হিন্দু রসায়নী বিদ্যা/আয়ুর্বেদ
আয়ুর্বেদ
আয়ুর্বেদীয় যুগের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ চরক ও সুশ্রুত। বৈদিক যুগের বিশৃঙ্খল জ্ঞানভাণ্ডারের সুষ্ঠু সংস্কারের পর এই যুগেই প্রথম রসায়নশাস্ত্রের সমধিক উন্নতি পরিলক্ষিত হয়। চরক ও সুশ্রুতের মধ্যে চরকই প্রাচীনতর। অথর্ববেদ ও চরকের মধ্যে সময়ের ব্যবধান প্রচুর,—সম্ভবত এক সহস্র বৎসর কিংবা ততোধিক। চরকে শ্লেষ্মা সম্পর্কিত নিদানশাস্ত্র পরিপূর্ণরূপে বিবৃত হইয়াছে। রোগনির্ণয় অথবা রোগের গতিপ্রকৃতির বিস্তারিত বিবরণ এই চরকসংহিতায় পাওয়া যায়। পূর্বেই বলা হইয়াছে প্রাচীন ভারতীয় সমাজে চিকিৎসা-ব্যবসায়ীর স্থান আদৌ সম্মানজনক ছিল না, কিন্তু তাহা সত্ত্বেও অথর্ববেদের সময় হইতে আরম্ভ করিয়া পরবর্তীকালে কোন সময়ই হিন্দুগণ চিকিৎসাশাস্ত্রকে একেবারে অবহেলা করেন নাই।
চরকের রচনাকাল সঠিক নির্ণয় করা অসম্ভব, মোটামুটি ভাবে কতকটা অনুমান করা যাইতে পারে মাত্র। প্রসিদ্ধ প্রাচ্যতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সিলভাঁ লেভি চীনা ত্রিপিটকে চরক নামে জনৈক চিকিৎসা-ব্যবসায়ীর উল্লেখ দেখিতে পাইয়াছেন। ইনি ছিলেন শক-বংশীয় নরপতি কণিষ্কের গুরু। এই কণিষ্ক খ্রীষ্টপরবর্তী দ্বিতীয় শতাব্দীতে বর্তমান ছিলেন বলিয়া জানিতে পারা যায়। আয়ুর্বেদ প্রণেতা চরক এবং চীনা ত্রিপিটকে উল্লিখিত এই চরক এক ব্যক্তি নহেন। পাণিনিতে চরকের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। পতঞ্জলি খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে বর্তমান ছিলেন ইহা প্রায় সর্বজনস্বীকৃত। পতঞ্জলি চরকসংহিতার টীকা প্রণয়ন করিয়াছিলেন, চক্রপাণি-প্রণীত চরকসংহিতার টীকা ‘আয়ুর্বেদদীপিকা’য় পতঞ্জলি সম্বন্ধে বলা হইয়াছে—
পাতঞ্জল-মহাভাষ্য-চরকপ্রতিসংস্কৃতৈঃ।
মনোবাক্-কায়দোষাণাং হর্ত্রেহহিপতয়ে নমঃ॥
আপ্তো নাম অনুভবেন বস্তুতত্ত্বস্য কার্ৎস্ন্যেন নিশ্চয়বান্
রাগাদিবশাদপি নান্যথাবাদী বঃ স ইতি চরকে পতঞ্জলিঃ॥
বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ হইতে বিচার করিয়া চরককে বৌদ্ধপূর্ববর্তী যুগের লোক মনে করিলে বিশেষ ভুল করা হইবে না বলিয়াই মনে হয়। চরকের কালনির্ণয় সম্পর্কিত তথ্যাদি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করিবার ক্ষেত্র ইহা না হইলেও নিম্নোক্ত কয়েকটি বিষয়ের অবতারণা এই স্থানে করা যাইতে পারে।
