স্বদেশী সমাজ/‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধ-পাঠ
‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধ-পাঠ
প্রথম সভা
গত ৭ই শ্রাবণ শুক্রবার অপরাহ্ণ সাড়ে ছয়টার সময় চৈতন্য লাইব্রেরির বিশেষ অধিবেশনে মিনার্ভা-থিয়েটার গৃহে শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় ‘স্বদেশী সমাজ’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। সভায় শহরের অনেক গণ্যমান্য লোক উপস্থিত ছিলেন এবং জনতা এত অধিক হইয়াছিল যে, প্রায় এক সহস্র ব্যক্তি সভাগৃহে স্থান না পাইয়া ফিরিয়া গিয়াছিলেন। শ্রীযুক্ত রমেশচন্দ্র দত্ত মহাশয় সভাপতির আসন গ্রহণ করেন।
···বিষয়গুলি বিস্তৃতভাবে বলিয়া উপসংহারে প্রবন্ধ-লেখক স্বদেশের পূজার জন্য সকলকে যে কবিত্বপূর্ণ ভাষায় উদ্বোধন করিয়াছিলেন তাহা সমবেত শত শত ব্যক্তি চিত্রার্পিতের ন্যায় নীরবে শ্রবণ করিয়াছিলেন। তাঁহার প্রবন্ধ সম্বন্ধে সভাপতি মুগ্ধভাবে বলিয়াছিলেন—এরূপ প্রবন্ধ তিনি কখনও শুনিয়াছেন বলিয়া তাঁহার স্মরণ নাই। উপস্থিত সমস্ত ব্যক্তি এই মন্তব্যের সত্যতা স্বীয় স্বীয় হৃদয়ের মধ্যে প্রবলভাবে উপলব্ধি করিয়াছিলেন।
গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য
প্রবন্ধপাঠান্তে স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় উঠিয়া উহার বিশেষ প্রশংসা করিলেন। তিনি বলিলেন, প্রবন্ধের বিষয় তিন ভাগে বিভক্ত করা যাইতে পারে। এক ভাগ সর্ববাদিসম্মত, যথা—রাজদ্বারে আবেদন করার অপেক্ষা আত্মনির্ভরের প্রতি লক্ষ স্থির করা উচিত, বিদেশ হইতে সংগ্রহ করিব দেশে সঞ্চয় করিব ইত্যাদি। দ্বিতীয় ভাগ—এমন কতকগুলি বিষয় আছে যাহা আমি ভালো করিয়া চিন্তা করি নাই, সুতরাং তৎসম্বন্ধে আমি সুস্পষ্টভাবে স্বীয় মত ব্যক্ত করিতে পারি না। সমাজপতি-নির্বাচন প্রভৃতি বিষয় এই শ্রেণীর। তৃতীয় ভাগ—প্রবন্ধকার মেলার কথা সুস্পষ্টভাবে বলিয়াছেন, জাতীয় উন্নতি-সম্বন্ধীয় অন্যান্য বিষয়ের আভাস দিয়াছেন, কিন্তু তাহা খুব সুস্পষ্ট করিয়া বলেন নাই। কোনো ব্যক্তি একটি দেশ গজকাঠি লইয়া মাপিতে যান। প্রত্যেকটি স্থান, তাহার ভৌগোলিক সংস্থান, ইতিহাস প্রভৃতি তাঁহার নক্সায় পরিস্ফুট হইয়া উঠে। ইনি বৈজ্ঞানিক। কিন্তু অপর এক ব্যক্তি সেসমস্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিচিত্র