বিষয়বস্তুতে চলুন

হিন্দু রসায়নী বিদ্যা/আধুনিক যুগ

​

আধুনিক যুগ

১৫০০-১৬০০ খ্রীষ্টাব্দ

 হিন্দু রসায়নশাস্ত্রের আধুনিক যুগ ১৫০০ খ্রীষ্টাব্দ হইতে আরম্ভ হইয়াছে বলিয়া গণ্য করা যাইতে পারে। এই যুগে অহিফেন ব্যতীত আরও কয়েকটি নূতন বৈদেশিক ঔষধের ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছিল। ষোড়শ শতাব্দীর প্রারম্ভ হইতে ভারতের বেলাভূমিতে পোর্তুগীজদের আগমনের এবং উপনিবেশ স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে ভারতবর্ষে কতকগুলি নূতন ব্যাধির প্রসার হইয়াছিল। হিন্দু চিকিৎসকমণ্ডলী এই সকল নূতন রোগের ঔষধ নির্ণয়ের চেষ্টার ত্রুটি করেন নাই। চরক সুশ্রুত হইতে আরম্ভ করিয়া পরবর্তীকালের বিশিষ্ট হিন্দু চিকিৎসকগণ উপদংশ রোগের বর্ণনা এবং তাহার চিকিৎসাতত্ত্ব লইয়া আলোচনা করিয়া গিয়াছেন, কিন্তু সিফিলিস বলিলে যাহা বুঝায়, সেই ব্যাধির বিষয়ে তাঁহাদের কেহই কোন কথা বলেন নাই। এই আধুনিক যুগে ‘রসপ্রদীপ’ নামক চিকিৎসাগ্রন্থে ‘ফেরঙ্গ’ রোগ নামক যে রোগের বিবরণ প্রদত্ত হইয়াছে তাহা যে সিফিলিস এ সম্বন্ধে কোনই সন্দেহ নাই। বস্তুত-পক্ষে হিন্দু চিকিৎসাপদ্ধতিতে ফেরঙ্গ রোগের ইহাই প্রথম উল্লেখ।

 ফ্ল্যুকিগার (Flückiger) ও হ্যানবেরীর (Hanbury) মতে ১৫৫৩ খ্রীষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে চৈনিক ব্যবসায়িগণ গোয়াবাসী পোর্তুগীজদের নিকট ফেরঙ্গ রোগের ঔষধ হিসাবে পারদঘটিত ক্যালোমেল ও যবচিনির ব্যবহারবিধি প্রচার করেন। ইহা হইতে ‘রসপ্রদীপে’র রচনাকাল সম্বন্ধে একটা মোটামুটি আভাস পাওয়া যায়। এই গ্রন্থে অজৈব অম্ল সম্বন্ধেও উল্লেখ করা হইয়াছে। এই অম্লকে শঙ্খদ্রাবক বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে। পরবর্তীকালে রচিত ‘ভাবপ্রকাশ’ গ্রন্থে কিন্তু শঙ্খদ্রাবকের কোনই উল্লেখ দেখা যায় না।

​ ‘রসকৌমুদী’ নামক গ্রন্থ আরও পরবর্তীকালের রচনা। ইহার রচয়িত মাধবকে অনেকেই ‘নিদানসংগ্রহে’র রচয়িতা মাধবকর বলিয়া ভুল করিয়াছেন। কিন্তু উভয়ে এক লোক নহেন। তাঁহাদের মধ্যে কালের ব্যবধান অন্যূন আট-নয় শত বৎসর হইবে। এই যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ রাসায়নিক গ্রন্থ বোধ হয় ‘রুদ্রযামল’ তন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত ‘ধাতুক্রিয়া’। হরপার্বতীর কথোপকথন ছলে এই গ্রন্থ লিখিত। ইহাতে ফেরঙ্গ জাতির বাসস্থান এবং বর্তমান কনস্টাণ্টিনোপলের তৎকাল প্রচলিত আরবীয় নাম রূমের উল্লেখ থাকায় মনে হয় ইহা ষোড়শ শতাব্দীর পূর্বে রচিত হয় নাই। ইহাতে দাহজল অথবা গন্ধকাম্লের (Sulphuric Acid) উল্লেখ আছে।