সুশ্রুতসংহিতার ন্যায় চরকসংহিতার রচনাপ্রণালী সুসংবদ্ধ ও সাবলীল নহে। চরকসংহিতার এখানে-সেখানে অনেক অবাস্তব ও অসংলগ্ন বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হইয়াছে। স্থানে স্থানে পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের অভাব দার্শনিক আলোচনার সাহায্যে গোপন করিবার প্রয়াস চরকে সুস্পষ্টরূপে বিদ্যমান। সুশ্রুত এই দোষ হইতে বহুলাংশে মুক্ত এবং বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে ন্যায় ও বৈশেষিক-দর্শনকে যেরূপ সুসংবদ্ধ ও সুলিখিত অবস্থায় দেখিতে পাওয়া যায় চরকের মূল গ্রন্থে ইহারা সেরূপ ছিল না। চরকোক্ত ন্যায় ও বৈশেষিকবাদ পাঠ করিলে পরিষ্কার বুঝা যায় যে এই দার্শনিক মতবাদের তখন কেবল সূচনা আরম্ভ হইয়াছিল মাত্র। চরকের প্রাচীনত্বের ইহাও একটি প্রকৃষ্ট প্রমাণ। বেদোক্ত দেবতা এবং বৈদিক মন্ত্র ব্যতীত কোন পৌরাণিক কাহিনী চরকে সংকলিত হয় নাই। মানবদেহের অস্থিসংখ্যা নির্ণয়ে চরক বৈদিক মতবাদই অনুসরণ করিয়া গিয়াছেন এবং ত্রিশ বৎসর বয়স পর্যন্ত মানুষের শৈশব বলিয়া স্থির করিয়াছেন। বৈদিক যুগে ত্রিশ বৎসর পর্যন্ত শৈশব হয়তো বা অত্যধিক অতিরঞ্জিত ছিল না। চরক-সংহিতার মতে মানবদেহ ৩৬০ খানি অস্থি সমবায়ে গঠিত। জলির মতে চরকের প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে ইহা অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রমাণ।[১]
এইখানে একটা কথা বলিয়া রাখা ভাল যে হিন্দু চিকিৎসাশাস্ত্রে চরককেই প্রথম সুলিখিত গ্রন্থ বলিয়া মনে করিলে ভুল করা হইবে। পাণিনি যেমন যাস্ক, সাকল্য, শাকটায়ন, গার্গ্য এবং অন্যান্য পূর্ববর্তী প্রায় চল্লিশখানি ব্যাকরণের সুলিখিত শেষ পরিণতি, চরকও তেমনই তাহার পূর্ববর্তী নানাবিধ আয়ুর্বেদগ্রন্থের সুচিন্তিত ও সুলিখিত পরিণত সংস্করণ।
ইহা ব্যতীত চরকসংহিতার ভাষার বৈশিষ্ট্যও ইহার প্রাচীনত্ব প্রমাণে একটি বিশিষ্ট উপাদান। চরকসংহিতার ভাষার সহিত বেদের ব্রাহ্মণের ভাষার যথেষ্ট সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। অথর্ববেদ ও চরকের মধ্যবর্তী কালে নিশ্চয়ই যুগোপযোগী চিকিৎসাগ্রন্থ প্রণয়ন করা হইয়াছিল। এমন কি চরকের সময়ই অগ্নিবেশ, ভেল, জাতুকর্ণ, পরাশর, হারীত এবং ক্ষারপাণি প্রণীত ছয়খানি প্রামাণিক আয়ুর্বেদ গ্রন্থ বিদ্যমান ছিল। অগ্নিবেশের গ্রন্থখানিকে[২] ভিত্তি করিয়াই চরক তাঁহার সংহিতা রচনা করেন। অর্থাৎ অগ্নিবেশের গ্রন্থখানিকে আমূল সংস্কার করিয়া চরকসংহিতার উদ্ভব হয়।
কিঞ্চিৎ মনোযোগের সহিত চরক পাঠ করিলে স্বতই মনে হইবে যে, ইহা যেন একটি আন্তর্জাতিক চিকিৎসকমণ্ডলীর কোন একটি বিশেষ সম্মিলনীর কর্মবিবরণী ও আলোচনা। হিমালয়ের সানুদেশে কোথাও এই সম্মিলনীর অধিবেশন হয় এবং সুদূর বাহ্লীক দেশ হইতেও কাংকায়ন প্রতিনিধি হিসাবে ইহাতে যোগদান করেন।
