হানাষি/তোন্সাকুর বিপত্তি
তোন্সাকুর বিপত্তি
“কি সুন্দর চাঁদ! মন্দপ্রভ সূর্য্যের মতো!” রাত্রিকালে এক বন্ধুর পর্ব্বতের উপর উঠিতে উঠিতে তোন্সাকু এই কথা বলিল। পাহাড়টি ভয়াবহ “হেন্জেয়্যামা” বা “বহুরূপী দৈত্য।” রাত্রে ত দূরের কথা, দিবাভাগেও কেহ এ পাহাড়ে উঠিতে সাহস করে না।
কিন্তু তাতে আসে যায় কি। সে ত ব্যবসায়ী লোক, সাধু; কুসংস্কারে বিশ্বাস করিবার সময় তাহার নাই। টাকা উপার্জ্জন করাই তাহার কাজ এবং “সাকে” পানে টাকা খরচ করাতেই তাহার আনন্দ। সে কাহারো মতের ধার ধারে না, বেশ আমুদে লোক এবং নিজেকে গ্রামের মধ্যে সর্ব্বাপেক্ষা চালাক চতুর বলিয়া জানে।
সে এখানে দৈত্যটিকে মারিতে আসে নাই,—সুধাংশুর রজত-কিরণ-পরিস্নাত রজনীর দৃশ্য উপভোগ করিবার জন্য আসিয়াছে। আর একটু সঠিক ভাবে বলিতে হইলে বলিতে হয়, এরূপ নয়ন-বিমোহন দৃশ্যের মাঝখানে “সাকে” পান করিতে আসিয়াছে। এমন দৃশ্যের মাঝে মদ বেশ মিষ্ট লাগে!
নিম্নভূমির উপর চন্দ্র সুবিমল জ্যোৎস্না ছড়াইয়া দিয়াছে। তোন্সাকুর মুখের উপর দিয়া এইমাত্র যে মিঠে হাওয়া বহিয়া গিয়াছে, তোন্সাকুর মন তাহারই মতো হাল্কা হইয়া উঠিয়াছে। কিছুক্ষণ সে নির্ব্বাক হইয়া এই শব্দহীন, অবসাদজনক সৌন্দর্য্য উপভোগ করিতে লাগিল। বৃক্ষপত্রের সির্ সির্ শব্দ ছাড়া সে কিছুই শুনিতে পাইতেছিল না; মধ্যে মধ্যে কেবল দূরাগত পেচকের ডাক স্থানটিকে কিছু ভয়াবহ করিয়া তুলিয়াছিল। অনিচ্ছাসত্ত্বেও, সে এই পাহাড়ের মালিক, বহুরূপী দৈত্যের কথা না ভাবিয়া থাকিতে পারিল না।
“এ স্থানটা একটু যেন বেশীরকম নির্জ্জন!”—সে জোরে জোরে বলিল, এবং কিছুক্ষণ একদৃষ্টে চাঁদের দিকে চাহিয়া, “আমি কিন্তু ভ্রূক্ষেপ করি না যতক্ষণ আকাশে ঐ চাঁদ আছে, আর আমার—এই আছে” বলিল। তারপর বুকের ভিতর হইতে মদের বোতলটি বাহির করিয়া ঈষৎ হাস্যে চাঁদের দিকে তুলিয়া ধরিল ও মুখে লাগাইয়া এক চুমুক পান করিল।
“আমাকে ‘সাকে’ দাও আর চাঁদ দাও আমি আর কিছু চাই না!”—এইরূপ অভিমত প্রকাশ করিয়া এক হাতে মদের বোতল ও অন্য হাতে টুপি লইয়া সে আপন মনেই পাহাড়ের উপর উঠিতে লাগিল।
হঠাৎ সে থামিয়া গেল, আর এক পাও অগ্রসর হয় না। তাহার চোখের সামনে কি একটা প্রকাণ্ড কালো পদার্থ রহিয়াছে! চক্ষু যথাসাধ্য বিস্ফারিত করিয়া সে কিছুক্ষণ পদার্থটার দিকে বেশ করিয়া চাহিয়া দেখিল, তাহার শরীর তখন ঠক্ ঠক্ করিয়া কাঁপি তেছে। পরক্ষণেই সে উচ্চহাস্য করিয়া উঠিল।
“পাহাড়ের নেই কিছু করেছে!”—ঘৃণার স্বরে এই কথা বলিল। “চমকে দিয়েছিল আর কি! সুসভ্য ‘মেইজি’-যুগে ভূত বলে পদার্থ যে নেই তা বিলক্ষণ জানি। এই পাহাড়ের বিষয়ে লোকে কত ভয়ঙ্কর গল্প বলে তা যে সব গুলিখুরি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমি মানুষ, দুনিয়ার মালিক; আমার ওপর নীচ শেয়াল বা বেঁজির কোনো জোর থাকতেই পারে না।”
এই চিন্তা তাহার মনে সাহস আনিয়া দিল, তাহার নিজের উপর বিশ্বাস আরো বাড়িয়া গেল। দৃঢ়পদে হাল্কা মনে সে অগ্রসর হইতে লাগিল। অবিলম্বেই সে পাহাড়ের মাথায় কোমল তৃণের উপর উপবেশন করিল। সেখান হইতে অসীম নৈশ আকাশ দৃষ্টিগোচর হইতেছিল। আকাশের মাঝে চন্দ্রমা জ্বল্ জ্বল্ করিতেছে। পাহাড়ের চতুর্দ্দিকস্থ নিম্নভূমি দূরে যেন কোটি-তারকাশোভিত আকাশের সঙ্গে মিশিয়া গিয়াছে। তাহার নিজের গ্রাম ঐ অনেক দূরে, স্বপ্নের মতো অস্পষ্ট!
