হিন্দু রসায়নী বিদ্যা/ঔষধি-বিজ্ঞানের যুগ
ঔষধি-বিজ্ঞানের যুগ
তান্ত্রিক যুগের সঞ্জীবনী সুধার কাল নিঃশেষ হইয়া আসিতে আসিতে অবশেষে হিন্দু রসায়ন ঔষধি-বিজ্ঞানে আসিয়া পৌঁছিল। চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যভাগ হইতে এই যুগ আরম্ভ হইয়াছিল বলা চলিতে পারে। পারদ, লৌহ, তাম্র প্রভৃতি ধাতুঘটিত অসংখ্য ঔষধের কোনটিই মানুষকে অমরতা অথবা মৃতের জীবনদান করিতে সক্ষম না হইলেও ইহা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হইয়া উঠিয়াছিল যে রোগ দূরীকরণে ইহাদের অনেকগুলিই বিশেষ কার্যকর। প্রথমে চরক ও সুশ্রুতবর্ণিত বহুবিধ বনজ ঔষধের সহিত ধাতুঘটিত দুই চারিটি ঔষধ বিশেষ সাবধানতা সহকারেই ব্যবহার করা হইত, কিন্তু কালক্রমে এই ধাতুঘটিত ঔষধাবলীই হিন্দু চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটা মুখ্য স্থান অধিকার করিয়া বসিয়াছিল। ইহার অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়ার ফলে বনজ ঔষধের ব্যবহার ক্রমশই কমিয়া আসিল। ‘রসরত্নসমুচ্চয়ে’র সমকালবর্তী ‘রসেন্দ্রচিন্তামণি’ নামক গ্রন্থের একটি শ্লোকে পরিষ্কার এই কথাই বলা হইয়াছে যে, “হে গুরো, দুর্বল এবং ভীরুগণের উপকারার্থে আমাকে এমন একটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে উপদেশ প্রদান কর যাহাতে শল্যশাস্ত্রের ব্যবহার একেবারেই অপ্রয়োজনীয় হইয়া যাইবে।” বলা বাহুল্য পারদঘটিত ঔষধসমূহের বহুল ব্যবহারের ইহা একটি বিশেষ হেতুবাদ ছিল মাত্র।
ঔষধি-বিজ্ঞানের যুগে যে সমস্ত গ্রন্থ রচিত হইয়াছিল তাহাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নাগার্জুনের প্রভাব সুপরিস্ফুট। বস্তুত নাগার্জুনই তির্যক্পাতন ও দহন (calcination) প্রক্রিয়াদ্বয়ের উদ্ভাবক। আলকিমি-বিদ্যাবিশারদ সপ্তবিংশতি বুধমণ্ডলীর অন্যতম বলিয়া ‘রসরত্নসমুচ্চয়ে’র গ্রন্থকর্তা তাঁহাকে তদীয় গ্রন্থে প্রথমেই বন্দনা করিয়াছেন এবং ‘ধাতুবাদ’ সম্পর্কে তাঁহার মতামত প্রামাণিক বলিয়া গ্রহণ করিয়াছেন। ‘রসেন্দ্রচিন্তামণি’-গ্রন্থকার এবং চক্রপাণিও তাঁহার অনুরূপ স্তুতি করিয়াছেন। পূর্বেই বলা হইয়াছে বৃন্দ এবং চক্রপাণির মতে নাগার্জুনই কজ্জলীর আবিষ্কর্তা এবং কোন কোন প্রাচীন গ্রন্থকর্তার মতে নাগার্জুনই সুশ্রুতেরও সংকলয়িতা।
চক্রপাণির টীকাকার পাণিনির টীকাকার পতঞ্জলিকে লৌহশাস্ত্র-বিশারদ বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। পতঞ্জলি খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে বিদ্যমান ছিলেন বলিয়া অনুমান করিতে পারা যায়। চক্রপাণি পতঞ্জলিকে চরকের সংকলয়িতা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। ইহা ব্যতীত ‘ন্যায়বর্তিকা’ গ্রন্থে ভোজ বলিয়াছেন, ‘পতঞ্জলি দেহ এবং মন উভয়েরই চিকিৎসক।’
যোগেন চিত্তস্য পদেন বাচাং মলং শরীরস্য তু বৈদ্যকেন।
যোহপাকরোৎ তং প্রবরং মুনীনাং পতঞ্জলিং প্রাঞ্জলিরানতোহস্মি॥
পতঞ্জলির যোগদর্শনে যে মোক্ষের কথা বলা হইয়াছে তাহার সহিত আলকিমিবিদ্যার বহুল সংযোগ বিদ্যমান।
তান্ত্রিক-মতাবলম্বী এবং আলকিমি-বিদ্যার অনুসরকগণের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হইয়া রসায়নশাস্ত্রের ভারতীয় ছাত্রগণ অনন্তকাল অযথা সময় নষ্ট করেন নাই। জীবকে অমরত্ব প্রদানে প্রয়াসী হইয়া অন্ততপক্ষে তাঁহারা আধিব্যাধিকে দূর করিতে চেষ্টা করিয়াছেন। ঔষধি-বিজ্ঞানের যুগে যে সমস্ত মূল্যবান গ্রন্থ প্রচারিত হইয়াছে তাহার মধ্যে মালবের রাজবৈদ্য মথনসিংহ প্রণীত ‘রসনক্ষত্রমালিকা’ অন্যতম। এই গ্রন্থের ১৫৫৭ সংবৎ অর্থাৎ ১৫০০ খ্রীষ্টাব্দে অনুলিখিত পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়াছে। ইহা হইতে মনে হয়, গ্রন্থের প্রণয়নকাল তাহারও অনেক পূর্বে। ধাতুঘটিত ঔষধের প্রস্তুতবিধির উল্লেখ এই গ্রন্থের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। অন্যান্য পদার্থের সহিত অহিফেনের ব্যবহার এবং রাং, লৌহ ও পারদভস্মের সহিত অন্যান্য ঔষধের মিশ্রণে প্রস্তুত ‘স্বচ্ছন্দ-ভৈরব-রসে’র উল্লেখ ‘রসনক্ষত্রমালিকা’য় দেখিতে পাওয়া যায়!
