স্বর্গীয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
স্বর্গীয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

স্বর্গীয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

শ্রীরজনীকান্ত গুপ্ত প্রণীত

১৩০০ সালের ১৩ই শ্রাবণ স্বর্গীয় বিদ্যাসাগর মহাশযের স্মরণার্থে
বিজ্ঞানসভাগৃহে বিদ্যাসাগরপুস্তকালয় ও ঝামাপুকুর
পাঠাগারের সভ্যগণের যত্নে যে সভার অধিবেশন
হয তাহাতে পঠিত।

(সাহিত্য হইতে পুনর্মুদ্রিত।)

কলিকাতা,

১২নং রামকৃষ্ণ দাসেব লেন, সাহিত্য যন্ত্রে

শ্রীযজ্ঞেশ্বর ঘোষ কর্ত্তৃক মুদ্রিত

এবং

শ্রীরাজেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য কর্ত্তৃক প্রকাশিত।

সন ১৩০০ সাল।


মূল্য ৵৹ দুই আনা।

স্বর্গীয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

আমাদের প্রাচীন ইতিহাসের পর্য্যালোচনা করিলে ইহা জানিতে পারা যায় রে, বিলাসবিদ্বেষ, কষ্টসহিষ্ণুতা, পরার্থপরতা ও সর্ব্বপ্রকার কঠোরতায় অপরাঙ্মুখতা, আমাদের জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য ছিল। হিন্দুছাত্ত্র যখন শাস্ত্রানুশীলনে মনোনিবেশ করিতেন, তখন তাঁহাকে অতি কঠোর ব্রতে দীক্ষিত হইতে হইত। আপাতরম্য সৌখীনভাবে তখন তাঁহার প্রবৃত্তি থাকিত না, বিষয়বাসনার পঙ্কিল প্রবাহে তখন তাহার হৃদয় কলুষিত হইত না, উচ্ছৃঙ্খলতার সমাবেশেও তখন তাঁহার প্রত্যেক কার্য্য উন্মার্গগামী হইয়া উঠিত না। তিনি তখন নানা কষ্ট সহিয়া, বিঘ্ন বিপত্তির সহিত ঘোরতর সংগ্রাম করিয়া, নানা দুঃসাধ্য কার্য্যসাধনে সর্ব্বদা উদ্যত থাকিয়া, শারীরিক উন্নতির সহিত অপূর্ব্ব মানসিক শক্তির পরিচয় দিতেন। হিন্দু গৃহস্থ যখন গার্হস্থ্যধর্ম্মপালনে প্রবৃত্ত হইতেন, তখন তাঁহাকে পরের জন্য সর্ব্বস্ব ত্যাগ করিতে হইত। তিনি তখন আত্মসুখের প্রতি দৃক্‌পাত করিতেন না, নিরবচ্ছিন্ন আত্মোদরপূরণে আসক্ত থাকিতেন না, বা আত্মসমৃদ্ধির বিস্তার করিয়া বিলাসসাগরে ভাসিয়া বেড়াইতেন না। তখন তাঁহার সমস্ত কার্য্য পরোপকারার্থে অনুষ্ঠিত হইত। পরপরি চর্য্যাই তখন তিনি আপনার প্রধান ব্রত বলিয়া মনে করিতেন। তাঁহার এই পবিত্র ব্রতের মহিমায়, রোগশোকতাপময় সংসার শান্তিনিকেতনস্বরূপ হইয়া উঠিত। “শ্যামলপত্রাবৃত ফলপুষ্পযুক্ত বৃক্ষ যেমন স্নিগ্ধ ছায়ায় পথশ্রান্ত পথিকের শ্রান্তিবিনোদন করে, সুস্বাদু ফল দিয়া, ক্ষুধার্তের ক্ষুধাশান্তি করিয়া থাকে, শাখা-বাহু বিস্তার করিয়া, শত শত বিহঙ্গকে আশ্রয় দান করে, তিনিও সেইরূপ গৃহাগত ভিক্ষার্থীকে দান করিয়া, জীবসমূহকে অন্ন দিয়া, অতিথি, অভ্যাগত ও আর্ত্তজনের আশ্রয়স্বরূপ হইয়া, ভূলোকে স্বর্গীয় শোভা বিকাশ করিতেন।” এইরূপ কঠোর কষ্টসহিষ্ণুতার সহিত অদম্য উদ্যম ও অধ্যবসায়, এবং এইরূপ পরার্থপরতার সহিত সর্ব্বজনহিতৈষিতা ও সর্বার্থত্যাগের দৃষ্টান্ত, আমাদের প্রাচীন ইতিহাসে অনেক প্রাপ্ত হওয়া যায়। কিন্তু পরিবর্ত্তনশীল কালের অনন্ত মহিমায় বা নিয়তির বিচিত্র লীলায়, এখন আমাদের সমাজের দশান্তর ঘটিয়াছে। এখন সে বিলাসবিদ্বেষ সৌখীনতার আবর্ত্তে পড়িয়া নিমজ্জিত হইয়াছে, সে কষ্টসহিষ্ণুতা আলস্য ও শ্রমবিমুখতার সহিত সংগ্রামে পরাজয় স্বীকার করিয়াছে, সে পরনিষ্ঠতা ও নিঃস্বার্থভাবের স্থলে বিকট স্বার্থপরতার কঠোরপীড়নে আশ্রয় প্রার্থী আর্ত্তজন কাতর ভাবে হাহাকার করিতেছে। এই অধঃপতন ও অধোগতির কালে, এই দুঃখ ও দুর্গতির শোচনীয় সময়ে, আমাদের মধ্যে আবার একটি অপূর্ব দৃশ্যের বিকাশ হইয়াছিল। আবার এই পরনিগৃহীত, পরপদদলিত, পরাবজ্ঞাত জাতির মধ্যে একটি মহাপুরুষ আবির্ভূত হইয়া, সেই পূর্বতন স্বর্গীয় ভাব—সেই মহিমান্বিত আর্য্যসমাজের মহত্তর কার্য্যের অবতারণা করিয়াছিলেন। ভীষণ মহামরুতে সুচ্ছায় বৃক্ষ বা সুপেয়জলপূর্ণ সরোবর পাইলে, মরীচিকায় উদ্‌ভ্রান্ত ও আতপ তাপে ক্লান্ত পান্থ যেমন শান্তিলাভ করে, সেই মহাপুরুষকে পাইয়া, রোগজীর্ণ ও সাংসারিক জ্বালাযন্ত্রণায় অবসন্ন লোকেও সেইরূপ শান্তি লাভ করিয়াছিল। “বীরপুরুষ রণস্থলে বিজয়িনী শক্তির পরিচয় দিয়া বীরেন্দ্রবর্গের বরণীয় হইতে পারেন, প্রতিভাশালী প্রতিভা খোইয়া সর্ব্বত্র প্রশংসালাভ করিতে পারেন, গবেষণাকুশল পণ্ডিত অভিনব তত্ত্বের উদ্ভাবন করিয়া, সহৃদয়দিগের প্রীতিবর্দ্ধন করিতে পারেন,” কিন্তু ভোগাভিলাষশূন্যতায়—পরহিতৈষিতায়, সর্ব্বোপরি সর্ব্বার্থত্যাগের মহিমায় তিনি চিরকাল সর্ব্বশ্রেষ্ঠ, সর্বসন্মানিত ও সর্ব্বজনের আদরণীয় হইয়া, করুণার পবিত্র মন্দিরে পবিত্র প্রীতির পুষ্পাঞ্জলি পাইবেন। আমরা আজ যাঁহার গুণকীর্ত্তন জন্য সমবেত হইয়াছি, সেই স্বর্গীয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরই উক্ত অলোকসামান্য মহাপুরুষ বলিয়া পরিগণিত হইয়াছেন, এবং সেই বিদ্যাসাগরই বাল্যে শ্রমশীলতার সহিত অপরিসীম কষ্টসহিষ্ণুতা, যৌবনে বিলাস বিদ্বেষের সহিত অপূর্ব তেজস্বিতা, ও বার্দ্ধক্যে লোকহিতকর কার্য্যানুষ্ঠানের সহিত অসামান্য দানশীলতার পরিচয় দিয়া, তেজস্বিতাভিমানী ও সভ্যতাস্পর্দ্ধী ইউরোপীয়ের সমক্ষে বাঙ্গালীর মুখোজ্জ্বল করিয়াছেন।

 বিদ্যাসাগর মহাশয় সমৃদ্ধিপূর্ণ সংসারে জন্মগ্রহণ করেন নাই, সমৃদ্ধির ক্রোড়ে লালিত হয়েন নাই, বা সমৃদ্ধিসুলভ বিষয়ভোগেও সংবর্দ্ধিত হইয়া উঠেন নাই। গগনবিদারী বাদ্যধ্বনিতে তাঁহার জন্মগ্রহণঘটনা ঘূচিত হয় নাই, গায়ককুলের কলকণ্ঠনিঃসৃত সঙ্গীত রবের মধ্যেও তাঁহার উদ্দেশে মাঙ্গলিক কার্য্য অনুষ্ঠিত হয় নাই, দূরবর্ত্তী জনপদবাসীরাও তাহার জন্মগ্রহণ জন্য সমবেত হইয়া, বিবিধ উৎসবে উল্লাসপ্রকাশ করে নাই। তিনি বাঙ্গালার একটি সামান্য পল্লীতে সঙ্কীর্ণ পর্ণকুটীরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতামহ সাংসারিক বিষয়ে এক প্রকার উদাসীন ছিলেন। তাঁহার পিতা এক এক দিন অনশনে বা অর্দ্ধাশনে থাকিয়া যাহা কিছু উপার্জন করিতেন, তাঁহাতেই অতিকষ্টে সংসার চালাইতেন। এইরূপ দরিদ্র পিতা এবং দরিদ্রতার প্রতিমূর্ত্তি পিতামহী ও জননী, বিদ্যাসাগরের অবলম্ব ছিলেন। পিতা অদূরবর্ত্তী হাট হইতে জিনিস পত্র লইয়া বাড়ীতে ফিরিয়া আসিতেছেন, এমন সময়ে পিতামহ তাঁহাকে কহিলেন. “আজ আমাদের একটা এঁড়ে বাছুর হইয়াছে।” বিদ্যাসাগরের জন্মগ্রহণসংবাদ এইরূপে বিজ্ঞাপিত হইয়াছিল। এইরূপ দরিদ্রতাময় সংসার—এইরূপ দরিদ্রভাবের মধ্যে তাঁহার আবির্ভাব ঘটিয়াছিল। তিনি এই চিরপবিত্র দরিদ্রভাব কখনও বিস্মৃত হয়েন নাই। তাঁহার জীবন দারিদ্র্যসহচর ব্রহ্মচারীর ন্যায় পরার্থপরতাময় ছিল। তিনি প্রভূত অর্থের অধিকারী হইয়া ও দরিদ্রভাবে যে কঠোর ব্রতপালন করিয়া গিয়াছেন, সেই ব্রতচর্য্যাই তাঁহাকে অলোকসামান্য মহাপুরুষের মহিমান্বিত সিংহাসনে স্থাপিত করিয়াছে। তিনি দরিদ্রের জন্য দরিদ্রের গৃহে আবির্ভূত হইয়াছিলেন, চিরজীবন দরিদ্রভাবে দরিদ্রপালন করিয়াই অনন্তপদে বিলীন হইয়াছেন। দরিদ্রের পর্ণ কুটীরে যে পবিত্র বহ্নিশিখার উদ্ভব হইয়াছিল, তাহার প্রখরদীপ্তি বিশ্বজয়ী রাজাধিরাজকেও হীনপ্রভ করিয়াছে।

