হরিচরণ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

ੇਿਕ਼੧ “—” সে আজ অনেকদিনের কথা। প্রায় দশ-বারো বৎসরের কথা । তখন দুর্গাদাসবাবু উকিল হন নাই। দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে তুমি বোধ হয় ভাল চেনে না, আমি বেশ চিনি। এসো, তাহাকে আজ পরিচিত করিয়া দিই ! ছেলেবেলায় কোথা হইতে এক অনাথ পিতৃণাতৃহীন কায়স্থ বালক রামদাসবাবুর বাটতে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল। সকলেই বলিত, ছেলেটি বড় ভালো । বেশ সুন্দর -বুদ্ধিমান চাকর, দুর্গাদাসবাবুর পিতার বড় স্নেহের ভূত্য । সব কাজ-কৰ্ম্মই সে নিজে টানিয়া লয় । গরুর জাব দেওয়া হইতে বাবুকে তেল মাখানো পর্য্যস্ত সমস্তই সে নিজে করিতে চাহে । সৰ্ব্বদা ব্যস্ত থাকিতে বড় ভালবাসে । ছেলেটির নাম হরিচরণ । গৃহিণী প্রায়ই হরিচরণের কাজ-কৰ্ম্মে বিস্মিত হইতেন ! মধ্যে মধ্যে তিরস্কারও করিতেন, বলিতেন, হরি —অন্য চাকর আছে ; তুই ছেলেমানুষ, এত খাটিস কেন ? হরির দোষের মধ্যে ছিল সে বড় হাসিতে ভালবাসিত । হাসিয়া উত্তর করিত, মা, আমরা গরীব লোক, চিরকাল খাটতেই হবে, আর বসে থেকেই বা কি হবে ? এইরূপ কাজ-কৰ্ম্মে, সুখে, স্নেহের ক্রোড়ে হরিচরণের প্রায় এক বৎসরকাল কাটিয়া গেল । স্বরে রামদাসবাবুর ছোট মেয়ে। স্বরোর বয়স এখন প্রায় পাঁচ-ছয় বৎসর। হরিচরণের সহিত স্বরোর বড় আত্মীয়ভাব দেখা ঘাইত ! যখন দুগ্ধ-পানের নিমিত্ত গৃহিণীর সহিত স্বরে দ্বন্দ্বযুদ্ধ করিত, যখন মা অনেক অযথা বচস করিয়াও এই ক্ষুদ্র কন্যাটিকে স্বমতে আনিতে পারিতেন না এবং দুগ্ধ-পানের বিশেষ আবশ্বকতাও তাহার অভাবে কন্যারত্বের আশু প্রাণবিয়োগের আশঙ্কায় শঙ্কান্বিত হইয়া বিষম ক্রোধে মুরোবালার গণ্ডদ্বয় বিশেয টিপিয়া ধরিয়াও তাহাকে দুধ খাওয়াইতে পারিতেন না, তখনও হরিচরণের কথায় অনেক ফল লাভ হইত। যাক, অনেক বাজে কথা বকিয়া ফেলিলাম। আসল কথাটা এখন বলি, শোনো । না হয় স্বরে হরিচরণকে ভালবাসিত। ●óፃ 红一8° শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ দুর্গাদাসবাবুর যখন কুড়ি বৎসর বয়স, তখনকার কথাই বলিতেছি। দুর্গাদাস এতদিন কলিকাতাতেই পড়িত। বাড়ি আদিতে হইলে মারে দক্ষিণ দিকে যাইতে হইত, তাহার পরেও প্রায় হাট-পথে দশ-বারো ক্রোশ আসিতে হইত ; স্বতরাং পথটা বড় সহজগম্য ছিল না। এইজন্যই দুর্গাদাসবাৰু বড় একটা বাড়ি যাইতেন না । ছেলে বি. এ. পাশ হইয়া বাড়ি আসিয়াছে। মাতাঠাকুরাণী অতিশয় ব্যস্ত। ছেলেকে ভাল করিয়া খাওয়াইতে, দাওয়াইতে, যত্ন-আত্মীয়তা করিতে, যেন বাটীস্থদ্ধ সকলেই একসঙ্গে উৎকণ্ঠিত হইয়া পড়িয়াছে। দুর্গাদাস জিজ্ঞাসা করিল মা, এ ছেলেটি কে গা ? মা বলিলেন, এটি একজন কারেতের ছেলে ; বাপ-মা নেই, তাই কৰ্ত্তা ওকে নিজে রেখেচেন । চাকরের কাজকৰ্ম্ম সমস্তই করে, আর বড় শাস্ত ; কোন কথাতেই রাগ করে না । আহা ! বাপমা নেই—তাতে ছেলেমাকুষ—আমি বড় ভালবাসি । বাড়ি