চরক এবং সুশ্রুত প্রভৃতি প্রামাণিক আয়ুর্বেদগ্রন্থ আলোচনা করিয়া প্রাচীন হিন্দুজগতের রাসায়নিক জ্ঞানের পরিমাপ সম্বন্ধে কোন মোটামুটি ধারণা করিতে হইলে প্রথমেই সাংখ্য এবং বৈশেষিক দর্শনের মূল তথ্য সম্বন্ধে কিছু জ্ঞান থাকা আবশ্যক বলিয়া মনে হয়। বৈশেষিক দর্শনের স্রষ্টা কণাদ আপনাকে সর্বতোভাবে পদার্থের গুণনির্ণয়ে নিবদ্ধ রাখিয়াছিলেন। তাঁহার প্রবর্তিত পরমাণুবাদ কতকাংশে গ্রীক দার্শনিক ডিমোক্রিটসের মতবাদের অনুরূপ। শব্দসঞ্চরণ সম্পর্কে তাঁহার অভিমত আজিও বৈজ্ঞানিকমণ্ডলীর শ্রদ্ধা ও বিস্ময়ের সঞ্চার করিয়া থাকে। সাংখ্যদর্শনের প্রণেতা কপিল কণাদেরও পূর্বে এই সকল বিষয়ে অনুরূপ আভাস দিয়াছিলেন।
অন্যান্য হিন্দু দর্শনশাস্ত্রের মত সাংখ্যদর্শনও এই কথাই বলিয়াছেন যে মোক্ষলাভের উপায় পূর্ণ জ্ঞান। কপিলের মতে জ্ঞানলাভের তিনটি পর্যায় আছে এবং তাঁহার দর্শনশাস্ত্রে এইগুলিকে তিনি পঁচিশটি সংখ্যায় বিভক্ত করিয়াছেন। এইগুলির বিস্তারিত আলোচনা বর্তমান ক্ষেত্রে অবান্তর। শুধু এইটুকু বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে সাংখ্য এবং বৈশেষিকবাদে বিজ্ঞানকে নিস্পৃহ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেই বিচার করা হইয়াছে।
গ্রীক এবং হিন্দু দর্শনশাস্ত্রের মধ্যে অনেকক্ষেত্রে যে আশ্চর্য সৌসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হইয়া থাকে তাহাকে উপলক্ষ্য করিয়া বহু মনীষী আপন আপন অভিমত প্রচার করিয়া গিয়াছেন। পণ্ডিত মোক্ষমূলর, অধ্যাপক ম্যাকডোনেল, কোলব্রুক এবং উইলসন সকলেই “হিন্দুদিগের নিকট যে গ্রীক পণ্ডিতগণ ঋণী” একথা একবাক্যে স্বীকার করিয়াছেন। ‘সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস’ নামক গ্রন্থে অধ্যাপক ম্যাকডোনেল বলিয়াছেন, “দার্শনিক সাহিত্যের দিকে দৃষ্টিপাত করিলে প্রাচীন গ্রীক ও হিন্দু দার্শনিকগণের মতবাদের মধ্যে বহু সাদৃশ্য বিদ্যমান দেখা যায়। ভগবান ও পৃথিবী একই, বহুরূপে যাহাদের অস্তিত্ব বিদ্যমান মূলে তাহারা মায়া মাত্র, চিন্তা এবং অস্তিত্ব একই—প্রভৃতি এলেয়াতীয় (Eleatic) দার্শনিকদের চিন্তাধারা হিন্দু দর্শনশাস্ত্র উপনিষদ্ ও তাহার পরিণতি বেদান্তেও দেখিতে পাওয়া যায়। যাহা কোন কালে বিদ্যমান ছিল না তাহার অস্তিত্ব অসম্ভব অথবা যাহার অস্তিত্ব ছিল তাহার সর্বাঙ্গীন বিলোপ সম্ভব নহে এম্পিডোকলসের এই মত