তত্ত্বের দিকে না যাইয়া হয়তো একটি টিলার উপর দাঁড়াইয়া অঙ্গুলিসংকেতে দূর হইতে দেখাইয়া দেন, সেই আভাসে সমগ্র দেশটির একটি সংক্ষিপ্ত ও জীবন্ত চিত্র দর্শকের চক্ষে পরিস্ফুট হইয়া উঠে। ইনি কবি। বৈজ্ঞানিক যেরূপভাবে আমাদের অভাব-অভিযোগের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কথা বলিয়া উপায়গুলির ক্ষুদ্রতম বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হইতেন রবীন্দ্রনাথ তাহা না করিয়া তাঁহার অপূর্ব প্রতিভার সংকেতে যেন একটি চিত্র আঁকিয়া দেখাইয়াছেন।
আমরা বিদেশমুখী ছিলাম, এখন স্বদেশমুখী হইব; কেন্দ্রের দিকে লক্ষ রাখিয়া স্বদেশ বিদেশ দুইই আমরা পাইব। অন্ধ কেন্দ্রাভিমুখী গতি আমাদের কল্যাণকর নহে। ধূমকেতুর ন্যায় কেন্দ্রবিচ্যুত হওয়া ভালো নহে। সৌরজগতের গ্রহাদির মতো কেন্দ্রের অধীন হইয়া আমাদের গতি রাখিতে হইবে।
হীরেন্দ্রনাথ দত্তের মন্তব্য
অতঃপর শ্রীযুক্ত হীরেন্দ্রনাথ দত্ত মহাশয় উঠিয়া প্রবন্ধের অশেষ প্রশংসা-পূর্বক বলিলেন, গত ৪০।৫০ বৎসর যাবৎ লোকের মনে যে-সকল কথা আভাসে উদয় হইয়াছে রবীন্দ্রবাবু তাহাই অপূর্ব ভাষার পরিচ্ছদ পরাইয়া বাহিরে আনিয়াছেন। ভিক্ষাবৃত্তি এখন নিরর্থক হইয়াছে, কিন্তু এক সময়ে উহা সার্থক ছিল। যে যুগে বেণ্টিঙ্ক মেটকাফ মেকলে প্রভৃতির ন্যায় উদারহৃদয় ব্যক্তিগণ সত্য-সত্যই এ দেশকে উন্নত করিতে সরলভাবে অভিলাষী ছিলেন, সে যুগে ভিক্ষার ঝুলি শূন্য থাকিত না। তাঁহাদের কার্যকলাপে আমাদের মনে যথেষ্ট আশার সঞ্চার হইয়াছিল। সুতরাং দেশের পূর্বনায়কগণ কতকগুলি ভিক্ষাবৃত্তি করিয়াছিলেন। তখন গৃহস্বামী সদয় ছিলেন। কিন্তু এখন যদি তিনি সিংহদ্বারে অর্ধচন্দ্র লইয়া রোষকষায়িত নেত্রে দৃষ্টিপাত করেন, তবে ভিক্ষুকের আশা একেবারে ত্যাগ করাই ভালো। তাঁহারা যদি মনে করিতেন তবে আমাদের অনেক উন্নতি করিতে পারিতেন। জাপান ৩০ বৎসরে যে উন্নতির শিখরদেশে দাঁড়াইল, ১৫০ বৎসরের চেষ্টায় কি তাহা আমাদের অধিগম্য হইত না? ভগবান ইংরেজের দ্বারা আমাদের যে একটা মহৎ উপকারের সুযোগ দিয়াছিলেন তাহা কী কারণে পণ্ড হইল? আমার বিবেচনায় এজন্য ইঁহারাই দায়ী। ইঁহারা ইচ্ছা করিয়াছিলেন এজন্য স্কট্ল্যাণ্ডের অবস্থা দ্রুতবেগে উন্নতিলাভ করিয়াছে, কিন্তু আয়র্লণ্ড্ ইঁহাদের অবজ্ঞায় পশ্চাতে পড়িয়া আছে। আমরা দূরদৃষ্টক্রমে ইঁহাদের ওয়ার্ল্ড্ এম্পায়ারের মধ্যে স্থান পাই নাই; অস্ট্রেলিয়া যাহা পাইয়াছে, শত্রুতা করিয়াও বোয়ারগণ যাহা পাইল, ভারতবাসিগণ হৃদয়ের রক্ত অজস্র ঢালিয়াও তাহা পাইল না। সুতরাং আমাদের এখন আত্মনির্ভর ভিন্ন উপায়ান্তর নাই। এখন ভারতবাসী সমস্ত জাতি একত্র হইয়া কার্য করিবার দিন; খণ্ড খণ্ড ভারত লইয়া এখন এক মহাভারত গঠন করার সময় হইয়াছে।
রবীন্দ্রনাথের পুনশ্চ বক্তব্য
শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় বলিলেন, আমি প্রবন্ধপাঠের উপলক্ষে আপনাদের অনেকটা সময় নিয়াছি, এখন আর-একটু সময় নেব। আমি বাল্যকাল হইতে কাব্যসাহিত্য-দ্বারা আপনাদের হৃদয়বন্ধন করিতে চেষ্টা পাইয়াছি। কিন্তু অদ্যকার উদ্দেশ্য শুধু হৃদয়রঞ্জন নহে। যে লোকের ব্যবসা বাঁশি বাজানো, সহসা সর্পাঘাতের উপক্রম হইলে সে বাঁশিকে লাঠির মতো ব্যবহার করিয়া থাকে। আমার যাহাকিছু শক্তি আছে তাহা উদ্যত করিয়া আজ দেশের এই দুর্দিনে আসন্ন অমঙ্গলকে ঠেকাইতে চেষ্টা করিতেছি। আমি সমাজের একজন অধিনায়ক স্থির করার কথা বলিয়াছি। এ দেশে যতপ্রকার চেষ্টা হইয়াছে তন্মধ্যে দেখিতে পাই যে, কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্রবর্তী করিয়া আমরা যেরূপ সফলতা লাভ করিতে পারিয়াছি অন্য কোনোরূপে তাহা হয় নাই। একজন লোককে এইভাবে দাঁড় করাইতে পারি নাই বলিয়া আমাদের উদ্যম সফলতা লাভ করিতে পারিতেছে না।
অতঃপর রবীন্দ্রবাবু স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহোদয়কে সমাজের অধিনায়কের পদে বরিত করিবার পক্ষে অনেকগুলি সুযুক্তি প্রদর্শন করিলেন।
সভাপতি রমেশচন্দ্র দত্তের মন্তব্য
সভাপতি শ্রীযুক্ত রমেশচন্দ্র দত্ত মহাশয় বলিলেন, রবীন্দ্রবাবুর প্রবন্ধের ন্যায় উৎকৃষ্ট প্রবন্ধ তিনি কখনও শুনিয়াছেন বলিয়া তাঁহার স্মরণ নাই।
একটি কথা এই যে, কেবল রাজনীতি বা কেবল সামাজিক বিষয় লইয়া কোনো জাতি উন্নত হয় না। উন্নতি সমস্ত দিক হইতেই হইয়া থাকে। কোনো গাছটি বৃদ্ধি পাইবার পূর্বে যদি নিয়ম বাঁধিয়া দেওয়া হয়, উহা এতদিন শুধু লম্বা হইতে থাকিবে কিংবা এতদিন শুধু চওড়া হইতে থাকিবে, তাহা যেরূপ অস্বাভাবিক—একসঙ্গে লম্বা ও চওড়া হইয়া বৃদ্ধি পাওয়াই নিয়ম—সেইরূপ জাতীয় উন্নতি চতুর্দিক হইতে হইয়া থাকে, শুধু সমাজনীতি বা রাজনীতি লইয়া থাকা একদেশদর্শিতা। ভাগীরথী যেরূপ রাজমহাল হইতে শতধারায় সমুদ্রাভিমুখী গতি লইয়াছে, আমাদের চেষ্টাও সেইরূপ শতমুখী হইয়া উন্নতির পথে প্রধাবিত হইবে। ঐক্য অবলম্বন করিয়া যে-কোনো বিষয়ে কাজ করা যায় তাহাতেই সার্থকতা হইবে। এই সুফল আমাদের রাজার হাতে ততটা নহে যতটা আমাদের হাতে।