পার্বতী-সূত সিদ্ধ নিত্যনাথ প্রণীত ‘রসরত্নাকর’ গ্রন্থের প্রস্তাবনায় বলা হইয়াছে, “রসার্ণবে উক্ত পারদঘটিত ঔষধের ব্যবহার সম্বন্ধে ভগবান শিববর্ণিত তথ্যসমূহ, ‘রসমঙ্গলদীপিকা’য় পারদ সম্বন্ধে এবং রোগাক্রান্ত জনগণের মঙ্গলার্থে নাগার্জুন প্রস্তাবিত সিদ্ধ চর্পটি, বাগ্ভট ও সুশ্রুত-উক্ত মতবাদ এবং ধাতু ও পারদ ঘটিত ঔষধ সম্বন্ধে বহু গ্রন্থ পাঠ করিয়াছি। যে সমস্ত ঔষধ দুষ্প্রাপ্য এবং দুর্লভ হইয়াছে সেগুলিকে বাদ দিয়া অন্যগুলির মূলতত্ত্বসমূহ আমি একত্র সংকলিত করিলাম। * * * * আমি আমার শিক্ষকবৃন্দের নিকট যাহা শিক্ষা করিয়াছি এবং যে সমস্ত বিষয় স্বয়ং পরীক্ষা করিতে পারিয়াছি মানবের হিতার্থে কেবল তাহাই এই গ্রন্থে স্থানলাভ করিয়াছে।” ‘রসেন্দ্রচিন্তামণি’ গ্রন্থের রচয়িতা ঢুণ্ঢকনাথ তদীয় গ্রন্থের ভূমিকায় বলিয়াছেন,—“আমি মাত্র সেই সমস্ত প্রক্রিয়ার প্রচার করিব যাহা আমি স্বহস্তে পরীক্ষা করিতে পারিয়াছি।” অন্যত্র―“পারদঘটিত সেই সমস্ত ঔষধ আমার গ্রন্থে স্থান পাইয়াছে যাহা আমি নিজে পরীক্ষা করিতে পারিয়াছি। যাঁহারা নিজেরা পরীক্ষা করিতে না পারিলেও শিক্ষাদান করিতে চান তাঁহারা বৃথাই পরিশ্রম করেন।”
এই যুগের ‘রসসার’ নামক অন্য একখানি গ্রন্থে হিন্দু রাসায়নিকমণ্ডলীর পারদ সম্পর্কিত জ্ঞানের পরিচয় বিশেষভাবে পরিস্ফুট হইয়া উঠিয়াছে। গ্রন্থকর্তা গোবিন্দাচার্য ব্রাহ্মণ্য-ধর্মাবলম্বী বলিয়া প্রথমেই শিব এবং বিষ্ণুর বন্দনা করিয়াছেন এবং এই উপলক্ষে স্বীকার করিয়াছেন যে তিনি অন্যান্য প্রচলিত প্রামাণিক গ্রন্থরাজি হইতে আবশ্যক তথ্যসমূহ সংগ্রহ করিয়াছেন। কতকগুলি রাসায়নিক প্রক্রিয়ার বিবরণ সম্বন্ধে “এবং বৌদ্ধা বিজানন্তি ভোটদেশনিবাসিনঃ” বলিয়া তিনি তিব্বতস্থ বৌদ্ধ পণ্ডিতমণ্ডলীর নিকট তাঁহার ঋণ স্বীকার করিয়াছেন। গ্রন্থশেষে একস্থলে গোবিন্দাচার্য বলিয়াছেন, “বৌদ্ধমতং তথা জ্ঞাত্বা রসসারঃ কতো ময়া।” গোবিন্দাচার্যের এই সকল স্বীকৃতি এবং উক্তি হইতে ইহা স্পষ্ট বোঝা যায় যে এই সময় ভারতভূমিতে আলকিমির চর্চা বন্ধ হইয়া গিয়াছিল এবং সুদূর তিব্বতে তখনও ইহা চলিতেছিল। এইজন্যই গোবিন্দাচার্যকে তথ্যসমূহের জন্য ভোটদেশবাসী বৌদ্ধ বুধমণ্ডলীর দ্বারস্থ হইতে হইয়াছিল।