সাংখ্যদর্শনোক্ত পদার্থের নিত্যতা এবং অবিনশ্বরতা বিষয়ক মতের সহিত মূলত এক। গ্রীক প্রবাদ অনুসরণ করিলে দেখা যায়, থেলস, এম্পিডোকলস, অ্যানাক্সাগোরাস, ডিমোক্রিটস এবং আরও অনেকে দর্শনশাস্ত্র পাঠ করিবার উদ্দেশ্যে প্রাচ্যদেশ ভ্রমণে যাত্রা করিয়াছিলেন। ইহা হইতে অনুমান করা যাইতে পারে যে পারস্যের মধ্য দিয়া গ্রীক পণ্ডিতগণ হিন্দু দার্শনিকবৃন্দ কর্তৃক প্রভাবান্বিত হইয়াছিলেন"[৩]—ইত্যাদি।
এইবারে চরকসংহিতায় বর্ণিত বিবিধ সূত্রনিচয়ের মধ্যে কয়েকটির উল্লেখ হয়ত অপ্রাসঙ্গিক বিবেচিত হইবে না। স্বাদ সম্বন্ধে চরক বলেন,—“জিহ্বার উদ্দেশ্য হইল স্বাদ গ্রহণ ***মিষ্ট, টক, লবণ, কটু, তিক্ত ও কযায়—স্বাদের এই ষড়বিধ পর্যায় আছে।***বস্তুকে সাধারণত তিনভাগে ভাগ করা যায়, যথা জাস্তব, ভেষজ ও ভূমিজ। জান্তব পদার্থের মধ্যে মধু, টিকা (Vaccine), নিসৃত রস, পিত্ত, চর্বি, মজ্জা, রক্ত, মাংস, মল, মূত্র, চর্ম, শুক্র, অস্থি, শিরা, শৃঙ্গ, নখ, ক্ষুর, কেশ, লোম এবং উজ্জ্বলাভ গোরোচনা ঔষধার্থে ব্যবহৃত হয়। স্বর্ণ ও বিভিন্ন ধাতুজ মল[৪] এবং পঞ্চধাতু[৫], বালি, চুন, রক্তবর্ণ সেঁকোবিষ, মণিমুক্তা, লবণ, গিরিমাটি এবং এণ্টিমনিকে (Antimony) ভূমিজ ঔষধ বলা হয়।”
চরকসংহিতায় তুতে, হীরাকস, realgar, হরিতাল ও গন্ধক সহযোগে একপ্রকার ঔষধ তৈয়ারি করিবার প্রণালী বর্ণিত আছে; ইহা দাদ, কাউর, কুষ্ঠ প্রভৃতির মহৌষধ। লৌহ, স্বর্ণ এবং রৌপ্যদ্বারা একপ্রকার বলবর্ধক ঔষধ প্রস্তুত করিবার ব্যবস্থাও চরকে প্রদত্ত হইয়াছে। একখানি পাতলা লোহার পাতকে বিশেষ উত্তপ্ত করিলে যখন উহা রক্তবর্ণ ধারণ করিবে তখন তাড়াতাড়ি উহাকে গোমূত্রের সহিত মিশ্রিত হরীতকী, আমলকী ও বয়ড়ার ক্বাথের মধ্যে ডুবাইয়া ধরিতে হয়, ইহাই হইল লৌহমিশ্রিত বলবর্ধক ঔষধ (tonic) প্রস্তুতের উৎকৃষ্ট প্রণালী। এইরূপে লৌহের পরিবর্তে রৌপ্য ও স্বর্ণ ব্যবহার করিয়া যথাক্রমে রৌপ্য ও স্বর্ণঘটিত বলবর্ধক ঔষধ প্রস্তুত করা যাইতে পারে।
চরকে গুণানুসারে দুই প্রকার ঔষধের নাম পাওয়া যায়। প্রথম প্রকারের ঔষধ সুস্থ ব্যক্তির জন্য। ইহা সেবনে স্বাস্থ্য ভাল থাকে, শরীরে বল সঞ্চার হয়। দ্বিতীয় প্রকার ঔষধ রোগনাশক। রসায়নের সংজ্ঞার্থ নির্দেশ করিতে গিয়া চরক বলেন, যাহা মানুষকে দীর্ঘজীবী করে; স্মৃতিশক্তি বর্ধন করে; স্বাস্থ্য, শক্তি ও পুরুষত্ব দান করে আয়ুর্বেদমতে তাহাকে রসায়ন বলা হয়।