 ইহার পূর্বে ভারতবর্ষে অজৈব অম্লের সাহায্যে ধাতু দ্রবণ করার ব্যবস্থা জানা ছিল বলিয়া মনে হয় না। এইখানে একটি কথা উল্লেখযোগ্য এই যে ‘রসপ্রদীপে’র পরবর্তী গ্রন্থ ‘ভাবপ্রকাশে’ শঙ্খদ্রাবক সম্বন্ধে কিছুই বলা হয় নাই, বলা বাহুল্য ইতিমধ্যেই ভারতবর্ষে অজীর্ণ, প্লীহা এবং যকৃতের ব্যাধির জন্য এই শঙ্খদ্রাবকের ব্যবহার প্রচলিত হইয়া গিয়াছিল। ‘ভাবপ্রকাশ’ কিন্তু অম্লস্বাদের ফলের রস ব্যতীত অন্য অম্ল ব্যবহারের নির্দেশ দেন নাই।

 ‘ভাবপ্রকাশে’র রচয়িতা ভাবমিশ্র। চরক, সুশ্রুত, বাগ্‌ভট, হারীত, বৃন্দ এবং চক্রপাণির গ্রন্থ হইতে ‘ভাবপ্রকাশ’ সংকলিত হইয়াছিল বলিয়া ইহাতে বনৌষধিরই অধিকতর আলোচনা দেখিতে পাওয়া যায়। রসপ্রদীপ, রসেন্দ্রচিন্তামণি, শার্ঙ্গধর প্রমুখ প্রামাণিক গ্রন্থসমূহ হইতে ধাতুঘটিত ঔষধাদি সম্বন্ধে দুই-একটি অধ্যায়ও ইহাতে দেওয়া হইয়াছে। গ্রন্থকার ভাবমিশ্র মধ্যপ্রদেশের কোন স্থানে জন্মগ্রহণ করেন এবং তিনি আকবর বাদশাহের সমসাময়িক ছিলেন। ‘ভাবপ্রকাশে’ মুসলমানপ্রভাব সুস্পষ্ট।

 এই যুগের অন্যতম গ্রন্থ ‘অর্কপ্রকাশ’ লঙ্কেশ্বর রাবণ কর্তৃক বিরচিত বলিয়া গ্রন্থে কথিত হইয়াছে। গ্রন্থখানিতে মুখ্যত অরিষ্ট ও ক্বাথ প্রস্তুতপ্রণালী সম্বন্ধে বলা হইয়াছে। প্রণেতার নাম জানিবার কোন উপায় না থাকিলেও ​ইহার আনুমানিক রচনাকাল নির্ণয় করা অসম্ভব নহে। শঙ্খদ্রাবক ও পারদের সংমিশ্রণে ফেরঙ্গ রোগের ঔষধ প্রস্তুতবিধি ‘অর্কপ্রকাশে’ প্রদত্ত হইয়াছে। অহিফেনের ব্যবহারও এই গ্রন্থে বলা হইয়াছে, এবং দস্তাকেও ইহাতে যশদ আখ্যায় অভিহিত করা হইয়াছে। রাংসংযুক্ত তাম্রপাত্র ব্যবহার পাতন প্রক্রিয়ায় প্রশস্ত বলিয়া বলা হইয়াছে। অর্কপ্রকাশেও মুসলমানপ্রভাব বিশেষ রূপে প্রকট। একথা মনে করা অসঙ্গত হইবে না যে অর্ক শব্দটি আরবী শব্দ ‘অরক্’-শব্দের সংস্কৃত অপভ্রংশ মাত্র।