হানাষি/চিত্রকর
চিত্রকর
(১)
পাহাড়ের উপর দিয়া কিওতো হইতে য়েদো যাইবার জন্য পদব্রজে সে যাত্রা করিয়াছিল। তখনকার দিনে রাস্তা সংখ্যাতেও যেমন অল্প ছিল, সেগুলির অবস্থাও তেমনি খারাপ। ভ্রমণ সমূহ কষ্ঠসাধ্য ব্যাপার। তবে “যতন করিলে রতন মিলে” যুবক চিত্রকর চিত্রের উপকরণ সংগ্রহের জন্য বাহির হইয়াছে।
একটা পাহাড় অতিক্রম করিয়া কোনো গ্রামে পৌঁছিবার চেষ্টায় সে পথ হারাইয়া ফেলিল।
আকাশে তখন চাঁদ ছিল না, দেবদারু গাছের ছায়াগুলো তাহার চতুর্দ্দিকে গাঢ় অন্ধকার সৃষ্টি করিয়াছে। স্থানটা ভীষণ বন্য; গাছের পাতার মধ্য দিয়া বাতাসের সন্ সন্ শব্দ ও ঝিঁ ঝিঁ পোকার অফুরন্ত ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যায় না।
অন্ধকারে হোঁচট খাইতে খাইতে সে চলিল। হঠাৎ একটা পার্ব্বত্য নদীর সামনে আসিয়া পড়িল। নদীর ধার দিয়া অগ্রসর হইলে বোধহয় লোকালয় খুঁজিয়া পাইবে, এই আশায় কিছুদূর অগ্রসর হইলে দেখিল, নদীটা মহাকলরবে একটা গভীর খাতের মধ্যে গিয়া পড়িতেছে।
নিকটস্ত একটা পাহাড়ের মাথায় উঠিয়া সে চতুর্দ্দিকে চাহিয়া দেখিল। যে দিকে চায় কেবল পাহাড় আর পাহাড়! হতাশ হইয়া সে সে-রাত্রি মুক্ত আকাশতলে কাটাইয়া দিবে স্থির করিয়াছে, এমন সময় সে যে-পাহাড় বহিয়া উপরে উঠিয়াছে তাহারি তলায় একটি ক্ষীণ আলোক দেখিতে পাইল। নিকটে গিয়া দেখে এক ক্ষুদ্র কুটীরের রুদ্ধ দ্বারের ফাটলের মধ্য দিয়া আলোক নির্গত হইতেছে। দেখিয়া বোধ হইল কৃষকের কুটীর। পুলকিতচিত্তে অগ্রসর হইয়া সে দ্বারে আঘাত করিল।
(২)
কয়েকবার আঘাতের পর ভিতর হইতে রমণী-কণ্ঠে প্রশ্ন হইল “কি প্রয়োজন?” সে কী মধুর স্বর! আর এ যে রাজধানীর মার্জ্জিত ভাষা! যুবক আশ্চর্য্য হইল। সে উত্তর দিল, সে শিক্ষার্থী, পাহাড়ে পথ হারাইয়াছে; সে রাত্রের জন্য আহার ও বাসস্থান চায়, যদি অসুবিধা হয় ত নিকটবর্ত্তী গ্রামে যাইবার পথ বলিয়া দিলে বড়ই বাধিত হইবে। ভিতর হইতে আরো কয়েকটি প্রশ্নের পর রমণী কহিল, “আমি এখনি যাচ্ছি। আজ রাত্রে গ্রামে যাওয়া আপনার পক্ষে সহজ হবে না; পথেও বিপদ আপদ আছে।”
এইবার দ্বার খুলিল। রমণী একটা কাগজের লণ্ঠন লইয়া বাহিরে আসিল; নিজের মুখ যথাসম্ভব অন্ধকারে রাখিয়া যুবকের মুখ মনোযোগের সহিত দেখিল, তারপর তাহাকে হাতমুখ ধুইবার জন্য একটা পাত্রে কিছু জল ও একখানা তোয়ালে আনিয়া দিল। যুবক তাহার খড়ের চটি খুলিয়া ধূলিধূসরিত পদদ্বয় ধুইয়া ফেলিল। তারপর একটি ছোট, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ঘরে তুলার আসনের উপর বসিয়া কয়লার আগুনে হাত গরম করিতে লাগিল।
