বিষয়বস্তুতে চলুন

হানাষি/স্বপ্ন

উইকিসংকলন থেকে

​

স্বপ্ন

 বাগানে ছিল একটা বহুদিনকার পুরাণো প্রকাণ্ড দেবদারু গাছ। গ্রীষ্মের অলস দিনে তার তলে বসিয়া আকিনোসুকে হাওয়া খাইত।

 বৈকালে সে দিন বড় গুমট! তাই আকিনোসুকে তার দুই বন্ধু ও ‘সাকে’র পেয়ালা লইয়া গাছের তলায় বসিয়া গিয়াছে। দু’ এক পেয়ালা শেষ হইতে না হইতেই হঠাৎ আকিনোসুকের চক্ষু জড়াইয়া আসিতে লাগিল—সে গাছের তলায় মাটিতে শুইয়া পড়িল।

 শুইয়া শুইয়া আকিনোসুকের হঠাৎ মনে হইল, নিকটবর্ত্তী এক পাহাড় হইতে যেন একটা মিছিল নামিতেছে। ভালো করিয়া ​দেখিবার জন্য সে উঠিয়া বসিল। চমৎকার বিরাট মিছিল! ঠিক যেন কোনো সম্ভ্রান্ত ‘দাইম্যো’ যাত্রা করিয়া বাহির হইয়াছেন। এমন মিছিল সে জন্মে কখনো দেখে নাই! আবার একি! মিছিলটা যে তার-ই বাড়ীর দিকে আসিতেছে! মিছিলের পশ্চাতে সুন্দর-পোষাক-পরা এক দল যুবাপুরুষ একখানা রাজ-শকট টানিয়া আনিতেছে। গাড়ীখানা মস্ত, গাড়ীর জানালা ও দরজায় উজ্জ্বল সবুজ রেসমী পর্‌দা। গাড়ীর গা হইতে গালার বার্ণিসের দীপ্তি চারি দিকে ঠিক্‌রাইয়া পড়িতেছে। বাড়ীর নিকট আসিয়া মিছিল থামিল; জাঁকালোপোষাক-পরিহিত এক ব্যক্তি অগ্রসর হইয়া আকিনোসুকেকে সসম্ভ্রমে অভিবাদন করিয়া কহিল:—

 “মহাশয়, আমি স্বর্গরাজের ভৃত্য। আমার প্রভু আপনাকে নমস্কার জানিয়েছেন ও আপনার আজ্ঞা পালনের জন্যে আমাকে ​পাঠিয়েছেন। তিনি রাজবাড়ীতে আপনার উপস্থিতি প্রার্থনা করেন ও আপনাকে সেখানে নিয়ে যাবার জন্যে এই রাজ-শকট পাঠিয়েছেন, অনুগ্রহ করে গাড়ীতে উঠুন।”

 কথাগুলি শুনিয়া একটা উপযুক্ত উত্তর দিবার ইচ্ছা হইল, কিন্তু আকিনোসুকে বিস্ময়ে হৃতবাক্ হইয়া গিয়াছিল, আর ঠিক সেই সঙ্গে তার ইচ্ছাশক্তিও লোপ পাইল; তাই চুপ্‌-চাপ্ রাজভৃত্যের কথামত সে গাড়ীতে উঠিল; ভৃত্য তার পাশে বসিয়া চলিবার আদেশ দিল। যুবকেরা রেশমের দড়ি ধরিয়া গাড়ীখানা দক্ষিণ দিকে ঘুরাইল—যাত্রা সুরু হইল।

