বিষয়বস্তুতে চলুন

হানাষি/মাৎসুয়্যামা দর্পণ

উইকিসংকলন থেকে

​

মাৎসুয়্যামা দর্পণ

 অনেক দিন আগে এক নিভৃত স্থানে এক যুবক ও তাঁহার পত্নী বাস করিতেন। তাঁহাদের একটি মাত্র সন্তান, ছোট একটি মেয়ে; উভয়েই সন্তানটিকে অতিশয় ভালবাসিতেন। দম্পতীর নাম জানি না, কারণ অনেক দিন আগে লোকে তাঁহাদের নাম ভুলিয়া গিয়াছে; কিন্তু যে স্থানে তাঁহারা বাস করিতেন সে স্থানটির নাম মাৎসুয়্যামা, এচিঙো প্রদেশের অন্তর্গত।

 ছোট মেয়েটি যখন নিতান্ত শিশু, তখন কার্য্যগতিকে একবার তাহার পিতাকে বিরাট সহর, জাপানের রাজধানীতে যাইতে হয়। অনেক দূরে রাজধানী, শিশুর মাতা ও শিশুর যাওয়া কষ্টকর, সে জন্য পিতা একাকী ​যাত্রা করিলেন। পত্নী ও সন্তানের নিকট বিদায় গ্রহণ করিয়া যাইবার সময় প্রতিজ্ঞা করিয়া গেলেন, ফিরিবার সময় ভাল ভাল উপহার লইয়া আসিবেন।

 শিশুর মাতা পরবর্ত্তী গ্রামের ওপারে কখনো পদার্পণ করেন নাই, তাই স্বভাবতই পতি এত দূরদেশে গমন করাতে চিন্তিত হইয়া উঠিলেন; তবুও তাঁহার পতিই সর্ব্বপ্রথম সেই গ্রাম হইতে রাজধানীতে—যেখানে সম্রাট তাঁহার বড় বড় ওমরাহদের সঙ্গে থাকেন এবং যেখানে সুন্দর সুন্দর আশ্চর্য্য দর্শনীয় পদার্থ অনেক, সেখানে—গমন করিয়াছেন বলিয়া মনে মনে যথেষ্ট গর্ব্ব অনুভব করিলেন।

 অবশেষে পতির প্রত্যাবর্ত্তনের সময় উপস্থিত হইল। শিশুটিকে সুন্দর পরিচ্ছদে সজ্জিত করিয়া, এবং নিজে পতির প্রিয় একটি নীল রঙের পোষাক পরিয়া তাঁহার প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন।

​ অনুরক্তা পত্নী স্বামীকে সুস্থশরীরে প্রত্যাবর্ত্তন করিতে দেখিয়া যার-পর-নাই আনন্দিত হইলেন, এবং ছোট মেয়েটি পিতার আনীত সুন্দর খেলনা দেখিয়া কেমন আনন্দে হাততালি দিয়া হাস্য করিতে লাগিল! পথে এবং সহরে পিতা যে সব আশ্চর্য্য বস্তু দেখিয়াছিলেন তাহার অনেক গল্প হইল।

 “তোমার জন্যে একটি ভারি সুন্দর জিনিষ এনেচি, এর নাম দর্পণ। দেখ ভিতরে কি আছে দেখ”, এই কথা বলিয়া তিনি পত্নীকে একটি সাধারণ কাষ্ঠনির্ম্মিত শ্বেত রঙের বাক্স দিলেন। বাক্সটি খুলিয়া তাহার ভিতর পত্নী একখণ্ড গোলাকার ধাতু দেখিতে পাইলেন। তাহার এক দিক ঘনীভূত রৌপ্যের মতো শুভ্র এবং পক্ষী ও পুষ্পের উত্থিত ছবির দ্বারা সজ্জিত; অন্যদিক অতি স্বচ্ছ স্ফটিকবৎ উজ্জ্বল। যুবতী মাতা সবিস্ময় আনন্দের সহিত ইহা ​দেখিতে লাগিলেন, কারণ ইহার মধ্য হইতে তাঁহার দিকে একখানি উজ্জ্বলচক্ষুবিশিষ্ট, বিস্ময়পুলকিত মুখ উঁকি মারিতেছিল। পত্নীর বিস্ময়ে, এবং বিদেশ হইতে নূতন কিছু শিক্ষা করিয়া আসিয়াছেন দেখাইতে পারিয়া আনন্দিত চিত্তে যুবক আবার জিজ্ঞাসা করিল, “কি দেখ্‌চ অ্যা?”

