হানাষি/কূটবুদ্ধি
কূটবুদ্ধি
কোন্দো সামুরাই। সে যে তরবারি-চালনে সুদক্ষ এ কথা বলাই বাহুল্য। তবে সে চিত্রবিদ্যাটাও এতদূর আয়ত্ত করিয়া ফেলিয়াছিল যে, তার নাম কিয়োতো রাজসভার আমীর-ওমরার কানে পর্য্যন্ত পৌঁছিয়াছিল।
ষোগুণ ইয়েমিৎসুর সহিত এক রাজকুমারীর বিবাহ স্থির হইল। এবং ইহাও স্থির হইল যে, সেই বিবাহে ভাবী বধুকে একখানি রেশমী পরদা উপহার দেওয়া হইবে। ষোগুণের প্রধান মন্ত্রীর প্রতি আদেশ হইল যে, তিনি যেন সেই পরদার উপর কোন্দোকে দিয়া কিওতোর নিকটবর্ত্তী ‘বিওয়া’ হ্রদের আটটি সুবিখ্যাত দৃশ্য অঙ্কিত করাইয়া লন।
প্রধান মন্ত্রীটি কিন্তু জনপ্রিয় ছিলেননা। তিনি একটি ছোটখাটো নবাব। তাই তিনি যখন কোন্দোর নিকট কথাটা পাড়িলেন, তখন সে যথেষ্ট বিনয় ও দৃঢ়তার সহিত তাঁহাকে বুঝাইয়া দিল যে, সে এ কার্য্য করিতে পারিবে না। সে সামুরাই, এবং সেই হেতু ষোগুণের জন্য যে-কোনো মুহূর্ত্তে প্রাণ দিতে প্রস্তুত; কিন্তু চিত্রাঙ্কন! সে বিষয়ে সে কারো হুকুম মানিবে না, এমন কি মহামান্য প্রধান সচিবেরও না।
মন্ত্রী ত কথাটা শুনিয়া একেবারে দমিয়া গেলেন। তিনি যে রাজকুমারীর পিতাকে কথা দিয়াছেন যে পর্দাখানি নিশ্চয়ই পাঠাইবেন; এখন—কেমন করিয়া তাঁর কাছে মুখ দেখান!
বিপদে পড়িয়া তাঁর ওকুবোর নাম মনে পড়িয়া গেল। ষোগুণের কার্য্যে সে চুল পাকাইয়াছে, পেঁচালো বুদ্ধিতেও তার সমকক্ষ কেহ নাই এইরূপই লোকে বলিয়া থাকে। তার শরণাপন্ন হইতে হইবে! সে এ বিপদ হইতে উদ্ধারের একটা পন্থা নির্দ্দেশ করিতে পারে!
পর দিন প্রভাতে ওকুবো একটিও অনুচর সঙ্গে না লইয়া একেবারে কোন্দোর বাড়ীতে গিয়া হাজির। এরূপ প্রথাবিরুদ্ধ কার্য্যে কোন্দো বিস্মিত হইল; প্রবীণ আগন্তুককে সে সম্ভ্রমের সহিত অভ্যর্থনা করিয়া লইল।
কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর প্রসঙ্গক্রমে ওকুবো কলাবিদ্যার কথা পাড়িল। এ বিদ্যায় কোন্দোর পারদর্শিতার কথা উল্লেখ করিয়া কহিল:—
“তোমার গুরু কানো তান্যু—তার কথা কে না শুনেচে! সে ওস্তাদ লোক ছিল। তুমি তার উপযুক্ত শিষ্য বটে। হায়, হায়! আমার জীবনটা যুদ্ধ কর্তে কর্তেই কেটেচে; ললিতকলা চর্চ্চা করবার একটু অবসরও মেলেনি। তোমরা শান্তির সময় জন্মেছ, তোমরাই সৌভাগ্যশালী! ”
কোন্দো উত্তর দিল, “আপনার কথা শুনে অহঙ্কারের পরিবর্ত্তে আমার লজ্জা হচ্ছে। সামুরাইয়ের তরবারি ধরাই উচিত, তুলি ধরা তার শোভা পায় না। কিন্তু কি করি, সময়টা ত কাটাতে হবে। তাই একটু একটু চিত্রচর্চ্চা করে থাকি। আমি কিন্তু কারো জন্যে ছবি আঁকি না—হাজার টাকা দিলেও না। এই সে দিন প্রধান মন্ত্রী রাজকুমারীর বিবাহে উপহার দেবার জন্যে বিওয়া হ্রদের দৃশ্য আঁকাতে এসেছিলেন। আমি তখনি জবাব দিয়ে দিলুম, আমা হতে এ কাজ হবে না। আমার রীতিই নয় পরের জন্যে ছবি আঁকা!”