‘রসসারে’র রচনাকাল নির্ণয় করার একটা সুবিধা এই আছে যে, ইহাতে ঔষধ হিসাবে অহিফেনের ব্যবহারের নির্দেশ পাওয়া যায়। এইখানে একটা কথা উল্লেখযোগ্য যে অহিফেন ব্যবহারের নির্দেশ দিলেও গোবিন্দাচার্য ইহার উৎপত্তি সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন। অহিফেনকে তিনি বিষধর সামুদ্রিক মৎস্য বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন,—
সমুদ্রে চৈব জায়ন্তে বিষমৎস্যাশ্চতুর্বিধাঃ
তেভ্যঃ ফেনং সমুৎপন্নম্ অহিফেনো বিযং স চতুর্বিধম্
কেচিদ্বদন্তি সর্পাণাং ফেনং স্যাদহিফেনকম্।
অন্যান্য প্রমাণ প্রয়োগ আলোচনা করিয়া ‘রসসার’কে অনায়াসে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে রচিত বলিয়া সিদ্ধান্ত করা যাইতে পারে।
এযুগের অন্য একখানি গ্রন্থ ‘শার্ঙ্গধরসংগ্রহে’ ঔষধার্থে সাতটি মৌলিক ধাতু এবং পিত্তল ও কাংসের ব্যবহার-নির্দেশ রহিয়াছে। আশ্চর্যের বিষয় শার্ঙ্গধর দস্তার ব্যবহার সম্বন্ধে কোন উল্লেখমাত্র করেন নাই। এই গ্রন্থ প্রধানত আয়ুর্বেদ গ্রন্থসমূহকে (চরক-সংহিতা) ভিত্তি করিয়া লিখিত। গ্রন্থকারের পিতার নাম দামোদর এবং পিতামহ চৌহান ভূপতি হম্মীর বা হামীরের সভাসদ রাঘবদেব।
গোপালকৃষ্ণ বিরচিত ‘রসেন্দ্রসারসংগ্রহে’ প্রথমেই বলা হইয়াছে যে বিভিন্ন তন্ত্রশাস্ত্র বিশেষ করিয়া ‘রসমঞ্জরী’ এবং ‘চন্দ্রিকা’ তন্ত্রদ্বয় আলোচনা করিয়া এই গ্রন্থ লিখিত হইয়াছে। ইহাতেও ধাতুঘটিত ঔষধসমূহের উপর অতিরিক্ত দৃষ্টি প্রদত্ত হইয়াছে এবং আয়ুর্বেদোক্ত বনজ ঔষধসমূহকে অপেক্ষাকৃত নিম্নস্থান দেওয়া হইয়াছে। রাসায়নিক জ্ঞানের দিক হইতে বিচার করিলে মনে হয় ইহা ‘শার্ঙ্গধরসংগ্রহ’ অপেক্ষা নিকৃষ্টতর।
‘রসেন্দ্রকল্পদ্রুম’ নামক এই যুগের অপর একখানি গ্রন্থও প্রধানত ধাতব পদার্থসমূহের আলোচনায়ই মুখর। ‘রসার্ণব’, ‘রসমঙ্গল’, ‘রত্নাকর’, ‘রসামৃত’ এবং ‘রসরত্নসমুচ্চয়’ হইতে বহু শ্লোক ইহাতে উদ্ধৃত হইয়াছে।
‘ধাতুরত্নমালা’ নামক এই যুগের আর একখানি গ্রন্থেরও উল্লেখ এইস্থলে করা যাইতে পারে। স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র, সীসক, রাঙ এবং লৌহ, মাত্র এই ছয়টি ধাতুর ব্যবহারের বিধি ‘ধাতুরত্নমালা’র প্রথম দিকে দেখিতে পাওয়া যায়, কিন্তু যশদ অথবা দস্তাকে খর্পর বলিয়া উল্লেখ করিয়া তাহার ব্যবহারবিধিও এই গ্রন্থে প্রদত্ত হইয়াছে।