চরক অপেক্ষা সুশ্রুত অধিকতর বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। ঔষধের নামকরণ ও রোগনির্ণয়প্রণালী উভয় গ্রন্থে প্রায় একই প্রকার। ভাষার লালিত্যের দিক হইতে বিচার করিতে গেলে সুশ্রুতকে বরঞ্চ শুষ্ক, সারগর্ভ ও সংক্ষিপ্ত বলিয়া মনে হয়। এবং এই কারণে সুশ্রুতকে চরক অপেক্ষা আধুনিক বলিয়া গ্রহণ করা হইয়াছে। সুশ্রুতের বর্তমান আকার বৌদ্ধযুগের সুপ্রসিদ্ধ রসায়নাচার্য নাগার্জুনের দান। তিনি সুশ্রুত সংহিতার আমূল সংস্কার করিয়া ইহাকে নব কলেবর দান করেন। চরকে যেমন বিশুদ্ধ চিকিৎসাবিদ্যা লইয়া আলোচনা করা হইয়াছে সুশ্রুতে তেমনই অবিমিশ্র শল্যতন্ত্রকে প্রাধান্য দেওয়া হইয়াছে। সুশ্রুত পাঠে জানা যায় তৎকালে ভারতবর্ষীয় চিকিৎসক-সম্প্রদায় অস্ত্রচিকিৎসায় অভূতপূর্ব নৈপুণ্য লাভ করিয়াছিলেন, অবশ্য সাধারণ চিকিৎসায়ও তাঁহাদের দক্ষতা অতুলনীয় ছিল।
সুশ্রুতও কিন্তু অতি প্রাচীন গ্রন্থ। ইহা এত প্রাচীন যে খ্রীষ্টীয় ৫ম ও ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে পর্যন্ত ইহাকে দেববৈদ্য অশ্বিনীকুমারদ্বয় বিরচিত বলিয়া বিবেচনা করা হইত। চরকের ন্যায় সুশ্রুতের রচনাকাল সঠিক নির্ণয় করা বড়ই কঠিন। বাগ্ভটও তাঁহার ‘অষ্টাঙ্গহৃদয়’ গ্রন্থে চরক ও সুশ্রুত হইতে অনেক অংশ অবিকল উদ্ধৃত করিয়াছেন। ইহা হইতে অন্ততপক্ষে একথা নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হয় যে খ্রীষ্টীয় নবম শতাব্দীর পূর্বেও সুশ্রুতের বর্তমান রূপ প্রচলিত ছিল। হিন্দুরা যে গ্রীকদিগের নিকট সর্ব বিষয়ে ঋণী ইহা প্রমাণ করিবার চেষ্টায় হাস্ প্রমুখ কয়েকজন ইউরোপীয় পণ্ডিত সুশ্রুতকে আধুনিক বলিয়া দেখাইতে প্রাণপণ চেষ্টা করিয়াছেন। ইহা স্বাভাবিক, কারণ ভারতের নিকট ঋণী একথা স্বীকার করিতে অধিকাংশ ইউরোপবাসীই লজ্জা অনুভব করেন। তাই তাঁহারা সাধারণত যেনতেন-প্রকারেণ ভারতকে হেয় প্রতিপন্ন করিতে চেষ্টা করিয়া থাকেন। কিন্তু সৌভাগ্যের বিষয় ভারতকে হেয় প্রতিপন্ন করিবার উদ্দেশ্যে উত্থাপিত তাঁহাদের কোন যুক্তিই বিচারসহ নহে; তাই তাঁহাদের সকল চেষ্টা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হইতে বাধ্য হইয়াছে।
পূর্বেই বলা হইয়াছে শল্যবিদ্যাই সুশ্রুতের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় ইহাতে ক্ষার পদার্থকে অস্ত্রের পর্যায়ভুক্ত করা হইয়াছে। তীব্র ক্ষারের প্রয়োগে শরীরের রুগ্ন অংশ হইতে অস্ত্রোপচারের সাহায্য ছাড়াই চর্ম ও মাংস অপসৃত করিয়া পরিষ্কার করা যাইতে পারে। প্রকৃতিভেদে ক্ষারের দ্বারা তিন রকমের কাজ সাধিত হইতে পারে। কোন কোন স্থলে ক্ষার শীতলধর্মী, কোথাও বা প্রস্তুতপ্রণালীর বৈচিত্র্যে ইহা তিক্ত, উত্তপ্ত