 খুব অল্প সময়ের মধ্যেই, আকিনোসুকে সবিস্ময়ে দেখিল, গাড়ীখানা একটা প্রকাণ্ড দোতালা ফটকের সামনে আসিয়া পৌঁছিয়াছে। ভৃত্য “আপনার পৌঁছান সংবাদ দিয়া আসি” বলিয়া অদৃশ্য হইল। কিছুক্ষণ পরে দুই জন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি বাহির হইয়া আসিলেন। তাঁদের ​বেগুনে রঙের পোষাক ও মাথায় উঁচু টুপি। তাঁরা আকিনোসুকেকে অভিবাদন করিয়া তাহাকে গাড়ী হইতে নামাইয়া লইলেন ও পথ দেখাইয়া চলিলেন। সেই প্রকাণ্ড ফটকের মধ্য দিয়া একটা বিরাট উদ্যান পার হইয়া তাঁরা রাজপ্রাসাদের প্রবেশপথে উপস্থিত হইলেন। সে প্রবেশপথটি পূর্ব্বে পশ্চিমে কত দূর যে বিস্তৃত তার ঠিক নাই! তারপর তাঁরা যে বৈঠকখানায় প্রবেশ করিলেন সেটি যেমন প্রকাণ্ড তেমনি সুসজ্জিত। আকিনোসুকেকে সম্মানের আসনে বসাইয়া পথপ্রদর্শক দু’জন সম্ভ্রমের সহিত দূরে সরিয়া বসিলেন। সুসজ্জিতা পরিচারিকারা জলখাবার লইয়া আসিল। জলযোগ শেষ হইলে সেই বেগুনে-পোষাক-পরিহিত লোকেরা অবনত হইয়া অভিবাদন করিলেন ও রাজসভার প্রথামত একের পর অন্যে এইরূপ বলিতে লাগিলেন—

​ “এখন আমাদের কর্ত্তব্য আপনাকে বলা .........কেন আপনাকে এখানে আনা হইয়াছে......আমাদের প্রভু মহামহিম রাজার ইচ্ছা যে, আপনি তাঁর জামাতা হন......এবং তাঁর ইচ্ছা এবং আজ্ঞা যে, অদ্যই আপনি বিবাহ করেন......মহামান্যা রাজকুমারী তাঁর কন্যাকে......আমরা অবিলম্বে আপনাকে রাজসন্নিধানে লইয়া যাইব......শ্রীল শ্রীযুক্ত মহিমার্ণব নৃপতি আপনার জন্য অপেক্ষা করিতেছেন......কিন্তু প্রথমে আপনাকে উপযুক্ত সাজে সজ্জিত হইতে হইবে।”

 বক্তৃতার পর তাঁরা উভয়ে উঠিলেন, এবং সোনালি গালায় বার্ণিস করা একটি বৃহৎ দেরাজ খুলিলেন। দেরাজ হইতে নানা প্রকারের মূল্যবান পরিচ্ছদ ও একটি রাজটুপি লইয়া আকিনোসুকেকে রাজ-জামাতার উপযুক্ত সাজে সজ্জিত করিয়া রাজসভায় লইয়া গেলেন। গায়ে হলুদে রঙের রেশমী ​পোষাক, মাথায় কালো রঙের উঁচু টুপি; দাইজা বা মহা-আসনের উপর রাজা বসিয়া আছেন। তাঁর বামে ও দক্ষিণে আমীর-ওমরাহের দল সার বাঁধিয়া মন্দিরমধ্যস্থ বিগ্রহমূর্ত্তির মতো স্থির নিশ্চল ভাবে বসিয়া রহিয়াছে। তাঁদের মাঝ দিয়া অগ্রসর হইয়া আকিনোসুকে তিন বার ভূমিষ্ঠ হইয়া রাজাকে অভিবাদন করিল। তাহাকে সুমিষ্ট বচনে আপ্যায়িত করিয়া রাজা কহিলেন—

 “আমরা কেন তোমাকে আহ্বান করেছি তা তুমি শুনেছ। আমরা স্থির করেছি, তুমি আমাদের ঘরজামাই হবে। এইবার বিবাহ হউক।”

 রাজার কথা সমাপ্ত হইবার সঙ্গে সঙ্গে মঙ্গলবাদ্য বাজিয়া উঠিল। একখানি পর্দ্দার অন্তরাল হইতে রূপসী রমণীর দল আকিনোসুকেকে রাজকন্যার নিকট লইয়া যাইবার জন্য অগ্রসর হইয়া আসিল।

​ সুবৃহৎ ঘরটি আগন্তুকে পূর্ণ হইয়া গিয়াছিল; সেখানে আর তিল ধারণের স্থান ছিল না। রাজকন্যার সামনে নির্দ্দিষ্ট আসনে যখন আকিনোসুকে হাঁটু গাড়িয়া বসিল, তখন উপস্থিত সকলে তাহাকে সশ্রদ্ধ অভিবাদন করিল। স্বর্গভ্রষ্টা অপ্সরার মতো সে রাজকন্যা! তার অঙ্গে যে বসন তা গ্রীষ্মকালের আকাশের মতো অপরূপ সুন্দর!

