বিষয়বস্তুতে চলুন

হানাষি/পাহাড়ে মেয়ে

উইকিসংকলন থেকে

​

পাহাড়ে মেয়ে

 শীতকাল। চারিদিক তুষারে ঢাকা পড়িয়াছে। পথ, ঘাট, মাঠ শাদা হইয়া গিয়াছে। পথ চিনিয়া চলা দুঃসাধ্য।

 পাহাড়ে দেশ। লোকের বসতি নাই বলিলেই হয়। দু একখানা কুটীর কেবল মনুষ্য-জীবনের পরিচয় দিতেছে। সেই জনহীন দুর্গম পথে অশ্বারোহনে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলিয়াছে! যে স্থানে রাত্রি কাটাইবে স্থির করিয়াছিল সে স্থান এখনো অনেক দূর। শীতের ভীষণ রাত্রি আসিতে আর বিলম্ব নাই; তার উপর এইমাত্র আবার বরফ পড়িতে আরম্ভ হইয়াছে, বাতাস উঠিয়াছে। বরফের কণাগুলো তাহার নাকে মুখে চোখে আঘাত করিতেছে; শ্রান্ত ঘোড়াটা আর ​চলিতে চাহে না। শীতে তাহার হাত অবশ হইয়া গিয়াছে, লাগাম ধরিয়া রাখা যায় না। সে কোথায় যাইবে! কি করিবে! আশ্রয় একটু কোথায় মেলে!

 ঐ না! ঐ যে ঐ পাহাড়ের মাথায় এক খানি কুটীর দেখা যাইতেছে! আঃ কি আনন্দ! মরুপ্রান্তরে জল দেখিয়া বুঝি তৃষ্ণার্ত্ত পথিকের এত আনন্দ হয় না!

 অনেক কষ্টে ঘোড়াটাকে লইয়া সে কুটীরের ধারে উপনীত হইল। কুটীরের আসে পাশে দীর্ঘ তুষারাচ্ছাদিত দেবদারু গাছগুলো ঝড়ের বেগে নুইয়া পড়িতেছে। কুটীরের মোটা কাঠের কপাট বন্ধ। তাহাতে সে সজোরে আঘাত করিল।

 এক বৃদ্ধা আসিয়া দ্বার খুলিল। সেই সুদর্শন পথিকের দুরবস্থা দেখিয়া দয়ার্দ্রচিত্তে কহিল, “আহা! ভদ্রলোক কত কষ্টই পেয়েচে! আসুন, আসুন।”

​ তোমোতাদা অশ্ব হইতে অবতরণ করিল। কুটীরের পিছনে একটা ছাউনির তলায় অশ্বটিকে বাঁধিয়া কুটীরে প্রবেশ করিল। ঘরের ভিতর আগুন জ্বলিতেছে,—সেই আগুনে এক বৃদ্ধ ও এক নবীনা হাত গরম করিতেছিল। তাহারা সম্ভ্রমের সহিত তাহাকে আগুনের ধারে আহ্বান করিল। বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা আগন্তুককে তাহার ভ্রমণ বিষয়ে নানা প্রশ্ন করিতে করিতে আগুনের উপর ‘সাকে’ গরম করিতে লাগিল। আহার্য্যও প্রস্তুত হইতেছিল!

 তরুণী পর্দ্দার অন্তরালে উঠিয়া গেল। তাহার পরণে ছিন্ন মলিন বসন। মাথায় চিরুণি পড়ে নাই, আলুলায়িত কুন্তল এলোমেলো ভাবে পিঠের উপর ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। কিন্তু এ সমস্তের মধ্য হইতেও তাহার রূপ যেন উছলিয়া পড়িতেছে! এই জনহীন পার্ব্বত্যপ্রদেশে এ রত্ন কেমন করিয়া আসিল! কেন, ​তিমিরগর্ভ কয়লার কদর্য্য খনিতে কি হীরক থাকে না?