এইবার সে গৃহকর্ত্রীকে ভালো করিয়া দেখিবার অবসর পাইল। তাহার বয়স তার চেয়েও দু একবৎসর বেশী হইতে পারে, কিন্তু তখনো তাহার পূর্ণযৌবন। তাহার অঙ্গের কমনীয়তা ও মুখের মাধুর্য্য দেখিয়া সে অবাক হইয়া গেল। এ তো কখনো কৃষককন্যা নয়! পূর্ব্ববৎ অতি মধুর স্বরে সে কহিল, “আমি এখানে একলা থাকি, এবং অতিথি কেউ আমার এখানে আসেনওনা। কিন্তু আজ রাত্রে আরো ভ্রমণ করা আপনার পক্ষে নিরাপদ নয়। নিকটে কয়েকঘর কৃষকের বাস, আপনি কিন্তু একলা রাস্তা খুঁজে যেতে পারবেন না। সকাল পর্য্যন্ত এখানেই থাকুন। আপনার বিশেষ আরাম হবে না, কিন্তু আপনার শোবার বিছানা দোব। আপনি অবশ্য ক্ষুধার্ত্ত, আমার এখানে ভালো খাবার নেই, নিরামিষ আহার যা আছে তাই আপনাকে দোব।”
যুবতী তখন আগুন জ্বালিল, অনতিবিলম্বে আহার্য্য দ্রব্যাদি প্রস্তুত করিয়া যুবকের সামনে রাখিল। আহারের সময় সে দেখিল ছোট বাড়ীটি কি নিখুঁত পরিষ্কার, আহারের বাসনগুলি কেমন নিষ্কলঙ্ক! ঘরে অল্পসংখ্যক আসবাব সেগুলি মহার্ঘ না হইলেও কত সুন্দর! ঘরের একধারে একটি নীচু বেদী, তার উপর বুৎসুদান,[১] তার গালা-করা ছোট দ্বারগুলি খোলা; মধ্যে একখানি মৃতের নামলেখা কাষ্ঠফলক, কয়েকটি বন্য ফুল ও একটি প্রদীপ মিট্ মিট্ করিয়া জ্বলিতেছিল। বুৎসুদানের উপরে “করুণা-দেবী”র একখানি অসাধারণ ছবি টাঙানো। দেবীর মস্তক চন্দ্র-পরিবেষ্টিত।
আহার শেষ হইলে রমণী কহিল, “আমার একটিমাত্র বিছানা ও একটি মশারি। আজ রাত্রে আমার অনেক কাজ, ঘুমোবার সময় নেই। আপনি ঘুমোবার চেষ্টা করুন।” যুবক প্রতিবাদ করিতে যাইতেছিল, কিন্তু রমণীর কথায় বোধ হইল, বাস্তবিকই তাহার কোনো বিশেষ কাজ আছে, তাহার বন্দোবস্তে কেহ আপত্তি করে ইহাও তাহার ইচ্ছা নয়। তাই সে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিয়া নীরব রহিল। রমণী বিছানা করিয়া দিল, বুৎসুদান ও বিছানার মাঝে একখানা পর্দ্দা টানিয়া দিয়া ‘শুভ-রাত্রি’ চলিয়া গেল। ক্লান্ত যুবক কাঠের বালিস মাথায় দিয়া অচিরাৎ গাঢ় নিদ্রায় অভিভূত হইল।
কি একটা শব্দে তাহার ঘুম ভাঙিয়া গেল, তাহার মনে হইল অধিকক্ষণ সে ঘুমায় নাই। শব্দটা পদশব্দ, তবে আস্তে আস্তে চলার শব্দ নয়। বরং দ্রুতপদবিক্ষেপের শব্দ, উত্তেজিত অবস্থায় চলার মতো। তাহার আশঙ্কা হইল, বাড়ীতে চোর ঢুকিয়াছে। আশঙ্কা নিজের জন্য নয়, সে তো একপ্রকার নিঃসম্বল! তবে আশ্রয়দাত্রী দয়াবতী রমণীর যদি কোনো বিপদ হয়! চেঁচাইয়া ডাকিবে না কি? না, তাহাতে অবস্থা আরো খারাপ হইতে পারে! যা থাকে কপালে, প্রাণ দিয়াও সে তাহার গৃহকর্ত্রীকে রক্ষা করিবে! তাড়াতাড়ি কাপড় পরিয়া মশারির বাহিরে আসিল; গুঁড়ি মারিয়া পর্দ্দার্র ধারে আসিয়া উঁকি মারিয়া দেখিল। দেখিয়া বিস্ময়ে স্তব্ধ হইয়া গেল।