ওকুবো ত কথা শুনে ভারী খুসী। বলিল “এই ত সামুরাইয়ের উপযুক্ত কথা!” কোন্দো বৃদ্ধের প্রশংসা শুনিয়া মনে বেশ একটু আনন্দ অনুভব করিল। তারপর ওকুবো একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া কহিল, “অনেক দিন হতে আমার একখানা পর্দ্দা রয়েছে, ইচ্ছে করে কা’কেও দিয়ে কয়েকটা ছবি আঁকিয়ে নিই, কিন্তু দরিদ্রের মনোরথ পূর্ণ হয় না! বিখ্যাত চিত্রকর কা’কেও দিয়ে যে ছবি আঁকাব এমন সম্বল ত আমার নেই। তবে তুমি যদি অবসর মত পরদাখানার উপর দু'’এক খানা ছবি এঁকে দাও তা হলে...”
সামুরাই চিত্রকর ভাবিল, “বৃদ্ধ কেমন বিনয়ী, কেমন সজ্জন! এ লোকটি ‘দাইম্যো’ হইবার উপযুক্ত কিন্তু কি দুঃখের কথা! একখানা সামান্য পর্দ্দা অঙ্কিত করাইতে পারে না!”
সামুরাইয়ের নরম ভাব দেখিয়া ওকুবো কহিল, “আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছ এজন্য আমি কৃতজ্ঞ। তোমার ঐ যে ললিতকলা চর্চ্চার জন্যে অর্থ গ্রহণে অনিচ্ছা— এ আমার বড় ভাল লাগে। আমার বাড়ীতে একটী পাঁচরঙা আইভি লতা আছে, সারা জাপান খুঁজলেও এমন লতা আর একটি মিল্বে না। লতাটি ওলন্দাজেরা ষোগুণকে দিয়েছিল, এমন লতা কোনো ‘দাইম্যো’ কখনো চক্ষে দেখে নি! এই অপূর্ব্ব লতাটি ষোগুণ আমাকে দিয়েছিলেন। যদি আমার পর্দ্দার উপর কিছু এঁকে দাও ত আমার কৃতজ্ঞতার চিহ্নস্বরূপ এই লতাটি তোমাকে দিই। অবশ্য তোমার গুণের পুরষ্কার দেওয়া আমার সাধ্যাতীত ...”
এই অদ্ভুত লতার বিবরণ শুনিয়া কোন্দোর লোভ হইল; ছবি আঁকিয়া দিতে আর আপত্তি রহিল না। ওকুবো কহিল, “যদি কষ্ট ক’রে ছবিই আঁকবে, তা হলে বিওয়া হ্রদের দৃশ্যগুলিই এঁকে দাও না! যে ছবি প্রধান সচিব পান নি, সে ছবি আমি পেলে আমার কত আনন্দ! আর এইরূপে প্রধান মন্ত্রীকে খুব অপদস্থও করা হবে।”
কোন্দো ভাবিল, “কথাটা ঠিক! মন্ত্রী বেটা খুব জব্দ হবে!”