আসিয়া দুর্গাদাসবাবু হরিচরণের এই পরিচয় পাইলেন। যাহা হোক, আজকাল হরিচরণের অনেক কাজ ধাড়িয়া গিয়াছে। সে তাহাতে সন্তুষ্ট ভিন্ন অসন্তুষ্ট নহে। ছোটবাবুকে (দুর্গাদাসকে ) স্নান করানো, দরকার-মত জলের গাডু, ঠিক সময়ে পানের ডিবে, উপযুক্ত অবসরে হকা ইত্যাদি যোগাড় করিয়া রাখিতে হরিচরণ বেশ পটু। দুর্গাদাসবাবুও প্রায় ভাবেন, ছেলেটি বেশ intelligent স্থতরাং কাপড় কোচান তামাক সাজা প্রভৃতি কৰ্ম্ম হরিচরণ না করিলে দুর্গাদাসবাবুর পছন্দ হয় না। কিছু বুঝি না, কোথাকার জল কোথায় দাড়ায় । মনে আছে কি ? একবার দুজনে কাদিতে কঁাদিতে পড়ি বড়ই দুরূহ তত্ত্ব । আমার বোধ হয় সব কথাতেই এটা খাটে। দেখেছি কি—ভাল থেকে কেবল ভালই দাড়ায়, মন্দ কি কখনও আসিয়া দাড়ায় না ? যদি না দেখিয়া থাকে। তবে এসো আজ তোমাকে দেখাই বড়ই হ্ৰহ্মহ তত্ত্ব। উপরি-উক্ত কথা কয়টি সকলের বুঝিতে পারা সম্ভবও নয়, প্রয়োজনও নাই, আর আমারও Philosophy নিয়ে deal করা উদ্বেগু নহে ; তবুও আপোষে দুটো কথা বলিয়া রাখায় ক্ষতি কি ? আজ দুর্গাদাসবাবুর একটা জ'কাল ভোজের নিমন্ত্রণ আছে। বাড়িতে খাইবেন না, সম্ভবতঃ অনেক রাত্রে ফিরিবেন। এইসব কারণে হরিচরণকে প্রাত্যহিক কৰ্ম্ম সারিয়া রাখিয়া শয়ন করিতে বলিয়া গেছেন। w'; হরিচরণ এখন হরিচরণের কথা ৰলি। দুর্গাদাসবাবু বাহিরে বসিবার ঘরেই রাত্রে শয়ন করিতেন। তাহার কারণ অনেকেই অবগত নহে। আমার বোধ হয় গৃহিণী বাপের বাড়িতে থাকায়, বাহিরের ঘরে শয়ন করাই তাহার অধিক মনোনীত ছিল । রাত্রে দুর্গাদাসবাবুর শয্যা রচনা করা, তিনি শয়ন করিলে তাহার পদসেবা ইত্যাদি কাজ হরিচরণের ছিল। পরে বাবুর রীতিমত নিদ্রাকর্ষণ হইলে হরিচরণ পাশের একটি ঘরে শুইতে যাইত। সন্ধ্যার প্রাক্কালেই হরিচরণের মাথা টিপ টপ করিতে লাগিল। হরিচরণ বুঝিল, জর আসিতে অধিক বিলম্ব নাই। মধ্যে মধ্যে তাহার প্রায়ই জর হইত ; মৃতরাং এ-সব লক্ষণ তাহার বিশেষ জানা ছিল। হরিচরণ আর বসিতে পারিল না, ঘরে যাইয়া শুইয়া পড়িল। ছোটবাবুর যে বিছানা প্রস্তুত হইল না, এ-কথা আর মনে রহিল না। রাত্রে সকলেই আহারাদি করিল, কিন্তু হরিচরণ আসিল না। গৃহিণী দেখিতে আসিলেন। হরিচরণ ঘুমাইয়া আছে ; গায়ে হাত দিয়া দেখিলেন, গা বড় গরম। বুঝিলেন জর হইয়াছে ; স্থতরাং আর বিরক্ত না করিয়া চলিয়া গেলেন। রাত্রি প্রায় দ্বিপ্রহর হইয়াছে। ভোজ শেষ করিয়া দুর্গাদাসবাবু বাড়ি আসিয়া দেখিলেন শয্যা প্রস্তুত হয় নাই। একে ঘুমের ঘোর, তাহাতে আবার সমস্ত পথ কি করিয়া বাড়ি যাইয়া চিত হইয়া শুইয়া পড়িবেন, আর হরিচরণ প্রান্ত পদযুগলকে বিনাম হইতে বিমুক্ত করিয়া অল্প অল্প টিপিয়া দিতে থাকিবে এবং সেই স্থথে অল্প তন্দ্রার ঝেণকে গুড়গুড়ির নল মুখে লইয়া একেবারে প্রভাত হইয়াছে দেখিতে পাইবেন, ইত্যাদি ভাবিতে ভাবিতে আসিতেছিলেন । একেবারে হতাশ হইয়া বিষম জলিয়া উঠিলেন, মহা ক্রুদ্ধ হইয়া দুই-চারিবার হরিচরণ, হরি, হরে—ইত্যাদি