দীপালোকিত বুৎসুদানের সম্মুখে বিচিত্রবর্ণোজ্জ্বল পরিচ্ছদে সজ্জিতা যুবতী রমণী একাকিনী নৃত্য করিতেছে। পোষাকটী নর্ত্তকীর, তবে সে কখনো কোনো নর্ত্তকীকে এরূপ বহুমূল্য পোষাক পরিতে দেখে নাই। গভীর রাত্রে সেই নির্জ্জন স্থানে রমণীর সৌন্দর্য্য শতগুণ বর্দ্ধিত হইয়া অলৌকিক বোধ হইতেছিল। নৃত্যটি যেন আরো অপূর্ব্ব! যুবক তন্ময় হইয়া দেখিতে লাগিল; সে জীবনে এমন সুন্দর নৃত্য কখনো দেখে নাই। একবার তাহার সন্দেহ হইয়াছিল, বুঝি বা এ মানবী নয়, পরক্ষণে দেবতাসান্নিধ্যের কথা মনে পড়াতে নিজ দুর্ব্বলতায় লজ্জিত হইল। সে কিন্তু বুঝিল, রমণীর ইচ্ছা নয় যে সে এ দৃশ্য দেখে, এবং তাহারও কর্ত্তব্য নিঃশব্দে বিছানায় গিয়া শুইয়া পড়া। কিন্তু তাহার নড়িবার শক্তি ছিল না, যুবতীর রূপমাধুরী ও লাস্যলীলা তাহাকে অভিভূত করিয়া ফেলিয়াছিল।
হঠাৎ যুবতী স্পন্দিতবক্ষে থামিয়া গেল, কোমরবন্ধটি খুলিয়া ফেলিল ও উপরের পরিচ্ছদটি খুলিবার সময় পাশ ফিরিয়া যুবককে দেখিতে পাইয়া ভয়ানক চমকিয়া উঠিল।
যুবক তাড়াতাড়ি মার্জ্জনা ভিক্ষা করিয়া কহিল, পদশব্দে তাহার ঘুম ভাঙিয়া যায়। সে তাঁহার জন্য চিন্তিত হইয়া দেখিতে আসে— তাহার পর সে কহিল, “আমার কৌতূহল মার্জ্জনা করবেন, কিন্তু আমার বড় জান্তে ইচ্ছে হচ্ছে আপনি কে, আর কেমন করেই বা এমন সুন্দর নৃত্য শিখলেন। আমি রাজধানীর সকল নর্ত্তকীর নৃত্য দেখেছি, কিন্তু আপনার মতো নৃত্য করতে পারে এমন কাকেও দেখি নি।” রমণী ঈষৎ হাস্য করিয়া কয়েকটা কথায় তাহার করুণ-সুন্দর জীবনের ইতিহাসটা বলিয়া ফেলিল।
সে রাজধানীর সর্ব্বাপেক্ষা নামজাদা নর্ত্তকী ছিল। যুবক বাল্যকালে তাহার নাম শুনিয়াছে। তাহার নামে যখন রাজধানী পাগল, তখন হঠাৎ একদিন সে অন্তর্হিত হইল। কেহ জানিল না, কেন গেল বা কোথায় গেল। সে যশ ছাড়িয়াছিল, অর্থ ছাড়িয়াছিল, সম্মান ছাড়িয়াছিল—প্রেমের জন্য। তাহার প্রিয়তমের অর্থ ছিল না কিন্তু তিনি তাহাকে সমস্ত প্রাণ দিয়া ভালবাসিতেন। রমণীও জীবন-যৌবন প্রাণমন সবই তাঁহার চরণে অর্পণ করিয়াছিল। এই জনহীন নিভৃত পার্ব্বত্যপ্রদেশে তাহারা কয়েক বৎসর কি সুখে কাটাইয়াছে! প্রতি সন্ধ্যায় তাহার স্বামী বাজাইতেন, সে নৃত্য করিত। তাহার নৃত্য দেখিতে তিনি বড় ভালবাসিতেন। এক দীর্ঘ দারুণ শীতে তিনি পীড়িত হইলেন, হইলেন, সে কত সেবা করিল, প্রাণপণ যত্নে; কিছুতেই কিছু হইল না, তাঁহার মৃত্যু হইল। সেই অবধি সে তাঁহার স্মৃতি বুকে ধরিয়া একাকিনী এইখানে আছে। তাঁহার আত্মার প্রীতির জন্য প্রতি রাত্রে সেই আগেকার মতো নৃত্য করে, ঐ বুৎসুদানের সন্মুখে; সেখানে যে তার স্বামীর নামাঙ্কিত কাষ্ঠফলক রক্ষিত আছে!
