হানাষি/হারু
হারু
তার শিক্ষা পুরাণো প্রথা অনুসারে প্রধানত গৃহে সম্পন্ন হইয়াছিল। এই গৃহশিক্ষা হৃদয়ের সারল্য, হাবভাবের সহজ মাধুর্য্য, বাধ্যতা ও কর্ত্তব্যানুরাগ এমন ভাবে ফুটাইয়া তুলিত যা জাপান ছাড়া অন্যত্র কোথাও সম্ভব নয়। এরূপ শিক্ষাসৃষ্ট জীব বড় কোমল বড় মধুর; তাহা আজিকার কঠোর সময়ের উপযোগী না হইলেও পুরাণো জাপানী সমাজের যে সম্পূর্ণ অনুপযোগী ছিল, এ কথা বলা যায় না। শিক্ষিতা রমণীকে এক কথায় স্বামীর অনুগ্রহের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করিতে হইত। সে যেন কখনো ঈর্ষা, দুঃখ বা ক্রোধের বশবর্ত্তী না হয়, এই শিক্ষা তাহাকে দেওয়া হইত! রমণী নিজের মধুর স্বভাব দিয়া স্বামীর কুপ্রবৃত্তি দমন করিবে, ইহাই সকলে আশা করিত। এক কথায় তাহাকে অতিমানুষিক হইতে হইত,—অন্তত বাহিরে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাব দেখাইতে হইত। এরূপ করা সম্ভব কেবল সেই স্বামীর সঙ্গে, যে পদমর্য্যাদায় তার স্ত্রীর সমান ও সূক্ষ্মদর্শী; যে তার মন বোঝে এবং কখনো সে মনে আঘাত করে না।
হারু যে পরিবার হইতে আসিয়াছিল তা তার স্বামীর পরিবার অপেক্ষা অনেক ভাল। সেই কারণে বোধ হয় তার স্বামী তাকে ভালরকম বুঝিত না। অতি অল্প বয়সেই তাদের বিবাহ হয়। হারুর স্বামীটির বিষয়বুদ্ধি বেশ পাকা ছিল, তাই দরিদ্রতার সঙ্গে যুঝাযুঝি করিয়া অল্পকালের মধ্যেই অবস্থা স্বচ্ছল করিয়া তুলিল। হারুর কিন্তু কখনো কখনো মনে হইত, দরিদ্র অবস্থাই ছিল ভাল তখনই তাহার পতি তাহাকে ভালবাসা দিতে কখনো কার্পণ্য করেন নাই!
সে তখনো নিজেই তার পোষাক তৈয়ারি করিত; আর স্বামী তার সূচিকার্য্যের প্রশংসা করিত। সে স্বামীর পোষাক পরিবার ও ছাড়িবার সময় স্বামীকে সাহায্য করিত; তাদের সুন্দর বাড়ীটিতে স্বামীর সর্ব্ববিষয়ে সুখস্বাচ্ছন্দ্যের জন্য সর্ব্বদা সচেষ্ট থাকিত; প্রাতঃকালে কর্ম্মস্থানে যাইবার সময় তাহাকে মধুরকণ্ঠে বিদায় দিত, আবার ফিরিয়া আসিলে স্বাগত সম্ভাষণ করিত; স্বামীর বন্ধুগণকে যথেষ্ট আদর-অভ্যর্থনা করিত, যৎকিঞ্চিৎ ব্যয়ে সংসার চালাইত এবং মুখ খুলিয়া কখনো কিছু চাহিত না। চাহিবার কোনো প্রয়োজনও ছিল না, স্বামী তাকে সকল জিনিষই দিত। সুসজ্জিতা পত্নীকে সঙ্গে লইয়া থিয়েটারে ও অন্যান্য আমোদপ্রমোদের জায়গায় যাইত। বসন্তের ‘সাকুরা’, গ্রীষ্মরাত্রে খদ্যোতের ঝিকিমিকি বা শরতের রক্তবর্ণ ‘মেপ্ল্’এর জন্য প্রসিদ্ধ সকল স্থানে যাইত। কখনো বা ‘মাইকো’তে[১] সমুদ্রের ধারে—দেবদারু গাছগুলো যেখানে নর্ত্তকীর মতো হেলিয়া পড়ে,—একত্রে বেলা কাটাইত; বৈকাল বেলাটা কোনোদিন বা বহু পুরাতন এক গ্রীষ্মাবাসে কাটিত; সেখানে সব জিনিষই যেন যুগ-যুগান্তের স্বপ্ন দিয়া ঘেরা; ঘন বন সেখানে প্রচুর ছায়া বিস্তার করিতেছে, স্বচ্ছ শীতল জল গহ্বর হইতে গহ্বরাভ্যন্তরে উছলিয়া পড়িয়া কলতান ভুলিয়াছে ও কোন্ সুদূরের বাঁশীর সুর অনুক্ষণ বাতাসে ভাসিয়া বেড়াইতেছে।