এইবার তোন্সাকু আনন্দিত মনে বোতল খুলিয়া তাহার বড় আদরের সুরাপানে মনোনিবেশ করিল। প্রত্যেকবার পাত্র পূর্ণ করে আর চাঁদের দিকে তাকায়। যতটা পান করা উচিত তার চেয়ে অনেকটা অধিক শীঘ্রই সে পান করিয়া ফেলিল। দেখিতে দেখিতে তাহার মুখ চাঁদের মতোই উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। বড় গান গাহিবার ইচ্ছা হইল কিন্তু এই নিস্তব্ধ সৌন্দর্য্যের মাঝে গাহিবার সাহস তাহার হইল না। চক্ষু দুটি যেন আনন্দে সাঁতার দিতে লাগিল, হাতে তালি পড়িতে লাগিল এবং বিশেষ আগ্রহ সহকারে আনন্দে অধীর হইয়া সে দাঁড়াইয়া উঠিয়া বিষম অঙ্গভঙ্গীর সহিত নৃত্য জুড়িয়া দিল। সে তথন স্ফূর্ত্তির সপ্তম স্বর্গে!
পশ্চাদ্ভাগ হইতে কে হঠাৎ বলিয়া উঠিল, “নমস্কার তোন্সাকু; নিজে নিজেই খুব ফূর্ত্তি হচ্চে যে!”
“কে রে তুই?” আশ্চর্য্য হইয়া তোন্সাকু বলিয়া উঠিল। পিছন ফিরিয়া দেখে একটা লোক। “তুই আবার কোত্থেকে উঠ্লি?”
নবাগত বলিল,“আমি তোমার প্রতিবেশী গোন্সুকে।” সে পরিহাসের সুরে বলিল, “এমন চাঁদের তলায় ফূর্ত্তি করা বেশ!”
“ওঃ, তুমি গোন্সুকে নাকি? মাপ কর ভাই, তোমাকে প্রথমে চিন্তে পারি নি। তুমি কোনো শব্দ না করে হঠাৎ এমন ভাবে: এসেছিলে, আমি মনে করেছিলুম ভূত। হাঃ! হাঃ! হাঃ!”
নবাগত কহিল, “দেখ তুমি এমন গোলমাল করছিলে যে আমার পায়ের শব্দ শুনতে না পাওয়া কিছু আশ্চর্য্য নয়। আমার উদ্দেশ্যও তোমারই মতো, চাঁদের তলায় একটু ফুর্ত্তি করা।”
“এস! এস!” তোন্সাকু উৎফুল্ল চিত্তে বলিল, “বসে যাও আমার সঙ্গে। আমি ভূত দেখে ভয় পাবার ছেলে নয়, নির্জ্জন জায়গায় এক্লা থাকা ত দূরের কথা। আহা এমন রাত্রে একজন মনের মতো লোকের সঙ্গে ‘সাকে’ পান করতে করতে আলাপ করতে কত সুখ!”
তোন্সাকু মদিরাপাত্র পূর্ণ করিয়া বন্ধুর হাতে তুলিয়া দিয়া বলিতে লাগিল, “খেয়ে ফেল, আবার ভর্ত্তি করে দিই। কি? আর খাবে না? এমন কথা বোলো না। খেয়ে যাও ভাই, খেয়ে যাও। ‘নবাগতকে তিন পাত্র দাও,’ এইটেই হল নিয়ম,—জান ত। খেয়ে যাও, দশবার খাও, বিশবার খাও! যতক্ষণ এক ফোঁটা অবশিষ্ট আছে ততক্ষণ খাওয়া যাক্ এস।”
তোন্সাকু ও গোন্সুকে অনেকবার প্রচুর পান করিল।
কিছুক্ষণ পরে তোন্সাকু দেখিল তাহার বন্ধু এত পান করিয়াছে তবু তাহার মুখে কোনো পরিবর্ত্তন লক্ষিত হয় না। সে গম্ভীর ভাবে বসিয়া রহিয়াছে। তোন্সাকু একটু বিরক্ত ভাবে বলিল, “গোন্সুকে তুমি ত দেখ্চি মজার লোক। তোমার হল কি, গম্ভীরভাবে বসে রইলে যে? চাঁদের নীচে এমন গম্ভীর লোক মানায় না। উঠে পড়, নাচ গাও ফূর্ত্তি কর। শুন্চ?”