 বিদ্যাসাগর ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ। পৃথিবীতে যে সকল মহাপুরুষ মহৎ কার্য্যে প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছেন, বিদ্যাসাগর তাঁহাদের অপেক্ষাও মহত্তর। তিনি প্রতিভাশালী পণ্ডিত অপেক্ষা মহত্তর, যে হেতু, তিনি প্রতিভার সহিত অসামান্য তেজস্বিতার পরিচয় দিয়াছেন। তিনি তেজস্বী মহাপুরুষ অপেক্ষা মহত্তর, যে হেতু, তিনি তেজস্বিতার সহিত স্বার্থত্যাগের পরাকাষ্ঠা দেখাইয়াছেন। তিনি দানশীল ব্যক্তিগণ অপেক্ষা মহত্তর, যে হেতু, তিনি দানশালতাপ্রকাশের সহিত বিষয়বাসনা এবং আত্মগৌরবঘোষণার ইচ্ছা সংযত রাখিয়া। ছেন। তাঁহাকে অনেক ভার সহিয়া, অনেক বাধা অতিক্রম করিয়া, অনেক কষ্টভোগ করিয়া, বিদ্যাভ্যাস করিতে হইয়াছিল। ইহাতে তিনি একদিনের জন্যও অবসন্ন হয়েন নাই। যখন তিনি লেখাপড়া শিখিবার জন্য কলিকাতায় উপনীত হয়েন, তপন তাঁহার বয়স আট বৎসর। তাহার বাসগ্রাম কলিকাতা হইতে প্রায় ২৬ ক্রোশ দূরবর্ত্তী। তখন রেলওয়ে ছিল না—স্টীমার ছিল না। তখন পদব্রজে দুর্গম পথ অতিবাহন করিয়া, কলিকাতায় আসিতে হইত। পথ যেরূপ দুর্গম, দস্যুতস্করের উপদ্রবে সেইরূপ বিপদসঙ্কুল ছিল। অষ্টম বর্ষীয় বালককে এই দুর্গম ও বিপত্তিপূর্ণ পথের অধিকাংশ পদব্রজে অতিক্রম করিতে হইয়াছিল। রাজ্যতাড়িত ও নিরতিশয় দুর্দশাগ্রস্ত হুমায়ুন যখন মরু-ভূমধ্যবর্ত্তা ক্ষুদ্র জনপদে স্বীয় তনয়ের জন্মগ্রহণের সংবাদ পাইয়া, অন্য সম্পত্তির অভাবে একটি সামান্য কস্তূরীর খণ্ড বন্ধুদিগের মধ্যে বিতরণ করেন, তখন তিনি বোধ হয় কখনও ভাবেন নাই যে, নবপ্রসূত বালক এক সময়ে সমগ্র ভারতের অদ্বিতীয় অধীশ্বর হইবে। দরিদ্র ঠাকুরদাস যখন অষ্টমবর্ষীয় পুৎত্রকে সঙ্গে করিয়া কলিকাতায় তাঁহার প্রতিপালকের গৃহে পদার্পণ করেন, তখন তিনিও বোধ হয় ভাবেন নাই যে, কালে এই বালক সমগ্র মহৎ ব্যক্তির গৌরবস্পর্দ্ধী হইয়া উঠিবে। সময়ের পরিবর্ত্তনে বালকদ্বয়ের অদৃষ্টের পরিবর্তন হইয়াছিল। মরুপ্রান্তরবর্ত্তী সামান্য নগরে দুঃখদারিদ্র্যে নিপীড়িতা জননীর রোদনধ্বনির মধ্যে যিনি জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন,—তরুণবয়সে যাঁহাকে নানাকষ্ট সহিয়া দুরূহ কার্য্য সাধন করিতে হইয়াছিল, সেই আকবর এক সময়ে দিল্লীর রত্ন সিংহাসন অধিকার করিয়াছিলেন, এক সময়ে তাঁহারই উদ্দেশে শত সহস্র কণ্ঠ হইতে ‘দিল্লীশ্বরো বা জগদীশ্বরো বা” বাক্য নির্গত হইয়াছিল। আর সামান্য পর্ণকুটীর যাঁহার আশ্রয়স্থল ছিল—যৎ সামান্য আহারীয় যাঁহার রসনাতৃপ্তি ও উদরপূর্ত্তির একমাত্র সম্বল ছিল; যিনি মলিনবসনে—পথ শ্রান্তিতে অবসন্ন হৃদয়ে এবং নিরতিশয় দীনভাবে এই মহানগরীতে পদার্পণ করিয়াছিলেন, এক সময়ে তিনিট জগজ্জয়ী সমাটের সিংহাসন অপেক্ষাও উচ্চাসনে সীন হইয়াছিলেন। অসামান্য অধ্যবসায়ে, অনন্যসাধারণ কষ্টসহিষ্ণু-তায় বিদ্যাসাগর এইরূপ উন্নতির চরমসীমায় পদার্পণ করিয়াছিলেন। সংস্কৃতকলেজে সংস্কৃতবিদ্যার অনুশীলনে তৎসমকালে তাহার কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। সাহিত্য, অলঙ্কার, পুরাণ, স্মৃতি সকল বিষয়েই তিনি অসামান্য অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছিলেন। শিক্ষাগুরু তাহার বুদ্ধিমত্তা ও পাঠানুরাগ দেখিয়া, আল্লাদপ্রকাশ করিতেন; সতীর্থ- গণ তাহার উদারভাব ও সারল্যময় সদাচারে সন্তুষ্ট থাকিতেন; বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ তাহার বিদ্যাপারদর্শিতার জন্য তাহাকে শত গুণে মহীয়ান্ করিয়া তুলিতেন। অধ্যয়নসময়ে তিনি স্বহস্তে পাক করিতেন, অনেক সময়ে স্বয়ং বাজার করিতে যাইতেন; কনিষ্ঠ সহোদরদিগকে আহার করাইয়া স্বয়ং বিদ্যালয়ে উপস্থিত হইতেন, এবং বিদ্যালয় হইতে বাসগৃহে প্রত্যাগত হইয়া, আহারের পর প্রায় সমস্ত রাত্রি প্রগাঢ় অভিনিবেশ সহকারে পাঠাভ্যাসে নিযুক্ত থাকি-তেন। এইরূপ আত্মসংযম, এইরূপ নিষ্ঠা, এইরূপ স্বাবলম্বন, এবং এইরূপ সহিষ্ণুতার সহিত তিনি অমৃতময়ী সারস্বতী শক্তির উদ্বোধন করিয়াছিলেন। এই শক্তির প্রসাদে তিনি সর্ব্বস্থলে সর্বক্ষণ অনম- নীয় ও অপরাজেয় থাকিতেন। বিদ্যালয় হইতে তিনি যে “বিদ্যা- সাগর” উপাধি প্রাপ্ত হয়েন, শেষে সেই উপাধিই তাহার একমাত্র পরিচয়স্থল হইয়া উঠে। বিদ্যার প্রাণরূপিণী বাণী যেন সেই দয়ার সাগর ঈশ্বরচন্দ্রেরই পরিচয় দিবার জন্য লোকের ‘রসনায় লীলা’ করিতে থাকেন।