রবে চিৎকার করিলেন। কিন্তু কোথায় হরি ? সে জরের প্রকোপে সংজ্ঞাহীন হইয়া পড়িয়া আছে। তখন দুর্গাদাসবাবু ভাবিলেন, বেটা ঘুমাইয়াছে। ঘরে গিয়া দেখিলেন, বেশ মুড়ি দিয়া শুইয়া আছে। আর সহ হইল না। ভয়ানক জোরে হরির চুল ধরিয়া টানিয়া তাহাকে বসাইবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু হরি ঢলিয়া বিছানার উপর পুনৰ্ব্বার শুইয়া পড়িল। তখন বিষম ক্রুদ্ধ হইয়া দুর্গাদাসবাবু হিতাহিত বিশ্বত হইলেন। হরির পিঠে সবুট পদাঘাত করিলেন। সে ভীম প্রহারে চৈতন্ত লাভ করিয়া উঠিয়া বসিল। দুর্গাদাসবাবু বলিলেন, কচি খোকা ঘুমিয়ে পড়েচে, বিছানাটা কি আমি করব ? কথায় কথায় রাগ আরও বাড়িয়া গেল ; হন্তের বেত্র-যষ্টি আবার হরিচরণের পুষ্ঠে বার-দুই-তিন পড়িয়া গেল। শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ হরি রাত্রে যখন পদসেবা করিতেছিল, তখন এক ফোট গরম জল বোধ হয় দুর্গাদাসবাবুর পায়ের উপর পড়িয়াছিল। সমস্ত রাত্রি দুর্গাদাসবাবুর নিদ্রা হয় নাই। এক ফোটা জল বড়ই গরম বোধ হইয়াছিল। দুর্গাদাসবাৰু হরিচরণকে বড়ই ভালবাসিতেন। তাহার নম্রতার জন্ত সে দুর্গাদাসবাবুর কেন, সকলেরই প্রিয়পাত্র ছিল । বিশেষ এই মাস-খানেকের ঘনিষ্ঠতায় সে আরও প্রিয় হইয়া দাড়াইয়াছিল। রাত্রে কতবার দুর্গাদাসবাবুর মনে হইল যে, একবার দেখিয়া আসেন, কত লাগিয়াছে, কত ফুলিয়াছে। কিন্তু সে যে চাকর, তা ত ভাল দেখায় না ! কতবার . মনে হইল, একবার জিজ্ঞাসা করিয়া আসেন, জরটা কমিয়াছে কি না । কিন্তুষ্ট্র তাহাতে লজ্জা বোধ হয়! সকালবেলায় হরিচরণ মুখ ধুইবার জল আনিয়া দিল, তামাক সাজিয়া দিল। দুর্গাদাসবাবু তখনও যদি বলিতেন, আহা ! সে ত বালক : মাত্র, তখনও ত তাহার ত্রয়োদশ বর্ষ উত্তীর্ণ হয় নাই। বালক বলিয়াও যদি একবার কাছে টানিয়া লইয়া দেখিতেন, তোমার বেতের আঘাতে কিরূপ রক্ত জমিয়া আছে, তোমার জুতার কাঠিতে কিরূপ ফুলিয়া উঠিয়াছে। বালককে আর লজ্জা কি ? বেলা নয়টার সময় কোথা হইতে একখানা টেলিগ্রাম আসিল। তারের সংবাদে দুর্গাদাসবাবুর মনটা কেমন বিচলিত হইয়া উঠিল। খুলিয়া দেখিলেন, স্ত্রীর বড় পীড়া। ধড়াস করিয়া বুকখানা একহাত বসিয়া গেল। সেইদিনই তাহাকে কলিকাতায় চলিয়া আসিতে হইল। গাড়িতে উঠিয়া ভাবিলেন, ভগবান! বুঝি-বাপ্রায়শ্চিত্ত হয়। প্রায় মাস-খানেক হইয়া গিয়াছে। দুর্গাদাসবাবুর মুখখানি আজ বড় প্রফুল্প, র্তাহার স্ত্রী এ-যাত্রা বাচিয়া গিয়াছেন। অদ্য পথ্য পাইয়াছেন। বাড়ি হইতে আজ একখানা পত্র আসিয়াছে। পত্ৰখানি দুর্গাদাসবাবুর কনিষ্ঠ ভ্রাতার লিখিত। তলায় একস্থানে পুনশ্চ’ বলিয়া লিখিত রহিয়াছে—বড় দুঃখের কথা, কাল সকালবেলা দশ দিনের জর-বিকারে আমাদের হরিচরণ মরিয়া গিয়াছে। মরিবার আগে সে অনেকবার আপনাকে দেখিতে চাহিয়াছিল। আহা ! মাতৃ-পিতৃহীন অনাথ ! ধীরে ধীরে দুর্গাদাসবাৰু পত্ৰখানা শতধা ছিন্ন করিয়া ফেলিয়া দিলেন। ●錦●