনায়ক মন্ত্রিগণসহ বিচার করিয়া তাহার মীমাংসা করিয়া দিবেন। আলোচ্য বিষয়ের গুরুত্ব-অনুসারে তাঁহারা বিশেষ ব্যক্তিগণ বা সামাজিক সাধারণকে আহ্বান করিতে পারিবেন।
এই-সকল কার্য ব্যতীত সামাজিকগণ পার্বণ-উপলক্ষে উৎসবসভায় মিলিত হইবেন।
সমাজবর্তী প্রত্যেককেই নিজের আয়ের নির্দিষ্ট অংশ করস্বরূপ সমাজকে দিতে হইবে।
ত্রিশ টাকা পর্যন্ত দুই আনা, পঞ্চাশ টাকায় চার আনা, এক শ টাকা হইতে হাজার টাকা পর্যন্ত শতকরা এক টাকা ও তদূর্ধ্বে শতকরা দেড় টাকা কর দিতে হইবে।
ছাত্র-সামাজিকগণকে বৎসরে আট আনা কর দিতে হইবে।
সমাজে প্রবেশকালে প্রত্যেককে প্রবেশিকা এক টাকা দিতে হইবে।
কাহারও আয়ের পরিমাণ সম্বন্ধে কোনোরূপ আলোচনা বা অনুসন্ধান করা হইবে না।
বিবাহাদি ক্রিয়াকর্মে সামাজিকগণ যে ব্যয় করিবেন তাহার অন্তত শতকরা আট আনা সমাজে দান করিতে হইবে।
প্রত্যেক সামাজিকের বাড়ি একটি করিয়া বাক্স থাকিবে। এই বাক্সে পরিবারস্থ ব্যক্তিগণের স্বেচ্ছাদত্ত খুচরা দান জমা হইবে। মাসের শেষে এই দান সমাজের বাক্সে গৃহীত হইবে। কোন্ বাক্স হইতে কত গৃহীত হইল তাহা যাহাতে অগোচর থাকে, সেইরূপ উপায় অবলম্বিত হইবে।
কর-আদায় সম্বন্ধে কোনো সামাজিককে কোনো অনুরোধ করা হইবে না। তাঁহাদের নিজের প্রতি সম্পূর্ণ নির্ভর করা হইবে।
কর আদায় না হইলেও তাঁহাদিগকে সমাজ হইতে অপসারিত করা হইবে না।
যাঁহারা অধিনায়কের আদেশ মানিবেন না, সমাজের বিধান লঙ্ঘন করিবেন, সমাজের মান্য ব্যক্তিগণকে অপমান করিবেন, সামাজিকগণকে বিদ্রোহী করিবার চেষ্টা করিবেন, বিশেষ কর্মে নিযুক্ত হইয়া কর্মক্ষেত্রে বারম্বার অনুপস্থিত থাকিবেন, তাঁহাদিগকে তৎসম্বন্ধে অধিনায়ক সতর্ক করিলে পর যদি তাঁহারা সমাজনির্দিষ্ট প্রায়শ্চিত্তবিধি অনুসারে দণ্ড স্বীকার-পূর্বক আচরণ সংশোধন না করেন, তবে অধিনায়কের আদেশঅনুসারে তাঁহাদিগকে সমাজ হইতে অপসারিত করা হইবে।
সমাজের বিচারে কোনো সামাজিক সমাজবিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ করিলে সমাজের বারো আনা লোকের সম্মতিক্রমে সামাজিকগণ তাঁহার সহিত সর্বপ্রকার ব্যবহার রহিত করিবেন।
প্রথম এক বৎসর সমাজগঠনকাল-রূপে গণ্য হইবে।
এই বৎসরে অধিনায়ক কেহ থাকিবেন না।
একটি প্রতিষ্ঠাসমিতি মন্ত্রিসভা ও কর্মিসভা নির্বাচন করিবেন।
মন্ত্রিগণ বিস্তারিতরূপে নিয়ম রচনা ও সমাজের কার্য চালনা করিতে থাকিবেন।
বয়োজ্যেষ্ঠতা-অনুসারে পর্যায়ক্রমে এক-একজন মন্ত্রী নায়কের পদ গ্রহণ করিবেন ও তৎকালে তাঁহার অভিপ্রায়ই চূড়ান্ত বলিয়া গণ্য হইবে।
তিনি পূর্বমীমাংসিত কোনো বিষয়ের পরিবর্তন করিতে পারিবেন না।
মন্ত্রিসভার চারিজন একমত হইলে তবে পরিবর্তন করিতে পারিবেন।
সমাজের বিধিগুলি যেমন যেমন স্থির হইবে, অমনি তাহা সমাজে প্রচলিত হইতে থাকিবে।
এক বৎসরের শেষে এই মন্ত্রী ও কর্মী-সভা অবসর লইবেন ও তখন সমাজের নিয়ম-অনুসারে নূতন নির্বাচন হইবে।[১]
- ↑ মুদ্রিত অনুষ্ঠানপত্র: সংগ্রাহক শ্রীঅমল হোমের সৌজন্যে পরিদৃষ্ট ও পুনর্মুদ্রিত।