সুনিদ্রার পর প্রভাতে যখন যুবক উঠিল, বেলা তখন অনেক হইয়াছে। দেখিল, রমণী তাহার জন্য আহার প্রস্তুত করিয়া রাখিয়াছে। আহার সারিয়া বিদায়ের সময় সে যখন রমণীকে মূল্য দিতে গেল, সে তাহা গ্রহণ করিল না, কহিল, “আমি যা দিয়েছি, তার আবার মূল্য কি? আপনি যে সব অসুবিধে ভোগ করলেন, অনুগ্রহ করে তা ভুলে গিয়ে কেবল আমার যত্ন করবার ইচ্ছাটা মনে রাখবেন।”
(৪)
কত বৎসর চলিয়া গিয়াছে, সঙ্গে সঙ্গে দেশের রীতিনীতিও কতক কতক পরিবর্ত্তিত হইয়াছে। চিত্রকর এখন বার্দ্ধক্যে উপনীত। কিন্তু সে এখন অখ্যাত দরিদ্র নয়। বড় বড় রাজা মহারাজা, আমীর ওমরাহ, তাহার চিত্রাঙ্কণে মুগ্ধ; তাহার নাম দেশে কে না জানে? রাজধানীতে তাহার প্রাসাদতুল্য বাড়ী; সে বাড়ীতে থাকিয়া কত যুবক তাহার কাছে চিত্রাঙ্কণ বিদ্যা শিখিতেছে।
একদিন দ্বারবানেরা আসিয়া কহিল, “একটা বুড়ী, বোধ হয় ভিথিরী, আপনার খোঁজে ক দিন থেকে আসছে। সে বলে প্রভুর সঙ্গে তার কাজ; আমরা কত বার তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি কিন্তু সে আবার এসেছে।”
বৃদ্ধ চিত্রকর ভৃত্যদিগকে ভর্ৎসনা করিল, কেন তাহারা এ কথা পূর্ব্বে বলে নাই? সে যে এককালে দরিদ্র ছিল, এ কথা বৃদ্ধ ভুলে নাই। নিজে ফটকের কাছে গিয়া সস্নেহে মলিনবেশধারিণী বৃদ্ধাকে জিজ্ঞাসা করিল, সে কি চায়? সে বলিল, সে অর্থও চায় না, আহারও চায় না—চিত্রকর অনুগ্রহ করিয়া তাহার একখানা ছবি আঁকিয়া দিলে সে কৃতার্থ হইবে!