 বাহিরে উদ্দাম বাতাস কপাট নাড়া দিতে লাগিল, কুটীর কাঁপাইতে লাগিল। বৃদ্ধ কহিল, “গ্রাম এখান থেকে অনেক দূরে; বাইরে ভারি বরফ পড়ছে। পথ চিনে ত আপনি যেতে পারবেন না। আমাদের কুঁড়ে ঘর, ভারি নোঙরা; এখানে থাকতে আপনার অসুবিধেও হবে অনেক। কিন্তু যদি কিছু মনে না করেন ত আজ রাত্তিরের মতো গরীবের এখানেই থেকে যান। আপনার ঘোড়ার কোনো অযত্ন হবে না।”

 এ বিনীত অনুরোধ তোমোতাদা এড়াইবার চেষ্টা করিলনা। বরং তরুণীকে ভালো করিয়া দেখিবার সুবিধা হইল ভাবিয়া মনে মনে বিশেষ আনন্দলাভ করিল।

 এইবার আহার আসিল। সাধারণ রকমের হইলেও পরিমাণে প্রচুর। তরুণী ​পর্দ্দার অন্তরাল হইতে বাহিরে আসিল। এবার সে একটি পরিষ্কার পোশাক পরিয়াছে, মুক্ত কেশ আঁচড়াইয়া মসৃণ করিয়াছে। সে যখন নত হইয়া তোমোতাদার ‘সাকে’র পেয়ালা পূর্ণ করিতেছে তখন যুবক বুঝিল তাহার জীবনে সে এমন অপূর্ব্ব সুন্দরী আর দেখে নাই । তাহার প্রত্যেক অঙ্গভঙ্গীর মাধুর্য্য তাহাকে মুঢ় করিয়া দিল।

 বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা কিন্তু বলিল, “আমাদের মেয়েটি এই পাহাড়ে দেশে একলা মানুষ হয়েচে তাই সে ভদ্রলোককে কি ভাবে আদর যত্ন করতে হয় তা জানে না। ওর অক্ষমতা দয়া করে মার্জ্জনা করবেন।”

 তোমোতাদা সুন্দরীকে দেখিবে না আহার করিবে! সে অনিমেষলোচনে তরুণীর মুখ পানে চাহিয়াছিল। তরুণীর মুখ লজ্জায় রাঙা হইয়া উঠিয়াছে, কিন্তু কি করিবে সে ​তাহার মুখের উপর হইতে চোখ সরাইতে পারিতেছিল না।

 আহার অস্পৃষ্ট রহিয়াছে দেখিয়া বৃদ্ধা কহিল, “মশাই দয়া করে কিছু খান! আমরা গরীব মানুষ, ভালো খাবার আর কোথায় পাব? শীতে বড় কষ্ট পেয়েচেন একটু কিছু না খেলে অসুখ করবে।”

 তাহাদের সন্তোষসাধনের জন্য তোমোতাদা সাধ্যমত পানাহার করিল। ইতিমধ্যে কিন্তু সেই লজ্জানম্রা তরুণী তাহার হৃদয় অধিকার করিয়া বসিয়াছে! সে তাহার সঙ্গে কথা কহিয়া বুঝিল, তাহার বাণী তাহার মুখের মতোই মধুর! পার্ব্বত্য প্রদেশে লোকালয়ের বাহিরে লালিত হইলেও, তোমোতাদার স্থির বিশ্বাস জন্মিল যে বালিকার মাতাপিতা নিশ্চয়ই সম্ভ্রান্তবংশসম্ভূত; নহিলে তাহার এরূপ মার্জ্জিত ভাষা ও ভঙ্গী হইতেই পারে না।

​ তোমোতাদা মনের আনন্দ আর গোপন করিতে না পারিয়া হঠাৎ তরুণীকে কবিতায় এই প্রশ্ন করিয়া বসিল:

আপনার মনে চলেছিনু কাজে
সহসা পথের ধারে
যা’ দেখিনু চোখে ফুল ব’লে হায়
ভুল হ’য়ে গেল তারে।
কাজে যাওয়া আর হ’লনা আমার
হেথাই কাটিল বেলা,
বুঝিতে না পারি অকালে কেন এ
প্রভাতী রঙের মেলা!

 ক্ষণমাত্র বিলম্ব না করিয়া তরুণী উত্তর দিল:

অঞ্চলে আমি আলোর আভাস
আড়াল করিয়া রাখিগো যদি
তবে বুঝি মম প্রভু প্রিয়তম
রহিবেন হেথা বেলা অবধি!