ও কটু হইতে পারে। ক্ষার পচনক্রিয়ার সহায়তা করে ও শরীরের রুগ্ন অংশের ধ্বংস সাধন করিতে পারে। দুরারোগ্য ক্ষত নিরাময় করিতে ইহার ক্ষমতা সর্ববাদিসম্মত। ইহাতে দানাবাঁধার সহায়তা করে, এবং ক্ষরণ-নিবারণ, রক্ত বন্ধ এবং চামড়া পরিষ্কার করা ইহার বিশিষ্ট ধর্ম। ক্ষারসেবন অম্ল, অজীর্ণ, ক্রিমি ও কফনাশক, ইহাতে চর্মরোগ, কতকগুলি বিষজনিত ব্যাধি ও স্থূলতা দূর হয়। অত্যধিক ক্ষারসেবনে পুরুষত্ব নষ্ট হয়।
সাধারণ উপকারিতাভেদে ক্ষার আবার দ্বিবিধ। এক প্রকার ক্ষার শুধু শরীরের বহির্ভাগে প্রয়োগ এবং অন্যপ্রকার সেবনকার্যে ব্যবহার করা হয়। কুষ্ঠ, দাদ, ফোড়া, দুরারোগ্য ক্ষত, ক্ষতনালী, আঁচিল, মুখের দাগ, শরীরের স্ফীতি, অর্শ, ভগন্দর প্রভৃতি রোগে ক্ষারের বাহ্য প্রয়োগবিধি দেখিতে পাওয়া যায়। এতদ্ব্যতীত উপজিহ্বা, আদিজিহ্বা, উপকুশ, দন্তবৈদর্ভ প্রভৃতি মুখের রোগে এবং তিন প্রকার গলরোগে ইহার বাহ্যপ্রয়োগ অতিশয় ফলপ্রদ। মৃদু বিষক্রিয়ায় (slow poisoning), অন্ত্রের ফোড়ায়, ক্ষুধামান্দ্যে, অজীর্ণে, অরুচিতে, কানপাকায়, মূত্রদোষে, অর্শে, ক্রিমিরোগে, শরীরের কোন অংশে স্ফীতিজনিত দুঃসহ ব্যথায় ক্ষারসেবন বিহিত আছে। শিশু, বৃদ্ধ ও রক্তমোক্ষণকারী রোগীর ক্ষারপ্রয়োগ প্রশস্ত নহে।
সাধারণ কদলী প্রভৃতি উদ্ভিদের ভস্মকে গোমূত্রের সহিত মিশ্রিত করিয়া ক্ষার প্রস্তুত করা হয়। কার্যশক্তি অনুসারে ক্ষারকে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়, —মৃদু, মধ্যম এবং তীব্র।
ক্ষার তৈয়ারি করিতে ইচ্ছা করিলে শরৎকালে খুব শুভ একটি দিন বাছিয়া লইতে হইবে। অনাহারী থাকিয়া শুদ্ধদেহে কোন পাহাড়ের বিশেষ স্থানে জাত কাল ফুলযুক্ত একটি মধ্যম অথবা বড় “ঘণ্টাপাটলি” বৃক্ষকে উল্লেখ করিয়া নির্দিষ্ট মন্ত্রপাঠ করিতে হইবে। এই প্রক্রিয়াকে অধিবাস বলে। পরের দিন নিম্নোক্ত মন্ত্র উচ্চারণ করিতে করিতে গাছটিকে কাটিয়া ফেলিতে হইবে,—“হে প্রচণ্ড শক্তিশালী গাছ, তোমার শক্তি যেন চিরকাল অব্যাহত থাকে, তুমি এই স্থানে অধিষ্ঠিত থাকিয়া আমার উদ্দেশ্য সাধনে সহায়তা কর। আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ করিয়া তুমি স্বর্গে গমন কর।” ইহার পরে হোম-উৎসব প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়। বাতাসশূন্য একটি স্থানে গাছটিকে খণ্ড খণ্ড করিয়া কাটিয়া স্তূপ প্রস্তুত করিতে হইবে। তারপর সেই স্তূপের উপরে কিছু চুনাপাথর (ঝিনুক) রাখিয়া উহাতে অগ্নি সংযোগ করিতে হয়। অগ্নি নির্বাপিত হইলে ঘণ্টাপাটলিভস্ম ও চুন-ভস্ম কে পৃথক করিয়া রাখিতে হইবে। নিম্নলিখিত বৃক্ষগুলিকেও ক্ষারপ্রস্তুত কাজের জন্য ব্যবহার করা যাইতে পারে—