অতঃপর সভাপতি মহাশয়কে ধন্যবাদ দেওয়ার পর সভাভঙ্গ হইল।
দ্বিতীয় সভা
ইহার পর শত শত বিমুখ ব্যক্তি রবীন্দ্রবাবুর দ্বারে ঘুরিতে লাগিল। এই প্রবন্ধ বহু লোকে শুনিতে পান নাই। তাঁহারা সভায় স্থানাভাববশতঃ লাঞ্ছনার একশেষ পাইয়া ফিরিয়া আসিয়াছেন। ইঁহাদের সনির্বন্ধ অনুরোধ এড়াইতে না পারিয়া অসুস্থতা-সত্ত্বেও রবীন্দ্রবাবু পরিবর্ধিত আকারে পুনরায় উহা পাঠ করিতে সম্মত হন। গত ১৬ই শ্রাবণ রবিবার বেলা পাঁচটার সময় কর্জন-থিয়েটার-গৃহে এইজন্য একটি সভা আহূত হয়। এবার টিকিট বিতরণ করিয়া শ্রোতাগণের জন্য স্থান নির্দিষ্ট হইয়াছিল। ১২০০ টিকিট ৪ ঘণ্টার মধ্যে বিতরিত হইয়া গিয়াছিল। বহুসংখ্যক লোককে এবারও ভগ্নমনোরথ হইয়া ফিরিয়া যাইতে হইয়াছিল। শ্রীযুক্ত হীরেন্দ্রনাথ দত্ত মহাশয় সভাপতির আসন গ্রহণ করেন। রবীন্দ্রবাবু জ্বর লইয়া সভাস্থলে আসিয়াছিলেন। তিনি দাঁড়াইতে না পারিয়া বসিয়া ধীর সুকণ্ঠে তাঁহার সুন্দর প্রবন্ধটি পুনরায় পাঠ করেন। যাঁহারা প্রথমবার শুনিয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যেও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সুকণ্ঠ উচ্চারিত কবিত্বপূর্ণ ভাষায় এদিনও যখন তিনি প্রবন্ধ পাঠ করেন তখন শ্রোতৃবর্গ মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাঁহার মুখের প্রতি নির্নিমেষ দৃষ্টিপাত করিয়া বসিয়া ছিলেন। প্রবন্ধকার যখন বলিতে লাগিলেন কলাপাতে খাওয়া আমাদের লজ্জার কথা নহে, একা খাওয়াই লজ্জার কথা—সাহেব-মনস্তুষ্টির কথা উল্লেখ করিয়া যখন চণ্ডীদাসের পদ উদ্ধৃত করিলেন—
‘ঘর কৈনু বাহির বাহির কৈনু ঘর
পর কৈনু আপন আপন কৈনু পর’
তখন শত শত শ্রোতা জাতীয়তার যে আবেগ অনুভব করিয়াছিলেন তাহা সভাগৃহকে মৌন স্বদেশভক্তির উচ্ছ্বাসে অপূর্বভাবে সজীব করিয়া তুলিয়াছিল।
গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমাজপতি নির্বাচনের প্রস্তাব