এই সব ছোটখাটো আমোদ ও ভ্রমণের জন্য ছাড়া হারু কথনো বাহিরে যাইত না। তার এবং তার স্বামীর আত্মীয় কুটুম্বেরা সকলেই দূরদেশে থাকিতেন। সেই জন্য কারো বাড়ীতে যাওয়ার প্রয়োজনও তাহার ছিল না। বাড়ীতে থাকিয়া সে ফুলগুলি সাজাইয়া রাখিত, ঘরগুলি গুছাইত, উদ্যানের পুষ্করিণীর লাল মাছগুলিকে স্বহস্তে খাওয়াইত। মাছগুলিও তাহাকে এমনি চিনিয়াছিল যে তাহাকে আসিতে দেখিলেই মাথা উঁচু করিয়া ভাসিয়া উঠিত, আনন্দে ল্যাজ খেলাইয়া নিকটে আসিত।
এ পর্য্যন্ত কোনো সন্তান জন্মিয়া তার জীবনে নূতন সুখ বা দুঃখ আনে নাই। মাথায় তার বিবাহিতা রমণীর খোঁপা থাকিলেও তাহাকে নিতান্ত অল্পবয়স্কার মতো দেখাইত।
ঘরকন্নার ছোট ছোট কাজে পত্নীর দক্ষতা ছিল বলিয়া বড় কাজেও স্বামী তার পরামর্শ চাহিত—তবুও সে শিশুর মতো সরল ছিল। পাঁচ বৎসর সে স্বামীর সঙ্গে থাকিয়া বেশ সুখেই কাটাইয়াছে। স্বামীও পত্নীর সহিত এতদিন ধরিয়া যথাসম্ভব সদয় ব্যবহারই করিয়া আসিতেছে।
সহসা তার ব্যবহার কেমন উদাসীন হইয়া পড়িতে লাগিল। ইহার যথার্থ কারণ বুঝিতে না পারিয়া হারু তার মনকে বুঝাইবার চেষ্টা করিল যে, নিশ্চয় তার কোনো কর্ত্তব্যের ত্রুটি হইয়াছে। সে তার নিরীহ মনকে তোলাপাড়া করিয়া তুলিল ও স্বামীর সন্তোষ সাধনের জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করিতে লাগিল; কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না। স্বামী তাহাকে কোনো কঠোর কথা বলিত না, কিন্তু সে সেই তুষ্ণীভাবের পশ্চাতে অনুচ্চারিত কথাগুলো বলিবার ইচ্ছাটা বেশ স্পষ্টই দেখিতে পাইত। উচ্চশ্রেণীর জাপানীরা স্ত্রীর প্রতি বাক্যে রূঢ়তা প্রকাশ প্রায়ই করে না। কিন্তু এমন কিছু আছে যা সকল বাক্যের চেয়েও নিষ্ঠুর—অবহেলা; যে অবহেলা ঈর্ষ্যা উদ্রেক করে। সত্য বটে কিছুতেই ঈর্ষান্বিতা না হইতে জাপানী স্ত্রীকে শিক্ষা দেওয়া হয়; কিন্তু এ মনোবৃত্তিটা সকল শিক্ষার চেয়েও পুরাতন,—প্রেমের মতো পুরাণো; এবং প্রেমের মতোই চিরস্থায়ী।
হারুর ঈর্ষ্যার কারণ যথেষ্টই ছিল, কিন্তু সে বড়ই শিশুভাবাপন্না তাই কিছু বুঝিত না। পরিচারিকারাও স্নেহবশত তার কাছে এ বিষয়ের কোনো আলোচনা করিত না। তার স্বামী ত আগে আগে সন্ধ্যা বেলাটা গৃহমধ্যে বা অন্য কোথাও তারই সঙ্গে কাটাইত কিন্তু এখন সে একাকী যায় কোথা? প্রথমবারে সে বলিয়াছিল, ‘কাজ আছে’; কিন্তু তারপর সে আর কোনো কারণই দেখাইত না, এমন কি কখন ফিরিবে তাহাও বলিয়া যাইত না। সে কেমন যেন পরিবর্ত্তিত হইয়া গিয়াছিল; পরিচারিকারা বলাবলি করিত, তাহাকে ভূতে পাইয়াছে!