 তোমোতাদার বুঝিতে বাকি রহিল না ​যে তাহার অনুরাগ প্রত্যাখ্যিত হয় নাই। তরুণী যে কবিতা দ্বারা স্বীয় মনভাব ব্যক্ত করিল তা তোমোতাদার অন্তর কি এক নামহীন পুলকে পূর্ণ করিয়া দিয়াছে। তাহার কবিতা রচনার শক্তিও তাহাকে বিস্মিত করিল। এমন স্ত্রী, এত সুন্দর এমন বুদ্ধিমতী, সারা বিশ্ব খুঁজিলেও মিলিবে না! তাহার অন্তরের মধ্যে কে যেন চুপে চুপে বলিতে লাগিল, এমন রত্ন হেলায় হারাইওনা!

 তোমোতাদা মুগ্ধ, মোহিত হইয়া গিয়াছিল, তাই কোনো ভূমিকা না করিয়। স্বীয় নাম ধাম ও বংশের পরিচয় দিয়া বৃদ্ধ দম্পতীর নিকট কন্যার পাণিপ্রার্থনা করিল। তাহারা এ কথা শুনিয়া কৃতজ্ঞহৃদয়ে, বিস্ময়ের সহিত তাহাকে অভিবাদন করিল। একটু ইতস্তত করিয়া বলিল:

 “মশাই আপনি বড় ঘরের ছেলে, সামুরাই; আমাদের মেয়েটি লেখাপড়া শেখেনি, ভদ্রতাও ​জানে না—তাকে আপনার পছন্দ হয়েছে সে তো আমাদের ভাগ্যি! কিন্তু সে তো আপনার স্ত্রী হবার যোগ্য নয়, ওকে আপনি দাসী করে রাখবেন। তা হলেই যথেষ্ট।”

 প্রভাতের পূর্ব্বেই ঝড় থামিয়া গিয়াছে। নির্মেঘ পূর্ব্বাকাশ রাঙা করিয়া সূর্য্যোদয় হইল। তুষারের উপর অরুণকিরণ পড়িয়া দিকে দিকে বিচিত্র সৌন্দর্য্যের সৃষ্টি করিয়াছে। সেই প্রভাতসূর্য্যের কিরণের ন্যায় লজ্জিত মুখের গোলাপী আভা অঞ্চল দিয়া তাহার প্রেমাস্পদের চক্ষু হইতে ঢাকিলেও তোমোতাদার আর অপেক্ষা করিবার অবসর নাই! কিন্তু তরুণীকে পরিত্যাগ করিয়া যাওয়াও অসম্ভব; তাই যখন যাত্রার সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ হইয়াছে, তখন সে বৃদ্ধবৃদ্ধাকে কহিল, “আমি যা পেয়েছি তারও বেশি কিছু চাওয়া উচিত নয় কিন্তু আমি আবার আপনাদের ​মেয়েটিকে চাইচি। তার বিচ্ছেদ আমি সহা করতে পারবো না। আপনাদের মেয়েরও আমার সঙ্গে যেতে আপত্তি নেই। আমার হাতে তাকে দিন, তার কখনো অনাদর হবে না। আপনাদের কাছে আমি চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকবো। কালকের আদর যত্নের জন্যে এই সামান্য কিছু নিন।”

 বৃদ্ধ কিন্তু মোহরের থলিটি আস্তে আস্তে সরাইয়া দিয়া কহিল, “আপনার বড় দয়া। ও আপনি রাখুন, অনেকটা পথ যেতে হবে, ওগুলি আপনার কাজে আসবে। আমাদের অল্পেতেই সংসার চলে, টাকাকড়ি নিয়ে কি করব? আমরা কবে আছি কবে নেই, আমাদের মেয়েটির যে একটা গতি হ’ল এ আমাদের ভাগ্যি। আমাদের বাছাকে আপনার হাতেই দিলুম, সে আপনার সঙ্গেই যেতে চায়। বাছার যেন অনাদর না হয়, আহা! সে যে আমাদের ছেড়ে কখনো ​থাকেনি”, বলিতে বলিতে বৃদ্ধের কণ্ঠরোধ হইয়া আসিল।

 একের মিলন অন্যের বিচ্ছেদ—জগতে এইরূপই অহরহ ঘটিতেছে!