| কুটজ | অর্ক | চিত্রক | সপ্তচ্ছদ |
| পলাশ | স্নুহী | পূতিক | অগ্নিমন্থ |
| অশ্বকর্ণ | অপামার্গ | ইন্দ্রবৃক্ষ | গুঞ্জা |
| পারিভদ্রক | পাটলী | আস্ফোট | চতুর্বিধ কোষ |
| বিভীতক | নক্তমাল | অশ্বমারক | |
| অরগ্বধ | বৃষ | ||
| তিল্বক | কদলী |
প্রস্তুত-প্রণালী:—৩২ সের ক্ষারের সহিত ইহার ছয় গুণ জল অথবা গোমূত্র মিশ্রিত করিয়া কাপড় দিয়া ছাঁকিয়া লইতে হইবে। একশ বার এই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি করিতে হইবে। এইরূপে শোধিত তরল পদার্থকে অতঃপর ধীরে ধীরে একটি বড় কড়াতে জ্বাল দিতে হইবে এবং একখানি হাতল দিয়া অনবরত নাড়িতে হইবে। তরল পদার্থটি পরিষ্কার, কটু ও পিচ্ছিল হইলেই চুল্লির উপর হইতে ইহাকে নামাইতে হইবে এবং আর একবার কাপড় দিয়া ছাঁকিতে হইবে। ছাঁকিয়া যে তরল পদার্থ পাওয়া যাইবে তাহাকে আবার জ্বাল দিয়া ঘন করিলে আদর্শ ক্ষার প্রস্তুত হয়।
রক্ষণ-প্রণালী:—ক্ষার প্রস্তুত করিয়া লোহার পাত্রে ঢালিতে হয়। তারপর পাত্রের মুখ ভালভাবে বন্ধ করিয়া নির্জন স্থানে রাখিয়া দিতে হয়। মৃদু ক্ষারকে নিম্নলিখিত জিনিসগুলির প্রত্যেকটির ২ তোলা মিশ্রিত করিয়া জ্বাল দিলে তীব্রহ্মারে পরিণত হয়।
| দন্তী | চিত্রক | পৃতিক | ক্ষীরী |
| দ্রবন্তী | লাঙ্গলিকী | কনক | বচা |
সীসক ও রাংকে ক্রিমিনাশক ঔষধি বলে। পরবর্তী যুগের চিকিৎসকগণও ইহা স্বীকার করিয়াছেন। রাংচূর্ণকে সাতদিন দধিসারের সহিত মিশ্রিত করিয়া ঔষধ হিসাবে সেবন করিবার ব্যবস্থা সুশ্রুতে আছে।
চরক ও সুশ্রুতসংহিতার পরই ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসাশাস্ত্র— বাগ্ভটের ‘অষ্টাঙ্গহৃদয়’। দক্ষিণাপথে চরক ও সুশ্রুত অপেক্ষা বাগ্ভটের উল্লেখ বেশী দেখিতে পাওয়া যায় বলিয়া হাস্ প্রমুখ পণ্ডিতগণ বাগ্ভটকে চরক ও সুশ্রুতের উৎস বলিয়া মনে করেন। প্রকৃতপক্ষে কিন্তু ‘অষ্টাঙ্গহৃদয়’ চরক ও সুশ্রুতসংহিতার সার-সংকলন মাত্র। একমাত্র শল্যচিকিৎসা অধ্যায়ে বাগ্ভটে খানিকটা নূতনত্ব দেখিতে পাওয়া যায়। ধাতু ও প্রকৃতিজাত বিভিন্ন পদার্থ ঔষধ হিসাবে ব্যবহারের উল্লেখ বাগ্ভটে আছে। পারদঘটিত ঔষধের কথাও বাগ্ভটে লিখিত হইয়াছে, কিন্তু তাহা এমন অস্পষ্ট যে বাস্তবিক কোন্ কোন্ পারদঘটিত যৌগিক ঔষধার্থে ব্যবহৃত হইত অথবা মোটেই ব্যবহৃত হইত কিনা সে সম্বন্ধে কিছু বুঝিবার উপায় নাই। ধাতু ও ধাতুযৌগিক হিসাবে ‘অষ্টাঙ্গে’ যে উল্লেখ আছে তাহা লক্ষ্য করিলে বুঝা যায় বাগ্ভটের অনেক পূর্বেই ধাতুনিষ্কাশন-বিদ্যা ভারতে সুপ্রচলিত ছিল। বাগ্ভটের কয়েকটি শ্লোকের মর্মার্থ এখানে উল্লেখ করি—