আসল কথা, কৌশলে তাহাকে ধরিবার জন্য জাল বিস্তৃত হইয়াছিল, এবং তাহাতে সে ধরাও পড়িয়াছিল। ‘গেইষা’র[২] একটা গোপন কথা তার চিত্ত অসাড় করিয়া ফেলিয়াছে; একটা বিলোল কটাক্ষ, একটুখানি হাসি তার চোখে ধাঁধা লাগাইয়া দিয়াছে। মাকড়সা যেমন শীকার ধরিবার জন্য জাল বিস্তার করে, সেও তেমনি ভোগের মায়াজাল বিস্তার করিয়া বসিয়াছিল। সে জালে পড়িলে দুর্ব্বলচিত্ত পুরুষের আর নিস্তার ছিল না!
হারু এসব কিছুই জানিত না। কিন্তু ক্রমে স্বামীর আশ্চর্য্য ব্যবহার অভ্যাসে পরিণত হইল, অর্থগুলোও আর বাড়ীতে আসে না। সন্ধ্যাবেলায় স্বামীর দেখা পাওয়া ভার, কোথায় থাকেন জিজ্ঞাসা করিতেও সাহস হয় না, তিনি যদি কিছু মনে করেন! তাই মনে যে ভাব আসিত বাক্যে তা প্রকাশ না করিয়া সে একান্তমনে স্বামীর পরিচর্য্যায় নিযুক্ত হইত। বুদ্ধিমান স্বামী হইলে পত্নীর মনের ভাব বুঝিতে বিলম্ব হইত না, কিন্তু হারুর স্বামীর ব্যবসায়বুদ্ধি বেশ পাকা হইলেও অন্যান্য বিষয়ে বুদ্ধি খুব অল্পই ছিল। সন্ধ্যাবেলাটা সে বাহিরেই কাটাইতে লাগিল এবং ক্রমশ চিত্ত যতই দুর্ব্বল হইতে লাগিল বাড়ী হইতে অনুপস্থিতির কালটাও তত দীর্ঘ হইয়া পড়িতে লাগিল। যত রাত্রিই হউক না কেন, স্বামীর গৃহে না ফেরা পর্য্যন্ত সাধ্বী পত্নী অপেক্ষা করিয়া বসিয়া থাকিবে, এই শিক্ষাই হারু পাইয়া আসিয়াছে, তাই অনিদ্রায় একলাটি বসিয়া বসিয়া তাহার স্নায়বিক পীড়া জন্মিল; দিনে দিনে জাগরণক্লান্ত চক্ষু দুটি জ্যোতিহীন ও স্নিগ্ধকোমল মুখখানি মলিন হইতে লাগিল। একদিন কেবল অনেক রাত্রে ফিরিয়া স্বামী বলিয়াছিল, “এত রাত পর্য্যন্ত কেন বসেছিলে? আর কখনো এমন করো না।” হারু সে দিন মনে করিয়াছিল, বুঝি বা স্বামী তার জন্য মনে ব্যথা পাইয়াছেন, তাই সে সকল দুঃখ ভুলিয়া গিয়া মধুর হাসি হাসিয়া বলিয়াছিল, আমার ঘুম পায় নি, ক্লান্তিও বোধ হয় নি, আমার জন্যে চিন্তিত হবেন না!” এ কথা শুনিয়া স্বামী মনে মনে প্রীত হইল এবং সেই দিন হইতে পত্নীর বিষয় চিন্তা করা একেবারে ছাড়িয়া দিল।