 “এক সুন্দরী রমণী আমার দিকে দেখ্‌চে, তার অধর কম্পিত হচ্চে, যেন সে কিছু বলছে, আর, কি আশ্চর্য্য, সেও আমার মতো অবিকল একটি নীল পরিচ্ছদে সজ্জিত!”

 পত্নী যে বিষয় জানেন না তাহা জানার ঈষৎ গর্ব্বের সহিত স্বামী উত্তর করিলেন, “পাগ্‌লি! তা নয়, তা নয়, তোমার মুখই তুমি দেখতে পাচ্চ। গোলাকার ধাতুটির নাম দর্পণ, আমরা এ গ্রামে ইহার পূর্ব্বে কখনো এমন জিনিষ না দেখলেও, সহরের প্রত্যেকের কাছেই এরকম এক একখানি আছে।”

​ পত্নী এই উপহার পাইয়া মোহিত হইয়া গেলেন। প্রথম কয়দিন দর্পণখানি ঘন ঘন দেখিতেন, দর্পণের মধ্যে আপনার সুন্দর মুখখানির প্রতিবিম্বের সহিত এই যে তাঁহার প্রথম পরিচয়! কিন্তু একদিন তাঁহার মনে হইল এমন আশ্চর্য্য অমূল্য নিধি প্রতিদিন ব্যবহারের জন্য নয়। দর্পণখানি তাঁহার বাক্সের মধ্যে বহুমূল্য সম্পত্তির সঙ্গে সযত্নে বন্ধ করিয়া রাখিয়া দিলেন।

 কত বৎসর অতীত হইয়া গেল, দম্পতী সুখে বাস করিতে লাগিলেন। তাঁহাদের জীবনের আনন্দ, সেই ছোট মেয়েটি; সে তাহার মাতার প্রতিকৃতিরূপে বর্দ্ধিত হইতে লাগিল, এবং তাহার কর্ত্তব্যজ্ঞান ও স্নেহশীলতায় প্রত্যেকেরই প্রিয়পাত্রী হইয়া উঠিল। আপনাকে সুন্দরী দেখিয়া তাঁহার নিজের মনে ক্ষণিক অহঙ্কার উদয় হইয়াছিল, এই কথা স্মরণ করিয়া, পাছে দর্পণে রূপচ্ছবি দেখিয়া ​কন্যার মনেও অহঙ্কারের উদয় হয়, এই ভয়ে মাতা আর্শিখানি সাবধানে লুকাইয়া রাখিলেন।

 তিনি আর্শিখানির কথা কখনো উত্থাপন করিতেন না, পিতা ত সে কথা একেবারেই ভুলিয়া গিয়াছিলেন। মেয়েটি তাহার মাতার মতো নিজ সৌন্দর্য্যের সহিত সম্পূর্ণ অপরিচিত থাকিয়াই সরল আনন্দে বাড়িয়া উঠিতে লাগিল। যে দর্পণ তাহার রূপের বিজলি চোখে হানিয়া তাহার সহিত তাহার নিজের পরিচয় করিয়া দিতে পারিত তাহার কথা সে কিছুই জানিতে পারিল না।

 সুখ চিরদিন সমান থাকে না। কালক্রমে এই সুখী পরিবারেও দুঃখের কালো ছায়া পড়িল। মাতা পীড়িতা হইলেন। কন্যা রাত্রিদিন মাতার সেবায় নিযুক্ত, তবুও দিন দিন তাঁহার অবস্থা খারাপ হইতে লাগিল, অবশেষে জীবনের আশা পর্য্যন্ত লোপ পাইল।