 বিবাহের পর প্রাসাদের অন্য দিকে তাহাদের জন্য যে ঘরগুলি নির্দ্দিষ্ট হইয়াছিল সেখানে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা আসিয়া আসিয়া নব দম্পতিকে অভিবাদন করিয়া গেল। উপহার যে কত আসিল তাহার আর সংখ্যা করা যায় না!

 কিছু দিন পরে আবার রাজার নিকট হইতে আহ্বান আসিল। এবার রাজা অধিকতর স্নেহের সহিত তাহাকে অভ্যর্থনা করিলেন। তিনি কহিলেন—

​ “আমাদের রাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে রাইষু দ্বীপ। আমরা তোমাকে সেখানকার শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত করলুম। সেখানকার লোকেরা বেশ রাজভক্ত ও শান্ত-স্বভাব; কিন্তু তাদের রীতিনীতি ও শাসন-পদ্ধতি এখনো নিয়মিত হয় নি। তাদের করুণা ও বুদ্ধির সহিত শাসন করবে ও তাদের সামাজিক অবস্থা যাতে উন্নত হয় তদ্বিষয়ে সচেষ্ট থাকবে। যাত্রার সমস্ত আয়োজন হয়েছে।”

 আকিনোসুকে স্ত্রীকে সঙ্গে লইয়া রাজদত্ত জাহাজে চড়িয়া যাত্রা করিল। অনুকূল বাতাস অবিলম্বে তাহাদিগকে দ্বীপে পৌঁছাইয়া দিল।

 কমলার বরে দ্বীপটি ফল-পুষ্প-শস্যে ভরপূর। শান্তিপ্রিয় লোকগুলি স্বাস্থ্যসৌন্দর্য্যে অদ্বিতীয়। বুদ্ধিমান মন্ত্রিবর্গের সাহায্যে আইন প্রণয়ন করিয়া, তাহাদের উৎসবাদিতে ​যোগ দিয়া, আপনার জনের মতো তাহাদের সহিত সস্নেহ ব্যবহার করিয়া আকিনোসুকে সকলেরই শ্রদ্ধা অর্জন করিতে সমর্থ হইল।

 দীর্ঘ ত্রয়োবিংশতি বর্ষের মধ্যে তাহার জীবনে শোকের রেখা একটিও পড়ে নাই। কিন্তু পর বৎসর তাহার মাথায় বজ্রপাত হইল। পাঁচ পুত্র ও দুই কন্যার মাতা, তাহার সুন্দরী স্ত্রী ইহসংসার ছাড়িয়া গেল। হান্‌র‍্যাকো নামক স্থানে এক পাহাড়ের উপর তাহাকে মহা আড়ম্বরের সহিত সমাহিত করা হইল।

 শোকার্ত্ত আকিনোসুকের জীবন দুর্ব্বিষহ হইয়া উঠিয়াছে। কিছুদিন গত হইলে এক দিন রাজদূত আসিয়া উপস্থিত। রাজা তাহার বিপদে দুঃখ প্রকাশ করিয়াছেন ও বলিয়া পাঠাইয়াছেন, “তোমাকে স্বদেশে ফেরত পাঠাইতে মনস্থ করিয়াছি। তোমার পুত্রকন্যাগণের যথোচিত সেবা শুশ্রূষা হইবে, ​তাহাদের জন্য চিন্তিত হইবার প্রয়োজন নাই। রাজার নাতি-নাতিনীর মতোই তাহারা লালিত পালিত হইবে।”

 রাজাজ্ঞা শুনিয়া বিনীত ভাবে সে যাত্রার আয়োজন আরম্ভ করিয়া দিল। সমস্ত বন্দোবস্ত সম্পূর্ণ করিয়া অমাত্যবর্গ ও কর্ম্মচারিবৃন্দের নিকট বিদায়গ্রহণ করিয়া রাজার প্রেরিত জাহাজে সে আরোহণ করিল। নীল আকাশের তলে, নীল জলের উপর দিয়া জাহাজ চলিল। রাইষু দ্বীপটাও যেন নীল দেখাইতেছিল! তারপর সেটা ক্রমে ধূসর হইয়া আসিল, অবশেষে অদৃশ্য হইয়া গেল। আকিনোসুকে হঠাৎ চমকিয়া উঠিয়া বসিল—তার বাগানের মধ্যে সেই দেবদারু গাছের তলায়!