চিত্রকর তাহার ইচ্ছা শুনিয়া আশ্চর্য্য হইয়া তাহাকে ভিতরে আসিতে কহিল। ভিতরে আসিয়া বৃদ্ধা হস্তস্থিত পুঁটুলিটি খুলিল, কম্পিতহস্তে সেকালের নর্ত্তকীর পোষাক এক একখানি করিয়া বাহির করিতে লাগিল। সেগুলি রেশমী, তার উপর সোনালিকাজ করা; ব্যবহারে মলিন হইয়া গিয়াছে, তবু সেগুলি বহুমূল্য।
সেগুলি দেখিতে দেখিতে, হঠাৎ চিত্রকরের চোখের সামনে থেকে যেন একটা পর্দ্দা সরিয়া গেল! সে দেখিল, বিজন পার্ব্বত্য প্রদেশে সন্ধ্যার অন্ধকার নিবিড় হইয়া আসিয়াছে, সে পথহারা হইয়া ঘুরিতেছে;—সে দেখিল বিজনবাসিনীর ছোট সেই শয়নের ঘর, বুৎসুদানের সম্মুখে সেই ক্ষীণালোক, মধ্যরাত্রে একাকিনী যে নৃত্য করিতেছিল তার অপূর্ব্ব সৌন্দর্য্য। তখন সেই রাজারাজড়ার বন্ধু বৃদ্ধ চিত্রকর সেই বৃদ্ধাকে নত হইয়া সসম্ভ্রমে অভিবাদন করিয়া কহিল, “আমাকে মার্জ্জনা করুন, আপনার মুখ এক মুহূর্ত্তের জন্যে চিনতে পারি নি; কিন্তু আপনার সঙ্গে একরাত্রির সাক্ষাতের পর কত বৎসর অতীত হয়ে গেছে। আমার সব মনে পড়েছে। আপনার একমাত্র বিছানা আমাকে শোবার জন্যে দিয়েছিলেন। আপনি আমাকে আপনার ইতিহাস বলেছিলেন, আপনার নৃত্য দেখবার সৌভাগ্যও আমার ঘটেছিল। আপনার নাম আমি ভুলি নি।”
চিত্রকরের মুখে নিজ নাম শুনিয়া বৃদ্ধা অবাক হইয়া গেল। ইদানীং তাহার স্মরণশক্তি কমিয়া আসিতেছে, সে জীবনে কষ্টও পাইয়াছে অনেক। চিত্রকর সস্নেহে তাহাকে অনেক কথা বলিল, রমণীর চোখে আনন্দাশ্রু বহিল। সে তাহার জীবনের অবশিষ্ট কাহিনী বলিতে আরম্ভ করিল। ক্রমশ সে দরিদ্র হইয়া পড়ে, তারপর বার্দ্ধক্যে উপনীত হইয়া এই রাজধানীতে আসিয়া পড়িয়াছে। এখানে এখন তাহাকে কেহই জানে না; কিন্তু তাহাতে তাহার দুঃখ নাই, দুঃখ কেবল যে, সে এখন বড় দুর্ব্বল, আর সে প্রিয়তমের মনোরঞ্জনার্থ বুৎসুদানের সামনে নৃত্য করিতে পারে না! তাই সে তাঁহার কাছে আসিয়াছে, তিনি দয়া করিয়া যদি তার একখানি ছবি আঁকিয়া দ্যান্! তার এখনকার চেহারা নয়, সে তখন যেমন ছিল সেই চেহারা; সেই জাঁকালো পরিচ্ছদে, নৃত্যের ভঙ্গীতে। সে চিত্রখানি তার প্রিয়তমের নামাঙ্কিত সেই কাষ্ঠফলকের সামনে টাঙাইয়া রাখিবে। সে তো মূল্য দিতে পারিবে না, তাই নৃত্যের পোষাকগুলি আনিয়াছে, তিনি যদি অনুগ্রহ করিয়া গ্রহণ করেন!