​ কন্যা ও স্বামীর নিকট হইতে চিরবিদায়ের সময় সন্নিকট জানিয়া, মাতা সাতিশয় দুঃখিত হইলেন। কন্যাকে নিকটে ডাকিয়া কহিলেন, “বাছা তুমি বোধ হয় বুঝতে পার্‌চ আমার বড় অসুখ; আমার মৃত্যু সন্নিকট, তোমাকে ও তোমার পিতাকে রেখে আমায় চলে যেতে হবে। আমার মৃত্যু হলে, প্রতিজ্ঞা কর, প্রতিদিন প্রাতে ও সন্ধ্যায় তুমি এই দর্পণের ভিতর দেখ্‌বে; উহার মধ্যে তুমি আমাকে দেখ্‌তে পাবে, এবং জেনো আমি তখনো তোমাদের দেখ্‌তে পাচ্চি।” এই কথা বলিয়া আর্শিখানি বাহির করিয়া কন্যাকে দিলেন। কন্যা কাঁদিতে কাঁদিতে মাতার আদেশ স্বীকার করিল। ইহার কিছুদিন পরেই মাতার নিরুদ্বেগ মৃত্যু হইল।

 কর্ত্তব্যপরায়ণা কন্যা মাতার অন্তিম অনুরোধ ভুলে নাই। প্রতিদিন প্রভাতে সূর্য্য উদয়ের সময় ও সূর্য্যাস্তকালে আর্শিখানি ​বাহির করিয়া একান্তমনে বহুক্ষণ ধরিয়া দেখে। দর্পণের মধ্যে স্বর্গীয়া মাতার হাস্যোজ্জ্বল ছায়া দেখিয়া মুগ্ধ হয়। এ শেষজীবনের রুগ্না বিবর্ণা মাতা নয়; বহু পূর্ব্বের সুন্দরী যুবতী মাতা, স্বাস্থ্যে সৌন্দর্য্যে আনন্দে উল্লাসে নিটোল পরিপূর্ণ। তাঁহাকে সে প্রতি রাত্রে দিবসের দুঃখ কষ্টের কথা বলে, প্রভাতে তাঁহার নিকট সহানুভূতি ও উৎসাহের জন্য প্রাণের আঁচলখানি বিছাইয়া দেয়।

 এইরূপে দিনের পর দিন সে যেন মাতার দৃষ্টির সম্মুখে থাকিয়া তাঁহার জীবিতাবস্থায় তাঁহাকে সুখী করিতে যেমন চেষ্টা করিত এখনো তেমনি করিতে লাগিল। তাঁহার মনে যাহাতে কষ্ট হইতে পারে এমন কিছুই করিত না। তাহার জীবনের সর্ব্বাপেক্ষা আনন্দ ছিল দর্পণখানির দিকে চাহিয়া বলিতে পারা “মা, তুমি আমাকে যেমন হইতে ইচ্ছা কর আজ আমি তেমনি হইয়াছি!”

​ প্রতিদিন প্রাতে ও সন্ধ্যায় নিয়মিত ভাবে আর্শির দিকে চাহিয়া কথা কহিতে দেখিয়া পিতা একদিন তাহাকে এরূপ করার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। মেয়েটি বলিল, “বাবা, আমি প্রতিদিন দর্পণের ভিতর মাকে দেখি ও তাঁর সঙ্গে কথা কই।” তারপর সে তাঁহাকে তাহার মাতার শেষ ইচ্ছার কথা বলিল, এবং সে যে কখনো তাহা ভুলে নাই তাহাও বলিল। কন্যার সরলতা ও একান্ত সস্নেহ আজ্ঞানুবর্ত্তিতায় মুগ্ধ হইয়া পিতা আনন্দাশ্রু বর্ষণ করিতে লাগিলেন। আর্শির মধ্যে লক্ষিত ছায়া যে তাহার নিজেরই সুন্দর মুখ, যাহা প্রতিদিনের সহানুভূতি ও একাগ্র চিন্তায় তাহার স্বর্গীয়া মাতার ন্যায় হইয়া উঠিয়াছিল, তাহা বলিয়া কন্যার সরল বিশ্বাসে আঘাত করিতে তাঁহার মন উঠিলনা।