হানাষি/কিমিকো
কিমিকো
(১)
যে দিন শুনা গেল কিমিকো তার শিক্ষয়িত্রী কিমিকার বাড়ী হইতে কোন্ এক অজ্ঞাতনামা পুরুষের সহিত অন্তর্হিত হইয়াছে, সে দিন সহরে মহা হুলস্থূল পড়িয়া গেল, বিশেষতঃ ধনিসন্তানমহলে। কত শত ধনীর সন্তান ধন, প্রাণ, মান বিসর্জ্জন দিতে উদ্যত হইয়াও যার কণামাত্র স্নেহলাভে সমর্থ হয় নাই, রাশি রাশি মূল্যবান উপহার দিয়াও যার মন টলাইতে পারে নাই, দেশ বিদেশাগত যুবকেরা পঙ্গপালের মতো যার পিছু পিছু ঘুরিয়াও ব্যর্থ মনোরথ হইয়াছে, এহেন কিমিকোর হৃদয় যে অবশেষে গলিয়াছে, এ কথা বিশ্বাস করিতে সহজে কাহারো প্রবৃত্তি হইল না।
কিন্তু কথাটা সত্য। অসামান্যরূপলাবণ্যসম্পন্না নর্ত্তকী কিমিকো সকলেরই প্রিয়পাত্রী ছিল। এমন কি সম্ভ্রান্ত মহিলারাও কখনো তার নাম ঘৃণা বা তাচ্ছিল্যের সহিত উল্লেখ করিতেন না। কিমিকো কোনো পরিবারে কখনো অশান্তির সৃষ্টি করে নাই; ঘরভাঙানো দোষ কেহ তাহাকে দিতে পারিত না। সে নিজে ছিল ভাস্করখোদিত শুভ্র মর্ম্মরমূর্ত্তির মতো; লোকে বলিত তার হৃদয়টাও ঐ প্রস্তরেরই মতো কঠিন, স্নেহহীন!
(২)
কিমিকো ও অন্যান্য নর্ত্তকীর মধ্যে প্রভেদ ছিল অনেক। তার মধ্যে প্রধান, সে ভদ্রবংশজাত। তার আগেকার নাম ছিল ‘আই’, যার অর্থ—প্রেম, ভালবাসা; আর একটা অর্থ দুঃখ। ‘আই’এর কাহিনী প্রেমের কাহিনী ও বটে, আবার দুঃখের কাহিনীও বটে!
সে বেশ সুখে লালিত হইয়াছিল। শিশুকালে সে এক বৃদ্ধ ‘সামুরাই’এর ইস্কুলে যাইত। ছোট্টো মেয়েগুলি সেখানে আসন বিছাইয়া এতটুকু উঁচু এক একটি ডেক্সের সামনে বসিত। শিক্ষকেরা সেখানে বিনা বেতনেই শিক্ষা দিতেন। ইস্কুলে যাইবার সময় ও প্রত্যাবর্ত্তনের সময় প্রত্যহ ভৃত্য তার পড়িবার বই, লিখিবার বাক্স, বসিবার আসন ও ছোট্ট টেবিলখানি বহন করিয়া লইয়া যাইত।
তারপর সে একটি সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্ত্তি হইল। সেই সবেমাত্র ‘আধুনিক’—পাঠ্যপুস্তকসকল বাহির হইয়াছে। সে সব পুস্তকে ইংরাজি জর্ম্মান ও ফরাসী ভাষা হইতে অনূদিত আত্মসম্মান, কর্ত্তব্য, বীরত্ব প্রভৃতি বিষয়ে কত কাহিনী! আর তাহাতে পাশ্চাত্যদের কত অপূর্ব্ব বিচিত্র ছবি!