 বিদ্যাসাগর মহাশয় যখন গবর্ণমেন্টের চাকরী গ্রহণ করিয়া সংসারে প্রবেশ করেন, তখন তাহার প্রতিভার সহিত অসামান্য সৎকার্য্যশীলতা পরিস্ফুট হইতে থাকে। বাঙ্গালা সাহিত্যের উন্নতি সাধন তাহার একটি প্রধান কার্য্য। বিদ্যাসাগর সদি আর কিছু না করিতেন,তাহা হইলেও কেবল এই কার্য্যে তাহার নাম চিরস্মরণীয় হইত। দামুন্যার দরিদ্র ব্রাহ্মণ দশ আড়া মাত্র ধানে পরিতুষ্ট হইয়া যে কাব্যপ্রণয়ন করেন, সেই কাব্যের প্রসাদেই তিনি বাঙ্গালার কবিকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পদ অধিকার করিয়াছেন। বিদ্যাসাগর আর কোনও কার্যে হস্তক্ষেপ না করিলেও, তাহার অমৃতময়ীলেখনী- বিনিঃসৃত গ্রন্থাবলীর গুণে তিনি চিরকাল বাঙ্গালা সাহিত্যসংস্কার চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিতেন। তিনি বাঙ্গালা সাহিত্যের পিতা না হইলেও স্নেহময়ী মাতার ন্যায় উহার পুষ্টিকর্ত্তা ও সৌন্দর্য্যবিধা। তাহার যত্নে গদ্য-সাহিত্যের উন্নতি, পরিপুষ্টিও সৌন্দর্য্য সাধিত হয়। দশভুজা দুর্গার প্রতিমায় খড়কঁশ ও দড়ির উপর সামান্য মাটির কাজ হইয়াছিল, তিনি ঐ মাটি যথাস্থানে বিন্যস্ত করেন, এবং মৃত্তিকাময়ী মূর্ত্তি নানাবর্ণে সুরঞ্জিত ও বিচিত্র বেশে সজ্জিত করিয়া, দেবমণ্ডপ শ্রীসম্পন্ন করিয়া তুলেন। মহাত্মা রাজা রামমোহন রায় বাঙ্গালায় গ্রন্থাবলীপ্রণয়ন করেন তাহার গদ্যরচনায়যুক্তিবিন্যাসনৈপুণ্য এবং ওজস্বিতাদি গুণ থাকিলেও, উহা তাদৃশ মাধুর্যসম্পন্ন হয় নাই। এক সময়ে উচ্চশ্রেণীর বিদ্যালয়ে “পুরুষপরীক্ষা” ও “প্রবোধচন্দ্রিকার” অধ্যাপনা হইত। কিন্তু উৎকট শব্দাবলীর জন্য উহাও তাদৃশ প্রীতি- প্রদ হইয়া উঠে নাই। উহার “মলয়াচলানিল উচ্ছলচ্ছীরাত্যচ্ছ- নিঝরান্তঃকণাচ্ছন্ন হইয়া আসিতেছে”, এইরূপ বিভীষিকাময়ী ভাষায় বোধ হয়, পাঠার্থীদিগকে শীতসঙ্কুচিত বৃদ্ধের ন্যায় সর্ব্বদা সশঙ্ক থাকিতে হইত।পণ্ডিতপ্রবর কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ও “বিদ্যা- কল্পদ্রুম” নাম দিয়া, ইংরেজী ও বাঙ্গালায় অনেক গ্রন্থ প্রচার করেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর মহাশয়ই বাঙ্গালায় গদ্যরচনার উৎকর্ষসাধক। তাহার মহাভারত ও বেতালপঞ্চবিংশতিতে যেরূপ ওজস্বিতা ও শব্দ- প্রয়োগবৈচিত্র্য দেখা যায়,—তাঁহার সীতার বনবাসে ও শকুন্তলায় সেইরূপ ললিতপদবিন্যাসের সহিত অসামান্য মাধুর্য্যগুণের উৎকর্ষ লক্ষিত হয়। সীতার বনবাস ও শকুন্তলা, গদ্যরচনায় তাহার অসা- মান্য ক্ষমতার নিদর্শনস্থল। তিনি বালক ও বালিকাদিগের শিক্ষার জন্য অনেক গ্রন্থ লিখিয়া গিয়াছেন; প্রতি গ্রন্থই তাহার অসাধারণ রচনাচাতুরী ও শব্দমাধুরীর জন্য প্রসিদ্ধ হইয়াছে। তিনি সংস্কৃত ও ইংরেজী গ্রন্থ হইতে বিষয়সংগ্রহ করিয়াছেন বটে, কিন্তু তাহার ভাষা তদীয় অদ্বিতীয় সম্পত্তি। উহা প্রসন্ন-সলিলা জানুবীর জলপ্রবাহের ন্যায় = নিয়তই জীবনতোষিণী। বিদ্যাসাগর মহাশয় কেবল ভাষার শ্রবৃদ্ধিসাধন করিয়াই নিরস্ত হয়েন নাই; স্বল্পায়াসে ও সুপ্রণাণী- ক্রমে ভাষাশিক্ষারও সদুপায় করিয়া গিয়াছেন। শিক্ষার বিস্তারে তিনি আজীবন যত্নশীল ছিলেন। এ অংশে বালক, বালিকা, প্রৌঢ় কেহই তাহার নিকটে উপেক্ষণীয় ছিল না। তাহার বন্দোবস্তের গুণে এই মহানগরীর বীটন বালিকাবিদ্যালয়েব কার্য্য প্রথমে সুনিয়মে সম্পন্ন হয়—তাহার যত্নাতিশয়ে ভিন্ন ভিন্ন জেলার অনেকগুলি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়—তাহার প্রস্তাবক্রমে নর্মাল বিদ্যালয়ের সৃষ্টি হয়। বালিকাদিগের পাঠোপযোর্গী গ্রহ না থাকাতে তিনি বর্ণপরিচয়প্রভৃতি পুস্তক প্রচার করেন। সংস্কৃতশিক্ষার্থারা ব্যাকরণ ও অমরকোষ অভিধান পড়িয়া, কাব্যপাঠে প্রবৃত্ত হইত। এক ব্যাকরণপাঠেই তাঁহাদের অনেক সময় সাইত। এজন্য বিদ্যাসাগর মহাশয় উপক্রমণিকাপ্রভৃতি প্রণয়ন ও ঋজুপাঠপ্রভৃতি প্রচার করিয়া, সংস্কৃতশিক্ষার পথ সুগম করিয়া দেন। এইরূপে শিক্ষা সংক্রান্ত প্রত্যেক কার্য্যেই তাঁহার অসামান্য যত্নের পরিচয় পাওয়া যায়। এই কার্য্যে তিনি প্রভূত অর্থব্যয়েও কুণ্ঠিত হয়েন নাই।

 জাতীয় সাহিত্যের উন্নতিসাধন-জাতীয় ভাষার শ্রীবৃদ্ধিসম্পাদনের সহিত বিদ্যাসাগর মহাশয় জাতীয় পরিচ্ছদ ও জাতীয় ভাবের একান্ত পক্ষপাতী ছিলেন। বাঙ্গলার লেফটেনেন্ট গবর্ণর হইতে উচ্চ শ্রেণীর রাজপুরুষগণের সহিত তাঁহার সবিশেষ পরিচয় ছিল। সকলেই তাঁহার আদর করিতেন, সকলেই তাঁহার প্রতি সম্মান দেখাইতেন, সকলেই কোনও রূপ জটিল বিষয়ের মীমাংসার জন্য তাহার পরামর্শগ্রহণে উদ্যত হইতেন। তিনি এই প্রধান রাজপুরুষগণের নিকটে ধুতি চাদর ভিন্ন অন্য পরিচ্ছদে যাইতেন না। ইংরেজী ভাষায় তাহার অভিজ্ঞতা ছিল। ইংরেজী গ্রন্থ পাঠে তিনি আমোদিত হইতেন। স্বয়ং সামান্য বেশে থাকিয়া, তিনি মূল্যবান্ ইংরেজী গ্রন্থগুলিকেই বিচিত্র বেশে সজ্জিত করিয়া যত্নসহকারে স্বীয় পুস্তকালয়ে রাখিয়া দিতেন। কিন্তু তিনি ইংরেজী রীতির অনুবর্ত্তী হয়েন নাই; ইংরেজী ভাবে অনুপ্রাণিত হইয়া উঠেন নাই, ইংরেজী প্রথার অনুকরণে আপনাদের জাতীয় প্রথায় বিসর্জন দেন নাই। তাহার আবাসগৃহের বৈঠকখানায় ফরাসের পরিবর্তে চেয়ার টেবিল প্রভৃতি ছিল বটে, কিন্তু উহা তাহার ইংরেজী ভাবানুরাগের পরিচয় না দিয়া, তদীয় অসামান্য শ্রমশীলতা ও কার্যক্ষমতারই পরিচয় দিত। এখন আমাদের এমনই বিলাসিতা ও শ্রমবিরাগ ঘটিয়াছে যে, আমরা প্রায় সকল সময়েই ফরাসের উপর তাকিয়া.ঠেস দিয়া, আপনাদিগকে লম্বোদরে পরিণত করিতে যত্নশীল হই। কিন্তু বিদ্যাসাগর মহাশয় এরূপ বিলাসী ও শ্রমবিমুখ ছিলেন না। তিনি সমভাগে চেয়ারের উপর বসিয়া সর্ব্বদা কার্যে নিবিষ্ট থাকিতেন। এইজন্যই বলিতেছি 'যে, চেয়ার প্রভৃতি তাহার শ্রমশীলতা ও কার্যক্ষমতারই পরিচয়স্থল ছিল। বস্তুতঃ তিনি জাতীয় ভাবের মাদারক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। পাশ্চাত্য ভাবে শিক্ষা হইলে বা রাজদ্বারে কিয়দংশে প্রতিপত্তি ঘটিলে, এখন আমাদের মধ্যে অনেকে জাতীয় ভাবে বিসর্জ্জন দিয়া বিজাতীয় ভাবেরই পরিপোষক হইয়া উঠেন। জাতীয় ভাষায় কথাবার্তা কহিতে তাহাদের প্রবৃত্তি থাকে না—জাতীয় পরিচ্ছদের সম্মানরক্ষা করিতেও তাহাদের সাহস হয় না। তাহারা আপনাদের অহঙ্কারে আপনারাই স্ফীত হইয়া, আপনাদের কার্য্যে আপনাদিগকেই গৌরবান্বিত মনে করিয়া, সংসারক্ষেত্রে বিচরণ করিয়া থাকেন। তাহাদের হিতৈষিতা থাকিতে পারে, ভূয়োদর্শন থাকিতে পারে, কার্যপটুতা থাকিতে পারে, কিন্তু একমাত্র বৈষম্যবুদ্ধি বিপত্তিপূর্ণ তরঙ্গাঘাতে তৎসমুদয়ই বিজাতীয় ভাবের অতল সাগরে নিমজ্জিত হইয়া গিয়াছে। বিদ্যাসাগর মহাশয় ইহাদের——এই পরমুখপ্রেক্ষী, পরানুগ্রহপ্রার্থী, শিক্ষিত পুরুষগণেরও শিক্ষার স্থল। তিনি ধুতি চাদর পরিয়া, পূর্ব্বতন লেফটেনেন্ট গবর্নর হালিডে সাহেব, বীডন সাহেব প্রভৃতির . সহিত দেখা করিতে যাইতেন। কথিত আছে, “বীডন সাহেব বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ধুতি চাদর দেখিয়া, সময়ে সময়ে বিরক্ত হইতেন। একদা গ্রীষ্মকালে বিদ্যাসাগর মহাশয় লেটেনেন্ট গবর্ণরের সহিত দেখা করিতে গিয়া দেখেন যে, বীডন সাহেব গ্রীষ্মতিশয্যে ঢিলে পাজামা ও পাতলা কামিজ পরিয়া রহিয়াছেন। তিনি বিদ্যাসাগর মহাশয়কে দেখিয়াই বলিয়া উঠিলেন, “এখন ইচ্ছা হয়, তোমাদের ন্যায় পরিচ্ছদ পরিধান করি।” বিদ্যাসাগর মহাশয় গম্ভীর ভাবে উত্তর করিলেন, “তাহাই কেন করুন।” উত্তর শুনিয়া লেফটেনেন্ট গবর্ণর বলিলেন, “ওরূপ পরিচ্ছদ পরিধান করা আমাদের দেশাচারবিরুদ্ধ-দেশাচারবিরুদ্ধ কাজ কেমন করিয়া করি।” এবার বিদ্যাসাগর মহাশয়ের তেজস্বিতার সহিত অপূর্ব অভিমানের আবির্ভাব হইল। স্বদেশীয় ভাবের প্রাধান্যরক্ষার জন্য তেজস্বী পুরুষ-সিংহ, লেফটেনেন্ট গবর্ণরকে অম্লানবদনে কহিলেন, “আপনাদের বেলা দেশাচার প্রবল—আর আমাদের বেলা কিছুই নয়; আপনারা এরূপ্ত মনে করেন কেন?”[১] ও জাতীয় গৌরবরক্ষার্থী মহাপুরুষ বঙ্গের শাসনকর্তার সমক্ষে এইরূপ স্বাধীন ভাবের পরিচয় দিয়াছিলেন। এইরূপ স্বাধীন ভাবের বলেই তাহার মহত্ত্ব অক্ষুন্ন, তাহার সম্মান অব্যাহত, ও তাহার প্রাধান্য অপ্রতিহত থাকিত। পাশ্চাত্য ভাবেব প্রবাহে যে দেশ প্লাবিত হইয়াছে— পাশ্চাত্য রীতি নীতির অপকৃষ্ট ছায়া যে দেশের স্তরে স্তরে প্রবেশ করিয়াছে পরানুগত্যে, পরপরিতুষ্টির আগ্রহে যে দেশ ক্রমে অন্তঃসারশূন্য হইয়া পড়িয়াছে, সেই দেশের একজন ব্রাহ্মণ যেরূপ স্বাধীন ভাবে, যেরূপ তেজস্বিতা সহকারে প্রধান রাজপুরুষগণেরও সমক্ষে জাতীয় ভাবের সম্মান রক্ষা করিয়াছিলেন, সেই স্বাধীন ভাব ও তেজস্বিতার কাহিনী, অনন্ত কাল এই শশাচনীয়ভাবাপন্ন ভূখণ্ডের শশাচনীয় দশাগ্রস্ত জীবদিগকে উপদেশ দিবে।