দয়ালু চিত্রকর কহিল, “না, না, ও সব কথা ভাববার প্রয়োজন নেই। আমি যে আমার ঋণ কিছু পরিশোধ করতে পারবো, এতেই আমার কত আনন্দ! আপনি কাল আসবেন। দেশের সর্ব্বাপেক্ষা ধনীর চিত্র যেমন মনোযোগের সহিত আঁকতুম, আপনার চিত্রও সেইরূপ আমার সমস্ত শক্তি নিয়োগ করে আঁকবো।”
(৫)
পরদিন যথাসময়ে বৃদ্ধা আসিল। চিত্রকর কোমল শুভ্র রেশমের উপর তাহার ছবি আঁকিলেন। তাহার পূর্ণযৌবনের দিনে সে যেমন ছিল; পাখীর মতো উজ্জ্বলনয়না, বংশযষ্টির মতো তন্বী নমনীয়া; স্বর্ণখচিত রেশমী পোষাকে পরীর মতো দীপ্তোজ্জ্বল! প্রতিভাবান চিত্রকরের তুলিকাসম্পাতে লুপ্ত শ্রী ফিরিয়া আসিল, ম্লান সৌন্দর্য্য পুনর্ব্বার বিকশিত হইয়া উঠিল! চিত্রকর ছবিখানি মূল্যবান রেশমী কাপড়ের উপর আঁটিয়া দিয়া টাঙাইবার জন্য রেশমী ফিতা সংযুক্ত করিয়া দিল। তারপর ছবির উপর স্বনামাঙ্কিত মোহরের ছাপ দিয়া শাদা কাঠের বাক্সে পুরিয়া বৃদ্ধাকে দিল। তৎসঙ্গে কিছু অর্থও দিতে যাইতেছিল, বৃদ্ধা তাহা গ্রহণ না করিয়া সজল নয়নে বলিল, “আমার আর কিছুই প্রয়োজন নেই। এই ছবিখানিই আমি চেয়ে ছিলুম, এরই জন্যে ভগবানের কাছে কত প্রার্থনা করেছি। ভগবান সে প্রার্থনা শুনেছেন, এ জীবনে আমি আর কিছু চাই না।” বৃদ্ধার একান্ত অনুরোধে তাহার পোষাকগুলি চিত্রকরকে গ্রহণ করিতে হইল। বৃদ্ধা তাহার বাসস্থানের সন্ধান কিছুতেই বলিল না, কহিল তাহার বাসস্থান অতি হীন, তাঁহার তুল্য সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির দেখিবার উপযুক্ত নয়।
চিত্রকর তাহার এক ছাত্রকে বৃদ্ধার অলক্ষ্যে তাহার অনুগমন করিয়া তাহার বাসস্থান দেখিয়া আসিতে কহিল। কিছুক্ষণ পরে সে ফিরিয়া আসিয়া বলিল, “সহরের বাইরে নদীর চড়ার ওপর যেখানে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিতকে ফাঁশি দেওয়া হয়, সেইখানে একখানা নোঙরা কুটীরে বৃদ্ধা থাকে।” চিত্রকর উঠিয়া বলিল, “চল, সেই নোঙরা কুটীরে আমাকে নিয়ে চল।”
* * *
কুটীরের দরজা বন্ধ ছিল, চিত্রকর তাহাতে ঘা দিতে লাগিল। তখন সূর্য্য অস্ত গিয়াছে, নদীর ধারে আকাশ শোণিতের মতো লোহিত হইয়া উঠিয়াছে। বৃদ্ধের মনে পড়িয়া গেল, বহুবৎসর আগে আর একদিন আর একস্থানে ইহারই দ্বারে সে প্রবেশের জন্য এমনই ব্যগ্রভাবে ঘা মারিয়াছিল! ভিতর হইতে কোনো উত্তর না পাইয়া সে আস্তে আস্তে দরজা ঠেলিলে দরজাটা খুলিয়া গেল।
ভিতরে ঢুকিয়া দেখিল জীর্ণ ঘরের মেঝের উপর একখানা পাতলা মলিন লেপ গায়ে দিয়া বৃদ্ধা ঘুমাইতেছে। ঘরের এক ধারে সেই পুরাতন বুৎসুদান, একটা ক্ষুদ্র প্রদীপ সেখানে মিট্ মিট্ করিয়া জ্বলিতেছে। বুৎসুদানের উপরে যে “করুণা-দেবী”র ছবি ছিল সেখানা নাই, কিন্তু বুৎসুদানের সামনের দেয়ালে চিত্রকর অঙ্কিত ছবিখানি টাঙানো আছে।
চিত্রকর তখন বৃদ্ধাকে ডাকিল; সে নড়িল না, কোনো উত্তরও দিল না। বৃদ্ধ নিকটে গিয়া দেখিল, তাহার আত্মা প্রিয়তমের কাছে চলিয়া গিয়াছে! তাহার মুখ কি এক অনির্দ্দিষ্ট কোমলতায় উদ্ভাসিত, আর বার্দ্ধক্যের রেখাগুলি চিত্রকর অপেক্ষাও শক্তিমান্ কোন্ এক ওস্তাদের করস্পর্শে মিলাইয়া গিয়াছে!
- ↑ বুদ্ধের প্রতিমূর্ত্তি ও পরিবারের মৃতব্যক্তির নামলেখ| কাষ্ঠফলক রাখিবার ছোট আলমারি।