পূর্বে উক্ত হইয়াছে এবার প্রবন্ধটি পরিবর্ধিত হইয়াছিল। এবার সমাজের অধিনায়কের পদে শ্রীযুক্ত গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়কে বরণ করিবার প্রস্তাব প্রবন্ধের মধ্যেই সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হইয়াছিল। সে অংশটি এই—‘যিনি এক দিকে আচার ও নিষ্ঠা দ্বারা হিন্দুসমাজের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিয়াছেন, অপর দিকে আধুনিক বিদ্যালয়ের শিক্ষায় যিনি মহৎ গৌরবের অধিকারী; এক দিকে কঠোর দারিদ্র্য যাঁহার অপরিচিত নহে, অন্য দিকে আত্মশক্তির দ্বারা যিনি সমৃদ্ধির মধ্যে উত্তীর্ণ; যাঁহাকে দেশের লোকে যেমন সম্মান করে, বিদেশী রাজপুরুষেরা তেমনি শ্রদ্ধা করিয়া থাকে; যিনি কর্তৃপক্ষের বিশ্বাসভাজন, অথচ যিনি আত্মমতের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করেন নাই; নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার যাঁহার প্রকৃতিগত ও অভ্যাসগত, নানা বিরোধী পক্ষের বিরোধসমন্বয় যাঁহার পক্ষে স্বাভাবিক; যিনি সুযোগ্যতার সহিত রাজার ও প্রকৃতিসাধারণের সম্মাননীয় কর্মভার সমাধা করিয়া বিচিত্র অভিজ্ঞতার দ্বারা ঐশ্বর্যবান্ অক্ষুব্ধ অবসর লাভ করিয়াছেন—সেই স্বদেশ-বিদেশের শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত, সেই ধনসম্পদের মধ্যে অবিচলিত তপোনিষ্ঠ ভগবৎপরায়ণ ব্রাহ্মণ শ্রীযুক্ত গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম যদি এইখানে আমি উচ্চারণ করি, তবে অনেক পল্লবিত বর্ণনার অপেক্ষাও সহজে আপনারা বুঝিবেন কিরূপ সমাজকে আমি প্রার্থনীয় ও সম্ভবপর জ্ঞান করিতেছি।’
সভাপতি হীরেন্দ্রনাথ দত্তের মন্তব্য
প্রবন্ধপাঠের পর সভাপতি মহাশয় বলিলেন, প্রবন্ধটি দ্বিতীয় বার শুনিলাম, কিন্তু এরূপ প্রবন্ধ শত শতবার শুনিলেও ইহার রসাস্বাদের জন্য পুনশ্চ আগ্রহ জন্মে। কেহ কেহ বলেন, রবীন্দ্রবাবু জাতীয় নৈরাশ্যের সংগীত শুনাইয়াছেন। আমার মনে হয়—ইঁহার কথা নব আশার সংগীত। তিনি বলিতেছেন, যে প্রণালীতে আন্দোলন হইয়া আসিতেছে তাহাতে কাজ হইবে না। যাঁহারা গতানুগতিতে কাজ করিতেছেন তাঁহারা হয়তো একটু ভীত হইয়া পড়িতেছেন। তাঁহাদের কার্যে ততটা স্বার্থত্যাগ নাই এবং দেশের জন্য জীবন ব্যয় করিয়া খাটিবার চেষ্টাও নাই। অথচ ‘দেশের কার্য করিতেছি’ এই বিশ্বাস জনিত একটা পরিতৃপ্তি আছে। রবীন্দ্রবাবু দেখাইয়াছেন—পূর্বে যে প্রণালীতে কাজ করা হইত এখন তাহা উপযোগী নহে। বৎসরের মধ্যে তিন দিন মাত্র একত্র হইয়া বাক্যব্যয় করিলে দেশের