ছবিখানি যে দিন ওকুবোর বাড়ী পৌঁছিল, সেই দিনই পাঁচরঙা আইভি লতা কোন্দোর বৈঠকখানার শোভা বর্দ্ধন করিতে লাগিল।
লতাটি পাইয়া কোন্দো আনন্দে আটখানা! সে তার বন্ধুবান্ধবকে একদিন নিমন্ত্রণ করিয়া আনিল। সকলেই লতাটি দেখিয়া কোন্দোর সৌভাগ্যে আনন্দ প্রকাশ করিলেন। ষোগুণের নিজস্ব সম্পত্তি কোন্দোর হস্তে আসিয়াছে, ইহা অপেক্ষা আনন্দের বিষয় আর কি হইতে পারে! বন্ধুগণ যখন বিদায় লইতেছেন তখন তাঁহাদের মধ্যে একজন কহিলেন, “ওহে পাতার রং যেন ‘ঝুটো’ বলে বোধ হচ্ছে! পাতাগুলো রং করা নাকি?”
কোন্দো অবিশ্বাসের হাসি হাসিয়া বলিল, “ক্ষেপেছ!”
কিন্তু যখন জল দিতে বাস্তবিকই রং ধুইয়া গেল, তখন কোন্দো রাগে অগ্নিশর্ম্মা হইয়া উঠিল। তাহাকে ঠকানো হইয়াছে, অপমান করা হইয়াছে! এ অপমানের ক্ষমা নাই! ওকুবোর রক্তে সে এই অপমানের প্রতিশোধ লইবে! মুহূর্ত্ত মধ্যে সে তরবারি গ্রহণ করিল, এক লম্ফে অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করিয়া ওকুবোর সন্ধানে ছুটিল।
কোন্দোর আহ্বান শুনিয়া নিশ্চিন্তচিত্তে ওকুবো বাহিরে আসিল। যেন নিতান্ত ভাল মানুষ! পরিধানে তার ষোগুণদত্ত রেশমী পোষাক; পোষাকের উপর ষোগুণের কুলচিহ্ন অঙ্কিত। মুখে তার ভয়ের চিহ্নমাত্র নাই। সামুরাই-শার্দ্দূলের সামনে সে গম্ভীর ভাবে দাঁড়াইল।
“অপমানের প্রতিশোধ দেবার জন্যে তোমার শ্বেত মস্তক ও লম্বা দাড়ি নিতে এসেছি” বলিয়া কোন্দো ক্ষিপ্রগতিতে তরবারি চালাইল। কিন্তু ওকুবো তার অভিপ্রায় বুঝিয়া সরিয়া গিয়াছিল, তরবারির আঘাত তাহাকে লাগিল না।
ওকুবো উচ্চকণ্ঠে কহিল, “মূর্খ কোথাকার! দেখছিস না আমার পরিচ্ছদের উপর ষোগুণের কুলচিহ্ন। এ পরিচ্ছদের উপর তরবারি চালালে ষোগুণের বিপক্ষে অস্ত্র ধারণ করবার দণ্ডভোগ করতে হবে। তুই রাজদ্রোহীর শাস্তি পাবি।”
কোন্দোর তখন চৈতন্য হইল, সে দোষ স্বীকার করিয়া ক্ষমা চাহিল, এবং আর একখানা ছবি আঁকিয়া দিতে প্রস্তুত, তাহাও কহিল।
ওকুবো উত্তর দিল, “তার প্রয়োজন নেই। তুমি যে ছবি এঁকে দিয়েছিলে তা যথাসময়ে প্রধান সচিবকে পাঠান হয়েছে। আর অর্থ গ্রহণ করে ছবি আঁকা তোমার রীতি নয় ব’লে ছবির মূল্য স্বরূপ যে এক হাজার র্যো পেয়েছিলুম তা আমিই গ্রহণ করেচি। কি আর করি বল, তোমায় সে টাকা দিয়ে তোমাকে অপমান কর্তে ত আর পারি না!”