 বিদ্যাসাগর মহাশয় সমাজসংস্কারের চেষ্টা করিয়াছেন। বিধবা বিবাহ ও বহুবিবাহের আন্দোলনে তাহার এই চেষ্টার পরিচয় পাওয়া যায়। বিধবাবিবাহের সম্বন্ধে অনেক মতভেদ আছে। রাজকীয় বিধির বল বহুবিবাহরোধের চেষ্টা করাতেও অনেকের বিরুদ্ধ মত প্রকাশিত হইয়াছে। কিন্তু বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অসামান্য দয়াই তাহাকে এই কার্য্যে প্রবর্তিত করিয়াছিল। বিদ্যাসাগর দয়ার নাগর ছিলেন। করুণার মোহিনী মাধুরীতে তাঁহার হৃদয় নিরন্তর পরিপূর্ণ থাকিত। কাহারও নিদারুণ দুঃখ দেখিলে বা কাহারও অসহনীয় কষ্টের কথা শুনিলে তিনি যাতনায় অধীর হইতেন। তখন তাহার উজ্জ্বল চক্ষু দুইটি উজ্জ্বলতর হই, এবং তাহা হইতে মুক্তাফলসদৃশ অশ্রুবিন্দু নির্গত হইয়া, গণ্ডদেশ প্লাবিত করিত। কিন্তু অশ্রু প্রবাহের সহিত তাহার হৃদয়নিহিত যাতনার অবসান হইত না। তিনি যতক্ষণ দুঃখীর দুঃখমোচন করিতে না পারিতেন, ততক্ষণ স্থির থাকিতে পারিতেন না। এইরূপ দয়াশীল পুরুষের কোমল হৃদয়, অনাথা বালবিধবা ও পতিবিচ্ছেদবিধুরা কুলকামিনীদিগের দুর্দশায় সহজেই বিচলিত হইয়াছিল। বিদ্যাসাগর মহাশয় এই, অভাগিনীদিগের দুঃখমোচনে বদ্ধপরিকর হইলেও, উচ্ছঙ্খলতাপ্রকাশ করেন নাই। তিনি এ বিষয়ে শাস্ত্রের শরণাপন্ন হইয়াছিলেন, এবং স্বয়ং যে ভাবে শাস্ত্র বুঝিয়াছিলেন, সেই ভাবেই সাধারণকে বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। ইহাতে তাহার সরলতার সম্যক্ পরিচয় পাওয়া যায়। তাহার বিধবাবিবাহবিষয়ক ও বহুবিবাহসম্বন্ধীয় পুস্তক, তদীয় অসামান্য গবেষণা, পাণ্ডিত্য ও বিচারনৈপুণ্যের অদ্বিতীয় দৃষ্টান্তস্বরূপ। এই দুই গ্রন্থ লিখিবার সময়ে তাঁহাকে বিস্তর হস্তলিখিত পুথির আদ্যোপান্ত পাঠ করিতে হইয়াছিল।বিধবাবিবাহবিষয়ক গ্রন্থের রচনাসময়ে তিনি যেরূপ অসাধারণ অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়াছিলেন, তাহা শুনিলে বিস্মিত হইতে হয়। সংস্কৃত পুথির পাঠোদ্ধার ও উহার অর্থসঙ্গতি করিতে তাহাকে অনেক পরিশ্রম করিতে হইত। তিনি সংস্কৃত কলেজের পুস্তকালয়ে বসিয়া, শাস্ত্রের বচন সংগ্রহ করিতেন, এবং উহার অর্থ লিখিতেন। কথিত আছে, এক দিন অনেক ভাবিয়াও কোন বচনের অর্থপরিগ্রহ করিতে পারিলেন না। এদিকে সন্ধ্যা অতীত হইল। অগত্যা লেখায় নিরস্ত হইয়া, ভাবিতে ভাবিতে বাসগৃহে চলিলেন। কিয়দ্র গেলে সহসা তাঁহার মুখমণ্ডল প্রসন্ন হইল। অন্ধকারময় স্থানে পরিভ্রমণসময়ে পথিক সহসা সূর্যের আলোক পাইনে যেরূপ প্রফুল্ল হয়, তিনিও পূর্বোক্ত বচনের অর্থপরিগ্রহ কুরিয়া, সেইরূপ প্রফুল্ল হইলেন। আর তাহার বাসায় যাওয়া হইল না। তিনি পুনর্ব্বার প্রফুল্লভাবে কলেজের পুস্তকালয়ে যাইয়া লিখিতে বসিলেন। লিখিতে লিখিতে রাত্রি শেষ হইয়া গেল। বিদ্যাসাগর মহাশয় হিন্দুবিধবার দুঃখদগ্ধ হৃদয়ে শান্তিসলিল প্রক্ষেপের জন্ত এইরূপ অধ্যবসায়ের সহিত শাস্ত্র-সিন্ধুমন্থনে উদ্যত হইয়াছিলেন। সে সময়ে তাহার আয় সামান্ত ছিল। তথাপি তিনি এজন্য অবিকীরচিত্তে তুর্ব্বহ ঋণভার বহন করিয়াছিলেন। র্তাহার চেষ্টা সর্ব্বাংশে সফল ও র্তাহার মত সমাজের সর্ব্বত্র পরিগৃহীত না হইলেও, কেহই তাহার অধ্যবসায়, দয়াশীলতা ও স্বার্থত্যাগের প্রশংসাবাদে বিমুখ হইবেন না।

 বিদ্যাসাগর মহাশয় যখন বিধবাবিবাহ প্রচলিত করিবার জন্ত শাস্ত্রীয় বিচারে প্রবৃত্ত হয়েন, তখন তিনি পরমারাধ্য পিতা ও স্নেহ ময়ী মাতার অনুমতি .গ্রহণ করিয়াছিলেন। মাতাপিত তাহার নিকটে প্রত্যক্ষদেবতাস্বরূপ ছিলেন। পিতার অমতে বা মাতার বিনানুমতিতে তিনি কখনও কোনও কার্য্যে হস্তক্ষেপ করিতেন না। মাতাপিতার প্রতি র্তাহার এইরূপ অসাধারণ ভক্তি ছিল। কথিত আছে, কোনও বালিকার বৈধব্য দেখিয়া, তাহার মাতা সজলনয়নে তাহাকে বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসিদ্ধ কি না, বিচার করিক্তে বলেন। পিতা নিকটে উপবিষ্ট ছিলেন, তিনিও এ. বিষয়ের অনুমোদন করেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, বিধবাবিবাহের বিচার প্রবৃত্ত হইলে, শাস্ত্র কখনও উহার বিরোধী হইবে না। কিন্তু চিরন্তন অনুশাসন ও চির-প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধে কোনও কথাবলিলৈ, পাছে ভক্তিভাজন জনকজননী মনঃক্ষুন্ন হয়েন, এই জন্ত তিনি উহাতে হস্তক্ষেপ করেন নাই; শেষে মাতপিতার সম্মতি দর্শনে তাহাঁর আগ্রহ ও অপাবসাগের সঞ্চার হয়। তিনি বিধবার বৈধব্য দুঃখ দূর করিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হইয়া উঠেন। তিনি এই প্রসঙ্গে এক দিন দৃঢ়তার সহিত কহিয়াছিলেন, “মাতাপিতার অনুমতি না পাইলে, আমি কখনও এই কার্যে উদ্যত হইতাম না; অন্তত তাহারা যতদিন জীবিত থাকিতেন, ততদিন এ বিষয়ে নিরস্ত থাকিতাম।” পরমাত্মনিষ্ঠ সাধক যেমন আপনার সাধনায় সিদ্ধিলাভের জন্য, তদগতচিত্তে বরণীয় দেবতার অনুমতি ও অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন তিনিও সেইরূপ প্রত্যেক বিষয়ে পরমদেবতাস্বরূপ মাতা পিতার সম্মতির প্রতীক্ষায় থাকিতেন। এখন আমাদের সমাজে যাহাদের শিক্ষাভিমান জন্মিয়াছে, প্রচলিত রীতিনীতির বিরুদ্ধবাদী হইয়া যাহারা জলদগম্ভীর স্বরে “সংস্কার, সংস্কার” বলিয়া চারি দিক কম্পিত করিয়া তুলিতেছেন, তাহাদিগকে অনেক সময়ে জনকজননীর মুখের দিকে দৃপাত করিতে দেখা যায় না। কঠোরকর্তব্যপালনের দোহাই দিয়া, তাহারা অবলীলাক্রমে ও অসঙ্কুচিতচিত্তে মাতাপিতার বুকে শেল হানিয়া থাকেন। পিতা একান্তে বসিয়া নয়নজলে গণ্ডদেশ প্লাবিত করিতেছেন, মাতা দুঃসহ দুঃখে অভিভূত হইয়াছেন—নিদারুণ শোকাগ্নি তুষানলো, ন্যায় অলক্ষ্যভাবে তাঁহাদের হৃদয়ের প্রতি স্তরে প্রতি মুহূর্তে প্রসারিত হই তেছে, শিক্ষিতাভিমানী পুত্র কিন্তু কঠোরকর্তব্যপালনে কিছুতেই নিরস্ত নহেন। পুত্রের এই কঠোর কর্তব্যপালনপ্রতিজ্ঞায় এখন অনেক স্থলে পিতা শোকশল্যের অভিঘাতে মর্মাহত হইতেছেন — মাতা প্রীতির অবলম্ব, মেহের পুত্তলী তনয় হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া, হাহাকার ও শিরে করাঘাত করিতেছেন। কিন্তু মহাত্মা বিদ্যাসাগর মহোদয় পিতৃভক্তিতে পবিত্র হইতে পবিত্রতর—মাতৃসেবায় মহৎ হইতে মহত্তর ছিলেন। তিনি অবলীলাক্রমে সর্বস্ব বিসর্জন কলিতে পারিতেন, পৃথিবীতে যাহা কিছু সুখ পদ—সাহা কিছু মদ—যাহা কিছু প্রীতিপ্রদ, তৎসমুয়েই উপেক্ষা দেখাইতে পারিতেন, রাজাধিরাজের নানারত্নসমাকীর্ণ দেববাঞ্ছনীয় সিংহাসনেও পদাঘাত করিতে পারিতেন, কিন্তু মাতাপিতাকে দুঃখাভিভূত করিতে পারিতেন না। মাতার নয়নজলের সমক্ষে তিনি সমস্তই তুচ্ছ জ্ঞান করিতেন। একবার তিনি আপনার ও পোষ্যবর্গের জীবনরক্ষার অদ্বিতীয় অবলম্বস্বরূপ চাকরি পরিত্যাগে উদ্যত হইয়াছিলেন, তথাপি মাতাকে দুঃখসাগরে নিক্ষেপ করিতে সম্মত হয়েন নাই। বহুব্যয়ে তিনি মাতাপিতার উৎকৃষ্ট চিত্র প্রস্তুত করাইয়াছিলেন, তাঁহাদের দেহাত্যয় ঘটিলে অনেক সময়ে সেই প্রতিকৃতির সম্মুখে বসিয়া অশ্রুপাত করিতেন। পরমভক্ত পুরুষ সিংহ, এইরূপে সেই পরম গুরু জনক, সেই স্বর্গাদপিগরীয়সী জননীর অনুপম স্নেহ ও মহীয়সী প্রীতির ধ্যানে নিবিষ্ট থাকিতেন, ' এবং এইরূপ পবিত্র শোকাতে তাঁহাদের পরলোকগত আত্মার * সন্তর্পণ করিতেন। যাহারা এখন শিক্ষাভিমানে আস্ফালন করিয়া বেড়াইতেছেন, মহাপুরুষের মাতাপিতার প্রতি এইরূপ ভক্তি তাঁহাদের উপেক্ষার বিষয় নহে। বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রত্যেক বিষয়ে মাতা পিতার প্রতি যেরূপ ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করিতেন, এবং ' তাঁহাদের মতাবলম্বী হইয়া চলিতেন, সেইরূপ সামাজিক প্রথার সংস্কারে সূক্ষ্ম সূক্ষ্মরূপে শাস্ত্রীয় বিধির বিচারে প্রবৃত্ত হইতেন। সমাজহিতৈষী সংস্কারকগণ যখন অভিনব সহবাসসম্মতির বিধানে আহলাদে উৎফুল্ল হইয়াছিলেন, তখন বিদ্যাসাগর মহাশয় তাহাদের পক্ষসমর্থন করেন নাই। এ সকল বিষয়ে তিনি শাস্ত্রের অর্থ যেরূপ বুঝিতেন, তদনুসারেই চলিতেন।