আই অল্পকালের মধ্যে অনেক শিখিয়া ফেলিল, পরীক্ষায় উচ্চ স্থান অধিকার করিয়া অনেক পারিতোষিকও লাভ করিল।
তারপর জাপানে পরিবর্ত্তনের যুগ আসিল। সেই ভাঙাগড়ার আবর্ত্তে পড়িয়া কত অবস্থাপন্ন পরিবার নিঃস্ব হইয়া পড়িল, আবার কত দরিদ্র রাতারাতি আমীর হইয়া গেল। আইকে ইস্কুল ছাড়িতে হইল। দুঃখসমুদ্রে হাবুডুবু খাইয়া বেচারা যখন চোখ মেলিল, তখন দেখে আছে কেবল মাতা আর শিশু ভগ্নীটি। মাতা এবং আই বুনন ছাড়া আর কিছু জানিত না এবং তদ্দ্বারা গ্রাসাচ্ছাদন চলা অসম্ভব। তাই প্রথমে বসতবাড়ী ও জমিজমা, তারপর ক্রমে বহুমূল্য পরিচ্ছদ, গালা-করা বাসন, অলঙ্কার ও অন্যান্য পৈত্রিক অস্থাবর সকল সম্পত্তি জলের দরে বিকাইয়া গেল। একের দুরবস্থায় অন্যে যারা ধনী হয়, তাদের অর্থ বাস্তবিকই “চোখের জলের অর্থ!” জীবিতের নিকট সাহায্যপ্রাপ্তির সম্ভাবনা বিশেষ ছিল না; কারণ অন্যান্য আত্মীয় কুটুম্ব সামুরাই পরিবারেরও সমান দশা। অবশেষে একদিন আইএর ইস্কুলের বইগুলিও বিক্রীত হইয়া গেল, তখন মৃতের নিকট সাহায্য গ্রহণ ভিন্ন গত্যন্তর রহিল না।
আইএর পিতামহকে তাঁর তরবারির সহিত সমাহিত করা হইয়াছিল। সে তরবারিখানি এক ‘দাইম্যো’ পিতামহকে উপহার দিয়াছিলেন। কবর খুঁড়িয়া তরবারির স্বর্ণমণ্ডিত বহুমূল্য হাতলটি খুলিয়া লইয়া উহার স্থানে একটি সাধারণ হাতল পরাইয়া দেওয়া হইল। খাপের উপর হইতেও মূল্যবান্ ধাতুগুলি উঠাইয়া লওয়া হইল। রহিল কেবল অসির ফলক; সেখানি ত লওয়া যায় না, উহা যে যোদ্ধার নিতান্ত প্রয়োজন! রক্তমৃত্তিকানির্ম্মিত সমাধির মধ্যে আই দেখিল তার মৃত পিতামহ সোজা হইয়া বসিয়া রহিয়াছে। এতদিন সমাহিত থাকা সত্ত্বেও তার মুখ কেমন অবিকৃত! তরবারিখানা যখন ফেরত দেওয়া হইল, মনে হইল যেন মাথা নাড়িয়া মৃত যোদ্ধা এই কার্য্যে নিজ সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছে!
অবশেষে আইএর মাতা পীড়িত হইলেন। চরকায় কাজ করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হইয়া পড়িল। মৃতের সহায়তায় প্রাপ্ত অর্থও নিঃশেষিত হইয়াছে। আই কহিল, “মা, এখন কেবল একমাত্র উপায় আছে। আমি নর্ত্তকীদের নিকট বিক্রীত হব।” মাতা উত্তর দিলেন না, কেবল চোখের জল ফেলিলেন। আই কাঁদিল না, বাড়ীর বাহির হইয়া গেল।
তার মনে পড়িল, সুখের দিনে তাদের বাড়ীতে যখন ভোজ হইত, তখন নর্ত্তকীরা মদ্য পরিবেষণ করিত। নর্ত্তকী কিমিকা তাহাকে সর্ব্বদাই আদর করিত। সেই কিমিকার নিকট উপস্থিত হইয়া আই কহিল, “তোমাকে আমায় কিন্তে হবে, কিন্তু আমার অনেক টাকা দরকার।” সে তার করুণ কাহিনী সমস্ত বলিল, চোখে তার এক বিন্দু অশ্রুও দেখা গেল না। কিমিকা তাহাকে সান্ত্বনা দিল, আহার করাইল; তারপর কহিল, “বাছা, তোমাকে অনেক অর্থ দিবার সামর্থ্য আমার নাই। কিন্তু আমি প্রতিজ্ঞা করছি, তোমার মাতার ভরণপোষণের ভার আমি গ্রহণ করব। তোমার মাতার বড় ঘরে জন্ম, ব্যয়সঙ্কোচ তিনি করতে পারবেন না। তাই তাঁর হাতে অর্থ না দেওয়াই ভাল। তোমার মাতাকে এই চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে বল যে, তুমি আমার নিকট চব্বিশ বৎসর বয়স পর্য্যন্ত, বা ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্য্যন্ত থাকবে। এই সামান্য অর্থ এখন দিচ্ছি, নিয়ে যাও।”
এইরূপে আই ‘গেইযা’ হইল। কিমিকা তার নাম রাখিল, কিমিকো। সে তার মাতা ও শিশু ভগ্নীর ভরণপোষণের ভার লইয়াছে। কিমিকো খ্যাতিলাভ করিবার পূর্ব্বেই তার মাতার মৃত্যু হইল।
(৩)
কিমিকোর হৃদয় যে হরণ করিয়াছিল, সে ধনী পিতামাতার স্নেহের নন্দন, একমাত্র পুত্র।
উচ্চ, স্তব্ধ, দেয়াল-ঘেরা, বিস্তৃত ছায়াশীতল উদ্যানের মধ্যে বাড়ী—যেন কোন্ পরীরাজ্য! জগতের কর্ম্মকোলাহল এখানে পৌঁছে না, চতুর্দ্দিকে কেবল নিরবচ্ছিন্ন শান্তি। এ যেন সেই বাঞ্ছিত দেশ—শতব্যাধিপীড়িত মানব যেখানে যাইবার জন্য উন্মুখ হইয়া রহিয়াছে!
এমনি একটি বাড়ীতে বাস করিয়া বসন্ত কাটিল গ্রীষ্ম আসিল, কিন্তু কিমিকো কিমিকোই রহিল! তিন বার সে বিবাহের দিন পিছাইয়া দিয়াছে।
কিছুকাল এইরূপে গেল। এক দিন কিমিকো ধীরে ধীরে, দৃঢ়তার সহিত তার প্রেমাস্পদকে কহিল, “অনেক দিন বলি বলি করে বল্তে পারিনি। আমার মা আর আমার ছোট বোনটির জন্যে আমি নরকযন্ত্রণা ভোগ করেচি। সে সব চুকে গেছে, কিন্তু বুকের ভিতর যে আগুন জ্বল্চে তা এখনো নেবেনি,—কখনো নিব্বে বলেও বোধ হয় না। তোমার পুত্রের জননী হওয়া, তোমার ঘরের গৃহিণী হওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। তোমার পত্নী হয়ে তোমার লজ্জার কারণ আমি হব না। আমি তোমার খেলার সাথী, তোমার সহচরী, তোমার ক্ষণেকের অভ্যাগত,—তাও অর্থের জন্যে নয়। যখন আমি তোমার কাছ থেকে চলে যাব, তখন সব বুঝতে পারবে। আমার প্রেম তখনো তোমারই থাকবে, কিন্তু সে প্রেম এখনকার মতো নয়; এখনকার প্রেম মত্ততা, নির্ব্বুদ্ধিতা। আমার অন্তরের এই কথাগুলো মনে রেখো। সাধ্বী, সুন্দরী রমণী তোমার সন্তানের জননী হবে। আমি তাদের দেখবো; তোমার পত্নী কিন্তু কখনো হব না,—জননী হবার আনন্দও আমার অদৃষ্টে নেই। আমি যে তোমার নির্ব্বুদ্ধিতার নিদর্শন, প্রিয়তম!—একটা মায়া, একটা স্বপ্ন;—উল্কার মতো ক্ষণেকের তরে তোমার জীবনের মাঝ দিয়ে ছুটেছি। এর পরে হয় ত আরো বেশি কিছু হতে পার্ব, কিন্তু পত্নী হতে কখনো পার্ব না;—এ জন্মে না, পর জন্মেও না।”
তারপর হঠাৎ একদিন কিমিকো অদৃশ্য হইল। কেন গেল, কোথায় গেল, কখনই বা গেল—কেহ জানিল না।
(৪)
বহুমূল্য পরিচ্ছদ, অলঙ্কার, রাশি রাশি উপহার কিছুই কিমিকো সঙ্গে লয় নাই। তাই লোকে ভাবিল, আবার সে ফিরিবে। কিন্তু যখন কয়েক সপ্তাহ অতীত হইয়া গেল, অথচ কিমিকোর কোন সন্ধানই মিলিল না, তখন মনে হইল, বুঝি বা সে কোন আকস্মিক বিপদে পড়িয়াছে। নদীতে টানা জাল দেওয়া হইল, কূপ মধ্যে ডুবুরি নামানো হইল, পত্র এবং টেলিগ্রাফ দ্বারা সন্ধান লওয়া হইল, কত বিশ্বস্ত অনুচর চতুর্দ্দিকে প্রেরিত হইল; কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না। মাসের পর মাস করিয়া শেষে বৎসরও অতিবাহিত হইল, কিন্তু সেই সুন্দরী নর্ত্তকী আর ফিরিল না।
কিন্তু সে যা বলিয়াছিল তা সত্য হইল। সময়ে চোখের জল শুষ্ক হইল, অন্তরের আকাঙ্ক্ষা নির্ব্বাণ লাভ করিল! কিমিকোর ‘প্রিয়তম’ আর একজনকে বিবাহ করিয়া একটি পুত্ত্রলাভও করিল।
কথায় বলে, “পুরুষের হৃদয় যেন শরতের মেঘ!”