 কয়েক মুহূর্ত্ত সে নির্ব্বাক হইয়া বসিয়া রহিল। দেখিল, তার দুই বন্ধু পেয়ালায় চুমুক দিতেছে ও গল্প করিতেছে। তাহাদের ​দিকে হতভম্বের মতো ফ্যাল্ ফ্যাল্ করিয়া চাহিয়া বলিয়া উঠিল—“কী আশ্চর্য্য!”

 তাহাদের মধ্যে এক জন হাসিয়া কহিল, “আকিনোসুকে দিনের বেলা স্বপ্ন দেখ্‌ছিল! আশ্চর্য্য কি দেখ্‌লে হে?”

 আকিনোসুকে স্বপ্নটি বিবৃত করিল। তাহা শুনিয়া তাহার বন্ধুদ্বয়ও বিস্মিত হইল। সে ত এই কয়েক মিনিট মাত্র ঘুমাইয়াছে!

 তাহাদের মধ্যে এক জন কহিল— “আশ্চর্য বটে! তুমি যখন ঘুমুচ্ছিলে, আমরাও কিছু আশ্চর্য্য দেখেছি। ছোট একটি হল্‌দে প্রজাপতি তোমার মুখের উপর উড়ে বেড়াচ্ছিল। তার পর তোমার পাশে গাছের কাছে বস্‌লো। যেমনি বসা, মত্ত এক পিঁপড়ে বেরিয়ে তাকে ধরলে ও গর্ত্তের ভিতর টেনে নিয়ে গেল। তোমার ওঠবার একটু আগেই সেই প্রজাপতি গর্ত্তের ভিতর থেকে বেরিয়ে তোমার মুখের উপর উড়্‌তে ​লাগলো। তারপর হঠাৎ কোথায় যে চলে গেল কিছুই বোঝা গেল না। ”

 অপর বন্ধু কহিল, “হয়ত সেটি আকিনোসুকের আত্মা। আমি যেন দেখ্‌লুম সে আকিনোসুকের মুখে ঢুকে গেল। কিন্তু প্রজাপতি যদি আকিনোসুকের আত্মাই হয়, তা হলেও ত স্বপ্নের কোনো মীমাংস' হয় না।”

 প্রথম বন্ধু কহিল, “পিঁপড়েগুলো বোধ হয় কিছু সন্ধান দিতে পারে। অদ্ভুত জানোয়ার এরা—ভুত যে নয় তা-ই বা কে বল্‌তে পারে!... যাই হোক্‌ এই গাছতলায় পিঁপড়ের এক মস্ত বাসা আছে!”

 আকিনোসুকে উত্তেজিত স্বরে কহিল, “এস, এস দেখা যাক! ”

 দেবদারু গাছের তলায়, গুঁড়ির চারি দিকে হাজার হাজার পিপীলিকা খড় কুটা ও কাদা দিয়া ছোট ছোট ‘নগর’ তৈয়ারি করিয়াছে। একটা বড় গোছের ‘নগরের’ ​চতুর্দ্দিকে গাদা গাদা পিপীলিকা জমা হইয়াছে। তাহাদের মাঝখানে এক প্রকাণ্ড পিপীলিকা—তাহার ডানা হলুদবর্ণ ও মস্তক কৃষ্ণবর্ণ।

 আকিনোসুকে চীৎকার করিয়া উঠিল, “এই ত আমার স্বপ্নের রাজা! আর ঐ ত তোকোয়ো রাজপ্রাসাদ! কী আশ্চর্য্য!... তা হলে রাইষু অবশ্য এর দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে হবে...ঐ মোটা শিকড়টার বামদিকে হ্যাঁ, এই যে! ভারী আশ্চর্য্য! এইবার বোধ হয় হান্‌র‍্যোকো পাহাড় ও আমার প্রিয়ার সমাধি পাওয়া যাবে।”

 পিপীলিকার বাসা খুঁড়িয়া ফেলিয়া অনেক অনুসন্ধানের পর একটি ছোট্ট ঢিপি দেখা গেল। তার উপর একটি মসৃণ ছোট্ট পাথরের নুড়ি—বৌদ্ধ সমাধির উপর যেরূপ স্মরণ-প্রস্তর রক্ষিত হয় অনেকটা সেইরূপ। আর সেই নুড়ির তলে কাদার মধ্যে একটি স্ত্রী-পিপীলিকার মৃতদেহ!