 বিদ্যাসাগর মহাশয় দীন দুঃখী ও অনাথদিগের অদ্বিতীয় আশ্রয়শুল ছিলেন। তিনি দয়ার সাগর; দান তাহার চিরন্তন ধর্ম্ম ও চির পবিত্র কর্ম্মের মধ্যে পরিগণিত ছিল। তাঁহার গ্রন্থাবলী কৃতী পুত্রের ন্যায় তাঁহাকে প্রচুর অর্থ আনিয়া দিত; তিনি উহার অধিকাংশ পরপেষণে ও পরদুঃখমোচনে ব্যয় করিতেন। গরীব দুঃখীরা কেবল প্রত্যহ তাঁহার দ্বারে উপস্থিত হইয়া দান গ্রহণ করিত না। অনেকে তাঁহার নিকট মাসে মাসে আপনাদের ভরণপোষণের জন্য অর্থ পাইত। তিনি প্রাত্যহিক, মাসিক, নৈমিত্তিক দানে হৃদয়নিহিত দয়ার তৃপ্তি সাধন করিতেন। এ বিষয়ে তাহার নিকটে জাতিভেদ ছিল না, শ্রেণীভেদ ছিল না, সম্প্রদায়ভেদ ছিল না। তিনি সকলেরই স্নেহময়ী ধাত্রী, প্রতিভাজন পরিজন ও বিশ্বপ্রেমময়ী জননীর তুল্য ছিল্লেন। যেখানে উপায়হীন রোগার্ত ব্যক্তি দুরন্ত রোগের দুঃসহ যাতনায় কাতরতা প্রকাশ করিত, সেইখানেই তিনি তাহার রোগ শান্তির জন্য অগ্রসর হইতেন; যেখানে নিঃস্ব ও নিঃসম্বল লোকে গ্রাসাচ্ছাদনের অভাবে কষ্টের একশেষ ভোগ করিত, এবং এই রোগশোকদুঃখময় সংসারে শশাচনীয় দারিদ্র্যভাবে আপনাদের অনন্ত যাতনার পরিচয় দিত, সেইখানেই তিনি তাহাদের দুঃখমোচনে উদ্যত হইতেন; যেখানে অভাগিনী অনাথা শশাকের প্রতিমূর্তিস্বরূপ নির্জন পর্ণকুটীরে নীরবে বসিয়া থাকিত, এবং হৃদয়ের প্রচণ্ড হুতাশন নিবাইবার জন্যই যেন নিরন্তর নয়নসলিলে আপনার বক্ষোদেশ ভাসাইয়া দিত, সেইখানেই তিনি তাহার কষ্ট দূর করিবার জন্য যত্নের পরাকাষ্ঠা দেখাইতেন। সম্রান্ত ব্রাহ্মণ হইতে অরণ্যবিহারী অসভ্য সাওঁতাল পর্য্যন্ত সকলেই এইরূপে তাঁহার অসীম করুণায় শান্তিলাভ করিত। যে পাপপঙ্কে ডুবিয়া স্বজনভ্রষ্ট ও সমাজচ্যুত হইয়াছে, সমাজের অত্যাচারেই হউক, পরের প্রলোভনেই হউক, আত্মসংযমের অভাবেই হউক, যে সহায়শূন্য হইয়া দুস্তর দুঃখসাগরে ভাসিয়া বেড়াইতেছে, তিনি তাহার প্রতিও করুণাপ্রকাশে সঙ্কুচিত হইতেন। লোকে উদাসীনভাবে যাহার কষ্ট চাহিয়া দেখিয়াছে,— যাহার কাতরতায় নিমীলিতনয়নে নিশ্চেষ্টভাবের পরিচয় দিয়াছে, যাহার মলিনভাব দেখিয়া, ঘৃণায় মুখ বিকৃত ও নাসিকা সঙ্কুচিত করিয়া, অন্য দিক দিয়া চলিয়া গিয়াছে, তিনি পবিত্র ভাবে তাহাদিগকে পবিত্র পদার্থের ন্যায় তুলিয়া, শান্তির অমৃতময় ক্রোড়ে স্থাপিত করিতেন। সম্রাট শাহ আলম যখন সিংহাসন হইতে অপসারিত হয়েন, বৃদ্ধ,অন্ধ ও অধঃপতনের চরমসীমায় পতিত হইয়া, পরপ্রদত্ত অর্থে জীবিকানির্বাহ করিতে থাকেন, তখন তিনি করুণরসপূর্ণ কবি: তায় এই বলিয়া আপনার চিত্তবিনোদন করিতেন, “দুর্দ্দশারপ্রবল ঝটিকা আমাকে পরাভূত করিয়াছে। উহা আমার সমস্তগৌরব অনন্তবায়ুরাশির মধ্যে বিক্ষিপ্ত করিয়াছে, এবং আমার রত্নসিংহাসনও দূরে ফেলিয়া দিয়াছে। গাঢ় অন্ধকারে নিমগ্ন হইলেও এখন আমি দরিদ্র 'ভাবে পবিত্র ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের দয়ায় উজ্জ্বল হইয়া, এই কষ্টময়, এই অন্ধকারময় স্থান হইতে উঠিতে পারিব।” দয়ার সাগর বিদ্যাসাগরও ঐ সকল নিরুপায় দুঃখীদিগকে দরিদ্রভাবে পবিত্র বলিয়াই জ্ঞান করিতেন। কল্পিত আছে, একদা তিনি প্রাতঃকালে ভ্রমণ করিতে করিতে এই নগরের প্রান্তভাগ অতিক্রম করিয়া কিয়দ্র গিয়াছেন, সহসা দেখিলেন, একটি বৃদ্ধা অতিসার রোগে আক্রান্ত হইয়া, পথের পার্শে পড়িয়া রহিয়াছে; দেখিয়াই তিনি ঐ মললিপ্ত বৃদ্ধাকে পরম যত্নে ক্রোড়ে করিয়া আনিলেন, এবং তাহার যথোচিত চিকিৎসা করাই লেন। দরিদ্রা বৃদ্ধা তাঁহার যত্নে আরোগ্য লাভ করিল। যতদিন সে জীবিত ছিল, তত দিন তাহার গ্রাসাচ্ছাদনের কষ্ট হয় নাই। বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রতিমাসে অর্থ দিয়া তাহার সাহায্য করিতেন।[২] বিদ্যাসাগর মহাশয়ের এক জন বিশ্বস্ত কর্মচারী, তাহার অসামান্য দয়ার সম্বন্ধে নিম্নলিখিত গল্পটি “দৈনিক” পত্রে প্রকাশ করেন;—