তারপর আরো কয়েক বৎসর অতীতের গর্ভে লীন হইল। সেই দেয়ালঘেরা পরী-রাজ্যে একদিন যেখানে কিমিকো ছিল, সেখানে অভাবের চিহ্নমাত্রও রহিল না।
* * * *
তখন সবেমাত্র ধরণীর বুকে প্রভাতের আলো পড়িয়াছে। দ্বারে বুদ্ধের দাসী ভিখারিণী হাঁকিল “হা—ই”! “হা—ঈ”! শিশুটি সেই শব্দে ছুটিয়া বাহির হইল।
পরিচারিকা ভিক্ষা দিতে গিয়া দেখে ভিখারিণী শিশুকে বক্ষে চাপিয়া ধরিয়া তার কানে কানে কি বলিতেছে। পরক্ষণেই শিশু পরিচারিকাকে কহিল, “আমায় দিতে দাও।” ভিখারিণী মিনতির স্বরে কহিল, “দয়া করে ওকেই দিতে দিন।” শিশু ভিখারিণীর ঝুলিতে চাল ঢালিয়া দিল। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিয়া ভিখারিণী কহিল, “তোমার পূজনীয় পিতাকে যে কটি কথা বলবে, সেগুলি বল ত বাছা।” শিশু আধ আধ স্বরে কহিল, “যাকে তুমি এ জগতে কখনো দেখতে পাবে না, সে বলে গেছে, তোমার পুত্রকে দেখে সে বড় সুখী হয়েছে।”
ভিখারিণী মৃদু হাস্য করিল, ছেলেটিকে আর একবার কোলে তুলিয়া লইল, তারপর —চলিয়া গেল। পরিচারিকা অবাক হইয়া চাহিয়া রহিল; পুত্র পিতার নিকট ছুটিল।
পুত্রের কথা শুনিয়া চোখের জলে পিতার বুক ভাসিয়া গেল। কারণ সে-ই জানে কে আসিয়াছিল, সে-ই বোঝে সে ত্যাগের মহিমা!
তাই সে আজকাল কেবল ভাবে, কিন্তু ভাবনার কথা মুখ খুলিয়া কাহাকেও বলে না।
সে জানে, সেই রমণীরত্ন, যে তাহাকে ভালবাসিত, তার ও নিজের মধ্যে অসীম ব্যবধান। গ্রহ হইতে গ্রহান্তরে যে ব্যবধান, সে ব্যবধান তার চেয়ে অনেক বেশী! কোন্ সুদূর নগরে, কোন্ নামহীন রহস্যময় অপ্রশস্ত গলিঘুঁজির গোলকধাঁধার মধ্যে, কোন্ অজানিত ক্ষুদ্র মন্দিরে সে ভগবান বুদ্ধের চরণ লাভের জন্য মৃত্যুর অপেক্ষায় বসিয়া আছে— তা জানিতে ইচ্ছা করা বিড়ম্বনা, তা সে বেশ বুঝে। সে যেন দেখিতে পায়, বুদ্ধ তাঁর শান্ত হাস্যোদ্ভাসিত মুখ নর্ত্তকীর দিকে ফিরাইয়া মধুর স্বরে কহিতেছেন, “হে আমার কন্যা! তুমি শ্রেষ্ঠ পথ অনুসরণ করিয়াছ; তুমি সার সত্য বুঝিয়াছ ও তদনুরূপ কার্য্য করিয়াছ। তাই আমি তোমায় আহ্বান করিতে আসিয়াছি।”
সে কণ্ঠস্বর মানব প্রেমিকের কণ্ঠস্বরের চেয়েও কত মধুর!