বিশেষ কোনো কল্যাণ সাধিত হইবে না। ইংরেজদের সদ্ব্যবহারে ইতিপূর্বে খানিকটা আশা ছিল, কিন্তু এখন সে আশা ঘুচিয়া গিয়াছে, শুভ্রাঙ্গের সাম্রাজ্যে কৃষ্ণাঙ্গের অধিকারলাভের আশা দুরাশা। যেদিন দেখা গেল স্যালিশ্ব্যারি দাদাভাই নৌরজিকে কৃষ্ণাঙ্গ বলিয়া প্রকাশ্যভাবে অবজ্ঞার স্বরে কথা কহিলেন, যেদিন দেখা গেল বোয়ারদের প্রতি শত্রুতা ঘোষণা করিয়াও তাঁহাদিগকে রিপাব্লিক দেওয়া হইল, ভারতবর্ষের শত শত আবেদন উপেক্ষা করিয়া ক্রমেই তাহাদের রাজকীয় অনুগ্রহের গণ্ডী সংকুচিত করা হইতেছে—তখন রাজদ্বারে কাঙালের বেশে উপস্থিত হওয়া যে নিতান্ত নিরর্থক তাহা আমরা বেশ বুঝিতে পারিয়াছি। তিন দিনের ঝঙ্কারে এখন আমাদের চেষ্টার কোনো সার্থকতা হইবে না। সমস্ত জীবন ব্যয় করিয়া দেশের কাজ করিতে হইবে। তাহা না হইলে জীবন প্রভাত হইবে না। রবীন্দ্রবাবু আশান্বিতভাবে বলিয়াছেন আমাদের অপমৃত্যু ঘটিবে না। তিনি জাতীয় জীবনের ভূতচিত্র হইতে এ দেশের সামঞ্জস্যবিধানের প্রতিভা প্রতিপন্ন করিয়া দেখাইয়াছেন। তিনি দেখাইয়াছেন—এক সময়ে অনার্যকে, তৎপর শক প্রভৃতি জাতিকে, হিন্দুজাতি আত্মীয় করিয়া লইয়াছেন। বৌদ্ধবিপ্লবের পরে হিন্দুজাতির একটু সংকীর্ণতা-অবলম্বন আবশ্যকীয় হইয়াছিল। পারসিক জাতি সেই বন্যার সময়ে আত্মরক্ষার জন্য চেষ্টা না করাতে আত্মঘাতী ও লুপ্ত হইয়া পড়িয়াছে। হিন্দুজাতি সংকীর্ণতার প্রাচীর তুলিয়া আত্মরক্ষা করিয়াছেন। এখন আর সেই সংকীর্ণতা ততটা উপযোগী নহে।
বিপিনচন্দ্র পালের মন্তব্য
সভাপতিকে ধন্যবাদ দেওয়ার উপলক্ষে শ্রীযুক্ত বিপিনচন্দ্র পাল মহাশয় বলিলেন, রবিবাবু যে আদর্শ দেখাইয়াছেন তাহা নূতন নহে এবং তাহা পুরাতনও নহে। নূতন আদর্শ পুরাতন আদর্শকে বর্জন করে নাই। গত ২৫ বৎসর যাবৎ দেশে যে সাধনা চলিতেছে রবীন্দ্রবাবুর প্রবন্ধ তাহারই ফল। এক সময়ে পশ্চিমগগনপ্রান্ত সৌরকরচ্ছটায় দীপ্ত হইয়া আমাদিগকে আমন্ত্রিত করিয়াছিল। এখন যদি আমাদের পক্ষে পশ্চিমে সূর্যাস্ত হইয়া থাকে তবে তাহার অভিমুখী হইয়া থাকা পণ্ডশ্রম মাত্র। এখন নবসূর্য পূর্বদিক হইতে সমুদিত হওয়ার লক্ষণ দেখাইতেছে। আর পশ্চিমের দিকে তাকাইলে চলিবে না। এক সময় আমরা ভাবিয়াছিলাম ইংরেজও মানুষ আমরাও মানুষ। তাঁহাদের যাহা সাধ্যায়ত্ত আমাদেরও তাহাই। সে ভ্রম এখন ঘুচিয়া গিয়াছে। তখন ফরাসি বিপ্লবের প্রচণ্ড আলোকে ইংরেজ আমাদিগের রাজ্যে অভিনব মৈত্রীর মহাবাণী প্রচার করিয়াছিলেন, আমরা তাহাতেই লুব্ধ হইয়াছিলাম। রেড ইণ্ডিয়ানের মতো আমরা শ্বেতাঙ্গের মোহিনীতে মুগ্ধ হই নাই। ইংরেজ এখন সেই মৈত্রীর প্রতিশ্রুতি ক্রমেই ভুলিয়া যাইতেছে। কিন্তু বুদ্ধ যে দেশে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন সে দেশের লোক মনুষ্যত্বের উচ্চতম আদর্শ কখনোই বিস্মৃত হইবে না। জাতীয় উন্নতি এখন আর পরকীয় দান-দ্বারা ঘটিবে না, স্বকীয় সাধনা দ্বারা অর্জন করিতে হইবে। বিলাতে রাজা প্রজার প্রতিনিধি, এখানে তাহা নহে। দশজন দেশীয় লোক আজ সাহেবের সভা আলো করিয়া বসিবেন, ৩০০ প্রস্তাবের মধ্যে তিনটি প্রস্তাব সম্বন্ধে কথঞ্চিৎ সার্থকতা লাভ করিবেন, ইহাকেই দেশের বিরাট হিত বলিয়া ঘোষণা করিতে হইবে—মিউনিসিপাল কর্পোরেশনে যেখানে দেশীয় লোকের পক্ষ হইতে ৩০০৲ টাকা মঞ্জুর করিবার প্রস্তাব হইল, সেই স্থানে তিন টাকা মজুরি পাইয়াই কি আমরা ধন্য হইব—এই অকিঞ্চিৎকর চেষ্টা ত্যাগ করিয়া যাহাতে আমরা নিজের পায়ের উপর নিজেরা দাঁড়াইতে পারি তাহারই চেষ্টা করা কর্তব্য। রবীন্দ্রবাবু জাতীয় জীবনের যে নূতন আদর্শ দেখাইয়াছেন তাহাই আমাদের পক্ষে একান্ত অবলম্বনীয়।
স্বদেশী সমাজ
রবীন্দ্রনাথের পুনশ্চ বক্তব্য
সভাভঙ্গের পূর্বে রবীন্দ্রবাবু সভার রীতি ভঙ্গ করিয়া দুইটি কথা বলিবার অনুমতি লইলেন এবং বলিলেন—
আজ সমবেত ব্যক্তিগণকে সাহিত্যরস দেওয়ার জন্য আমি দাঁড়াই নাই। শুধু উদ্দীপনায় কোনো কাজই হয় না; আগুন জ্বালাইতে হইবে, সঙ্গে সঙ্গে হাঁড়িও চড়াইতে হইবে। ক্রমাগত অগ্নি জ্বালাইলে ইন্ধন নষ্ট করা হয় মাত্র, হাঁড়ি চড়াইয়া হয়তো অগ্নির বেগ সংযত করিবার জন্য গোটাকতক ইন্ধন সরাইয়া ফেলিতেও হইবে। আমাদিগকে অপ্রমত্তভাবে কাজ করিতে হইবে। আমরা সাধারণতঃ সর্বদাই যেন একটা মত্ততার জন্য অপেক্ষা করিয়া থাকি, কিছু পরেই উত্তেজনার অবসানে নিতান্ত নিশ্চেষ্ট হইয়া পড়ি। আমি শুধু উদ্দীপনার জন্য এই প্রবন্ধ পাঠ করি নাই। আমরা অনেক সময় কল্পনা দ্বারাই খুব বেশি পরিমাণে চালিত হই, দেশের কাজ করিতে হইলে মনে ভাবি যেন ধুমধামের সহিত মস্ত একটা অট্টালিকা গড়িতে হইবে, একটা চূড়া প্রস্তুত করিতে হইবে, যেন কোনো-একটা সমারোহব্যাপার—আমাদের চেষ্টা এই ভাবে একটা সুবৃহৎ কল্পনায় পর্যবসিত হইয়া যায়। আমরা যেন