 “এক দিন বিদ্যাসাগর মহাশয় উক্ত কর্মচারীকে বলিলেন, দেখ, কলুটোলার অমুক গলির অমুক নম্বর বাড়ীতে এই নামে এক জন মাদ্রাজবাসী আছেন। জানিয়াছি, তিনি অর্থাভাবে সাতিশয় কষ্ট পাইতেছেন। অতএব তুমি তথায় গিয়া সবিশেষ সংবাদ লইয়া আইস।” বিদ্যাসাগর মহাশয়ের আদেশে কর্মচারী নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হইয়া, প্রথমে গৃহস্বামীর দেখা পাইলেন। তাহার নিকট উক্ত মাদ্রাজবাসীর নামোল্লেখ করাতে তিনি বলিলেন, “হ! আমার এই বাটীর নিম্নতলস্থ গৃহে তিনি সপরিবারে বাস করেন। আমি তার নিকট ছয় মাসের ভাড়া ৩০ টাকা পাইব। তিনি উহা দিতে পারিতেছেন না। তাহাকে ভাড়া পরিশোধ করিয়া উঠিয়া যাইবার জন্য পীড়াপীড়ি করিতেছি। কিন্তু কি করি, তিনি অর্থাভাব প্রযুক্ত আজ দুই তিন দিন সপরিবারে অনাহারে রহিয়াছেন।” কর্মচারী গৃহস্বামীর এই কথা শুনিয়া, উক্ত মাদ্রাজবাসীর নিকট যাইয়া দেখিলেন যে, তিনি একটি সঙ্কীর্ণ গৃহে পাঁচটি কন্যা ও দুইটি অল্পবয়স্ক পুত্র লইয়া সামান্য দমার উপর বসিয়া রহিয়াছেন। পুত্রকন্যাঞ্চণ রুগ্ন ও অনাহারে শীর্ণ। কর্মচারী এই শশাচনীয় দশাগ্রস্ত মাদ্রাজবাসীর সহিত আলাপে প্রবৃত্ত হইলে, তিনি কহিলেন, “আমি এই কলিকাতা সহরে অনেক বড় লোকের নিকট আমার কষ্ট জানাইয়াছিলাম। কিন্তু কেহই আমার দুরবস্থায় দয়া হইয়া একটি কপর্দক দিয়াও আমার সাহায্য করেন নাই। অবশেষে একটি বাবুর নিকট ভিক্ষার্থ উপস্থিত হই। তিনি ভিক্ষা না দিয়া, একখানি পোষ্টকার্ডে পত্র লিখিয়া, আমার হাতে দিয়া বলিলেন— ‘এই সহরে এক পরম দয়ালু বিদ্যাসাগর আছেন। আমি তোমারই নামে তোমার দুরবস্থার বিষয় লিখিয়া দিলাম। পত্রখানি ডাকঘরে দিয়া আইস।' আমি তদনুসারে উক্ত পূত্র ডাকঘরে দিয়াছি। এখন আমার অদৃষ্ট।” কর্মচারী বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিকট প্রত্যাবৃত্ত হইয়া, তাহাকে এই সকল বিষয় জানাইলেন। শুনিয়া বিদ্যাসাগর মহাশয় অবিরলধারায় অশ্রুপাত করিতে করিতে ঐ কর্মচারী মহাশয়ের হস্তে মাদ্রাজবাসীর বাড়ী ভাড়ার দেনা ৩০ টাকা খোরাকী ১৯ টাকা এবং তাহাদের জন্য নয় খানি কাপড় দিয়া বলিলেন, “যদি তাহারা বাড়ী যায়, তাহা হইলে কত হইলে চলিতে পারে, জানি আসিবে। আর এখানে থাকিলে আমি প্রতি মাসে ১৫ টাকা দিব।” কৰ্মচাৰী যথাস্থানে উপনীত হইয়া, উক্ত মাদ্রাজবাসীকে টাকা ও কাপড় দিয়া বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কথা জানাইলেন। দয়ার সাগর বিদ্যাসাগরের অসীম দয়ায় দুঃখী মাদ্রাজবাসী স্ত্রীপত্রের সহিত রোদন করিতে লাগিলেন। অনন্তর তিনি বলিলেন, “এক শত টাকা হইলে আমরা সকলে স্বদেশে যাইতে পারি।” ইহা শুনিয়া বিদ্যাসাগর মহাশয় কর্মচারীর হস্তে উক্ত টাকা দেন। কমচারীও তাহাদিগকে ষ্টীমারে রাখিয়া আইসেন।

 বিদ্যাসাগর এইরূপ দয়ার সাগর ছিলেন। তাঁহার অপার করুণ এক সময়ে এইরূপেই দীন হীনদিগের দুঃখসন্তপ্ত হৃদয় শান্তিসলিলে শীতল করিয়াছিল। যাহাদের কাতরতায় কেহই কাতরভাব প্রকাশ করে নাই; যাহাদের কষ্টে কাহারও হৃদয়ে সমবেদনার আবির্ভাব দেখা যায় নাই, যাহাদের উদ্ধারে কাহারও হস্ত প্রসারিত হয় নাই; তিনি এইরূপেই তাহাদিগকে অনন্ত যাতনা হইতে রক্ষা করিয়াছিলেন। তাহার অর্থ এইরূপে কেবল দরিদ্রপালনের জন্যই ব্যয়িত হইত। এই কার্যে তাহার আড়ম্বর ছিল না—সংবাদপত্রের দিগন্ত ব্যাপী প্রশংসাধ্বনির প্রত্যাশায় বা রাজকীয় গেজেটে ধন্যবাদ প্রাপ্তির কামনায়, তিনি এই কার্য্যর অনুষ্ঠান করিতেন না। তাহার কার্য্য নীরবে সম্পন্ন হই। ধনী পূর্ব্বসঞ্চিত ধনরাশির মধ্যে অবস্থিতি করিয়া অর্থ দান করিতে পারেন, কিন্তু তাহার দান, এই দানের তুলনায় শ্রেষ্ঠ বলিয়া পরিগণিত হইতে পারে না। যিনি বিলাসসুখ পরিত্যাগ করিয়াছিলেন—দুঃখ দারিদ্রে নিপীড়িত হইয়া, যিনি শেষে প্রভূত অর্থের অধিকারী হইয়াছিলেন, তিনি আত্মভোগে উপেক্ষা দেখাইয়া, ভবিষ্যতের দিকে দৃকপাত না করিয়া, অপরের প্রশংসা বা নিন্দা তুচ্ছ ভাবিয়া, কেবল যথার্থ কৃপাপাত্রদিগের জন্য যে ব্রত পালন করিতেন, সে ব্রত চিরপবিত্র— চিরন্তন ধর্মের মহিমায় মহিমান্বিত-চিরস্থায়ী গৌরবে গৌরবযুক্ত। বঙ্গের মহাকবি এই চিরপবিত্র ব্রতের মহিমায় মুগ্ধ হইয়া, এক দিন গম্ভীর স্বরে গাইয়াছিলেন,

“বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে
করুণার সিন্ধু তুমি। সেই জানে মনে
দীন যে, দীনের বন্ধু।”
সমগ্র ভারতও একদিন বিমুগ্ধ হইয়া গাইবে;—
“বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে
করুণার সিন্ধু তুমি।”

 ফলতঃ নিঃস্বার্থভাবে পরোপকারসাধনে—নিঃস্বার্থভাবে পরপ্রয়োজনের জন্য উপার্জিত অর্থরাশির দানে মহাত্মা বিদ্যাসাগরের কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী নাই। এখন সেই দানবীর চিরদিনের জন্য অন্তর্হিত হইয়াছেন। কোমলতাময়ী করুণা এখন আশ্রয়ের অভাবে দুর্দশাপন্ন। দুঃখদারিদ্র্যময় জনপদ এখন অধিকতর দারিদ্রভারে নিপীড়িত। নিরাশ্রয়, নিঃসম্বল ও নিরন্ন জীবগণ এখন কাতরকণ্ঠে লোকের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষাপ্রার্থী। প্রলয়পয়োধির জলোচ্ছ্বাসে যেন এই হতভাগ্য দেশের পূর্বতন সৌন্দর্য্য বিনষ্ট হইয়াছে। মরুভূবাহিনী স্নিগ্ধ সলিলরেখা চিরবিশুদ্ধ হইয়া গিয়াছে—শান্তিবিধায়িনী লেহময়ী জননী চিরকালের জন্য অন্তর্ধান করিয়াছেন; কিন্তু যে সলিলের স্নিগ্ধতায় তাপদগ্ধ লোকে শান্তিলাভ করিয়াছিল—যে জননীর করুণায় দরিদ্র সন্তানগণ দারিদ্র্যযাতনা ভুলিয়া গিয়াছিল, তাহার অপার্থিব পবিত্র ভাব চিরকাল এই অনন্তযন্ত্রণাগ্রস্ত জাতির গৌরবের কারণ বলিয়া পরিগণিত হইবে।