গোন্সুকে কিন্তু পূর্ব্ববৎ চুপচাপ বসিয়া আছে, প্রতি মুহূর্ত্ত সে যেন আরো গম্ভীর হইতেছিল। তোন্সাকুর বিষম ক্রোধের উদ্রেক হইল।
“তবে রে বাঁদর। উচিত শিক্ষা দিচ্চি। তবে এই নে!” বলিয়া তোন্সাকু খালি বোতলটা তাহার গায়ে ছুড়িয়া মারিল। অমনি গোন্সুকে অদৃশ্য হইয়া গেল।
কোথা হইতে একটা বিকট, অমানুষিক চীৎকার ভূমি ফুঁড়িয়া উঠিল। তোন্সাকু ত ভয়ে অর্দ্ধমৃত; সমস্ত শরীর ঠক্ ঠক্ করিয়া কাঁপিতে লাগিল। সামনে চাহিয়া দেখে গোন্সুকের স্থানে এক ভীষণদর্শন বিরাটদেহ দৈত্য। তাহার মুখ সর্পের মতো, চক্ষু হইতে আগুনের হল্কা বাহির হইতেছে। দৈত্যের দেহ ক্রমশ দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর হইতে লাগিল, অবশেষে আকাশে মিশিয়া গেল।
“ওরে বাপরে!” বলিয়া তোন্সাকু অজ্ঞান হইয়া পড়িল।
* * * * *
বেচারা কাঁদিয়া বলিল, “হায়, হায়, আমার কি হবে?”
ঠিক সেই সময়ে পদশব্দ শুনা গেল। নিশ্চয়ই কোনো লোক পাহাড়ের উপর উঠিয়া আসিতেছে!
তোন্সাকু উদ্গ্রীব হইয়া শুনিতে লাগিল। “রাম! রাম! বাঁচা গেল, ঐ যে ক জন গাঁয়ের লোক আস্চে!” সে তাহাদের প্রতীক্ষা করিতে লাগিল।
তাহারা তিন জন, সকলেই তোন্সাকুর নিকট-প্রতিবেশী। তাহাদের মধ্যে একজন তোন্সাকুকে সেই ভাবে গুঁড়ি শুঁড়ি মারিয়া শুইয়া থাকিতে দেখিয়া বলিল, “কে হে তোন্সাকু নাকি? কিছু অদ্ভুত দেখেচ?”
“অদ্ভূত!” তোন্সাকু বলিল, “উঃ কী ভীষণ! কী ভয়ানক! ”
“আমি কিছু বুঝতে পারচিনে, তোন্সাকু; কি দেখেচ বল।”
“দৈত্য দেখেচি একটা, ভীষণদর্শন, প্রকাণ্ড লম্বা, কী বিকট চীৎকারই করেছিল, আর—”
তাহাদের মধ্যে একজন বলিল, “কি? সে চীৎকার কি এমনই বিকট ছিল?” * * *
সেই মুহূর্ত্তে আকাশ প্রতিধ্বনিত করিয়া এক বিকট চীৎকার উত্থিত হইল এবং সেই লোকটি অদৃশ্য হইয়া গেল।
আর একজন প্রতিবেশী ভীত তোন্সাকুর ঘাড় ধরিয়া তাহার মুখের কাছে মুখ লইয়া গিয়া চীৎকার করিল, “এখনো তুমি নিজেকে দুনিয়ার মালিক বল? দৈত্যটা এই রকম দেখতে ছিল কি?” দ্বিতীয় প্রতিবেশী অদৃশ্য হইল এবং তাহার স্থলে ইতিপূর্ব্বে দৃষ্ট বিরাটাকার দৈত্য আবির্ভূত হইল। দৈত্য বার বার ঐ একই প্রশ্ন করিতে লাগিল— “দৈত্যটা এই রকম? এই রকম?” প্রত্যেক “এই রকম”-এর সঙ্গে সঙ্গে দৈত্য দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর হইতে লাগিল এবং অবশেষে তাহার মস্তক আকাশের চন্দ্রের সহিত মিশিয়া গেল!