 শুভস্য শীঘ্রং। তোমোতাদা সুন্দরীকে নিজের পাশে ঘোড়ার উপর তুলিয়া লইল। তাহার পিতামাতাকে ধন্যবাদ জানাইয়া আনন্দিতচিত্তে যাত্রা করিল।

(২)

 তখনকার দিনে সামুরাই প্রভুর অনুমতি ব্যতীত বিবাহ করিতে পারিত না। যে কাজে তোমোতাদা বাহির হইয়াছিল তা সম্পন্ন না করিয়া অনুমতি গ্রহণ করাই বা যায় কেমন করিয়া! সেই জন্য কিওতো পৌঁছিয়া তোমোতাদা সুন্দরীকে সযতনে লুকাইয়া রাখিল; পাছে তাহার সৌন্দর্য্যে আকৃষ্ট হইয়া হোসোকাওয়া-রাজ তাহাদের মধ্যে ​বিচ্ছেদ ঘটাইয়া দ্যান্। তিনি যে সুন্দর মুখের ভারি ভক্ত!

 কিন্তু কথায় আছে, যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়; এ ক্ষেত্রেও তাহাই হইল। সুন্দরীকে হঠাৎ একদিন হোসোকাওয়া-রাজের এক অনুচর দেখিয়া ফেলিল ও স্বীয় তরুণ প্রভুকে এ সংবাদ জ্ঞাপন করিল। অবিলম্বে সুন্দরীকে বিনা বাক্যব্যয়ে তোমোতাদার নিকট হইতে ছিন্ন করিয়া লইয়া যাওয়া হইল!

 তোমোতাদার দুঃখ বাক্যে বর্ণনা করা যায় না! ‘দাইম্যো’র তুলনায় সে সামান্য একজন কর্ম্মচারী, তাঁহার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সে কি করিতে পারে! আর সে ত যোদ্ধার নিয়মবিরুদ্ধ কাজ করিয়াছে, প্রভুর অনুমতির অপেক্ষা না করিয়াই গোপনে বিবাহ করিয়াছে! কেমন করিয়া সে প্রিয়ার উদ্ধার সাধন করিবে? উভয়ে এদেশ ছাড়িয়া ​পলায়ন ভিন্ন উপায় নাই! কিন্তু পলাইবে কেমন করিয়া? পত্র লিখিবে? ‘দাইম্যো’র অন্তঃপুরে প্রেমপত্র পাঠানো, তা-ও ত একটা বিষম ব্যাপার! যদি ধরা পড়ে?

 নানা চিন্তার পর পত্রের পরিবর্ত্তে সে একটি কবিতা রচনা করিল। তাহার গভীর প্রেম ও অসীম বিরহবেদনা কবিতামূর্ত্তি গ্রহণ করিয়া প্রিয়া সন্নিধানে চলিল:

হায়, মণি-লাবণিয়া তরুণীর চোখে
অবিরল জলধার,
আজি, কাছে কাছে রহি’ রাজার কুমার
পাছে পাছে ফিরে তার।
ওগো, বড়র পীরিতি সাগরের রীতি,
উচ্ছ্বাসে সুগভীর;—
হায়, আমি দুর্ভাগা ফিরি আজ একা
প্রান্তে এ পৃথিবীর।

 কবিতাটি প্রেরিত হইবার পরদিন সন্ধ্যার সময় ‘দাইম্যো’র নিকট তোমোতাদার তলব ​পড়িল। তোমোতাদা ভাবিল এইবার দফা রফা! কিন্তু এ জীবন লইয়াই বা লাভ কি? এ বিচ্ছেদযন্ত্রণা সে আর সহ্য করিতে পারে না! তাহার মরণই ভাল!

 হোসোকাওয়া-রাজ সভায় সামুরাই পরিবেষ্টিত হইয়া বসিয়া রহিয়াছেন। তোমোতাদা যখন অভিবাদন করিতে অগ্রসর হইল, তখন সভায় যে নিস্তব্ধতা তা ঝটিকার পূর্ব্বের নিস্তব্ধতার মতো ভয়াবহ। কি এক অজানিত বিপদাশঙ্কায় তোমোতাদার বুক কাঁপিয়া উঠিল। সে অভিবাদন করিয়া নতমুখে দাঁড়াইয়া রহিল।