 *বিদ্যাসাগর মহাশয় যেরূপ দয়াশীল, সেইরূপ তেজস্বী ও মহানুভাব ছিলেন। দয়ায় তাহার হৃদয় যেরূপ কোমল ছিল, তেজস্বিতা ও মহানুভবতায় তাহার হৃদয় সেইরূপ অটল হইয়া উঠিয়াছিল। চিরদরিদ্র অনাথের নিকট তিনি যেরূপ স্নিগ্ধসুধাকরের ন্যায় প্রশান্ত ভাব প্রকাশ করিতেন, ধনগর্বিত বা ক্ষমতাগৰ্বিত ব্যক্তির নিকট তিনি সেইরূপ প্রদীপ্ত মধ্যাহ্ন তপনের ন্যায় অপূৰ্ব তেজোমহিমার পরিচয় দিতেন। অভিমানসহকৃত তেজস্বিতা তাহাকে সর্বদা উচ্চতম স্থানে প্রতিষ্ঠিত রাথিত। শিক্ষাবিভাগের অধ্যক্ষ ইয়ং সাহেবের সহিত অনক্য হওয়াতে, তিনি অবলীলাক্রমে পাঁচ শত টাকা বেতনের চাকরি পরিত্যাগ করিয়াছিলেন। এ বিষয়ে আত্মীয়বর্গের পরামর্শ তাহার গ্রাহ হয় নাই, লোকের কথায় তাহার মতপরিবর্তন ঘটে নাই, বা ভবিষ্যতের ভাবনায় তাঁহার হৃদয় অবসন্ন হইয়া পড়ে নাই। লোকে তখন বলিয়াছিল, ব্রাহ্মণ এবার নিজের অহম্মুখয় নিজেই মারা পড়িল। আত্মীয়গণ তখন ভাবিয়াছিলেন, এবার বিদ্যাসাগরের অন্নাভাব ঘটিল। কিন্তু অভিমানসম্পন্ন তেজস্বী পুরুষ কাহারও কথায় কর্ণপাত করেন নাই। তিনি ' পরের অধীনতা স্বীকার করিয়াছিলেন, কিন্তু পরের মনস্তুষ্টির জন্য আত্মসম্মানে বিসর্জন দেন নাই; তিনি পরৈর কার্য্য সম্পাদনে নিয়োজিত হইয়াছিলেন, কিন্তু পরের নিকট স্নায়ুবিক্রয় করেন নাই; তিনি পরের আদেশপালনে প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু পরের অনুচিত আদেশানুসারে কার্ঘ্য করিতে সম্মত হইয়া আত্মাভিমানের মর্যাদানাশ করেন নাই। তাঁহার হৃদয় এইরূপ অটল ও এইরূপ শক্তিসম্পন্ন ছিল। বহু অনুরোধে, বহু অনুনয়েও তাহার অভিমান অন্তর্হিত—তেজস্বিতা বিচলিত, বা কর্তব্যবৃদ্ধি অবনত হইত না। মিবারের রাজপুতগণ অনেকবার আপনাদের ভূসম্পত্তি হইতে স্খলিত হইয়াছেন; অনেকবার অনেক বিষয়ে স্বার্থত্যাগের পরাকাষ্ঠা দেখাইয়াছেন; তথাপি আপনাদের তেজস্বিতা বা অভিমানে জলাঞ্জলি দেন নাই। সহৃদয় উড় এই অসামান্য গুণদর্শনে বিমুগ্ধ হইয়া, তেজস্বিগণের বরণীয় প্রাচীন গ্রীকদিগের সহিত মিবা রের রাজপুতদিগের তুলনা করিয়াছেন। বঙ্গদেশের জন্য যদি এক জন টডের আবির্ভাব হয়, এক জন টড় যদি বাঙ্গালীর সুকীর্তি না অপকীর্ত্তির বর্ণনায় ব্যাপৃত হয়েন, তাহা হইলে তিনি এই অধঃপতিত ভূখণ্ডে এই চিরাবনত জাতির মধ্যে মহাত্মা বিদ্যাসাগরে এমন প্রভাব দেখিতে পাইবেন, যাহার অচিন্তনীয় মহিমায় তাহার অপরিসীম বিস্ময়ের আবির্ভাব হইবে; তিনি সেই মহাপুরুষকে গৌরবান্বিত গ্রীকদিগের পার্শ্বে বসাইয়া, মুক্তকণ্ঠে ও ভক্তিরসার্জ হৃদয়ে তদীয় স্তুতিবাদ করিবেন।

 এইরূপ তেজস্বী, এইরূপ অভিমানসম্পন্ন বিদ্যাসাগর, জনসাধারণের সমক্ষে কখনও অহঙ্কারে স্ফীত হইয়া; হীনতা প্রকাশ ‘করেন নাই। তাহার তেজস্বিতা যেরূপ অতুল্য, তাহার মহত্ত্ব সেইরূপ অপরিমেয় ছিল। দরিদ্র প্রচুর অর্থের অধিকারী হইলে আত্মগর্বে অধীর হইয়া, আত্মগৌরবের বিস্তারে উদ্যত হইয়া থাকে। কিন্তু বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রশস্ত হৃদয় এরূপ হীনভাবে কলুষিত ছিল না। যখন,তাইার প্রভূত পরিমাণে অর্থাগম হয়, সমাজে অসাধারণ প্রতিপত্তি বদ্ধমূল হয়, দিগন্তব্যাপিনী মহীয়সী কীর্তির কথা লোকের মুখে মুখে পরিকীর্তিত হইতে থাকে, তখনও তিনি আপনাকে সামান্য দরিদ্র বলিয়াই পরিচিত করিতেন। উচ্চপদস্থ রাজপুরুষগণ—সমাজের ধনসম্পত্তিশালী সম্রান্ত ব্যক্তিগণ, সর্ব্বদা যাহার সম্মান করিতেন, যাহাকে দেখিলে অভ্যর্থনার জন্য অগ্রসর হইতেন; অনেক সময়ে তিনিই সামান্য মূদীর দোকানে বসিয়া, মুদীর সহিত আলাপ করিতেন, এবং দীন দুঃখীদিগকে আত্মীয় স্বজন বলিয়া আপনার কাছে বসাইতেন। একদা তিনি সম্রান্ত ব্যক্তি। গণের সহিত কোনও বাগানবাড়ীতে অবস্থিতি করিতেছিলেন, এমন সময়ে এক জন দ্বারবান্ ঘর্মাক্তকলেবরে উপস্থিত হইয়া, তাহাকে একখানি পত্র দিল। এরূপ স্থলে অনেকে হয় ত সামান্য দ্বারবানের দিকে দৃকপাত করেন না। কিন্তু দয়ার সাগর, পত্রবাহককে পরিশ্রান্ত ও প্রখর আতপতাপে অবসন্ন দেখিয়া স্থির থাকিতে পারিলেন না। তিনি শান্তিবিনোদন জন্য পত্রবাহককে সেই গৃহে বসাইলেন। তদীয় বন্ধুগণ ইহাতে সাতিশয় বিরক্তি প্রকাশ করিতে লাগিলেন। কিন্তু এইরূপ বিরক্তিতেও তাঁহার হৃদয়ে অনুদার ভাব বা অহঙ্কারের আবির্ভাব হইল না। একদা তিনি উপস্থিত প্রবন্ধলেখককে কথা প্রসঙ্গে বলিয়াছিলেন—“আমি এক দিন ইডেন সাহেবের (ইডেন সাহেব তখন গবর্ণমেন্টের সেক্রেটরি বা অন্য কোনও উচ্চ পদে নিয়োজিত ছিলেন) সহিত বসিয়া আলাপ করিতেছিলাম। এমন সময়ে অন্য এক ব্যক্তি সাহেবের দর্শনার্থী হইয়া, আপনার নাম লিখিয়া পাঠাইলেন। সাহেব চাপরাসীকে বলিলেন—“বাবুকে বল, এখন ফুর্সুথ নাই। ইডেন সাহেবের কথা শুনিয়া, আমি স্থির থাকিতে পারিলাম না, তখনই সাহেবকে বলিলাম, ’তুমি আমার হিত বসিয়া বাজে কথায় সময়ক্ষেপ করিতেছ। ইহাতে তোমার ফুরসুথ আছে। আর এ ব্যক্তি অবশ্য কোনও প্রয়োজনের অনুরোধে তোমার সহিত দেখা করিতে আসিয়াছে। উহাতে তোমার ফরসুথ নাই। আমি সামান্য গরীব মানুষ; পাল্কীভাড়া করিয়া আসিয়াছি। এ ব্যক্তি যদি গরীব হয়, তাহা হইলে বেচারীর গাড়ীভাড়া দণ্ড হইবে—আর এক দিন আসিলে আবার গাড়ীভাড়া দিতে হইবে।’ ইডেন সাহেব তখন ঈষৎ হাসিয়া দর্শনার্থী ভদ্রলোকটিকে আসিতে বলিলেন।” মহাপুরুষের এইরূপ উদারতা, এইরূপ সমদর্শিতা ও এইরূপ অহঙ্কারশূন্যতা ছিল। একদা একটি ভদ্রসন্তান তাঁহার নিকট উপস্থিত হইয়া কাতরভাবে বলিলেন—“বড় দায়গ্রস্ত হইয়া আপনার নিকট আসিয়াছি। দশ হাজার টাকা না হইলে উপস্থিত দায় হইতে মুক্ত হইতে পারি না। আমি উক্ত টাকা পরে ফিরাইয়া দিব।” বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিকট তখন বেশী টাকা ছিল না। তথাপি তিনি ভদ্রসন্তানের কাতরতাদর্শনে ব্যথিত হইয়া, অন্য স্থান হইতে টাকা আনিয়া দিয়া কহিলেন, “এই টাকা অন্যের নিকট হইতে আনিয়া দিলাম—তোমার সুবিধামত দিয়া যাইও।” ভদ্রলোকটি টাকা লইয়া চলিয়া গেলেন। পরে বিদ্যাসাগর মহাশয় এই টাকার জন্য তাঁহার নিকট লোক পাঠাইলে তিনি কহিয়াছিলেন—“আমি দান গ্রহণ করিয়াছি। টাকা যে ফিরাইয়া দিতে হইবে, তাহা। ভাবি নাই।” বিদ্যাসাগর মহাশয় তাঁহার এই কথা শুনিয়া। হাস্য করিয়া বলিয়াছিলেন—“লোকটা আমাকে ঠকাইল, দেখিতেছি।” আর তিনি টাকার জন্য তাহার নিকট লোক পাঠান নাই; স্বয়ংও তাঁহার নিকটে কখনও টাকা চাহেন নাই। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মহত্ত্বের সম্বন্ধে এইরূপ অনেক কথা আছে। এই সকল মহ কাহিনী মহাপুরুষের লোকোত্তর চরিত স্বর্গীয় ভাবে পূর্ণ করিয়া রাখিয়াছে।

 *পূর্বে উক্ত হইয়াছে, বিদ্যাসাগর মহাশয় লোকশিক্ষার জন্য যথোচিত পরিশ্রম স্বীকার ও অর্থব্যয় করিয়াছেন। শিক্ষাপদ্ধতির সংস্কারে ও শিক্ষার গৌরববিস্তারে তাহার কখনও অমনোযোগ বা ঔদাস্ত দেখা যায় নাই। লোকে যাহাতে সর্ববিষয়ে শিক্ষিত ও কার্যক্ষম হয়, তৎপ্রতি তাহার সাতিশয় যত্ন ছিল। তিনি এই বিজ্ঞানসভার উন্নতির জন্য এক সময়ে হাজার টাকা দান করিতেও কাতর হয়েন নাই। সংস্কৃতের ন্যায় বিজ্ঞানশাস্ত্রের প্রতিও তাঁহার এইরূপ অনুরাগ ছিল। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত ভাষায় আলোচনার জন্য যত্ন করিয়াছেন; সংস্কৃত কলেজে ইংরেজী ভাষানুশীলনেরও উপায় করিয়া দিয়াছেন। কিন্তু এ অংশে মেট্রোপলিটন ইষ্টিটিউসন তাঁহার অদ্বিতীয় কীর্তি। তিনি ঐ বিদ্যালয়ের ভার গ্রহণ করিয়া, উহার উন্নতির জন্য যত্ন, পরিশ্রম, একাগ্রতা ও অধ্যবসায়ের একশেষ দেখাইয়াছেন। স্বয়ং বোগশয্যায় থাকিয়াও বিদ্যালয়ের তাবধানে ত্রুটি করেন নাই। তিনি বহু যত্ন ও পরিশ্রম করিয়া, বিদ্যালয়ের জন্য যে প্রশস্ত অট্টালিকা নিৰ্মাণ করিয়া দিয়াছেন, তাহা রাজকীয় প্রেসিডেন্সি কলেজের সুবিস্তৃত অট্টালিকারও গৌরবম্পর্ধী হইয়াছে। বিদ্যালয়ের উপর তাঁহার এমনই যত্ন ছিল যে, পূর্বে যে বাড়ীতে বিদ্যালয়ের কার্য্য হইত, সেই বাড়ী যখন বিক্রীত হইয়া যায়, তখন তিনি নিজের বাড়ী ভাঙ্গিয়া ঐ স্থানে ও উহার সন্নিকটবর্তী ভূমিতে বিদ্যালয়ের গৃহনির্মাণে প্রস্তুত হইয়াছিলেন। তাঁহার যত্নে এই নগরের কতিপয় স্থানে মেট্রোপলিটন্ ইনষ্টিটিউসনের কয়েকটি শাখা বিদ্যালয় স্থাপিত হইয়াছে তিনি সমান যত্নের সহিত সকল বিদ্যালয়েরই তত্ত্বাবধান করিতেন। তাঁহার যত্নাতিশয়ে—তাহার প্রবর্তিত শিক্ষাপ্রণালীর গুণে, মেট্রোপলিটনের ছাত্রগণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় প্রশংসার সহিত উত্তীর্ণ হইয়া, তাঁহাকে শতগুণে আদিত করিয়া তুলিয়াছে। স্বহস্তরোপিত ও যত্নসহকারে বর্ধিত বৃক্ষ সুস্বাদু ফলভারে অবনত হইলে লোকের যেরূপ আলাদের সঞ্চার হয়, তিনিও সেইরূপ মেট্রোপলি টনের উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধি দেখিয়া, প্রীতি লাভ করিয়াছেন।