প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষুদ্রভাবে দেশের জন্য কাজ করিতে পারি। আমার প্রস্তাব প্রত্যেকে নিজেদের গৃহে স্বদেশের জন্য যদি প্রত্যহ কিছু উৎসর্গ করিয়া রাখেন তবে ভবিষ্যতে সেই সঞ্চয় কাজে লাগিবে। তাহা ছাড়া উহা আমাদের একটা চেতনা প্রবুদ্ধ করিয়া রাখিবে। ইহা, সভা কি বার্ষিক কোনো সমিতির জন্য প্রতীক্ষা না করিয়া, আমরা অনায়াসে করিতে পারি। এইরূপে নীরবে, কোনো বিশেষ সময়ের প্রতীক্ষা না করিয়া, সেবার কার্য করিতে ভারতবর্ষের একটা বিশেষত্ব আছে। অন্য দেশে রবিবার দিন মাত্র গির্জায় যাইতে হয় এবং প্রার্থনাদির জন্য পাদ্রির আবশ্যক হয়, কিন্তু আমাদের প্রত্যেককে মন্ত্র জপিতে হয়—তাহার জন্য পুরোহিতের প্রয়োজন হয় না। সেই মন্ত্র প্রত্যহ আধ্যাত্মিক শক্তি উদ্বোধিত করিয়া দেয়, আমরা সাপ্তাহিক কোনো উত্তেজনার প্রতীক্ষা করি না। আমাদের স্বদেশভক্তিও যেন সেইরূপ কোনো সভা-সমিতির তাগিদের প্রতীক্ষা না করিয়া নীরবে আপন কার্য সমাপন করে। স্বদেশের কাজ যেন বৃহৎ বাহ্য অনুষ্ঠানে পরিণত না হয়। তজ্জন্য একটা বড়ো ভাণ্ডার করিয়া একজন খাজাঞ্জি হইলেন, একজন টাকা ভাঙিতে লাগিলেন—এইরূপ ভাবের অনুষ্ঠান কখনোই এ দেশে সার্থক হইবে না। আমাদের অবস্থা একটা গল্পের কথায় এই ভাবে বলা যাইতে পারে—একজন একটা পয়সা খুঁজিতে দীপ জ্বালাইয়া ইতস্তত সন্ধান করিতে করিতে তাহার পূর্বপুরুষের একটা রত্নভাণ্ডারের খোঁজ পায়, তথাপি মাটি খুঁড়িয়া তাহা বাহির করিবার চেষ্টা না করিয়া ক্রমাগত সে যদি সেই একটা পয়সার খোঁজই করিতে থাকে, তবে এমন ব্যক্তিকে কী বলা যাইবে? ইংরেজ সেইরূপ এ দেশে আসিয়া কয়েকটা পয়সা ছড়াইয়া ফেলিয়াছিল। তাহা খুঁজিতে যাইয়া আমরা দেশীয় আত্মশক্তির রত্নভাণ্ডারের খোঁজ পাইয়াছি। তথাপি কেহ কেহ সেই পয়সা কয়েকটির খোঁজ করিয়াই সময় অতিবাহিত করিতেছেন। ইংরেজের ভোজের নিমন্ত্রণে আমাদের আহ্বান নাই, তথাপি দ্বারস্থ হইয়া সেই টেবিলের দিকে চাহিয়া থাকিতেছি। যাহা গড়াইয়া পড়িতেছে তাহার দিকে লুব্ধ দৃষ্টিপাত না করিয়া, বাড়িতে যাইয়া হাঁড়ি চড়াইয়া ভাত ডালের ব্যবস্থা করা কি উচিত নহে? সেই শাকান্নও আমাদের পক্ষে সহস্রগুণে শ্রেয়ঃ।[১]
- ↑ এই বিবরণী সভাস্থলেই নোট করা হইয়াছিল। ... বক্তাগণের কথার সারমর্ম সংকলিত... সাধ্যমত তাঁহাদের নিজের ভাষা রক্ষা করিবার চেষ্টা করা হইয়াছে।—শ্রুতিলেখক