 কিন্তু এ কি! এ তো সে স্বপ্নেও ভাবে নাই! প্রভু যে মঞ্চ হইতে নামিয়া আসিয়া তাহার হাত ধরিলেন! ভয়ে ভয়ে তোমোতাদা মুখ তুলিয়া দেখে তাঁহার চোখে অশ্রু টলমল করিতেছে। তিনি কহিলেন, “তোমার কবিতা আমি পড়েছি। তোমাদের ​মধ্যে যে গভীর প্রেম সে প্রেমে বাদ সাধতে পারবো না। অভিন্নহৃদয় তোমাদের দু’জনকে আমি ঠাঁই ঠাঁই করব না। আজ এই সভায় সকলের সামনে তোমাদের বিবাহ-উৎসব সম্পন্ন হবে।”

 অচিরাৎ সভাগৃহের পার্শ্বদেশের পর্দ্দা সরিয়া গেল ও লজ্জারক্তিম মুখে বধূবেশে তরুণী স্বামীর পাশে আসিয়া দাঁড়াইল!

(৩)

 পাঁচ বৎসর কাটিয়া গিয়াছে। শীতের সন্ধ্যায় আগুনের ধারে পতিপত্নী বসিয়াছিল। বাহিরে ধূসরবর্ণ চন্দ্রতারকাহীন আকাশ হইতে অবিরাম তুষারপাত হইতেছে। বায়ু হাহা রবে কাঁদিয়া ফিরিতেছে।

 তোমোতাদার মনে পড়িল আর এক রাত্রে বাতাস এমনি ভাবে বহিতেছিল, তুষারপতনেরও বিরাম ছিল না। সেই রাত্রে প্রিয়ার সহিত প্রথম সাক্ষাৎ!

​ হঠাৎ কাতর চীৎকার শুনিয়া তোমোতাদা চমকিয়া উঠিল। ফিরিয়া দেখে স্ত্রীর মুখ শাদা হইয়া গিয়াছে। শশব্যস্তে সে তাহাকে দুই হাতে ধরিল। স্ত্রী ধীরে ধীরে কহিতে লাগিল, “হঠাৎ চীৎকার করে উঠেছিলুম, আমায় মার্জ্জনা কর। কিন্তু বেদনাটা এমনি হঠাৎ এসেছিল! আমাদের বিচ্ছেদ ঘনীভূত হয়ে এসেছে। পূর্ব্বজন্মের কর্ম্মফলে এ জন্মে আমাদের মিলন হয়েছিল, আবার পরজন্মেও হবে ব’লে আমার বিশ্বাস। তুমি অবিশ্বাস কর্‌চো? কিন্তু সত্যিই আমি মর্‌চি। তোমাকে এতদিন বলি নি যে আমি মানুষ নই। একটা গাছের আত্মা হচ্ছে আমার আত্মা; গাছের অন্তঃকরণ আমার অন্তঃকরণ। দেবদারু গাছের যে রস তা-ই আমার প্রাণ। এই মুহূর্ত্তে কে আমার গাছটি কাটচে তাই আমি মর্‌চি। তবে চল্লুম......!”

 আবার যন্ত্রণাকাতর চীৎকার। প্রতি ​মুহূর্ত্তে তাহার শরীর ক্ষুদ্র হইতে ক্ষুদ্রতর হইতে লাগিল, শেষে মেঝের উপর লুটাইয়া পড়িল।

 তোমোতাদা ব্যাকুল আগ্রহে তাহাকে জড়াইয়া ধরিল, কিন্তু কোথায় সে! কেবল যে রেশমী পোষাকটা পড়িয়া রহিয়াছে!

* * * *

 বৌদ্ধ ভিক্ষুর বেশ পরিয়া তোমোতাদা দেশভ্রমণে বাহির হইল। সংসারে আর তাহার আসক্তি নাই! প্রিয়ার স্মৃতি বুকে ধরিয়া তীর্থে তীর্থে কতদেশ দেশান্তরে ভ্রমণ করিয়া অবশেষে একদিন সেই পাহাড়ে দেশে আসিয়া উপস্থিত। দেখিল সে কুটীর ধূলির সহিত মিশিয়াছে। আছে কেবল তিনটি ছিন্নকাণ্ড দেবদারু গাছের মূল; দুইটি প্রাচীন ও একটি নবীন গাছের। গাছগুলি দেখা গেল সে আসিবার বহু পূর্ব্বে কাটা হইয়াছে!