 বিদ্যাসাগর মহাশয় কি কারণে এরূপ প্রতিপত্তিশালী হইয়াছেন, কি কারণে এরূপ অতুলনীয় কীর্ত্তির অধিকারী হইয়া, সকলের নিকটে “হৃদয়গত শ্রদ্ধা ও প্রতির পুস্পাঞ্জলি” পাইতেছেন? মণ্ডণাধিপতি সম্রাট অসামান্য ক্ষমতা ও অপরিমিত অর্থের বলে যে সম্মান লাভ করিতে পারেন না, একজন দরিদ্র ব্রাহ্মণের সন্তান কি গুণে সেই সম্মানের পাত্র হইয়াছেন? ইহার একমাত্র কারণ, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মস্তিষ্কের অসাধারণ ক্ষমতার সহিত হৃদয়ের অতুল্যশক্তির সামঞ্জস্য। যিনি হৃদয়ের শক্তিতে উপেক্ষা করিয়া, মস্তিষ্কের শক্তিতে মহৎ হইতে চাহেন, তিনি মহত্ত্বের অধিকারী হইতে পারেন না। উদারতা, হিতৈষিতা, পরদুঃখকাতরতা প্রভৃতি মনুযযাচিত গুণ সমূহ তাহা হইতে বহু দূরে অবস্থিতি করে। তিনি কেবল আত্মস্বার্থেই পরিতুষ্ট থাকেন, পরার্থে তাহার দৃষ্টি থাকে না। গৃধুকুল যেমন সুদূর গগনতলে উড্ডীয়মান হইলেও তলস্থ গলিত শবের দিকে সর্বদা দৃষ্টি রাখে, তিনিও সেইরূপ বুদ্ধিবৈভবে, উন্নত হইলেও হৃদয়ের শক্তির অভাবে নিকৃষ্টতর কার্যে মনোনিবেশ করিয়া, ক্রমশঃ নিম্নভিমুখে অবনত হইতে থাকেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় এরূপ শ্রেণীর লোক ছিলেন না। তাহার অসাধারণ প্রতিভার সহিত হৃদয়ের অপূৰ্ব শক্তি ছিল। তিনি এক দিকে জ্ঞানগৌরবে ও বুদ্ধিবৈভবে যেরূপ মহিমান্বিত, অপর দিকে হৃদয়ের মহৎগুণে সেইরূপ গৌরবাতি। তাহার অভিমান ও তেজস্বিতা যেরূপ অতুল্য, তাহার 'কোমলতা ও দয়াশীলতাও সেইরূপ অসামান্য। আত্মাভিমান, আত্মদর ও আত্মনির্ভরের বলে তিনি কোনও বিষয়ে পরের নিকট অবনত বা কোনও বিষয়ে পরমুখ। প্রেক্ষী হইতেন না। ইহা তাহার হৃদয়ের অসামান্য শক্তির নিদর্শন স্বরূপ। লোকের শিক্ষাবিধান হেতু তিনি স্নেহময় পিতা, এবং •লোকের পালন ও শান্তিবিধান হেতু তিনি করুণাময়ী মাতা ছিলেন। এইরূপে তাঁহাতে প্রতিভার সহিত লোকশিক্ষাবিধায়িনী ও লোকপালনী প্রবৃত্তির সমাবেশ ছিল। তিনি যখন শাস্ত্রজ্ঞানের পরিচয় দিতেন, তখন তাঁহার অনুপম লিপিনৈপুণ্য, অসাধারণ বুদ্ধিপ্রাখর্য্য ও অপূর্ব যুক্তিবিন্যাসকৌশল দেখিয়া, শাস্ত্রদর্শী পণ্ডিতগণ তদীয় প্রশংসাবাদে প্রবৃত্ত হইতেন, তিনি যখন অভিমান ও তেজস্বিতায় উন্নত হইয়া, আত্মস্বার্থেও পদাঘাত করিতেন, তখন লোকে সেই অপূর্ব তেজস্বিতার প্রখর দীপ্তিতে চমকিত হইয়া, বিস্ময়বিস্ফারিতনেত্রে হতবুদ্ধি হইয়া থাকিত; আর তিনি যখন দরিদ্রের পর্ণকুহরে দুর্দশাগ্রস্ত দুঃখিতের সম্মুখে উপস্থিত হইতেন, তখন সেই অনাথগণ তাহার অপরিসীম দয়ায় ও প্রতিস্নিগ্ধ মুখমণ্ডলের প্রশান্তভাবে বিমুগ্ধ হইয়া অশ্রুপাত করিত। এইরূপ বিভিন্ন শক্তির সমবায়ে, তিনি প্রকৃত মনুষ্যত্বের পূর্ণাবতারস্বরূপ মহাপুরুষ ছিলেন[৩]

 এই মহাপুরুষের মহাদৃষ্টান্ত কি আমাদের উপেক্ষার বিষয় হইবে? আমরা কি ইহাতে কিছুই শিক্ষালাভ করিব না? যিনি লোকহিতব্রতে জীবনোৎসর্গ করিয়াছিলেন, আমরা কি তাঁহারই উদ্দেশে, তাঁহারই পবিত্র নামে সেই ব্রতপালনে যত্নশীল হইয়া, তাহার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিব না? পঞ্চদশবর্ষীয় বালকের অপূৰ্ব স্বার্থত্যাগ ও তেজস্বিতার দৃষ্টান্তে সমগ্র পঞ্জাব সাধনায় অটল, সহিষ্ণুতায় অবিচলিত ও তেজঃপ্রভাবে অনমনীয় হইয়াছিল। আজপর্যন্ত গুরু-গগাবিন্দের মহামন্ত্রের মহীয়সী শক্তি তিরোহিত হয় নাই। সেই শক্তিতেই শিখগণ আজপর্যন্ত সজীব রহিয়াছে সেই শক্তিতেই বেদকীর্তিত পবিত্র পঞ্চনদে অপূর্ব্ব বীরত্বের বিকাশ দেখা গিয়াছে। যিনি পরসেবাতেই সমস্ত বিষয়ের উৎসর্গ করিয়াছিলেন, তাহার উপদেশ কি তদীয় স্বদেশবাসিগণের কর্তব্যবুদ্ধির উদ্দীপক হইবে না? তাহার পবিত্র নামে যে পাঠাগারের প্রতিষ্ঠা হইয়াছে, তদুপলক্ষে আমরা এই স্থানে সমবেত হইয়া তাহার প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করিতেছি। আশা আছে, সর্বত্র এইরূপ ‘লোকহিতকর কার্য্যের অনুষ্ঠান হইতে থাকিবে। মহাপুরুষের দৃষ্টান্তে আবার এই দেশে অমৃতপ্রবাহের আবির্ভাব হইবে। আবার এই দেশ হীনতাপঙ্কে নিমজ্জিত না হইয়া, মহৎকার্যে পুণ্য ক্ষেত্র বলিয়া পরিগণিত হইবে। যে জাতি শত তাড়াতেও বিচলিত হয় না; “শত আঘাতেও বেদনা বোধ করে না,” শত উত্তেজনা তেও জাড্যদোষে জলাঞ্জলি দেয় না, সেই জাতি স্বার্থপরতার মোহিনী মায়ায় ভ্রুক্ষেপ না করিয়া, পরানুগত্য—পরমুখপ্রেক্ষিতায় আপনাদের হীনভাব না দেখাইয়া, এবং সর্ববিষয়ে নির্জীব নিশ্চেষ্ট, ও নিষ্ক্রিয়” না হইয়া, বিশ্বজয়ী পুরুষসিংহের প্রবর্তিত পথানুসরণে ‘বিশ্বসংসারে প্রসিদ্ধিলাভ করিবে।


এই লেখাটি ১ জানুয়ারি ১৯২৬ সালের পূর্বে প্রকাশিত এবং বিশ্বব্যাপী পাবলিক ডোমেইনের অন্তর্ভুক্ত, কারণ উক্ত লেখকের মৃত্যুর পর কমপক্ষে ১০০ বছর অতিবাহিত হয়েছে অথবা লেখাটি ১০০ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছে ।

 
  1. এই গল্পটি শ্রীযুক্ত বাবু রাজনারায়ণ বসুর “সেকাল আর একাল” হইতে হৃত হইয়াছে। লিখনভঙ্গীতে বোধ হয়, রাজনারায়ণ বাবু বিদ্যাসাগর হাশয়কে লক্ষ্য কবিয়াই এ গল্পটি লিখিয়াছেন।
  2. এইরূপ গল্পগুলি সঞ্জীবনী, ইণ্ডিয়ান নেশন, এডুকেশন গেজেট প্রভৃতি হইতে সংগৃহীত হইয়াছে।
  3. প্রবন্ধ-লেখক, প্রকৃতিপত্রিকায় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সম্বন্ধে, যে প্রস্তাব লিখিয়াছিলেন, তাহারই সারাংশ এই স্থলে উদ্ধৃত হইল।