ইহার কিছু দিন পরে একদিন সারা রাত সে গৃহে ফিরিল না। তার পররাত্রেও সে ফিরিল না, তার পররাত্রেও না। তৃতীয় রাত্রের পর সে প্রাতে আহারের জন্যও বাড়ী ফিরিল না! আর চুপ করিয়া থাকা নয়, এইবার হারু স্বামীর সহিত একটা বোঝাপড়া করিবেই করিবে! তার কিছুই আর অগোচর নাই, পরিচারিকারা তাহাকে কিছু কিছু বলিয়াছে, অবশিষ্ট সে বুঝিয়া লইয়াছে! সে যে কত পীড়িত সে তা নিজেই জানে না। সে কেবল বুঝিল হৃদয়ের স্তরে স্তরে নিষ্ঠুর মর্মান্তিক ব্যথা পুঞ্জীভূত হইয়া উঠিয়াছে, এখনি যেন বুক ফাটিয়া বাহির হইবে!
উৎসুক দৃষ্টি পথের উপর স্থাপন করিয়া সারা সকাল বেলাটা সে স্বামীর প্রতীক্ষায় বসিয়া রহিল। যেন একটি প্রস্তরমূর্ত্তি! চোখে জল নাই; প্রলয়ের পূর্ব্বে প্রকৃতি যেমন স্থির অচঞ্চল তার মুখও তেমনি স্তব্ধ গম্ভীর! আজ তার ভয়ভাবনার অন্ত নাই। সে কি সব গুছাইয়া বলিতে পারিবে! স্বামী যদি তার মনের ভাব বুঝিয়া ফেলেন! বুঝুন, ক্ষতি নাই; আর তো সহ্য হয় না! সে আর বাঁচিতে চাহে না! তার যে কেহ নাই, সে যে বড় দুঃখী! ভগবান তাহাকে মরণ দিন! আর কোনো প্রার্থনা নাই!
ঐ না কুরুমার চাকার শব্দ! ঐ ত ভৃত্যেরা বলিতেছে আসুন, আসুন! তার মাথা ঘুরিতেছে, বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা অতি দ্রুত তালে দপ্ দপ্ করিতেছে চোখে সব জিনিষই কেমন ঝাপসা হইয়া উঠিল!
স্বামীর সহিত দেখা করিবার জন্য সে বহু কষ্টে দ্বারের নিকট অগ্রসর হইল। জ্বরে, বেদনায়, এবং পাছে সেই বেদনা প্রকাশিত হইয়া পড়ে সেই ভয়ে তার ক্ষীণ তনু কম্পিত হইতেছে। লোকটা তাহাকে দেখিয়া চমকিয়া উঠিল। কই, পত্নী তো তাহাকে সহাস্য বদনে স্বাগত সম্ভাষণ করিল না! সে তার কম্পমান ছোট হাত খানি দিয়া স্বামীর রেশমী জামার বুকটা চাপিয়া ধরিল। তার মুখের উপর স্থিরদৃষ্টি স্থাপিত করিল, এই পাষাণের মধ্যে একটুখানি হৃদয়ের সন্ধান যদি মেলে! কি বলিতে গেল কিন্তু আর বলা হইল না; কেবল একটা কথা বাহির হইল — তুমি? সেই মুহূর্ত্তে তার হাতের মুঠি শিথিল হইয়া গেল, কেমনধারা একটু হাসি চকিতের জন্য অধরে ভাসিয়া গেল, তারপর চোখ দুটি মুদ্রিত হইল; তাহাকে ধরিবার জন্য হাত বাড়াইবার পূর্ব্বেই সে পড়িয়া গেল। দেখা গেল সেই পতনে তার কোমল প্রাণের তন্ত্রী ছিন্ন হইয়া গিয়াছে!