“স্বর্ণ, তাম্র, রৌপ্য, লৌহ অথবা রাং, সৈন্ধব লবণ, মধু, হরীতকী সহ সেব্য।”
“স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র ও লৌহ দুগ্ধ এবং শিলাজতু সহ গ্রহণীয়।”
“৬৪ ভাগ স্রোতোঞ্জন (sulphide of antimony) তাম্র, লৌহ, রৌপ্য এবং স্বর্ণের প্রত্যেকটির একভাগ সহ একটি ঢাকা পাত্রে ভস্ম কর, ইত্যাদি।”
“৩০ ভাগ সীসক, ৫ ভাগ গন্ধক, তাম্র এবং হরিতালের প্রত্যেকটি ২ ভাগ, এক ভাগ রাং এবং তিন ভাগ স্রোতোঞ্জন লইয়া একটি রুদ্ধ পাত্রে ভস্ম কর।”
পারদ সম্বন্ধে বাগ্ভটে নিম্নলিখিত উদাহরণটিই বোধ হয় একমাত্র উল্লেখ―
“সমপরিমাণ পারদ এবং সীসক লইয়া একটি উত্তম মিশ্রণ প্রস্তুত করিতে হইবে। উহাতে সমান ওজনের স্রোতোঞ্জন ও কর্পূর মিশাইতে হইবে।... ইত্যাদি।”
দক্ষিণ ভারতে কিংবদন্তি প্রচলিত আছে যে বাগ্ভট জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন কিন্তু জনৈক বৌদ্ধ শ্রমণের প্রভাবে তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। ‘অষ্টাঙ্গহৃদয়ে’র প্রথম শ্লোকটি লক্ষ্য করিলে মনে হয় যে ইহাতে বুদ্ধদেবকে অথবা বৌদ্ধধর্মের কোন বিশিষ্ট প্রতীককে প্রণতিজ্ঞাপন করা হইয়াছে। নানাসূত্রে সংগৃহীত প্রমাণ হইতে একমাত্র এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হওয়া যায় যে বাগ্ভট খ্রীষ্টীয় অষ্টম শতকে তাঁহার এই প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রচনা করেন। অবশ্য প্রসিদ্ধ প্রাচ্যতত্ত্ববিদ্ কুন্তের (Kunte) মতে, বাগ্ভটের রচনাকাল খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী।
- ↑ Jolly—Introduction to Vishnu, pp. xviii-xx.
- ↑ “অগ্নিবেশ সম্বন্ধে চরক নিজেই বলিয়াছেন যে, “ছয়জনের (গ্রন্থকর্তা) মধ্যে অগ্নিবেশই সর্বাপেক্ষা ধীমান্।”
- ↑ কোলব্রুক বলেন: “আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছি যে এক্ষেত্রে (পারস্য দেশে) ভারতীয়গণ শিক্ষার্থী না হইয়া শিক্ষক ছিলেন”—History of Sanskrit Literaturepp., 421 22. অধ্যাপক উইলসনও বলিয়াছিলেন “হিন্দুগণ গ্রীকদিগের নিকট হইতে দার্শনিক মতবাদ গ্রহণ করিয়াছিলেন ইহা অসম্ভাব্য মনে হয়। যদি বাস্তবিক একে অন্যের মত গ্রহণ করিবার কথা উঠেই তবে শেষোক্তেরাই খুব সম্ভবত প্রথমোক্তদিগের নিকট ঋণী।—Trans. Roy. As. Soc. Vol. I, p. 579.
- ↑ ধাতু ও অক্সিজেন ঘটিত পদার্থ।
- ↑ রৌপ্য, তাম্র, সীসক, দস্তা এবং লৌহ।